রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

হলদে গোলাপঃ পাণ্ডুর রঙে উদ্ভাসিত অদেখা জীবনের পাঁচালী

বইপাঠ

পাপড়ি রহমান

কী পড়ছি? 

কেউ এমন প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করলে বেশ হকচকিয়ে যাই আমি। উত্তর যে কী দিব, তাই ভেবে সারা হই। আমার তাকে পালটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে--আচ্ছা আপনিই বলুন না আমার কী পড়া উচিত আর কী পড়া উচিত নয়?

এই প্রশ্নটাকে ইদানীং আর সহজভাবে নিতে পারি না, কারণ আমি পড়বার মতো খুব বেশি কিছু হাতের নাগালে পাই না বা আমার সবকিছু পড়তে ভালোও লাগে না। চিরকাল বেছে বেছে পড়ার স্বভাবের কারণে সর্বভুক তেলাপোকা আমি কোনোদিন হতে পারিনি। 

ফলে আমি টিটিপক্ষীর মতো হা করে তাকিয়ে থাকি একটা মনপছন্দ বইয়ের জন্য। আমার আব্বা প্রায়ই বলতেন এই পাখিটির কথা, যে কি না জলের জন্য অপেক্ষা করে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি খুব বোদ্ধাপাঠক, এমন নয়। বা অতি পড়াশুনা আমার, এমনও নয়। আমার পাঠ বা পড়াশুনা তেলেসমাতি দেখাবার মতো, এমন দাবী আমি কস্মিনকালেও করব না। 

তবে আমি খুঁতখুঁতে। যে-বইয়ে মজতে পারি না, তা যত ক্লাসিকই হোক আমি পড়ব না কিছুতেই। ফলে খটমট বঙ্কিমচন্দ্র নিয়ে আমার টেণ্ডার এজ পার করতে হয়েছে। মানিক এবং মধুসূদন ছিল শিথানে-পইথানে। তবেও এটাও তো সত্য আমি যাতে মজি, তাতে চিরকালের জন্যই মজি। হতে পারে পাঠক হিসেবে আমি অনাধুনিক, পশ্চাদপসরণকারী, বা খুব আটপৌরে, একঘেয়ে, বিরক্তিকর। সেখানে দাঁড়িয়েই বলছি, মানিকের-'পুতুল নাচের ইতিকথা'র তুখোড় ব্যক্তিত্বসম্পন্না কুসুমের কথা আমি এক জীবনে বিস্মৃত হতে পারিনি। জীবনানন্দের 'মাল্যবান'-এর রাত জেগে বসে থাকার অদ্ভুত ভঙ্গিটি আমি আজও স্পষ্ট দেখতে পাই। দেখতে পাই তাঁর অন্তহীন নিঃসঙ্গতা। কিংবা রবীন্দ্রনাথের 'যোগাযোগ'-এর কুমুদিনীর মর্মবেদনা। তাঁর রজনীগন্ধার ডাঁটার মতো পেলব সৌন্দর্য। দেখতে পাই, সুরের সাথে অসুরের মৌন লড়াই।আর আভিজাত্যের সাথে স্থুলরুচির, বা সেই অরণ্য-নন্দিনী 'কপালকুণ্ডলার' সরল প্রতিকৃতি, তাঁর আজানুলম্বিত কেশরাশি। 

হাসান আজিজুল হকের 'আগুনপাখির' মনোলোগ। বা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামার' তমিজকে। তমিজের বাপকে। চেরাগ আলিকে। বা, শহিদুল জহিরের 'ডলু নদীর হাওয়া'। 

বিগত কয়েক বছর ধরে কানাডিয়ান লেখক এলিস মানরো নিয়ে কাজ করতে করতে তাঁর অন্ধ ফ্যান হয়ে যাওয়া। আহা! কী-সব গল্প তিনি রেখে যাচ্ছেন এক জীবনে- এইসব ভাবতে ভাবতে রাত ভোর করে ফেলা!

বা, তাঁর গল্পের বুননে যে ঢেউয়ের ওঠানামা সেসব অবলোকন করে বিস্ময়াভিভূত হয়ে থাকা! 

আমি নিজে জানি, এমন ঘাড়ত্যাড়া বেকুব পাঠককে কোনো লেখক বশ করতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। 

পুরাতন সূত্রমতে গত এক বছর ধরে আমি একটি বই পড়ে চলেছি। এই এক বছরে এই বইয়ের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু নতুন কবিতার বই, কিছু তরুণের গল্পবই, কিছু অনুবাদ বানের জলের মতো ঢুকে গেছে। যাদের পড়েছি তারাও আছে পাতাটির মতো সবুজ, ফুলটির মতো সুবাসে। কিন্তু এই বইটি আমাকে নতুন প্রেমে মারাত্মক বেঁধে ফেলেছে। ফলে আমি তাকে পড়ছি জীবনের ক্রান্তিকালে পাওয়া প্রেমপত্রের মতো, যেন সে ফুরিয়ে গেলেই আমি রিক্ত-শূন্য হয়ে যাব। যেন সে নিঃশেষ হয়ে গেলে আমি মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলব। 

বইটির লেখক- স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বইয়ের নাম- হলদে গোলাপ। 

এমন ক্লিশে নাম সর্বস্ব বইয়ের টান আমার থাকার কথা নয়। বইটির কথা আমি প্রথম শুনি মাওলা বাদার্সের কর্ণধার মাহমুদ ভাইয়ের কাছে। 

ইদানীংকালের ভালো উপন্যাসের নাম মনে করতে করতে আকালের চিত্রই ভেসে ওঠে। ভালো কী কী লেখা হয়েছে বলতে বলতে এই বইটির নাম চলে এসেছিল। 

তারে আমি চোখে দেখিনি তার অনেক গল্প শুনেছি- এ আমার জীবনের ব্রত নয়। ফলে এক বন্ধুকে দিয়ে বর্ডার পার করিয়ে তাকে নিয়ে আসি স্বগৃহে। 

এরে মা, এ যে দেখি আনন্দ পুরস্কার পেয়ে বসে আছে! 

ঢাউস এক বই, ৫৯২ পৃষ্ঠার বিছিয়ে রাখা উন্মুক্ত এক- জলমহাল। আপনি চাইলেই ঝাঁকেঝাঁক মীনেদের জালে তুলে ফেলতে পারবেন। পরক্ষণেই তাদের ছেড়ে দিয়ে জলক্রীড়া দেখতে পারবেন। সে এক অদ্ভুত আনন্দের আধার! 

আমি বইটি পড়ছি বেজায় যত্ন করে, উপভোগ করছি এর বিষয়-আশয়, অদেখা চরিত্রের কর্মযজ্ঞ। বইটি যেন বা হীমের রাতের বহু কাঙ্ক্ষিত এক মগ এক্সপ্রেসো কফি--যা ফুরিয়ে যাওয়া মাত্রই আমার দেহে উষ্ণতার আকাল দেখা দেবে, ক্যাফেইনের নেশা আমায় পুনঃপুন তাড়িত করবে। 

কেন এই বই আমাকে এত টানছে? যা খুব সহজে আত্মস্থ করা যায় তা আমি পড়ব কেন? 

আমার পাঠের মূলমন্ত্র--কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে করে না বঞ্চনা।

সমাজের শরীর ও শরীরের সমাজতত্ত্ব নিয়ে এক দুঃসাহসিক উপন্যাস এটা। ইদানীং যে বিষয় নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত পৃথিবী, যে বিষয়কে কেউ কেউ আধুনিকতাবাদ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, সে বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন শক্তিমান লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। জোর দিয়েছেন মনস্তত্ত্বের ওপর। বলেছেন, নানাভাবেই অসহায় এই পৃথিবীর মানুষ। চারপাশে এত নোংরা রাজনীতি, ভয়ানক অবক্ষয়, দলিতমথিত জীবন, অপ্রাপ্তি, ক্রমাগত বদলে যাওয়া মানুষ, তাদের জীবনবোধ, ক্ষুধা, বঞ্চনা আর হাহাকারপূর্ণ দিবারাত্রিতে সব নিয়ম মেনেই চলবে কেন? কিছু অনিয়ম হতেই পারে। প্রকৃতির বিপক্ষে গিয়ে কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। ফলে ওসবে শংকা বা হতাশার কিছু নেই। নিয়ম করেই সব গোলাপকে লাল হয়ে ফুটতে হবে কেন? কিছু পুষ্প অনিয়ম নিয়েই ফুটুক। কিছু গোলাপ হলুদ হোক। এই হলদে গোলাপ হোমোসেক্সুয়ালিটি। যা নিয়ম ভেঙে বাগানের সব পুষ্পের সঙ্গে ফুটতে পারে।




পাপড়ি রহমান



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন