রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সোহেইল মুশফিক'এর গল্প : বিড়ম্বিত হেঁশেলের তিতপুঁটি ও গলে যাওয়া একটি গোলাপী লাক্স


অন্যদের ছোট দেখাতে পারলেই বুঝি নিজেকে বড় করে দেখানোর সম্ভবনা সৃষ্টি হয় ! কারওয়ান বাজারের মোড়ে,নিজেদের মধ্যে পরস্পর,সে সম্ভাবনার সচেতন খেলা খেলেছে পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতারা। আকারে প্রকারে ও বিশালত্বে একজনের চেয়ে একজনের হোর্ডিং বড়। বিশাল বিশাল হোর্ডিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলিকে বড্ড বেশি ছোট লাগে। এশিয়া ও আন্তারাকেও ছোট লাগছিলো। পূর্ণিমা হলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল এক হোর্ডিংয়ের সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়ে এশিয়া। এশিয়া দাঁড়ায় বলে আন্তারাকেও দাঁড়াতে হয়।


স্বগতোক্তির মতো এশিয়া বলে,“মানু-ই এমন সুন্দর অয়!”

আন্তারা বলে,“অইবো না? বিশ্ব সুন্দরী বেডি ! অশুরিয়া রায়। বলুডের নাইকা।”

“লাক সাবান মাইক্যাই এমন সুন্দর অইছে ?”

“সুন্দর সুন্দর বেডিগরে টেহা খাওয়াইয়া কম্পানীর বেডারা ইতা করায়। লোবে পইরা মাইনষে যাতে ইতা কিনে! সাবান মাইক্যা যদি সুন্দর অওন যাইতো,বেঢক মানু থাকতো লো ছেড়ি দুইন্যাইত! খোদার কাম আর লাগলো না অইলে। মানু সুন্দর অইয়া গেলগা অইলে সাবান মাইক্ক্যাই। আসলে ইতানরে কয় একটা এডবিটিস! গেরাম দেশে বড়শি পাতে না মাইনষে ? খালি বড়শি কি মাছে গিলে ? মাছেরে বড়শি গিলাইতে অইলে টোপ দিতে অয়। এডবিটিস অইছে গিয়া বড়শির হেই টোপ। ইছার ধুরা মুখে না রোচলে আটার গুল্লি। তাও খাইতে না চাইলে মাডিত্তলের নিরালা লেডা জির। মুখে না খাইলে পুটকি দিয়া ঠাসবো ! না খাইয়া যাবি কই ?

আন্তারার কথা যেনো কানেই যায় নি! মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে এশিয়া বলে,

“আমারে একটা কিন্যা দিবা বুবু ?”

কপট রাগের ভঙ্গীতে এশিয়াকে টানতে টানতে আন্তারা বলে,“বালছাল ইতান পরে চোদাইছ হেডা! বেডারা কী তর লাইগা খাড়া করাইয়া রাখবো শু ?”

বোনের সজোর টানে সাড়া না দিয়ে পারে না এশিয়া।

যেতে যেতে সে বলে,“ডাহা শহর আইয়া জবর আ-কতা শিক্যা লাইছো বুবু!”

আন্তারা বলে,“ছেড়ি কয় কি! চৈতারকান্দার জবান লইয়া থাকলে না বুনি টাইন্যা নাইয়্যাত নামাইয়া লাইবো বেডাআইতে?”

আন্তারার এই কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে এশিয়া।

সিনেমা হলের সামনে গিজগিজ করছে লোক । কাউন্টার থেকে টিকিট পেলো না ওরা । ব্ল্যাকে কাটলো টিকিট। নীচতলার অনেকখানি জায়গা পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলা। ভীড় ঠেলে যেতে যেতে কাঁচুমাচু করতে থাকে এশিয়া।

আন্তারা বলে,“কি অইছে তর ?”

ফিসফিস করে এশিয়া বলে,“পিছের বেডাডা বারবার খালি পাছায় আত দিতাছে।”

আন্তারা বলে,“তুই খুইট্যা লড়াইছ না। দেখ ক্যামনে চিফাকাডি দিয়া ধরি খাইনকারে।”

পেন্ডুলাম যখন দুলতে থাকে,দুলতেই থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল পেরোয়। বিকেল গড়িয়ে রাত। কেউ ঘাড় ধরে না থামালে খামতেই চায় না উজবুকটা। পেন্ডুলামটা যখন তালে আছে তালেই থাকবে। ভাও বুঝে আন্তারাও রইলো তাকে তাকে। এশিয়ার পাছায় পুনর্বার হাত দিতে দেরি করলো না লোকটা। আন্তারা খপ করে ধরে ফেললো লোকটির হাত।

“পাছায় আত দিলেন ক্যান ?
খেঁকিয়ে উঠলো লোকটি।

“ভীড়ের মইধ্যে লাগতেই পারে।”

আন্তারা পাশের লোকটিকে দেখিয়ে বললো,“ইলারটা দি লাগে নাই।”

লোকটি মুখ ভেংচিয়ে বললো,“এতোই যখন পাছায় ঝাল সিনেমা হলে না আইলেই হয় ছেড়ি মাইনষের।”

বাঘিনীর হুংকার ছাড়ে আন্তারা।

“চু উ প !”

হুংকারের কোনো শ্রেণি চরিত্র থাকে না। থাকলে বাঘকেই ভয় পেতো লোকে,বাঘিনীকে নয়। হুংকার এমনই এক দোর্দন্ড প্রতাপের তূর্য-নাদে,বাঘে মোষে এক ঘাটে জল খেতে খেতে ভুলে যায়,কার ঔরশজাতের অধীন সে। বাঁদির না বেগমের!

আন্তারার এক চুপে চুপ মেরে যায় পুরো ভীড়। ধৃতমান চাটুজ্জ্যেও নুইয়ে ফেলে ঘাড়।

আন্তারা বলে,“আপনের পাছায় তো আবার ঝাল নাই ! ডাক দিমু নি পোলাপাইন ? লইতারবেন নি ক্ষেত পাথাইল্ল্যা হাঁটা ?”

লোকটি করুণ চোখে আন্তারার দিকে তাকায়।

আন্তারা কথা থামায় না ।

“বেটা অইছেন বইলা জুতার শুকতলি উইন্ন্যা বুতাম অইয়া গেছেনগা না ! পিচের ততায় হগলতের পায়েই সমান ঠসা পড়ে ।”

লোকটি কোনো কথা বাড়ায় না আর । ঘাড় নীচু করে আঙ্গুলের নখ খুঁটতে থাকে ফ্লোরে। আন্তারাও ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে আসে। ক্রমেই শিথিল হয়ে আসে তার হাত। লোকটি ছাড়া পেয়ে দাঁড়ায় না একমূহুর্ত। প্রায় দৌঁড়ে মিলিয়ে যায় জনারণ্যে। লাইন ধরে ততোক্ষণে হলের ভেতর ঢুকতে শুরু করেছে লোকজন । এশিয়াকে নিয়ে আন্তারাও ঢুকে পরে। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে লাইটের আলো ফেলে আসন চিহ্নিত করে দেয় লাইটম্যান। দুই সারির মাঝ বরাবর সরু পথ ধরে নিজেদের সিটে পৌঁছতে পৌঁছতে জাতীয় পতাকা উড়তে শুরু করে দেয় পর্দায়।

নিজের আসনে বসতে বসতে এশিয়া বলে,“তোমার দি দেখি ডর ভয়ের বীজ নাই বুবু !”

“বাঘের ডরেই ঘরে হান্ধাই নাই, চিকার ডরে কাপড় নষ্ট করতে কছ ?”

আন্তারার চোখ পর্দার দিকে। কিন্তু এশিয়ার তখনো ঘোর কাটছে না। বিস্ময়াভূত হয়ে সে আন্তারার দিকে তাকিয়ে রইলো।

দশ বারো বছর বয়সেও রাতের বেলা ঘরের বাইরে মুততে যেতে ভয় পেতো আন্তারা। তার জন্য ঘরের কোনায় পেশাবের ডাইলা রাখতে হতো নিয়ম করে। ডেকে না মুতালে মুতে দিতো বিছানায়। সেই মুতে খেতা ভিজে পাটি ভিজে কেতকেতা হয়ে যেতো মাটির লেপ। সকাল হতে হতে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া সেই মাটিতে পাটির রেখ পড়ে যেতো। বিছানা তুলতে গিয়ে মুতে ভেজা সেই মাটির লেপ পরোলে পরোলে উঠে আসতো পাটির জমিনে।। জয়গুন কতোদিন সেই মুতে ভেজা মাটিতে লবন ছিটিয়ে ঘাড় ধরে লেইয়ে লেইয়ে খাইয়েছে মেয়েকে। বিছানায় মুতে দেয়া তবু ঠেকাতে পারে নি আন্তারার।

সমবয়সীরা ‘পাদ ডরাইন্যা’ বলে ক্ষেপাতো আন্তারাকে। পাদের কোনো সময় অসময় ছিলো না আন্তারার। বলা নেই কওয়া নেই আচমকা ফসকে যেতো পাদ। ছি কুতকুতের কেনা ঘরে কলসীর কানায় দাগ কাটতে কাটতে আচমকা পাদ ফসকে গেলে ভোঁ এক দৌঁড় দিতো টাট্টিখানায়। ফিরে এলে শৌচের ভেজা হাত দেখতে চাইতো খেলার সাথীরা। লজ্জা লুকাতে আন্তারা বলতো,“মুততে এনা গেছি! আমি কী হাগতে গেছি লো?”
সেই আন্তারা এখন চিকার ডরে কাপড় নষ্ট করবে দূরে থাক, বাঘের ডরেই ঘরে হান্ধায় না। একটু আগে সেই নমুনার খানিকটা নিজ চোখেই দেখলো এশিয়া। পাঠামারার বিস্তির্ণ বিশাল চক আর বাইলা ধরার বিল সংলগ্ন গ্রামগুলির বাইরে জীবনে প্রথম সশরীর পা রেখে, অচেনা ঢাকার চেয়ে চেনা সহোদরাকেই এশিয়ার চোখে অচেনা ঠেকতে থাকে বেশি। না ভাঙ্গতে পারা হুল্ডুকের মতো তার সামনে পরে ঘুরপাক খেতে থাকে আন্তারা। যার ঘাড় আছে মাথা নাই,পেট আছে য়ুজুরি নাই।

যতোবারই পোয়াতি হতো জয়গুন,একটা ছেলে পয়দানোর দূর্নিবার আকাঙ্খা দিনমান তাকে অস্থির করে রাখতো। আজান দিয়ে জানান দিতে চাইতো সে ছেলের সুসংবাদ। কিন্তু প্রতিবারই শুনতে হয়েছে তাকে কন্যা দুঃসংবাদ। পর পর চারবার জয়গুনের পেটে কন্যা দুঃসংবাদ শুনতে শুনতে গাল চাপা ঝুলে গেছিলো তার। কন্যা জন্মের দায় ও দূর্ভাগ্যের অনাগত ভবিষ্যৎ জপতে জপতে তিরিশেই সে নেমে গেছিলো তিপ্পান্নের কোটায়। অভাব অনটন আর অবজ্ঞা অবহেলায় মাঝের দুটি মরে গিয়ে যে দুটি টিকে গেছিলো তারমধ্যে বড়টি আন্তারা আর ছোটটি এশিয়া ।

আন্তারা ও এশিয়া অনেকটা অনাদর অবহেলায় বড় হচ্ছিলো । পুত্রের বাপ হতে না পারার একটা গোপন প্রতিশোধই হয়তো নিচ্ছিলো সে মেয়েদের উপর। মেয়েদের দিকে হাসুর বিশেষ একটা চোখ পরে সিকদার বাড়িতে একদিন ছৈয়লের কাজ করতে গিয়ে।

তরজার বেড়া বাইনের মুলির পরোল ছিলছিলো সে। বেতের মোড়ায় বসে হুঁকোর আগুনে রংপুইরা তামাকের মজা টানতে টানতে কথা বলছিলেন ময়নাল সিকদার।

“পোলা ছাওয়ালের লগে মাইয়া ছাওয়ালের একটা তফাৎ কি জানো হাসু?

“মুখ্যূ সুখ্যূ মানু আমরা। এতো কিছু জানমু কইত্তে সিকদার সাব!”

হুঁকোয় একটা জবর টান দিয়ে সিকদার সাহেব বলেন,“পোলা ছাওয়াল মুসলমানী দেওয়ার আগে খুব একটা ব’লে না, বুঝলা? মাইয়া ছেড়ি জুয়ান অইয়া যায়গা লাউয়ের ডোগার লাহান লক লকাইয়া। দুই মাইয়ার বাপ তুমি। ঝাকার জোগাড়যন্ত্র করতাছো নি কিছু ? বিয়া শাদী দেওন লাগবো না ! ”

শুকনো হাসে হাসু।

“ভাতই পাই না দুধ রোজ ! একটার পর একটা মাইয়া দিতে দিতে আর কিছু দেওয়ার কতা আমারে মনে আছে চুদির পুতের ?”

“নাফরমানী কতা কইয়ো না। আদমের উপর কন্যা সন্তান খোদাতালার এক শ্রেষ্ঠ নেমত ।”

“আউশে আউশে পোয়াতি অইয়া বিয়ানের মজা বুঝতাছি।আপনে কন নেমত !”

“জীবনে পড়ছো এক য়োক্ত নোমাজ ? কইতারবা কোরান হাদিসের এক দুই লাইন ? তাইলে ক্যামনে বুঝবা কোনটা নেমত আর কোনটা কেমত ?”

ময়নাল সিকদারের এই কথায় অনেকটা নরম হয়ে আসে হাসু। নেয়ামতের বিষয়টা বুঝতে উৎসাহিত হয়ে উঠে সে।

“বিষয়টা আমারে একটু বুঝাইয়া কনচাই দেহি সিকদার সাব?”

আড়চোখে হাসুর দিকে তাকিয়ে সিকদার সাহেব বলেন,“কন্যাযোগ যার বালা,তার হাতে গরু ছাগল খুব ফলে। এখন তো পানিতেও চলে না তোমার নাও। কয়টা গরু ছাগল পাইল্যা দেখো। শুকনা দিয়া চলবো। এইটারে কী কম নেমত মনে করছো ?”

“নেমতই যদি দিলো, নেমত থোয়ার কিসমত দিলো কই চুদির পুতে ? খাইয়া পিন্ধা একটা মুরগা কিনার টেকা থাকে না,গরু কিনমু কি দিয়া ?”

“খোদায় বান্দারে নিজের হাত দিয়া সব কিছু দেয় না বেকুব। একটা উসিলা দিয়া দেয়। চোখ দিয়া খুইজ্যা বাইর করার ক্ষেমতা লাগে হেই উসিলার মানুডারে। গরু কী কোনো ব্যাপার ? চাইলে আমিও কিন্যা দিতাম পারি। পুঁজি ফেরত দিয়া বাদবাকী লাভের অর্ধেক তোমার অর্ধেক আমার। ব্যাপার অইছে তোমার গর্জ।”

বলতে বলতে হাসুর হাতে হুঁকোটা দেয় ময়নাল সিকদার।হুঁকো টানতে টানতে ভাবতে ভাবতে কল্কির তামাক পুড়ে খাক করে ফেলে হাসু।

ময়নাল সিকদার বলে,“পানিত পইড়া গেলাগা নি !”

লাজুক হাসিতে হাসু বলে,“গরজো আমার সেরের উফরে সোয়া সেরই আছে। দুই কাম এক লগে কইরা পারমু নি হেই চিন্তা করতাছি।”

সরু চোখে ময়নাল সিকদার বলে,“মাইয়া জোড়া দিয়া কী পাল্লা দিবা নি ঘরের ?রক্ত-মাংস পানি কইরা বড় করতাছো তুমি আর মধু খাইবো নিয়া আরেক বেডায়। আর হেই বিয়াও দিতে অইবো তোমার টেহা পইসা ভাইঙ্গাই। কইখান তাইলে কইয়ের তেলেই ভাইজ্যা দেও ! বিয়ার খরচা পাতি মাইয়াগরে দিয়াই ওসোল করাইয়া লও।”

ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে হাসু ছৈয়ল বলে,“কতা তো কইছেন ঠিকই সিকদার সাব কিন্তু সমস্যা অইছে জয়গুন। খালি পড়া পড়া করে। ঘরের এই কছের কুডা হেই কছে লাড়তে দেয় না মাইয়াগরে।”

খানিকটা অসহিষ্ণু হয়ে ময়নাল সিকদার বলে,“পোলাপাইনের গু ফালানো ছাড়া মাইয়া মাইনষের সাটিফিট হাজারে কামে লাগে একটা। আইয়ে পাশ কইরা কার বালডা ছিঁড়ছে নুরু মন্ডলের মাইয়া ! বিয়া দিতে দি হেই পাঁচ লাখই লাগছে। লাভটা কী অইলো মাইয়া পড়াইয়া ? নুরু মন্ডলের ধার আইতেও কাটলো ছেড়ি যাইতেও কাটলো।”

সেই তুলনায় হাসু ছৈয়লের ধার ভার কোনোটাই নাই। পুরোটাই ভুতা দাও। শুকনা দিয়ে নাও চালাতে হলে খোদাতালার নেয়ামতের উপর ভরসা করা ছাড়া তার গতি নাই। কৈয়ের তেলেই তাকে কৈ ভাজার জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। নিদানের পথ বাৎলে দেয়ার কারণে ভেতরে ভেতরে ময়নাল সিকদারের প্রতি সে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়ে গেলো। সে রাজী হয়ে গেলো ময়নাল সিকদারের প্রস্তাবে।

গরুর হাটে হাঁটতে হাঁটতে ময়নাল সিকদার বলে,“ডেহা কী এঁড়ে কিনবা না বকনা ?”

হাসু ছৈয়ল বলে,“উপুইত্যা পইরা আর ছয়মের রোজা রাখতাম না সিকদার সাব! তিন গাই পালতে পালতে এমনেই জীবন তামা। কিনলে বেডা গরুই কিন্যা দেন।”

বেরাইম্যা দেখে দুটো এঁড়ে বাছুর কিনে ফেললো ময়নাল সিকদার।

এঁড়ের ডিগ্লা হাসু ছৈয়লকে বুঝিয়ে দিয়ে ময়নাল সিকদার বলে,“পালার গরু বেরাইম্যা বালা। পূঁজি কম পরে। হাসিলসহ তিরিশ পরলো। লাখ টেহার মাল করতারো যদি কানা অইয়া পাইতিরিশ তোমার। লাবঐ লাব। চা সিগারেট আর পুঁজিতে আনলাম না। বিসমিল্লা বইলা শুরু কইরা দেও পালা। তয় শুকনায় ফালাইয়ো না আত। যত্ন লইয়া পালতে কইয়ে মাইয়াগরে। পাতের খিচুরীতে যেনো পাইন্যা পরে।”

হাসু ছৈয়লের এই সিদ্ধান্তে একেবারেই রাজী ছিলো না জয়গুন।

“সিকদারে কয় সিকদারের স্বার্থের কথা। ঘরে পইরা থাকা অলস টেহা খাইলো অইলে উলুয়ে, আপনেরে বেকুব পাইয়া ধরাইয়া দিছে পাখনা গজানোর দায়। আপনের মাইয়ার স্বার্থ আপনে দেখবেন না ?”

স্ত্রীর কথা শুনে খেঙ করে উঠে হাসু ছৈয়ল।

“মাইয়াছেলা পড়াইলেও যা না পড়াইলেও তা। ফুইবো তো হেই জামাইর তলেই আর বাগার দিবো একই মুশুরীর ডাইল ! বালা একটা হাংগা বিয়া দিবার চাইলে গরুর গতরে গোস গজাইবার ক । টেকা পইসার কাম পড়ায় দিবো না।”

রোজগার করে ছৈয়ল। কাজ থাকলে রান্না চড়ে চুলায়। কাজ না থাকলে উপোস কাটায় পুরো সংসার।। সংসারে এতো খাটে জয়গুন তবু কামাইহীন দিনে তার এতো খাটারও কোনো মূল্য থাকে না। জয়গুনের এতো ভালো রান্না জানা হাত নিমনাম বেকার পরে থাকে সেই দিন। সংসারে এতো খাটা সত্বেও রোজগারে নিজের সরাসরি হাত না থাকায়, কখনোই নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো মূল্য পায় নি জয়গুন। এবারও সে ব্যর্থ হলো। সংসারে নিজের খাটনির মূল্য হিসেবে মেয়েদের পড়ালেখা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেছিলো সে। ছৈয়ল চরম অবজ্ঞায় মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে তার সেই অনুরোধ। ফলে পাঠের পঞ্চত্ব পঞ্চমেই ঘটে গেলো আন্তারার। আগের লাঙ্গল যেভাবে হাঁটে পেছনের লাঙ্গলকে সেভাবেই হাঁটতে হয়। এশিয়া পেলো না স্কুলই। এঁড়ের ডিগ্লা হাতে চকে-পাত্থরে ঘুরে বেড়াতে লাগলো বোনের পিছে পিছে। গরুর গতরে গোস গজাতে গজাতে, এমনি করে একদিন,অগ্রহায়ন মাসের শীত শীত এক শীতের রাতে, চৈতারকান্দা গ্রামে ইসমাইল শা’র উরশ এসে পরে। নারী পুরুষের রুহানী বিবাদ নিয়ে তরজায় অবতীর্ণ হয় মাতাল মনছুর আর মমতাজ। সেই তরজা দেখতে আট দশ গ্রামের নারী পুরুষে ভরে যায় শামিয়ানার চাতাল। সারারাত মমতাজের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে জাতের চিরতায় চিঁড়ে ভেজানোর কৌশল নেয় মাতাল মনছুর। টংকারের বদলে ঢংকার উঠে। মাতাল মনছুরের দোতারার কাঠখোদাই থেকে সদলবলে উড়ে যায় ভাবের যতো ময়ূর টিয়া । শেষ রাতের দিকে খেমটা তালে ভূজঙ্গ তীর ছুঁড়ে সে। মারেফতকে এক টানে নামিয়ে নিয়ে আসে শরীয়তে।

“মাইয়া তোর পঁচা কাঁঠাল
বিক্রি দিবি কোন জায়গায়
এই পূরুষে না জিগাইলে
ঘরের কোনায় থাম লাগায়
মাইয়া তোর পঁচা কাঁঠাল……….. !”

দর্শক শ্রোতাদের সিংহভাগই পুরুষ। পাতার আড়ালে য়োমাইল্ল্যা ভাবের ঢুপি দেখতে দেখতে সুখের ঘুড়ি তাদের আকাশ খুঁজে পাচ্ছিলো না। মাতাল মনছুর সেটাকে ল্যাংটা করে দিলে বুনো ষাড়ের উন্মাদনা জাগে তাদের শরীরে। মুহুর্মুহু জিগারে প্রকম্পিত করে তুলতে থাকে তারা দরগার মাটি। মাতাল মনছুর পঞ্চমে থাকলেও তারা চড়ে বসে সপ্তমে। পঁচা কাঁঠাল আরো পঁচাতে থাকে। নির্মল গানের পাখিটাকে হাতের কাছে মৃত পেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মমতাজ। মমতাজের মুখের দিকে তবু তাকানো যাচ্ছিলো। আন্তারার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। আচমকা এক হ্যাঁচকায় ছোট্ট এশিয়াকে বগলদাবা করে বেরিযে আসে সে আসর ছেড়ে। বাড়ি যেতে যেতে, অনিচ্ছুক কামড়ে মুড়ালী খেতে খেতে এশিয়া বলেছিলো,“তুমি এতো চেতছো কেরে বুবু ?”

একটি কথাও সেদিন ব্যায় করে নি আন্তারা।

বৃষ্টির জলে পানসে হয়ে গেছে কতো পেয়ারার মিষ্টি ! আন্তারার গতরে থেকে গেছে সেই একই আদার ঝাল। সেই রাত শেষ হয়ে গেলেও চৈতারকান্দার আকাশে বাতাসে জিকির বিয়োতে লাগলো সেই আধ-খেঁচড়া পালার বেতালপঞ্চবিংশতি । ক্রমেই সেই জিকির নৈর্ব্যক্তিকতার ঘাট উতরিয়ে মাংসের রোয়ায় রোয়ায় রুইয়ে দিতো থাকলো অনাকাঙ্খিত সব চর্বি চিকনাই। মেয়েদেরকে দেখলেই জোয়ান মদ্দদের সাথে সাথে মাতাল মনছুরের হাইরে হাইর মেলাতে শুরু করে দিলো এক পা কবরে চলে যাওয়া অসুমুদ্দিরাও। কেতা বোতা কোষ বিচি সাবাড় করেও কাঁঠালের আঁশ মিটছিলো না লোকের। কিলিয়ে পাকাতে চাইছিলো পুটকি থেকে তখনও ফুল না ঝরে যাওয়া মুচিটি। ঘাস ক্ষেতে গরু ছেড়ে দিয়ে,বিলের পুলের তলে, আখ চিবিয়ে এইসবের,দাঁতের শিরশির মজাচ্ছিলো আন্তারা। কিন্তু এতোই সহজে মেলে কী মুক্তি মাকড়শার কখনো ? পেট নিঃসৃত সুতোটিই তার আপনা মাংসে হরিণা বৈরী যে ! যা-ই করে, পাঁকে চক্রে জড়িয়ে যায় সে একই পূনরাবৃত্তির জালে। তা না হলে,চিবিয়ে ফেলে দেয়া আখের ছোবড়ায়ও কেনো লাল লাল পিঁপড়ে ? কামড় দিলে জ্বালা ধরে যাওয়া,গতর ফুলে যাওয়া পিঁপড়েগুলি সহ্য হচ্ছিলো না আন্তারার। গোড়ালী উঁচিয়ে পিষে ডলতে উদ্যত হয় লাল লাল পিঁপড়েগুলি। আর তখনই, ভুইত্যা মারা দুই শ্রীমঙ্গইল্যা আনারস গড়াতে গড়াতে তার পায়ের আঙ্গিনায় এসে নোঙ্গর ফেলে।

আনারসের উৎস খুঁজতে গিয়ে আন্তারার চোখ পরে সফুরার উপর। পুলের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সফুরাও খুঁজছিলো তার গড়িয়ে পরে যাওয়া আনারস দুটি। চোখাচোখি হয়ে যায় চার চোখ। দুজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠে। আনারস হাতে পুলের নীচ থেকে উপরে উঠে আসে আন্তারা। হাতে ব্যাগ পিঠে ব্যাগ। ব্যাগের ভারে বাঁকা হয়ে যাচ্ছিলো সফুরা। তারমধ্যে আবার ভুইত্যা মারা চার চারটি শ্রীমঙ্গইল্যা আনারস। সুতলী খসে দু’টি গড়িয়ে, বাকী দু’টি তখনো হাতে। কালাইনগর লঞ্চঘাট থেকে এতো দূর হেঁটে আসতে আসতে নেয়ে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে সফুরা। তবু যেনো তার মধ্যে কোথাও এতোটুকু ক্লান্তি নেই।

খসে পড়া আনারস দুটি সুতলী দিয়ে বেঁধে দিতে দিতে আন্তারা বলে,“ পুরা ডাহা শহর দি তুইল্যা লইয়া আইছো বুবু ?”

“কতলা দিন পরে পরে আই। একটা একটা কইরা জিনিস জমলেও কম জমে লো !”

আনারসগুলি নিজের হাতে নিতে নিতে আন্তারা বলে,“লও যাই বাইত দিয়া আই তোমারে।”

হাসতে হাসতে সফুরা বলে,“ছিনালের লগে আটলে কইলাম ছিনালই কইবো লোকে।

আন্তারা বলে,“চইত মাইয়া উডান মুইত্যা ভিজান যায় ? তোমারে পারছে ?”

অবাক চোখে আন্তারার দিকে তাকিয়ে সফুরা বলে,“তুই দি ডাঙর অইয়া গেছোসগা লো ছেেড়ি?”




মায়ের জন্য আনা শাড়ী ব্লাউজ, বাবার লুঙ্গী পাঞ্জাবী,বোনের জামা সেলোয়ার আর ছোটো ভাইটিকে পোঁ-পোঁ ভোঁ-ভোঁ ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে দিতে দিতে সফরের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ নিয়ে আসে সফুরা।দরজার মুখে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জীবনের এইসব উচ্ছাস দেখতে দেখতে আন্তারার ভেতরে সমানে ফুটতে থাকে চম্পা চামেলী জুঁই।

সমাজের লোক মাত্রই ভাত দেয়ার মুরোদ নাই কিল মারার গোঁশাই। কতো গোঁশাই পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলো সফুরার ! গোঁশাই খছার বেইল ছিলো না সফুরার। গার্মেন্টসে চাকুরী করতে একা একা চলে গেছিলো ঢাকা। কতো নানতান কতো অপমান গ্রামের মানুষের ! বেশ্যা, ছিনাল, বারো ভাতাইরা মাগী থেকে শুরু করে আরো কতো কী ?

ছুটি ছাটায় গ্রামে এলে আন্তারা বলতো,“তুমি এতো কিছু সইহ্য করো কী কইরা বুবু ?

সফুরা হেসে বলতো,“ফৌরার তেলে আঙ্গুল পিছলাইয়া বান আতাইবো মানু আর দুধাইতে দুধাইতে ফেনাইলামু আমি বালতির খোচ ! আমি কী কারো চাকের গাই লো ছেড়ি ? আমি অইছি আমার। খাই দাই কাম করি। মাস শেষে ছেব দিয়া গনি বেতনের টেহা। কেডায় কী কইলো না কইলো তাতে আমার বাল ছিঁড়া যাইবো কোন দুঃখে !”




সফুরার কনুইর গুতায় সম্বিত ফিরে পায় আন্তারা।

“কি লো ছেড়ি, কার খোয়াফে মইজ্যা গেলিগা দিন দুফুইরা বেলা ?

আন্তারা বলে,“বুবু,আমারে তুমি নিবা তোমার লগে ?”

মুখ থেকে কথাটা ছেড়ে দিয়ে একবারের জন্যও চোখের পলক ফেললো না আন্তারা।

আন্তারার বলার দৃঢ়তা এবং চোখের আকুতিকে উপেক্ষা করার সাধ্য হলো না সফুরার।

আন্তারার চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সফুরা বললো,“এই কাপড়েই যাবি ?

বাইত গিয়া কাপড় চোপড় ধুইয়া লইগ্যা, যা!”

সফুরার এক কথায় লক্ষ প্রজাপতি উড়তে থাকে আন্তারার চোখে মুখে ঠোঁটে। ঠোঁটের প্রজাপতিটা সফুরার গালে বসিয়ে দিতেই সফুরা বললো,“কাইলই কিন্তু ? আমার আবার ছুডি নাই।”

আন্তারা বলে,“অসুবিধা নাই। পিন্দনের হাডে শুকায় না ভিজা কাপড় !”



মেয়ের ঢাকা যাওযার কথা শুনে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে হাসু ছৈয়লের মাথায়।

“খানকির লগে যাইবি তুই খানকিগিরি করতে ?”

“সফুরা বুবু খানকি? তুমিও কইলা এই কতা ?”

“আমি আর নতুন কইলাম কী ? সারে চৈতারকান্দা কয়।”

বাপের কথা শুনে মাথায় রক্ত চড়ে যায় আন্তারার।

“বেডা হইছো তো ? এক ঘাউড়ারেই চিনো গু খায়। বেডি অইলে বুঝলা অইলে গু খায় না কোন মাছে !”

বলেই এশিয়াকে ডাকে আন্তারা।

“এই ছেড়ি ক, খাইনকা না কেডায় চৈতারকান্দার ! কেডায় কেডায় নাইল্লা ক্ষেতে ডাকছে

তরে ক।”

জয়গুন ও হাসু অবাক চোখে মেয়েদের দিকে তাকায়। বিন্দু পরিমাণ দ্বিধান্বিত না হয়ে আঙ্গুল গুণে গুণে একেকটা নাম নিতে থাকে এশিয়া ।

“পঁচা মুন্সী,তারা মেম্বর, ইছাইন্ন্যার পুত মইজ্জ্যা,মতি ডাক্তর…….”

শুনতে শুনতে গরম হয়ে উঠে হাসু ছৈয়লের কান। “চুপ কর…...চুপ কর…….চুপ কর…….!”

আন্তারা বলে,“ক্যান ? পানের পিক পরছে ধোয়া তুলসী পাতাত? আমারটা ফোনবা না ?

আঙ্গুল গুণে গুণে আন্তারাও নিতে থাকে একেকটা নাম।

“বুইট্টা বাতেন,বাচ্চু সরকার,মরম আলীর বাপ,ঘর জামাইয়্যা জালু, বাতেন মাষ্টোর, আর কতো কমু? ময়নাল সিকদারের কতা কইলে তো আবার ইজ্জত থাকবো না তোমার! কইতাম না যাও। ময়নাল সিকদারের কতা কইতাম না তোমাত্তে। হের বিছার আমি খোদার কছে দিমু।”

মেয়েদের কথা শুনতে শুনতে বিলাপ করে কাঁদতে থাকে জয়গুন। হাসু ছৈয়লের আর শোনার সহ্য থাকে না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় সে।



ভোর রাতের দিকে কপালে কারো ঠাণ্ডা হাত টের পায় আন্তারা।

বাপকে দেখে উঠে বসে সে।

“চোখ এমুন লাল ক্যান? ঘোমাও নাই তুমি ?”

হাসু বলে,“কোম্বালা যাবি তুই? ফর দি অইয়া গেছেগা বাইরে ?”

আন্তারা বাপের দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে।

“টেহা কয়টা রাখ হাতে । ডাহা গেলে কামে লাগবো।”

বলতে বলতে মেয়ের হাতে ময়লা কয়টা টাকার নোট গুঁজে দেয় হাসু। চোখ আর মন দুটোই ভিজে উঠে আন্তারার।





কালাইনগর ঘাট থেকে ঢাকার লঞ্চে উঠার তিন মাস তেরো দিন পর এক হাজার পাঁচশো টাকার একটা মানি অর্ডার পায় হাসু আর সাথে একটা চিঠি। আন্তারার সেই চিঠিতে ছিলো গার্মেন্টসে চাকুরী হওয়ার কথা,তিন হাজার পাঁচশো টাকা বেতন পাওয়ার কথা,সফুরা বুবুর লগে একসাথে থাকার কথা,এশিয়াকে ইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার কথা আর মসজিদে পাঁচ সের আমিত্তি দিয়ে দোয়া চাওয়ার কথা।

পরের দিনই কুলু ময়রার দোকান থেকে পাঁচ সের অমৃতি কিনে মসজিদে গিয়ে হাজির হয় হাসু।

নজরুল মোল্লা যোহরের আজানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

হাসু তার সামনে গিয়ে অমৃতির পোটলাটা রাখতেই নজরুল মোল্লা বলে উঠেন,“কি এইডা?”

“আমিত্তি। আপনেগর কাছে দোয়া চাইছে আমার বড় মাইয়াডা।।”

“কীয়ের দোয়া ?”

“গার্মেন্সে চাকরী অইছে মাইয়ার।”

নজরুল মোল্লা ক্ষেপে উঠেন।

“আর তুমি আইয়া পড়ছো সোজা হাইট্টা মরজিদে। গার্মেন্সের চাকরী যে মোসলমান মাইয়াগর ইমান নষ্ট করার একটা ইহুদী চক্রান্ত, এই কতা কি তুমি জানো ?”

অনেকক্ষণ ধ্যান ধরে থেকে হাসু বলে,“কোরান হাদিসে আছে এইসব কতা ?”

“আছে না ! পর্দা পশীদার কতা কী হাউশ কইরা কইছে খোদায় ? উদাম তেতুল দেখলে লোল পড়ে বইলাই তো খোসা দিয়া হেইডারে হেফাজতে রাখবার কইছে। গার্মেন্সের চাকরীতে আছে কী কোনো আব্রুর হেফাজত ? এক ঘর এক ছাদের তলে গাইট্ট্যাইয়া ভরে ছেড়া ছেেড়ি । একের ঘাড়ে অইন্যে উমাশ ফালায়। আগুনে কী খালি মোমই গলায়? সুতলীও পোড়ায় না ? আর তুমি আইছো কিনা,গইল্ল্যা যাওয়া হেই আঁইডা মোমের গৈডা খাওয়াইয়া, দশজনের ঈমান নষ্ট করতে ! কেমুন বাপ তুমি ? মাইয়ার এইসব পাপের কামাই খাওয়ার আগে মইরা যাইতা,দোজখে একটা লাকড়ি কম পুড়তো।”

অমৃতির পোটলা হাতে হাসু ছৈয়ল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নজরুল মোল্লার দিকে।

“আমি এখন কী করতাম হুজুর ?”

“ফরজ আদায় করো। মাইয়া বড় অইছে তারে বিয়া শাদী দেও।তোমার ফরজ আদায়ের গাফিলতির কারণে, বারো বেডায় ঘাইট্টা যদি অরে নষ্ট করে, খোদার কছে কি জপ দিবা ?”

সহসা কোনো কথা খুঁজে পায় না হাসু। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নজরুল মোল্লার দিকে।

নজরুল মোল্লা বলে,“পাপ ঠেহাও আগে।। গার্মেন্স ছাড়াও মাইয়ারে। গেরামের মানুষ কি মইরা গেছিগা আমরা ? সাইহ্য সহযোগিতা লাগলে করমু নে। মাইয়া আইন্যা বিয়ার ব্যবস্থা করো।”

হাসু সন্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

সরু চোখে হাসুর দিকে তাকিয়ে নজরুল মোল্লা বলে,“বিয়া একটা অবশ্য আছে হাতে। যদি রাজী থাকো সাত পিঁড়ি বিনা হিসাবে বেস্ত যাইতারবা।”

অবাক হয়ে হাসু বলে,“কন কি! কেডা এইডা?

“দৌলতপুরের সিরাজ মাওলানা।”

কথাটা শুনেই শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে উঠে হাসুর।

“কতা কইলেন একটা? ইলার ছোডু মাইয়ারও ছোডু আমার মাইয়া।”

“বিবি তো আর নাই ? সতীনের ঘরে তো আর বিয়ার কতা কইতাছি না! আল্লায় তেনারে জান্নাত নসীব করছে বইলাই তোমার মাইয়ার কপাল খোলছে! তানাইলে উনি কই আর তুমি কই?বাইতে তোমার কলাগাছ আছে বইলাই গরীবের বাইত হাতির পারার প্রসঙ্গ আইছে। গাবগাছ থাকলে তুমি কানলেও কোনো কাম অইলো না অইলে।”

“না হুজুর, দুতিকা বেডাত্তে বিয়া দিতাম না। মাইয়ার আমার আগে কুনু বিয়া শাদী অইলে একটা কতা আছিলো!”

“চহের পাঁচকানি য়োস্তা ক্ষেত তোমারে সাফ কাওলা কইরা দেওয়া অইবো। রাজী থাকলে কও । দেশে মাইয়া মানুর অভাব? ”

জমির কথা শুনে চকচক করে উঠে হাসু ছৈয়লের চোখ।

আমতা আমতা করে হাসু বলে,“ মাইয়ার মার লগে ওট্টু পরামিশ কইরা লইতাম যদি……!”

নজরুল মোল্লা বলে,“খাসী চিনো,খাসী? গাইয়েত্তে জিগাইয়া হাল চওন লাগে খাসীর। চাষীর অওন লাগে পাডা। বেডা না তুমি? বেডি মাইনষেরে বেডি মাইনষের জাগাত রাইক্যে। সমাজে ইজ্জত পাইবা।”

নিমিষেই চঞ্চল হয়ে উঠে হাসু। নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে উঠতে থাকে তার। অতি দ্রুত কি খানিক ভেবে সে বলে,“ আমি রাজী হুজুর।”

উচ্ছসিত হয়ে নজরুল মোল্লা বলে,“আলহামদুলিল্লাহ! জলদি বাইতে আনার ব্যবস্থা করো মাইয়া। হুজুরের লগে কতা কইয়া আমি দিন তারিখ পাকা করতাছি।”



দোয়ার পাঁচ সের আমিত্তি পাঁচ মণ ভারী লাগতে থাকে হাসু ছৈয়লের হাতে। আবু’র পুষ্করীনিতে এক ঢিলে ফেলে দিয়ে পোটলাটা, নজরুল মোল্লার কলমের চারায় আম কাঁঠাল পাকাতে পাকাতে ঢাকা পৌঁছে যায় হাসু। জয়গুনের শরীর খারাপের কথা বলে রাতের লঞ্চেই আন্তারাকে নিয়ে চৈতারকান্দায় ফিরে আসে সে।।

ডাইলে বাগার দিচ্ছিলো জয়গুন। বাপ বেটি দুজনকে উঠোনের আঙ্গিনায় দেখে বিচলিত বোধ করতে থাকে সে।

দৌঁড়ে গিয়ে বলে,“কী অইছে ?”

তীক্ষ্ন চোখে মার দিকে তাকিয়ে আন্তারা বলে,“তোমার নাকি যা-ওইয়া অবস্থা ?”

“মরজিদে মিষ্টি দিতে গিয়া তর বাপের এনা খবর নাই। আমিতো বালাই।”

আন্তারা বাপের দিকে তাকিয়ে বলে,“মিছা কতা কইয়া আমারে আনলা ক্যান ?”

সবিস্তারে নজরুল বৃত্তান্ত শোনাতে শোনাতে হাসু ছৈয়ল বলে,“এখন তুই রাজী হইলেই সারে। তিন কুল উদ্ধারের এই সুযোগ বার বার আইবো না।”

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে আন্তারার। বাপের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ মেরে থাকে সে। অনেকক্ষণ পর সে বলে,“যেয় কয় রাম হের লগেই যাম যাম করো তো ! জানাজার নোমাজটা পড়া ছাড়া,জীবনে আর কোনো কামে যদি লাগে এইসব বান্ধব, খাড়ুইয়া মুইত্যা দিও তুমি আমার মুখে।”

জয়গুন আর এশিয়ার কান্নার বিলাপ আটকাতে পারে নি আন্তারার পথ। মুখে এক গ্লাস পানি না তুলে বাড়ির উঠোন থেকেই চলে এসেছিলো সে ঢাকায়।

চৈতারকান্দায় সে আর পা রাখে নি যদিও, তার বেতনের একটা অংশ চৈতারকান্দায় ঠিকই গেছে নিয়মিত। কাকের মতো না দেখা না দেখা ভাবে কোকিলের সেই ডিমে ওম দিয়ে গেছে হাসু ছৈয়ল। বিষয়টা প্রকাশ্যে চলে আসে হাসু ছৈয়লের যক্ষ্মা বাধার পর। ফলেছিলো আন্তারার কথাই।সাহায্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়া নজরুল মোল্লারা একটা বড়ি কিনে দেয়ার সাহায্যেও এগিয়ে আসে নি। খবর পেয়ে আন্তারাই বাপকে ঢাকা নেয়ায় চিকিৎসা করাতে। সেই সুবাদেই এশিয়ার ঢাকা আসা। এক দফা চিকিৎসা শেষে জয়গুনকে নিয়ে হাসু ছৈয়ল চৈতারকান্দা ফিরে গেলেও, ঢাকা শহর দেখার জন্য দিনকয়েক বোনের সঙ্গে থেকে যায় এশিয়া।



সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারে বসে ফুচকা চটপটি খেতে খেতে সন্ধ্যা নেমে আসে। বিষয়টা ইতোপূর্বে চোখে পড়ে নি এশিয়ার। এই প্রথম পড়লো। সেলোয়ারের পকেট থেকে টাকা বের করে ফুচকা চটপটির বিল মেটালো আন্তারা।

সোনারগাঁ হোটেলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এশিয়া বলে,“এক আজব জিনিস দেহাইলা বুবু। বেডি মানু থোয় বুনির চিপাত টেহা। তোমার দি দেহি বেডা মাইনষের লাহানি সেলোয়ারে জেব!”

“ডেগ হাঁড়ির জীবন ঠেলি লো ছেড়ি ? জামাই কালেভদ্রে চাইরানা আটানা দিবো আর হেইডা নিয়া লুকাইয়া থুমু বুনির চিপাত ? আমরা অইছি কর্মজীবি নারী। মাস শেষ অইলে পরিশ্রমের সন্মানী পাই। কোন দুঃখে লুকাইয়া থুমু নিজের কামাইর টেহা?”

হাসতে হাসতে এশিয়া বলে,“বেডি মানু কামায় দেইক্যাই কি কিন্যা খাওন লাগে ডাকা শহরের পানি ?”

হাসতে হাসতে আন্তারা বলে,“জ্বালা কী এক জায়গায় ? এক টেহার পানি খাইয়া মুত্তে লাগে পাঁচ টেহা !”

“তাইলে বুঝো ? কয় পাঁচ টেহার মুইত্যা ভিজাইছো ছোডুবেলার খেতা?

এই কথা বলার পরে রোল উঠে হাসির। প্রাণ খুলে হাসতে থাকে দুই বোন।চৈতারকান্দার অনুরণনে কেটে যায় অনেকটা পথ।

সামনে একটা শপিং কমপ্লেক্স দেখতে পেয়ে আন্তারা বলে,“ল ওট্টু এসির হাওয়া খাইয়া যাই।বাসায় ফিরার পথে পেরায় পেরায়ই খাই আমি।”

এসির হাওয়া খেতে মার্কেটে ঢুকে ওরা।

একটা কসমেটিক্সের দোকানে ঢুকে আন্তারা বলে,“লাক সাবান কি সাদা নিবি না গোলাপী?”

আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলায় এশিয়া।

লাজুক হেসে বলে,“গোলাপী।”

এশিয়াকে একটা গোলাপী রঙের লাক্স সাবান কিনে দেয় আন্তারা।






পথে নেমে হাঁটতে হাঁঠতে আন্তারা বলে,“কার লাইগ্যা এতো সুন্দর অইতি ছেড়ি? নিজের লাইগ্যাই নাকি কেউ আছে মাছে?”

লাজুক হেসে এশিয়া বলে,“শুরু অইছে তোমার খাল কাইট্টা কুমির আনা!”

এক চিলতে মিষ্টি হাসির দুষ্টু ঝলক চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলে আন্তারা বলে,“নাই কুমিরই টাইন্যা লইয়া আই, আছে কুমির আনমু না ! নাম ক ফুনি হালার পুতের।”

লজ্জাবনত মাথায় গলার স্বর খানিকটা নামিয়ে এশিয়া বলে,“সুলতুর পুত মইপ্যায় আমারে বালবায়।”

“ডেঙা আডির সুলতু?”

ছোট্ট করে এশিয়া বলে,“হ।”

“তুই বাছ না ?”

“বাই ।”

“তাইলে আর খা লাক সাবান। কাজি ডাইকা বিয়া পড়াইয়া দেই ?”

এশিয়া বলে,“কাম কাইজ তো করে না ! আজাইরা ঘুরে খালি।”

“জিগা চাকরী করবো নি । ঢুকাইয়া দেই কোনো গার্মেন্সে।”

খুশীতে ডগমগ করে উঠে এশিয়া। উচ্ছাসে জাপটে ধরে আন্তারাকে।

“তুমি আমার মনের কতাডা কইছো বুবু। তুমি হাত না দিলে অইবো না এইডা ।”



বেগুনবাড়ি ঢোকার আগে সাত রান্তার মোড়েই বৃষ্টিতে ধরে ফেলে ওদের।

সেই বৃষ্টি সারা রাত। বস্তির টিনের চালে রিমঝিম বৃষ্টি। ফিরে ফিরে আসছিলো চৈতারকান্দা গ্রাম। গল্পে গল্পে ঘুম পালিয়ে গেছে এশিয়া ও আন্তারার। শেষমেষ কথার অভাব পড়ে গেলে আন্তারার বিয়ের প্রসঙ্গ টানে এশিয়া।

“দুলাভাইরে তুমি তালাক দিছিলা ক্যান বুবু ? আইতেও দেখলাম না লোকটারে যাইতেও দেখলাম না। ফটু মটু থাকলে দেখাও না !”

“তালাক খাওয়া বেডার ফটু দেইখ্যা কী করবি ?”

“কেমুন বেডায় তোমার বর আছিলো দেহার সাধ ?”

“জগতের হগল বর একই বেডা। ধইরা নে কুনু মুখ ! হেইডা নায়ক অইলেও সমস্যা নাই,লোলা ল্যংড়া অইলেও সমস্যা নাই।”

“কী দেইখা বিয়া বইছিলা তাইলে ?”

“স্বপ্ন। হেয়ও দেখছিলো আমিও দেখছিলাম। একই স্বপ্ন দেখছিলাম দুইজনে। আমারে হেয় বুঝবো হেরে আমি বুঝমু।চান্নিপসর রাইতে হাঁটতে হাঁটতে যামুগা যেইফিল দুই চোখ যায়।”

বলতে বলতে উদাস হয়ে আসে আন্তারা।

এশিয়া বলে.“তারপর?”

আন্তারা বলতে বলতে থাকে,“বিয়ার পরে দেখি, আমারে বুঝবো দূরে থাক, নিজেরে বুইঝ্যাই কুলাইয়া উঠতারে না বেডা। হের চোখ খালি আন্ধাইর বিছারে আর আমারে কইরা রাখতে চায় আতের তল্ল্যা। তাও থা্কতাম,আমি গলা পানিতে নামলে হেয় যদি হাঁটু পানিতে নামতো । হেয় করতে চায় টানে খাড়ুইয়া একলা মাতবরী।”

আন্তারার কথাগুলি কেমন শুনছেই না শুধু এশিয়া। গিলছেও।

আন্তারা কথা থামায় না।

“ছয়মাস বাইশ দিন হের লগে ঘর করছি। কইলে বিশ্বাস করতি না বইন,কতো বেডার লগে যে হেয় আমারে বাইন্ধ্যা দিলো ! গার্মেন্সের চাকরী। রাইত বিরাইত নাই। কাম থাকলে করোন লাগে। কাম কাইজ নাকি বাহানা। বেডা মাইনষের লগে ফূর্তি কইরা নাকি রাইত কাবার কইরা আই আমি। দিনের পর দিন খাইট্টা মইরা আজাইরা কিত্তন জুইত লাগে কয়দিন, ক ? শেষে একদিন কয় চাকরী ছাড়ার কতা । মাইনষের সবচেয়ে বড় ক্ষেমতা অইছে নিজেরে নিজের চালানের ক্ষমতা। শাক খাই শুটকি খাই আর বস্তির ঘরে থাকি,নিজেরে চালানের নিমনাম ক্ষমতাডা আমার আছে ! জানোস-ই তো সমাজ সংসারে কী দাম বেডি মাইনষের ! জুয়ান শইলডা যদ্দিন,তদ্দিন-ই কচকচানি। করার মজা ফুরাইয়া গেলে হেইডার ফিলও পাছাডা দিয়া ঘুমাইয়া থাকে বেডা মাইনষের জাতে। বুড়া অইয়া গেলে হেই শইল্যেরে হেয় কদ্দুর সেব্বো বুঝ ! নিজের আতের ক্ষমতা ছাইড়া দিয়া তর আতের তল্যা অই, আর বান্দর নাচাইয়া ফির তুই পথে ঘাটে ! আমি কী মাতাল মুনছরের পঁচা কাডোল লো ? ভাইয়েরে ভাইয়ে বিশ্বাস করে না আইজকাইল আর তুই তো চাইর বিয়া সুন্নত জঁপা জামাই। সুন্নতের কোডা ফুরাইয়া গেলেগা কামড়া-কামড়ি জুইড়া দিবি নফলের কটকটি লইয়া। আমার তখন জাগা অইবো কই ? আমি তখন যামু কই ? তুই তো তখন চ্যাটটা দেখাবি ।”

এশিয়া বলে,“পরে ?”

আন্তারা বলে,“পরে আর কী ? বোনাসের লাইগা মুল বেতন ছাড়মু আমি কোন দুক্ষে ? খাইলে তুই-ই খা গিয়া চোদায়া মুড়ি । নিজে ফোয়া ছাড়া আর অইন্য মাইনষের লগে ফোয়ানো ছাড়া আর কোনো ক্ষেমতা দিয়া বেডি মাইনষেরে মাপার যুগ্যতা যেগোর নাই,হেই বেডাগরে চোদার টাইম আমারও নাই। তিন তালাক দিয়া বুড়িগঙ্গাত্তে এক্কেরে গা ধুইয়া আইয়া পরছি।”

এশিয়া বলে,“বিয়া শাদী বইতা না আর ?”

“বইতাম না খা! ঘর বান্ধার স্বপ্ন কার নাই? তয় হাংগা বইতাম না আর । শইল্যের স্বাধীনতা,মনের স্বাধীনতা,কামাই রোজগারের স্বাধীনতা ঠিক রাইখ্যা প্রয়োজনে দশ বিয়া করমু। নিজেরে বিসর্জন দিয়া, আরেক বেডার তল্যা অইয়া এক বিয়াও না। নিজে আগে নিজের না অইতারলে,অইন্যের জীবনে কুত্তা বিলাইর জিন্দেগী কাডান লাগে বইন। মোন চাইলো কোলে তুল্ল,মোন চাইলো না থ্যাকনা দিয়া ফালাইয়া দিলো। গিরস্তের বাড়িরে নিজের মনে কইরাই ঘুরে ফিরে কুত্তা বিলাই। বাইরে থাইক্ক্যা মনে অয় গিরস্তেরও না জানি কতো আপনা! কপালে জোডে আসলে কী? উষ্ঠা লাতি। আর কিসমতে? উফরা যতো কাডা-কোডা আর চাবাইয়া ফালাইয়া দেওয়া আড্ডি-গুড্ডি।”

বলতে বলতে চৌকি থেকে এক লাফে নামে আন্তারা।

“কতা কইতে কইতে মুতে ধইরা গেছেগা ছেড়ি। মুতবি নি আয়।”

ছোট্ট করে এশিয়া বলে,“তুমি যাও।”







ফিরে এসে এশিয়াকে রুমে পায় না আন্তারা। সে আবার বাইরে আসে। বৃষ্টির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে এশিয়া। লাইটের আলোয় সে দেখতে পায়, উঠোনের আঙ্গিনায় গোলাপী লাক্সটা ভিজছে।

পেছন থেকে এশিয়ার কাধে নিজের হাতের আলতো স্পর্শ ছোঁয়ায় আন্তারা।

“এতো শখ কইরা আইন্যা ফালাইয়া দিলি সাবানডা ?”

বোনের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এশিয়া।

“বুবু আমি চাকরী করমু।আমি আগে আমার অমু বুবু।

আলতো করে আন্তারা বলে,“সুলতুর পুত মইপ্যা ?”

“বোনাস খামু।”

কেউ আর কোনো কথা বলে না। নীরবে দু’বোন এসে বৃষ্টির মুখোমুখী দাঁড়ায়। ঢলভাঙার অঝোর প্রস্রবণের ছাঁট লেগে, ভিজে যেতে থাকে ওদের ভেতর বাহির। এক অবস্থাকে শুন্য করে দিয়ে পূর্ণ হতে থাকে আরেক অবস্থা।তুমুল বৃষ্টি বাইরে।রূপান্তরের তোড় সামলাতে না পেরে, ফজরের আগেই; গোলাপী আবরণ খসে গিয়ে ফেনা ছাড়তে শুরু করে দেয় সাবানটা।।



----------------------------------

লেখক পরিচিতি

সোহেইল মুশফিক। জন্ম সালঃ ১৯৭৪। একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানীতে এরিয়া ম্যানেজার পদে দায়িত্বরত। ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটির আওতাধীন দয়ানন্দ সাগর কলেজ থেকে ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় স্নাতক।

ঠিকানাঃ পশ্চিম মেরুল,বাড্ডা, ঢাকা-১২১৯

ই-মেইলঃ sohailmushfique@yahoo.com

ফোন নম্বরঃ 01731 218616, 01716 650726

সম্পাদিত পত্রিকাঃ কাজী দীন মুহম্মদের সঙ্গে ‘ঢলভাঙা’ নামে শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন