বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

মোঃ জাকির হোসেন'এর লেখা : আমার ভিতরে বাহিরে


অন্য আয়নায় দেখা ----


নিজের কথা নিজে বলাই আত্মকথা| তবে অন্তর্দৃষ্টি প্রখর হলে, কোনো কোনো নিবিড় পর্যবেক্ষণে অন্যের বলাও 'আত্মকথা' হয়ে যায়| ...পাঠক পড়লেই বুঝবেন, 'কখন' এবং 'কেন' এমন হয়| পড়ুন ফারহান আরিফ নাফি'র অন্যরকম এক আত্মকথা "আমার ভিতরে বাহিরে"| পুত্রের 'ভিতর-বাহির' দেখেছেন এবং লিখেছেন পিতা মোঃ জাকির হোসেন...


আমার ভিতরে বাহিরে 

(আত্মকথাঃ ফারহান আরিফ নাফি)



এক।।

ছেলেটাকে দেখেই চিনতে পারলাম। আমার চুল দাড়ি কাটতে এসেছে। খুবই খারাপ একটা সময় এটা। বুঝতে পারছি- দীপু পাপা এই ছেলেটিকে বাসায় নিয়ে এসেছে। ছেলেটার নাম রাম। তার বয়স আমার চে’একটু বেশী হতে পারে। রামের নিজের সেলুন আছে এই পাড়াতেই। তার সেলুনে প্রথমবার যখন চুল দাড়ি কাটতে যাই, অন্যদের মত সেও আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। রাম কথা খুব কম বলে। সে কোন কথা না-বলে চুল কাটতে শুরু করেছিল। তার সেলুনটা যথেষ্ট বড় নয়। বরং খুবই সংকীর্ণ জায়গায় দু’টো চেয়ার রেখে, কোন রকমে কাজ চালিয়ে নেয় রাম। ছাদটা একেবারে নিচু। আমি লম্বায় ৫ফিট ৮ইঞ্চি। দাঁড়ানো অবস্থায় আমার মাথার সোজা- মাত্র ৯ইঞ্চি উপরেই, একটা তিন পাখাওয়ালা ফ্যান ঘুরছিল বিপজ্জনকভাবে। চুল কাটা শুরু করেছিলাম তাই- অনেক অস্বস্তি নিয়ে। আর এই অস্বস্তির কারণেই আমার চুল কাটার সিকোয়েন্সগুলো দ্রুত শেষ করতে চাইছিলাম। আমাকে দেখে অবশ্য বোঝার কোন উপায় ছিল না ভিতরে-ভিতরে কী তীব্র একটা অস্বস্তিতে আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। সিকোয়েন্সের ২য় অংশ হলো- আমার বগলের চুলগুলোকে কেটে ফেলে পরিস্কার করা। রাম বুঝতে পারছিল না আরো তাড়াতাড়ি সবকিছু শেষ করতে হবে। আমার ইন্দ্রিয়গত সংবেদনশীলতার কারণে, সাধারণ মানুষের চাইতে অনেক বেশী মাত্রায় তথ্য আমার মস্তিষ্ক গ্রহণ করে থাকে। যা বেশীর ভাগ সময়েই আমাকে স্বাভাবিক মানুষের মত চিন্তা এবং চলাফেরায় বাধাগ্রস্থ করে। এ’কারণেই আমার মনের অতিচেতনার অংশ বলছিল এটা খারাপ জায়গা। একটা বিপদ হতে পারে এখানে। তাই দ্রুত আমাকে সবকিছু শেষ করে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সে’কথা আমি কাউকে বোঝানোর চেষ্টাও করতে পারি না। কারণ, কারো সাথে কিভাবে যোগাযোগ করতে হয়- আমি সেটা পারি না। জানি না- ঠিক কিভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে কথার মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে। আমার একেকটা অনুভূতি অন্যান্য নানা ধরনের অনুভূতিগুলোর ভিতর দিয়ে ঠেলাঠেলি করে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু ট্রেনের মত লাইনচ্যূত হয়ে, প্রতিটা অনুভূতিই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অনুভূতির সাথে।অবশেষে আমার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে ভিন্ন কোন শব্দ হয়ে- যার কোন অর্থ হয় না। কিন্তু আমি বোবাও নই! বোবা মানুষগুলো সাধারণতঃ বধির হয়ে থাকে। আমি বধির তো নই-ই, বরং সাধারণ মানুষদের তুলনায় আমার শ্রবণেন্দ্রিয় অনেক বেশী মাত্রায় সংবেদনশীল। অনেক সূক্ষ্ণ শব্দও আমি শুনতে পাই। শব্দ শুনেই বুঝতে পারি- সারা বাড়িতে কোথায়, কে কী করছে। কিন্তু তীক্ষ্ণ শব্দ এবং উচ্চ শব্দ আমার কাছে ভীষণ পীড়াদায়ক অনুভূত হয়। এ’জন্যে আমাকে সারাক্ষণ দু’কানে আঙ্গুল দিয়ে চলাফেরা করতে হয়। তবে, এ’সবের মানে এই নয় যে আমি কিছু বুঝি না। কিংবা একেবারে কিছুই বলতে পারি না, তাও নয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আমার দৃষ্টিভঙ্গি সবার থেকে আলাদা। আমি হয় চুপ হয়ে থাকি অথবা আমার সেই অদ্ভূত-ভিন্ন শব্দগুলোকেই বারবার প্রকাশ করতে থাকি। এটা বেশী করি- যখন আপন মনে থাকি। এবং এটা অনেকটা ঠিক নিজেকেই নিজে শোনানোর মত। তাই- আমি অন্যদের মত বোঝাতে পারি না- আমি কী ভাবছি। আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয় নিজেকে বোঝানোর জন্যে। 

কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সেলুনের তখনকার মুহূর্তটা আমার কাছে তীব্র পীড়াদায়ক মনে হচ্ছিল। ভুলে গেলাম মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানের কথা। ফলে, চুল কাটা শেষ হওয়ার আগেই আমার বগল পরিস্কার করানোর জন্যে দুম করে উঠে দাঁড়িয়ে সিকোয়েন্সের ২য় অংশটাও শেষ করতে চাইলাম। আর, উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই এবং কেউ আমাকে বাঁধা দেবার আগেই, যেই মাত্র আমি আমার ডান হাতটা উঁচু করেছি ঠিক তখনই ঘটে গেল দুর্ঘটনাটা। মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানে আমার হাতটা প্রচন্ড জোরে একটা বাড়ি খেল। সংগে সংগে বেশ জোরে একটা শব্দ হলো। চোখের পলকে একসাথে ঘটে গেল অনেক কিছু। ফ্যানটা আমার হাতের ধাক্কায় একমুহূর্ত থেমে থেকে আবারও ঘুরতে শুরু করলো এবং সেই সংগে দোলনার মত দুলছেও। রাম ছেলেটা ভয়ের চোটে এক দৌড়ে সেলুনের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো। তার চোখে মুখে আতংক। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দীপু পাপা দ্রুত আমার হাতে কোথায় ব্যথা পেলাম এবং আমি কেমন বোধ করছি- আমার হাত আর মুখ দেখে সেটা বুঝতে চেষ্টা করছে। না, কোন রক্ত বের হয়নি। আসলে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে, আমার আর কোন ভাবান্তরও হয়নি। চুপচাপ প্রতিক্রিয়াহীন মানুষের মত বসে আছি। আমার মন তখন শান্ত-দীঘির পানির মত শান্ত। আসলে এ’ ধরনের আঘাতে অন্য যে কোন সাধারণ মানুষের মত প্রতিক্রিয়া আমার হয় না। আমাকে নির্বিকার দেখে এবং রামের আতংকিত মুখ দেখে দীপু পাপা হেসে ফেললো। সেটা কিন্তু তার কৃত্রিম হাসি ছিল! এরপর, হাসিমুখে রামকে বললো- ‘আরে কিছুই তো হয়নি। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? ফ্যানের সাথে সামান্য একটা বাড়ি খেয়েছে শুধু- আর কিছু না। আসো, আসো।’ রাম এলো এবং ভয়ে ভয়ে সে কাজ শুরু করলো- যেখানে শেষ করেছিল, সেখান থেকে। ঐ সেলুনটাই ছিল এখন পর্যন্ত আমার শেষ সেলুন। আসলে এরপর থেকেই চুল কাটানোর জন্যে দীপু পাপা আমাকে নিয়ে আর কোথাও যায়নি। আজ আমার চুল কাটার দিন। তাই রামকেই বাসায় আনা হয়েছে। রাম যখন এলো তখন সময়টা প্রায় শেষ বিকেল। একটু পরেই ঝুপ করে বাইরে অন্ধকার নামবে। কাল দুপুর থেকে মোট তিনবার, আমার মানসিক প্রস্তুতির জন্যে দীপু পাপা আমাকে বুঝিয়েছে আজ আমার চুল-দাড়ি কাটা হবে। ঐ ঘটনার পর থেকে গত কয়েক মাস যাবৎ আমার চুল কাটানোর কাজটা বাসায় করানো হচ্ছে। 

রামের সেলুনটা ছাড়াও আমাদের এই পাড়ায় আরো একটা সেলুন আছে। সেটা বেশ সুন্দর এবং বড়। কিন্তু সেটায় আমার চুল কাটতেই চায়নি। এবং প্রথমবারেই দেখেছিলাম- সেলুনের চুল কাটানোর লোকটা আমার দিকে বেশ তাচ্ছিল্য করেই তাকিয়েছিল। দীপু পাপা সেটা ঠিকই ধরতে পেরেছিল। দীপুর ভাবনাগুলো আমি বেশ বুঝতে পারি। তখন তার কী রাগ! রাগে গজ্ গজ্ করতে-করতে সেলুনের লোকটাকে বারবার ছাগল বলছিল। লোকটা অবশ্য সেটা শুনতে পাচ্ছিল না। আরেকটা সেলুন ছিল- বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেটাতেও আমার চুল কাটতে চাইতো না। সেই ছেলেটাও প্রায় আমার বয়সী ছিল। তার চোখ দেখেই বুঝতাম- সেও তাচ্ছিল্য করতো আমাকে। বিশেষ দয়ায় সে দু’বার চুল কেটেছিল। তৃতীয়বার কোন কারণ ছাড়াই, আর কাটতো চাইলো না। ফিরিয়ে দিল আমাকে। দীপু পাপার মুখটা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম- সে তীব্র রাগ আর অপমান বোধ করেছিল। এবং আমার তখন মনে হয়েছিল পাপা যে কোন খারাপ কিছু করে ফেলতে পারে। আবার ভাল একটা সমাধানও করে ফেলতে পারে। যেটা ভাল হবে- ঠিক আমার জন্যে। সে অবশ্য ভালটাই করে বেশির ভাগ সময়ে। কিন্তু খুব খারাপ দেখাচ্ছিল দীপু পাপার মুখটা সেদিন। লুকাসের মোড়ের সেলুনটাও আমার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে দ্বিগুন টাকা চেয়েছিল। অথচ অন্যদের চে’ আমার চুল কাটানোয় ঝামেলা অনেক কম ছিল। আমার স্পর্শকাতর ত্বকের কারণে গায়ে কোন কাপড়, যার উপরে কাটা-চুল পড়বে, তেমন কিছু জড়াতে পারি না। তাই নিজের পোশাকের ক্ষেত্রেও, বিশেষ ধরনের নরম কাপড় (knit fabric) ছাড়া অন্য কোন ধরনের কাপড় ব্যবহার করি না। ফলে, সেলুনে এলে, খালি গায়ে চেয়ারে শুধু বসে পড়লেই হলো। 

আমার চুল ছাটা, বগল পরিস্কার এবং শেভ- এই তিনটি কাজ অনেক কম সময়ে এবং কম ঝামেলায় শেষ হয়ে যায়। তবু তারা অনেক বেশী টাকা দাবী করেছিল- আমাকে তাদের বিশেষ দয়ায় চুল কেটেছিল বলে। দীপু পাপা সেটা দেয়নি এবং রাগের চোটে ওদের ওখানে আমাকে নেয়া বন্ধ করে দিল। আমাদের গলির এই বড় সেলুনটা আমাকে তাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দিলেও, আমি জানি- দীপু এবার নাছোড় বান্দার মত লোকটাকে নিয়ে ভাবতে থাকবে। ভেবে একটা সমাধান ঠিকই বের করে ফেলবে। ইতমধ্যে আমার চুল-দাড়ি বিশ্রী রকমের বড় হয়ে গেছে। সারাদিনই খুব অস্বস্তি বোধ হয় সে’ জন্যে। এর বেশ ক’দিন পরে, প্রথমবারের মত, পাড়ার নতুন বড় সেলুনটায় চুল কাটতে পেরেছিলাম। রাগ আর অপমান চেপে রেখে, খাতির জমাতে গিয়ে দীপু পাপা অনেক কথা বললো তাদের সাথে। আলাপের সুরে সে আমার সম্পর্কে চুল কাটানোওয়ালা লোকটাকে ধারণা দিতে থাকলো- অটিজম কী, পৃথিবীতে কতজন বিজ্ঞানী অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন, তারপরে- কাটা-পড়া চুলের খোঁচা আমার ঘাড়ে কেমন অনুভূতি তৈরী করে, অটিজম নিয়ে সরকার কী কী করছে- এইসব অনবরত বলতে থাকে। আমার মোটেও ভাল লাগেনা দীপু পাপা যখন ওদেরকে এইসব কথা বলতে থাকে। কারণ- ওরা এসব বোঝে না। কিন্তু বোঝার ভান করে। আমি এই সময়ে চুপচাপ এবং তাড়াতাড়ি সব কিছু শেষ করে বাসায় ফিরতে চাই। খারাপ লাগার যেটা হলো- তাহলো দীপু পাপা যে এত কষ্ট করে ওদের সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করলো, তাতে কোন লাভ হলো না। আমি বেশ বুঝতে পারছি দীপু পাপাকে ওরা বোকা একজন মানুষ মনে করেছে। ওদের ভুল হয়েছে। দীপু পাপা দেখতে খুব সাধারণ হলেও অনেক অন্যরকম তার চিন্তা-ভাবনার জগত। তো, বোকা মানুষ ভেবেই দেড়গুণ টাকা বেশী চেয়ে ফেললো! কিন্তু দীপু পাপা যে সেটা দিবে না- আমি জানতাম। কারণটা মোটেই অক্ষমতা নয়। বরং কারণটা এটাই যে সে অন্যায় করছে। আর, ঐ পরিমাণ টাকা দেয়নি বলে বড় ছেলেটা আমাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে ছোট ছেলেটাকে বললো- ‘তুই আর হের চুল কাটবি না। আইজকেই শ্যাষ।’ মজার ব্যাপার হলো- আমাকে আর আমার পাপাকে ওরা বোকা ভেবেছে। আসলে কিন্তু ওদের বুদ্ধি এত কম যে- আমি আর দীপু পাপা কে কী ভেবেছিলাম- ওরা সেটা একটুও বুঝতে পারেনি। আমরা কিন্তু ঠিকই বুঝেছিলাম- ওরা কে কী ভেবেছিল সে’দিন। এটাকে বলে সেন্স অব এমপ্যাথি (sense of empathy)। মানে অন্যকে বোঝার ক্ষমতা। অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারা। যা ওদের নেই। কিন্তু জন্মগতভাবেই এটা আমার ভেতরে আছে অনেক বেশী মাত্রায়। 


দুই।। 


বাহিরে থেকে দেখতে আমাকে সাধারণ আর দশটা মানুষের মতই মনে হয়। কিন্তু আমার ভিতরে আরো কিছু আছে যেটা তোমাদের জানা প্রয়োজন। আমি বেশ বুঝতে পারি- আমার মত একজন মানুষ যার অটিজম আছে তাকে কেন সমাজের মানুষ এত তাচ্ছিল্যের সাথে দেখে। এ’পাড়ায় অনেকেই আছে- মহিলা, পুরুষ যারা আমাকে দেখলে ভয় পায়। অনেকেই দৌড়ে পালায়। তাদের দেখাদেখি ছোট ছোট অনেক ছেলেমেয়ে- তারাও ভয় পায় এবং বড়দের মতই পালিয়ে যায়। কিন্তু অনেক দুষ্ট ছেলে আছে যারা আমাকে ভেংগায়। আমার কাছের আত্মীয় গোছের মানুষরাও আমাকে বুঝতে পারে না। আসলে এ’দের কারোরই, অটিজম সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর, তাই আমার চারপাশে প্রতিনিয়ত এ’সব ঘটে। যদিও আমার- কারো কাছে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যা কিছু বোঝার- আমি আমার জ্ঞানতঃ বুঝে নেই। তাই কারো কাছে আমার কোন প্রশ্নও নেই। হ্যাঁ, এটাও সত্যি যে, আমার কোন স্বপ্নও নেই। ভবিষ্যতের কোন স্বপ্ন আমি দেখি না। ‍সত্যি বলতে অটিষ্টিকদের ভাবনায়- ভবিষ্যৎ কালটাই তো নেই। এমনকি অতীতকাল নিয়েও আমরা তোমাদের মত মাথা ঘামাই না। তাই, আমি বেঁচে থাকি শুধু বর্তমান কালকে নিয়ে। তবে প্রকৃতি আমাকে এমন কিছু পারগতা দিয়েছে যার সাহায্যে আমি- অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে পারি। আমি যখন কারো দিকে তাকাই, তার চোখ এবং ঠোঁটের দিকে আমার তীক্ষ্ণ মনোযোগ থাকে। প্রতিটা শব্দের সাথে সাথে তার প্রতিক্রিয়া আমি মনে রাখি। আমার মস্তিকে তার অনুভূতির একটা নিখুঁত ছবি তৈরী হয়। এটা আমাকে শিখতে সাহায্য করে। এমনকি এটা আমাকে সতর্ক হতেও সাহায্য করে।। তোমাদের মনে হতে পারে আমি ঠিক স্বাভাবিক নই। কিন্তু আমি আমার জন্যে ভীষণভাবেই স্বাভাবিক।

স্কুলে আমার শিক্ষকরা আমাকে শিখতে সাহায্য করে। কিন্তু সেটা যতটা না তাদের মতো করে, তার চে’ বেশী তাঁরা করেন সে’ভাবে- যে’ভাবে ঠিক আমি শিখতে পারি। এমন মনে করার কোন কারণ নেই যে অটিজম আছে এমন মানুষগুলো সবাই আমার মতো! সে’কারণেই সবার শিক্ষা পদ্ধতিও একই রকমের নয়। বরং আমরা প্রত্যেকেই আলাদা। আমার যেমন- স্পর্শ এবং শ্রবণকাতরতা আছে, আরেকজনের সেটা নাও থাকতে পারে। কেউ হয়তো ঘূর্ণায়মান বস্তুর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। কেউ হয়তো বিচিত্র কোন কারণে প্রথম দেখা নতুন মানুষটার মাথার গন্ধ শুঁকে নিতে পছন্দ করে। কেউ হয়তো সবকিছুই জিহ্বা দিয়ে অনুভব করতে চায়। সেটা লোহা, কাপড় কিংবা মাটি যাই হোক না-কেন। আমি যেমন কোন কাপড় ভেজা কি-না, সেটা ঠোঁট দিয়ে অনুভব করি। কেউ হয়তো খুবই শান্ত। আবার কেউ হয়তো হঠাৎ রেগে যায়। কেউ হয়তো লিখতে-পড়তে পারে। কেউ হয়তো এ’দুটির একটিই পারে। আবার হতে পারে- কেউ কোনটাই পারে না। কেউ কেউ চমৎকার ছবি আঁকতে পারে। অনেকেই কথা বলতে পারে। আমি যেমন কথা বলে উঠি কখনো কখনো। আমি কথা বলে উঠলে বাসার সবার চোখে-মুখে আনন্দ চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু তোমরা জানো না- সেটা হয়তো আমার কাছে শুধু মাত্র ‘শব্দ’ই। কখনো কখনো কেউ কোন শব্দ বেশী উচ্চারণ করলে আমার মস্তিষ্ক সেটা রিপিট করতে পারে। তুমি তাকে কথা মনে করতেই পার। এমন অনেক শব্দই আমার কাছে আছে। কখনো কখনো তিন চারটি শব্দও আমি পুনরাবৃত্তি করতে পারি। যেমন- আমি কিছু একটা খুঁজছি আলমিরাতে। আমার মা আমাকে খুঁজতে সাহায্য করছে। কিন্তু আলমিরার কোথাও সেটা নেই। মা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে- জিনিষটা এখানে নেই। কিন্তু- আমি মরিয়া হয়ে খুঁজতেই থাকি। শেষ পর্যন্ত না-পেলে, তীব্র রাগ এসে আমাকে গ্রাস করে। আমি একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে “দীপু পাপা” বলে চিৎকার করতে করতে তার কাছে ছুঁটে যাই। অর্থাৎ আমি তার সাহায্য চাই। এটা হয়তো শব্দের সঠিক প্রয়োগ। কিন্তু এটা কী কথা? আসলে এটা যতটা না কথা তার চে’ বেশী- শব্দের পরে শব্দ পুনরাবৃত্তি করা। আমাকে যদি বলা হয় “নাফি এখন ভাত খাবে। এসো।” শব্দগুলোর প্রয়োগ-ক্ষেত্র মনে রেখে পরবর্তীতে আমার প্রয়োজনে হয়তো মাকে বলতে পারি- “নাফি ভাত খাবে।” কিন্তু সেটা যে বলতে পারবো – তেমন নাও হতে পারে। আবার এমনিতেই একা একা বারবার বলতে পারি – নির্দিষ্ট কোন শব্দ বা শব্দমালা। সেটা কিন্তু শব্দগুলোকে মুখস্ত করার জন্যে নয়! অটিস্টিকদের বেলায় কোন নির্দিষ্ট কিংবা কয়েকটা শব্দ ক্রমাগত বলতে থাকা, ক্রমাগত হাত বা পা নাড়ানো, নিজে নিজে নড়তে থাকা বা শরীর দোলানো, এক জায়গায় ঘুরতে থাকা,–এ’সব খুব common দৃশ্য। এ’টাকে Self-stimulatory behavior বলে। অবশ্য এটাকে stereo-type আচরণও বলা হয়। যাই হোক, আমার মতো এ’রকম- প্রত্যেকেরই একাধিক বৈচিত্রময় বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। আর সে’কারণেই বলা হয় যে- “যদি তুমি অটিজম আছে এমন একজনকেও দেখে থাক, তাহলে তুমি একজনকেই দেখেছ।” অর্থাৎ সেটা দিয়ে কখনোই অটিজমকে বোঝা যায় না। আমাদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এমন কি ভিন্ন মাত্রার অটিজম আছে। 

তবে বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে মিল নিশ্চয়ই আছে। যেমন আমরা প্রত্যেকেই একটা সিকোয়েন্স অনুসরণ করে চলতে পছন্দ করি। আমাদের প্রত্যেকেরই এক বা একাধিক ইন্দ্রিয়গত স্পর্শকাতরতা থাকতে পারে। পৃথিবীকে আমরা ভিন্ন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি- যেটাকে তুমি কোনভাবেই ভুল বলতে পার না। হতে পারে- স্পর্শানুভূতিকে প্রগাঢ়তরভাবে অনুভব করা, শব্দকে উচ্চতরভাবে শুনতে পাওয়া, ঘ্রাণকে গভীরতরভাবে পাওয়া কিংবা কোন কিছুকে স্পষ্টতরভাবে দেখা- এই বৈশিষ্ট্যেগুলোতে বেশ মিল আছে। এ’ছাড়া রকিং- যেমন আমি বিছানায় কিংবা চেয়ারে বসে রকিং পছন্দ করি। কেউ হয়তো স্পিনিং- অর্থাৎ এক জায়গায় চরকীর মত ঘুরতে পছন্দ করে। 

অটিজম আমাকে কোথাও কোথাও হয়তো কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়। তেমনি কোন কোন ক্ষেত্রে আবার বেরও করে আনে- অনেক সমস্যার সহজ সমাধান করে দেয়। এটা কখনো হয়তো আমাকে তীব্র আঘাত করে আবার কোথাও আমাকে স্বাভাবিকের চাইতেও বেশী শক্তি জোগায়। তুমি যখন কোন বস্তুর (object) দিকে তাকাও তখন তুমি প্রথমে সেটার পুরোটা দেখ এবং এরপরই তুমি ধাপে ধাপে তার বিস্তারিত (details) দেখতে পাও। কিন্তু যার অটিজম আছে সে হয়তো প্রথমেই বিস্তারিতের মধ্যে লাফ দিয়ে পড়ে। তারপর ধাপে ধাপে সম্পূর্ণটা দেখতে পায়। এ’ক্ষেত্রে আমি বলবো- তোমাদের উচিত আমরা কী পারছি-না সেটা নয়, বরং কী পারছি সেটার দিকে লক্ষ্য করা। এবং সেটাই করতে আমাদেরকে সাহায্য করা। 

সমাজ বা পৃথিবী আমাকে কিভাবে দেখে বা আমাকে কেমন দেখায়- আমি সেটা গ্রাহ্য করি না। তোমার মনে হতে পারে অটিজম আছে এমন শিশুর- তার বিশেষ চাওয়াগুলো নিয়ে বেড়ে উঠা সত্যি খুব বাজে ব্যাপার। কিন্তু আমি বলবো সবচে’ বাজে ব্যাপার হলো আমাদের বিশেষ চাওয়াগুলোর প্রতি তোমাদের গ্রাহ্য না-করা। আসলে বাইরে থেকে আমাকে দেখে তোমরা যেমন বুঝবে না, তেমন- আমার ভিতর থেকে বাইরে তাকিয়েও তোমার মনে হতে পারে –এর কোন ব্যাখ্যা নেই। এটা আসলে- অনেকটাই কম্পিউটারের ভিন্ন একটা অপারেটিং সিস্টেমের মত। আর কোন কারণে প্রকৃতি সেটা আমার ভিতরে আপলোড করে দিয়েছে। আমি ছাড়া আর কেউ সেই অপারেটিং সিস্টেম জানে না। আর সেটাই আমার জীবনের অংশ। (শেষ) 

“I know of nobody who is purely autistic, or purely neuro-typical. Even God has some autistic moments, which is why the planets spin.” 
-Jerry Newport, 

Author of “Your Life is Not a Label”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন