বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

মাউন্ট শাস্তা ও দীপেন ভট্টাচার্যের আরও সব অমল সময়-আখ্যান

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

দীপেন ভট্টাচার্যর 'মাউন্ট শাস্তা'।

পড়তে শুরু করে পাঠক অল্প পরেই টের পান, লেখক খেলে ফেলেছেন সেই বিপজ্জনক খেলা। করে ফেলেছেন সেই প্রয়োগ। তবে তা দিপেন ভট্টাচার্য'র নিজস্ব 'টাইম-স্লিপ' পদ্ধতির প্রয়োগ।


আখ্যানটি রচিত হয়েছে ফার্স্ট-পার্সন এ তিনটি জবানীর ব্যবহারে। তিনটি জবানীই একটি মাত্র ঘটনার
ও তার ক্রমের ব্যাখ্যা দ্যায়। কুরশাওয়া'র 'রশোমন' চলচ্চিত্রে এই ন্যারেটিভের ধাঁচা ব্যবহার হয়েছিলো। বলা যায় একরকম কিউবিজম এর ব্যখ্যায়।

দীপেন ভট্টাচার্যের জগতে, তার কল্প-সময়ে, অতীত বারবার ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান কে সাক্ষাত করছে।

তার অন্য সব গল্পের প্রায় সবকটি মুখ্য চরিত্রের নাম অমল। নানা গল্পে অমলরা প্রায়ই তাদের ভবিষ্যৎ কে দেখছে আয়নায় পড়া প্রতিবিম্বের মত। নিজেকে ভিন্ন সময়-স্থান ভেদে বারবার দেখতে চাওয়া, জাগতিক সময়-চক্রে আটকা পড়া অস্তিত্বের সন্ধান করার সময় এই লেখক-বিজ্ঞানীকে আমরা 'অ্যানন্থ্রপিক' তত্বের খুব কাছাকাছি দেখতে পাই। কিন্তু ঈশ্বরের ছায়া তিনি লম্বা করেননা। বেশীর ভাগ কল্পবিজ্ঞানের আখ্যানের অসহায়তা মূলত এগুলোই। এমনকি খুব সামান্য পরিত্রাণ পেতেও দরকারে-অদরকারে, সূক্ষ্ম ম্যাজিকের ব্যবহার। কৌশলে বিজ্ঞান ও ম্যাজিক কে গুলিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা অথবা ঈশ্বরের ও অজানিত-এর ছায়াকে লম্বা করে দেওয়া। লেখক একজন বিজ্ঞানী। তাই তিনি তা করতে পারেন-না। কারণ ঃ 'Any technology distinguishable from magic is insufficiently advanced'।
এইখানেই তিনি বাঙ্গালী পাঠক-কে রক্ষা করেন।

কসমিক-স্প্যাশিয়াল ও কসমিক-টেম্পোরাল, এখানে আখ্যানের এর অন্তর্বর্তী আরেক স্প্যাশিয়াল ও টেম্পোরালে খেলছে। এ এক বিপজ্জনক মস্তিষ্ক-সঞ্চালন। 'মাউন্ট শাস্তা'য় অমল রিভার্স-সময়ের লুপে চলে গিয়েছে।

কল্পবিজ্ঞান শাখায় আখ্যান রচনায় আধুনিকতার শুরু- সময়ের প্যারাডক্স নির্মাণে টাইম মেশিনের ক্লিশে থেকে মুক্ত হতে পারা। লেখক যখন একজন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী, অতএব তিনি একাজ করবেন-না।

আখ্যানের প্রয়োজনে যতটুকু সময় ট্রান্সফার করা দরকার ততটুকুই করেছেন এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও বাড়তি প্রয়োগ করেন নি। অমল শাস্তা পর্বতের পরিবর্তে অন্য স্পেসে চলে গেছে। একথা অমল উপলব্ধি করে অতি দ্রুত। স্প্যাশিয়াল ভুলভুলাইয়ার ছোট কিন্তু অনিবার্য বর্ণনা টুকু করছেন মাত্র।

স্প্যাশিয়াল স্লিপ টুকুও এখানে ঘটে যাচ্ছে পাঠক কিছু বুঝে ওঠার আগেই। সংক্ষিপ্ত কিন্তু অপ্রতিরোধ্য।

''আমি গরমে ঘামতে থাকি। একটা পাথরের ওপর বসি। গুহাটা লাভার রক্তিম আলোতে একটা অপার্থিব রূপ নেয়। এবার গুছিয়ে চিন্তা করার পালা। প্রথমতঃ পাওলোকে একেবারে হারিয়ে ফেলার কোন কারণ আমি দেখি না, আমি পেছনে নেই দেখে পাওলোর ফিরে আসার কথা। দ্বিতীয়তঃ এই মেঘমুক্ত সকালে হঠাৎ কুয়াশা বা মেঘের সৃষ্টি হবার কথা নয়। এবং যার কোন ধরণের ব্যাখ্যা আমি করতে পারছি না – তৃতীয়তঃ আমার এক প্রতিলিপির আবির্ভাব, শুধু আবির্ভূত হয়েই সে আমাকে চমকে দেয় নি, তার প্রতিটি ভঙ্গী ছিল যেন আমার কৃত ভঙ্গীর প্রতিরূপ। সময়ের সম্মুখ গতির বিপরীত দিকে প্রতিফলন, একটি চলচ্চিত্রকে যখন উল্টোদিকে চালানো হয়ে সেরকম। এর নিশ্চয় কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে। আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে, পাহাড়ের হাল্কা বায়ুতে মস্তিষ্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। সেই উন্মত্ত মস্তিষ্ক আমার dopplegangarয়ের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। ডপলগ্যাংগার একটি জার্মান শব্দ যার মানে হচ্ছে ভৌতিক প্রতিলিপি যে কিনা কোন অশুভ উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে দেখা দেয়। তাছাড়া আমি শুনেছি স্কিৎসোফ্রেনিয়ার রোগীরা নাকি নিজেদেরকে দূর থেকে দেখতে পায়। আমার স্কিৎসোফ্রেনিয়া নেই, আর আমি ডপলগ্যাংগারে বিশ্বাস করি না।

চতুর্থতঃ পাহাড়ের ওপর এই লাভাকুণ্ডের আবিষ্কার।

ধীরে ধীরে আর একটি সম্ভাবনার কথা আমার মাথায় আসে। আমার সময় ছেড়ে আমি অন্য একটি সময়ের স্রোতধারায় প্রবেশ করেছি। কুয়াশাটা যখন ওপর থেকে নেমে আসে তখন। শুধু যে অন্য সময়ে প্রবেশ করেছি তাই নয় অন্য কোন স্থানে বা দেশে আমি আবির্ভূত হয়েছি। দুই সময়ের বা দেশের সীমানায় আমি ক্ষণিকের জন্য আমার প্রতিলিপিকে দেখেছি। সেই প্রতিলিপির জন্য সময় উল্টোদিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। আমি তাকে দ্বিতীয় অমল নাম দিলাম।'

তার এই কাহিনীতে প্যারালালে সময় চলছে এই পৃথিবীতেই। তার জন্যে প্যারালাল ইউনিভার্স তিনি রচনা করেননা। যদিও তার উল্লেখ করেন। তার ধারাবাহিক উপন্যাস অদিতার আঁধারেও তাই দেখি।

মাউন্ট শাস্তা- এ কাহিনীতে অমলের সময় উলটো দিকে হাঁটতে শুরু করল, তার সাথে অ্যানালোগাস হোল তার চরিত্রের জড়- প্রত্যঙ্গের পদক্ষেপ ও। চলচ্চিত্রের রিভার্স প্রজেকশনের মত। অমলের সময় উল্টো দিকে যেতে শুরু করেছে। এইখানে তিনি আমাদের ছেড়ে দেন, আমরা ভাবতে থাকি উলটো সময়ে চলতে চলতে তবে কি সে একেবারে ফীটাস এ চলে যাবে? মায়ের গর্ভে প্রবেশ করবে? আরও অতীতে চলে যাবে কি ? তখন গর্ভ পাবে কোথায়? তার প্রতিলিপি'র তবে কি হবে? একইসাথে এভাবে কতগুলি প্রতিলিপি তৈরি হতে পারে?

একে নেহাত অতীতে সময়-ভ্রমণ ভাবলে বলা যায়- এ জিনিশ আগে হয়েছে। চলচ্চিত্রে রিভার্স সময়-প্রয়োগ তো খুবই প্রচলিত। এমনকি কল্পবিজ্ঞান বলতে অনিবার্য ভাবে সেই যার রেফারেন্স আসে সেই এইচ, জি, ওয়েলস এই আছে। তবে এ আখ্যান তা নয়। তাকে ক্লিশে-মুক্ত করে অন্য কজালিটি নির্মাণ করেন ডঃ দীপেন ভট্টাচার্য । কারন এটি টাইম ট্রাভেলের আখ্যান নয়। এখানে বর্তমান ভবিষ্যৎ এর ও বর্তমান অতীতের সাক্ষাত পায়। সময় উল্টো ঘুরতে শুরু করে। তার জন্যে কোন সময়-যন্ত্র বা যান এর অবতারণা না করে বেছে নিচ্ছেন বরং একটি আগ্নেয়গিরি। পৃথিবীর অতলের সাথে, তার জৈবিক অস্তিত্বের সাথে এই গ্রহের উৎপত্তির সাথে জড়ান গলন্ত ম্যাগমা তার বুকে । বাইরে ছাইভস্ম। তা নিয়ে সে আমাদের উৎপত্তি'র ইতিহাস স্মরণ করানোর জন্যে কাহিনীতে উপস্থিত থাকে। আবারো দীপেন ভট্টাচার্য হয়ে ওঠেন ইতিহাসবিদ, সময়ের আখ্যান-রচনা তাকে সভ্যতার ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়। এই মহাজগতের বুকে এই গ্রহ। ম্যাগমা'র জ্বালা-পোড়া শীতল করে গজিয়ে ওঠা প্রিয় এই সবুজ গ্রহ। তার উৎপত্তিতে থাকা জৈব জানে এ সন্ধান- সম্ভবত এ কথাই তিনি মনে করিয়ে দিতে চান হয়তো আমাদের। কারণ তার কাজ সময়ের মাত্রা গুলি নিয়ে পাঠককে সচেতন করতে পারা।

তাই ফ্যান্টাসি, ম্যাজিক-রিয়াল ও কল্প বিজ্ঞানের সীমানা তিনি এখানে এভাবে ধ্বংস করেন।

পাওলো'র জবানী অংশ, গল্পের চরিত্র লিয়ান্দ্রো তাই এই কথকতা করেন ঃ

“মহাবিশ্বের মত অসম্ভব জিনিস যখন সংঘটিত হয়েছে, সেই মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য আবার মানুষের স্বজ্ঞার মত একটা জটিল ব্যাপারের উদ্ভব হয়েছে, তখন কোন কিছুকেই অসম্ভব বলাকে আমি সঙ্গত মনে করি না। একটা গাণিতিক সেটে অমলকে যদি একজন সদস্য বলা যায় এবং তার স্থান-কাল বা দেশ-কালের রেখা যদি এমন অদ্ভূতভাবে ভ্রমণ করে তবে সেটের অন্যান্য সদস্যদের ভাগ্য কেন অন্যরকম হবে? অমল কি বিশেষ কেউ? না, অমল এই মহাবিশ্বের একটি সাধারণ অংশ। সেই অংশ যদি একটা বিশেষ পথে চলে আমি বলব সেই পথ্টা বিশেষ নয়। গাছ-পাথর সহ আমরা সবাই এই পথে চলতে পারি।”

তার চরিত্ররা অসীম রহস্যে সময়ের সরণীতে একাকী। সেভাবে তাদের প্রেম, রোমান্স ও যৌন জীবন নেই। এমনকি পাওলো'র যথেষ্ট এক সংবেদনশীল, প্রেমময়ী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও। পাওলো ও এমা’র মান্ডেন ও অপার্থিব প্রেমের বেশ অবকাশ থাকা স্বত্বেও। কল্পবিজ্ঞানে প্রেম ও যৌনতাকে তেমন আমল দিতে দেখিনা বেশীর ভাগ লেখককেই। সে নিয়ে পরে অন্য অবকাশে বলা যাবে। আপাতত এই গল্পের চরিত্ররা। যেমন পাওলো চরিত্র টি। সে মহাবিশ্বের কৌতুকের কাছে ভালনারেবল, কিন্তু স্থিতধী। একই রকম স্থিতধী অমল ও। যেন মহাবিশ্বে একা এগিয়ে যাওয়ার মত শক্ত মনের-জোরের সঞ্চয় চরিত্রগুলির আছে। তার চরিত্ররা ইতিহাস নির্মাণে, তার উপাদান সংরক্ষণে যত্নশীল। অমল টাইম-স্লিপ টুকুর স্বল্প ট্রান্সমিশনের মধ্যে তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে বাধ্যতা অনুভব করে। ইতিহাস ও মহাজগতের সংকেত লিপিবদ্ধ করে রাখার দায়-পালন। নিজের আসন্ন, অজানা 'ভবিষ্যৎ" যা কিনা কাল-গনণায় আসলে তার অতীত, তাকে বিভ্রান্ত করতে পারেনা। এইসব মুহূর্তে চরিত্ররা মহত্ব অর্জন করে ফেলেন। দীপেন ভট্টাচার্য'র চরিত্ররাও করেন।

কিন্তু এখন আমার ভয় হচ্ছে যে লিখতে লিখতে পুরোনো লেখা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে – অর্থাৎ ‘অর্থাৎ’ লিখতে না লিখতেই ‘ৎ’য়ের লেজ মুছে যেতে থাকবে, তারপর ‘ৎ’য়ের মাথা মুছে যেতে পারে – তাই যদি হয় তবে কোনভাবেই হয়তো ভবিষ্যতে এগুনো সম্ভব নয়, আর আমার ইতিহাসটাও পুরোপুরি জানানো সম্ভব নয়। আমি ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতের কথা ভুলে গেছি, এখন শুধু অতীতকে পুনর্গঠন করতে চাইছি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অতীত ও ভবিষ্যৎ দুটোই আমার হাত-ছাড়া হয়ে যাবে, আমি নিশ্চিত জানি সেটা, আমি হব বর্তমানের দাস।

কিন্তু তা হয়না। অমলের ডায়েরি থেকে যায়। এবং পরিরক্ষিত হয়। পাওলো ও তার স্ত্রী তার পরিরক্ষণ করেন।

দীপেন ভট্টাচার্য বিজ্ঞানী। তিনি সময়-তত্ত্বের দার্শনিক।

এক মহাকবি বা দার্শনিক নাকি বলেছিলেন মহাবিশ্ব আমাদের সাথে খেলা করে। কিন্তু আমরা সেই মহাবিশ্বের অংশ, আমাদের পক্ষে কি সেই খেলার প্রকৃতি বোঝা সম্ভব? আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই সব কিছু ভুলেযাবার আগে শেষ কয়েকটা কথা লিখে যেতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা। আমার জন্য সেই কথাগুলির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে, কিন্তু আপনাদের জন্য সেগুলোর অর্থ আছে।

হয়তো আজকে সেটা বুঝবেন না, কিন্তু একদিন হঠাৎ করে রাস্তায়, কিংবা বিছানায় শুয়ে, কারখানায় কাপড় সেলাই করতে করতে অথবা দুপুরের খাবার খেতে খেতে, টেলিভিশন দেখতে দেখতে, কিংবা ক্লাসে লেকচার দিতে গিয়ে আপনার মনে হতে পারে আপনার জন্য সময় থেমে গেছে। ঠিক থেমে গেছে বলব না, বরং আপনার মনে হবে আপনার জীবনে যা কিছু হবার ছিল সবই ঘটে গেছে, রয়ে গেছে শুধু একটা অস্পষ্ট মলিন প্রতিফলন যে প্রতিফলন দেখা যায় পুরাতন কাঁসার বাসনের পেছনে।

ঠিক এ'ধরণের কাজ বাংলা সাহিত্যে আগে হয়নি। যদিও ঠিক এই মুহূর্তে ঘটে গেলে, পাঠক, আমি তার খবর জানিনা। মাফ করবেন।
-------------------------------
মূল গল্প : মাউন্ট শাস্তা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন