বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

অমর মিত্র'র গল্প : ধ্রুবতারাটি

এই অফিসের জানালা আছে। বন্ধ। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এর সবটাই। বাইরের আলো নেই। সব এল,ই,ডি ল্যাম্প। এই হলো কুসুমের অফিস। সেক্সপিয়র বুক কোম্পানি। অফিসে বই আনা নিষেধ। নিউজ পেপারও বারণ। কিন্তু ইন্টারনেটে সব দেখা যায়। বস টের পায় না কোথাও না কোথাও জানালা আছেই। উইন্ডোজ-টেন। গুগল সার্চ করলেই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড। অনন্ত আকাশ। নদী পাহাড় সমুদ্রেরও অতীত তা। অফিস চায় না চম্পা জানালা খুলুক। একদিন সে খুলতে গিয়েছিল, সকলে হা হা করে উঠেছিল, না না না না। একদম না। এসি রয়েছে। বাইরের বাতাসে ঘর তেতে যাবে।

কুসুম অভিনয় করে। তাদের নাট্যদলের শো আছে শিলিগুড়িতে উত্তরবঙ্গ নাট্যোৎসবে। ছুটির দরখাস্ত নিয়ে কুসুম গেল বসের কাছে। চারদিন ছুটি চাই। বছরের আরম্ভ । তার কি চারদিন হবে না ? শীতকাল উৎসবের ঋতু। বইমেলা, নাট্যমেলা, শিল্পমেলা, গানমেলা, লিটল ম্যাগাজিন মেলা…...কত মেলা লেগেছে পরপর। বইমেলাতে তাদের অফিসও স্টল দেবে। তখন সেখানে কুসুম ডিউটি নেবে। এখন তার ছুটি চাই। দরখাস্ত পড়ে বস মিঃ গোলদার বললেন, ও মাই গড, দিল্লি থেকে মিঃ কুলকারনির আসার কথা, কী করে ছুটি নেবে, কেনই বা নেবে ?

কুসুম বলল, আসুন না কুলকারনি সায়েব, আমি সব গুছিয়ে রেখে যাব, সাইট খুললেই সব পেয়ে যাবেন উনি, স্যার আমার ছুটিটা খুব দরকার। 

অমিত গোলদার বললেন, অফিসের ইন্টারেস্ট তো দেখতে হবে তোমাকে, দিল্লি থেকে সায়েব আসবেন, তখন একজন ছুটিতে, ঠিক হবে না, অফিসের ডিসিপ্লিনের একটা ব্যাপার আছে।

কুসুম বোঝে না ডিসিপ্লিনের সঙ্গে তার ছুটি নেওয়ার সম্পর্ক কী ? একজন অসুস্থ হতে পারে, তার বাড়িতে খুব অসুবিধে হতে পারে, ছুটি নেবে না? কুলকারনির শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। সঙ্গে অফিস ভিজিট। দুটো কাজ একসঙ্গে হয়। সবাই তা জানে। তার মানে কুলকারনি শ্বশুরবাড়ি আসবে, ফ্যামিলি নিয়ে রায়চকে হোটেল র‍্যাডিসন ইন্টারন্যাশানালে ফ্যামিলি নিয়ে থাকবে দুদিন, তাই তাকে অফিসে থাকতে হবে। রায়চক থেকে কুলকারনি ভিডিও কনফারেন্স করতে পারে, তাই তাকে অফিসে থাকতে হবে। তার সঙ্গে কুলকারনি কথাই বলবে না, কিন্তু তাকে অফিসে থাকতে হবে। কুলকারনি দেখবে সব সিটে লোক আছে। তার মুখ কম্পিউটার মনিটরে এলেই যেন সকলে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে। যতক্ষণ সে ভিডিওতে থাকবে এমপ্লয়িজ রুমে, কেউ বসবে না, দাঁড়িয়ে থেকে নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করবে। 

কুসুম বলল, স্যার আপনি কনসিডার করলেই হবে।

গোলদার বলল, তুমি কি শো করতে যাচ্ছ?

ইয়েস স্যার নর্থবেঙ্গল নাট্যমেলা।

যদি তুমি অসুস্থ হতে কিংবা বাড়ির কেউ, কনসিডার করা যেত, তুমি ছুটি চাইছ থিয়েটার করার জন্য, হয় নাকি, অফিস তো তোমার যাত্রা-নাটকের সুবিধে দেখতে পারে না, ওসব ছাড়ো। 

কুসুম বলল, আমি যে প্রধান চরিত্রে আছি, আপনি একদিন দেখতে আসুন স্যার, ফেব্রুয়ারিতে শো আছে একাডেমিতে।

গোলদার একটু কঠিন গলায় বলল, আমার অত সময় নেই, আমরা বাঙালিরা অকাজেই সময় নষ্ট করি বেশি, চাকরি না অভিনয়, কোনটা করবে তা ঠিক করে নাও। 

কুসুম বাড়ি ফিরে বাবাকে বলল, কী করি বলো দেখি, অফিস আমায় ছুটি দেবে না, আমার বস ঠিক কৌশিকের মতো,আমাকে অভিনয় করতে দেবে না।

বাবা বলল, তুই চলে যাবি, মাইনে কেটে নিক না ক’দিনের। 

পাই পনের, একদিনের তো পাঁচশো হবে, আমি তাতে খুব রাজি তিনদিনের যদি না পাই।

বাবা বলল, সিদ্ধান্ত তোর, আমি কী বলব ?

কিন্তু বাবা, ওরা ডাকবে ফোনে, পারমিশন ছাড়া স্টেশন লিভ করা যায় না, আমি ছুটির কথা বলেই ভুল করেছি। 

মা বলল, যেতে হবে না শিলিগুড়ি, অভিনয় করতে হবে না, চাকরি আগে, ওসব এখন ছাড়। 

কাকা সুমিত্রভূষণ বলল, আর তিন মাস বাদেই এপ্রিলে তোর স্যালারি কুড়ি হয়ে যাবে, এখন অফিসের কথা শোন, অফিস যা বলবে তা করতে হবে, তোর সম্পর্কে অফিস নিশ্চিত হলেই তো পারমানেন্ট করবে। 

এখনো পনের দিন আছে। কুসুম ভাবছিল কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেবে। তার অভিনয়ের প্রশংসা হয়েছে খুব। কন্ঠস্বরের প্রশংসা হয়েছে। স্যার মানে নির্দেশক শমীক রায়চৌধুরী নতুন নাটকের মহলা আরম্ভ করবেন শিগগির। কুসুমকে ভেবে রেখেছেন প্রধান চরিত্রে। শিলিগুড়ির পর তাদের যাওয়ার কথা আছে দিল্লি। মনে হচ্ছে অফিস ছুটি দেবে না। পরেরদিন সে আবার বসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, বলল, স্যার আপনি একটু দেখুন,ছুটি আমার নিতেই হবে।

গোলদার বললেন, অফিস তো থিয়েটারের জায়গা নয় চম্পা, তুমি ডিসিশন নাও কী করবে ?

স্যার আমি চাকরি তো করতে চাই।

চাকরি করতে হলে অফিসের মতো করে চলতে হবে।

ইয়েস স্যার। কুসুমের ভয় করছিল বসের সামনে দাঁড়িয়ে বাক্য বিনিময় করতে। চাকরি যদি চলে যায়? চলে যেতে পারে নাকি? বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুতানটি-শোভাবাজার স্টেশনে মেট্রোয় ময়দানে নেমে একটুখানি হাঁটা। পনের হাজার তো কম নয়। বাবাকে সাপোর্ট দেওয়া হয়। কুসুম বলল, আমি জানি স্যার।

নিজের ডেস্কে গিয়ে বসো। স্যার অমিত গোলদার নির্দেশ দিলেন। উনি খুব বেশি সময় দেন না। সময় না দিলে কুসুম নিজের কথাটা বলে কী করে? পাশের ডেস্কের বিজন সাহা বলল, সব এক সঙ্গে হয় না চম্পা, তুমি এখানে চাকরি করে তা পারবে না। 

আমি চারদিন ছুটি পাব না ? কুসুম বলল।

বিজন সাহা বলল, ছুটি কিন্তু তোমার নিজের ইচ্ছেয় হবে না, অফিস যদি চায় ছুটি নাও দিতে পারে।

বাহ, আমার দরকারেই তো আমি পাওনা ছুটি নেব। 

বিজন মাথা নাড়ে, নো, লিভ ইজ নট ইওর রাইট, অফিস দয়া করে তোমাকে ছুটি দেয়, পাওনা বলে কিছু হয় না। 

কুসুম চুপ করে থাকে। বস তাঁর চেম্বারে বসে সব দেখতে পান। অফিসের সবটা ক্লোজড সারকিট টিভির আওতায়। বিজন মুখ ঘুরিয়ে নিল। কুসুম কম্পিউটারের মনিটরে তাকিয়ে। আপডেটিং তার কাজ। কিছুই ভালো লাগছে না। পনের হাজার পায় বলে কৌশিক যোগাযোগ করতে চাইছে। কৌশিক বলছে, যা হয়েছে ভুলে যাও চম্পা, আমি আবার ফিরতে চাই, আমরা এবার বিয়ে করতে পারি, খুব মন দিয়ে চাকরি কর, সেক্সপিয়র বুক কোম্পানির ব্রাঞ্চ দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বাঙ্গালুরু আছে, অ্যাব্রডেও, ইংল্যান্ডে আছে শুনেছি, তুমি অনেক উপরে উঠতে পারবে, ডিসট্যান্ট লারনিং এ ম্যানেজমেন্ট করে নাও, পুনের সিমবায়োসিসের ডিগ্রির খুব দাম। 

হ্যাঁ, কুসুমের নামই চম্পা। কুসুম তার দাদুর দেওয়া নাম। সকলে জানে না। কেউ কেউ জানে, খুব কাছের জন। তার প্রাক্তন প্রেমিক কৌশিক জানত। ভুলে গেছে। কৌশিক অবশ্য নামটা পছন্দ করেছিল কি না মনে নেই কুসুমের। চম্পা বলেই তো ডেকেছে। কয়েকটা চিঠি লিখেছে। এস,এম,এস- কিংবা মেসেঞ্জার হোয়াটস আপে নাম লিখতে হয় না। সে প্রথম থেকেই ফেসবুকে ২২শে শ্রাবণ হয়ে আছে। ২২শে শ্রাবণ তার নাম। কৌশিক বলেছিল, ফেসবুকে আছ কেন কুসুম, কী হয়? 

কুসুম তার কাজে মন দিতে চাইল। কিন্তু মন বসছে না। সে মনিটরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, 

“ আমি দেখতে পাচ্ছি, রাজার ডাক- হরকরা পাহাড়ের উপর থেকে একলা কেবলই নেমে আসছে--- বাঁ হাতে তার লন্ঠন, কাঁধে চিঠির থলি। কত দিন কত রাত ধরে সে কেবলই নেমে আসছে। পাহাড়ের পায়ের কাছে ঝরনার পথ যেখানে ফুরিয়েছে সেখানে বাঁকা নদীর পথ ধরে সে কেবলই চলে আসছে--- নদীর ধারে জোয়ারির ক্ষেত, তারই সরু গলির ভিতর দিয়ে দিয়ে সে কেবলই চলে আসছে---রাতদিন একলাটি চলে আসছে; …...।

তার নির্দেশক স্যার বলেছেন, সুযোগ পেলেই সে যেন নিজে নিজে সংলাপ বলে। যে কোনো সংলাপ, যে কোনো সময়ে। সময় পেলেই। কুসুম তা করে। স্নান ঘরে, একা ঘরে, ঘুমের ঘোরেও। মা বলে, ঘুমের ভিতরে সে নাকি কথা বলে। কী কথা ? মা প্রথমে বুঝতে পারেনি অমন কথা বলছে কেন মেয়ে? কে কবিরাজ, কে-ই বা পিসেমশায়, তারপরই মনে পড়েছিল, ডাকঘরের অমল। অমল্কুসুম। এই কুসুম, কী বলিস, অমলকুসুম ? 

“ না, না, পিসেমশায়, তুমি কবিরাজকে কিচ্ছু বলো না।--এখন আমি এইখানেই শুয়ে থাকব, কিচ্ছু করব না----কিন্তু যেদিন আমি ভালো হব সেইদিনই আমি ফকিরের মন্ত্র নিয়ে চলে চলে যাব---নদী পাহাড় সমুদ্রে আমাকে আর ধরে রাখতে পারবে না।” 

তাদের নাটকের ভিতরে নাটক আছে, কুসুম ‘ডাকঘর’ নাটকের অমলের সংলাপ উচ্চারণ করতে থাকে নিজ মনে। যখন তার নয়-দশ, তাকে দিয়ে ডাকঘরের অমল করিয়েছিল বাবা পাড়ার রবীন্দ্র জয়ন্তীতে। বাবা এখনো বলে, সে একটি সংলাপও ভুল বলেনি, ভুলে যায়নি। তাদের এই নাটকের ভিতর ‘ডাকঘর’ আছে। আর সেই সংলাপ তারই। বন্দী অমলের কথা আসে নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে। কুসুম ঘাড় ঘুরিয়ে বিজনকে জিজ্ঞেস করল, তুমি ডাকঘর দেখেছ বিজনদা ?

এই প্রশ্নে বিজন হকচকিয়ে গেল, মানে ?

রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, পড়েছ ?

বিজন ম্লান হাসে, নারে, ইস্কুলের বইয়ে একটুখানি অংশ ছিল, ‘ অমল ও দইওয়ালা’, ওইটুকু। 

কুসুম বলল তা দশ বছরে অমলের ভূমিকায় অভিনয়ের কথা। শুনতে শুনতে বিজন বলল, এ জীবনে আর ওসব হবে না, তুই কী করবি?

ভাবছি। কুসুম বলল, আমাকে তো যেতেই হবে শিলিগুড়ি। 

এই চাকরি করে পারবি না। বিজন বলল। 

কুসুম বলল, আমাদের কোম্পানি ‘ডাকঘর’ অনুবাদ ছেপেছে, ‘পোস্ট অফিস’ জানো তা?

বিজন বলল, জানি, বেস্ট সেলিং বুক, আমার কাছে হিসেব আছে।

আমি কী করব বল দেখি বিজনদা? কুসুম মনিটরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আমার স্বপ্ন ভালো অভিনেত্রী হওয়া, একটু সুবিধে হলেই চাকরি ছেড়ে দেব। 

আর যদি সুবিধে না হয় ? বিজন জিজ্ঞেস করল।

তার মানে ? কুসুম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। 

বিজন বলল, তুই কি সিনেমায় চান্স পাবি, সিরিয়াল করতে পারবি টিভিতে ?

কুসুম বলল, আমি থিয়েটারই করব, আর যদি ভালো ছবি পাই, মনের মতো রোল পাই...বলতে বলতে ঢোক গেলে কুসুম, কবে তা হবে, হবে কি না বুঝতে পারছে না, সকলেই পেডিগ্রি চায়, অমুকের ছেলে, অমুকের ভাইপো, তমুকের মেয়ে, তাহলে সেই পরিচয়ে খুব তাড়াতাড়ি সুযোগ এসে যায়, নতুবা ঘষতে হয় খুব, কিন্তু স্ট্রাগলের দাম আছে, তার স্যার বলেন, একটি দুটি ভাল রোল পেয়ে যদি কুসুম লোকের নজর কাড়তে পারে তখন আর দেখতে হবে না, তরতর করে এগিয়ে যাবে। ভালো কাজের দাম আছে ইন্ডাস্ট্রিতে। থিয়েটারও ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠছে। এক অভিনেতা নানা দলে অভিনয় করছে। আর সব দলই ভালো অভিনেতা অভিনেত্রীকে পে করে। অনিমেষ বসু সাতটি নাটক করছে এখন সাত দলে। এমন হয়েছে ম্যাটিনিতে এক নাটকে বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করে সন্ধের শো-তে অন্য নাটকে প্রেমিক। দুই নাটক দুই দলের। কুসুম তেমনিই করবে একদিন। 

বিজন বলল, স্যার যদি না বলে, হ্যাঁ করাতে পারবি না, সব অফিসের বস অমন হয়।

কুসুম চুপ করে থাকে। 

বিজন বলে, তার বাবার কাছে গল্প শুনেছে, বাবার বস অকারণে অপমান করতেন তার বাবা কবিতা লিখত শুনে, কোনো কারণ ছিল না, তবুও।

কুসুম বলল, থিয়েটারে অমন হয় না বিজনদা, তবে ভুল করলে বকুনি খেতে হয়, আর ডিসিপ্লিন ভাঙলে, দেরি করে রিহার্সালে গেলে, শো-এর দিন আগে না পৌছলে ডিরেক্টর ছেড়ে কথা বলেন না।

একই ব্যাপার বলতে পারিস। বস অপমান করবেই। তার হাতে যে অনেক ক্ষমতা। 

না, ঠিক এক রকম নয় বিজনদা, ডিরেক্টর যা করেন আমাদের ভালোর জন্যই করেন, অভিনয় শিখতে হয়, তিনি তো শিক্ষক। কুসুম বলল।

বিজন মাথা নাড়ে, বসও শিক্ষক, ভুল হলে দেখিয়ে দেন।

কুসুম চুপ করে থাকে। তখন বিজন বলে, বস যা বলে তা শুনতে হয়, এতে সারভিস সিকিওরড হয় চম্পা, আবার বস যদি অবিচার করেন, তার বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না যে তাও সত্যি। 

কুসুম কথা বাড়ায় না। সে যদি শিলিগুড়ির শো না করতে পারে, তার বদলে রিমি দাশগুপ্ত ঢুকে যাবে, রিমি একবার ঢুকে গেলে পরের নাটকে কাস্টিং কী হবে জানে না কুসুম। রিমি খুব আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে চলে। কুসুম শুধু তার অভিনয় গুণে স্যারের আনুকুল্য পেয়েছে। শিলিগুড়ির পর কলকাতায় এক দিন ডাকঘর পাঠ আছে সুরম্য পালিতের বাড়িতে। অনেক বিশিষ্টজন আসবেন। চিত্র পরিচালক সুবর্ণ দত্তর আসার সম্ভাবনা আছে। সুরম্য পালিত বিখ্যাত লেখক এবং সম্পাদক। তিনি এমন আয়োজন করেন মাঝেমধ্যে। তাদের নাটক ‘বন্দিনী’ র ভিতরে ডাকঘরের অংশ বিশেষ আছে সংলাপে, তা শুনেই তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তার জায়গায় রিমি ঢুকে যাবে। ইস, রিমির হাস্কি গলায় ডাকঘর পাঠ কেমন লাগবে? আর সুরম্য পালিত শুনবেন সে আর অভিনয় করে না, অফিসের হিসেব দ্যাখে। কুসুমের চোখে জল এসে গেল। সে হোয়াটস আপে মেসেজ পায়, কৌশিক লিখেছে। কৌশিককে সে লিখেছিল, আর সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয় কৌশিক, সে অভিনয় ছাড়তে পারবে না। কৌশিক লিখেছে, চাকরি পেয়েছ, আবার অভিনয় কেন, কী হবে ঐশ্বর্য রাই? সে সিমবায়োসিসের ফর্ম অন লাইনে ফিলাপ করে কুসুমকে মেইল করছে। যে সমস্ত তথ্য সে জানে না তা যোগ করে কুসুম যেন মেইল করে সিমবায়োসিস স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টকে। ম্যানেজমেন্ট তাকে পড়তে হবেই। তাহলে ভবিষ্যত সুরক্ষিত হবে।

কুসুম মেসেজটি মুছে দিয়ে কৌশিককে ব্লক করল। কৌশিক আর গোলদার একই ব্যক্তি মনে হয়। গোলদারের সঙ্গে কৌশিকের যোগাযোগ আছে মনে হয়। মনে হচ্ছে মেসেজটি গোলদারের। গোলদার এক দিন বলেছিল, ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রি থাকলে কুসুম দ্রুত উপরে উঠতে পারবে। সে তার চাকরির আরম্ভের কথা। ন’মাস আগের কথা। কুসুম আবার জিজ্ঞেস করল বিজনকে, কী করা উচিত তার?

বিজন হাসে, বলে, আমার বাবাকে সেই বস, ডি,এন, বসু, কত ব্যঙ্গ যে করতেন, বাবার কলিগরাও শেষে তা করতে আরম্ভ করল। বসের উস্কানিতেই তা হতো। বাবাকে কলিগরা এই যে পোয়েট বলে ডাকত, রাত্তিরে কবতে লিখলে পোয়েট ? 

তারপর ? কুসুম জিজ্ঞেস করে। 

বাবার মনে হয়েছিল সুইসাইড করে, আচ্ছা জীবনানন্দ দাসের মৃত্যু হয়েছিল কেন বলো দেখি ? 

কুসুম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিজন সাহার দিকে। মনেই হয় না বিজনদা জীবনানন্দর কথা জানে। কোনোদিন গল্প উপন্যাস কবিতা নিয়ে একটি কথাও বলেছে বলে শোনেনি কুসুম। সে জিজ্ঞেস করে, তুমি জানো বিজনদা, জীবনানন্দ পড়েছ ?

বিজন বলল, সকলেই জানে, রাসবিহারী, ট্রামলাইন, আট বছর আগে এক দিন, কারুবাসনা, জলপাইহাটি।

কৌশিক জানে না,অমিত গোলদার জানে না। কুসুম বলল। 

হয়তো জানে, স্বীকার করতে চায় না, চাকরির উন্নতির সঙ্গে ওই জানার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং বিরোধ আছে । নিম্নস্বরে বলল বিজন। 

তুমি কি ডাকঘর পড়নি সত্যি? কুসুম জিজ্ঞেস করে। 

বিজন চুপ করে থাকে। তারপর কন্ঠস্বর প্রায় গোপন করে বলে, ভুলে গেছি।

ভুলে যাওয়া যায় ? কুসুম বলে। 

বিজন বলল, এই অফিসে ঢুকেছ, তুমিও আস্তে আস্তে ভুলে যাবে চম্পা, মানে ভুলে থাকতে হবে, আমি যেমন আছি, আমার বাবা একদিন ট্রেন লাইনে ঝাঁপ দেবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করেছিলেন, আমাকে বলেছিলেন কাজের জায়গায় আত্মগোপন করে থাকলে ভালো থাকা যায়।

তুমি কবিতা লেখ? কুসুম জিজ্ঞেস করেছে।

না, বিজন সাহা লেখে না, থাক চম্পা এসব কথা।

কিন্তু আমি কী করব ? কুসুম জিজ্ঞেস করে।

তখন গোলদারের কল এল ইন্টারকমে, গোলদার বললেন, তাঁর কাছে গত তিন মাসের কাজের হিসেব দিতে। তিন মাস চম্পা কী করেছে? তিনি দিল্লি পাঠাবেন। 

কুসুম বলল, সাবমিট করেছি প্রত্যেক মাসে স্যার।

আবার দাও। গোলদার বললেন।

দিচ্ছি স্যার, কিন্তু আমার ছুটি?

নট আপ্রুভড, তুমি ছুটির কথা আর তুলবে না, আগামী তিন মাস কোনো ছুটি হবে না। 

স্যার আপনি কৌশিক ব্যানারজীকে চেনেন ? 

কেন বলো দেখি। গোলদার জিজ্ঞেস করলেন।

কৌশিক ছুটিটা দিতে বলছে আপনাকে। কুসুমের মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে এল আচমকা। 

এ কথা কেউ বলতে পারে না যে-ই বলুক। গোলদার লাইন কেটে দিলেন। 

কুসুম এবার নিজেই বসের লাইন ডায়াল করল, আমার ছুটিটা চাইই স্যার, প্লিজ। 

থামবে চম্পা, ভবিষ্যতের কথা ভাবো, অভিনয় করে কী হবে, সুচিত্রা সেন ? কথাটা যেন ইন্টারকমেই ভেসে এল। বস লাইন কেটে দিয়েছেন।

কুসুম বিজনকে বলল, আমি কিন্তু আসব না এবং পাঁচটার পর চলে যাব, নটা পাঁচটা আমার ডিউটি বিজনদা, পৌনে পাঁচটায় নতুন কাজ এলে পরের দিন হবে। 

বিজন বলল, তুমি আত্মগোপন করে থাকলেই পারতে চম্পা, পৃথিবীতে অন্য রকম কিছু করতে হলে কখনো কখনো আত্মগোপন করতে হয়, আমার কথা ভাবো চম্পা। 

তুমি! কুসুম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। 

বিজন বলল, বাবা আমাকে বলে গিয়েছিলেন, থাক চম্পা, তুমি ভাব কী করবে, গোলদার তোমায় অতিষ্ঠ করে দেবে, ইউউউ অ্যাক্ট্রেস, কাম অন, অফিস অভিনয়ের জায়গা নয়। 

কিন্তু বিজনদা, তোমার কি অন্য কোনো নাম আছে আমার মতো, যা অফিস জানে না। 

বিজন বলল, আমি তো বলব না কুসুম। 

কুসুম অবাক হয়ে বিজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আত্মগোপন করা কবি ! দেখে কিছুই মনে হয় না। 

বিজন চুপ করে নিজের কাজে মগ্ন হয়। ক্লোজড সারকিট টিভিতে সব দেখছেন বস। শুধু শুধু বিব্রত হয়ে কী লাভ। অফিসের পরে কথা হবে। কুসুম একা হয়ে গেছে। অফিসের অন্যরা এত সময় তার কথা শুনে নিজেদের ভিতর হাসাহাসি করে কম্পিউটারে মগ্ন হয়েছে। কুসুম আবার সেই দশ বছর বয়সের অমল হয়ে গেল। বাইরের বাতাস ঢুকবে সেই কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অমলের ঘরের জানালা। সে স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করতে থাকে, 

“ পারব, আমি পারব। বেরোতে পারলে আমি বাঁচি। আমি রাজাকে বলব, এই অন্ধকার আকাশে ধ্রুবতারাটিকে দেখিয়ে দাও। আমি সে তারা বোধ হয় কতবার দেখেছি কিন্তু সে যে কোনটা সে তো আমি চিনিনে ।“

বলতে বলতে কুসুমের দুচোখ ভিজে গেল কখন তা সে জানে না। কলকাতায় এখন সন্ধে নেমেছে। উত্তর আকাশের তারা উত্তর আকাশে ফুটে উঠেছে। জানালা খুললে দেখা যায়। অথবা বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে। কুসুম নতুন চিঠির মুসাবিদা করতে থাকে কম্পিউটারে। একটির পর একটি অক্ষর, আলোর ফুল, ধ্রুবতারার মতো ফুটে উঠতে থাকে কুসুমের আকাশে। 


লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র

২টি মন্তব্য:

  1. এমন গল্পই ভাল লাগে খুব সহজেই গল্পে ঢোকা যায়। উপভোগ করা যায়। শেষ করতে বাধ্য হতে হয় । একটানে পড়া শেষ করলাম । দারুণ!

    উত্তরমুছুন