রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

স্বপ্নময় চক্রবর্তী'র গল্প : স্বস্ত্যয়ন

জাজিমের উপর নরম তোশক, তার উপর মৃগচর্ম পাতা, রক্তবর্ণ তাকিয়া দুপাশে, মাঝখানে বসে আছেন গুরুদেব স্বামী অঘোরানন্দ। হরিদ্রাবর্ণের উপবীত, মাংসল দেহ নির্লোম, হাতে অস্থির জপের মালা । একটু আগে গুরুবন্দনা শেষ হল। শঙ্খবাদ্য ও ঘণ্টাধ্বনি হল। ধূপময় ঘর।


গুরুদেবের পদকিনারে বসে আছে বাড়ির কর্তা রাঁতিকান্ত পবি। নিজস্ব হাঁটুর গাঁটের পাতলা চর্বির আস্তরণের উপর নিজের আঙুলের টোকা দিয়ে স্তিমিত স্বরে ভাবাবেশে গাইছেন “ভবাসাগর তাঁরণ কারণ, হে, গুরু দেব দয়া কর দীনজনে।” রেকবিতে রাখা সাজা পান মুখে দিলেন গুরুদেব। রতিকান্ত চৌকির তলায় রাখা পিকদানি তুলে গুরুদেবের মুখের কাছে ধরলেন। গুরুদেব বাঁ হাতটা এগিয়ে সামনে স্থির রাখলেন। রতিকান্ত দেখল গুরুদেবের করতল তার চোখের সামনে, আঙুলগুলো গায়ে গায়ে জোড়া থাকলে বরাভয় মুদ্রা ভাবা যেত, তা নয়, আঙুলগুলো ফাঁকা ফাঁকা করে রাখা আছে। গুরুদেব বোধহয় বলতে চাইছেন “অপেক্ষা কর।”

“ডাড়া এই টো মুকে ডিলুম পানটা, এখনই পিকডানি হাজির করলি,—টোর সব কাজেই টাড়াহুড়ো” গুরু বলে উঠলেন। “টারহুড়োর জনবি মরণ ঢর্ম হল ঢৈর্য ঢারণ।” রতিকান্ত দোষ করে লজ্জায় মাথা নিচু করে রয়েছে। এইবার গুরুদেব পিক্‌ ফেললেন। রতিকান্তকে বললেন গুরুদেব—তোর সবতাতেই একটু তাড়াহুড়োরে, রজঃ গুণ প্রবল হলেই ওই ধর্ম প্রকাশ পায়। সত্ত্ব গুণার্জনের জন্য দান দক্ষিণা, সেবা--শিষ্ট জীবন, মিষ্ট বাক্য এই গুলির অভ্যাস দরকার হয়। ওই যে অশ্বত্থ বৃক্ষটা হঠাৎ করে অবিবেচকের মতো কেটে ফেলে দিলি, বিশাল ছায়ায় ডাঙা জমিটার চাষের বিঘ্ন হচ্ছিল বলে—কেন কাটলি ? ছায়াঘন পরিবেশে তুই ইষ্টচিন্তা করতে পারতিস।

রতিকান্ত বলল—দু'বিঘা জমি পেরায় আন্ধার হইছিল গুরুদেব। ওকেনে একুন কচু বুনে দিলাম, তার রোজগোরে দান দক্ষিণা ব্রাহ্মণ সেবা করে সত্ত্ব ধর্ম করা যাবে। সেই বিবেচনায় আর তাছাড়া ন’ পুকুরের পড়েও অশথ্‌ ব্রেক্ষ আছে একটা, সেটা লয় বাঁধিয়ে, ওকেনে বসে ইষ্ট নাম করা যাবে,যদি বলেন....


যাক সে কথা, কালকের স্বস্ত্যয়নের জন্য যা যা দরকার জোগাড় করিস, স্বোপার্জিত জমির তিন হাত গভীরের এক খাবলা মৃত্তিকা চাই। তাড়াহুড়ো করে যে সে জমির মাটি নিয়ে আসিস না য্যানো,স্বোপার্জিত হওয়া চাই। ছ’টি বিম্বফল, কদম্ববৃক্ষের ছাল, আর একশো আটটি শ্বেতপদ্ম। তামাক দে। গুরুবাবার জন্য বিশেষভাবে নিযুক্ত ব্রাহ্মণী হেমবালা তামাক তৈরি করতে লাগল।

গুরুদেব বললেন, নিজের যাহা উপার্জন
দান করিবে সেরূপ ধন |

পরের দ্রব্য দান করাও যা, না করাও তা। যেমন ধর না, এই গোলাপ ফুলের মালা, এ তো অন্যের বাগানের ফুল। তাড়াহুড়ো করে জোগাড় করেছিস। রতিকান্ত হঠাৎ প্রণিপাত হল। আপনি অন্তর্যামী। এই ফুলগুলো চাকর-বাকর দিয়ে আপনার সেবার জন্য বিডিওর কোয়ার্টার থিকে তোলা করিয়েছি আপনি জেনে গেছেন ঠাকুর ? অপরাধ মার্জনা করুন। গুরুদেব হো হো করে হেসে উঠলেন। বোক্কা কোথাকার। বড় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত করে ফেলিস তুই। এতে অলৌকিক কিছু নেই। আমি দেখলুম তোর বাগানে শুধুই কচু গাছ, লাউ গাছ, বেগুন গাছ। ফুল গাছই নাই, গোলাপ দূরে থাক।

দ্বিতীয়ত, এটা শহর নয় যে কিনতে পাওয়া যাবে। তাতেই সিদ্ধান্ত করা গেল এই ফুলগুলো হয় ভিক্ষালব্ধ নয়তো চৌর্যলব্ধ।

গুরুদেব তামাক খেতে লাগলেন।

বুঝলি, ধৈর্য বড় ভালো গুণ। সু-সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যেমন বৌমার গর্ভে দশমাস ধরে সন্তানটা পরিপূর্ণতা লাভ করছে। একমাস আগে যদি জোর করে প্রসব করানো হত তবে অপরিপুষ্ট হত। মুনি ঋষিরা সিদ্ধিলাভের জন্য হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করতেন। পুরাকালে নীলক পক্ষী নামে এক আশ্চর্য পক্ষী ছিল। তার পালক ছিল সুবর্ণময়। চক্ষুমণি হীরকখচিত। ওষ্ঠ মুক্তানির্মিত। বসন্তকালে ডিম্ব প্রসব করার পর ত্রিশ বসন্ত অতিক্রম হত। তারপর আরও ত্রিশ বসন্ত ডিমে তা দেবার পর সুসময়ে শাবক নির্গত হত। তাড়াহুড়োয় কিছু হয় না।

রতিকান্তর বালক ভ্রাতুষ্পপুত্র অবাক হয়ে শুনছিল। সে বললে—নীলক পাখির ডিম এখনো আছে বাবাঠাকুর?

গুরুদেব উচ্চৈঃস্বরে হেসে বললেন, হ্যাগো আচে বইকি, খুঁজলেই পাওয়া যাবে।

এইভাবে আরও কিছুক্ষণ ধর্মালোচনার পর ব্রাহ্মণী হেমবালাকে গুরুদেবের সেবার জন্য গুরুদেবের ঘরে রেখে রতিকান্ত শুতে গেল।


রতিকান্তর স্ত্রী ঘুমোচ্ছে। স্ত্রীর সাথে রতিকান্তর মাও আছেন। তার স্ত্রীর দু'একদিনের মধ্যেই সন্তান প্রসব করার সম্ভাবনা। তাদের বিবাহ হয়েছে প্রায় কুড়ি বৎসর। বহু চিকিৎসা ও অর্থব্যয়ের পর এই তাদের প্রথম সন্তান। আসন্ন সন্তানের নির্বিঘ্ন প্রসবের কামনায় স্বস্ত্যয়নের জন্য গুরুদেবের শুভাগমন। আগামী কালই স্বস্ত্যয়ন হবে। উপকরণ সবই সংগ্রহ হয়েছে। কেবল স্বোপার্জিত মৃত্তিকা ছাড়া। ওটা গুরুদেব নিজ হাতে তুলবেন।

রতিকান্ত শুয়ে শুয়ে ভাবে গুরুদেবের বাণী “তাড়াহুড়োয় জানিবি মরণ ধর্ম হল ধৈর্য ধারণ।” তাড়াহুড়ো করেই অনেক লোকসান হয়েছে ওর। মহেশ্বরী রাইস মিলের শেয়ারটা তুলে নিয়ে ও পাটের গুদামে ঢেলেছে। কারণ রাইস মিলে তেমন লাভ হচ্ছিল না। গত বছরেই ধানকলে সরকারি আইন পাল্টে গেল। ধানকলগুলো ইচ্ছেমতো দামে চাল বেচতে পারছে এখন। তাড়াহুড়ো না করে যদি একটু সবুর করত তবে কত পয়সা হত। দান দক্ষিণা, ব্রাহ্মণ ভোজনে আরও পয়সা ঢেলে সত্ত্বগুণ অর্জন করত সে। এখন আফসোস হয়। তার ছোট ভাইটকে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের তিন বছরের মধ্যেই ভাইটা মরল। ভাই-এর বৌ মরল আরও ছমাস পর। রেখে গেল ছেলেটাকে। এখন এই ছেলেটা পৈতৃক সম্পত্তিতে বখরা বসাবে। তাড়াহুড়ো করে যদি ভাইকে বিয়ে না করাত তবে এ ঝামেলাটা হত না।

আয়ু যখন কম--ভাইতে মরতই। পৈতৃক সম্পত্তিটা তবে রতিকান্তই ভোগ করত। তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা দিয়ে এখন আফসোস।

তাড়াহুড়ো করে কংগ্রেস ছেড়ে বাংলা কংগ্রেসে ঢুকেও কম ভুল হয়েছিল ? এখন বাংলা কংগ্রেস নেই। কংগ্রেসে ঢুকেও সেরকম সম্মান পাচ্ছে না রতিকান্ত। নাঃ, এ দোষ শোধরানো দরকার। ওর সন্তানকে, গুরু কৃপায় পুত্র সন্তানই হবে আশা করা যায়, জ্যোতিষীরও তাই মত, ধৈর্যের গুণ শিক্ষা দেবে। শিশু বয়েসেই।

গুরু দেবের বাণী মনে পড়ে রতিকান্তর। নিজের যাহা উপার্জন, দান করিবে সেরূপ ধন । খুব খাঁটি কথা। খুব খাঁটি কথা...একটু পরে গুরুদেবের পান খাবার বাটা আর রেকবি গড়িয়ে গড়িয়ে রতিকান্তর ঘরে চলে আসে। গতকালই পানের বাটা আর রেকাবিখানা গুরুদেবকে দান করেছিল রতিকান্ত ।

রেকাবিখানা মশারির বাইরে নাচতে লাগল, বলতে লাগল এ আমি তোমার লয়, আমার মুনিব নিশিচরণ। গুরু তোমার দান লেয়নি, আমি লইতো তোমার উপার্জন।


আর আমনি রতিকান্তর মশারির বাইরে নিশিচরণ এসে হাজির, হাতে সেই থালা। আবার বিরাট কত্তালে রক্ত কঁপানো আওয়াজ তুলল “ঝম”। আর আমনি বায়োস্কোপের মতো পুরোনো হিস্টিরি দেখতে পায় রতিকান্ত---

নিশিচরণের ছেলেকে সাপে কাটার পর ছেলে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে, দুলু ওঝা মাথা নাড়িয়ে মন্ত্র পড়ছে।

ফিঙার বচনে ফিঙি
পাতিলেন বিষ
ভস্ম যারে কালকূট সাপের বিষ
মনসী দেবীর আজ্ঞায় রূংরাং সোহায়—

এমন সময় ছুটে এল সেই ছোঁড়াটা, কিনা নাম, সাধন, প্রাইমারি মাস্টার। এসে বললে--ওঝায় কী হবে, শহরের হাসপাতালে পাঠাও।

নিশিচরণ পরের দিন এল রেকবিটা হাতে নিয়ে.এটা রেখে পাঁচটা টাকা দ্যান বাবু, এটাই সম্বল আর কিছু নাই।

—কী হবেরে, মদ খাবি বুঝি ?

--ব্যাটারে ভরতি করেছে সোহারের হাসপাতালে, মোর পরিবার ছেলেডা দেখার মন করেছে। যাওয়া আসার ভাড়া নাই।

থালাটা রতিকান্তর ঘরে রইল। পাক্কা একসের ওজন। কারুকার্য করা। রতিকান্তর বউ মহা খুশি। এক বছর পর নিশিচরণ এল আবার।

বাবু টাকাটা এনেছি। থালাড ফিরতি দ্যান।

—নিবিখনে, আছে থাক না, নিলেই তো বেচে দিবি। বলেছিল রতিকান্তর বৌ।

—তা থাক কেনে, অঘ্রানে লেব খনে।

অঘ্রানে আবার এল নিশিচরণ, বাবু থালাডা দ্যান, ওটাই সম্বল, ট্যাকাডা লেন।

--কত টাকা এনেছিস ?

—কেনে পাঁচ ট্যাকা।

—সে তো আসল। ডেড় বছরের সুন্দ কত জমেছে, জনিস? বারো টাকা লাগবে।

নিশিচরণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সোজা তাকাল রতিকান্তর চোখের দিকে— থালাডা ছেনিয়ে নিলেন গো বাবু...।

নিশিচরণ চলে যাচ্ছে মশারির পাস থেকে। থালাটাও সঙ্গে সঙ্গে। রতিকান্ত দ্যাখে।


এবার এল হেমবালা হেলেদুলে। গুরুসেবার জন্য গুরুর ঘরে ছিল। হেমা এসে বলল— গুরুদেব ফিরিয়ে দিলেন। সেবা নিলেন না।

রতিকান্তর মনে পড়ল গুরুদেবের বাণী--নিজের যাহা উপার্জন...।

ঝম্‌। আবার পুরানো হিস্টিরি।

--হেমবালার স্বামী হেরম্ব নামাবলী গায়ে কাশছে, আর হাঁপাচ্ছে। রতিকান্তর গোপাল জিউর নিত্য সেবার জন্য আসতে গিয়ে, বারান্দায় বসে পড়েছে কাশতে কাশতে।

--হাঁপানিটা বেড়েছে বুঝি ?
রতিকান্ত বলছে।

--হ্যাঁ, বেড়েছে খুব। এক যজমান পুরীতে নিয়ে গেছিল, গত বছর শীতে ভালো ছিলাম।


এর পরের দৃশ্যে রতিকান্ত হেরম্ব পণ্ডিতের বাড়িতে। ঘরে বুড়োর যুবতী স্ত্রী। দ্বিতীয় পক্ষ। গোপন আলাপ। প্রিয় সম্ভাষণ। হারমোনিয়ামে ষড়যন্ত্রের বাজনা।


পরের দৃশ্যে পুরী যাচ্ছে হেরম্ব। রতিকান্তই খরচ দিল। মাসে মাসে কিছু টাকা পেনসন দেবে কথা দিল রতিকান্ত।

পরের দৃশ্য।।
হেমা--ছিঃ ঘেন্না ঘেন্না, আমি তো পরস্ত্রী।
রতি--তুমি বৈষ্ণবী আমিও বৈষ্ণব। বৈষ্ণব শাস্ত্রে পরকীয়া প্রেমে পাপ নাই। ফুটন্ত ফুলে ভ্রমর বসবে না, তা কি হয় ?

আরও কিছুদিন পরের আরেক দফা সংলাপ।
রতি-- গুরুদেব ওই পাপের কী প্রায়শ্চিত্ত।
গুরু—পাপ কি? কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছায় পাপ নাই। শরীরেই শ্রীকৃষ্ণের অধিষ্ঠান।

সকালবেলা উঠে রতিকান্ত বুঝল কাল সারারাত দুঃস্বপ্ন দেখেছে সে। হেমবালাকে জিজ্ঞাসা করল, জানতে পারল, গুরুদেবের কোনো অসুবিধা হয়নি রাত্রে। হেমবালা ঘণ্টা খানেক পা টিপতেই গুরু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তারপর রতিকান্ত শুনল ওর বউয়ের ব্যথা উঠেছে। তারপর রতিকান্ত গুরুদেবের চরণামৃত নিল। রতিকান্তর বউও চাইছিল চরণামৃত। গুরুদেব বাধা দিলেন। আজ তোমার পুজো । তোমার বিশ বছরের বিবাহিত সার্থকতম দিন আজ। আজই হয়তো তোমার সন্তান হবে। আজ আর আমার চরণামৃতের প্রয়োজন নেই।

রতিকান্তর বড় আনন্দ হচ্ছে। বিশ বছরের আকাঙ্ক্ষিত পিণ্ডদানাধিকারী আসছে।


গুরুদেব স্বস্ত্যয়নে বসবেন। লোকজন ব্যস্ত। হোমকুণ্ড তৈরি। শুধু স্বোপার্জিত জমির তিন হাত গভীর থেকে সংগৃহীত মৃত্তিকা বাকি রয়েছে।

রতিকান্তর মনটা এখন কেমন কেমন করছে। গতকাল সাধন মাস্টারকে স্বপ্ন দেখেছে রতিকান্ত। গণ্ডগোলের সময় সাধন মাস্টার বলত রীতিকান্তকে, --আপনার এক খণ্ড জমিও আপনার নয়, সবই জোচ্চুরি করা। ওই জমিতে আপনার অধিকার নেই।

রতিকান্ত ভাবে--বলনা মৌজার বিশ বিঘা জমি হল বিয়েতে যৌতুক পাওয়া। ওটা ওর স্বোপার্জিত হল না। বাগ্‌দা মৌজার জমি পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া, অভিরামপুরের জমিও পৈত্রিক। হাজরা পুকুরের পশ্চিমপাড় ,পাঁচু বাগ্‌দিকে ঠকিয়ে নেয়া। বুড়োশিব মন্দিরের জমিও কৌশলে ভোগ রতিকান্ত। রায়চরের জমিও বিষয়বুদ্ধির বলে সাঁওতালদের সরিয়ে দিয়ে জোগাড় করেছে রতিকান্ত। বাকি থাকে বলনা মৌজার জাম গাছতলার ডাঙা জমিটা।

গত বছর অঘ্রানে ধান কিনে ভদ্রে বেচে দিয়ে যে লাভ হয়েছিল তাতেই কিনেছিল জমিটা! উঁচু জায়গা, নিরিবিলি। ভেবেছিল ওখানে একটা মন্দির পেতিষ্ঠা করে সত্ত্ব ধর্ম করবে।

মনে হল ওই জমিই স্বোপার্জিত। তাছাড়া পবিত্র। মাটি কাটার জন্য লোক লস্কর, চাকর বাকর আর গুরুদেবকে নিয়ে রতিকান্ত চলল বলনা মৌজার জামগাছ ডাঙায়। পেছন পেছন চলল বাপমা মরা রতিকান্তর ভ্রাতুষ্পুত্র।

রতিকান্তর মনে আনন্দ। পবিত্র মাটি পাওয়া গেছে। ধনশালী বলশালী সন্তানের জন্য স্বস্ত্যয়নের সব উপকরণই হাতের কাছে। হয়তো আজই বাপ হবে। ঢ্যামনা বদনাম ঘুতে চলেছে তার।

জামগাছ তলা খোঁড়াখুড়ি হচ্ছে। দূরে রোদ্দুর পোহাচ্ছে গুরুদেব। রতিকান্ত তদারক করছে। চারিপাশে পাকা ধান।

যে ছোটলোকগুলো খোঁড়াখুড়ি করছিল—তারা শাবলের ডগায় শক্ত স্পর্শ পায়, তারপর একটু মাটি সরায় ওরা। মোহরের বাস্‌কো! চিৎকার করে ওঠে চাকর বাকর লোক লস্কর। রতিকান্তর ভ্রাতুষ্পপুত্র ছুটে এসে ঝুকে দাঁড়ায়--তারপর চিৎকার করে ওঠে— গুপ্তধন । গুপ্তধন ।

সাধারণ প্যাকিং কাঠের বাক্‌স। রতিকান্ত ভাবে এরকম কাঠের বাক্‌সে তো গুপ্তধন থাকে না। রতিকান্ত বাক্‌সটার ডালি খুলতে হুকুম করল।

এবার দাখা গেল বাক্‌সের মধ্যে দড়ি প্যাঁচানো গোল বলের মতো কী সব। রতিকান্তর চাকরবাকর ওগুলো চিনল—চিনেই দূরে সরে গেল। রতিকান্ত ঝুঁকে পড়া ভ্রাতষ্পুত্রকে হাত ধরে টেনে দূরে সরিয়ে নিল—তারপর চাকর-বাকরকে হুকুম করল—ওখেনে বালতি করে জল ঢেলে দে।

রতিকান্তর শিশু ভ্রাতুষ্পপুত্র জিজ্ঞাসা করল—ওগুলো কী জেঠু, ওগুলো কি সেই নীলক পাখির ডিম?
রতিকান্ত রেগে বললে—তোর মুণ্ডু, সাধন মাস্টার এইসব ডিম পেড়ে রেখে গ্যাছে।
গুরুদেব শুধুলেন—ওখেনে হট্টগোল কেনে ? কী উঠলরে মাটির তলা থেকে
রতিকান্ত বললে--বোমা।

গুরুদেব বললেন—সমুদ্র মন্থনে কখনো ওঠে হলাহল, কখনো অমৃত
রতিকান্ত বললে—এ বড় বিপজ্জনক, এধারে আর খুঁড়তে হবে না। এগুলো থাক এখেনে, পরে থানায় খপর দোবখনে। রতিকান্ত ওই ডাঙা জমিতেই অন্য একটা স্থান নির্দেশ করে খুঁড়তে বললেন।

একটু পরেই আবার চিৎকার করে উঠল মাটি খোঁড়ার চাকর বাকর—লরকঙ্কাল বাবু। রতিকান্ত দেখে মাটির ভিতর থেকে উজিয়ে আছে হাড়, মাথার খুলির একটু অংশ। কাউকে গোর দিয়েছিল বোধ হয়—কোদালের ফলায় ক্রমশ আরও কিছু মাটি উঠে আসে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসছে কঙ্কালের শরীর, দুটো হাত ভাঁজ করা বুকে, গায়ে গুটিয়ে রয়েছে একটা সুবজ রং এর জামা, অথচ শরীরের সমস্ত মাংস রক্ত মাটির সূক্ষ্ম আনাচে কানাচে মিশে আছে। রতিকান্ত দু আঙুলে চোখের কোনার ছোট্ট লাল রং-এর মাংস চেপে ধরে, চোখের কোনা থেকে উঠে আসে পিচুটি। কঙ্কালের শরীর। বুড়ো কচুর মতো এখন মৃত হাড়ের রং, হাত দুটো বুকের কাছে স্থির, সবুজ জামাটা গুটিয়ে রয়েছে—হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল কেন শাবল আর কোদালের শব্দ ?

--ভদ্রলোক ছিল যে গো, কেউ খুন করেনছে—কাজের লোকেরা বলে ওঠে।

চাকর-বাকরদের কোদাল শাবল আর নড়ে না, ভরা গর্তটার দুপাশে নিথর দাঁড়িয়ে। ওরা কি চিনতে পেরেছে এই সবুজ জামা ? ওরা কি গোল হয়ে কোনো মৃত অজগর দেখছে ?

রতিকান্তর ঘাড় গর্দন বেয়ে ঘাম নামছে। গরমের পিচ্‌ রাস্তার মতো তেতে উঠছে চামড়া, রোদ্দুরটা বড়ো তপ্ত মনে হচ্ছে--চোখ বুজল রতিকান্ত— চোখ বুজলেই দেখতে পায় ঝড়ের নারকোল গাছের মতো মাথা নাড়ছে সাধন মাস্টার। রতিকান্তর কানের মধ্যে গো গো করছে পেট্রোম্যাকসের শব্দ। চোখের সামনে সাধন মাস্টারের বুক চাপড়ানির শব্দ। রতিকান্ত ভাবতে চায় না সাধন মাস্টারের সেই চোখ, সেই দাঁতে দাঁত, গলার পাশের উঁচু হওয়া নীল শিরা। হরকান্তর

মেজ ছেলেটা এক হাজার টাকা নিয়েছিল, ও বলেছিল সাধন মাস্টারের লাশ ফেলে দিয়েছে কুনো নদীর বানের জলে। ধোঁকা দিল ?

রতিকান্ত চোখ মেলে—কুনো নদীর বান ওইখানে কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে। কালবৈশাখীর মেঘের ডাক ওইখানে কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে।

ডিভিসি ক্যানেলেরশ লক্‌গেট ছেড়ে দিয়েছে যেন কেউ,--রতিকান্ত জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে, দলা পাকিয়ে, গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে যাচ্ছে, ঢিলের মতো, বাচ্চাদের মর্বেলের মতো গড়াচ্ছে, ছ্যাঁচড়াচ্ছে, ধানকল, আখ মাড়াইয়ের মেশিন জোত জমা গাইবলদ দলিল পড়চা পঞ্চায়েত সব নিয়ে—তাল গোল পাকিয়ে, দলা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ...রতিকান্ত চিৎকার করে—গর্ত বোজা, এখুনি, এখুনি। নিচু হয়ে তুলে নেয় এক খাবলা মাটি, সবুজ জামার ওপর ছুড়ে দেয়, সবুজ জামা নড়ে ওঠে আর ওমনি নড়ে ওঠে জয়া-রত্না আই আর এইট্‌ এর মাঠ। দুহাতে খাবলা খাবলা মাটি তোলে, ছুড়ে দেয় সবুজ জামায়, সবুজ জামাটা আড়াল করা দরকার। অসহ্য।

কিন্তু চতুর্দিকের সমস্ত মাঠ জুড়ে ছড়ানো সবুজে, রতিকান্ত দেখে সাধন মাস্টার শুয়ে আছে। পরনে সবুজ জামা।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন