বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

সুইডিশ গল্প : সূর্যগ্রহণ

সেলমা লাগার্লফ
অনুবাদক : আলম খোরশেদ

রিজকোর্টের স্টিনা, বার্ডসংয়ের লিনা, লিটলমার্সের কায়সা, স্কাইপীকের মায়া, ফিন ডার্কনেসের বেদা, বুড়ো ইয়ানিকের নতুন বউ এলিন ছাড়াও দলে আরও দু’তিনজন কৃষক রমণী ছিল; তাদের সবারই বাস গীর্জাপ্রান্তরের শেষ মাথায়, স্টোরহোজডেন পর্বতের ঢালে রুখাশুখা এক জংলি জায়গায়, যেখানকার বন্ধ্যা মাটিতে হাত দেবার সাহস হয়নি কোন বড় জোতদারেরও।

একজন ঘর বেঁধেছে পাথরের চাঁইয়ের ওপর, অন্যজন জলার ধারে, আরেকজন একেবারে পর্বতের শিখরে, যেখানে উঠতে রীতিমত গলদঘর্ম হতে হয়। কেউ যদি নেহাত বরাত জোরে এরচে সরেস
জায়গায় বসতি গাড়তে পারে তবে নির্ঘাৎ তা একেবারে পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে; যেখানে শরৎ থেকে বসন্ত অব্দি সূর্যের আলো পৌঁছুয় না।

তারা প্রত্যেকেই বাড়ির লাগোয়া জায়গায় প্রচুর কসরত করে আলু চাষ করে। সেই পাহাড়ি এলাকার মাটি খুব নরম থাকলেও মোটের ওপর সবই এমন নিস্ফলা আর এতখানি পাথর সরাতে হয় যে, তা দিয়ে জমিদার বাড়ির একখানা গোয়াল ঘর বানিয়ে নেয়া যায়, কোথাও বা মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বিশাল সব কবরের মতো গর্ত হয়ে যায়, আবার কোথাও শক্ত শিলার ওপর বস্তা বস্তা মাটি এনে ঢালতে হয়। যেখানে মাটি এতটা নিরস নয় সেখানে আবার বুনো আগাছার এমন বাড়বাড়ন্ত যে, মনে হয় আলুর ক্ষেতখানা যেন ওদের ভোগের জন্যই তৈরী করা হয়েছে।

দিন মানের সবটুকুই বউদের ঘরে বসে কাটাতে হয় একা একা, এমনকি যাদের স্বামী পুত্র রয়েছে তাদেরও, কেননা রোজ সকালে স্বামীরা বেরিয়ে যায় কাজে আর বাচ্চারা স্কুলে। বেশি বয়সের যারা তাদের আবার ছেলে মেয়েরা লায়েক হলেই আমেরিকায় পাড়ি জমায়। আর যাদের ছোট বাচ্চা, তাদেরকে সবসময়ই ব্যস্ত থাকতে হয় ওদের নিয়ে, যদিও সঙ্গ বলতে যা বোঝায় তারা ঠিক তা নয়।

এতখানি একাকিত্বের দরুণ মাঝে মধ্যে চা খাবার অছিলায় একসঙ্গে হওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়ে তাদের জন্য। এমন নয় যে তাদের মধ্যে খুব বনিবনা হয়, কিংবা এ ওকে ভীষণ ভালোবাসে, তব কে কী করছে কোথায় এটুকু অন্তত জানতে চায় তারা সকলেই, এছাড়া পাহাড়ের নিচে এরকম জনমনিষ্যিহীন পরিবেশে বাস করতে করতে তাদের অনেকেই মনমরা হয়ে পড়ে প্রায়ই। অনেকে মনের ভার হালকা করার সুযোগ খোঁজে, বিশেষত আমেরিকা থেকে চিঠি আসে যাদের, আর যারা স্বভাবতই ফূর্তিবাজ ও বাচাল, তারা তাদের এই প্রতিভার সদ্ব্যবহার করার জন্য ওঁত পেতে থাকে।

তাছাড়া এরকম ছোট খাটো আড্ডার বন্দোবস্ত করাটা এমর কোন ঝামেলার কাজ নয়। কেতলি ও কাপ রয়েছে প্রত্যেকেরই, নিজেদের গরু নেই যাদের তারা খামার বাড়ি থেকে দই পেতে পারে সহজেই, আর দুধের গাড়ির ড্রাইভারকে একটু তোয়াজ করলেই মিউনিসিপ্যাল বেকারি থেকে এনে দেবে সৌখিন বিস্কিট, চিনি ও চায়ের ফেরিঅলার তো কেনো অভাবই নেই। ফলে চায়ের আড্ডার আয়োজন তাদের কাছে একবারে জলভাত। মুশকিলটা হয় জুতসই উপলক্ষ্য খুঁজে বার করতে গিয়ে।

স্টিনা, লিনা, কায়সা, মায়া, বেদা, এলিন সবাই একটি ব্যাপারে একমত যে, প্রাত্যহিক কাজের দিনে এমন উৎসবের আয়োজন করা চলে না। মূল্যবান সময়ের এমন অপচয়ের জন্য তাহলে তারা দুর্নামের ভাগী হবে। আবার সাপ্তাহিক বা অন্য কোন ছুটির দিনে তো প্রশ্নই ওঠেনা, কেননা বিবাহিত নারীদের স্বামী পুত্র রয়েছে সঙ্গ হিসেবে যা এমনিতেই যথেষ্ট। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ গীর্জায় যায়, কেউ কেউ কুটুমবাড়িতে চলে যায়, কেউ বা ঘরে বসেই চুপচাপ, শান্তিমতো কাটিয়ে দিতে পছন্দ করে ধর্মীয় ছুটির দিনগুলো।

ফলে লাগসই কোন উপলক্ষ্য পেলেই তারা তার সদ্ব্যবহার করতে উঠে পড়ে লাগে। বেশির ভাগই তাদের ‘নাম-দিনে’ আড্ডার আয়োজন করে, কেউ কেউ অবশ্য বাচ্চার প্রথম দাঁত ওঠা বা হাঁটতে শেখার দিনেও তা উদযাপন করে। আমেরিকা থেকে যাদের মানি অর্ডার আসে, সেই দিনটা তাদের জন্য একটি বড় অজুহাত, সে উপলক্ষ্যে তারা প্রতিবেশী বউঝিদের ডাকে কাঁথা সেলাইয়ে কিংবা তাঁত বোনায় একটু হাত লাগাতে।

তবু প্রয়োজনমতো উপলক্ষ্য সবসময় মেলে না। একবার তাদের একজন আর কিছুতেই কোন অছিলা খুঁজে পায় না। তার নিজের নাম-দিন সে পালন করতে পারে না, কেননা তার নাম বেদা, যাকে পাঁজি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এমনকি তার পরিবারের কারো নাম-দিনও সে উদযাপন করতে পারেনা কেননা তাদের সবাই কবরে। তার বয়স হয়েছে ঢের, কিন্তু যে কাঁথাটা গায়ে দিয়ে সে ঘুমায় সেটা এমনই পোক্ত যে সম্ভবত তার আয়ুকে ছাড়িয়ে যাবে তা। তার একটা পোষা বিড়াল আছে। সে সত্যি চা খেতে পারে, কিন্তু একটা পোষা প্রাণীর জন্য পার্টি দেয়ার কথা সে ভাবতে পারে না।

চিন্তিত মনে সে তাই পাঁজির পাতা উল্টে চলে এধার থেকে ওধার, যদি তার সমস্যার কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। সে রাজবাড়ি থেকে শুরু করে, তারপর “প্রতীক ও ভবিষ্যৎবাণী’ হয়ে “১৯১২ সালের ডাক পরিবহন ব্যবস্থা” পর্যন্ত পড়ে শেষ করেও মনমতো কিছুই খুঁজে পায় না। সাতবার পড়ার মাথায় তার চেখে পড়ে ‘সূর্যগ্রহণ’ লেখা অংশটুকু। সেটা পড়ে সে জানতে পারে যে, ঐ বৎসর অর্থাৎ ১৯১২ সালের সতেরো এপ্রিলে সূর্যগ্রহণ হবে। দুপর বারোটা কুড়িতে শুরু হবে, চলবে দুটো চল্লিশ পর্যনÍ এবং সূর্যের প্রায় দশভাগের ন’ভাগ ঢাকা পড়ে যাবে। এটা সে এর আগে অনেকবারই পড়েছে কিন্তু তা এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে মনে হয়নি তার কাছে, কিন্তু এবার হঠাৎ করেই যেন এর অর্থ জলের মত স্¦চ্ছ হয়ে দেখা দিল। ‘পেয়েছি’ বলে চিৎকার করে ওঠে সে। কিন্তু তার এই উল্লাস স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেরন্ডর জন্য, কেননা পরমুহূর্তেই অপর সঙ্গীরা হেসে উড়িয়ে দেবে এই ভয়ে সে তার এই ভাবনাটুকু সরিয়ে রাখে।

সে যাই হোক, এর পরের ক’দিন সেই ভাবনাখানি ঘুরে ফিরে তার মনে আনাগোনা করতে থাকলো যতক্ষণ না সে সাহস করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, দেখাই যাক না একবার চেষ্টা করে। কারণ তার মন বলে এ-দুনিয়ায় সূর্য ছাড়া আর কোন প্রিয় বন্ধু আছে তার? যেখানে তার কুঁড়েঘর সেখানে সারা শীতকাল সূর্যের আলো পৌঁছুয় না। কবে বসন্ত আসবে তার পথ চেয়ে বসে থাকতে হয় তাকে। সূর্যই একমাত্র বস্তু যার জন্য অপেক্ষা করে থাকে সে, যে তার প্রতি প্রসন্ন ও বন্ধুবৎসল, যদিও তার দেখা পায় সে খুব কমই।

সে তার অতীতের দিকে তাকিয়ে কঠিন বছরগুলো অনুভব করে। হাত জাড়া সারাক্ষণই কাঁপে তার, যেন স্থায়ী শীতের কবলে পড়ে আছে সে, আয়নার দিকে তাকিয়ে তার নিজেকে বড় বেশি ফ্যাকাশে ও ক্ষয়াটে বলে মনে হয়। একমাত্র উষ্ণ, জোরালো, সূর্যালোকের ঝর্ণাধারায় ¯œাত হলেই নিজেকে তার চলন্ত মুর্দা মনে না হয়ে তাজা, প্রাণবন্ত একজন পরিপূর্ণ মানুষ বলে মনে হয়।

যত সে ভাবতে থাকলো ততই তার বিশ^াস মজবুত হতে থাকলো যে, উদযাপনের জন্য বছরের আর সব দিনের চেয়ে এই দিনটাই শ্রেষ্ঠ কেননা সে-দিন তার প্রিয় বন্ধু সূর্যদেব অন্ধকারের দানবের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে বিজয়ীর বেশে দেখা দেয় সারা গায়ে নবীন ঐশ্বর্য আর উজ্জ¦লতা মেখে।

সতেরোই এপ্রিল খুব একটা দূরে নয়, তবে একটা চা পর্বের আয়োজন করার জন্য যথেষ্ট সময় তা। অতঃপর গ্রহণের দিন স্টিনা, লিনা, কায়সা, মায়া এবং অন্য মেয়েরা বেদার বাড়িতে এসে চায়ের কাপে ঝড় তোলে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাপ চা দেখতে দেখতে খাওয়া শেষ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে হেন বিষয় নেই যা নিয়ে তাদের কথা হয়নি। তাদের মধ্যে সকলেই অবশ্য এ-কথা জানাতে ভুললো না, কেন এত দিন থাকতে বেদা এই দিনটাকেই বেছে নিল তার পার্টির জন্য।

ততক্ষণে গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তারা তা খেয়াল করে না খুব একটা। কেবল এক পর্যায়ে সারা আকাশ যখন কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে, চারদিক শিসার মতো স্তব্ধ ও ছাইবর্ণ ধারণ করে, শেষ বিচারের দিনের কাড়া-নাকাড়ার শব্দে ধেয়ে আসে অমঙ্গুলে বাতাস, তখন মুহূর্তের জন্য তাদের গা কেমন করে ওঠে, কিন্তু তা অল্পক্ষণের জন্য, পরমুহূর্তেই পরবর্তী কাপে চুমুক দেয় তারা।

যখন সবকিছু শেষ হয়, আকাশে সূর্যের আলো ঝলসায় অপরূপ সৌন্দর্যে, তাদের মনে হয় সারা বছর সে এমন তীক্ষè কিরণ আর জৌলুস নিয়ে জ¦লজ¦ল করেনি, বুড়ো বেদা তখন জানালার কাছে উঠে যায়, বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়ায়। তাপর সূর্যালোক ¯œাত বাইরের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে গেয়ে ওঠে,

‘জ¦লজ¦লে সূর্য উঠেছে আবার

প্রভু, তুমি দয়াবান।

নতুন আশায় শক্তি ও সাহসে

আমি ফের গাই গান।’

পাতলা, শীর্ণকায় বেদা আলোয় উদ্ভাসিত জানলায় দাঁড়িয়ে গান গেয়ে চলে, তাকে ঘিরে নাচে সূর্যের কিরণরেখা, যেন তাকেও ভাগ দিতে চায় তারা তাদের নতুন জীবন, শক্তি ও সৌন্দর্যের।

গান শেষ করে সে ফিরে দঁড়িয়ে তার মেহমানদের দিকে তাকায়, অনেকটা যেন ক্ষমা চাওয়ার ঢংয়ে। “দেখলে তো, সূর্যের চেয়ে আর কোন ভালো বন্ধু নেই আমার। তাকে তার বিপদের দিনে মনে করেছি আমি। তোমাদের সবাইকে ডেকেছি অন্ধকারের হাত থেকে মুক্তি পাবার পর তাকে বরণ করে নিতে।”

এতক্ষণে তারা বেদার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে। সবারই মন ছুঁয়ে যায় বেদার কথা ক’টি। তারা তখন সবাই প্রাণভরে সূর্যের সুখ্যাতি করে। বলে “ধনী গরীর সবার প্রতিই সূর্য সমান উদার। শীতকালে আমাদের ভাঙ্গা ঘরের ফাঁক দিয়ে যখন আলো ঢোকে, তাকে তখন চুলোর আগুনের মতো উষ্ণ মনে হয়। তার জ¦লজ¦লে হাসিমুখ দেখলে, জীবন যত কঠিনই হোক, বাঁচতে ইচ্ছে করে।”

সভার শেষে সুখী পরিতৃপ্ত বউঝিরা যে যার ঘরে ফিরে যায়। সূর্যের মত একজন বিশ^স্ত, ভালো বন্ধু রয়েছে, এই আবিষ্কারে নিজেদের আরো সবল ও নিশ্চিনÍ বলে মনে হতে থাকে তাদের।




(লেখক পরিচিতি: সাহিত্যের জন্য প্রথম নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী, সেলমা লাগার্লফ-এর জন্ম ১৮৫৮ সালে সুইডেনের পশ্চিমাঞ্চলে। পেশাগত জীবনে স্কুল-শিক্ষিকা, সেলমা লাগার্লফ অসংখ্য গল্প ও উপন্যাসের রচয়িতা। তাঁর ’জেরুজালেম’ উপন্যাসখানি একই নামে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়ে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর অপর একটি জনপ্রিয় কিশোরগ্রন্থ, ”দ্য ওয়ান্ডারফুল অ্যাডভেঞ্চার্স অভ নিলস্”, ত্রিশটিরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯০৯ সালে তিনি সুইডিশ একাডেমির ভাষায়, ”তাঁর লেখার উন্নত আদর্শবোধ, কল্পনাপ্রতিভা এবং আত্মিক শক্তির” জন্য নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৪০ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।)

২টি মন্তব্য:

  1. আজকের দিনের সেরা পাঠ।

    উত্তরমুছুন
  2. আলম খোরশেদ ভাইয়ের অনুবাদ মানেই অসাধারণ।ভালো লেগেছে।কিছু বানান ত্রুটি যদিও রয়েছে।

    উত্তরমুছুন