বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস : গোলাপ সুন্দরী

গোলাপ সুন্দরী
কমলকুমার মজুমদার

উৎসর্গ – স্নেহের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে


‘গোলাপ সুন্দরী’ গলপটি বই আকারে প্রকাশিত হল। আমার স্বামী, স্বর্গত শ্রীকমলকুমার মজুমদার লিখিত ‘গোলাপ সুন্দরী’ গল্পটি প্রথমে ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, পরে কৃত্তিবাসে পুন্ররমুদ্রণ হয় । এই গল্পটি বহুদিন যাবৎ বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘গোলাপ সুন্দরী’ গলপটি, বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার ব্যাপারে শ্রীমজুমদারের অন্তরঙ্গ-ভক্ত শ্রীমান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিশেষ সাহায্য করেছেন । বইটি প্রকাশিত হওয়ায়, মনে হয় বহুমনের প্রত্যাশা পূর্ণ হবে…।
–দয়াময়ী মজুমদার

গোলাপ সুন্দরীর পটভূমিকা


কমলকুমার মজুমদারের ‘গোলাপ সুন্দরী’র পটভূমিকা সম্পর্কে বলতে গেলে কিছু কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এসে পড়বেই। তাতে একালের পাঠকদের পক্ষে কমলকুমারের রচনা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার কিছুটা সুবিধে হতে পারে।
১৯৫৩ সালে কমলকুমারের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় হয়। তখন তিনি পরিণত যুবা পুরুষ । বলিষ্ঠ দেহ, মসৃণ কালো রং, চোখ দুটি অতি উজ্জল এবং ওষ্ঠে সব সময় কৌতুক হাস্য । আমরা তখন কলেজীয় ছোকরা, পৃথিবী তো দূরের কথা, এই কলকাতা শহরটাকেই তখনো ভালো করে চিনি না।
তাঁকে আমরা প্রথমে দেখি একজন নাট্য পরিচালক হিসেবে । সেই সময় ‘হরবোলা’ নামে একটি থিয়েটার ক্লাব খোলা হয়েছিল, যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সিগনেট প্রেসের দিলীপকুমার গুপ্ত এবং পরামর্শদাতাদের মধ্যে ছিলেন সত্যজিৎ রায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু সয়ীদ আইয়ুব, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ। পরে জ্যোতিরিন্দ মৈত্র এসেছিলেন আমাদের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এবং প্রথম থেকেই ফৈয়াজ খার সাক্ষাৎ শিষ্য সন্তোষ রায় নিযুক্ত ছিলেন গান শেখাবার জন্য । আমরা লক্ষ্মণের শক্তিশেল” পালার মহড়া শুরু করার কয়েকদিনের মধ্যেই কমলকুমার মজুমদার এসে যোগ দিলেন আমাদের মোশান মাস্টার হিসেবে ।

পরিচয়ের আগে আমরা তাঁর নামও শুনিনি । । তিনি যে লেখক এটা জানতে আমাদের ঢের দিন লেগেছিল। তার আগে আমরা জেনেছিলুম যে আমাদের এই নাট্য পরিচালক খুব ভালো ছবি আঁকেন, প্রায় সময়েই মার্গ সঙ্গীত গুনগুন করেন, ফরাসী ভাষা অতি উত্তম জানেন এবং কথা বলেন উনিশ শতকের বাঙালীদের বৈঠকী কায়দায় ।

আমরা নাটকের দল খুলেছিলুম বটে, কিন্তু নাট্য জগতের চন্দ্র-সূর্য হবার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাদের ছিল না । সাহিত্যের প্রতিই ছিল আমাদের সর্বাঙ্গীণ টান । নাটক মঞ্চস্থ করার চেয়ে মাসের পর মাস ধরে শুধু মহড়া দিয়ে যাওয়াতেই ছিল আমাদের বেশী আগ্রহ এবং সেই সঙ্গে আডিডা । দিলীপকুমার গুপ্ত যেমন ছিলেন এই নাটকের দলের মধ্যমণি, আবার তারই উৎসাহে ও ঔদার্যে আমরা প্রকাশ করতে শুরু করি তরুণতম কবিদের কবিতার পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’ । তিনি ছিলেন বিদগ্ধ ব্যক্তি, বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে গভীর জ্ঞান ছিল, বিশেষত বাংলা কবিতার প্রতি ছিল তার তীব্র ভালোবাসা । ‘হরবোলা’র আসরে তিনি সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের বিষয়ে নানান অশ্রুতপূর্ব কাহিনী শোনাতেন আমাদের । এবং আমাদের সৌভাগ্য এই যে, আমাদের সঙ্গীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র একজন বিশিষ্ট কবি, তিনিও যোগ দিলে আমাদের সেই আডডায় আমরা উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রস পেতাম এবং পরের সপ্তাহের জন্য তৃষিত হয়ে রইতাম। কিছুদিন পরেই আমরা আবিষ্কার করলাম যে আমাদের নাট্য পরিচালকেরও প্রধান আসক্তি সাহিত্যে, অগাধ তার পড়াশুনো এবং দেশী-বিদেশী সাহিত্যের বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও তার অসাধারণ। অবশু তখনও টের পাইনি যে তিনি নিজেও একজন লেখক ।
আমরা অল্পদিনেই তাঁর অনুরক্ত হয়ে পড়লুম এবং হরবোলার আড্ডার শেষে আমরা একই সঙ্গে বাসে চেপে বাড়ি ফিরতুম বলে (হরবোলার দপ্তর ছিল এলগিন রোডে সিগনেট প্রেসের বাড়িতে, আর আমরা প্রায় সকলেই থাকতুম শ্যামবাজারের কাছাকাছি, কমলকুমার আরও উত্তরে) আরও অনেকক্ষণ তাঁর সঙ্গ পেতুম, এর পরেও পাঁচ মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্পে গল্পে মধ্য রাত্রি পার করা । শব্দ ব্যবহারের অসীম ক্ষমতায়, শুধু কথা দিয়ে তিনি আমাদের মন্ত্ৰমুগ্ধ করে রাখতে পারতেন ।

হরবোলা নামের প্রতিষ্ঠানটি বেঁচে ছিল কিঞ্চিৎঅধিক চার বছর । এর পরেও আমরা কমলকুমার মজুমদারের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে যাই ।

কমলকুমারের রচনা প্রসঙ্গে এই হরবোলা-পর্বটি তুলে ধরার বিশেষ কারণ আছে। এর আগে তিনি সাহিত্যপত্র ও চতুরঙ্গে কয়েকটি ছোট গল্প লিখেছিলেন মাত্র এবং মাঝখানে বেশ কিছুদিন সাহিত্যরচনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন । হরবোলা-আসরের ধারাবাহিক সাহিত্য প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই তাকে নতুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করে। এই সময়েই তিনি হাত দেন তার প্রথম উপন্যাস রচনায় । অকস্মাৎ একদিন তিনি আমাদের একটি অখ্যাত পত্রিকা উপহার দিলেন, তাতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘অন্তর্জলি যাত্রা’ ।

পুস্তকাকারে প্রকাশের পর ‘অন্তর্জলি যাত্রা পাঠক মহলে কোনো সাড়া জাগায় নি। তাঁর খ্যাতি কিছু নবীন লেখকদের, বিশেষত কবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমরা এই উপন্যাস পড়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলুম বলা যায়। এরকম কোনো রচনা আমরা বাঙলা ভাষায় আগে পড়িনি। প্রথমে বেশ শক্ত লেগেছিল, এক একটি বাক্য, খুবই দীর্ঘ, বারবার পড়েও সঠিক অর্থ বোঝা যায় না, কিন্তু শব্দ ব্যবহারের অপূর্ব ব্যঞ্জনায় এটা ঠিকই বুঝতুম যে অসাধারণ কিছু আস্বাদন করছি। ফৈয়াজ খানের তালগুলির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ছন্দ এবং কারিকুরি আমরা যেমন সব বুঝতে পারি না কিন্তু অনুভব করতে পারি যে একজন মহৎ শিল্পীকে শ্রবণ করছি । অন্তর্জলি যাত্রা সাধু ক্রিয়াপদে লেখা এর বাক্য গঠনরীতির সঙ্গে পরিচিত বাংলার কোনো মিলই নেই। আমরা তখন কারংকা ও জয়েসে দীক্ষিত হয়েছি, তবু বুঝেছিলুম, কমলকুমারের রচনার জাত ওঁদের থেকেও আলাদা ।

এবার ‘গোলাপ সুন্দরী’ প্রসঙ্গে আসি। এই রচনাটির সঙ্গে গোড়া থেকেই আমরা কয়েকজন জড়িত। আমাদের ‘কৃত্তিবাস’ ছিল তখন শুধুই কবিতার পত্রিকা, অন্য কিছু তাতে ছাপা হতো না । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই গদ্য লেখক বন্ধুরাও এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। তখন আমরা ঠিক করেছিলুম যে কবিতার কৃত্তিবাসে গদ্যের অনুপ্রবেশ ঠিক হবে না বটে, কিন্তু ঐ কৃত্তিবাস নামেই আর একটি গল্পের পত্রিকা প্রকাশিত হবে । অর্থাৎ গল্প ও কবিতার জন্য একই নামে দুটি আলাদা পত্রিকা । এই গল্প-কৃত্তিবাসের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় কমলকুমারের গল্প ফৌজ-ই-বন্দুক। দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য তিনি রচনা করতে শুরু করেন ‘গোলাপ সুন্দরী’ ।

প্রত্যেকদিন আমরা গোলাপ সুন্দরীর একটু একটু অগ্রগতির কথা শুনতুম। যেমন, টি বি স্যানাটোরিয়ামের রোগীদের জন্য একজন বিনামূল্যে এপিটাফ লিখে উপহার দিতে চায় ; একটি নারী যে একবার জল রং-এর চিত্র আবার কখনো ভাস্কর্য ; একজন কারুর ছেলেবেলা তার বাগানের গোলাপে ফুটে উঠবে ; একজন কারুর খরচ করার মতন নিঃশ্বাস কম আছে বলে সে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে না,… ইত্যাদি । ছোট গল্প হিসেবে শুরু হয়ে লেখাটি ক্রমশ বড় হতে থাকে। গোলাপ সুন্দরী সমাপ্ত হবার পর এক সন্ধ্যায় ওয়েলিংটনের মোড়ে একটি সাঙ্গুভেলি রেস্তোরায় আমাদের কয়েকজনকে কমলকুমার সেটি পুরো পাঠ করে শোনান । মনে আছে, প্রচণ্ড নেশার ঘোরে বাড়ি ফিরেছিলাম সেই রাত্রে । সেই বয়েসে, এ রকম একজন লেখককে সামনাসামনি দেখছি, এজন্য আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করেছিলুম।

প্রবল অর্থাভাবে আমরা গল্প-কৃত্তিবাসের দ্বিতীয় সংখ্যা আর প্রকাশ করতে পারিনি। সেই সময় আমাদেই বন্ধু নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘এক্ষণ’ নামে একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ হচ্ছিল, লেখকের সম্মতিক্রমে ‘গোলাপ সুন্দরী’ দেওয়া হয় সেই পত্রিকায়। পরে তিনি ‘এক্ষণ’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক হয়ে যান এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলির মধ্যে ‘দেশ’ পত্রিকার দুটি বাদে বাকি সব ঐ পত্রিকাতেই বেরিয়েছে । এই সূত্রে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় ইন্দ্রনাথ মজুমদারের, যিনি কমলকুমারের বাকি জীবন ভাই-বন্ধু-পুত্রের মতন সঙ্গে থেকেছেন এবং কমলকুমার মজুমদারের গল্প সংগ্রহ প্রকাশ করে তাকে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছে দেন ।
গোলাপ সুন্দরী কমলকুমারের শ্রেষ্ঠ রচনা কি না জানি না, তবে তার সম্পূর্ণাঙ্গ সার্থক দু’ তিনটি রচনার অন্যতম নিশ্চয়ই । ‘গোলাপ সুন্দরী’ অনেককাল দুর্লভ হয়ে ছিল, পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবার ফলে বাংলা সাহিত্যের গৌরব বৃদ্ধি হলো ।

যাঁরা কমলকুমারের রচনায় দীক্ষিত, তাদের কাছে গোলাপ সুন্দরীর ভাষারীতি বেশ সহজ ও সাবলীল মনে হবে, কেন না, শেষের দিকে ক্রমশ তাঁর রচনা আরও জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। একেবারে শেষ জীবনের দু একটি লেখা বারবার পড়ে আমিও যেন সঠিক মর্ম-উদ্ধার করতে পারছি না মনে হয়েছে । সেই তুলনায় গোলাপ সুন্দরী সরল নিশ্চয়ই। তবু, সদ্য নতুন পাঠকদের কাছে এই গোলাপ সুন্দরীর ভাষাও প্রাথমিক বাধার সৃষ্টি করতে পারে বোধহয় । সেই জন্য কয়েকটি কথা বলা দরকার ।
কমলকুমারের ভাষা একেবারেই অন্য রকম । কেন এরকম ভাষায় ৷ তিনি লেখেন, সে প্রশ্ন অনেকবার করেছি। এক এক সময় এক এক রকম উত্তর দিয়েছেন তিনি । যেমন, বাংলা গদ্যের বাক্য বিন্যাস তৈরি হয়েছে ইংরেজির অনুকরণে । কমলকুমারের মতে, যদি বিদেশী রীতি নিতেই হয়, তবে ফরাসী বাক-ভঙ্গী অনেক বেশী কাম্য । তিনি ইংরেজি-প্রভাব অস্বীকার করে ফরাসী-রীতিতে বাংলা গদ্য লেখেন । আবার কখনো বলেছেন, হাটে-বাজারে, বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে যে-ভাষায় আমরা কথা বলি, সে ভাষায় সাহিত্য রচনা উচিত নয় । সাহিত্য হচ্ছে সরস্বতীর সঙ্গে কথা বলা, তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ভাষা তৈরি করে নিতে হয় ।

তবে, এগুলোও বোধহয় সঠিক যুক্তি নয় । আধুনিক বাংলা গদ্য অনেকখানিই রবীন্দ্র-অনুসারী। গদ্যে এই রবীন্দ্র-প্রভাব তার তেমন মনঃপূত ছিল না, তিনি পছন্দ করতেন বঙ্কিমের গদ্যের দৃঢ়তা এবং মনে করতেন, বাংলা গদ্য বঙ্কিম-দৃষ্টান্তেই চলা উচিত ছিল । তবুও, সাধু ক্রিয়াপদ আঁকড়ে ধরে থাকলেও, কমলকুমারের গদ্য ঠিক বঙ্কিমী গদ্য নয়, এ তাঁর নিজস্ব তৈরি করা ভাষা। নিজের লেখার জন্য একজন লেখক আলাদা ভাষা তৈরি করে লিখেছেন, এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বেশী নেই।

তাঁর বিষয়বস্তুও অভিনব । তিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদের লেখক হলেও তার গল্পউপন্যাসে সমসাময়িক জীবন প্রসঙ্গ কদাচিৎ এসেছে। তিনি গত শতাব্দীর বাঙালী-গৌরবে মুগ্ধ ছিলেন বলে তার অনেক রচনারই পটভূমি গত শতাব্দী। অথবা, এই শতাব্দীর গোড়ার দিক । তার শৈশব-কৈশোরের পর্যবেক্ষণ ও স্মৃতি নিয়ে লিখতেই তিনি ভালোবাসতেন । গোলাপ সুন্দরীর পটভূমিও স্বাধীনতার আগের আমলের। তাঁর গল্প-উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠাটিই বেশী জটিল । যেন তিনি পাঠকদের পরীক্ষা করতে চান । শাল-সেগুনের জঙ্গল দেখেই যারা ফিরে যেতে চায় তাদের তিনি চন্দনের বনে পৌঁছোবার পথের সন্ধান দিতে চান না । সেইজন্য পাঠকদের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন । যেমন, গোলাপ সুন্দরীর প্রথম বাক্যটি : “বিলাস অন্যত্ৰে, কেননা সম্মুখেই, নিম্নের আকাশে, তরুণসূৰ্য্যসবর্ণ কখনও অচিরাৎ নীল, বুদ্বুদসকল, যদৃচ্ছাবশতঃ ভাসিয়া বেড়াইতেছে”। প্রথমেই তিনি একটা রঙের । প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করলেন, এবং এর একজন দ্রষ্টা আছে, তার নাম বিলাস, সে একজন যুবক, তার মন এখন অন্যত্র । কমলকুমারের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মানুষের অনুভূতি, তার পরিবেশ, তার রচিত দৃশ্যের বর্ণনা দেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে, সেই তুলনায় চরিত্রগুলিকে আঁকেন কয়েকটি মাত্র আঁচড়ে । বিলাসের জামাইবাবু মোহিতের চেহারাটি কেমন তিনি বললেন না, কিন্তু তার গাড়িটির বর্ণনা চমৎকার। মোহিতকে অবশ্য তার বাক-ভঙ্গীর জন্য আমাদের চিনতে একটুও অসুবিধে হয় না, কারণ সে নিজের কাছে নিজেই অত্যন্ত ফেমাস ম্যান ।

গল্পের শুরু একটি স্যানাটোরিয়ামে। যক্ষ্মা যেমন এক সময় ছিল রাজরোগ, তেমনি এক সময় সাহিত্যে বিষয়বস্তু হিসেবেও এই রোগটি রাজ-স্থান পেয়েছিল । দেশ-বিদেশের অনেকগুলি বিখ্যাত উপন্যাস লেখা হয়েছে এই রোগীদের নিয়ে । ন্যানাটোরিয়ামের বর্ণনা টমাস মান-এর উপন্যাসে আছে অসাধারণ, কমলকুমার সেই স্যানাটোরিয়ামকে আনলেন সম্পূর্ণ নতুন রূপে । হাসপাতাল মানেই রক্তহীনতা, আর তিনি প্রথমেই সেই হাসপাতালকে ভরিয়ে দিলেন রক্তে । বিলাস হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে, তার দিদি-জামাইবাবু তাকে নিতে এসেছে, সেই সময় বাইরে মোহিতের গাড়ির ফুটবোর্ডে (এখনকার গাড়িতে এ জিনিস থাকে না ) বসে একটি গ্রাম্য বালক সাবানজলের ফেনার বুদ্বুদ ওড়াচ্ছে অসংখ্য। সেই সব স্থডেল, ছাতিসম্পন্ন, সুন্দর, উজ্জল, বাবু, অভিমানী,আশ্চর্য বুদ্বুদগুলি ভরিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল । সেই ভ্ৰাম্যমাণ বুদ্বুদ, গতিশীল বর্ণচ্ছটা, যা কয়েক মুহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়, তা দেখে বিলাস মুগ্ধ, কারণ সে ছুটি পেয়েছে। কিন্তু অন্য অনেক রোগী চঞ্চল ও ব্যথিত হয়। চেট্টি নামে একজনের মনে হয় সেই বুদ্বুদ ভ্ৰাম্যমাণ নিদ্রা, চলন্ত এপিটাফ। এবং সে তার প্রিয় এপিটাফটি উচ্চারণ করে । এখানে লেখক বাংলা অক্ষরে আট লাইনের একটি ফরাসী এপিটাফ লিখে দিলেন, অর্থ বলে দেবারও চেষ্টা করলেন না, পাঠককে তিনি এমনই শিক্ষিত মনে করেন । গোলাপ সুন্দরী প্রথম পাঠের সময় আমরা অবশ্য সেরকম শিক্ষিত ছিলুম না, তাই অনুসন্ধান করে জেনেছি, সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসী কবি স্কারোঁ-র রচনা ঐটি, তার নিজের এপিটাফ, কেউ যেন শব্দ না করে, কারণ এই প্রথম রাত্রে স্কারোঁ ঘুমোচ্ছে ।

এই পর্যন্ত দু’ তিনগুণ মনোযোগ দিয়ে অনুধাবন করলে, গোলাপ সুন্দরীর বাকি অংশের রস গ্রহণ করতে কোনো পাঠকের অসুবিধে হবার কথা নয় । গোলাপ সুন্দরীর মূল কাহিনীটি অতিশয় রোমাটিক। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবার পর বিলাস কোনো স্বাস্থ্যকর নিরালা জায়গায় একটি বাগান বাড়িতে একা থাকে। সে বাগানে গোলাপ ফোটায়, বিশেষত একটি গোলাপ, যার রং ঠিক কী রকম লাল হবে তা সে নিজেই জানে না, যে গোলাপের জন্য নির্দিষ্ট একটি নারী আছে, সেই নারী কখনো সেই গোলাপের কাছে এলে তাকে আর ভালোবাসার কথা মুখে উচ্চারণ করতে হবে না । এক সময় আসে সেই নারী, তার নাম মনিক চ্যাটার্জি । সত্যিই সে এক সময়ে জলরঙের চিত্র, পরে ভাস্কর্য হয় । কাহিনীর চেয়েও বড় এর কাব্য সৌন্দর্য, কয়েকটি মাত্র চরিত্র তবু জীবনের কত দিক উদ্ভাসিত করেছেন লেখক, মৃত্যুকে দিয়েছেন মহান সংজ্ঞা ।
এই বই একাদিক্রমে বারবার পড়তে হবে । এমন বই বাংলা ভাষায় তেমন বেশী নেই, যা প্রত্যেকবার নতুন করে পড়লে প্রত্যেকবারই নতুন নতুন সূক্ষ্ম রসের সন্ধান পাওয়া যাবে।


–সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


বিলাস অন্যত্রে, কেননা সম্মুখেই, নিম্নের আকাশে, তরুণসূর্য্যবর্ণ কখনও অচিরাৎ নীল, বুদ্বুদসকল, যদৃচ্ছাবশতঃ ভাসিয়া বেড়াইতেছে। একটি আর একটি এইরূপে অনেক অনেক–আসন্ন সন্ধ্যায়, ক্রমে নক্ষত্র পরম্পরা যেমন দেখা যায়–দূর কোন হরিত ক্ষেত্রের হেমন্তের অপরাহ্ন মন্থনকারী রাখালের বাঁশরীর শুদ্ধনিখাদে দেহ ধারণ করত সুডৌল দ্যুতিসম্পন্ন বুদ্বুদগুলি ইদানীং উঠানামা করে, এগুলি সুন্দর, উজ্জ্বল, বাবু, অভিমানী আশ্চর্য্য! এ কারণেই বিলাস, চমৎকার যাহার রূপ, যে বেশ সুস্থ, এখন অন্যদিকে আপনার দৃষ্টি ফিরাইয়াছিল কেননা এসকল বুদ্বুদ সম্মুখে থাকিয়াও পশ্চাদ্ধাবন করে কিন্তু এ-দৃষ্টিতে তাহার কোনরূপ অভিজ্ঞতা ছিল না, এ কথা সত্য যে, তাই মনেতে নিশ্চয় সে কুণ্ঠিত কেননা ইতঃপুর্ব্বে অজস্র দিনের আত্মসচেতনতার কুজঝটিকার মধ্যে সে একা বসিয়া কবিতা লিখিবার মনস্থ করে – কবি হইবার নয়, যেহেতু, সম্ভবত, রূপকে রূপান্তরিত না করিয়া ভালবাসার শুদ্ধতার দিব্য উষ্ণতা ক্রমে অস্পষ্ট অহঙ্কার পর্য্যন্ত, তাহার ছিল না যদিও – তাহার নিঃসঙ্গতা নাই শুধুমাত্র স্বতন্ত্রতা ছিল।

ক্রমাগতই সকালের আলোকদীপ্ত বুদ্বুদসকল ইতস্তত ভ্রাম্যমাণ।

বালকটি, কালো সুঠাম ন্যাংটো, মোটর গাড়ীর ফুটবোর্ডে বসিয়া একটির পর একটি বুদ্বুদ নির্ম্মাণ করিয়া চলিয়াছে; ক্বচিৎ ঊর্দ্ধে অদ্ভুত ভাবে, যে ভাবে পলাতক কাঠবিড়ালীকে দেখে, অর্থাৎ মাটির দিকে চাহনি লইয়া, বালক আপনার আয়ত চক্ষুদ্বয় তুলিয়া কি যেন বা দর্শনে হাসিয়াছে সম্ভবত প্রথম রৌদ্র অথবা গতিমান দিগ্‌ভ্রান্ত বুদ্বুদনিচয়। তাহার, বালকের, পিছনেই দরজায় এবং মাড্‌গার্ডের অবিশ্বাস্য ধূলার স্তরে অসংখ্য রেখাচিত্র, না শিশুওষ্ঠের অজস্র এলেবেলে স্পন্দন। এগুলি প্রতীকমাত্র কারণ ইহার ছাপা আতপ নাই, এগুলি প্রতীকমাত্র কারণ, ইহা গণিতের সংখ্যা আত্মিক নহে; ইহাতে দৃষ্টির অভিজ্ঞতার স্বকীয়তা নাই, শুধুমাত্র খুশীর ব্যক্তিগত অনুভব আছে। কখনও বা দুঃসহ ঝটিতি আরবীটান যখন মানসিক অধৈর্য্য, নিঃসন্দেহে, অনুভূত হয়। হায়! বালকের মধ্যেও ক্ষুব্ধ বিরক্তি আকাশ হইয়া আছে। এই গাড়ীতেই বিলাস যাইবে।

গাড়ীখানি দাঁড়াইয়াছিল, মরুপথিপ্রজ্ঞ উট যে উট বৃদ্ধ যে উট ক্লান্ত, যাহার সমক্ষে দৃশ্যমান জগতই পথ বৈ অন্য নহে; উহার ড্রাইভার, দেহা যায়, আরামে ঘুমায়, তাহার রুক্ষ গৈরিক চুলগুলি, যাহা রঙিন রুমালে বাঁধা, এখনকার হাওয়ায় ত্রস্ত, স্বস্তিহীন প্রমত্ত। এই গাড়ীর ফুটবোর্ডে, চিত্রসমূহের সম্মুখে বসিয়া বালকটি, সে শুধু বা সকালের—এখন রাত্রি শেষে দিনের সুরু হয় এ-খেলা খেলিতেছিল। তাহার হস্তধৃত এনামেলের বাটির সাবানজল-সম্ভব্ব ফেনিল উচ্ছ্বাসের নিকটে তাহারই দীঘল নয়ন যুগল যাহা অযথা ক্রুর; এবং পদদ্বয় দ্রুত ব্যগ্রভাবে নাচিয়া উঠে কখন সখন, এ-হেন বালখিল্য আধিক্য বিলাসকে যারপরনাই ব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল; ফলে ক্ষণেকের জন্য তাহার, বিলাসের, মনে হয় সে খাটে শুইয়া আছে, এবং মাথার কাছে শুভ্র চার্ট করা কাগজ হাওয়ায় হাড়ের শব্দ করিতেছে ফলে ইদানীং আপনার সুমার্জ্জিত রুচিসম্পন্ন পোষাক কেমন গুরুভার—এতকাল ধরিয়া যাহা পরিধেয় ছি;, তাহা হাল্কা যাহাতে সে অভ্যস্ত—তাহার জন্যই বিলাসের মনে এরূপ বিকার উপস্থিত এবং এই একই মুহূর্ত্তেই রেশমী রুমালের সিভেটের দন্তযুক্ত সৌরভকে বিদীর্ণ করিয়া আবছায়া একটি প্রায়-হারমানা-পৃথিবীর হিমবাহ তৎসহ উৎকট রাসায়নিক গন্ধ পরিব্যপ্ত হয়। সে, বিলাস, আপন অস্বাচ্ছন্দ্যের কারণে, দ্রুত একটি কোটের বোতাম খুলিতে উদ্যত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘প্যাচ’ পকেটের দিকে লক্ষ্য করিয়াছিল, এবং এ সময়ে তাহার বাম ভ্রূ বিস্ময়কর ভাবে উপরে উঠে, সে অত্যন্তই উদ্‌গ্রীব কাহার একটি মন্তব্য পুনরায় শুনিবার জন্য আপনাকে একাগ্র করে। বিলাস স্থির করিয়াছিল। কিছুক্ষণ পূর্ব্বে ডাক্তার রঙ্গস্বামীর ঘরে প্রবেশ করিবার সময়, এই করিডোরেই দাঁড়াইয়া মোহিতদা বলিয়াছিলেন “প্যাচ পকেট তোমার কেমন লাগে ডিয়ার? অফুলি (হাসিয়া) স্পোর্ট নয়? দারুন স্পোর্ট!” আরও কিছু কথা হয়ত মোহিতের বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ওমি অর্থাৎ বিলাসের দিদি তাঁহাকে এক প্রকার টানিয়া লইয়া অদৃশ্য হয়।

‘স্পোর্ট’ কথাটা বিলাসকে বড় খুসী করে, বড় সুন্দর করে, উহা যেন বাক্য নয়, তাহা যেন সত্যই নয়ন-অভিরাম সহজ, একটি ব্রাহ্মণী হংস, যে হাঁস তুষার অভিমানী, যৌবনশালিনী এবং যে হাঁস শূন্যতা লইয়া খেলা করে। ‘স্পোর্ট্‌স’ কথাটার উচ্চারণের সঙ্গেই—ইচ্ছাকৃত কষ্টসাপেক্ষ স্বরভঙ্গের সময়ই—মোহিতের পুরুষালি মুখখানি সুপ্রসন্ন সুপ্রভ নাটকীয় হইয়া উঠিয়াছিল। বিলাস দেখিল কালোসাদা ব্রোগ, সিয়াসেকার কাপড়ের, সোজা ইস্ত্রির, পাতলুন এবং কোট, পোলকা ডট সার্ট, সুঠাম বো, পকেটে ব্লু রুমালে স্থাপত্যের পরিচ্ছন্নতা, বাটনহোলে সোনার চাকতিতে M লেখা এবং সেখান হইতে ঘড়ির চেন নামিয়া আসিয়াছে। বঙ্গের গোলাপ বলিতে যে আহ্লাদ উদাত্ত হইয়া উঠে আহা নিশ্চয়ই মোহিতকে ধারণ করিয়াছিল। এইটুকু ভাবিবার পরক্ষণেই, বিলাস অস্থির হইল, এমত সময়ে কাহার জুতার শব্দ পাইয়া দৃষ্টি ফিরাইতেই দেখিল মোহিত।

মোহিত তাঁহার সরু ভ্রূ যুগল তুলিয়ে আপনকার হস্তদ্বয় ছেলেমানুষের মত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করিয়া কহিলেন।—“আও গাড্‌ অয়লমাইটি তোমার দিদি কি গল্পই করতে পারে” বলিয়াই প্রথমে বাঁ হাতে আপনার পিছু পকেটে পরে চঞ্চলতা সহকারে আপনার ডান হাতে ডানদিকের পকেট হইতে লিমুজকৃত রৌপ্য নির্ম্মিত ফ্লাস্ক বাহির করিয়া ছিপিটি খুলিয়ে এক ঢোক গলায় ঢালিয়া দিলেন।—এই ছোট সুরা আধারেও তাঁহার নামের আদ্য অক্ষর ছিল—ঝটিতি সুন্দর মুখমণ্ডলে তড়িৎ প্রবাহ খেলিয়া গেল। বিলাস দেখিল মোহিতের চক্ষুর্দ্বয় অসম্ভব মঙ্গলীয়; সে স্থির ভাবে মোহিতের প্রতি চাহিয়াছিল। মোহিত রৌপ্য আধারটি তাহার দিকে ধরিয়াই অতিভদ্র ‘সর্ ‌রে’ বলিয়া যথাস্থানে আধার রাখিয়া, সৌখীন সিগারেট কেস বাহির করিল, এখানেও লেখা ‘M’…।

বিলাস কেমন করিয়া ডাক্তারের সহিত এতদিন ধরিয়া কথা বলিয়াছে, তেমনি ওষ্ঠদ্বয় কাঁপাইয়া ধীরে ধীরে কহিল “এম এম এম, এত মোনগ্রাম তোমার ভাল লাগে?”

মোহিত কি যেন বলিতে গিয়া খুব সাধারণ করিয়া উত্তর করিল “হ্যাঁ…আমার কাছে আমি অন্যন্ত ফেমাস ম্যান” বলিয়া হাসি দিয়া আপনার উচ্ছল রসিকতাকে বাধাঁন দিল না, বরং সিগারেটে একটি টান দিয়া কহিল “আমার এক মুহূর্ত্তও এখানে ভাল লাগছে না, পাগল হয়ে যাচ্ছি…কি অদ্ভুত dull জায়গা, নিঃশ্বাসের কি বিশ্রী শব্দ…”

বিলাসের রুগ্ন বরফচাপা রঙটা মোহিতের এহেন কথায় রক্তিম হইয়াছিল, শিশুসুলভ মুখখানি তুলিয়া সে সভয়ে সজল নেত্রে তাঁহার প্রতি চাহিয়া, পরে, ধীরে, আপনার চতুষ্পার্শ্ব উপলব্দি করিল; এই করিডোরের সাদা একটানা দেওয়াল—মধ্যরাতে রমণীয় চোখের পলকের মত—মধ্যে মধ্যে। সোনার জড়োয়া ফ্রেমে প্রসিদ্ধ ডাক্তারদের ছবি; নিকটেই কোক! সমস্ত দেওয়াল আলোর তারতম্যে। কখন বা অতীব দীন, এখানে চাপাগলার শব্দ, কোথাও অভিমান, এমন কি করাঘাত কভু বা দীর্ঘশ্বাস! এ দীর্ঘশ্বাস সম্ভবত তাহার নিজের, বিলাসের। বোধ হয় বিলাস এই বাড়ী, তথা স্থান—অথবা তাহার ইহকালের কিছুটা—সমস্ত অতীত ভালবাসিয়াছে।

এরূপ আত্মস্থ মুহূর্ত্তে সহসা বিলাস আপনার পকেটে হস্ত প্রদানের সঙ্গেই বপথুমান, যে কি সে অনুভব করে? অস্ফূট নিবিড় ঘোর এক খস্‌খস্‌ কাগজের শব্দ; এ রৌদ্রকর্ম্মা শব্দ তাহাকে চকিত রোমাঞ্চিত করিয়াছিল। কাংড়া কলমের ‘অভিসারিকা’ চিত্র দর্শনে মানুষের যেরূপ একা বোধ হয়, ধৈবতের গাম্ভীর্য্যের রাজ্যে যেরূপ একাকী বোধ করে, সেইরূপ এইক্ষেত্রে বিলাসকে পকেটস্থ এই খস্‌খস্‌ শব্দ—যাহা অন্ধকারকে নাম ধরিয়া ডাকে—বড় একা করিয়াছিল।

অন্যপক্ষে মোহিত দেখে নাই, যে সেইক্ষণে বিলাস আপনার উদ্বেগ চাপিবার জন্য, আপনার ওষ্ঠের একপাশ দাঁত দিয়া চাপিয়া ধরিয়াছিল, হঠাৎ সে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করত, পকেটের কাগজের টুকরো দুটিকে মুঠা করিয়া ধরিয়া ঝটিতি বাহিরে নিক্ষেপ করিতেই একই ত্রস্ত উড়ন্ত পাখীর ছায়া পলকেই সবেমাত্র-পতিত কাগজের পিণ্ডের উপর দিয়া রেশ টানিয়া চলিয়া গেল। ইহাতে মনে হয়, কাগজের পিণ্ড বিলাসের সমক্ষ হইতে বহু বহু কাল দূরে সরিয়া চলিয়া গিয়াছে, নিশ্চয়ই সেখানে গাঢ় অন্ধকার। ভগবানকে ধন্যবাদ অন্ধকারের রেখা নাই।

এ কারণে মোহিত অনভিজ্ঞ চোখটি বাঁকাইয়া, নীল কাগজের পিণ্ড যাহা ইদানীং গাড়ীর ড্রাইভারের ঘুমন্ত মাথার নিম্নে বুদ্বুদ-নির্ম্মাণকারী বালকের এবং এইখানকার সিঁড়ির মধ্যবর্ত্তী যে জমি—এখানে ফুলের কেয়ারী বর্ত্তমান—সেখানে খেলিয়া বেড়ায় তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া কহিল—“বিলে দু?”

মোহিতের এ প্রশ্ন বিলাসের নিকট রূঢ় বিদ্রুপ হইয়া দেখা দিল, সে কঠিন ভাবে চাহিতে জানে না শুধুমাত্র আপনার সৃজিত পৃথিবীতে চিত্রার্পিতের মত দাঁড়াইয়া রহিল। সে নিশ্চয়ই বলিতে চাহিয়াছিল “ও নো…” উহা বিলে দু নহে তথা পুনরায় জাগিয়া, পুনরায় বিশ্বাস ফিরিয়া পাইয়া প্রথম ভোরের দিকে চাহিয়া শ্বাশত হইবার মানসে কোন যুবতীজন কর্ত্তৃক লিখিত উহা কোন ডাগর বিদ্রোহের জয়ধ্বনি নয়। কিন্তু বিলাস মরিয়াছিল ফলে কোন কথাই সে বলে নাই, এ কারণে যে এখনও স্বতন্ত্র নিঃসঙ্গতার দুর্জ্জয় বীরত্ব তাহার নাই!

বিলাসকে আর উত্তর করিতে হইল না, এ-হেন সময়ে অদূরে ডাক্তার রঙ্গস্বামীর কক্ষের দোলান-দরজাটা একটু ফাঁক করিয়া ওমি বিলাসকে ইসারা করিল। বিলাসকে যাইতে দেখিয়া মোহিত অসম্ভব চঞ্চল হইয়া উঠিল।

রঙ্গস্বামীর ঘর।

রঙ্গস্বামীকে দেখিবা মাত্রই বিলাসের মনে হইল সে যেমত বা শুইয়াই আছে, পরক্ষণেই সহজ হইয়া অল্প একটু হাসিল। আশ্চর্য্য, এই ঘরে ঔষধের কোন গন্ধ নাই, পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র, এ-ঘর বিল্বদলের মত শুদ্ধ। একমাত্র রঙ্গস্বামীর আঙুলের নখগুলি প্রতীয়মান হয় যে, অদ্ভুত শক্ত, কেন যে শক্ত তাহা কাহারও এতাবৎ মনে হয় নাই; এখন বিলাস যেমন বা এ নখগুলির সম্মুখেই দাঁড়াইয়া ছিল, নিমেষেই সে অনুভব করে, যে না তাহা নয়, সে ঐ নখগুলির পিছনেই আছে, নিশ্চিন্তে, সুখে নিদ্রায়, এ নখে বন অন্ধকার নাই!

রঙ্গস্বামী মুখ তুলিয়া হাসিলেন “হ্যালাও ডিয়ার” ইহার পরে কণ্ঠস্বরকে সঠিক কর্ত্তব্যপরায়ণ করিয়া কহিলেন, “মাই চাইণ্ড, সব কথার তোমার ভগনীকে আমি বলেছি, তেমনভাবে চলবে, আমাকে চিঠি লিখবে, অবশ্য যার উত্তর আশা করা বৃথা…নিশ্চয়ই আমি তোমার চিঠি পড়ব…কোন রকম ভারী কাজ” বলিয়াই হাসিয়া উঠিয়া কহিলেন, “তোমার কর্ম্ম উঠে গেছে” এখানে গলার স্বরটা কেমন যেন বা অস্পষ্ট হইয়া চকিতেই পুরুষালি সদা রসিক আওয়াজ শোনা গেল “হ্যাঁ কর্ম্ম নয় কোনরূপ নয়…” এসময় একটি ভ্রূ অত্যাধিক উঁচু হইয়া উঠে “কর্ম্ম নেই—মুক্ত…সম্পূর্ণ অনাসক্ত…খ বৎ”

বিলাসের নবতম দিব্য জামা কাপড়—যাহা স্পোর্টস ধরণের—তাহার নীচে অতি সূক্ষ্ম দেহ যেন বা প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল, একদা তাহার মনে হইল, রঙ্গস্বামী কি এই যশস্বিনী ধরিত্রীর লোক নহে? এ কথা এ অভিমান মনে উঠে সঙ্গে সঙ্গেই মিলাইয়া গেল, কেন বা রঙ্গস্বামী উচ্চশ্রেণীর দক্ষিণ ভারতীয়—ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের স্বর্গীয় সুষমায় যে জীবনধারা গঠিত, ফাঁকি নাই। এখন, বিলাস—সাঁওতাল রমণীরা যেরূপ হাটে আসিয়া আপনার বিক্রয়ার্থে ঠেকাপূর্ণ সামগ্রীর সম্মুখে, মুখে একটি হাত দিয়া নির্ব্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া থাকে সেইরূপ দণ্ডায়মান।

সঘন ট্রাজেডির অভিনেতার মতই টেবিলের সবুজ বনাতের উপর দিয়া বার বার ঘুরাইয়া গভীর কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন “ভগবানকে ধন্যবাদ যে তুমি এই শতাব্দীতে জন্মেছ…(তবু এখানে রঙ্গস্বামীর স্বর নিদাঘের দ্বিপ্রহরের ফেরিওয়ালার ডাকের মতই ক্লান্ত শোনাইল) যখন দিন দিন রাত্র রাত্র—আপনার সহজ রূপে এসেছে; বহু মহাপুরুষকে তুমি কল্পনা করে নিতে পারো…আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে…”

বিলাস সত্যই রঙ্গস্বামীর এই সরলতায় মুগ্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল, সহসা তাহার মনে হইল, এই স্যানাটোরিয়ামের সাজগোজ আসবাবপত্রের সহিত কি মিল আছে? এখানে ওখানে সর্ব্বত্রে লুই কাতজ আমলীয় সাজসজ্জা তাহাকে এখন বুদ্ধিহীন করিল, কেন এত ঝাড় লণ্ঠন, সেজ, বাতিদান, ঈবনী, গোল্ড ওরমলু, কারপেট…এক মাত্র এপরন, চার্ট, খাট এবং এটা সেটা ছাড়া সবই ভারী সুন্দর শান্তি উপত্যকা! এই স্যানাটোরিয়ামকে সাজাইতে যখনই মহামান্য রাহা বাহাদুরকে কোন কিছু প্রয়োজন এ-প্রার্থনা জানাইয়াছে, তৎক্ষণাৎই তাহা মঞ্জুর হইয়াছে। কিছুদিন পূর্ব্বে নয়টি পরীধৃত সোনার সৌখীন কাজ করা একটি ঘড়ি পাঠাইয়া দিয়াছেন—রঙ্গস্বামী ঘড়িটি ঈবনীর ম্যানটেল-পিসে রাখার সময় হাঁকিয়া বলিয়াছেন “চিলড্রেন…জগতের যত সুসময় এই ঘড়িটিতে জমা হয়ে আছে…তোমরা যদি লাভ করতে চাও…এটার দিকে তাকিও” বিলাস ছেলেমানুষ যেমত কঠিন অঙ্কের সামনে ঘর্ম্মাক্ত হইয়া উঠে, তেমনি অদ্ভুত অদ্ভুত কথা এবং আপনার অভিজ্ঞতার সমক্ষে সে অস্থির।

“আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি…ভগবানকে বিশ্বাস ক’রো” রঙ্গস্বামী বলিতেছিলেন। ‘বিশ্বাস ক’রো’ কথাটা ভোরের হাওয়ার মত বিলাসের শীর্ণ মুখে আসিয়া লাগিল; এবং সে উদ্‌গ্রীব হইয়া রঙ্গস্বামীর মুখপানে তাকাইল, পুনরায় তাঁহার স্বর শোনা গেল “মাই ডিয়ার এ এক অদ্ভুত শতক, দেখ না একজনকে একজনের বলতে হয়, তাঁকে বিশ্বাস করো…” বলিয়াই আপনার দুঃসাহসিক হাতখানি বাড়াইয়া দিলেন, এখন তাঁহার সার্টের হাতার হীরকখণ্ড দেখা দিল। ওমি হীরকখণ্ড দেখিয়া মনে মনে প্রশংসা করিয়াছিল।


বিলাস ইদানীং আপনার ব্যাধিমুক্ত হাতখানি বাডাইয়া দিয়াছে, এ সময় তাহার সুন্দর কালো দুখানি চোখ জলসিক্ত হয়, কম্পিত কণ্ঠে সে কহিল “আমি জানি না কেমন করে…”
“আ আ…ধন্যবাদ দেবো এই ত”
“পুনরায়”
“ও ডিয়ার ও ডিয়ার. . ‘বলো না বলো না” বলিয়া চক্ষুদ্বয় বড় করিয়া রঙ্গস্বামী পুনৰ্ব্বার কহিলেন “বলো…বিদায়”

বিলাস হরিণশাবকের মত করিয়া মুখখানি তুলিয়া কহিল “কেমন করে বলি আপনাকে…”
ঠিক এই সময় পাশের হল হইতে কেমন যেন ভৌতিক গোলমাল ভাসিয়া আসিল ; অনুচ্চ এবং মৰ্ম্মান্তিক, গুহার প্রতিধ্বনি যেমন, গহ্বর আপনার প্রাচীনতম আবহাওয়া লইয়া দীর্ঘকায়া হইয়া উঠিল । এ কক্ষের সকলেই উৎকীর্ণ, ঝটিতি উদ্বিগ্ন হয় ; স্নেহপ্রবণ রঙ্গস্বামী আপনার চেয়ার ছাড়িয়া দ্রুতপদে ঘর ছাড়িয়া যাইবার কালে, বিলাসের উদ্বেগ ব্যস্ততা লক্ষ্য করিয়া কহিলেন “উত্তেজিত হ’য়ো না, দৌড়ে না”

বিলাস এবং ওমি ডাক্তারের পিছন পিছন করিডোরে আসিতেই দেখিল, মোহিত সবেগে হাতছানি দিয়া তাহাদের ডাকিতেছে । বিলাস কৰ্ত্তব্যপরায়ণ এবং ওমি কৌতুহলপরতন্ত্র, দুইজনে হল অভিমুখে অগ্রসর হইল। হলের দরজার অনতিদূরে মনোরম আঙুরলতার কেয়ারি করা সিল্কের খাড়া স্ক্রীনের পাশ দিয়া দেখে, প্রত্যেক বিছানায় শুয়ে-শুয়ে নিরাকার রোগীসকল ঊর্দ্ধে দৃষ্টি রাখিয়া আত্মঘাতী সৰ্ব্বনাশের আওয়াজ করিতেছে, সে আওয়াজে গিরিনদী ভূমিকার পূৰ্ব্বেকার স্তব্ধতা ছিল, যে স্তব্ধতায় দশাসই উৎকণ্ঠিত যৌবনার কেশরাশির আঁধার ছিল, যে আঁধার বাঁশরীর বিচিত্র অন্তরীক্ষ—তথাপি বিলাস আপনার সংযম হারায় নাই, স্পষ্ট করিয়া চাহিতে চেষ্টা করিল।

বিলাস দেখিয়াছিল, হলের প্রায় মধ্যস্থলে চেট্রি—সে আপনার খাট ছাড়িয়া এখন ঐখানে—তাহাকে দেখিয়া মনে হয় যে ঘোর উত্তেজনাবশত তাহার প্রায় নির্বাপিত শরীরের মধ্যে যেটুকু ঔদ্ধত্য ছিল, তাহাও কম্পমান, সে ঊর্দ্ধে দৃষ্টি রাখিয়া অতি পরিশ্রান্ত নৃত্যরত বাইজীর মত তাহার ঠোঁট অদ্ভূত ভঙ্গিমায় বিকৃত হইতেছে মাত্র, কিন্তু স্বর নাই…এইবার চেট্টি, ভয়ঙ্করভাবে আহত যেমন, টলিতে টলিতে অন্য আর খাটের বাজু ধরিয়া একটি হাত সঞ্চালন করিয়া সহসা উদাত্ত কণ্ঠে কহিল “ইয়া চলন্ত নিদ্রা অহো ভ্ৰাম্যমাণ এপিটাপ”

সকলেই দেখিল একটি বুদ্বুদ—সাবানজলের বুদ্বুদ—এ হলে হাওয়া খেলিয়া বেড়াইতেছে, এখন এইমাত্র, ঝাড়ের কলমে লাগিয়া নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল । ( ফলে পুনরায় আমরা বিস্ময় ফিরিয়া পাইলাম)। কালহত ঘরটিকে বুদ্বুদ ভীত হইল না।

অথচ বিলাস স্বচক্ষে দেখিল, স্বল্পালোকিত রঙ্গমঞ্চ, তাহার গভীরতা হইতে একটি কিশোর আপনার বক্ষদেশে একটি হস্তস্থাপন করিয়া অন্য হস্তটি ডানার মত মেলিয়া এই বলিতে বলিতে অগ্রসর হইতেছে যে, “আর নয় আর নহে আমারে ফিরায়ে দাও মোর মনোভাব”। বিলাস স্তম্ভিত হইয়াছিল ।
রঙ্গস্বামীকে হলের অস্থিরতা যারপরনাই বিমূঢ় করিয়াছিল, কৰ্ত্তব্যজ্ঞান সত্ত্বেও তিনিও হয়ত বা মুগ্ধ হইয়াছিলেন। সাবানজলের বুদ্বুদটি লুপ্ত অদৃশ্য হইবার পরক্ষণেই দেখা গেল, চেট্টির ব্যাধি-ক্লান্ত শরীরটি উৎসাহিত, উত্তেজিত, হিম, বীরদপ, গীতব্যঞ্জক উদাত্ত কণ্ঠস্বরের উপরেই যেন বা ঝরিয়া পড়িল, এতদর্শনে হলময় সকরুণ ব্যথিত বাণবিদ্ধ কষ্টের ধ্বনি উৎসারিত হয় এবং আপনা হইতে একটি বর্তমানকাল দেখা দিল, আর যে বাস্তবতা ঝটিতি অনিত্যতাকে কেন্দ্র করিয়া সকলের সমক্ষে অত্যন্ত সহজরূপ পরিগ্রহ করিল।

চেট্টি এখনও সেইভাবে পড়িয়া আছে, সমস্ত দেহে হারমানা লাঞ্ছিত ভাব, উপরের জানালার লিনটেলের লাল নীল সবুজ কাঁচের আলো-খেলান ছায়া ইদানীং চেট্টির মুখে দেহে পড়িয়াছিল, ওষ্ঠের এক কোণ বাহিয়া চাপ রক্ত অনেক দূর আসিয়াছে, কাঁচের লাল সবুজ ছায়ায় রক্ত অধিক কালো, ওলিভকুঞ্জের ঘনঘটা করা রাত্র যেমন বা তার বক্ষে ছিল, ইদানীং ঝরিয়া পড়িল । বিলাস শান্তভাবে ইহা দেখিতে লাগিল।

যে নাপিত ৬নং রোগীকে কামাইতেছিল, সে খুব ব্যগ্রভাবে ধরিয়া এতাবৎ ঘটনা পরম্পরা সাক্ষ্য দিবার মত করিয়া দেখিতেছিল ; হঠাৎ নিস্তব্ধতায় সে পুনরায় আপনার কার্য্য করিবার মানসে ডান হাতের খুর বাম হস্তে লইয়া বুরুশ জলে ডুবাইয়া যেন সম্বিৎ ফিরিয়া পাইল ।

বিলাস এখনও ঝরিয়া পড়া রাত্র দেখিতেছিল, অনেকদিন পূৰ্ব্বে বিদ্যুতের আলোয় আর একজনের মুখে এরূপ রক্ত দেখিয়াছে,—সে আত্মারাম । বেচারী আত্মারাম, অনেক কথাই বিলাসের মনে পড়িল, যখন প্রায় সে হার স্বীকার করিয়া আসিয়াছে, তখন কোথা হইতে একটি থারমোমিটার সে যোগাড় করিয়াছিল, আপনার টেম্পারেচার দেখিয়া রুদ্ধশ্বাসে জিগির দিয়া উঠিল “নৰ্ম্মাল নৰ্ম্মাল —দেখ ডাক্তার” রঙ্গস্বামী তাহার থারমোমিটার দেখিয়া কিছুটা সন্দেহের বশে অন্য রোগীকে দিলেন, সেখানেও ‘নৰ্ম্মাল’ ; এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের থারমোমিটার বাহির করিতেই ব্যাপারটা যেন তাঁহার বোধগম্যে আসিল । অবশেষে তিনিও সায় দিয়াছিলেন “হ্যাঁ নৰ্ম্মাল—তোমার বাড়িতে চিঠি দেবো ।” তারপর পরদিন আত্মারামকে কেহ আর দেখে নাই…কেহ কোন প্রশ্নও করে নাই । এই আত্মারাম বিলাসকে দু’তিনটি প্রেমপত্র লিখিয়াছিল, তারপর একদিন রাত্রে বিলাস ঘুম ভাঙ্গিয়া দেখে আত্মারাম তাহাকে সস্নেহে চুম্বন করিতেছে, এবং ধীর কণ্ঠে বলিতেছে “আমি তোমায় ভালবাসি বিলাস” এবং ঠিক তখনই বিলাস চমকিত বিদ্যুৎ আলোকে শাপগ্রস্ত আত্মারামের মুখে রক্ত রেখা দেখে ।

এতক্ষণে ডাক্তার রঙ্গস্বামী প্রায় চেট্টির কাছে । চেট্টি যারপরনাই শান্ত। তথাপি তাহার গর্ব্বিত দৃষ্টি এখনও ঊর্দ্ধে বুদ্বুদ অনুসন্ধানে ব্যস্ত, যদিচ বুদ্বুদ আর নাই তবুও তাহার খরচৈত্রে বিদীর্ণ পলিমাটি-প্রায় ওষ্ঠযুগল কোন এক এপিটাপ আবৃত্তিতে চঞ্চল।

বিলাসের, এতদ্দর্শনে, আপনার যুবরাজ সদৃশ মুখমণ্ডল কালো হইয়া উঠে, আর যে চেট্টির দূরদৃষ্ট তাহাকে নিঃসন্দেহে অতিমাত্রায় মৰ্ম্মাহত করিয়াছিল, ফলে তাহার সুন্দর রাধিকার ন্যায় চক্ষুদ্বয় আরক্ত হইল ; সে কেবল মাত্র অস্ফুট অসংযত কণ্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিল “ও চেট্টি” এবং যুগপৎ অনুভব করিল আসন্ন সন্ধ্যায় কোন বেলাতটে দাঁড়াইয়া নিকটের, নিম্নে, বহমান উচ্ছসিত জলধারার প্রতি একদৃষ্টে চাহিয়া সে অদ্ভুত টান টানা স্বরে বলিয়া চলিয়াছে ।

সলুই কি সি ম্যৎনাঁ দোর
ভি প্লু দ্য পিতিয়ে ক্য দাঁভি
এ সুফরি মিল ফোয়া লা মোর
আভাঁ ক্য দ্য পারদ্যর লা ভি
পাসাঁ ন্য ফে ইসি দ্য ব্রুই
গারদ বিয়াঁ ক্য তু ন্য ল্য ভেই
কার ভোয়াসী লা প্রমিয়ের নুই
ক্য ল্যু পভ্যয়র স্কারোঁ স্যমেই।

এইটি চেট্টির খুব প্রিয় এপিটাপ, এইটি তাহার নিকট হইতেই শেখা। এ-আবৃত্তির কালে বিলাসের মুখ-নিঃসৃত একটি গুনগুন আওয়াজ শোনা গেল, নিশ্চয়ই বিলাস সম্ভবত, সদর্পে এ সময়ে আপনার প্যাচ-পকেটে—যাহা অত্যন্ত স্পোর্টস—একটি হাত ঠেলিয়া রাখিয়াছিল। এবং আরবার আপনার মস্তকখানি আন্দোলিত করত চেট্টির মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে বলিয়াছিল “এ সুফরি মিল ফোয়া লা মোর, আভাঁ ক্য দ্য পারদ্যর্‌ লা ভি” এক্ষেত্রে তাহার কণ্ঠস্বর শুনিলে মনে হয় সে যেমন বা বেদান্তের অভিধা ক্রমে ক্রমে মিশাইয়া ফেলিতেছে, পরক্ষণেই মনে হয় যে তাহা স্বপ্নমাত্র, উক্ত এপিটাপের অতি সাধারণ মায়াপ্রবণ অর্থই তাহা জ্ঞাপন করিতেছে যথা “এবং সহ করেছে হাজারবার মরণ, ঠিক পূৰ্ব্বে জীবন হারাবার অর্থাৎ জীবন হারাবার পূৰ্ব্বে সে হাজার বার মরিয়াছে” একথা অবশ্যই যে বিলাসের এই আবৃত্তির পশ্চাতে যথাযথ শ্লেষ ছিল ।

চেট্টির এপিটাপ উদ্ধৃতির জ্বালায় সকলেই পাগল হইয়াছে, তাহার লাল চামড়ায় বাঁধান সোনার কাজ করা খাতাটিতে অজস্র এপিটাপ সংগ্রহ, নিজেও সে এপিটাপ রচনা করিত । সে নিজের বিছানায় বসিয়া, ইদানীং জৌলুষহীন মরা এককালের সুন্দর মুক্তার মত দাত চাপিয়া ধীরে ধীরে আবৃত্তি করিত তখন অন্যান্য বিছানার স্বাস্থ্যহীন মানুষেরা ভয়ে শুষ্ক হয় । বাক্যগুলির মধ্যে বাঘের গন্ধ ওতপ্রোত হইয়া উঠিত। পাঠের পরই চেট্টির বিদ্রুপাত্মক হাস্যে সারা হল ত্ৰাহি ত্ৰাহি, কে জানে চেট্টি অত্যন্ত নির্দয় ছিল কি না ! হয়তো ছিল ! চেট্টির নামে অনেকেই ডাক্তারকে বলিয়াছে কিন্তু কোন ফল হয় নাই।
বিলাস প্রথম চেট্টির গলার স্বর শুনিলেই ত্রস্ত হইয়া উঠিত, তাহার পর একরূপ সে চেট্টিকে সহ্য করিয়া ফেলিয়াছিল। অদ্য সকালে যখন সে অন্যান্তের নিকট হইতে বিদায় লইয়া, চেট্রির কাছে দাঁড়াইল, চেট্টি তাহার হাতে নীল কাগজটি দিয়া কহিল “বিদায়”
“এটা কি”
“তোমার নামে এপিটাপ, পড়” বিলাস সহাস্যে কহিল “কি নির্দ্দয় তুমি” বলিয়া সে কাগজটি ধীরে আপনার পকেটে রাখিয়া দিল… এবং চেট্টির একটি হাত লইয়া আপনার সুন্দর গণ্ডদেশে বুলাইয়াছিল।
হলের এ দুর্ঘটনাবু সামনে দাঁড়াইবার মত শিক্ষা তথা ধৈর্য্য ওমির ছিল না, তথাপি সে স্ক্রীণ পার হইয়া খানিক অগ্রসর হইয়াছিল । হলের এ-ঘটনা এত বেশী গোপনীয় ব্যক্তিগত (?) যে তাহার এখানে দাঁড়ান এক প্রকার দুঃসহ বলিয়া বোধ হইতেছিল, ফলে একবার সে জানালা দিয়া দূর পৰ্ব্বতমালার দিকে চাহিল। এবং এই নিৰ্য্যাতন হইতে অব্যাহতি পাইবার নিমিত্ত বিলাসের কোটে মৃদু আঘাতও করিল। বিলাসের বস্তুত, তখন কোন ব্যবহারিক জ্ঞান পর্য্যন্ত ছিল না ।

হলের অবস্থা যখন প্রায় শান্ত তখন ওমি বিলাসকে জোর করিয়া ধরিয়া পুনরায় করিডোরে আসিল। উহাদের দুজনকে দেখিয়া মোহিত উচ্চকণ্ঠে সুরু করিবামাত্র নিম্ন কণ্ঠে কহিল…”তোমাদের সাধারণ কাণ্ড পর্য্যন্ত নেই…এখান থেকে চল্লিশ মাইল তারপর ট্রেন…”

“সরি”—বলিয়াই ওমি ভাইকে কহিল…“বিলা খুব সাবধান…এতটুকু একসাইটমেন্ট নয়”
“আমার কিন্তু বড্ড কষ্ট হচ্ছে…”

“টমিরট…থাকলেই পারতে” মোহিত কহিল…এবং পরে মহাবিরক্তি সহকারে যোগ দিল “এক মুহূৰ্ত্ত থাকতে ভাল লাগছে না…”

গাড়ীতে জিনিসপত্তর তোলাই ছিল । মোহিত সত্বর গাড়ীতে উঠিয়া বসিল । বিলাস একবার বলিবার চেষ্টা করিল ডাক্তারের কাছ হইতে বিদায় লওয়া উচিত । মোহিত সাধারণভাবেই কহিল “পরে হবে…” পরক্ষণেই নিজের কথা সংশোধন করিয়া কহিল…“মানে কতবার নেবে…চল…চল ট্রেন ফেল হবে ।”
এখন বিলাস সিঁড়ির কাছেই, তাহার চোখ সম্মুখের জমিতে কি যেন বা খুঁজিতেছিল ; যাহা খুঁজিতেছিল তাহা তাহার নজরে পড়িল, সেই নীল কাগজের পিণ্ড, এখন ঘুমন্ত পক্ষীশাবকের মত চুপ! বিলাস এক পা অগ্রসর হইতে গিয়া থামিল, এতকাল সে শুধু আশাই করিয়াছে, মানুষ যে মনস্থ করিতে পারে এ ক্ষমতা তাহার জানা ছিল না । মনস্থ করিতে গিয়া হঠাৎ সে এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিল ; এ-শ্বাস যে কি হেতু তাহা ভাবিবার মত সময় ছিল না ; এবং সে আর সময়ক্ষেপ না করিয়া কাগজের পিণ্ডটি তুলিয়া পকেটে রাখিল । এইসূত্রে রঙিন কাচের ছায়ায় চেট্টির মুখখানি তাহার দৃষ্টিপথে ভাসিয়া উঠে !
এ ব্যাপার মোহিত অথবা ওমির দৃষ্টি এড়ায় নাই, মোহিত সোল্লাসে বলিয়া উঠিল “বলিনি
প্রেমপত্তর”

বিলাস স্বভাবত লাজুক, তিৰ্য্যক দৃষ্টিতে মোহিত এবং দিদির দিকে চাহিল, মনে মনে নিশ্চয়ই সে বলিয়াছিল “সত্যিই প্রেমপত্র, আত্মারামের লেখা--
নয় বা অন্যান্ত ছেলেদের লেখা নয়”

গাড়ীতে উঠার সময় মোহিত প্রশ্ন করিল “বিলা কখন প্রেমপত্তর লিখেছ…”
বিলাস কি যেন বলিতে যাইতেছিল, সম্ভবত “না” । সহসা ওমি বাধা দিয়া কহিল “না আবার সুধীরকে…লোকনাথকে…”

“মেয়েদের নয় ?” মোহিত কহিল ।

“আমার মেয়ে ভাল লাগে না” “

কিন্তু ছেলে দিয়ে কি হবে…গোঁফ দাড়িতে গাল বড় কড়া হয়”

ওমি ক্ষুদ্র একটি ধমক দিয়া কহিল “ও না থাম” বিলাস বাল্যের এবং কৈশোরের কোন বন্ধুকে একদৃষ্টে এবং আড়ে তাকাইয়াও বিশেষ স্পষ্ট করিয়া স্মরণ করিতে পারিল না…। কেবল একবার যেমত বা দেখিল, লোকেন সবুজ মাঠে বলের উপর একটি পা দিয়া দাঁড়াইয়া, চুল হাওয়ায় দোলে, পিছনে কালোমেঘ, ওমির ধমকে মোহিত স্ত্রীর মুখপানে চাহিয়া স্মিতহাস্য সহকারে আপনকার বেতের টুপিতে ঈষৎ ঠিক দিয়া কহিল “সানাটোরিয়ামটা অদ্ভুত টেরিব্‌ল না” বলিয়া আধো রক্তিম চক্ষু দুইটি মেলিয়া অতীব দূরের দিকে ভয়ে ভয়ে নিরীক্ষণ করত ক্রমে ক্রমে আপনাকে ব্যক্ত করিল “adoring garlic with humble face. সেই দলই আমার ভাল…”

ওমি আপনার স্বামীর দিকে তাকাইয়া ছেলেমানুষের মত হাসিয়া মন্তব্য করিল “ও ডিয়ার…সানাটোরিয়াম জিনিষটা তোমার কাছে হাইলি ইণ্টালেকচুয়াল বলে বোধ হল…”

“সত্যি” প্রতিউত্তর করিয়া মোহিত বিলাসের মুখের দিকে লক্ষ্য করিল, ওমির মুখের মত গাড়ীর কম্পনের সহিত থর থর করিয়া তাহা কাঁপিতেছে না, উহা সহজ এক সুন্দর । বিলাস খুব সোজা করিয়া একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিবার জন্য আপনার দেহটি হেলাইয়া দিয়াছিল । মোহিত ঝটিতি “আঃ” স্বরে চীৎকার করিয়া কহিল “ড্রাইভার রোকও…” মুখে হাত দিয়া “সস” শব্দে কথা কহিতে মান করিয়া বলিল “আঃ কি সুন্দর হরিণটা—বন্দুকটা ওমি”

ওমি শুধুমাত্র আপত্তি জানাইল “আঃ মোহিত” যেমন সে আপত্তি জানাইয়াছিল তেমন অন্তপক্ষে সে হরিণশাবকের দিকে শুদ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়াছিল। আশ্চর্য্য এখানকার হরিণরা চলন্ত গাড়ীকে নিশ্চয়ই ভয় পায় না বিলাস, আপনার সম্মুখে ওমির স্তব্ধ দৃষ্টি তথা নয়নযুগল এবং ক্ষণিক পরেই হরিণটিকে দর্শন কালে শুনিল যে মোহিতের কথাটি তাহার কানের কাছে ভাসিয়া বেড়াইতেছে। বিলাসের কেন বার বার “কি সুন্দর–বন্দুকটা” এ-হেন বাক্য পরম্পরা গুঞ্জন করিয়া ফিরিতেছিল, নিঃসন্দেহে কথা দুইটি দৈনন্দিন সহজ গোলমালের মধ্যে মিশিবে না ; এ কারণে যে, এ-প্রকাশের অনেকটা মনোভাব একদা আকাশে উড়িয়া খেই হারাইয়াছে, কিছুটা স্থাপত্যের অহঙ্কারে কিছুটা সঙ্গীতের নিখাদ পর্য্যন্ত আবিষ্কারে ক্ষয় হয়, যেটুকু আছে এটুকু আছে। এ-কথায় মনুষোচিত ভাবধারা অদ্য বৰ্ত্তমান । এখন সে, বিলাস ঘুরন্ত হরিণ এবং পশ্চাতে সুঠাম বনরাজি ও পর্বতমালা হইতে চক্ষুদ্বয় ফিরাইয়া মোহিতকে দেখিল, দেখিল মোহিত কালহত নহে । এতদর্শনে মন্দিরের অভ্যস্তরস্থ, আশ্চৰ্য্য, তাহাকে ছাইয়াছিল। শ্রদ্ধায় তাহার মধ্যে যেমন রৌদ্র দেখা দিল, সূক্ষ্মতা গণিতের মানকে ক্ষুব্ধ করিতে চাহিল, মধ্যরাতের নৈসর্গিক স্তব্ধতার আশ্রয়ে উপলব্ধ নম্র উষ্ণতা সারাদেহে প্লাবিত হইল। এ সময় বিলাসের দৃষ্টি যে শূন্ততায় নিবদ্ধ ছিল, সে শূন্ততা গোলাপের রক্তিমতা বহন করে । ফলে বিলাস অতিমাত্রায় উৎফুল্ল হইয়া আপনাকে জ্ঞাপন করে “আমায় বন্দুকটা দাও…”

“ও না পাগল, ড্রাইভার…গাড়ী চালাও… রিকয়েল করবে না…” ওমি বলিয়াছিল ।

“তাহলে গান নিয়ে বার হওয়া কোন মানেই হয় না” মোহিত উত্তর করিল… !

“না বার হবে না, যে স্বদেশীর যুগ…বন্দুকটা চুরি যাক” ওমি কহিল ।

বিলাস কি একটা কথা বলিতে যাইতেছিল কিন্তু হঠাৎ তাহার চোখে লিনটেলের ফুলকাটা লাল নীল ভাসিয়া উঠিল, আশ্চৰ্য্য এই যে এই আলোর মধ্যে সে হারমানা মুখখানি নাই… । বিলাসের মনে হইল, ছেলেবেলার জর উপশমে প্রথম মাগুর মাছের তেজপাতা জীরে মরিচ বাটা ঝোলের মধ্যে যেরূপ মুখচোরা লাজুক পৃথিবীর নিমন্ত্রণটি থাকিত, এখানেও মোহিতের উক্তির মধ্যে সেই বাহু বিস্তার করা স্বাগতম স্বাগতম ধ্বনিটি ছিল ।

বিলাস আপনার সহিত একটি সমান্তরাল রেখা টানিয়া আপনাকে স্বতন্ত্র করত, শ্ৰাম মোহিনী মায়ার সচেতন রূপ এই সুবিস্তৃত পৃথিবীকে মহ আবেশভরে দেখিয়া লইল । তবু কি হেতু জানা নাই, যে—চাতুর্য্য অথবা সরলতা—সে বলিল, “ওমি আমার কাশী থাকাই ভাল” এবং এক নিমেষে ওমি প্রশ্নমান দৃষ্টি লক্ষ্য করিয়া কহিল, “কাশীতে গঙ্গা আছেন…”

এ-হেন উক্তিতে স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই ছোট করিয়া হাসিল ।

ঐ হাস্যের উত্তর না করিয়া অন্তপক্ষে বিলাস পুনরায় এই যশস্বিনী সৃষ্টিকে দর্শন করিয়াছিল, এ পৃথিবীতে অদ্যও নিশ্চিন্ত নিদ্রা আছে এবং আরবার জাগিবে বলিয়াই, জানিয়াই যেখানে মানুষে ঘুমায়।


হায় গোলাপের মত বিস্মৃত ফুল আর নাই সমস্ত মুহূৰ্ত্ত যাহার অনিত্যতা ; প্রথমে শুকায় ধীরে
ঝরিয়া চুপ, ক্ষণেকেই কোথাও ফুটিয়া উঠে, সমক্ষে থাকিয়াও চির-বিস্মৃত ।—বিলাস এই রুগ্ন কথাটি, প্রত্যহই, বারবার উদ্ভিন্ন প্রস্ফুটিত গোলাপের প্রতি চাহিয়া ভাবিয়াছে ; এ-সত্য তাহার নিজস্ব অভিজ্ঞতা। এবং এ-কারণে তাহার দুঃখময় শরীরে আক্ষেপ ছিল, অস্থিরতা ছিল । গোলাপক্ষেত্রে কার্য্যের মাঝে সে যখন দূর রাস্তার প্রতি চাহিয়াছে যে পথ ঝিনকীর ঝরণার পাশ দিয়া গিয়াছে, যে পথে কখনও স্তন্যদণনরত মা আসে, বাকবাহী লোক আসে । বিলাস ঝরণার কথা ভাবে নাই, যদিও ঝরণাটি অতীব বিস্ময়কর, এখন যাহা মৃত তথাপি কিছুকাল যাবৎ তাহার দিকে চাহিলে অবৰ্ত্তমান জলধারার গুঞ্জনধ্বনি শুনা যায়, যে গুঞ্জনধ্বনি ভ্রমরগুঞ্জন সদৃশ, ফলে যখন এ ঝরণায় উল্লসিত আছে, তখন অনেক পথহারা ভ্রমর যাহারা সঙ্গলোভী তাহারা এ ঝরণা পরিক্রমণ করে ; এখন শুষ্ক তবুও ভ্রমর দেখা যায় । এ-ঝরণার দিকে চাহিয়াও গোলাপের দূরদৃষ্টের কথা ভাবিতে ভাবিতে আপনার হাতে লাগা লাল মৃত্তিকা ঝাড়িয়াছে । কেবলমাত্র স্মরণ করিয়াছে, কিন্তু গোলাপের উপর হাজার হাজার রোদ আসিয়াছে, চন্দ্রালোক মথিত করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু অদ্যও গোলাপকে কেহ দেখে নাই।

অদ্য এখন সকাল, একটি গোলাপের প্রতি বিলাসের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ; সে-গোলাপের পিছনে অসংখ্য যোজন অবকাশ, চড়াই উৎরাই কখনও বা সমতল অনেক দূরে অজস্র পাহাড়ের সারি—যাহা । এখন গম্ভীর নীল । ইতিমধ্যে মিয়ানী মৌজার ছোট বিলাতী কটেজ, কটেজের গেটের দুই পাশ্বের বগনভেলিয়ার কমলানেৰু রঙের ফুল সহ লতাছড়ির অসহায়তা দৃশ্যমান ; আজ এই কুটিরখানি বিলাসকে কিছুটা বিমনা করিয়াছিল । এবং এ-কারণে গোলাপ সম্পর্কে নিত্যকার ভাবনা এবং সে-ভাবনা হইতে কোন এক আকাশ পস্থায় তথা শূন্ততায়, যে শূন্ততায় স্যানাটোরিয়ম হইতে প্রত্যাবৰ্ত্তন কালে, মোহিতের কথা সূত্রে তিৰ্য্যক দৃষ্টিতে সে দেখিয়াছিল যে, যে-শূন্ততা গোলাপের রক্তিমতা বহন করে—সে শূন্ততায় দৃষ্টি নিবদ্ধ-করা তাহা আজ তেমন করিয়া ঘটিয়া উঠে নাই ।

কেননা উক্ত বিলাতী কটেজে ইদানীং মনিক চ্যাটার্জ্জি আসিয়াছেন ।

দিশড়া মৌজার এক প্রান্তে বিলাস, অন্যপ্রান্তে গোলক মিত্তির । ইতিমধ্যে অনেক বাড়ী আছে, কিন্তু কচিৎ কখনও কেহ আসে, এখন সব বাড়ীই ফাকা । প্রতিদিন বৈকালে, গোলকবাবু বিলাসকে । দেখিতে আসেন, গোলকবাবু অসম্ভব—বারান্দায় আরাম কেদারায় আপনাকে নিৰ্ব্বিকারে ছাড়িয়া দিয়া যে কোন আকাশের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া আপনার একদার সময় ও সমৃদ্ধির গল্প করেন, কেননা ইদানিং তিনি সত্যই দুঃস্থ ; এখন তাহার ক্ষেতে পেয়াজ উঠিতেছে, ফলে জামার গায়ে অযথা পেয়াজের গন্ধ, গল্প করিতে করিতে যখন এখনকার জীবনের কথা মনে হয়, তখনই আরামকেদারা ছাড়িয়া বেতের চেয়ারে বসেন ; বিলাসের এ ধরনের ছড়া-কাটা গল্প শুনিতে কোন দিনই ক্লান্তি বোধ হয় না, একটি মুহূৰ্ত্তের লোভে সে উদ্‌গ্ৰীব হইয়া থাকে, বেতের চেয়ার ছাড়িয়া হঠাৎ যখন গোলকবাবু বিলস্থিত রুষ্ট সপের ন্যায় মহাদৰ্পে উঠিয়া একখানি হাতদ্বারা আপনাকে সুস্পষ্ট করত কহিতেন “দেখে নেব সব শালাকে. এইসা দিন নেহি রহে গা” বলিয়া অন্ধকারে তিনি প্রস্থান করিতেন ।

যে অন্ধকারে বৃদ্ধ গোলকবাবু—ইঁহার বয়ঃক্রম প্রায় সত্তর—সে অন্ধকার কিছুক্ষণ যাবৎ লাল হইয়া থাকে, এ-লাল মহাঈর্ষাবশত মহা আক্রোশ যে নিরীহ পশুবলি (ভুলক্রমে) সংঘটিত হয় তাহার রক্তধারা যেরূপ ; এরূপ অশরীরী রক্তিমতা দর্শনে বিলাসের ত্রাসের সঞ্চার হয় নাই, ‘যেহেতু তৎক্ষণাৎ আপনার মানসচক্ষে সুদীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ কালে গোলকবাবুর কণ্ঠে শিরা উপশিরা সকল কি ভয়ঙ্কর ভাবে ফুলিয়া উঠিত তাহা দেখিতে পাইত। এই গোলকবাবুই মনিক চ্যাটার্জ্জির খবর আনিয়াছেন ।

তখন সন্ধ্যা হয় হয়, তখন চন্দ্রমাধববাবু, দূর বিসর্পিল রাস্তা যেখানে চড়াইয়ে উঠিয়া হাওয়া, সেখানে সর্বপ্রথমে বিন্দুবৎ এবং কিছু ঊৰ্দ্ধমুখিন ধূলার ছটা, ক্রমে পরে, ঝিনকীর মৃত ঝরণার পাশ দিয়া, এখানে ক্ষণেকের জন্য তাহার ঘোড়া স্থিতি লাভ করে, পরে এ ঝরণাকে দক্ষিণে রাখিয়া চন্দ্রমাধববাবুর ঘোড়া ছোট-ছুটে অগ্রসর হয়, এবার তাহার বিরাট পাগড়ী দেখা যায় । গেটের নিকটে অসিয়া, ধীরে নামিয়া শ্লথ পদে বারান্দার দিকে যান । বিলাস গ্রাভেল ফেলা রাস্তায় সংযত পদক্ষেপ শুনিয়াই বাহিরে অগসিয়া যথারীতি অভ্যর্থনা করে ।

চন্দ্রমাধববাবু মাথা হইতে বিরাট পাগড়ীটা নামাইয়া মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে প্রশ্ন করেন “বল ছোট সাহেব তোমার গোলাপের খবর কি ? বৃয়ার বড় শক্ত হে, কারণ কি জান এই যে গরম ছুটে আসছে না, তোমাকে খুব সাবধান হতে হবে হে, বেচারী গাছগুনো…আজ কিন্তু কালো-''কফিবেশ” বলিয়া বিলাস তাহার অন্য কথার অপেক্ষার জন্য থাকে, আপনার হস্তদুটিকে লইয়া কি যে করিবে তাহা সে ভাবিয়া পায় না । চন্দ্রমাধববাবুর বয়স গোলকবাবুর না হইলেও ষাটের ঊর্দ্ধে নিশ্চয়ই, কিন্তু আশ্চৰ্য্য একই জিনিষকে নূতন করিয়া দেখিবার মন অনেক নিৰ্ম্মমতায় খোয়া যায় নাই “কফি পটের লতাপাতাগুনোর উপরে সন্ধ্যার আলো পড়লে বেশ দেখায় না, মনে হয় চেঞ্জে গেছি” আবার খানিক স্তব্ধতা “ঝিনকীর ঝরণার সঙ্গে আমাদের কেমন মিল আছে না, অথচ শুষ্ক একবার একবার জল চতুর্দিকে মানুষ আয়না খাড়া করচে…” আবার স্তব্ধতা “খোলা মাঠে যখন বাছুর লাফায় তখন—আজি দেখলুম— তখন বেশ লাগে না—তখন মনে হয় বাঃ বেশ ?” আবার স্তব্ধতা—বিলাস এসকল স্তব্ধতার সঙ্গে বিশেষ পরিচিত, এ স্তব্ধতা তথা বিরাম সঙ্গীতের— শেষ স্তব্ধতার পরেই অবলীলাক্রমে আসন্ন সন্ধ্যার আলোর সহিত চন্দ্রমাধববাবুর কণ্ঠস্বর এক হইয়া যায়, তখন কানে ভাসিয়া আসে “তুমি নেহাৎ ছেলেমানুষ না হলে তোমাকে অনেক কথা বলতুম” নিমেষেই তাঁহার আয়ত চক্ষুদ্বয় অত্যধিক করুণ হইয়া উঠে এবং দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করত বলিতেন “অত্যন্ত শকড হয়ে এখানে এসেছি । এই চল্লিশ বছর কেটে গেল—আচ্ছা ছোট সাহেব…কাল দেখা হবে”। গমনোদ্যত চন্দ্রমাধববাবুর পিছনে অস্তমিত সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু দেখা গিয়াছে। অদ্যও, নিশ্চয়ই, যদি বিলাস স্মরণ করে তাহা হইলে তাহার মনে পড়িবে, লিখার পরগণার রানীর পূজা উপচার লইয়া যাইবার কালে, সম্মুখেই ঢাক ঢোল তুরী পিছনে, সাদা ঘোড়ায় ম্যানেজার চন্দ্রমাধব ঘোষাল, রাজকীয় বেশ মাথায় উষ্ণাষ সবুজ ভেলভেটের খাপে তরোয়াল—তাহার পিছনে বিচিত্র সজ্জায় পাঁচটি হাতী, মধ্যেরটি শ্বেত। সে অবস্থাতেও চন্দ্রমাধববাবু নামিয়া বিলাসের সহিত দেখা করিবার সময় সেই এক কথু “নেহাৎ ছেলেমানুষ না হলে, বড় শকড হয়ে এখানে এসেছি—না না কফি না জল না…আজ শিবরাত্রি যে…যদি মোক্ষ দেন…আর মনুষ্য জীবন নহে” বলিয়া সবেগ প্রস্থান করিলেন ; লাল কিংখাবের ছত্রের রক্তিম আভা তখন তাহার মুখমণ্ডলে…বুদ্ধ হাসিলেন ।

চন্দ্রমাধববাবু আসিয়া বসিলেন। বিলাস তাহাকে দেখিয়া অল্প হাসিল, কহিল “বলুন চা না কফি…না…”
চন্দ্রমাধববাবু বিলাসের সুন্দর মুখখানির দিকে তাকাইয়া ভ্রূ তুলিলেন । বিলাস কহিল “হুইস্কি, ব্রাণ্ডি, ওয়াইনজাতীয়…কোন…মোহিতদার জন্য ওমি সব রেখে যায়—কখন…”

“হুইস্কি…”

বিলাস ঈষৎ উচ্চৈস্বরে তাহার কথার প্রতিধ্বনি করিয়াছিল ।

“জান মনিক এসেছে… সারা জীবন ত ফাঁকা, মানুষ আবার ফাকায় আসতে চায় মজা দেখ…
মনিক বললে কি না…এখানটা বেশ ফাঁকা তাই বেশ লাগে…কে কোথায় হাঁপিয়ে উঠছে বলা ভার কি বল.” বলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিলেন, বিলাস বুঝিল এই মুহুৰ্ত্তটি চন্দ্রমাধববাবুর আপনার কথায় ভরিয়া ছিল, পরক্ষণে শোনা গেল “গ্রাণ্ড মেয়ে দারুণ স্কলার তেমনি অপূৰ্ব্ব সুন্দরী…বিয়ে যে কেন… বুঝি তা ওদের সমাজে…এই বয়সেই সেণ্ট স্কুলের হেডমিস্ট্রেস…বেরি বেরি…কলকাতা অতি নচ্ছার জায়গা হয়ে উঠেছে…হ্যাগা ছোট সাহেব তুমি ওকে নেমন্তন্ন…”

“আজ্ঞে আজ্ঞে মানে…বুঝলেন নেমন্তন্ন ঠিক নয়…লিখেছিলুম কারণ এ কয়েকদিন আগে হঠাৎ সকাল বেলা তখন বেলা ৮টা হবে জানেন…” বলিতে বলিতে সেই শূন্যতার দিকে চাহিতেই কয়েকদিন পূৰ্ব্বেকার পাহাড়ী সকালে গিয়া পৌঁছিল, দেখিল, তখন মেঘাচ্ছন্ন সূর্য্য ফলে আলো অতীব, মেষশাবকের গায়ের মত, কোমল, একজন অপুর্বরূপসী আপনার এলোখোঁপা বাঁধিতে বাঁধিতে সম্মুখের গোলাপের ইতস্তত প্ৰমত্ততা দর্শনে মগ্ন । মেঘ ছিন্ন হইল, তৎক্ষণাৎই সৰ্ব্বকালের আলোর কল্পনা আসিয়া সারা মুখমণ্ডল এবং অবয়বটি উদ্ভাসিত করে । এই অপসরা তাহারই বেড়ার ধারে তখনও দণ্ডায়মানা, গোলাপ দর্শনে স্থাবর । বিলাস তাঁহাকে দর্শন করিয়াও বুদ্ধি হারায় নাই, শুধুমাত্র একটি কুহকের মধ্যে ছিল যে কুহকের অর্থ মোহিনী মায়ার শ্বেত কবিপ্রসিদ্ধি ইঁহার চারি দিকে খেলা করিতেছে ; এই সেই লাল, আরবার মনে হইল, ওমি বোধ হয় ইহা হইতেও সুন্দরী কিন্তু বড় বেশী সোফিষ্টিকেটেড। সেদিনকার অভিজ্ঞতা সাধারণভাবে চন্দ্রমাধরবাবুকে নিবেদন করে ।
“ও বলেছে একদিন বাগান দেখতে আসবে… ব্যাপারটা কি জান, ওর মা…যাক, তাই বড় একা একা মিশতে চায় না…”

“আমি ভাবলুম…আমার ত টিবি, তাই হয়ত…”

সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রমাধববাবু এমন ব্যস্ত হইয়া বিলাসের গায়ে হাত দিয়া আদর করিতে গেলেন যে হুইস্কির গেলাসটি প্রায় পড়িয়া যাইতেছিল। বিলাস গেলাসটি ধরিয়া ফেলিল, চন্দ্রমাধববাবুর বড় আপনার করিয়া তাহাকে আদর করিলেন । ইহার পর হুইস্কিতে ঠোঁট ভিজাইতে ভিজাইতে কহিলেন “ও গো বাবু বেরি বেরি কি কম ছোঁয়াচে…যাক্‌ আজ রানীর জমিদারীর উত্তর দিকে গিয়েছিলুম, জানো সেখানে একটা ছোট নদী আছে…আহা, বলতেও কষ্ট হয়, গেল “এইখান যাত্রায়” (পরব) সাঁওতালরা, সেই নদীর তীরে বেশ কিছু হুপ্‌পি ছিল…সব মেরেছে গা… পাখী আমার বড় ভাল লাগে যখন এখানে আসি কত পাখী…এখন… আচ্ছা এখানে বেশ মন বসেছে ত…।“

“হ্যাঁ তবে একটু আপনার মত বেড়াতে পারলে…”

“না না বিলাস ছেলেমানুষী করো না…তোমার থেকে কয়েক বছর বড় হব, তখন, আমি এ অঞ্চলে অভ্যাসি, এখনকার মজা কি জান, নিজেকে পরিষ্কার দেখা যায়”

“সে ত আয়না… ”

এই উত্তরে চন্দ্রমাধববাবু চেয়ারে সজোর চাপড় মারিয়া কহিলেন “আঃ কচে বারো…দারুণ বলেছ…হ্যাঁগো গোলাপের কতদূর, খবর নেওয়া হয় না…”

“তাহলে তো ডায়েরী পড়ে শোনাতে হয়…একটু হুইস্কি…”
“আঃ গুড…তবে তোমার ডাইরী বড্ড বেশী সরলতা—ওটা বুঝতে আমার…”
“সত্যিই…”
“ওই যে ডাইরীর মাথায় লেখা—art is too long life is too short—এসব কথা দুঃখ থেকে বঞ্চিত করে…তুমি ত দুঃখ পাওনি তুমি ভয় পেয়েছ…তাই…থাক বৃয়ার রোজ কি বলে…”

এ সময় আঁধার করিয়া আসিয়াছিল ফলে নগেন আলো লইয়া আসিতেই, হাত তুলিয়া বিলাস তাহাকে নিষেধ করিল। বিলাস মন খারাপ করিতে গিয়া চন্দ্রমাধববাবুর দিকে তাকাইল, বুঝিল এই কয়েক আউন্সেই তাহার জিহ্বা বজ্জাতি করিতেছে। সহসা আপনার ভারী মাথাটা তুলিয়া নগেনকে দেখিয়া চন্দ্রমাধববাবু কহিলেন “নগা…তোর দাদার বৌ কেমন রে…”

বিলাস নগেনের পূৰ্ব্বেই উত্তর করিল “আর বলবেন না, বড় মুস্কিলে আছি, যক্ষ্মা তো, বলে কিনা রক্ত পিত্ত! হাসপাতালে গেল না…যখন যা পারি দি, অনবরত সেই টাকা দিয়ে রঙ্কিলি টিলায় পাঁঠা কাটাচ্ছে, আর ঢাকি ভাড়া কচ্ছে…”

“এ্যাঃ” চন্দ্রমাধববাবুর ম্যানেজারি ভাব ফুটিয়া উঠিল “শালা শুয়োরের বাচ্চা—হারামজাদা—ডাক শালা…তোর দাদাকে ছোট জাত…”
“আহা থাক্‌ চন্দ্রমাধববাবু.”
“কি সৰ্ব্বনাশ গো…তোমার ত বড্ড অসুবিধে হচ্ছে একমাত্র চাকর ভরসা…তা তার বৌ মরবে কবে ?”
“এখন ভূষণ বলছে গণৎকার বলেছে…একাদশী-দ্বাদশী কাটলে হয়”
“বাঃ সিদে কথা…হ্যারে তা মরবে, কত কাঠ যোগাড় করেছিস…”
“ভূষণ ত কাঠ কাঠ করে লাফাচ্ছে বলছে গোলকবাবুর উঠোনে মণ মণ কাঠ আছে…আচ্ছা বলুন ত সে ভদ্দরলোক কাঠ নিজের জন্যে জমিয়েছ…বিদেশ বিভূয়ে যদি…”
“আমাদের খেজুড়ী জঙ্গলে গেলে কাঠ দিতে পারি. তবে যে আবার যাবে সে ত মহুয়া খেয়ে বেহুঁস হয়ে থাকবে—তুমিও যেমন, মরুক শালারা…”

এখান হইতে দেখা যায়, হল-ঘরে এক পাশে, রাত্রের খাবার জন্য টেবিল সাজানো হইতেছে ; অসম্ভব গোপনীয় দৃশ্য, এই দিক হইতে চক্ষু ফিরাইয়া চন্দ্রমাধববাবু কহিলেন “তুমি কোথায় ছোট সাহেব”
প্রথম আঁধার, দ্বিতীয় অনন্ত দূরত্ব মানুষের অস্তিত্বকে ফুৎকারে উড়াইয়া দিতে চাহিতেছে, উপরন্তু এই অসহায় জিজ্ঞাসায় বিলাস রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল, আপনার অভ্যন্তরে অসংখ্য পরিপ্রেক্ষিতের যাওয়া অভ্যাসা চলিতে লাগিল, আর সে, বিলাস, অদ্ভূত ভাবে মাথায় হাত দিয়া এক হাত ঊর্দ্ধে তুলিয়া কি যেন বলিবার জন্য ওষ্ঠবিদীর্ণ। চতুর বিলাস পলকেই এ দৃশ্য হইতে মন ঘুরাইয়া লইল ।
চন্দ্রমাধববাবুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল “বিলাস, তুমি বেশী ভূষণের ওখানে যেও না…”
“না গিয়ে কি করি বলুন, ওরা ভাব্‌বে…”
“তুমি ভয়ে…”
“আজ্ঞে তাই…তাই যেতে হয়…”
“যাতে ওরা বিশ্বাস করে তুমি মোটেই ভয় পাও না…যাক সব মার ইচ্ছা…”

চন্দ্রমাধববাবু, শেষোক্ত কথায়, বিলাস কালো হয়, এ-কারণে যে এক্ষণি তিনি প্রশ্ন করিবেন, “কি বিলাস তারা ব্ৰহ্মময়ীকে দেখছ ত” সে-ছবি মেরুদণ্ড সরল করিয়া দেখার মত সুযোগ সে খোঁজে নাই ; প্রকৃতি মাঠ ঘাট তেপান্তর লোক গল্পই ভাল, তাহাকে এরূপে দেখা তাহার পক্ষে সম্ভব নয় তবে এইটুকু সে বুঝিয়াছিল, সে-ছবি যখন চন্দ্রমাধববাবু তাহাকে উপহার দেন, তাহার মধ্যে প্রাচীন ভালবাসা ছিল ।
“মা মা” বলিয়া এমত কাতর উক্তি করিলেন, সম্মুখের বিলাস শিশু হইয়া গেল, যে বিলাস এতাবৎ ষড়যন্ত্র করিতেছিল, বাঁচিবার নামে জীবন ধারণের নামে, বহু বহু যুগের অনর্থ, ময়লা, অন্ধকার এবং কূট পদ্ধতি লইয়া খেলা করিতেছিল, সে বিমূঢ় হইল, বিলাস আর যাহা আকাঙ্ক্ষা । করুক, কোন ক্রমেই শিশু হইতে চাহে নাই। ফলে, বৃক্ষলতাদি এবং নিকটের গোলাপ ক্ষেত্র, উপরে নক্ষত্ররাজি সকলেই সাক্ষী রহিল যে, বিলাস রুক্ষ হইল…“রাত হয়েছে…”

বিলাসের এ কথা চন্দ্রমাধববাবু অল্প নেশার ঘোরে শুনিয়া কহিলেন “কথাটা বড় অর্থব্যঞ্জক, ইচ্ছা করলে আমি এখনি সন্ন্যাস নিতে পারি…যাক গোলাপের লাল, হ্যাঁ যে লাল তুমি বলেছিলে সে লাল অতীব গূঢ় সূর্য্যের আছে…আর আছে উষ্ণতার মধ্যে…” এইটুকু বলিয়াই চন্দ্রমাধববাবু কোথায় যেমন বা অন্তৰ্দ্ধান করিলেন ।

বিলাস যেন বা হাঁফ ছাড়িল, কেন না ভাগ্যে চন্দ্রমাধববাবু বলেন নাই তাই জগজ্জননী তারা লাল ভালবাসেন ।


বিলাসের সমস্ত দেহ সম্পূর্ণভাবে রোমাঞ্চিত হইয়া আছে। মৃদু শব্দে, ছোট স্পন্দনে সাধারণ হাওয়ায় সে বার বার চমকাইয়া উঠিতেছিল, এমন কি কিছুক্ষণ আগে, ওমিকে চিঠি লিখিবার কালে তাহার অনবরত একাগ্রতা ভাঙ্গিতে ছিল, চিঠি হইতে মুখ ঘুরাইয়া সে বলিয়া উঠিয়াছে “কে?”

একদা এ প্রশ্ন তাহার আপনার দিকে চক্রাকারে ঘুরিয়া আসিল, এ প্রশ্নে সৰ্ব্বভুক্‌ দেদীপ্যমান শিখা ছিল। এহেন উপলব্ধিতে বিলাস বুঝিল তাহার আপনার মধ্যে মহাবায়ু—যে বায়ু ভাস পাখীর আকাশ পন্থায়-—চলা ফেরা করিতেছে, না না তাহা নহে মনে হইল সে নিজেই যেমন বা চলিতেছে। বন্ধু নাই, কবি নাই, পথপ্রদর্শক নাই । একটি দুঃসহ অমাত্রিক ছন্দ ক্রমে ঘুরিয়া ঘুরিয়া পরিক্রমণ করিতেছে। একদা ক্ষীণ চেতনায় দেখিল, সে যেন বা কোন এক বেলাতটে আপনার ছায়ার উপরে অচেতন, অদূরে ঘোর তরঙ্গভঙ্গ—এখন মধ্যরাত ।

দুৰ্দ্ধৰ্ষ সুপ্তি হইতে উঠিয়া পুনরায় বেশ গভীর করিয়া প্রশ্ন করিবার মানসে ওষ্ঠস্বয় বিভক্ত করে, এবারে তার স্বর ছিল না । সম্মুখের ওমির ফোটর দিকে চাহিয়া অসহায় ভাবে আপনার মস্তক আন্দোলন করিল। এই আশ্চর্য বিকারের মধ্যে সে গোলাপ ফুটিবার অপেক্ষার হেতু নির্ণয় করে, মনে হইল তাই কি ? তবে কেন পড়িয়া-থাকা-চাবি দর্শনে, দরজা দর্শনে, শিশু দর্শনে, তাহার দেহ শিহরিয়া উঠে । যে বিলাস, যে কোন চিত্তবিভ্রান্তকারী দৃশ্বকে বৃক্ষস্থিত কাঠঠোকরা দেখিয়া, পাতার আন্দোলন মনস্থির করিয়া ঠেকাইয়াছে, আজ অর্ণর পারিতেছে না, সে হার মানিতেছিল, প্রত্যেক বস্ত . হইতে এক অজর বাস্তবতা তাহাকে আক্রমণ করিতেছিল । সমস্ত যেমন বা প্রহেলিকাময় ! অথচ হয় তাহার কোন বিস্ময় নাই ! একদা ভাবিতে চাহিল আমার বন্ধু নাই, কবি নাই, পথপ্রদর্শক নাই । কিন্তু বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হইল না । বিলাসের গলার প্রথমোক্ত আওয়াজ পাইয়া, নগেন আসিয়া বিনীত কণ্ঠে কহিল “আমায় ডাকছেন হুজুর”

বাতিদানের আলো পড়িয়া নগেনকে ভীতিপ্রদ লাগিতেছিল, বস্তুত একধরনের লোক আছে
যাহাদের অন্ধকারেই ভাল লাগে, সহ্য করা যায় যেমন হাটুরিয়ারা হাট সারিয়া ঘনরাত্রে প্রত্যাবৰ্ত্তন করে। নগেন তখনও দণ্ডায়মান, নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে এক কাধের তোয়ালে অন্ত কাধে রাখিল ; কেন না প্রভুর দৃষ্টি তেমনই এখনও শূন্য ; সহসা ভূত্য দেখিল যে, বিলাস হস্তধৃত কলম দিয়া বাতিদানের কলমে আঘাত করিতেছে ফলে নম্র আওয়াজ খেলিয়া উঠিল, তবু বিলাসের মুখে মৃদু হাস্য দেখা যায় নাই, হয়ত নগেনের মুখে কুট বিষের প্রতিক্রিয়া সে । দেখিতে পাইয়ামিল, সে ঝটিতি বলিয়া উঠিল, “না ডাকিনি” নগেন যেন বাষ্প হইয়া নিশ্চিহ্ন ।

এখন বিলাস পত্র লিখিবার কারণে মনোনিবেশ করে, ওমির ফোটর পাশেই মোহিতদার ফোট, মনে হইল যে কোন শতাব্দীর আনন্দ সে, মোহিত, জানিয়াছে—কোন ঝড় জল জানে না বেশ ! পরক্ষণেই চিঠির সূত্র ধরিল ।

ওমি ডিয়ার, মনটা আমার তোমার জন্য পাগল হয়ে আসছে, কবে তুমি আর মোহিতদা আসবে ? আমার আজকাল বড় একা একা বোধ হয়, যতই স্থস্থ হচ্ছি ততই খালি মনে হচ্ছে – জায়গাটা সত্যি বড় নির্জন ভূষণের বের অবস্থা প্রায় শেষ হয়ে আসছে, ফলে লোকজনের বড় অসুবিধে, ওরা এই আছে এই ছুটে ছুটে যাচ্ছে…কি যে করি…

মিয়ানার ‘লিলি কটেজে’ মনিক চ্যাটার্জি এসেছেন, ভদ্রমহিলা আমাদের গোলাপবাগের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, আমাকে দেখেই স্থান ত্যাগ করলেন। নেমস্তন্ন করেছিলুম আসেননি। আশ্চৰ্য্য নয়! অদ্ভূত নেটিভ ! যাক, সব থেকে মন আমার উদ্‌গ্ৰীব হয়ে আছে, যে গোলাপ নিয়ে এতদিন কাজ করছিলুম, তাতে কুঁড়ি এসেছে। তোমার থাকার সময় যদি ফুটত আমি ভারী খুলী হতুম কেন না তুমি খুলী হতে ! মনে হচ্ছে যেন সমস্ত ছেলেবেলাটা আমার এবার গোলাপ হয়ে ফুটে উঠছে। নিজে যেখানে নিজের সব থেকে বড় সঙ্গী। আজকাল এইসব কারণে আমার নিশ্বাস বড় দ্রুত হয়েছে। স্বপ্ন নয় ঘুমের মধ্যে বেশ বুঝতে পারি, জেগে আছি ! এক এক সময় মনে হয়, নিমেষেই কোন সৃজনক্ষম নগরে চলে যাই, একটা হোটেলের ঘর ভাড়া নিয়ে ঘুমাই। এ ঘুমটার চেহারা অনেকটা নব্যধারার শিল্পসাধনার এবষ্ট্রাক্ট প্রজ্ঞানের মত সুঠাম!

চন্দ্রমাধববাবু আসেন, বলেন আমি নাকি দুঃখ কি তা জানি না ( ঠাকুরের কৃপা ) গোলকবাবু আধিভৌতিক দুঃখেই কাৎ…। আমার গোলকবাবুকে সত্যি বেশ লাগে, এই বয়সেও লোকটা লড়তে রাজী, মনে হয় যদি একটা বেতে ঘোড়া একটা হিরট ব্লেডের ভোঁতা তরোয়াল এবং পুরাতন যে কোন সেঞ্চুরী ওকে দেওয়া যায়—ও গড আউল মাইটি ! উনি যে কি ভাবে দেশ জয় করবেন তা ভাবাই যায় না । অদ্ভূত দৰ্প ভদ্রলোকের। মানুষের মত। আমি খুব ভালবাসি, লোকটি একদিন না এলে মন কেমন করে।

ওমি ডিয়ার কবে আসবে, আজকাল আমার বড় ভয় হয়, এখুনি দরজাটা দেখে চমকে উঠেছিলুম, সকালে ভূষণের ন্যাংট ছেলেটাকে দেখে মনে হল এক থাপড় দি—কেন না ভয় পেয়েছিলুম কোথাও দাঁড়াতে পাচ্ছি না ।

অজস্র অফুরন্ত ভালবাসা ওমি ডিয়ার ! চিঠি হঠাৎ রাখিয়া বিলাস উঠিয়া পড়িল, হাতে টর্চটি লইয়া বিরাট গোলাপ বাগে আসিয়া চারিদিকে চাহিল, সম্মুখের আকাশ, এমত ধারণা হয় পৃথিবীর অংশ, মাথার উপর যে আকাশ সে দিকে তাকাইতে বিলাসের দৈহিক কষ্ট হয় ( ? ) সে দিকে সে চাহিতে আদতে ভরসা পায় না, সহসা মনে হইল বহু ঊর্দ্ধের আকাশ, মসৃণ পেলব কোমল কুহকের ছদ্মবেশে সমস্ত গোলাপ বাগে, অদ্বিতীয় রম্য স্থান জ্ঞানে নামিয়া আসিয়া আপনার দেহ এলাইয়া দিয়াছে, এতদর্শনে বিলাস গতিহীন অনড় । আপনার দেহ মনে হইল, গুরু
কোন ভারে জগদল, এরূপ আর একবার হইয়াছিল যখন বহুদিন পূৰ্ব্বে ভূমিতে পতিত চেট্টিকে সে দেখে ! কিছু কাল পরে বিলাস যেমন বা এই বিচিত্র বর্তমানতাকে প্রশ্ন করিতে চাহিল ‘এ কি তুমি !’ আবার মনে হইল হায় যদি একটি বক্ৰ তুলির টান পাইতাম যাহার উপরে মাথ৷ রাখিয়া কাল অতিবাহিত হইত। এখন সে টর্চ জালিয়া সমস্ত গোলাপ ক্ষেত্রের উপর বুলাইয়া দিল । আলো আর নাই, সে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া কি যেন অনুভব করিতে পারে! ধন্য সে, যে আকাশ হইতে তাহার জন্য নিঃসঙ্গতা নামিয়া আসিয়াছে। কিন্তু এই সমগ্র সত্যটি একটি বুক চেরা ভাব লইয়াই উদয় হইয়াছিল—কোন বাক্যরূপে আসে নাই— । তথাপি বিলাস অগ্রসর হইল যেখানে এখন গোলাপ ইদানীং কুঁড়ি এবং মুখ তুলিয়া চাহিল যেখানে, মনিক কয়েকদিন পূৰ্ব্বে সকালে দেখা দিয়াছিল।

ইতিমধ্যে কে একজন আসিয়া হস্তদন্ত হইয়া দাঁড়াইল, বিলাস কহিল “কে”
“আমি ভূষণ”
“কি খবর”
“আমরা কাঙাল মানুষ বুঝেতে লারছি—তার কোন সাড় নাই…নাড়ী কেউ বুঝে না…”
“আঃ” অত্যধিক মনুষ্যোচিত ঘৃণায় বলিয়া উঠিল “তা সে খবর এখানে কেন…” একথা সে এমতভাবে কহিল যেন বা বাগানের শুদ্ধতা নষ্ট হইয়াছে ।
ভূষণ পশুর মত কাদিয়া উঠিতে গিয়া কহিল “হুজুর যদি”

বিলাস আত্মস্থ হয়, একবার আপনার গোলাপ বাগ দেখিল, এবং শোনা গেল যে সে বলিল “চল”
ইতর জাতির গ্রাম যেমন হয়, বিলাস আসিয়া সম্মুখের খোলা জায়গাতে দাঁড়াতে, আর আর যাহারা ছিল তাহার কাঁদিবার জন্য প্রস্তুত হইল, অশান্ত হা-হুতাশের শব্দ যেমন বা তাহার হাতের মুঠায় রাখিয়াছে, বিলাস দাওয়ায় উঠিতেই লক্ষ্য করিল ভূষণের বোন সত্বর, কঙ্কালসার অচেতন পদার্থ বৌটির মাথায় খুব পরিপাটি করিয়া ঘোমটা টানিয়া দিল । বিলাস আর সহ্য করিতে পারিতেছিল না, একারণে সে পিছনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল ; যেখানে তাহার আপনার সুদীর্ঘ ছায়া অল্পবিস্তর অস্থির ।

বিলাস আসিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া ভূষণের বৌর নাড়ী দেখিতে লাগিল, এখানে বলা উচিত বিলাস তাহার গাত্রে হস্ত প্রদান করিতেই যে শৈত্য অনুভব করে, সে শীতলতায় তাহার, বিলাসের, ব্যবহারিক জ্ঞান পর্যন্ত মিলাইয়। গিয়াছিল । বিলাস ধীরে হাত রাখিয়া উঠিয় দাঁড়াইল, আশ্চর্য কেহ তাহার পার্থিব নিশ্বাসটি শুনিতে পায় নাই । সে ডাকিল—“ভূষণ”
“হুজুর”

ভূষণের হাতে টর্চ দিয়া চলিতে আরম্ভ করিল, পৃথিবীর কোন দিকে চাহিয়া ভূষণকে, সেই ভয়ঙ্কর খবর দিবে ? অনেকবার সে গতি শিথিল করিয়াছে অনেকবার নূতন করিয়া নিশ্বাস লইয়াছে, একদা মনে হইল, আসফাকের কথা, যে সকল সময় আপনার নাসিকা গহবরের কাছে হাত রাখিয়া ঠিক লইত যে নিশ্বাস পড়িতেছে কি না । এই ব্যক্তিই তাহাকে বলে, এই ভয়ঙ্কর খবর দেওয়ার জন্য মানুষে কিছু করে নাই—ইহার উচিত স্থান স্টেজ ব্যতীত অন্যত্র হইতে এ খবর ঘোষণা করা বাতুলতা।

বিলাস ক্রমে আপনার গোলাপ বাগে আসিল এবং অবলীলাক্রমে এখানেই স্থিতিবান হইয়া কহিল…“ওদের কাঁদতে বল, তোরা ব্যবস্থা কর” নিজের কানে এ-হেন ভাষায় সহজ কথা বলা বড় হাস্যকর লাগিল । বিলাস একথা আর মনে করিতে না চাহিয়া ঝটিতি তাহার হস্ত হইতে টর্চটি লইয়া, বাগানের মধ্যে চলিয়া গেল, হাত ধোয়ার কথা একবারও মনে উদয় হইল না ।

একটি গোলাপ গাছে টর্চ পড়িতেই আশ্চৰ্য্য হইয়া একটি ফুটন্ত গোলাপের মধ্যে অমোঘ তুর্বিবনীত জোয়ার খেলা করিতেছে, কম্পমান একটি পাপড়ি রমণমুখ অনুভবের পর ষোড়শী যেমত নিশ্চিন্ত ভাবে এলাইয়া পড়ে তেমনই ক্রমে ধীরে এলাইয়া পড়িল ; বিলাসের উল্লাস অথবা বেদনার ধ্বনি, কি জানি কোনটি—শ্রুত হইল । এ ধ্বনিকে পাপিয়ার আহবান ডাক প্রতিধ্বনিত করে, যে আহবানকে বহন করিয়াছিল উৎসারিত মৰ্ম্মর, যে মৰ্ম্মরকে পথ দান করিয়াছিল অযুত স্তব্ধতা । বিলাস আচম্বিতে রুদ্ধশ্বাসে এই গোলাপের নিকটে ছুটিয়া আসিয়া তাহার কণ্টকময় দণ্ড সৰ্ব্ব শক্তি দিয়া ধরিয়াছিল । একারণে, এক্ষণে, তাহার কোনরূপ বেদনাই অনুভূত হয় নাই ; কেন না সে আশ্রয় চাহিয়াছিল, আশ্চর্য্য এতদিন পর সুস্থতার পর সে অদ্ভূত ভাবে কাশিল ।

অনেকক্ষণ গোলাপের কাছেই, ত্রিগুণাত্মিক ক্রিয়ার ভুবনমোহিনী মায়ার মধ্যে সে মহা আনন্দে সাতার দিয়া বেড়াইতেছে, এখন রাত্র, রাত্র তাহার নৈসর্গিক বিহ্বলতা লইয়া দূর দূরান্ত তাহার চির রহস্য লইয়া জীবন, জীবন তাহার চির পৌত্তলিকতা লইয়া এ সন্তরণলীলা দেখিয়াছিল । বিলাস এই প্রথম সকালের আলোর জন্য মরিয়া অস্থির ব্যাকুল ; এ উন্মত্তত তাহাকে রমণী করিয়া তুলিল । ‘কখন আলো দেখা দিবে’ বালকের মত কণ্ঠে সে নিশ্চিত বলিয়াছিল।

কখন যে সে ইতিমধ্যে নগেনকে ডাকিয়াছিল তাহা সে নিজেই অবগত নহে, নগেন প্রুনিং নাইফটি আনিল । ফুলটি কাটিয়া ঘরে লইয়া অগসিতেই আলোয় দেখিল যে আপনার হস্তের তালুর কয়েক স্থানে রক্ত বিন্দু, এই প্রথম নিশ্চয়ই সে রক্ত-কে গৰ্ব্বভরে তথা ভ্রূক্ষেপ না করিয়া মানুষের মতই দেখিয়াছিল, কারণ তাহার হস্তে তখন আর এক লালের প্রতিমা ছিল ।

রূপার পাত্রে এখন সে গোলাপ, যে গোলাপের জন্য বিলাস আপনার মধ্যে দুঃখ সৃষ্টি করিয়াছিল (অবশ্য এ দুঃখের মধ্যে বিগত শতাব্দীর পূৰ্ব্বেকার রোমাটিক কবিদের চোরা-অহঙ্কার ছিল ; সে, বিলাস, ছিল না ) সে গোলাপ সম্মুখেই ক্ষুদ্র একটি শূন্যতাকে বন্দী করিয়া নির্বিবকার, বৃত্তকারে কখন বা স্রোতের মত ইহার পাশে কাহারা আসে যায়, গালে হাত দিয়া সুন্দর রূপবান বিলাস দাঁড়াইয়া কতবার সে জানালা দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়াছে, মনে হইয়াছে যে কোন মুহূৰ্ত্তেই ভোর হইতে পারে। এবং নানান দৃষ্টিকোণ হইতে এ গোলাপের রক্তিমতা অনুধাবন করিয়াছে, কখনও দূরে গিয়াছে কখনও নিকটে আসিয়াছে ; সে-শূন্যতাকে ভাবিতে চাহিয়াছে, সে গোলকবাবুর প্রস্থান কালের অন্ধকার উদ্ভাসিত করা রক্তিমতাকে ভাবিতে চাহিয়াছে, চন্দ্রমাধববাবুর কথায় উষ্ণতাকে কল্পনা করিয়াছে । বহুকাল পরে আত্মারামের ছোট রাজস্থানী আধা মৈথিলী পদ যেন তাহার মনে পড়িল “কিত্থে লু মেহেরা অর্ণব জব ঝড় পড়িয়া” হে লু তুমি কোথায় মেঘ যখন খর ধারা বরষণ করে ? তখন লু উত্তর দেয় আমি বালিকা বধুর চিরবিরহী বুকে বাসা বাঁধি দেখ না তাহার পীন ডগমগ মদমত্ত স্তনযুগ কি দারুণ রক্তিম। বিলাস অনেকদিন পর মৃত্যু হাস্য করিল। এবং এই সময় সে গোলাপের অতীব নিকটে মুখ লইয়া গিয়াছিল।

তাহার মুখ তেমনি ভাবে সেখানে স্থির, বিশাল চক্ষুদ্বয় যেন বা অধিক আয়ত হইয়া উঠিল । সে অনুচ্চ ম্যানটেল পিসের কিনারে হস্ত দ্বারা ধরিয়া আছে, তাহার চক্ষুতারকা স্থির, ক্রমে কখন যে তাহার কান প্রায় গোলাপের মুখোমুখি হয় তাহা তাহার অজ্ঞাত ; তাহার চক্ষুর তারকাকে কেহ যেমত আকর্ষণ করিল…হলের এক কোণে এবং বিপরীত কোণে বিভিন্ন কোণে তাহা ছোটাছুটি করিয়া ফিরিল । মহা বেদনায়, কিছু তাহাকে যেমন দংশন করিয়াছে—মহা যন্ত্রণায় বলিয়া উঠিল “হা ভগবান” কোনরূপে মন্ত্ৰমুগ্ধ মস্তকটি উঠাইয়া মুখ খানিক ফাঁক করিয়া বিস্ফারিত নেত্ৰে গোলাপের দিকে তাকাইল, সে স্পষ্ট শুনিল কাহার ক্রন্দনধ্বনি দুরন্ত সমুদ্রের হাওয়ায় ভাসিয়া আসিতেছে । আর বার শুনিল, একি চিত্তবিভ্ৰম ?

পুনরায় শুনিল, অতি ক্লান্ত দুঃখময় ক্ষুব্ধ, আৰ্ত্ত নিপীড়িত মৰ্ম্মাহত যে ধ্বনি, বিলাস ধীরে অতীব সন্তর্পণে এ-ক্ৰন্দনের সহিত আপনার কণ্ঠস্বর মিলাইতেই দুটি স্বর মিলিয়া এক হইল, তাহার কণ্ঠ যেন বা স্ফীত হইয়া উঠল। মহা আবেগে গোলাপকে ধরিতে গিয়া হাত ফিরাইয়া অগনিল, এবং সে নিজে এবং এ কক্ষের সকল কিছু এবং দিকসকল এই মহা করুণ ক্রন্দনধ্বনি শুনিয়াছিল ।

এ কারণে বিলাস সকালের প্রতীক্ষার কথা ভুলিয়াছিল।

সারা রাত্র ব্যাপী বিলাস এ-ক্ৰন্দন ধ্বনি মধ্যম এবং পঞ্চমে লাগিয়া যখন ভাঙ্গিয়া উঠে তখন বিলাসও তাহার সহিত রোমাঞ্চিত শিহরিয়া উঠে । কখন যে ভোর হইল বিলাস তাহা দেখে নাই ; সহসা দেখিল পূর্ব দিককার বারান্দার আরাম কেদারায় ছোট্ট একটু আলো শুইয়া আছে। আরও দেখিল নগেন তাহার প্রাতঃকালীন চায়ের সরঞ্জাম ঠিক করিতেছে। এবং আর কিছুদূরে বাবুর্চিখানার সামনে কতকগুলি লোক পাথর হইয়া আছে । বিলাসের এ-দৃশ্য ভাল লাগে নাই, আজ আর কাহাকেও ভাল লাগিতেছিল না কারণ বিগত রাত্রের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা তাহাকে অন্য আর লোকে লইয়া গিয়াছিল। তথাপি সত্বর প্রস্তুত হইয়া সে তাহাদের জন্য বারান্দায় আসিল, সমস্ত কথা শুনিয়া কহিল “বেশ তোমরা একজন খেদুড়ীর জঙ্গল যাও…চন্দ্রমাধববাবুর সঙ্গে দেখা করে যেও…” বলিয়া অতি দ্রুত চা পান সারিয়া পুনরায় গোলাপের নিকটে আসিল…।

গোলাপের ক্ৰন্দন এখন কিছুটা অস্পষ্ট, বিলাস ভাবিল হয়ত এখন দিবালোক এই আলোতে ক্ৰন্দন সম্ভবত শুকাইয়া যাইতেছে। অথচ জানালা দিয়া দেখিল আলো তেমন নাই ; এখন সারা আকাশে মেঘ । অল্প অল্প হিম হাওয়া বহিতেছে।

বৈকাল না হইতে ঘনঘটা করিয়া বর্ষণ সুরু হইল, বিলাস গোলাপটিকে নিকটে রাখিয়া প্রায় আত্মস্থ । দুর্দান্ত ঠাণ্ডা হাওয়া বহিতেছিল, বিলাস তাহার শরীরের জন্য পায়ে কম্বল ঢাকা দিয়া বসিয়াছিল, এমন সময় ভূষণ আসিয়া দাঁড়াইল, মস্তকের টোকা বহিয়া অনর্গল জল পড়িতেছে ; বিলাস প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে চাহিল, জানালার নিকট আসিয়া কহিল “কেরোসিন না হলে কাঠ ত ধরবেক
না…হুজুর”
বিলাস তৎক্ষণাৎ কহিল “দেখ্‌ টিনে…কত আছে…আর…”
ভূষণ ছাদের সিঁড়ির নীচে যেখানে কেরোসিন থাকে…সেখান হইতে ঘুরিয়া আসিয়া কহিল “আদ্‌টিন”
“মাত্র । তাহলে ?…আর এক কাজ কর-না গোলকবাবু…উঁহু…তার ত নেই লিলি কটেজ…”
“সেখানে কেউ নেই”
“তাহলে লণ্ঠন থেকে ঢেলে দেখ…আমার টর্চ আছে মোমবাতি আছে”

যখন আর একটু অন্ধকার তখন পুনরায় ভূষণ আসিল “হুজুর ও রাস্তায় অনেকটা ভেঙ্গে গেছে— আমরা কি এই বাগান দিয়ে চলে যাব…”

বিলাস তাহার করজোড়ের দিকে তাকাইয়া একবার দেখিল, এবং তৎক্ষণাৎ তাহার নিকট হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য কহিল “যাও” কেন না এত দুরন্ত আবহাওয়ায় সে ক্রমাগত ক্ৰন্দন ধ্বনি শুনিতে পাইতেছিল । শুধু ভূষণকে বলিয়াছিল “কোন শব্দ কর না” অর্থাৎ হরিধ্বনি করিও না ।
আর কিছুক্ষণ পরে বিলাস দেখিল তাহার জানালা দিয়া তিৰ্য্যকভাবে আলো আসিয়া পড়িয়াছে, এবং এবার তাহার দৃষ্টিতে পড়িল, সেই গোলাপবাগের উপর দিয়া শবযাত্রীরা আসিতেছে, শবযাত্রীদের, পথ কর্দমাক্ত হওয়ার কারণে, পা বেসামাল ভাবে পড়িতেছে, শব সমেত পা-টা কখন অন্যপাশে ঢলিয়া পড়িতেছে, সঙ্গে সঙ্গে অন্য যাত্রীর গরু তাড়ানের মত শব্দ করিয়৷ উঠে “হিরে । হিরে লে লে সামাল গো”।

এ দৃশ্যে বিলাস অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইল, যেখানে তাহার পার্শ্বস্থিত গোলাপ ফুটিয়াছে ; যেখানে
গতরাত্রে উর্দ্ধ আকাশকে দেহ এলাইতে দেখিয়াছে যেখানে…অনেক ভ্রমর গুঞ্জন করিয়াছে—তাহা অবশেষে শবযাত্রার একটি সহজ পথ হইল! বিলাস আরও আশ্চর্য্য সহকারে দেখিল শবযাত্রীরা শব লইয়া সেখানেই দাঁড়াইয়া ; ইহারই নিকটে একটি ছাতা যাহা নগেন তাহার ভ্রাতৃবধূর মৃত মুখের কিছুটা উপরে ধরিয়াছিল প্রায় তাহারই তলে দাঁড়াইয়া কি যেন কথাবার্ত্তা পরামর্শ করিতেছে। হঠাৎ উহাদের কথাবাৰ্ত্তার খানিক মন্ত্ৰমুগ্ধ বিলাসের কানে ভাসিয়া আসিল “তাহলে মাগী…ভূত হয়ে ঘুরবে…আত্মা বটে সামগ্ৰী…উয়ার পাট পর্য্যায় আছে…বল না শালা হুজুরকে…”

একবার কাঠ, একবার কেরোসিন উপরন্তু গোলাপবাগের মধ্য দিয়া শবযাত্রা, তাহার শান্তি ভঙ্গ নিশ্চয়ই এবং নবতম একাগ্রতা অনুধাবনকে ব্যাহত করে, বিরক্ত হইয়া সে জানালার কাছে আসিতেই বিদ্যুৎ চমকিয়া উঠিয়া বজ্রাঘাত হইল, চকিতে নগেনের ছাতা সরিয়া যাইতেই…ক্রমাগত বৃষ্টিধৌত একটি মুখ বীভৎস হইয়া দেখা দিল। বিলাস পুনরায় শুনিল “আত্মা বটে সামগ্ৰী” (হায় স্ত্রীলোকটির আত্মা ছিল ! )
তিন চারজন এই ঠাণ্ডা হাওয়া ও বৃষ্টিতে কাঁপিতে লাগিল, হাতগুলি জলে চুপসাইয়া গিয়াছে, কহিল “বামুন পাওয়া গেল না, আমাদের বামুন শিখরভূমে, এ বামুন যে ছিল এখন নেপাল তাঁতির ছেলের বিয়ে গেছে ফাল্গুনমাস…আত্মার…”
“আমি কি করবো”
“আত্মার”

এই অদ্ভূত কথাটা বিলাস ত্বরিতে থামাইয়া দিতে চাহিল, কেন না এই বাক্যের পিছনে বিদ্যুতের আলোক ছিল । এবং খুব শক্ত কণ্ঠে কহিল “সবাই চলে গেলে বিকালে রণধবার…”
“আজ্ঞে চাপার বাবা সব কচ্ছে”
“হুজুর মা বাপ” যে একথা বলে সে হয় ভূষণের শ্বশুর “জানি হুজুরের কষ্ট হবেক, হুজুরের শরীল গতিক ভাল লয়, হুজুর আত্মার সদগতি…পিণ্ডদান করা মুখাগ্নি…”

বিলাস গরম জামা কাপড়ের মধ্যে চমকাইয়া উঠিল ।

“আমাদের সঙ্গে পাঁজি আছে—এই আমার লাতি (অধুনা প্রায় কোপনী মত করিয়া কাপড় পরা দুই হাত বুককে বেড় করত কাধে উঠিয়া গিয়াছে ) মুখাগ্নি করবে আমরা লেখা পড়া জানি না…বাবু” বলিয়া মেঘগর্জনকে স্তম্ভিত করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, বিলাস দৃষ্টি তুলিতে পুনরায় দেখিল, নগেনের ক্রমাগত চেষ্টা সত্ত্বেও মুখখানির উপর হইতে ছাতা সরিয়া যায়, বৃষ্টি ভেজা ভারী চুলগুলি ফণার ন্যায় ফুঁসিয়া উঠিতেছে। এবং বিদ্যুতে উদ্ভাসিত জীর্ণ তাপিত মুখমণ্ডল তাহাকে যেমন বা আর এক আহ্বান করে। তবু বিলাস কহিল…“আমি ব্রাহ্মণ নই জান ত…”

“আপনি শুধু পড়ে দেবেন বাবু, হুজুর আত্মা…”

গোলাপের ক্ৰন্দন ছাড়িয়া, বিলাস ম্যাকিনটসটি তুলিয়া লইল, মাথায় টুপি পরিল ছাতা লইল । নিজের মনেই বলিল “ওখানে গিয়ে জুতো খুলব”।


ঝিনকীর ঝরনা এখন প্রমত্ত । এই ঝরণার উত্তরে যে নাবাল জমি সেখানেই দিশাড়ার শ্মশানভূমি। পাশেই অশ্বখ ও বেল এক সঙ্গেই উঠিয়াছে। বিলাস এখানে দাঁড়াইয়া প্রথমেই সমস্ত দেহ সূক্ষ্মভাবে অনুভব করে যে, এতটুকু ভিজে নাই। ভূষণের ছেলে একটি গামছা দিয়া সযত্নে কঙ্কালসার মুখখানিকে মুছাইয়া দিতেছিল, এবং ঠিক এ সময়ই মনে হইল, ওমি যদি শোনে, আর ভাবিতে পারিল না, নিজেকে খানিক সাহস দিল, যাক পোর্ট ওয়াইন খাব তাহলেই কিন্তু আশ্চৰ্য্য এতক্ষণে একবারও তাহার গোলাপের কথা মনে হয় নাই । সহসা তাহার গোলাপের কথা মনে হইল, এ কারণে যে শবযাত্রীরা কেমন একটানা স্বরে দেহেলা ধরণের গান গাহিতেছিল--
“পরান ময়নারে এ বাসা ছেইড়ে
কোত্থাকে যাও বারেবার”

বিলাস আপনার চেয়ারে আশ্রয় লইয়াছিল, সে আপনাকে শক্ত করিয়া গৃহস্থিত গোলাপের দিকে মন রাখিয়াছিল । সম্মুখের ইহজগৎ বিদ্যুতে বীভৎস ভাবে পরিদৃশ্যমান হইতেছিল, উপরে ভয়ঙ্কর মেঘগর্জন । নিম্নে ছাতার তলে রমণীর শবদেহ । বিলাস কোন দিকে চাহিবে ভাবিয়া পাইল না, একবার মনে হইল চক্ষু বুজাইলে বোধহয় ভাল হয় ।

অনেক তালপাতা কাটিয়া আনিয়া কাঠ ঢাকা দেওয়া হইয়াছে, সেগুলির উপর তুমুল বৃষ্টিধারী অদ্ভূত শব্দ সৃষ্টি করিতেছে। এদিকে দুই চারিজন অসম্ভব যত্নে কাঠ সাজাইতে ব্যস্ত ছিল, এখন চিতা নিৰ্ম্মাণ হইয়াছে। হরিধ্বনি করিয়া ভূষণের স্ত্রীকে চিতায় শায়িত করা হইল। ভূষণের শ্বশুর বিলাসকে কহিল “আস্থন হুজুর”

যন্ত্রচালিতের মত বিলাস জুতা খুলিতে যাইবে তৎক্ষণাৎ একজন আসিয়া বিলাসের জুতা খুলিয়া দিল—, বিলাসের জন্য এখান হইতে তালপত্র পাতা ছিল, বিলাস তাহার উপর দিয়া যাইবে । বিলাস তখনও চলিতে আরম্ভ করে নাই শুধু অবাক হইয়া ভূষণের মত স্ত্রী, যে ইদানীং চিতায় শায়িত তাহাকে দেখিতেছিল ; বিজুরী রেখার আলোক, তাহাকে চির হতভাগিনীকে, শুধু রাজরাজেশ্বরী নহে অপূৰ্ব্ব সুন্দরী বলিয়া মনে হইতেছিল, সে যেন বা ওমি হইতে গোলাপবাগের বেড়ার ধারে দেখা মহিলা হইতে অপূৰ্ব্ব রূপসী : একদা বিলাসের মনে হইল চিতায় শুইলে মানুষকে কত সুন্দর দেখায় ( যেহেতু তখন আকাশের দিকে মুখ করিয়া শয়ান দেওয়া হয় হয়ত ) ৷

পাঁজির নিদিষ্ট পাতার চিহ্ন হিসাবে একটি পলিতা দিয়া রাখা হইয়াছিল পাঁজি ভেজে নাই তবে বড় হিম, যে লোকটি জুতা খুলিয়া দিয়াছিল তাহার দিকে বিলাস মোজা খুলিয়া ফেলিবার নিমিত্তে পা অল্প তুলিয়া ধরিল । ভূষণ বলিল, “গরম মোজা ত শুদ্ধ না কি গো…হুজুর খুলবেন না” এ কথার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলাস তালপাতার উপর পা দিতেই পাতা-দলিত অদ্ভূত অশরীর এ শব্দ হয়—শ্রবণে বিলাস বিমূঢ় হইয়া স্থির তাহার মনে হইয়াছিল সে যেমন বা পড়িয়া যাইতেছে । তাহার এরূপ বিকার দর্শনে সকলেই এক সঙ্গে সাহস দিল, বিলাস তখনও পদক্ষেপ করে নাই এ কারণ যে বিদ্যুৎ বিভায় বীভৎস রূপ পরিগ্রহ করিয়া পৃথিবী তাহার সমক্ষে দৃশ্যমান হয়। এ দুরন্ত হাওয়া হইতে কোন মতে একটি নিশ্বাস লইয়া সে অগ্রসর হইল ।

“লে লে বস না শালা…লে ধর পিণ্ডি ধর শালা…বাবুর কত কষ্ট…লিন বাবু”

বিলাসের মন শূন্য হইয়া গিয়াছিল, কেন না তাহার অত্যন্ত প্রিয় যশস্বিনী পৃথিবী ইদানীং অপ্রকৃতিস্থ, অদূরে মৃত দেহ এবং টর্চের আলোকে নিদারুণ শ্লোক। ভূষণের বৌকে সম্মুখে রাখিয়া সমস্ত লোকচরাচর যেন একটি পলের মধ্যে মিলাইয়া গেল, তাহার বিশ্বাস হইল সেও অনেকদিন মরিয়াছে——অনেকদিন তাহার আত্মা খেইহারা ছিল । সে বন্ধুহীন । আজ তার পিণ্ড দান হইতেছে। কোন এক ভয়ে রূপবান বিলাস পাংশুবর্ণ, কে যেন ডাক ছাড়িয়া বলিয়া উঠিতেছে “মা জননী মা গো, জীবন হারাবার আগে কতবার মানুষ মরবে, বাচাও বাঁচাও।” পাঠ শেষ হয় ।

আমি…লণ্ঠনের কেরোসিনটাও ঢাল ভূষণ, টচটা থাক”
“হুজুর—”
“আমি চলে যাব—”
“সাপ টাপ—”
“আঃ—থাক”

বিলাস ঘুরিয়া দেখিল না তালপত্রের ছাউনি এই বিচিত্র চিতা কি জ্বলিয়া উঠিয়াছে। কোন ক্রমে বৃষ্টির সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে সে আপনার গৃহে ফিরিল— । মনে হইয়াছিল গভীর রাত্র, এবং কখন যে গোলাপের পাশে আপনার শূন্য মনকে বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী করিবার জন্য দাঁড়াইয়াছিল তাহা সতক স্মরণ নাই। এখন সে আর সেই সমুদ্র বায়ু দ্বারা আনীত ক্ৰন্দন ধ্বনি শুনিতে পায় নাই ; হয়ত কিছুকাল পূর্বেই প্রবল দুরদৃষ্ট মুহূৰ্ত্তের মধ্যে সে অচেতন হইয়া আছে, যেখানে সে দাঁড়াইয়া আপনাকে, আপনার সকল কিছুকে নিৰ্ম্মম ভাবে পরিত্যাগ করিয়াছে । এরূপ মনে হয় তাহার কোন বোধশক্তি নাই—ভাল মন্দ নাই । তথাপি সে, একাগ্রভাবে এ কক্ষে প্রতিটি বস্তু অবলোকন করিল, যে বস্তু সকলের অজর বাস্তবতা তাহাকে রুত্ব করে, সে দরজা দেখিল, পুনরায় গোলাপের নিকটে আপনার চিত্তকে লইয়া গেল ।

কখন মনে হয় সে সঙ্গীত অ্যাসিতেছে কখন বা মনে হয় আশ্চৰ্য্য মিথ্যা ! সে, বিলাস, দেখিল পা ঠাণ্ড ঠাণ্ডা লাগিতেছে, এইটুকু বোধকে সুচতুর বিলাস আশ্রয় করিল ; দ্রুত আপনকার শরীরের যত্ন লইতে সে ব্যগ্র হয় । সে বুঝিল সে ক্ষুধাৰ্ত্ত ! এই সূত্রেই সে মনস্থ করে কডলিভার আর এক চামচ বেশী করিয়া সেবন করিবে ।

এখন সে এই হলে আসিয়া একটু পোর্ট ঢালিয়া অল্প চুমুক দিতে কেমন যেন সাহস ফিরিয়া পাইল, চকিতে চেট্টির লিখিত এপিটাপের কথা স্মরণে আসে, যে স্মরণ এতকাল রৌদ্র আর আশা লইয়া দিনক্ষয় করিয়াছে—এবং এমত সে ভাব করিল যেন এখনি সে সেই এপিটুপি খুঁজিয়া বাহির করিবে, এবং এই মুহূৰ্ত্তে মেঘগর্জন শোনা যায়, আর তাহারই শেষে আবার সেই ধীর মন্থর মৰ্ম্মান্তিক ক্ৰন্দন ধ্বনি যাহা গোলাপের অন্তর হইতে—গোলাপ ত স্বল্পায়ু মানুষের অনন্ত সুপ্তি—এই সুপ্তি হইতে, স্থানসমূহকে আচ্ছন্ন করে । বিলাস কোথায় যেন অন্তৰ্দ্ধান করিয়াছিল ।

এখন দরজায় করাঘাত পড়িল, বিলাস যেমন চোখে প্রথম ক্ৰন্দন ধ্বনি শুনে, তেমনই আশ্চর্য্য হইয়া হয়ত বিরক্ত হইয়া দ্বারে করাঘাত শুনিল, চাপার বাবা ত চলিয়া গিয়াছে তবে শ্মশানযাত্রী ? পুনরায় করাঘাত। বিলাস অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে দরজা খুলিতেই, দূরস্থিত আলো, ছবির কাচে লাগিয়া আলোকিত করিয়াছে দেখিল, আশচর্য্য একটি চক্ষু তাহারই আশে, শিকড়াকৃতি কেশরাশি, ক্রমাগত সম্ভবত বৃষ্টিজল গড়াইয়া পড়িতেছে, যন্ত্রচালিতের মতই দরজা মেলিয়া ধরিল, এবং স্পষ্ট দেখিল, সুন্দর একটি মুখমণ্ডল, সুদীর্ঘ পক্ষ্মযুক্ত পদ্ম-পলাশ লোচন, চুলগুলি ঝুরি ঝুরি হইয়া নামিয়াছে এবং ক্রমাগত জলধারা, আর যে মেজেতে পড়িয়া জলবিন্দুর শব্দ হইতেছে। সম্মুখের রমণীর মুখখানি অল্প অল্প আন্দোলিত ।

বিলাস, নিশ্চিত ইহার জন্য প্রস্তুত ছিল না ।
“আমি এলা”
বিলাস এখনও তাহাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইতে পারে নাই, এ কারণ যে দূর কোন ঐতিহাসিক প্রাসাদের মধ্যে সে আশ্রয় লাভ করে নাই ।
রমণী কহিলেন “চিনতে পারছেন না”

বিলাস এমত জড় অবস্থাতেও আপনার মস্তক হেলাইয়া সায় দিল । পরক্ষণে সে সংজ্ঞা ফিরিয়া পাইয়া অসম্ভব আপনার করা কণ্ঠে কহিল “আরে আসুন আসুন…বেচারী আপনি ঠিক আছে… চলে আসুন কার্পেট আঃ…আর দেরী নয়…” মনে হইল সে যেন বা ওমির সঙ্গে কথা কহিতেছে ।

“সত্যি আমায় চিনতে পেরেছেন…” ঘরের চারিদিক রমণী শিশুর ন্যায় মাথা তুলাইয়া দেখিতে লাগিলেন ।
“নিশ্চয়…কথা পরে হবে…এখন…কাপড় না বদলালে আপনি ত…”
“কিছু নয় কাপড়টা নিঙড়ে নিয়ে বসে থাকব, বৃষ্টি…”
“তা হয় না…আমার কাপড় ত নেই…সবই…” এইটুকু মাত্র বলিয়া বিলাস সহসা গম্ভীর হইয়া উঠিল, এসব কথাবাৰ্ত্তা বলিতে তাহার কেমন লজ্জা হইল, প্রথমত ভদ্রমহিলা, অথবা প্রথমত সে ভদ্রলোক… । তথাপি অত্যন্ত কৰ্ত্তব্যপরায়ণ কণ্ঠে কহিল “এক কাজ করুন”, বলিয়া তৎক্ষণাৎ বাতিদানটি লইয়া পূৰ্ব্ব দিককার ঘরের দেরাজের উপর রাখিয়া যোগ করিল “পাশে বাথরুম আছে, আপনি অনায়াসে এখানে আপনার মত করে এ ঘর ব্যবহার করতে পারবেন” এবং কক্ষ পরিত্যাগ কালে মুখ না ফিরাইয়া কহিল “সত্যিই আমি বড় লজ্জিত তবু যা যা আছে আমি দিয়ে যাচ্ছি—”

বিলাস অন্ধকার হলে এক বসিয়াছিল, আপনার অজ্ঞাতসারে একবার দেখিল তাহার সুন্দর হাত ফুটিকে আরাম দিবার মানসে বাতিদানের কাচের আশেপাশে নাম উঠা করিতেছে ; বিলাস ভাবিল ভদ্রমহিলাকে একটু পোর্ট…না কোন প্রয়োজন নাই, হয়ত গর্হিত হবে ।

সে জানালায় দাঁড়াইয়া ঘোর মেঘলিপ্ত আকাশের প্রতি লক্ষ্য করে, জানালার গরাদে তাহার হস্তদ্বয় এবং সেখানেই আপনার মুখমণ্ডল স্পর্শ করত লৌহের শৈত হইতে ঈষৎ আরাম পায়, আজিকার সারাদিনটা তাহার এক ভাবে কাটিয়াছে, যেখানে সে কারণ মাত্র ; যে অহঙ্কার যে মনোভাব লইয়া ওমিকে সে চিঠি লিখিতে পারে তাহার এক কণা মাত্র অদ্য মাথাও তুলিতে পারে নাই, পিণ্ডদানের কথা মনে এতাবৎ আসে নাই, শ্লোক পাঠ কালে একদা সে ঊর্দ্ধের আকাশকে, নিঃসঙ্গতাকে শায়িত স্ত্রীলোকের মধ্যে দেখিয়াছে— সে কথা আরও স্পষ্ট করিয়া মনে হইতেছিল ।

বিলাসের এই দুর্য্যোগময়ী রাত্রের অতিথির কথা একবারও মনে হয় নাই, এ কারণে যে সে যে-সমাজে মানুষ সেখানে নারী জাতি সম্পর্কে সাধারণ লজ্জা তথা বিমূঢ়ভাব নাই যদিচ পূর্ণ ধৰ্মজ্ঞান আছে। বিলাস এখান হইতে কাহার যেন কণ্ঠস্বর শুনিল “আমার আর আলোর প্রয়োজন নেই”
বিলাস অনন্যসাধারণ লীলাময়ী প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তাহার ধারণা এ কণ্ঠস্বর ইদানীং মন্থিত ধরিত্রী হইতে আসে, অন্য কোথাও হইতে বিলাস মহাউৎকণ্ঠায় কিছুকাল কাটাইবার পর একদা তাহার খেয়াল হইল, উহা রমণীর কণ্ঠস্বর। সে তৎক্ষণাৎ ভদ্রভাবে দাঁড়াইয়া অত্যধিক সহবত সহ কহিল “না থাক আমি” তাহার শেষ কথাটা কক্ষস্থিত অন্ধকারে মিলাইয়া গেল, ইহাতে প্রতীয়মান সে স্বল্পভাষী, কিন্তু সত্যই সে সমস্যায় পড়িয়াছিল, কেন না গৃহে অন্য আলোর ব্যবস্থা আর নাই, ইহা ব্যতীত ভূষণ যে মোমবাতি কোথায় রাখে তাহা জানা ছিল না !

“আপনাকে খুব মুস্কিলে ফেলেছি”

এ কণ্ঠস্বর পুনরায় সাধারণ ভাবে আসিল না, সমুদয় দিক প্রদক্ষিণ করিয়া দূর পাহাড়ের পাশ দিয়া আসিয়া তাহার তন্দ্রায় লাগিল যেখানে দর্শক তথা শ্রোতা ব্যতীত অন্য অস্তিত্ব তাহার ছিল না, এমন কি সে ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণে আপনকার সূক্ষ্ম দেহ দিব্য কম্পন অনুভব করিত যে সে একনিষ্ঠ এরূপ নিশ্চয়তার কোন চিহ্ন সেখানে নাই । এ তন্দ্রা হইতে সে, বিলাস, পুনরায় ঘোর যামিনী আবৃত বসুন্ধরা দর্শন করিল, এবং চকিতে সোজা হইয়া পূৰ্ব্বদিককার কক্ষ অভিমুখে চাহিল।

আর কোন শব্দ নাই, মুখচোরা লজ্জা সে ঘরে যেমত বা ছাইয়া আছে । ইহার পর কুষ্ঠাবিজড়িত কণ্ঠের স্বর আসিল “কি কুক্ষণে যে শহরে গিয়েছিলুম…গরুর গাড়ীও এগোতে পারলে না…মাইল খানেক পথ হেঁটে” তাহার স্বর মসৃণ আলোর মত হলঘরে ভ্রমণ করিতে লাগিল ।
“বৃষ্টি কখন যে থামবে…”
“ব্যস্ত হবেন না”


একটি যুদ্ধ স্থিরনিশ্চয় জয়পরাজয়ের মত সময় গিয়াছে ; ভূষণের স্ত্রীর অবশিষ্ট আর কিছু হয়ত আছে, তথাপি বিলাস যেমত বা একই সময়ের মধ্যে স্থিতি লাভ করিয়া আছে, লোকগীতির মত বিলাপমুখর ক্ৰন্দনধ্বনি তাহাকে জড়ীভূত করিয়াছে, সে এখন গোলাপের নিকটেই, চক্ষু তাহার বন্ধ ছিল। গোলাপের ক্ৰন্দন ধ্বনির মধ্যে প্রকৃতির উন্মাদন শোনা যাইতেছিল, ভয়ানক বিপৎকাল সমুপস্থিত, সৃষ্টি নিশ্চয়ই হিম হইতে চলিয়াছে, কক্ষমধ্যের যাহা কিছু দুৰ্ব্বল তাহা ত্ৰাহি ত্ৰাহি করিয়া উঠে, বাহিরের মাঠঘাট লতাবৃক্ষণদি পৰ্ব্বতমালা উদ্দাম বায়ুর আঘাতে মনে হয় এখনই উড়িয়া যাইবে, মানুষকে একাকী বোধ করাইবার মানসে এ রৌদ্রকল্মা কুটিল আয়োজন । বিলাস তাহার তন্দ্রার মধ্য হইতে ভ্ৰকুঞ্চিত করিয়া এ মূৰ্খতা অবলোকন করে, এ প্রকৃতির কথা পুনরায় যখন চক্ষু বুজাইয়া স্মরণ করিয়াছে তখনই এ-হলঘর আলোয় থৈ পাইল ।

গোলাপের পাশ দিয়া দেখিল, পূর্ব্বদিকের দরজার চৌকাঠে রমণী দণ্ডায়মান, হস্তে বাতিদান ছিল, তাহার অজস্র চুলগুলি দুই পাশ বহিয়া নামিয়া গিয়াছে। এ এক আধুনিক চিত্র । বিলাস তাহাদের রীতি অনুযায়ী সচেতন হইয়া সসন্ত্রমে অভিবাদন করা থাক সে গ্রাম্য চোখে সবিস্ময়ে চাহিয়া ছিল ; তাহার, বিলাসের, দেহে শবযাত্রার , ক্লান্তি ছিল, গোলাপের আশ্চর্য্য ছিল ।

রমণীর চিত্রের ন্যায় রূপ তাহাকে বিমোহিত করে । কেন কি কারণে সহসা তাহার বোধ হইল,
বাহিরে যিনি ভয়ঙ্কর সংহার মূৰ্ত্তি ধারণ করিয়া ক্রমাগত বজ্রাঘাত হানিতেছে ইদানীং বাতিদান লইয়া দরজায় প্রতীয়মান। অদ্যকার ঘোর প্রকৃতি আর এক প্রকৃতিকে এখানে আনিয়াছে। দরজার চৌকাঠ হইতে তিনি কহিলেন “যদি এ ঘরে আসি”
“নিশ্চয়”

টেবিলের উপর বাতিদান রাখিয়া রমণী বসিলেন, পরনে এখন ওমির শুদ্ধ কাপড়, যে কাপড় পরিয়া ওমি ঁকাল ভৈরব দর্শন করিতে যায় ; রমণীর প্রতি বিলাসের অসম্ভব শ্রদ্ধা আসিল, এবং আপনার হাতখানি বক্ষে ও কপালে স্পর্শ করিয়াছিল ।

রমণী মৃদু হাস্য করিলেন । “আপনার মনে পডে যেদিন আমি…প্রথম বেড়ার ধারে…”
বিলাস এখনও গোলাপের নিকটেই, সে কোন প্রকারে উত্তর করিল “হ্যাঁ হ্যাঁ” তাহার উত্তর ভদ্রমহিলাকে সে ক্ষুব্ধ করিয়াছে তাহা সে বুঝিল, কেন না রমণী আপনার গর্ব্বিত মুখখানি তুলিয়া তাহাকে দেখিয়াছিল । সে ত্বরিতে আপনাকে সামলাইবার জন্য কহিল “আমার মনটা শ্মশানে পড়ে আছে…ভূষণ আমার চাকর…”

তাহার কথা শেষ হইতে না দিয়া কহিলেন “মনে পড়ে সেদিন গোলাপ-বাগানের বেড়ার ধারে” এই উক্তিতে এইরূপ মনে হইল, বিলাসকে তিনি ক্লান্ত দেখিতে চাহেন না, অথবা ‘শ্মশান’ শব্দটি
তাঁহার খুব প্রতিপ্রদ নহে ।

“ও আপনি মনিক চ্যাটার্জ্জি” বলিয়া বিলাস তাঁহার সুন্দর কপালের দিকে লক্ষ্য করিল । এ-কপালে একটি তারা আসিয়া দেখা দিতে পারে।

মনিক বিলাসের সম্বিৎ লাভে অত্যন্ত আমোদ পাইলেন এবং ভদ্রতা করিয়া কহিলেন “খুব বিরক্ত করছি আপনাকে, আপনি সত্যিই যথেষ্ট ক্লান্ত…”

“ও ডিয়ার না” এরূপ ধরণের সম্বোধন তাহার ওমির সহিত করিয়া অভ্যাস, ফলে সে সত্যই লজ্জিত হয় এবং ভুল সংশোধনের নিমিত্ত কহিল “অত্যন্ত দুঃখিত, আপনি…” বলিয়া সে যে কি বলিবে তাহা ভাবিয়া পাইল না, তাহার জড়ীভূত তন্দ্রা উধাও, এবং সত্বর আপনকার ইদানীং অভিজ্ঞতার কথা বলিয়া চলিল “আমার মন বড় এলোমেলো হয়ে আছে জানেন, আজকে মানে
গতকাল রাত্রে যখন— আপনার আমার কথা…”
“খুব ভাল লাগছে…তবে শ্মশান শুনলে বড় ভয়”
“আমি গোলাপের কথা…বলব”
“আঃ গোলাপ, . .”
“Rose is a cure.”
“তাই না ?”

এখন বিলাসের দৃষ্টি তাহার, মনিকের, সুন্দর সুলক্ষণা কপাল হইতে ভ্রূ-যুগলের বেড়া আপনার অজ্ঞাতসারে পার হইয়া কালো দুটি চোখের উপর থামিল, তাহার কণ্ঠস্বরও থামিয়া ছিল, মনিকের চোখের তারা ঈষৎ চঞ্চল হইতেই বিলাস অনর্গল বলিয়া চলিল, এখন তাহার স্বর নামিয়াছে এবং ক্রমে ক্রমে সে কহিল “গতকাল সেই গোলাপ ফুটল, আনন্দে আমি এমন হয়েছি…দেখুন” বলিয়া আপনার হাত মেলিয়া ধরিল, মনিক কিন্তু সে হাতের দিকে চাহিল না, তখনও সে বিলাসের মুখের দিকে অনিমেষে চাহিয়া আছে…বিলাস আরবার অনুরোধ করিল “দেখুন হাত” এবং পরক্ষণেই হাত সরাইয়া ইঙ্গিত করিল এই সেই গোলাপ, যে লাল চেয়েছিলুম সে লাল হয়েছে কি না তা আমার দেখা হয়নি কেন জানেন…”

মনিক শিশু হরিণের মত তাহার দিকে তখনও চাহিয়া আছেন ।

“ও ডিয়ার আমার কথা…” এই কথার ‘ডিয়ার’ শব্দটি বিলাসের আপনার কানে যায় নাই ।
মনিকের কণ্ঠস্বর ছিল না, তিনি শুধুমাত্র মুখখানি আন্দোলিত করত এ কথা প্রকাশ করিলেন যে তিনি শুনিতেছেন ।

“যখন আনলুম খুব আশ্চর্য্য হয়ে দেখেছিলুম, হঠাৎ শুনলুম এর মধ্যে কান্নার ধ্বনি…”
এ কথা শ্রবণমাত্রই মনিক একবার সূক্ষ্ম নিমেষেই স্ফীত হইয়া উঠিলেন, তাঁহার সোনার শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল, তিনি চেয়ার হইতে আচন্বিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিলেন “তাই…”
“এ কান্নার ধ্বনি মনে হয় বহুদূর কোন দেশের সমুদ্রের হাওয়ায় কব আসছে”
“ও না আমাকে পাগল করবেন না…”
“সত্যি আপনি, শুনবেন…”
“আমার বড় ভয় করছে, আমার বড় ভয় করছে”
“ভয় কি, আমি ত আছি”

চেয়ার ত্যাগ করিয়া এক পা অগ্রসর হইয়া থমকিয়া স্থির, নিশ্চয়ই তাঁহার মনে হইয়াছিল যেন কোন এক অন্ত দেশে, বড় আদরের চিরপরিচিত রাত্রিদিন ফেলিয়া চলিয়া যাইতেছেন । তাঁহার অঞ্চল খসিয়া ধূলায় পড়িয়াছিল। তিনি যেমত বা এইটুকু পথের মধ্যে ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, নিদ্রার মধ্য হইতে কহিলেন “কোন দিকে যাব—কোন দিকে যাব…” এ জিজ্ঞাসা এ কক্ষের দিকসমূহে বাজিতে লাগিল, যেমন বা মনিক অন্ধ ।

বীরের মত বিলাস উত্তর করিল “এই যে—গোলাপ”

রূপার সেখীন আধারে গোলাপ, অনাদি অনন্ত কালের মধ্যে মানুষের প্রতিভা যথা মনিক ত্রস্ত অবস্থায় দুটি হাত দুপাশে মেলিয়া, ক্রমে আসিয়া থ, আপনার স্বগীয় সুষমাদীপ্ত মুখমণ্ডল, গোলাপের অনতিদূরের শূন্যতার উপর দিয়া বুলাইয়া দিল, আর একবার বুলাইবার সঙ্গে সঙ্গে কি যেন শুনিতে পাইল—হয়ত এসময় গোলাপক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া বিলাস যে ভূষণকে বলিয়াছিল “কাঁদতে বলো” সেই আজ্ঞাটা এখানে ধ্বনিত হয়—মনিক শুনিবামাত্রই সূক্ষ্ম চতুর নৰ্ত্তকীর মত (কিম্বা বাণবিদ্ধ নিরীহ জীবের মত ) নিমেষেই, ঝাঁটতি, চকিতে গোলাপের নিকট হইতে অনিন্দনীয় ভঙ্গী সহকারে, হলের এক কোণে, এক পা মেলাইয়া দিয়া হস্তদ্বয় শেল্পের নিকটে রাখিয়া, অসম্ভব ভাবে স্থির করিয়া এখন, “আঃ” বলিয়া মহা যন্ত্রণায় মাথা তুলাইতে লাগিল । সেখানে বাতিদানে আলো নাই, আঁধার নাই । এবার মনিক ক্রমে মৎস্যের মত বাঁকিয়া উঠিলেন । এবং সেখান হইতে যে দৃষ্টিতে চাহিলেন তাহাতে সেই পুরাতন উপলব্ধি ছিল, ঝিনুকের বাস্তবতা, বিদ্রোহের রক্তিমতা—তিনি বক্ষের নিকটে হাতের উপর হাত রাখিয়া কহিলেন “আমি শুনেছি আমি শুনেছি” ইহার পর আপনার আঙুলের উপর ভর দিয়া আসিয়াই আপনাকে ঋজু করিয়া দণ্ডায়মানা করিয়া কহিলেন “সেদিন সকালে হায় আমার নিশ্বাস পড়েছিল তোমার গোলাপের উপর…গোলাপের উপর…”

রূপবান বিলাস তাঁহার বাক্যে ঘৰ্ম্মাক্ত হইয়া গেল। শ্লোক উচ্চারণের সময়ের বন্ধন হইতে তাহার যেন মুক্তি হইল। তথাপি মনে হইল, ট্রাজেডীর অভিনেতার মত তাহার পায়ে বুট—সে যেমন বা আরও দশাসই—এ কারণে যে মনিক পালকসদৃশ কতিপয় অপসরাব ভূমিকা একাই গ্রহণ করিয়াছেন, সৰ্ব্বক্ষণ, এতাবৎ কোরাসের ধরণে সকল কথা প্রকাশ করিয়াছেন! সহসা, আপনিই যেমত বা বিদ্যুৎ, ভয়ঙ্কর ভাবে চমকাইয়া ব্যক্ত করিলেন “আমার মা পাগল ছিলেন আমার মা পাগল ছিলেন”
এই উক্তিতে একদা গোলাপটি দেখিয়া অন্যবার বিলাস জানালা দিয়া অস্থির উন্মাদ লোকচরাচর অবলোকন করে, অনুধাবন করে ।

মনিক, এখন, আপনার শুদ্ধ বস্ত্রের দিকে চাহিয়া বৎসহারা গাভী যেমন দিশাহারা তেমনি এক ভাবকে আপনার সুদীর্ঘ কেশরাশিতে যাহা এখন শীতল— হাত দিয়া শান্ত করিতে করিতে কহিলেন “আর নয়…আর নয়…আমি বাড়ী যাব বাড়ী যাব” বলিয়াই ঝটিতি পূর্ব্বদিককার কক্ষে বাতিদান লইয়া অদৃশ্য । বিলাস ইদানীং অন্ধকারে দাঁড়াইয়া কহিল “দুর্য্যোগ এখনও আছে…কেমন করে যাবেন…” ইহার পর অনুচ্চ কণ্ঠে শ্রদ্ধায় বলিয়াছিল “গোলাপ সুন্দরী”

যদিচ বিলাসের স্বর অনুচ্চ ছিল, তবু তাহা হাওয়ায় পূৰ্ব্বকক্ষে ধ্বনিত হইল, সেখানে কাহার, নিশ্চয়ই সুন্দরী মনিকের পদক্ষেপ বৰ্দ্ধিত হইল, অভিমান নিঃসন্দেহে আলোর সামনে “কেন
সে-কথা বল নাই ?” তারপর শান্ত ।

বিলাস আশ্চর্য্য হয় যে, সমস্ত ঘর ভরিয়া ক্ৰন্দন ধ্বনি ঝঙ্কার দিয়া উঠিতে লাগিল । হয়ত তাহার এ ধারণা হয় যে, গোলাপ সুন্দরী কাঁদিতেছেন আর যে সেই ঝঙ্কার অন্ধকারকে আরও নিবিড় গৃঢ়তর করিতেছে, যেখানে দাঁড়াইয়া শুধু মাত্র ‘জগৎজননী মা ব্ৰহ্মময়ী’ বলিয়া খেদোক্তি করা বিধেয়।


বিলাস এখন আপনার ঘরে জানালা খুলিয়া দাঁড়াইয়াছিল। এমত সময়, প্রবল মেঘ-ঘর্ষণ শুনিল; সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরাইয়া দেখিল যেটুকু আলো ছিল তাহাও নাই এবং কে যেন ত্ৰাসে ভয়ে এইমাত্র দ্রুতপদক্ষেপে যাওয়া-আসা করিতেছে। যে দরজাকে সে একদা ভয় করিয়াছে সেই দরজার দুই পাশ ধরিয়া দাঁড়াইল। বুঝিল মনিক এই অন্ধকারে ঘুরিয়া বিভ্রান্ত হইতেছেন, আর যে তিনি ভীত কণ্ঠে কহিলেন “আলো নিভে গেছে"। বিলাস এ কথায় এক মুহূৰ্ত্ত দেরী করিল না, দেশলাই খুঁজিতে লাগিল| আঁধারে আর এক নিদ্রিত অবস্থা, অন্ধের মত হস্তদ্বারা সমস্ত বস্তু স্পর্শ করিতে করিতে চলিয়াছে, অনেক দূর, না অনেক সময়ের পারে সে গিয়াছে, ইতিমধ্যে একবার মনে হইল মনিকও দেশলাই খুঁজিতেছেন। এইভাবে খুঁজিতে খুঁজিতে যে হাতে বিলাসের একদা কাঁটা ফুটিয়াছিল, যে হাতে গ্ৰন্থ ধরিয়া শ্লোক পাঠ করে, সেই নিমিত্তমাত্র হাতে, উষ্ণতার স্পর্শ লাগিল মানবীর দেহ অথবা নিঃশ্বাস! বাষ্পসম্ভূত মেঘ, মেঘ উৎপন্ন আলোকে...ভাস্কর্য্যের বিপুলতা বিলাস দেখিল। এইটুকু দেখা লইয়া তাহার মনে হয় যে ঘুম ভাল। 

“আমাকে ছেড়ে যেও না...আমি ভীত” এবং ইহার পর মাথা নত করিয়া মনিক বলিতে চাহিয়াছিলেন যে শুদ্ধ বস্ত্ৰ পরিবর্ত্তনকালে আলো নিভিয়া যায় ফলে. ..। 

মনিকের কথার উত্তরে বিলাস গভীর কণ্ঠে বলিল “গোলাপ সুন্দরী ” এ কথা সত্যই অনুক্ত ছিল, সে কেবল মাত্র তাহার দিকে চাহিয়াছিল। পুনরায় মনিকের কণ্ঠস্বর “গোলাপের মধ্যে আমারই ক্ৰন্দন..যে কান্না আমি বহুকাল ধরে কাঁদছি। তোমাকে আমি."

ইহার পর-মুহূৰ্ত্তের জন্য দুজনকে পরাজিত করিবার চেষ্টা করিল, একে অন্যের দেহের সুমধুর

আনন্দধারা নিঃশেষ করিয়া শুষিয়া লইতে চাহিল। সহসা অশরীরী বজ্ৰাঘাতে দুইজনেই বিক্ষিপ্ত হয়। সহসা যেমত পাখী ডাকিয়া উঠিল, লজ্জা আসিল। বিলাস চকিতে উঠিয়া শায়িতা বিপুল রমণীকে দেখিয়া যেন শিহরিয়া উঠিল। সত্বর সে কক্ষ ত্যাগ করে। হলে আসিয়া যেখানে সে হাত রাখিল সেখানেই দেশলাই ছিল, বাতি জ্বালিয়া সে মাথায় হাত দিয়া বসিয়াছে। এমত সময় তিনি, মনিক, এই আলোতে আসিয়া এমন প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে চাহিলেন যাহার অর্থ “আমি কি অপূৰ্ব্ব সুন্দরী নই, গোলাপ সুন্দরী নই ” মনিক পুনরায় তাঁহার হাত ধরিল, বিলাস আপনার কথা স্মরণ করিয়া তাঁহার দিকে লক্ষ্য করিল, নিরাভরণ দেহের সমস্ত রোমকৃপ দিয়া মহা উল্লাস নিঃসৃত হইতেছে।

বিলাস যেন কহিল “বেশ, এখানে দাঁড়ান” বলিয়া সে তাঁহাকে মৰ্ম্মর মূৰ্ত্তির ভঙ্গিমায় দাঁড় করাইয়া ড্রয়ার খুলিয়া মোহিতদার জন্য রক্ষিত সিগারেটের টিন কাটিয়া, সিগারেট ধরাইয়া, অনিমেষ নেত্ৰে তাঁহাকে যেমন বা অনুসন্ধান করিতে লাগিল। মনিক আপনার পদদ্বয় ঈষৎ বিভক্ত করিয়া দুই হস্তে সমস্ত কেশরাশি ধরিয়া স্থির। সিগারেট ফেলিয়া ঝটিতি বিলাস তড়িৎ বেগে তাঁহার নিকটে গিয়া একটি নিঃশ্বাস ফেলিল। তাহার স্পর্শে মৰ্ম্মর মূৰ্ত্তিও রক্তমাংসের দেহ পরিগ্রহ করিল। মনিক অদ্ভুতভাবে হাসিলেন।

“এখন ঘুমান যাক।”

“পৃথিবীতে কি ঘুম আছে"

বিলাস এই জাড্যবিজড়িত উক্তিতে বিছানায় উঠিয়া বসিল--বহুদিন পূৰ্ব্বে যে এপিটাপ তাহার--স্কাঁরোর লিখিত--মুখস্থ ছিল যাহা সে ভুলিয়াছিল তাহা স্মরণে দ্বিপ্রহরের চেতনা হইতে রাত্রের চেতনা পারাবারের মধ্যে জাগিয়াছিল—আসিল “পথিক শব্দ করিও না। কারণ এই প্রথম রাত্রে স্কাঁরো ঘুমায়”।

“ওঠো” মানিক কহিলেন।

‘হল-ঘরে’ বলিয়া শ্লথপদে ক্লান্ত বিলাস তাঁহাকে অনুসরণ করিল।

দুজনে এখানে আসিয়া স্তম্ভিত, বিলাস সম্পূর্ণ শান্ত, গতিরহিত--কিন্তু বিলাস অত্যন্ত আধুনিক, একটু পোর্ট ঢালিয়া, সিগারেট ধরাইল, এবং মনিককে নিরীক্ষণ করিতে করিতে সিগারেটটি তাঁহার হাতে দিয়া কহিল “প্লিস আমার দিকে চাও...মানে তাদের মত করে অর্থাৎ,...”

মনিকের নিকট হইতে যাহা সে আশা করিয়াছিল, অর্থাৎ বেশ্যার মত তাহাকে প্রলুব্ধ করিবে তাহা শতগুণ সে পাইল, মনিক আশ্চৰ্য্যভাবে সিগারেট ধরিয়া এক মহাৰ্য্য আবেশে আপনাকে পূর্ণ করিলেন, এখন স্তন বহিয়া সিগারেটের নীল ধোঁয়া ছত্রাকার হয়...কেমন একভাবে মনিক—যিনি সুন্দরী সুলক্ষণা--আপনার জঙ্ঘায় জঙ্ঘায় সশব্দ আঘাত করিলেন যে অধুনা ধৰ্ষিত পৃথিবীর মেরু পৰ্যন্ত কম্পিত হয়, আর যে তাঁহার সুরম্য উরু যুগকে আশ্রয় করিয়া আলো উঠা নামা করে।

ক্লান্ত বিলাসও অস্থির।

ভোর যখন হইল, তখন বিলাস দেখিল, মনিক নাই। শুদ্ধ বিছানায় বিশেষত বালিশে ওলিভ কুঞ্জের রাত্রির ছাপ—পোর্টের মাত্রা আধিক্যে যাহা সে বুঝিতে পারে নাই। ত্বরিতে উঠিয়া সে দক্ষিণের ঘরে গিয়া আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইল । তাহার মুখ বহিয়া পুনরায় রক্ত আসিল । এক মুহূৰ্ত্ত সে স্থির থাকিতে পারিল না। একবার চন্দ্রমাধববাবুর সহিত দেখা করার কথা মনে করিতেই ভয়ে সে, বিলাস, আকাশের মত হয় ।


অনেকদিন পার হইয়াছে ।
স্যানাটেরিয়ামের খাটে এখন সে শুইয়া, এইমাত্র রঙ্গস্বামী চোরা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া চলিয়া গেলেন। বিলাস আপনার মনকে দৃঢ় করিয়া ফেলিয়াছে, সে ধীরে বালিশের তলা হইতে চেট্টি লিখিত এপিটাপ বাহির করিয়া খুলিতে যাইবে…যে এপিটাপে লেখা ছিল--
“চল যাই—পৰ্ব্বতের শৃঙ্গে, যেথা
পার্পাল কবরী বাঁধে,
প্রত্যুষের প্রথম সূৰ্য্য,
তোমাদের শব্দ যেথা বর্ণ হয়ে যায়
সঙ্গীহীন ভালবাসা
হেম অন্ধতায়— “

এমত সময় একটি টাইপ করা চিঠি আসিল, এখন সে চিঠি খুলিল ।

চিঠিতে সনিৰ্ব্বন্ধ অনুরোধ ছিল, এবং গোলাপ সুন্দরীর খবর ছিল, যে তিনি একটি পুত্র রাখিয়া মরিয়াছেন । আঃ মনিক ! একবার বিলাসের মনে হইল, যাঁহাকে সে প্রথমে পবিত্র শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান নিমিত্ত দেয়, তিনি বলিয়াছিলেন “আমার মা— পাগল ছিলেন” এবং একথা শ্রবণে তখন সে, বিলাস, বাহিরের মহাপ্রলয় দেখে ।

বিলাসের নিশ্বাস দুৰ্ব্বল হইয়া আসিয়াছিল তথা আর কয়েকটি নিশ্বাস মাত্র সম্বল এ কারণে দীর্ঘ নিশ্বাস তাহার ছিল না। শুধু ইতিমধ্যে, সম্ভবত, মনে হইল মৃত্যুকে অমোঘ করিবার জন্য পুনরায় সে শিশু হইতেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন