বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

রুমা মোদকের গল্প : গোল

নিদেনপক্ষে চার পাঁচটি চেয়ারে ধাক্কা খেয়ে ফুটবলটি একবার সামনের টেবিলে সেকেন্ডখানেক বিরতি নিয়ে পড়লো গিয়ে ঠিক মাঝখানের চেয়ারটিতে। জামিলের মনটা তখনই খারাপ হয়ে গেলো। এই ফুটবল কী তার পিছু ছাড়বে না আজীবন। কতো আশা নিয়ে সে দুপুর থেকে বসে আছে এখানে।নিত্য অভাবের সংসারে তিষ্ঠানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেতন যাই হোক, আপাতত সহোদরা শাহানার একটা সামান্য আয়ের ব্যবস্থা না করলে বাপ, মা ছোট ভাই সহ ছয় জনের সং সারটার টিকে থাকাই দায় হয়েছে।

আলহাজ্ব করম আলী হাইস্কুল এন্ড কলেজ এর বিশাল মাঠটি ঠিক কার্যালয় সংলগ্ন নয়, বরং হাত
তিরিশেক দূরত্বে। সেখানে বালকের দল খেলছে নিত্যদিনের নিয়মমতোই, আর তাদের পায়ের গোলমুখী লাথি খেয়ে ফুটবলটার কিনা আজই ঢুকতে হলো কার্যালয়ে! অতপর মাঝখানে চেয়ারটিতে ধীরেসুস্থে জিরিয়ে, বালকের দল খুুঁজে নিতে আসার ফাঁকেই তার চোখ গজালো, নাক গজালো, মুখ গজালো। আর পূর্বের মতোই জামিলের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো- মিস, এবারও মিস।

ততোক্ষণে বালকের দল ফুটবলটি খুঁজতে অফিসঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং টেবিলের নীচ দিয়ে মাঝখানের সুউচ্চ চেয়ারে স্থির ফুটবলটি আবিষ্কার করে তারা তা ফেরত চাইবার বদলে দাঁড়িয়ে থাকলো নিশ্চুপ। খাজনা দিতে অপারগ প্রজাদলের মতো, অপরাধী মুখ করে, যেনো সামনে জমিদারের কাছারি।

মাঝখানের চেয়ারটি বাকি সবগুলো চেয়ারের চেয়ে উঁচু । উচ্চতায়, নকশায়, বাহারেও। আসলে বাকী চেয়ারগুলো সব সাধারণ, প্রয়োজনীয়, কেজো। তাই বলে মাঝখানেরটা অকেজো নয় মোটেই। সেটি বরং কেজো- অকেজোর উর্দ্ধে। সমীহের, সম্মানের। যেমনটা কিনা অতিলৌকিক শক্তির প্রতি মানুষের থাকে। সমস্যাসংকুল বাস্তব জীবনের অপ্রতিরোধ্য প্রয়োজনসমূহ অস্বীকার কিংবা সমাধান কোনটাই না করতে পেরে অবশেষে যেখানে আশ্রয় খুঁজে মানুুষ। সমাধান হোক কিংবা না হোক আপামর জনতার বশ্যতায় তাতে ভাটা পড়ে না। তারা চেয়ারটির কাছে বারবার আসে। ঘুরে ফিরে আসে। প্রয়োজনে আসে, অপ্রয়োজনে আসে। স্বভাবে আসে, অভ্যাসে আসে। 

ফুটবলটি খুঁজতে আসা বালকের দলটির বয়স প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, স্বভাব-অভ্যাস কোনটিই যদিও আবশ্যিক বশ্যতার নয়, তবু তাদের বহন করা জ্বীনে পিতা-প্রপিতামহক্রমে চেয়ারটির প্রতি বশ্যতা স্বীকারের প্রবহমান ¯্রােতকে তারা অস্বীকার করতে পারে না। অনুগামী হয়ে কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে নিঃশ্চুপ অবস্থান নেয় তারা। আঙুলে নির্ভয় দেয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা মেখে জামিল তাদের ডাকে হাতের ইশারায়। একজন ভিতরে ঢুকলে, সম্ভবত বালক দলটির সর্দার সে, ভিতরে সুপ্ত ভবিষ্যত গোল দেয়ার ইচ্ছাটির একটি মহড়া দেবার সুযোগ পায় জামিল। যেনো এই চেয়ারটির একচ্ছত্র অধিকারী সে-ই, দেহের ভাষায় সেই ঔদ্ধত্য এনে, মাঝখানের চেয়ার থেকে ফুটবলটি তুলে বালকদলের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে একটু আগে প্রদত্ত নির্ভয় ইশারায় সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে কষে একখানা ধমক লাগায় বালকের সর্দারটিকে- বলডা য্যান আর ভিত্রে না আইয়ে। ফুটবল কাঁখে নিয়ে বালক দলের সর্দারের ছড়ানো ছিটানো চেয়ারের ফাঁক গলে পালানোর সময় জামিল পুনরায় ফুটবলটির অট্টহাসি শুনতে পায়- মিস, এইবারও গোল মিস।

ফুটবলটির অট্টহাসি জামিলকে বিচলিত করে। আশৈশব গোল করার একটা ইচ্ছাও তার পূরণ হয়নি অদ্যাবধি। বালক বয়সে দলে তার অবস্থান ছিল গোলকিপার। হয় গোল খাও না হয় গোল আটকাও। করম আলীর প্রশ্রয়ের ছত্রছায়ায় রহমানের আশ্রয়ে এখনো তার ভূমিকা গোলকিপারেরই। নিজের একটি গোল দেয়ার ইচ্ছা তার অন্তরের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে হৃষ্টপুষ্ট হলেও এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি কোনটিতেই। সেই বালকবেলায় একদিনই গোল দেয়ার সুযোগ পেয়েছিল সে খেলার মাঠে। যেদিন বাপের এনে দেয়া ফুটবল নিয়ে সে মাঠে হাজির হয়েছিল। জামিল এখনো জানেনা সিগারেট কোম্পানীর সেলসম্যানের চাকরি করা বাবা এই বল কোত্থেকে যোগাড় করেছিল, ঘরে তিনবেলা খাবার যোগান না দিতে পারা বাপের ছেলের এই বায়না মেটানোর আশ্চর্য ব্যাপারটির পরিষ্কার ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। তবে এখন সে একটু ধারণা করে সম্ভবত সেবার বিশ্বকাপ খেলা চলছিল আর কোম্পানী ক্রেতাদের জন্য উপহার হিসাবে পাঠানো ফুটবল থেকে একটি তার বাবা সরিয়ে নিয়ে এসে ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিল। এটাকে ঠিক চুরি করা বলে না। 

জামিলের হাতে নতুন ফুটবলটি দেখে, সারাদিন জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা বালক দলের সবার চোখ চকচক করে উঠেছিল বন্যার্ত অভুক্ত মানুষের ত্রাণবাহী নৌকা দেখা চোখের মতো। বয়স, অপুষ্ট শারিরীক গঠন, অদক্ষতা ইত্যাদি নানাবিধ অযোগ্যতায় এতোদিন ডিফেন্স, অফেন্স, স্ট্রাইকার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে সুযোগ না পাওয়া জামিলকে তারা প্রথমবারের মতো স্ট্রাইকার পজিশনে খেলবার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য তার, এই প্রথমবারের সুযোগটাই শেষবার হয়ে গেল নিজের কারণেই। গোলের সুযোগ তৈরি করে গোলপোস্টমুখী দৌড়ানোর সময় তার পায়ের লাথিতেই ফুটবলটি মাঠের সীমানা নির্দেশক কাঁটাতারের বেড়ায় খোঁচা খেয়ে সমস্ত বাতাস ছেড়ে চুপসে গেল নির্বাচনে হেরে যাওয়া আত্মবিশ্বাসী নেতার মতো। ঠিক যেনো নিজেরই একখানা অঙ্গহানি ঘটলো, এমন ব্যাথা নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গিয়ে নিজেকে কয়েক জায়গায় রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত করে জামিলের অশ্রুপূর্ণ নয়নের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো- মিস, গোল মিস। মাত্রতো শরু!

সত্যিকার অর্থেই শুরুটা এখনো শেষ হয়নি। গোল নির্ধারণ লোভী নয় সে, আর গোল দেয়াটা খুব অসম্ভবও নয়, তবু এখনো পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি সে। তাই বলে হাল ছেড়ে দেয়ার মতো ক্লান্তিও নেই জামিলের। 

ভবিষ্যত গোলটির দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় জামিল। অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন চেয়ারখানা। দুপাশে দুখানা মিনার, তাতে কারুকাজ করা অনতিদীর্ঘ চূড়া। মাঝখানে ফুল লতাপাতার ঠিক ঠিক ঠাহর করতে না পারার মতো কঠিন কিংবা ভুলভুলাইয়ার মতো জটিল কারুকাজ। করম আলী যেদিন শহরের কাঠপট্টির মধ্য দিয়ে গাড়ির বহর নিয়ে শনিমন্দিরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন অনুদানের টাকা বন্টন করতে, সেদিন “জয় বাবা লোকনাথ ফার্নিচার হাউসে” চেয়ারটি চোখে পড়েছিলো তার। গাড়ি থেকে স্বশরীরে নেমে সেটি কিনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে দোকানের সত্ত্বাধিকারী জানিয়েছিল চেয়ারটি স্থানীয় কোর্ট জামে মসজিদের কমিটি কর্তৃক অর্ডার করা মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্য। অত্র এলাকায় করম আলীর ক্ষমতা-প্রতিপত্তি প্রশ্নাতীত। ইচ্ছে করলেই তিনি তখনই চেয়ারটি নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু মসজিদ এবং ইমাম সাহেবের মতো স্পর্শকাতর বিষয় বলে তিনি নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের ইচ্ছাকে সংহত করলেন। মূলত সুযোগ বুঝে সুযোগের সদ্ব্যবহার করার পরিমিতিবোধই তাকে এই সর্বোচ্চ চেয়ারে বসার একচ্ছত্র ক্ষমতা এনে দিয়েছে। তিনি বরং আরেকটি চেয়ারের অর্ডার দিয়ে এলেন এবং বলাবাহুল্য সপ্তাহান্তে নতুন চেয়ারটি কার্যালয়ে প্রবেশ করে কার্যালয়ের শোভাবর্ধনই করলো না, করম আলীর সর্বজনস্বীকৃত যোগ্যতাকে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুললো। 

সুযোগের সদ্ব্যবহার করার পরিমিতিবোধ জামিলেরও আছে বৈকি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রহমান প্রার্থী নয় জেনেই সে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। রহমানের সাথে পরামর্শ না করে এই প্রার্থীতা ঘোষণা সে ধৃষ্টতা হিসাবে নিয়েছে। যদিও জামিলের ধারণা ছিল করম আলী ঠিকই তার মূল্যায়ন করবে। কেননা কোমরে গুঁজা অস্ত্র আর বেপরোয়া সাহসের জোরে বলতে গেলে এক জামিলই অপ্রতিরোধ্য গতিতে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে শহরতলীর সবকটি সেন্টার দখল করে করম আলীকে গত নির্বাচনে জিতিয়েছে। পুরষ্কারসরূপ করম আলী নির্বাচনের পর ঢাকায় তার বহুতল ফ্ল্যাটের নীচতলায় অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে কোলাকুলি করে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। ইচ্ছামতোন খরচ কইরো- বলে হাজার দশেক টাকাও গুঁজে দিয়েছিলেন হাতে।

করম আলীর কাছাকাছি যাবার এই সুযোগেই জামিল তার প্রার্থীতা ঘোষণার আবদার নিয়ে পুণরায় এসেছিলো করম আলীর ঢাকাস্থ বহুতল-ভবনে। গেটের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার সময়ও দারোয়ান তাকে ভিতরে ঢুকার অনুমতিতো দেয়ই নি, বরং সেদিনও ডিভাইডার দেয়া রাস্তার উল্টোদিক থেকে বালকদের পা থেকে ছিটকে আসা একটি ফুটবল তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। আর যথারীতি ফুটবলটির চোখ গজালো, নাক গজালো, ফুটবলটি তার দিকে স্মিত হেসে বললো- লাভ নাই, গোল মিস। 

নমিনেশন তো পায়ই নি, উল্টো দূরত্ব তৈরি হয়েছে রহমানের সাথে। রহমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা সে করতে চায়নি কখনোই। মূলত ‘মুখোরোচক’ রেস্টুরেন্টে আগে পরে চা সার্ভ করা নিয়ে যেদিন জামিল রহমানের পরিচয় জানা সত্ত্বেও, তার সামনে থেকে চায়ের কাপ নিয়ে ঢিল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেদিনই সন্ধ্যায় সে রহমানের ডেরায় দাওয়াত পেয়েছিল আর রহমানের পোষা মাছের ঝাঁকে আশ্রয় পেয়ে সাধারণ জামিল থেকে অসাধারণ জামিলে পরিণত হয়েুছিল। অবশ্য পুরো ঝাঁকের মধ্যে একমাত্র সেই যে একখানা পিস্তলের অধিকারী হয়েছে আর এর জোরেই ঝাঁকের কই এর সর্দার বনে গেছে তা নিজগুনেই। রহমান যেদিন তার হাতে পিস্তলখানা তুলে দেয় সেদিন বলেছিল- এইডা খালি একখান অস্ত্রই না, বরং নেতার বিশ্বাস আর ভরসা।

ইউরোপ আমেরিকার কয়েকটি দেশ সফর করে করম আলী সবে দেশে ফিরেছেন। নিজ শহরে ফিরছেন আজ। পথে গোটা কয়েক সংবর্ধনা সেরে আসবেন কার্যালয়ে। কার্যালয়ে সাজ সাজ রব। নানা প্রয়োজনে, তদবিরে, অপ্রয়োজনে তৈল মর্দনের জন্য আসা নানা শ্রেণি পেশার মানুষের ভীড়। জামিলও তাদের মধ্যে একজন। আপাতভাবে একটি গোল দেয়ার ইচ্ছাতেই তো আসা তার।পরিবারটিকে আপাতত বাঁচানো।

নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ কিংবা বলা যায় চূড়ান্ত গোলপোস্টমুখী দৌড়ের জন্য বল তৈরি করা। কাজটি অবশ্য রহমানকে দিয়েই করানো যেতো, কিন্তু রহমানের সাথে সম্পর্কের হালকা অস্পষ্ট চিড়ধরা সম্পর্কটা বলতে গেলে এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান।

করম আলীর গাড়িটি তার ফর্সা মিষ্টি কন্যাকে নিয়ে অফিসের সামনের রাস্তা ধরে বাড়ির গেটের ভিতর ঢুকে যায়। কার্যালয়ে জমায়েত হওয়া জনতা শ্লোগান ধরে- তোমার নেতা- আমার নেতা-------। জামিলের অপলক দৃষ্টিতে করম আলীর গতি ধীর হয়ে যাওয়া গাড়িতে। এমন সুন্দরী মেয়ে সে জীবনে দ্বিতীয়টি দেখেনি। ঠিক দাদাজানের মুখে শোনা সেই রূপকথার পরী। সোনার কাঠি-রূপার কাঠির মাঝে ঘুমন্ত অপরূপ নিষ্পাপ সৌন্দর্য। জামিলের খুব ইচ্ছে করে রহমানের মতো মেয়েটিকে মোটর বাইকের পিছনে বসিয়ে কলেজ যাবার নাম করে হাইওয়ে ধরে ঘুরতে যায়। ঐ ইচ্ছে পর্যন্তই। গোলপোস্টমুখী দৌড়ে সে ইচ্ছেটাকে মোটেই প্রশ্রয় দেয় না সে। কারণ নিজের কা-জ্ঞান তাকে বলে দেয়, এটা তার পক্ষে অসম্ভব। রহমান পারে কারণ সে কেবল যে ডাকসাইটে নেতা তা নয়, করম আলীর আপন ভ্রাতুস্পুত্র এবং কার্যালয়ের সুউচ্চ চেয়ারটির বৈধ উত্তরাধিকারীও বটে। তবুও তার চোখ ফেরাতে ভুল হয়ে যায়। আর দূর থেকে তা লক্ষ্য করে, কাছে এসে হুমকি দেয় রহমান- ফকিন্নীর পুত, চুখ দুইডা গাইল্যা দিতে কয় সেকেন্ড লাগব জানস? 

জামিল উত্তর করে না। করার প্রয়োজনও নেই। কারণ জামিল যেমন জানে রহমানও জানে রহমানের জন্য কাজটা হাতে কলমে করা যতোটা কঠিন, জামিলের পক্ষে ঠিক ততোটাই সহজ। 

করম আলী ঘন্টাখানেক সময় দেন কার্যালয়ে। জমায়েত জনতার প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, তদবির-তৈলমর্দন ইত্যাদির কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের ইউরোপ আমেরিকা ট্যুরের অভিজ্ঞতা বয়ান করেন। এ সময় হাতদুয়েক দূরত্বে বসে জামিল বারকয়েক তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। করম আলীর সাথে চোখাচোখি হলেও তার দৃষ্টিতে চিনতে পারার কোনো লক্ষণই সে দেখে না। জামিল চেয়ারটির মাহাত্ম্য আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করে জীবনের চূড়ান্ত গোলের লক্ষ্যে চেয়ারটির প্রতি আরো একনিষ্ট হয়ে উঠার শপথ নেয়।

কিন্তু আপাত যে গোলটির জন্য আজ দুপুর থেকে এই কার্যালয়ে অপেক্ষমান জামিল, সে গোলটি চূড়ান্ত গোলটির মতো গুরুত্ববহ না হলেও ব্যক্তি জামিলের জন্য তা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বক্তৃতা শেষ করে হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে সবার প্রতি একইরকম উদাসীন নিস্পৃহ দৃষ্টি ফেলে চলে যাবার পর নিজেকে খুব অসহায় বোধ হয় জামিলের। শেষ পর্যন্ত রহমানকে বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। জামিল লক্ষ্য করে উদ্ধত অমান্যতার এই আত্মসমর্পনে কেমন ক্রুর হাসি ফুটে উঠে রহমানের মুখে। 

হাসিটি তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অসহ্য উত্তাপে জ্বলেপুড়ে যেতে থাকে তার অহম। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে সে, আর মনে মনে উচ্চারণ করে- দেখিস একদিন আমিও......। কিন্তু বাসায় ঢুকে সে টের পায় সেখানে যে ওম তা যেনো দোযখের, অহমের জ্বলুনি তুচ্ছ এর কাছে। নিজ বাড়িতে, নিজ পরিবারে অভাব অভিযোগের তীরে শরবিদ্ধ ভীষ্মের মতো নিরুপায় বোধ হয় জামিলের। কিচ্ছু অমূলক নয়। অভাবও নয় অভিযোগও নয়। বারান্দায় বসে থাকা স্বামী পরিত্যক্ত বোন শাহানার বিষন্ন হতাশাগ্রস্ত দৃষ্টি তার গোল মিস হওয়ার ঘাটাকে আরো দগদগে করে তুলে। জামিলকে দেখামাত্র শাহানার বিষন্ন হতাশ দৃষ্টিতে যোগ হয় প্রশ্নবোধক। সেই প্রশ্নবোধকের তীব্র আকুলতায় পরাজিত হয় জামিলের অহম।

কোমরে গুঁজা পিস্তল, শহরজুড়ে ভয়ার্ত চোখ, উঠতি তরুণদের সমীহের দৃষ্টি কিছুই তার ঘরের দোযখের ওম কমাতে পারে না। যেমন দু’চারটা অপারেশান থেকে প্রাপ্ত কয়েক হাজার টাকা থেকে দু চারটা টাকাও সে যোগান দিতে পারেনা সংসারে। আর সে কিনা পৌঁছুতে চায় সবচেয়ে উচু চেয়ারটায়? নিজেকে প্রবোধ দিতে হয়। না এর থেকে বরং জরুরী শাহানার চাকরিটা, খুব জরুরী। 

না হয় করম আলীর কন্যাকে নিয়ে একটা দূরত্ব শেষপর্যন্ত তৈরি হয়েই গেছে রহমানের সাথে, না হয় একদিন রহমানের সাথে করম আলীর দিনভর ডেটিং পাহারা দেবার বদলে সে ঘাড় ত্যাড়া করে জানিয়েছে- ফারতাম না। কিন্তু করম আলী কিংবা রহমানের জন্য গত কয়বছরে কৃত উপকারের পরিমানওতো খুব কম নয়। টেন্ডার ছিনতাই থেকে বাজারের টোল আদায়, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদার টাকা আদায় থেকে বস্তি উচ্ছদ করে ইটভাটা স্থাপন কোন কাজেই অদক্ষতা বা অবিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়নি সে। বিনিময়ে যা পেয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছে। সম্প্রতি এই উঁচু চেয়ারটির প্রতি তার অন্তরে জাগ্রত লোভটিকে সে দ্বিধাহীন নিষ্ঠুরতায় হত্যা করে। মনে মনে সান্তনা পায়, যাই হোক রহমান এই গোলটির আকাক্সক্ষ¥ার খবর জানে না।

কাজেই শাহানার একটা চাকরির তদবির তার কাছে করা যেতেই পারে। হাসলোই বা সে ক্রুর হাসি। সত্যিতো রহমানের প্রতি কখনোই কৃতঘœ হতে চায়নি সে। এতে বরং লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি তার। হাত খরচের টাকার যোগান বন্ধ, থানায় মৃত পড়ে থাকা কয়েক ডজন মামলা পুনরুজ্জীবিত হবার আশঙ্কা, এমনকি জানটাও ঝুঁকিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।

সব ভুলে পুনরায় রহমানের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিশ্বস্ততা আর আধিপত্যে আত্মসমর্পনের জন্য পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা হাতে নেয় জামিল। ঠিক তখনই মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠে- রহমান কলিং......।

এ যে মেঘ না চাইতেই জল। সবকটা সার্টিফিকেটসহ আগামীকালই শাহানাকে নিয়ে ঢাকা রওয়ানা দিতে বলে রহমান ভাই। বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার ধৃষ্টতাকে করুণা হয় জামিলের। একটা উচ্চাকাঙ্খ¥া কিংবা অহমিকার পাথর বুক থেকে নেমে বড় হালকা করে দেয় তাকে। চোখের সামনে না থাকলেও ফুটবল টিকে উদ্দেশ্য করে বলে সে- যা শালা, গোলের আশাই ছাইড়া দিসি। এখন আর হাসবি কেমনে? 

রাজধানীতে করম আলীর বহুতল ভবনের নীচতলায় ওয়েটিং রুমে বসে মনে স্বস্তি খুঁজে সে। নিজ পরিবারের জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ এবার ঘুচবে তার। তখনই ভিতরে ডাক পড়ে শাহানার। সার্টিফিকেটগুলো হাতে নিয়ে শাহানা ভিতরে ঢুকলে জামিলের মুখে একরাশ এসির ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা দিয়ে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়।

বসতে বসতে দিনের শুরুটা মধ্যাহ্নের দিকে যায়। কেউ একজন সামনে চা আর কেক রেখে যায়। মধ্যাহ্ন নিশ্চিতভাবে অপরাহ্নের দিকে গড়িয়ে গেলে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় জামিল। কয়েকবার ফোন দেয় রহমানের মোবাইলে। রিসিভ না করলেও দরজা ঠেলে বের হয়ে আসে একসময়, অপরাহ্নের শেষ হতে যাওয়া আলোতে রহমান জামিলকে নিয়ে বাইরে আসে- চল তরে ফালুদা খাওয়াই, খাইছসনি কোনুদিন? শাহানা কই- প্রশ্নটি করার আগেই- রাস্তার ডিভাইডার পার হয়ে ফুটবলটি বালকদলের পা গলে ঠিক তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। ফুটবলটির চোখ গজালো, নাক গজালো আর জামিলের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললো- এইবার সব মিস। একবারেই মিস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন