রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

রুমা মোদক'এর গল্প : একটি সন্ধ্যা যেভাবে রাত হয়

কালভার্টের উপরে উপুড় হয়ে হুড়মুড় সন্ধ্যা নেমে গেছে। কালভার্টের দু’পাশে অনতিবয়স্ক গাছগুলোর ডালপালা পোঁচ পোঁচ অন্ধকার আঁকড়ে ধরছে অন্যান্য অনেক দিনের চেয়ে দ্রুত, নিশ্চল অভ্যস্ততায় মেনে নিচ্ছে নীড়েফেরা পাখ-পাখালির হল্লা। দু একটা হোন্ডা অভ্যাসমতোই কালভার্ট পার হয়ে পাড়ামুখী হাওয়া হয়ে যায় চারপাশের উদ্দেশ্যে নির্বিকার পাতা, ধুলো বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে। কাছেধারে দূরেপিঠে বাসাবাড়িগুলোর রান্নাঘরে, স্নানঘরে বারান্দায় জ্বলে উঠতে থাকে নিত্যনৈমত্তিক আলো। দিনভর আত্মব্যস্ত মানুষগুলো ক্রমশ ব্যক্তিগত ঠিকানাগামী কোঠরে প্রবেশ করতে থাকে অন্যান্যদিনের মতোই রাত ঘনিয়ে আসার আগাম বার্তায়। সন্ধ্যাটির ক্রমে ঘনায়মান রাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে থেমে যেতে থাকা পাখিদের হল্লা ক্রমশ গিলে খেতে থাকে কালভার্টের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো

আর একই সাথে কিছু একটা দেখে নিতে চায় নীচু হয়ে কালভার্টের নীচে।পাড়ার মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের মোহময় কন্ঠ চরাচর ব্যপ্ত করে আরো দ্রুত করতে থাকে রাতের আগমন। 

ঠিক এসময় আমার আম্মার অস্থিরতা অসহ্য হয়ে উঠলে তিনি ঘর-বাইর করেন আশঙ্কাময় দু্শ্চিন্তায়। এটা তার রোগ। হাইপার টেনশন। গত জীবনের লড়াইজাত উৎকণ্ঠা থেকে উদ্ভুত। ঠিক এইসময় তাঁর ব্লাডপ্রেসার মাপলে উপর-নীচের রিডিং দেখে নিশ্চিত পাড়ার ডাক্তার রনজিত কাকা চোখ বড় বড় করে নির্দেশ দিতেন-তাড়াতাড়ি ওষুধ খাইয়া ঘুমান গা যান, আর আমি ঝড়ের মতো তীব্রবেগে মাকে বাঁচানোর প্রচন্ড আকাঙ্খায় বাড়ি ফিরে ওষুধ খাইয়ে আলো নিবিয়ে দরজা ভেজিয়ে সোহাগকে মার বিশ্রামে বিঘ্ন না ঘটানোর আকুতি জানাতাম ইশারায়। এসব ইশারা ইংগিত দুশ্চিন্তা কিছুরই তোয়াক্কা না করে যদিও সোহাগ চিল্লানোর প্রয়োজন হলে চিল্লাতোই। তাই বলে আমার আকুতির আকুলতা ব্যহত হতো না। কিন্তু আজ আমি সেই আকুলতা প্রকাশে অক্ষম। 

অবশ্য আজ আমি যেটিতে সক্ষম ছিলাম তা হলো এই যে, আম্মার এই উৎকণ্ঠাময় পায়চারির সূত্র ধরে নির্দ্বিধায় সব কথা নিজেই বলে যেতে পারতাম। গল্পটি জমে উঠতো, হয়ে উঠতো, বেশ হয়ে উঠতো। কিন্তু বলবো না। এই ম্যারম্যারে ক্লিশে বহুল ব্যবহৃত আঙ্গিক হয়ে উঠার প্রবল সম্ভাবনা, যা লেখককে এই মহুর্তে প্রলোভিত করছে, তা সমূলে বিনষ্ট করে আম্মা মোবাইলে নাম্বার টিপলেন নীতার। আর নীতাও মোবাইলের অন্যপ্রান্ত থেকে আম্মার তটস্থ কণ্ঠস্বর শুনে তার আম্মার পুনপুন বারণ অগ্রাহ্য করে দ্রুত গায়ে বোরকা চাপিয়ে রিস্কায় উঠে বসলো আমার বাসার উদ্দেশ্যে, ভর সন্ধ্যায় যাত্রার নানা বিপত্তির সম্ভাবনা উপেক্ষা করে। 



নীতার ভাষ্য-

ঋতুদের বাসায় ঢুকতেই ঝিমরত সোহাগকে চোখে পড়ে বারান্দায়, দেখে সন্দেহটা স্থিতির দিকে আরো একধাপ এগিয়ে যায়। ক মাস ধরে সোহাগের কারণেই চরম অশান্তিতে ডুবে ছিলো পরিবারটি। যার বৃত্তান্ত বলতে বলতে একান্ত এই বন্ধুটির কাছে চোখের জল লুকাতে পারতো না ঋতু। গেলো বছর ওর ষোলতম জন্মদিনের কেক কেটেছিলাম না? এই বয়সেই সোহাগের কেন তার এই ঢুলুঢুলু দৃষ্টি? সেই রহস্য উন্মোচনের বেদনাময় প্রচেষ্টা মূহুর্তের মধ্যে দিকভ্রষ্ট হয়ে যায় ঋতুর আম্মার উদ্বিগ্নচিত্ত তাড়ায়। অ মা নীতা,তাড়া কইরা ঘর আয়।

বারান্দায় জ্বলতে থাকা টিমটিমে আলোর আবছায়ায় আমার দৃষ্টিগ্রাহ্য না হয়ে হঠাৎ তখন ঋতু হেচকা টানে আমাকে টেনে নিয়ে যায় বারান্দা লাগোয়া আট ফুট বাই আট ফুট কুঠুরিতে। যে ঘরটিতে একটি চারপেয়ে চকি আর টেবিল দাঁড়িয়ে থাকার পর আর কারো দাঁড়ানোর জায়গা অবশিষ্ট থাকে না, সে ঘরটিতে সোহাগের থাকার ব্যবস্থা। কেননা ছেলে বড় হলে মা আর বোনের মাঝখানের গুটিসুটি উষ্ণতা থেকে আলাদা হয়ে যেতে হয়। ঘরটা অন্ধকার, কোনো আলো জ্বালানো নেই, শুধু ঋতু দরজাটা খুললো বলেই বাইরের বারান্দার টিমটিমে আলোটা ততোধিক টিমটিমে হয়ে বাধ্য ছেলের মতো বিছানাটার উপর চুপ করে শুয়ে থাকলো। ঋতু আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলল- শোন আম্মা যা যা জানতে চায় হাছা হাছা সব কইয়া দিবি। এই সময়ে আম্মারে কিচ্ছু লুকাবি না। 

এই সময়? মানে কোনসময়? প্রশ্নটা ঋতুকে করার আগেই খালাম্মা এক ঝটকায় টান দিয়ে আমাকে মূলঘরে ঢুকান। মূলঘর আর বারান্দায় এই কুঠুরি ঘর, পিছনে হাত দশেক দূরে কলতলা আর স্নানঘর কাম টয়লেট এই নিয়ে ঋতুদের অস্থায়ী নিবাস। খালু মানে ঋতুর আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর ঋতুরা যখন এ বাসায় ভাড়াটিয়া হয়ে আসে তখন অবশ্য শুধু এই মূলঘরটিই ছিলো। মাস শেষে ভাড়া আসার উৎস তখন অনিশ্চিত। আর বছর ছয়েকের সোহাগও যখন পিতা-মাতার বিচ্ছিন্নতার অব্যবহিত প্রতিকূলতা আঁচ করেনি। চুপচাপ গুটিসুটি মেরে মা বোনের মাঝখানে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে পারতো সে, তখন এটুকুতেই সন্তুষ্টির অন্ত ছিলো না খালাম্মার। তারপর যতো দিন গড়িয়েছে, প্রতিকূলতার পাথর নানা রং নানা মাত্রায় ক্রমাগত ভারী হয়ে ঘাড়ে চেপেছে, ততোই বারান্দা লাগোয়া কুঠুরি, সীমান্ত ঘিরে কাঁটাতার, বারান্দায় গ্রীলের খাঁচায় তালা, কতোশতো প্রতিরক্ষার আয়োজন করতে হয়েছে। 

মূলঘরে, মাথার উপর মাচাঙ থেকে ঘররঘর ঘররঘর ফ্যানটির শব্দ আর এনার্জি বাল্বের ম্রিয়মান আলো। শব্দ না আলো কি বেশি প্রয়োজনীয় ঘরটিতে বুঝা মুশকিল । ঘরখানার তুলনায় কম ঔজ্জ্বল্যের আলোতে ছোপ ছোপ অন্ধকারে খালাম্মার মুখের উদ্বিগ্নতাটুকুর দ্রুতগতিতে দুশ্চিন্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাক্ষী হতে থাকি আমি। ঘররঘর মার্কা ফ্যানটার শব্দ যতোই অসহনীয় হোক বাতাস খুব কম নয়, তার নীচে বসে ঘামছেন খালাম্মা- হাছা কইরা ক ত মা ঋতু কার লগে প্রেম করত? কপালজুড়ে এবার আমার ঘামও টের পাই পেরে উঠছে না ঘররঘর মার্কা ফ্যানের অবিশ্রান্ত বিলিয়ে যাওয়া বাতাসের সাথে। ঋতুটার স্বভাব একটু পাতলা; শহুরে-গেঁয়ো-শ্রেণি-পেশা বিবেচনা না করে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা, নারীর জন্য নির্ধারিত প্রচলিত আচরণবিধি লঙ্ঘন করে একা একা নির্বিকার পথ হাঁটা ইত্যাদির কারণে ছোট্ট শহরটাতে সবাই কমবেশি চিনে ওকে। রিক্সায় না চড়ে, হেঁটে চষে বেড়ানো ছাড়া পরিশ্রমের পয়সা কটা দিনমান ট্রেইলারি করা মায়ের হাতে তুলে দেয়ার স্বার্থে আর কোনো বিকল্প ছিল না ওর। আর তাতেই পাড়ার বখাটে থেকে শহরের উঠতি ছাত্রনেতা সবার আড়চোখের লক্ষ্যবস্তু হতো ও। এলাকায় ওকে ছাতাওয়ালী বলে একনামে সবাই চিনে। খালাম্মার পুনরায় তাড়ায় দুশ্চিন্তার ভয়ার্ত চাপ আর চাপা রাখতে পারেন না তিনি- অ মা নীতা হাছা কইরা ক। খালাম্মার তাড়ায় উদভ্রান্ত লাগে নিজেরও। কী কই আমি, হাছাটাই কী কই আর মিছাটাই কী কই? ঘরে বাইরে প্রতিকূলতার সাথে যতোটা যুদ্ধ উনি করেছেন, করে চলেছেন ঋতুর যুদ্ধ কি তারচেয়ে কিছু কম?


ঘটনা-১

বেলা সাড়ে চারটায় আকতার স্যারের স্পেশাল ক্লাস। পাগলাটে স্যার ক্লাসটাইমে ক্লাস না নিয়ে এক্সট্রা টাইমে বিরতিহীন ক্লাস নেয় বলে সবচে বেশি সমস্যা হয় আমার। টিউশনির বাসাগুলোতে ফোন দিয়ে অজুহাত সাজাতে সাজাতে হাঁফিয়ে যাই। কতো আর মাথা ব্যাথা, পেট ব্যাথা, মায়ের প্রেসার জাতীয় কারণের পুনরাবৃত্তি! তবু স্যারের ক্লাসটা করতে হয়। এই স্যারের ক্লাস করলে কোর্সটার প্রস্তুতিতে তেমন আর না পড়লেও চলে। বাসা থেকে বের হবার সময় ঘড়িতে সময় দেখি। চারটে বেজে পনেরো মিনিট, হাতে পনের মিনিটের তাড়া। ব্যাগের কোনায় লুকিয়ে রাখা পাঁচশ টাকার নোটটা আবার সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখি। বিশ টাকা রিক্সাভাড়ার জন্য নোটটা খুচরো করার আকাংক্ষা বিসর্জন দেই। মাসের রয়ে গেছে আরো সপ্তাহখানেক। বলা তো যায় না কখন কিসে প্রয়োজন হয়। সোহাগের হাতটান থেকে বাঁচতে কতো কায়দা করেই না লুকিয়ে রাখা নোটটা। পথ কমানোর জন্য পাড়ার পিছন দিয়ে ফাঁড়ি পথ ধরি, আর পায়ের দ্রুততার সুনাম অক্ষুন্ন রেখে যথাসময়ে পৌঁছে যাই। ক্লাস শেষে ফেরার সময় সহপাঠী নিক্সন আমার সঙ্গ নেয়, দু চারটি প্রয়োজনীয় ক্লাসনোট নেবার প্রয়োজন কিংবা অজুহাতে। উদ্দেশ্যটা আমার কাছে খুব পরিস্কার না হলেও আমি আপত্তি করিনা। 

ফাঁড়ি পথে ঢোকার মুখেই আড্ডারত ছেলেগুলো পথ আটকায়- ওই খাড়া, এই হাইঞ্জাকালা পরপুরুষ লইয়া যাস কই? আমি পোড় খাওয়া মেয়ে। যার বাবা মেয়ের প্রাইভেট টিচারকে বিয়ে করে প্রথম পক্ষের স্ত্রী সন্তান ফেলে দ্বিতীয় সংসার পেতেছে। মা দুই ভাই বোনকে নিয়ে উদয়াস্ত ঘরে বাইরে লড়ে চলে কেবল মনের দাপটে, সেই মায়ের দাপট আর সাহসের সাক্ষী আমি। মায়ের কাছাকাছি এতো বছর ঘুমানোর পরও কিছু দাপটের সাহস কী প্রতিস্থাপিত হয়নি মায়ের কাছ থেকে মেয়ের গায়ে আর মনে? এ রকম উৎপাত আম্মাকে দেখেছি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে, সেই অভিজ্ঞতা আমাকে সাহস যোগায়, আমি ঘাবড়ে না গিয়ে ক্ষিপ্ত উত্তর দেই- তোগো সমস্যা কী, রাস্তা ছাইড়া খাড়া, নইলে খারাপ কাজের লাইগ্যা পথ আটকাইছস কইয়া চিল্লাইয়া পাড়ার মানুষ দলা করুম। বীরপুরুষেরা উল্টো ঘাবড়ে যায়। এরা খালি জানেই না, মানেও, এটা আমি পারবো। পুরুষ অভিভাবকহীন জানালায় উঁকি দেয়া শহরের প্রখ্যাত যুবনেতারে একদিন আম্মা যে দৌড়ানি দিয়েছিল তার স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে সবার কাছে। আম্মার চিৎকারে সেদিন পাড়া-পড়শীরা গভীর রাতে একত্রিত হয়েছিল আর পরদিন স্থানীয় পত্রিকায় হেডলাইন নিউজ হয়েছিল। ঘটনা শেষ হয়েছিল সেই যুবনেতা বহিস্কৃত হবার মধ্য দিয়ে। আজ পথ আটকানো এই বীর পুরুষেরা সম্প্রতি সরকারি ছাত্রসংগঠনের অফিসে ঘনঘন যাতায়াত শুরু করেছে পদপ্রত্যাশী হয়ে। কেন না সম্মেলন অতি নিকটে। আমার হুমকিতে দমে যাওয়া দলটিকে দ্রুত পায়ে তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবার মধ্য দিয়ে সেদিনের ঘটনাটা শেষ হয়ে যেতে পারতো। 

কিন্তু বেচারা নিক্সনের গোবেচারা চেহারায় ফুটে উঠা প্রেমময় দৃষ্টিটা সেই সন্ধ্যাটির দ্রুত রাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া অবশ্যাম্ভাবী অন্ধকারেও আমার পড়তে ভুল হয় না। একা চলার বন্ধুরতাগুলোকে যেভাবে প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করি, নিক্সনকে ঘরে ঢুকার আমন্ত্রণ না জানিয়ে সেই উপেক্ষাটুকু আপদ নিক্সনকেও বুঝিয়ে দেই। কিন্তু বাসায় ফিরে মোবাইল খুলেই দেখি নিক্সনের এসএমএস- আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। নীতাকে কল করে আমি হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ি- এইডা লইয়া কয়জনরে? 

আমার প্রত্যুত্তর না পেয়ে নিক্সন-পর্ব সমাপ্ত হয়ে যেতে পরতো, যা হয়েছে অন্যান্য ক্ষেত্রে। প্রজাপতি অন্য ফুলের সন্ধানে যেতে সময় ব্যয় করেনি। কিন্তু এই প্রজাপতি হাল ছাড়েনি একদিনেই। পরপর কয়েকদিন কলেজগেটে দাঁড়িয়ে থাকা তার দৃষ্টি বুঝিয়ে দিয়েছে সারারাত ঘুমায় না সে। কোন কোন দিন এসএমএস এর ভারে আমার অসুস্থ মোবাইলটা কোঁকাতে কোঁকাতে বন্ধ হয়ে যায়। হাত কেটে নাম লেখা, ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে হাসপাতাল যাওয়া কি করতে বাদ রেখেছে সে! কিন্তু কোনকিছুই আমার হৃদয়ের দেয়াল ভেদ করতে পারে না।

একদিন আবিষ্কার করি নিক্সন বেশ বদলে গেছে। পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ সব বদলে গেছে এবাউট টার্ন করে। প্যান্টের মধ্যে শার্ট গুঁজে, কোমরে চামড়ার বেল্ট বেঁধে সে মিছিলে শ্লোগান দেয়। গ্রামের গোবেচারাকে মিছিলের সম্মুখভাগে বেশ অচেনা লাগলেও, আমার দিকে প্রতিফলিত ক্রুর দৃষ্টি তার মোটেই অচেনা লাগে না। আমিও যথারীতি পাত্তা না দিয়ে মনে মনে স্বস্তি পাই, যাক বাবা আমার মোবাইলে উৎপাত, বাসা পর্যন্ত পিছু নেয়ার উৎকট অত্যাচার, টিউশনির বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকার দৃষ্টিকটু নির্যাতন থেকে তো বেঁচে গেছি!


পুনরায় নীতা

খালাম্মার লড়াইক্লান্ত চোখ অশ্রুতে টলটল করে- অ মা নীতা, আমি না তর আম্মার মত, কিচ্ছু লুকাইস না তর পায়ে পড়ি মা। আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাই। খালাম্মা এবার সত্যি কাঁদতে থাকেন। যেমন হয়, হঠাৎ সৃষ্ট যে কোন সংকটে অতীতে মুখোমুখি লড়াই করে আসা সকল সংকট, যন্ত্রনা, সংকট থেকে উত্তরণ কিংবা অবতরণ যাবতীয় যন্ত্রণা চারপাশ থেকে জাপটে ধরে দুর্বহ স্মৃতি নিয়ে, এক্ষেত্রেও তাই হলো। খালাম্মা বলতে থাকেন- দেহস ত মা কত ঝড়-ঝাপটা সামলাই নিত্য, এর মধ্যেই পোলাডা গেছে বিগড়াইয়া। হ্যাঁ মধ্যদুপুরে ঘুম থেকে জেগেই মা-বোনের সাথে হল্লা-চিল্লা, হাতখরচের টাকা না পেলে ঘরের গ্লাস-কাপ ভাঙা সব স্বাক্ষ্য দেয় সোহাগের অধপতনের। এ এক দুর্বিষহ যন্ত্রনা প্রতিদিন অনটনের সংসারে। এই সংগ্রামক্লিষ্ট মানুষগুলোর উপর যন্ত্রনার পর যন্ত্রনার বোমা চাপিয়ে প্রকৃতি যেন দ্বিগুন আনন্দ পায়। খালাম্মা বলতে থাকেন- বাপডার আর যাই হোক, এসব খারাপ অভ্যাস আছিল না। কারো দোষ দেই না রে মা, নিজের কপালরে ছাড়া! হ্যাঁ ঋতুর আব্বার আর কোনো অভ্যাস দূরে থাক, সিগারেটের নেশাও ছিল না। মুখচোরা লাজুক স্বভাবের লোকটা যখন ঋতুর হাউস টিউটরের সাথে প্রেম করে খালাম্মার কাছে অসতর্ক মূহুর্তে ধরা পড়ে গেলেন, তখন খালু অস্বীকার করলেন না বটে, খালাম্মার হাতে পায়ে ধরে দিব্যি করলেন ফিরে আসবেন এই ভুলের মরিচীকা থেকে। এসেও ছিলেন। কিন্তু ফ্যাকড়া বাঁধালো সেই মেয়ে, বাড়ি এসে খালাম্মার আঁচলে ফুঁপানো কান্নার জল মুছে জানিয়ে গেল সে তিনমাসের প্র্যাগনেন্ট।

অশ্রু মুছা ফোঁপানোর সাথে হালকা স্বরের হুমকিও ছিলো, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশ ডাকার। তার আর দরকার পড়েনি। খালাম্মার মতো তীক্ষ্ম আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মহিলা দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাত ধরে বিনাবাক্যব্যায়ে পথে নেমে গেলেন। খালুর হাজারটা দিব্যি তাকে আর ফেরাতে পারেনি, কিন্তু সত্যি খালাম্মা কারে দোষ দেবেন কপাল ছাড়া, যখন তার প্রাক্তন স্বামীর দ্বিতীয় সংসার এখনো সন্তানহীন। খালাম্মা আবার কাঁদেন- ক ত মা ক, হাছা কইরা ক, কার লগে প্রেম করে মাইয়াডা? আমি তলপেটে চাপ অনুভব করি, ঠিক যেরকম পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে হয় আমার, অতিরিক্ত নার্ভাসনেসে। টয়লেটে যাবার জন্য দরজা খুলে পিছনদিকটায় যেতেই ঋতু আমাকে হ্যাঁচকা টানে নিয়ে যায় রান্নাঘর লাগোয়া নিমগাছটার নীচে ঝিম মারা অন্ধকারে, হাজার রং মেলে দেয়া রাতের অন্ধকারে ততক্ষনে সন্ধ্যাটা মিশে গেছে। ঋতু আমার হাত ধরে বলে- কইয়া দে, কইয়া দে, হাছা কথাডা কইয়া দে। এই সময় আর লুকাইয়া কী করবি?


ঘটনা-২

আসলে নীতা ছাড়াতো ঘটনাটা আর কেউ জানে না। নীতা আমার সত্যিকারের বন্ধু, আমি ন্যায় করলেও বলে ঠিক, অন্যায় করলেও বলে ঠিক। এই আমি যখন আকিব স্যারের সাথে অসম প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি, নীতা বলে- প্রেম তো প্রেমই, পড়লে কী করবি, প্রেম কী এত বলে কয়ে হিসাব করে হয়? তাইতো প্রেম কি আর এতো হিসাব করে হয়? নইলে আকিব স্যারের প্রেমে পড়বো কেন আমি? যে আকিব স্যার টেবিলের নীচে ১০ বছর আগে তার থেকে ১২ বছরের ছোট ছাত্রী আমার পায়ে পা ঘষিয়ে টিউশনি হারিয়েছিল, সেই আকিব স্যারের প্রেমে পড়ে গেলাম আমি?

নীতার মা আর আমার আম্মার আপত্তি সত্ত্বেও আমরা দুজন সেবার কলেজের রিহার্সেলে সন্ধ্যারাত অব্দি কোরাস গাই- এসো হে বৈশাখ এসো এসো.......চৈত্রের শেষাশেষি শেষ বিকালে সেদিন ঈশান কোন ঘনকালো হয়ে ডালভাঙা বাতাস ছেড়ে বৈশাখের আগাম বার্তা দিলে আমি আম্মার হাইপার টেনশনের কথা ভেবে ফোনটা নিয়ে রিহার্সেলের সম্মিলিত শব্দ থেকে নিরিবিলি দূরত্বে আসি, আম্মাকে একটা ফোন দিয়ে আমার নিরাপদে থাকার খবরটুকু জানানোর জন্য। ঠিক তখন নিক্সন পাতাল ফুঁড়ে দৈত্যের মতো হঠাৎ এসে জাপটে ধরে এলোপাথারি চুমু খেতে থাকে আমার গলায় কপালে ঠোঁটে। ভ্যাবাচ্যাকার প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়েই আমি চিৎকার করি গায়ের সমস্ত শক্তি গলায় জড়ো করে। সম্মিলিত গানের সুরে আমার চিৎকার নিশ্চিহ্ন হয়ে মিশে যায়।কেউ শুনে না।আসন্ন বিপদে দিশেহারা আমাকে নির্বাক করে তখন কোথা থেকে দেবদূতের মতো হাজির হয় আকিব স্যার। নিক্সনকে এক চড়ে মাটিতে ফেলে আমাকে আগলে নিয়ে বাসামুখী রওয়ানা হন রিক্সা ডেকে। ইলেক্ট্রিসিটি গিলে খাওয়া বীভিষিকার মতো অন্ধকারে, গাছ উপড়ে পড়া কালবোশেখির তীব্র বাতাসে আমি রিক্সায় কবুতরের মতো কাঁপতে থাকি। বিষন্ন গম্ভীর মুখে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়েই কর্তব্য সারেন নি আকিব স্যার, ঘটনাটা বেমালুম চেপে গিয়ে লোকলজ্জার হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে বিশাল দায়িত্বেরও পরিচয় দেন। আমি মনে মনে অনুতাপে ভুগি, বেসরকারি কলেজটিতে সদ্য যোগদান করা আকিব স্যারকে দেখেও না দেখার ভান করতাম। 

অতপর কৃতজ্ঞতায় নাকি মুগ্ধতায়,ঠিক বুঝি না আমি আকিব স্যারের প্রেমে হাবুডুবু খাই। আকিব স্যারের মোবাইলে রাত বিরাতে ম্যাসেজ পাঠাই আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশ কদিন আকিব স্যার কোন রিপ্লাই দেন না। বিয়ে-শাদি, ঘর-সংসার করে আকিব স্যার আমূল পাল্টে গেছেন, প্রথম যৌবনের লজ্জাকর অভিজ্ঞতা তিনি ভুলতে চান আমার এমন ধারণা পাল্টে দিয়ে স্যার একদিন আমাকে বাসায় ডেকে পাঠান। আমি জীবনে প্রথমবার সাজগোজ করি, মুখে পাউডার, নীতার কাছ থেকে ধার করে এনে লিপস্টিক, সবচেয়ে ভালো জামাটা.......। স্ত্রীর উপস্থিতিহীন ঘরে তিনি আমাকে দোকান থেকে কেনা ডালপুরি আর চা খাওয়ান। হাতে ধরা আর কপালে একটা চুমু খাওয়া ছাড়া আর মোটেই সীমা লংঘন করেন না খালি বাসা পেয়েও। আমি আরো আরো গভীর প্রেমে নিমজ্জিত হয়ে সারাবেলা ধুকধুক করতে থাকি। চোখের পাতা বন্ধ করলেই কপালে একজোড়া নরম ঠোঁটের স্পর্শের শিহরণে ধড়ফড় করে উঠি, গায়ের সমস্ত লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। নির্ঘুম গভীর রাতে স্যারকে মোবাইলে টেক্সট লিখি। স্যারও সাথে সাথে রিপ্লাই দেয়। এলাকার সীমিত সীমাবদ্ধতায় দু’চারদিন রেস্টুরেন্টের মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত কেবিনে ঢুকে হাতে হাত রেখে হালিম খাই। 

পরিণামহীন আবেগে ভেসে যাই। 

কিন্তু এমন তুমুল হাবুডুবু খাওয়া প্রেমময় সময়ে স্যার একদিন খালি বাসায় জোর করে আমাকে এমনভাবে বিছানায় ফেলেন যে মূহুর্তে আমার গা রি রি করে উঠে। প্রেমের স্পর্শে সর্বস্ব উজাড় করে দেবার বোধের বদলে আমার ভিতরে জাগ্রত হয় আত্মোপলব্ধি, শিকারের লক্ষ্য মাছটিকে আটকাবেন বলে তিনি ধীরে ধীরে জাল গুটাচ্ছিলেন! কোথা থেকে অতিমানবিক শক্তি পাই আমিও সেদিন, এক ঝটকায় তাকে মাটিতে ফেলে দরজা খুলে বাইরে আসি। ভীতি নয়, লজ্জা নয়, প্রতারণার অপমানে আমার গলা ধরে আসে। আমি চিৎকার করে বলি- আমার কথাডা কাউরে না জানাইয়া আপনে মহৎ হইছিলেন, আমি কিন্তু মহৎ হমুনা, প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে কমপ্লেন করুম। স্যারের দৃষ্টিতে ভেসে থাকা ভয়ার্ত দুর্বল ক্রুরতা পিছনে ফেলে আমি প্রেম থেকে ফিরে আসি। 



সবশেষে পুনরায় নীতা--

খালাম্মার চোখের অল্প সল্প অশ্রু স্রোতে পরিণত হয়। পাগলের মত এখানে ওখানে ফোন করেন তিনি। ঋতু যে সব বাসায় টিউশনি করতে যায়, যে স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়, যে গানের দলটিতে রিহার্সেল করতে যায়, সর্বত্র। প্রত্যুত্তরে হতাশ হয়ে ফোন রেখে আমাকে উন্মাদের মতো জড়িয়ে ধরেন- অ মা নীতা, কিতা করতাম অখন, কস না ক্যান? মাত্রাতিরিক্ত ব্লাড প্রেসারের চাপেই সম্ভবত খালাম্মা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েন। পুনরায় প্রলাপ বকতে থাকেন, অতীত সংকটকালের বৃত্তান্ত বয়ান করে। ট্রেইলারি করা আর্থিক অনটনের সংসারে টিউশনি করে অর্থের যোগান দিয়ে চলেছে মেয়েটা স্কুলের গন্ডি পার হয়েই। কোনদিন ভাল একটা মাছের টুকরা খায়নি, ভালো একটা জামা পরেনি, কোনো চাহিদা আবদার নেই মেয়েটার। খালাম্মার আহাজারিতে আমার চেপে রাখা অশ্রুও অবাধ্য হয়ে উঠে। 

বাইরে অনেক আগেই সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমে এসেছে আরো গভীর হবার প্রস্তুতি নিয়ে। ব্যাগের ভিতর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠে , বুঝতে পারি আমার মায়ের ফোন।

ব্যাগ থেকে খুলে ফোনটা রিসিভ করার আগেই সাইরেনের মতো নিস্তব্ধতা খানখান করা ভোঁ ভোঁ শব্দে অন্তরাত্মা কঁপে উঠে, পুলিশের গাড়ির রহস্যময় আলো খোলা দরজা দিয়ে ঘরে আছড়ে পড়ে ম্লান আলোর দুর্বহ দুশ্চিন্তাকে আরো অস্থির অসহনীয় করে তোলে। 

সাইরেনের শব্দটা থেমে যাবার পর পরই সোহাগের কণ্ঠটা কানে আসে- আম্মাগো আফামনি............. ধেঁয়ে আসা আশঙ্কার গভীর অন্ধকার চিড়ে দৌড়ে যাই আমরা কালভার্টের উপরে, যেখানে পুলিশে মানুষে বেশ একটা জটলা, সোহাগের কন্ঠের উৎপত্তিটা সেখানেই। দুপাশের অনতিবয়স্ক গাছগুলোর মতো সবার দৃষ্টি কালভার্টের নীচে ঝড়াপাতা, জংলী গাছের আড়ালে। পুলিশের ফোকাস করা কৃত্রিম আলো ছাপিয়ে ঋতুর দেহ গ্রাস করা ঘন অন্ধকারেও আমার কিংবা খালাম্মার ঋতুর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ দেহটা চিনতে মোটেই বেগ পেতে হয় না। খালাম্মা নিমিষে মূর্ছা গিয়ে বেঁচে যান উপস্থিত মূহুর্তের ভয়াবহ মানসিক চাপ থেকে,আমার মুঠোয় বাজতে থাকা মোবাইলে মায়ের ক্রমাগত তাড়া হঠাৎ আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়তে অভিঘাত করে, আমি উপলব্ধি করি এখান থেকে সরে যাবার প্রয়োজনীয়তা। সবার অলক্ষ্যে ভয়ডর উপেক্ষা করে ফাঁড়ি পথ ধরি। পাড়ার উঠতি ছাত্রনেতা দের হো হো হাসির শব্দ কাছেধারে কোথাও সিগারেটের ধোয়ার সাথে মিশে যায়।আর আমি আকাশ-পাতাল ভাবনায় পাড়ার উঠতি মস্তান, নিক্সন,আকিব স্যার ইত্যাদি নানা মুখের মিছিলে হাবুডুবু খেতে থাকি, ঋতুর মৃত্যুর বিষাদ ছাপিয়ে কতগুলো প্রশ্নবোধক আমাকে চারপাশ থেকে বিপর্যস্ত করে তোলে। 

ঠিক তখন ঋতু আবার আমার হাত ধরে টান দেয়- ভাগ, ভাগ, তাড়াতাড়ি ভাগ। মোবাইলের সিমটা পানিতে ফালাইয়া কয়েকমাস এই শহর ছাইড়া লুকাইয়া থাক। নইলে তোর এই প্রশ্নবোধকগুলো নিয়ে পুলিশ, সাংবাদিক, উকিল তর জীবনডা ছ্যাড়াব্যাড়া কইরা দিব। মাইয়ারে কেউ তর-আমার গলাগলি করা বন্ধুত্ব দেখবো না, আমার এই বীভৎস মৃতদেহ দেখবো, আর তর জীবন দুর্বিষহ কইরা তুলবো। ভাগ........ ভাগ................।

1 টি মন্তব্য:

  1. ভালো লিখেছেন। মেষের দিকটা চমৎকার ছিল। একিই চরিত্রে ধারাবাহিকতার গল্প পড়তে আমার ভালোলাগে। শুভ কামনা দিদি।

    উত্তরমুছুন