রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম'এর গল্প : ডিডেলাসের ঘুড়ি

ইমানের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই দেখে হোসেন মিয়া রাগ দেখালেন খুব, যদিও তার রাগার কোনো কারণ নেই, এমনকি (পৃথিবীতে সত্যধর্ম আছে এটা ধরে নিলেও) রাগার তার অধিকারও নেই। কারণ ইমান তার গ্যারেজের কর্মচারী হলেও আজ ছুটির দিন, তদুপরি সময়টা বিকাল।

ছুটির দিন হলেও সকালে ঘণ্টা তিনেক ইমান খেটেছে। তার সঙ্গে কোনো এক সময়ে হোসেন মিয়ার যে মৌখিক চুক্তি হয়েছিল_যা ইমানের ঘুড়িটার মতোই পলকা, এবং তার অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা হাড়গুলোর মতোই ভঙ্গুর_সে অনুযায়ী এই তিন ঘণ্টার কাজও অতিরিক্ত। কিন্তু ভাই, পৃথিবীতে সত্যধর্ম নাই, সেজন্য অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ইমান পাবে না। বরং তাকে শুনতে হবে, 'তুই কি একটা বাইচ্ছা নাকি যে খালি গুড্ডি উড়াইবি? রাখ। গুড্ডি লাটাই রাখ। হাত লাগা। প্লাসটা খুঁইজ্যা দে।'
হোসেন মিয়া শুক্রবারে কাজ করা পছন্দ করেন না। বিশেষ করে জুমার নামাজের পর। জুমার নামাজে মিয়াসাহেব যে বেশ সেজেগুজে যান সেটি নিশ্চয় লক্ষ করেছেন। সাদা লুঙ্গি, সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, হায়দ্রাবাদি টুপি। চোখে সুরমা। গলায় বুকে জুলফিতে আতর। বাহ! এ রকম সাজে গ্যারেজে আসাটা বেমানান। হাস্যকর। গ্যারেজে গা বাঁচিয়ে হাঁটলেও কালিঝুলি গ্রিজ লাগে কাপড়ে। কিন্তু আসতে হয়েছে মুয়ীদ ভাইয়ের জন্য।
মুয়ীদ ভাই ঢালকা বাজারের ভালো মানুষদের প্রিয় মানুষ। হোসেন মিয়া, আপাত দৃষ্টিতে শিশু-শোষক প্রতীয়মান হলেও, আসলে ভালো মানুষ। সে কারণে মুয়ীদ ভাইকে পছন্দ করেন। মুয়ীদ ভাই মসজিদ থেকে বেরোতে বেরোতে, কাপড়ের টুপিটা ভাঁজ করতে করতে, হোসেন মিয়াকে বলেছেন, 'হোসেন ভাই, আমার ভেসপাটা বিগড়েছে। বিকেলের মধ্যে ঠিক না হলে বিপদ।'
হোসেন মিয়ার মুখে প্রায় চলে এসেছিল, কিন্তু মুয়ীদ ভাই, আইজকে যে শুক্কুরবার। কিন্তু কথাগুলো দ্রুত গিলে ফেলে তিনি বললেন, 'আইসেন। তিনটার সময় নিয়া আইসেন।'
মুয়ীদ ভাইয়ের জন্যই শুধু শুক্রবারের একটা বিকেল উৎসর্গ করা যায়। ভালো মানুষ। তাছাড়া, মেয়র হানিফ সাহেবের লোকজন যখন তার গ্যারেজ প্রায় গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, আর চারটা গ্যারেজের সঙ্গে রাস্তা বড় করার ছুতোয়, তখন মুয়ীদ ভাই ব্যাপারটা নিজের হাতে তুলে না নিলে আজ তাকে (হয়তো) পথে বসতে হত।
মুয়ীদ ভাই, যাকে জনকণ্ঠ-র পাঠকরা আবদুল মুয়ীদ তালুকদার নামে চেনেন, খুব শক্তিশালী কলমযোদ্ধা। জনকণ্ঠ-র স্টাফ রিপোর্টার। গ্যারেজ উচ্ছেদের পেছনে করপোরেশনের কিছু মেজো-সেজো কর্তার একটা মতলব যে ছিল, সেটি যথাসময়ে উদ্ঘাটন করেছিলেন মুয়ীদ তালুকদার। তাতে হোসেন মিয়া বেঁচে গিয়েছিলেন, সঙ্গে ইমানও। কারণ হোসেন মিয়ার সঙ্গে ইমানের জীবনের সংযোগ গাছের সঙ্গে পরগাছার মতো।
কিন্তু ভেসপার ইঞ্জিনে রেভ দিতে দিতে হোসেন মিয়া অনুভব করলেন, মুয়ীদ ভাইয়ের জন্য হোক, অথবা এমনকি আপন মায়ের পেটের ভাইয়ের জন্য হোক, শুক্রবার বিকেলে কাজ করাটা সত্যি কষ্টকর। সেজন্য মেজাজটা চড়েছে। তবে ইমানের হাতে লাটাই-ঘুড়ি দেখে হোসেন মিয়া যে রাগ দেখিয়েছেন তা শুধু এই শুক্রবার বিকেলটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য নয়, বরং হঠাৎ তার আপন মায়ের পেটের ভাইয়ের মুখটা মনে পড়ে যাওয়ার জন্য। ভাইটা ছিল বছর দশেকের বড়, কিন্তু তাকে বাবাই মানতেন হোসেন মিয়া, বাবার অবর্তমানে। বাবার মতোই স্নেহ করত তাকে মানুষটা। সবই ঠিক ছিল লোকটার, কলিজা ছিল কলিজার জায়গায়, দিল দিলেন জায়গায়। কিন্তু সমস্যাটা ছিল একটাই। নেশা। বড় নেশা ছিল লোকটার ঘুড়ি ওড়ানোর। ঋতুভিত্তিক নেশা, এই যা রক্ষা। হেমন্তের প্রথম দিনেই যেন সেটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠত, আর বসন্তের প্রথম বাতাসের সঙ্গে মিলিয়েও যেত। বছরের বাকি সময় তার নেশা ছিল তাস। তবে সেটি ছিল নৈশকালীন নেশা, তার ওপর অত ঘোর লাগানো নেশা না, ঘরের ভেতরে বসে বসেই যার সেবা। ঘুড়ির নেশার মতো পথে প্রান্তরের, ছাদের, অলিন্দের এবং খোলা আকাশের নিচের নয়। হোসেন মিয়ার বড় ভাইয়ের এই নেশার জোগানদার ছিল ইমানের বাবা সেতু মিয়া_যার ঘুড়ির সুনাম ছিল শুধু ঢালকা বাজার নয়, সারা পুরনো ঢাকাজুড়ে। শীত আসলেই সেতু মিয়ার ডাক পড়ত চানখাঁর পুল থেকে দয়াগঞ্জ, দক্ষিণ মৈশণ্ডি থেকে ছোট কাটরা_যেখানেই উড়ত নানান রঙের আকৃতির প্রকৃতির ঘুড়ি_সেখানে।
এক শীতের দুপুরে, এরশাদ আমলের শেষ বছরে, ঢালকা বাজারের সঙ্গে যখন উয়ারির ঘুড়ি ওড়ানোর একটা প্রতিযোগিতা চলছিল, উয়ারির তিনটি ঘুড়ি কেটে হোসেন মিয়ার ভাই চতুর্থটি কাটার জন্য ১১ আশেক জমাদার লেনের পুরনো দু'তলা বাড়ির ছাদে উঠেছিল এবং সঙ্গে ছিল বিশ্বস্ত সেতু মিয়া, তাদের পেছনে ছিল ৮/১০ জনের এক উৎসাহ দেনেওলা দল_তারা হৈ হৈ করছিল_হোসেন মিয়ার ভাই এবং সেতু মিয়া দালানের রেলিং-এ পা রেখে ঘুড়ি উড়াচ্ছিল, হোসেন মিয়ার ভাইয়ের হাতে সুতো, সেতু মিয়ার হাতে লাটাই। লাটাইটা সেতু মিয়ার তৈরি এবং একটা দেখবার জিনিস ছিল বটে তা, সেই লাটাই সমেত, হোসেন মিয়ার ভাই সমেত, সেতু মিয়া রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে গেল। সেতু মিয়া উত্তেজনায় রেলিং-এ উঠে বসেছিল। রেলিংটা... যাহোক, নিচে ছিল ১১ আশেক জমাদার লেনে বসবাসরত চার পরিবারের কলতলা। বাঁধানো শান। এ রকম জায়গায় মানুষের মতো ভঙ্গুর ও নরম কিছু পড়লে যা হয়, তাই হল।
মাগো!
সেতু মিয়া যখন মারা যায়, ইমানের মা তখন নামাজ পড়ছিল। বস্তুত সে মোনাজাত করছিল। কী মোনাজাত কে জানে। ইমান তার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। ওজু করার আগে ইমানের মা তার নয় মাসের শিশুকে স্তন্যদান করেছিল। শেষ স্তন্যদান। কেননা, সেতু মিয়ার (মাথার দিকটা থেঁতলানো) লাশ যখন বাড়িতে আসে, তা (অর্থাৎ তাকে) দেখে সে যে মূর্ছা গিয়েছিল, ওই মূর্ছাভঙ্গ তার আর হয়নি।
ইমান তাহলে কিভাবে বড় হল, তার দেখাশোনা কে করল, একথা জিজ্ঞেস করলেন? উত্তরটা, ভাই, আমার জানা নাই। হয়তো কোনো প্রতিবেশী, হয়তো কোনো আত্মীয়স্বজন। পৃথিবীতে সত্যধর্ম কোথাও কিছু অবশিষ্ট আছে নিশ্চয়, ইমানের বড় হওয়া তার প্রমাণ। তবে একই দিনে বাবা-মাকে হারাল নয় মাসের একটা শিশু, এটাই-বা সত্যধর্মের কি প্রমাণ, অথবা অপ্রমাণ, বলুন?
ইমান কিছুক্ষণ সাহায্য করল হোসেন মিয়াকে। কিন্তু সামান্য একটা ভেসপা, কতক্ষণই-বা লাগে ঠিক করতে। আধা ঘণ্টা পর কেরোসিন দিয়ে হাত মুছতে মুছতে হোসেন মিয়া ইমানকে কটা বিলম্বিত ধমক দিলেন, 'আর যদি তোর হাতে কুনুদিন লাটাই গুড্ডি দেখি, তোর খবর আছে। এখন যা।'
ইমান খালি হাতেই দৌড়ে পালাল হোসেন মিয়ার সামনে থেকে। কিন্তু রাস্তায় ওঠার মুখে বিক্রমপুর বেকারির নষ্ট পিক-আপের পেছন থেকে ঘুড়ি আর লাটাই তুলে নিল। তাড়াতাড়ি। চাচা যেন না দেখে।
গ্যারেজের পেছনে একটা আধা-মজা পুকুর। পুকুরটা দখল হয়ে গেছে, মুয়ীদ তালুকদারের অনেক লেখালেখি সত্ত্বেও। এককালের পাবলিক পুকুর এখন প্রাইভেট প্রপার্টি। পুকুরের মাঝখানে পোঁতা সাইনবোর্ডে সেই প্রপার্টির নতুন মালিকের নামটা ফসফরেসেন্ট পেইন্টে লেখা আছে, যাতে রাতেও পড়া যায়। বিখ্যাত নাম, মুয়ীদ তালুকদারের ধরা-ছোঁয়ার বহু দূরে নতুন এক তারকামণ্ডলীতে যার অবস্থান। শীঘ্রই পুকুর ভরাট হবে। কিছু আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। ইমানের জন্য এই একটাই ভালো জায়গা ছিল এই পুরো ঢালকা বাজারে, ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য। এই পুকুরের উপর দিয়ে তেড়চা কিছু বাতাস বয় এ রকম বিকেলে, সে বাতাসে ঘুড়িটা ছেড়ে দিতে পারলেই হল। পাক খেয়ে মুহূর্তে আকাশে উঠে যায়। ঘুড়িটা আকাশে উঠলে সেতু মিয়ার মতোই আনন্দ এবং উত্তেজনা অনুভব করে সে। অবাক কাণ্ড, বাবাকে দেখলই না ছেলেটা। হ্যাঁ হ্যাঁ, টেকনিক্যালি বললে দেখেছে বটে, বাবার কোলেও উঠেছে, বাবার কোলে ঘুমিয়েছে, হিসি করেছে, কিন্তু সে দেখা আর না দেখার মধ্যে তফাৎ কী? দু'দিন তাকে কোলে নিয়ে ঘুড়ি উড়িয়েছে সেতু মিয়া_এর একদিন হঠাৎ তার মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা চেপেছিল, ইমানটাকে একটা ঘুড়ির সঙ্গে বেঁধে উড়িয়ে দিলে কেমন হয়। কী পল্কা ছেলেটা, ওজনহীন, যেন পাখির পালকে ভর্তি তার ভেতরটা। সেতু মিয়া মনে মনে একটা ঢাউস ঘুড়ি তৈরি করে ফেলেছে, যাতে বেঁধে দিলে ছেলেটা আকাশের অনেক দূরে উঠে যেতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ইকারুসের কথা মনে পড়েছে তার, এবং নিজেকে আবিষ্কার করেছে হতভাগা ডিডেলাসের জায়গায়। অথবা, এ রকম হয়তো মনে পড়েনি বা পড়া সম্ভব ছিল না তার, হেতু তার শিক্ষার অভাব। আমরাই তার ওপর আমাদের চিন্তাটা চাপিয়ে দিয়েছি। সে যাই হোক, সেতু মিয়া শিউরে উঠেছে। তারপর পল্কা ইমানের মাথায় একটা চুমু খেয়ে স্ত্রীর কোলে দিয়ে এসেছে। ঘটনাটা ঘটেছিল তার মৃত্যুর পূর্বদিন। অবাক, গ্রিক পুরাণকে পাল্টে দিয়ে ডিডেলাসই মরে গেল। আকাশ থেকে পড়েই মরল এক অর্থে, ১১ আশেক জমাদার লেনের দু'তলার ছাদ ছোটখাটো একটা আকাশই বটে। সে কথাটা মুয়ীদ তালুকদারকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি বলতে পারবেন। তিনি তো ওই দালানের চার পরিবারের এক পরিবার।
আহা, ইকারুসের গল্পটা আপনাকে ব্যাখ্যা করতে বললে আমার গল্পের কী হবে? কেন, মনে নেই, গ্রিক পুরাণের সেই ডিডেলাসের কথা, পুত্র ইকারুসের গায়ে মোমের ডানা লাগিয়ে যে ভাসিয়ে দিয়েছিল আকাশে। ছেলেটা পুলকিত উড়াল দিল অনেকক্ষণ, বাবা নিচে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল। কিন্তু রোদের আঁচে মোম গলে যেতে থাকলে...
মাগো!

ইমানের ঘুড়ি একটা গুত্তা খেয়ে হঠাৎ যেন অবাধ্য হয়ে গেল। ইমান অবাক। কী হল ঘুড়িটার? পেট খারাপ হল, না মাথা? হায় হায়, ডান দিকে কানাচ্ছে। একটু কানি্নর দরকার ছিল বাঁয়ে। এই বিষয়টা সে কিভাবে নোটিশ করেনি?
ঘুড়িটাকে তার মনে হয় পাঁচিলবাসিনী সাদা বেড়ালটার মতো। খুব ভালোমানুষ বিড়ালিনী, কিন্তু একদিন লেজে এট্টু পা পড়তেই!
ইমান প্যান্টের পা সরিয়ে আঙুল বুলায় পুরনো সেই আঁচড়ক্ষতের ওপর। আর সেই অবসরে ঘুড়িটা আরেকটা বিশাল গুত্তা খায়, তারপর সরসর করে একটা নারিকেল গাছের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ইমান। নারিকেল গাছে চড়ার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না। কিন্তু চড়তে হবে। জগতে সকালবেলাটা থেকে বিকেলবেলাটা কেমন যাবে, কোনোদিন আন্দাজই করা যায় না, ইমান জানে। ভবিতব্যের ঘরের এসব অতিরিক্ত শ্রমকে সে বলে আন্ধা কাম, যেমন আজ হোসেন মিয়ার গ্যারেজে বিকেলে আধা ঘণ্টার কাজ। আন্ধা কাম।
নারিকেল গাছটা একটা ফ্ল্যাটবাড়ির গা ঘেঁষে। বাড়িটার মালিক সেই তারকা যার নাম জ্বলজ্বল করছে মজা পুকুরের এদোর মাঝখানে। পাঁচ তলা ফ্ল্যাটবাড়ি, নারিকেল গাছটা এক বিকৃত আনন্দে ঠিক পাঁচতলা পর্যন্ত উঠেছে লিকলিকিয়ে (অথবা ফ্ল্যাটবাড়িটা বিকৃত আনন্দে নারিকেল গাছের মাথা পর্যন্ত উঠেছে লিকলিকিয়ে) এবং সেইখানে, সেই অনাবশ্যকই উচ্চতায়, লিকলিকে দুই ডালের মাঝখানে সেঁধে বসে আছে ইমানের ঘুড়ি।
ইমানের বাবা সেতু মিয়া গাছ বাইত ঢালকা বাজারের বদরাগী বাঁদরগুলোর মতো ক্ষিপ্রতায়। তার এই প্রতিভা, তার ঘুড়ি বানানো-ওড়ানো-লাটাই বানানোর প্রতিভার মতোই, জিন-বাহিত হয়ে খলখল করে প্রবাহিত হচ্ছে ইমানের রক্তে, নাড়িতে নাড়িতে। সে উঠল, ঘুড়িটা পাড়ল এবং নিচে নামতে থাকল। কিন্তু চারতলার উচ্চতায় নামার আগেই সে একটা মেয়ের চিৎকার শুনতে পেল। এবং চিৎকারটা মেলাবার আগেই ধপাস করে একটা দরজা বন্ধ হতে শুনল, এবং দেখল, একটি মেয়ে চারতলার ব্যালকনি ধরে যেন কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে অসীম কাৎরাচ্ছে এবং এক ভয়াবহ করুণ অতীব্র চিৎকার কেটে দিচ্ছে ঢালকা বাজারের আকাশ। ইমানের চোখ ঠিকরে গেল মেয়েটাকে দেখে। ঊর্ধ্বাঙ্গে এক টুকরো কাপড়ের আবরণও নেই। ত্রস্ত হাতে সালওয়ারের ফিতাটা লাগানোর চেষ্টা করছে মেয়েটা। অথবা এ রকম কিছু। ইমান যে আগে অনাবৃত নারী বুক দেখেনি, তা নয়। তবে সেসব কলতলায় গোসল করতে আসা বয়স্ক অথবা অল্প বয়সে বুক ঝুলে পড়া মেয়েদের। এই পনেরো ষোলো বছরের মেয়েটির মতো এক ঝলক লাগানো বুক সেসব মোটেও না। ইমানের শরীরের ভিতরে একটা শিরশির স্রোত জাগল। নারিকেল গাছের সঙ্গে লাগানো কোমল অঙ্গে সে স্রোত পেঁৗছাল। ফলে, সেখানে সে বিশাল টান অনুভব করল। সেই অনুভব কিন্তু জেগেই মিলিয়ে গেল। কারণ মেয়েটির চোখের দিকে চোখ পড়ল ইমানের। সর্বনাশের ঝামা পাথরে ঘষা বিবর্ণ চোখ। আতঙ্কের হলুদ সাদা আলোয় পোড়ানো চোখ। ইমান এ রকম চোখ অবশ্য আগেও দেখেছে। এ রকম চোখে জীবনের সামান্য সবুজও জন্মাতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্য, এই রকম কাতরতার মুহূর্তেও সেই ঘষা-পোড়া চোখ দিয়ে ইমানকে দেখছে মেয়েটি। যদিও ইমানের অবস্থান গাছের পেছনটায়, এবং গাছটার অবস্থান বারান্দা থেকে সাত ফুট দূরে ঈশানের দিকে। মেয়েটা রেলিং থেকে তারা দিকে হাত বাড়িয়ে দিল যেন ইমান কোনো ফেরেশতা, তাকে তুলে নিয়ে যাবে এই বারান্দা থেকে। 'ভাই, আমারে বাঁচাও। আমারে মাইর‌্যা ফেলতাচ্ছে। এই দ্যাহ'_বলে সে একটা স্তন বাড়িয়ে দিল ইমানের দিকে। ইমানের চোখ জ্বলছে, যেন গরম বৃষ্টি হচ্ছে, দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে আসছে। সেই অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়েও সে পরিষ্কার দেখল, রক্ত। বন্ধ দরজাটা সজোরে খুলে গেল। বলিষ্ঠ এক পুরুষ প্রবেশ করল দৃশ্যে। এই পুরুষকে ইমান চেনে। সবাই চেনে, ঢালকা বাজারের, বস্তুত। ইনি দারোগা সাহেব। দারোগা সাহেব মেয়েটিকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। ইমান দেখল তার বলিষ্ঠ হাত মেয়েটির রক্তাক্ত স্তন দলে দিল। সে চোখ বন্ধ করল। চিৎকার মিলিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হল। এবং ইমান_যেন সে কোনো দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে কাদাভরা একটা প্রান্তর মাড়িয়ে একটা ঘুড়ির পেছনে ছুটছে_তার পল্কা শরীরটাকে টেনে টেনে এক নামহীন উত্তেজনা এবং অবসাদের যুগপৎ পীড়নে নারিকেল গাছ থেকে নামতে থাকল।
কতক্ষণ লাগল মাটিতে পা ফেলতে, ইমান জানে না, কিন্তু যার জন্য ওঠা, সেই ঘুড়িটা সে ছিঁড়ে ফালি ফালি হয়ে গেল! হায়! ইমানের মনে পড়ল, যখন ঘুড়িটাকে গাছের বাঁধন থেকে মুক্ত করে, তখন সেটা অক্ষত ছিল, ঘুড়িটাকে একটা চুমাও দিয়েছিল সে। কিভাবে ছিঁড়ল? সে উপরে তাকাল, যেন নারিকেল গাছের থেকে একটা উত্তর সে আশা করছে। কিন্তু না, নারিকেল গাছটা নয়, এবার তার দৃষ্টি অধিকার করে নিল সেই ব্যালকনিটি। সেই রেলিং এবং সেই মেয়েটি। আবার! সে দেখল ব্যালকনি গলিয়ে মেয়েটা পড়ে গেল যদিও সে পড়তে চায়নি। তার চিৎকার তাই বলছিল। তবে এবার তার বুক আর অনাবৃত নয়। এবার একটা কামিজ দিয়ে ঢাকা। মেয়েটি পড়ল, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক নারীমুখ নিচে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল, 'পড়ে গেল, পড়ে গেল।' সেই নারীমুখের পাশে দাঁড়ানো আগের সেই বলিষ্ঠ মুখ। কঠিন। অভিব্যক্তিহীন।
ইমান দ্রুত দুই হাত দিয়ে কান ঢাকল। সে জানে, ব্যালকনির ঠিক নিচে সেফটি ট্যাংকের সিমেন্টের ঢাকনা। সেখানে একটা কাতর, আতঙ্কিত, অরক্ষিত এবং নরম শরীরের মানুষ পড়লে কী হতে পারে, ইমান তা জানে। সে রকম জানা বোঝার বয়স তার হয়েছে।

মুয়ীদ ভাই ভেসপা নিতে এসে খবরটা শুনলেন। ততক্ষণে আশপাশের সবগুলো বাড়ির মানুষও জেনে ফেলেছে, ২৩/বি/আই বাড়ির চারতলার কাজের মেয়ে আছমা রেলিং গলিয়ে পড়ে মরে গেছে। পাড়াময় উত্তেজনা। ঠিক কেন মেয়েটি পড়ল, কিভাবে পড়ল, কেউ বলতে পারল না। কেউ অনুমান করল কাপড় তুলতে গিয়ে পড়ে গেছে_যদিও এই ব্যালকনির রেলিং-এ কাপড় শুকাতে দেখেনি কেউ কোনোদিন। কেউ বলল, হয়তো খেলতে গিয়ে পা পিছলেছে_কিন্তু পনেরো-ষোলো বছরের কাজের মেয়ের কী খেলার বয়স দশ বছর আগেই পার হয়ে যায় না, এই বঙ্গদেশে? তাহলে?
শুধু ইমান জানাল মুয়ীদ ভাইকে, আছমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে দারোগা সাহেব আর তার বিবি। ইমানের বর্ণনা থেকে মুয়ীদ ভাই বুঝলেন, দারোগা মেয়েটির ওপর অত্যাচার করেছে। হয়তো ধর্ষণ করেছে। মুয়ীদ ভাইকে কখনো এ ধরনের রিপোর্ট লিখতে হয়নি, কিন্তু তার কাগজেই তো তিনি পড়েছেন, স্বামী ধর্ষণ করেছে কাজের মেয়েকে স্ত্রীর সহযোগিতায়। তারপর স্ত্রী খুন্তি গরম করে...
মাগো!
এ রকম সময়ে স্ত্রীজাতির ওপর তার বিশ্বাস চলে যায়। ভাগ্যিস তিনি বিবাহ করেননি। এই দীর্ঘ চলি্লশ বছরের জীবনে একবারের জন্যও নয়।
প্রকৃত সত্যটা উদ্ঘাটন করতে দেরি হল না মুয়ীদ ভাইয়ের। কিন্তু এই আবিষ্কারে তিনি কোনো আনন্দ পেলেন না। তার মন ব্যথিত হল বরং। ঢালকা বাজারের ভালো মানুষ ওয়ার্ড কমিশনার মোফাজ্জেল নিজেকে আছমার গার্জেন দেখিয়ে থানায় একটা এফআইআর করলেন। সাংবাদিকদের সামনে থানার দারোগা অনেক গাঁইগুঁই করেও এর ভাষা বদলাতে পারল না। অবসরপ্রাপ্ত দারোগা কলিমুল্লাহ এবং তদীয় স্ত্রী আলেফা বেগমকে থানায় আনা হয়েছিল ঘটনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। থানার হাজতে তাদের রাতে রাখতে হবে, এই চিন্তায় দারোগার কপালে রেখা দেখা দিয়েছিল। ঘামও জমেছিল। কিন্তু সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেছিল। কী করা যায়। কলিমুল্লাহ ও আলেফা বেগম ভাবলেশহীন বসে ছিল। নিজে দারোগা ছিল লোকটা, সে জানে, কোনো কথা না বলাই উত্তম। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শুধু জানাল, আছমা আত্মহত্যা করেছে। কেন আত্মহত্যা করেছে? পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। হয়তো ছ্যাঁক খেয়েছে।
পাশের বাড়ির কাজের ছেলে রফিককে থানায় ধরে আনা হল। সে হাউমাউ করে কেঁদে বলল, আল্লাহর কসম, আছমার লগে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ইত্যাদি।
আবদুল মুয়ীদ তালুকদার জনকণ্ঠ-র প্রথম পৃষ্ঠায় স্বনামে রিপোর্ট লিখলেন। একদিন, দু'দিন, চারদিন। ডাক্তারি রিপোর্টে মেয়েটিকে ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মুয়ীদ বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন এবং তার পাঠকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভেবেছে, মুয়ীদ তালুকদারের ভাষায়, এই 'নরপশু'র এবং তার স্ত্রীর বিচার হবে। আছমা নিজে নিজে মরেনি, এরা তাকে মেরেছে, এখন আছমার আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।
হোসেন মিয়া নতুন করে রাগ করেছেন ইমানের ওপর। ঘুড়ি ওড়াতে গিয়েই বিপদ ডেকে আনল ছেলেটা। এখন সে একজন সাক্ষী। আর হোসেন মিয়া জানেন, এই রকম প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইমানের মতো পল্কা সাক্ষীর ভাগ্যে কী লেখা থাকে।

আছমা হত্যা/আত্মহত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে মুয়ীদ ভাইয়ের যে ক'দিন সময় কেটেছে, নিঃসন্দেহে তা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কারণ তার পরিচয় হয়েছে চ্যানেল আই-এর প্রতিবেদক সাবরিনা নীনার সঙ্গে। নীনা, মুয়ীদের মতোই, পোড় খাওয়া মানুষ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত তার জীবনে। মুয়ীদ ভাই তাকে এর আগেও অনেক জায়গায় দেখেছেন। কিন্তু পরিচয় হয়নি। মেয়েটির মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব আছে, দেখে ভালো লাগে। আছমার লাশ দেখে আজ অবশ্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়েটি ভেঙে পড়েছে। তার চোখে পানি এসেছে। না, নীনা যখন রিপোর্ট করে, অনেক মানুষের সামনে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, তখন তার চোখে পানি ছিল না। পানি পরে এসেছে এবং মুয়ীদ ভাই যখন তাকে বলেছেন, 'সাবরিনা, মন খারাপ করবেন না, জীবনে এমনটা হয়, আমার আপনার তা জানার কথা, তখন আর অশ্রু বাঁধ মানেনি। 'আমার আপনার' কথাটির মধ্যে একটা কামারাডেরির ব্যাপার আছে, যা তার নিঃসঙ্গতাকে আরেকটা ছায়া দিয়ে কিছুটা হলেও ভরিয়েছে। তারপর, খানিকটা সামলে নিলে, এবং রিপোর্টিং-এর পালা শেষ হলে, আশ্চর্য, যখন মুয়ীদ ভাই বলেছেন, 'চলুন, আমার বাসায় একটু বিশ্রাম নিয়ে যাবেন, এ কাপ চা খেয়ে যাবেন', সে না করেনি। ব্যাপারটা ক্যামেরাম্যান আজমলকে অবাক করেছে। সে-ও ক্যামেরা কাঁধে সাবরিনার সঙ্গে এসেছে ১১ আশেক জমাদার লেনের দু'তলায়। এসে সাবরিনার খেয়াল হয়েছে, মুয়ীদ সাহেবের পরিবার বলতে তিনি একাই। সে জিজ্ঞেস করেছে, 'অন্যরা কোথায়?' মুয়ীদ ভাই বলেছেন, 'অন্যরা অন্যদের জায়গায়।' 'অর্থাৎ আমি আছি আমার জায়গায়।' চা খেয়েই সাবরিনাকে দৌড়াতে হয়েছে। সাতটার নিউজে ছবিসহ রিপোর্ট যাবে। মোবাইল ফোনে বস তাগাদা দিয়েছেন। সেই রাতে মুয়ীদ ভাই দালানের ছাদে উঠেছেন, পায়চারি করেছেন। যেখানটায় রেলিং ভেঙে সেতু মিয়া ও হোসেন মিয়ার বড় ভাই পড়ে গিয়েছিল, যে রেলিংটা, আশ্চর্য, এখনও মেরামত করা হয়নি, সেখানে দাঁড়িয়ে জীবন মৃত্যু নিয়ে ভেবেছেন, আকাশ দেখেছেন। এই দালানের ছাদটাকে তার বরাবর মনে হত একখণ্ড নিরিবিলি আকাশ। আজ সেই আকাশে আরেকজনের ছায়া পড়েছে, যে ছায়া বড় হয়ে একটা বড় টিভি স্ক্রিন দখল করে সারা ঢাকাময় ছড়িয়ে পড়েছে। আহ।
চ্যানেল আইয়ের শেষ খবরটা কি শেষ হয়ে গেল? দ্রুত ছাদ থেকে নামার আগে হঠাৎ তার মনে হয়েছে, আশ্চর্য, আছমা নামে যে মেয়েটি আজ মারা গেছে, তার নামের অর্থটাও যে আকাশ!

জনকণ্ঠ-র পাঠক যখন নিশ্চিত যে আছমা হত্যা মামলার একটা সদগতি হবে, তখন পুরনো ঢাকার জ্বলজ্বলে নামের নতুন তারকা নামলেন মাঠে। তিনি নামার দুদিনের মধ্যে খেলার নিয়ম পাল্টে গেল। মাঠে দুটো গোলপোস্টের জায়গায় থাকল শুধু একটি। দুটি দলের মধ্যেও থাকল শুধু একটি দল এবং তারা ক্রমাগত অনুপস্থিত দলের গোলপোস্টে গোল করে যেতে লাগল।
এই খেলাটি, মুয়ীদ ভাই জানেন, এখন বাংলাদেশের জাতীয় খেলা।
আবদুল মুয়ীদ তালুকদার জনকণ্ঠ-র প্রথম পৃষ্ঠায় কোলাহল তুললেন_যদি কাগজের পৃষ্ঠা হতো আকাশ, তাহলে বলা যেত সেখানে মহাজাগতিক অগি্নঝড়ের সূচনা করেছেন মুয়ীদ ভাই। অন্যান্য কাগজও তাঁকে অনুসরণ করল। ডেইলি স্টার সম্পাদক স্বনামে লেখা কমেনটারিতে মামলার আলামত গায়েব, সাক্ষী পরিবর্তন এসব নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করলেন, প্রতিকার চাইলেন। পাঠক ভাবল ডেইলি স্টার যেহেতু বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা পড়েন, তাঁরা সরকারের কাছে নিশ্চয় সদুত্তর চাইবেন। তাঁরা চাইলেন কি না, কে জানে। কিন্তু পুরনো ঢাকার নতুন তারকার এক আলোকবর্ষ দূরত্বেই এসব ফরিয়াদ মাথা কুটে মরল। আদালত থেকে সস্ত্রীক (অব.) দারোগা কলিমুল্লাহ জামিন পেল। তারপর এসব ঘটনা পাবলিকের মন থেকে মুছে যাবার সময় দূরত্বে কেস উঠল আদালতে। এর আগে সত্যধর্মে বিশ্বাসী দেশের ০.০০০০০১% মানুষ অবাক হয়ে দেখল, ইমানের নাম সাক্ষীর তালিকা থেকে আসামির তালিকায় চলে গেছে। এক সন্ধ্যা রাতে পুলিশ এসে পিছমোড়া করে ধরে নিয়ে গেছে ইমানকে। হোসেন মিয়া প্রবল প্রতিবাদ করতে করতে দৌড়ে গেছেন পুলিশের পিছু পিছু। পুলিশ, আইনের বন্ধু, হোসেন মিয়ার আচরণে আইনের ওপর অকারণ হস্তক্ষেপ দেখতে পেয়েছে। ফলে, হোসেন মিয়াকে কিল-থাপ্পড় ও বুটের লাথি খেতে হয়েছে। ভাগ্যিস তাঁকে থানায় নিয়ে যায়নি আইনের বন্ধুরা।
হোসেন মিয়া হাতের কাজ ফেলে পাগলের মতো দৌড়ালেন মুয়ীদ ভাইয়ের বাসায়। রাত নয়টা বাজে। এই অল্প রাতে কোনো সাংবাদিককে বাসায় পাওয়া যায় না (অথবা, যদি কাউকে পাওয়া যায়, তিনি সাংবাদিক না)। কিন্তু মুয়ীদ ভাইকে পাওয়া গেল। তিনি ছাদে ছিলেন। সঙ্গে কে আবার! সাবরিনা নীনা। হোসেন মিয়ার কান্না শুনে তাঁরা দুজনে থানায় ছুটলেন। থানার দারোগা বহুদিন পর সাংবাদিক দেখে আরাম পেল। সে বলল, নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তার আলোকে চার্জশিট দেয়া গেছে।
নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণ কী?
না, আছমা ওই পিচ্চি ইমানের সহযোগিতায় দারোগা সাহেবের ঘরের মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে পাচার করত। ছেলেটা গাছ বেয়ে উঠত, আর আছমা পোঁটলা চালান দিত। চুরি করা মালও উদ্ধার হয়েছে, তার মধ্যে দারোগা সাহেবের বিবির তিন ভরি সোনার হার আর দারোগা সাহেবের একটা ক্যামেরা ছিল। বোঝেন।
'কিন্তু আছমাকে বারান্দা থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে', সাবরিনা নীনা প্রতিবাদ করলের। দারোগা জিব কাটল। 'কী সর্বনাশ, উল্টাপাল্টা কথা কইয়েন না ম্যাডাম। ওই দিন পোলাডা বড় ছিল। ঝুইক্কা পইড়া ইমানের দিকে ছুইড়া মারতে গিয়ে মেয়েটা ব্যালেন্স হারাইয়া পইড়া গেল। এই রকম হয়।'
'কিন্তু আছমাকে রেপ করা হয়েছে।' সাবরিনা তাঁর মরিয়া হওয়া প্রতিবাদ জানালেন।
'রেপ না। এন্টারকোছ। সেইটা আছমা করত পাশের বাড়ির ওই রফিক পোলাডার লগে। রফিক সব স্বীকার করছে।'
এবার ঝুঁকে পড়ে দারোগা বলল সাবরিনা নীনাকে, 'ম্যাডাম, ক্যামেরা দেখতাছি না যে, চাকরি কি ছাইড়া দিলেন, নাকি চইলা গেল?' এই বলে দারোগা হাসতে লাগল। সেই হাসির ময়লা বাঁচিয়ে কোনো রকমে বাইরে বেরিয়ে এসে সাবরিনা মুয়ীদ ভাইকে বললেন, 'আমার মাথা ঘুরছে।'
মুয়ীদ ভাই বললেন, 'আমার বাসায় চলো।' বলা বাহুল্য, সেই যে নীনা ১১ আশেক জমাদার লেনে ঢুকলেন, তারপর আর বের হলেন না। টেকনিক্যালি স্পিকিং।

ছাদে পাশাপাশি হাত ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন মুয়ীদ ভাই ও সাবরিনা। মুয়ীদ ভাই একসময় বললেন, 'কেউ কি বিশ্বাস করবে, এতটুকুন একটা ছেলে নারিকেল গাছে চড়ে একহাতে গাছ আঁকড়ে ধরে অন্যহাতে আছমার ছুড়ে দেয়া পোঁটলা ধরতে পারবে? এ রকম ক্যাচ ফারুক ইঞ্জিনিয়ারও ধরতে পারত না।'
ফারুক ইঞ্জিনিয়ার, যদি জানতে চান, ভারতীয় দলের সফল উইকেটকিপার ছিলেন অনেক দিন। ইমানের জন্মের আগেই খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাই ইমান তাঁকে চেনে না, ইমান চেনে রিডলি জ্যাকবসকে, ঢাকা স্টেডিয়ামে সে তাঁর খেলা দেখেছে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে, এক শুক্রবার বিকেলে। ইমানও যে দারুণ ক্যাচ ধরতে পারত, মুয়ীদ ভাই সেটি জানেন না। পাড়ার বন্ধুরা জানে। সে জন্য তাকে তারা রিড্ডু বলে ডাকত। দারোগা (অব.) কলিমুল্লাহ ও তার স্ত্রীর পক্ষে দুই বিখ্যাত আইনজীবী যুদ্ধে নেমেছেন। এঁদের একজন আবার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপকের সঙ্গে তিনি পত্রিকায় নানা বিবৃতি দেন প্রায়শই। তিনি দুই দিন ধরে নানা যুক্তি-তর্ক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জাল বুনলেন। মুয়ীদ ভাইয়ের মনে হলো, এই জাল ছেঁড়া ইমানের জন্য ভাড়া করা বটতলার উকিলের পক্ষে কোনোদিন সম্ভব না। সাবরিনা, চোখে পানি নিয়ে বসে বসে শুধু ভাবলেন, বেচারা আছমা! বেচারা ইমান! বেচারা আছমা! কোর্ট থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে নীনার দুচোখে দুফোঁটা পানি দেখা গেল সেদিন। তা দেখে বস মোবাইলে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন, 'একজন রিপোর্টারের তো পার্সোনাল ইমোশন শো করলে চলে না। ওটা হাইড করতে হয়।'
রাইট, বস।
আইনজীবী মহাশয়রা যখন কথা বলেন, ইমান আসামির কাঠগড়া থেকে ভাবলেশহীন তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমনিতেই সে ভাবলেশহীন না, নয় মাস বয়সে বাবা-মা দুজনকে হারিয়েও। তার ভাব যথেষ্ট, ভাবনাও যথেষ্ট, জীবনশক্তি যথেষ্টর একটু বেশিই। কিন্তু কী হবে ভাই, তিন দিন ধরে যে ছেলেটি অভুক্ত। তাকে প্রহারও করা হয়েছে এ তিন দিন। কিন্তু তার থেকে বড় যা, তার খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওপরওলার নির্দেশ। কিন্তু হোসেন মিয়া অথবা ঢালকা বাজারের কেউ তো দূরের কথা, কোনো সাংবাদিক, এমনকি মুয়ীদ ভাইও দেখা করতে অথবা কথা বলতে পারলেন না তার সঙ্গে। ওপরওলার নির্দেশ।
শেষ দিনে বিখ্যাত আইনজীবী মাননীয় আদালতকে বললেন, আজ তিনি প্রমাণ করবেন, ছেলেটি প্রকৃতই দাগী অপরাধী। এই অপরাধীর কারণেই বস্তুত হতভাগা আছমার করুণ মৃত্যু হয়েছে। আছমাও দাগী অপরাধী, তবে, কিছুটা করুণার সুরে তিনি বললেন, মৃতের কোনো অপরাধ থাকে না। মৃতেরা শাস্তি-পুরস্কারের বাইরে চলে যায়।
ভাগ্যবান মৃতজনেরা, সাবরিনা ভাবলেন। 'মাননীয় আদালত', আইনজীবী বললেন, 'পত্রপত্রিকায় সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, ছেলেটি অত উঁচুতে এক হাতে গাছ আঁকড়ে অন্য হাতে কিভাবে আছমার ছুড়ে দেয়া পোঁটলাপাতি ধরবে? একজন বিদগ্ধ সাংবাদিক লিখেছেন, এ রকম ক্যাচ ফারুক ইঞ্জিনিয়ারও ধরতে পারত না। আমি মানি মাননীয় আদালত, যে আমাদের পাইলট হয়তো পারত না। তিনি ঈষৎ যতি দিলেন, একটুখানি শুকনো হাসলেন, আর নাটক করে বললেন, 'যদি পারত, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এমন দশা হতো না' (এবার সারা আদালতে হাসির রোল পড়ল। আইনজীবী মহাশয় প্রীত হয়ে বললেন) 'কিন্তু এই ছোঁড়াটা পারে। পারে। আমি প্রমাণ দেখাচ্ছি।'
এই বলে তিনি তাঁর ব্রিফকেস থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করলেন। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেট। তার ভেতরের জিনিসগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কারণ তিনি উঁচু করে প্যাকেটটি তুলে ধরেছেন। অন্যদের সঙ্গে ইমানও দেখল, প্যাকেটে একটি কলা, একটি আপেল, একটি বনরুটি, চকোলেট, আরো কী কী খাবার। আদালতের অন্যরা এসব খাদ্যই শুধু দেখল, কিন্তু ইমান দেখল আরো কিছু_দেখল প্লাস্টিকের পোঁটলার ভিতর তার জীবনশক্তি, তার জীবন, তার মুক্তি। সে হঠাৎ অস্থির হয়ে গেল। মুখে লালা আসল, অসাড় হওয়া শরীরে একটু যেন শক্তিও আসল। কিন্তু চোখ বুজে একটা প্রার্থনা শুরু করার আগেই সে বুঝতে পারল, এ খাদ্য তার জন্য নয়। এ মুক্তির স্বাদ সে কোনোদিন পাবে না। তার চোখ নোনা পানিতে ভরে গেল।
সে দেখল, একটা পুলিশ তার বাঁ হাত চেপে ধরেছে। সে ডান হাতটাও এগিয়ে দিল, ভাবল, এটাই নিয়ম। পুলিশ সে হাত ফিরিয়ে দিল। শরীরের ডান পাশে প্রত্যাখ্যাত হাতটি ঝুলে পড়ল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেটি ঝুলে থাকল না। কারণ হঠাৎ সে শুনতে পেল, আইনজীবী মহাশয় বলছেন, 'এই প্যাকেটটি আমি ছেলেটির দিকে ছুড়ে মারব।' ইমান তার কথার অর্থ অনুধাবন করার আগেই আইনজীবী পোঁটলাটি ইমানের দিকে ছুড়ে মারলেন। সত্যি সত্যি ছুড়ে মারলেন। আদালত ঘরের শূন্যতায় চড়ে পোঁটলাটা একটা পাক খেল। আতঙ্কিত ইমান ভাবল, খাবারগুলি কি খুলে পড়ে যাবে? না, পড়ল না। কিন্তু পোঁটলাটা যে তার দিকেই আসছে? তার দিকে? আয় আয় আয়, ইমান পোঁটলাটাকে ডাকতে শুরু করল। কতক্ষণ, সে জানে না, হয়তো একটা পুরো জীবনকাল। আয়, আয়... ইমান আবার ডাকল, যেমন সে ডাকে তার ঘুড়িটাকে যখন কেটে গিয়ে অনেক দূরের আকাশে ভাসতে ভাসতে সেটা হারিয়ে যেতে থাকে। আবার আতঙ্কও হলো ইমানের। আসবে তো? আয় আয়... কুড়ি ফুট দূরত্ব অতিক্রম করতে কতক্ষণ সময় লাগে একটা প্যাকেটের, জনাব? আমি জানি না। ইমানকে জিজ্ঞেস করুন। কারণ ঝুলতে থাকা ডান হাতটা ত্বরিত ঘুরিয়ে সে প্যাকেটটা ধরে ফেলেছে। সেই সাফল্যে পুলিশ যেন তার বাঁ হাতটা ছেড়ে দিয়েছে। আর ইমান, যেন সে ঢালকা বাজারের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো মকবুল পাগল, তিন দিন জ্বরে বেঘোরে পড়ে থেকে চার দিনের দিন অভুক্ত বেরিয়ে কোনো স্কুলগামী মেয়ের টিফিন বাঙ্ ছিনিয়ে নিয়ে তার ওপর হামলে পড়েছে, সে রকম ব্যগ্রতায় পোঁটলা থেকে খাবারগুলো বের করতে লাগল এবং চোখের পলকে মুখের ভিতর চালান করে দিতে থাকল। মকবুল পাগলের মতো মুখে ফেনা তুলে চিবোতে চিবোতে তার মনে হলো, আহ, কী মুক্তি। তার দাঁত নড়ছে, চোয়াল নড়ছে, সারা অস্তিত্ব এখন শোঁ শোঁ নড়ছে, কাজেই সে শুনতে পেল না, আইনজীবী উচ্চ স্বরে তৃপ্তি প্রকাশ করে বলছেন, 'মাননীয় আদালত, দেখুন, এক হাতে কী ক্ষিপ্রতায় একটা ছুড়ে মারা পোঁটলা ধরে ফেলল ছেলেটা।' সত্যধর্মে আস্থা আছে বলে এই দৃশ্য দেখে এবং এই যুক্তি শুনে আইনের পাহারাদার ও আইনের বন্ধুরা স্বীকার করলেন, দাগী ইমানকে একটা পোঁটলা ছুড়ে দিতে গিয়েই বস্তুত আছমা নামের মেয়েটি রেলিং থেকে টলে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। অতএব, সত্যধর্ম দাবি করে, ছেলেটি অন্তত তার দুষ্ট, বিক্ষিপ্ত, বিকৃত অপরাধী মন নিয়ে কিছুদিনের জন্য সমাজের পূতপবিত্র গণ্ডি থেকে দূরে থাকুক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন