রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

দীপেন ভট্টাচার্যের গল্প : অসিতোপল কিংবদন্তী

আমি উদ্ভাবন করেছিলাম নির্ভেজাল উজ্জ্বল সাদা কাগজ তৈরি করার পদ্ধতি। সাদা কাগজ, তাতে কোনো দাগ নেই, পরিষ্কার। তার ওপর আপতিত সমস্ত ফোটনের শক্তি ক্ষণিক বিরতির পর প্রতিফলিত হয়ে পৌঁছায় দর্শকের রেটিনায়। সেই শক্তির সব রঙ মিলে মিশে মনে সৃষ্টি করে সাদা রঙের ধাঁধা। সেই সাদা কাগজের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে মনকে সাদা করা যায় - আমি তার নিশ্চয়তা দিতাম। প্রতিদিন, যে কোনো সময়, পাঁচ মিনিট সেই সাদা কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকলে এক মাসের মধ্যে একটি কালিমামুক্ত মন, সমস্ত ধরণের আত্মসন্দেহ থেকে মুক্ত অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যাবে।
এই ছিল আমার অবস্থান। আমি বলতাম, মাটিতে জোড়াসনে বসে ধ্যানমগ্ন হয়েও সেরকম সাদা প্রান্তর কল্পনা করতে পারবে না, বন্ধ চোখের পেছনে মহাশূন্যের গভীর কালো ছাড়া আর কিছু দেখবে না, তাই ধ্যানের চেষ্টা বৃথা, বরং শ্বেত-শুভ্র কাগজের দর্শন কার্যকরি। তবে আমার নিশ্চয়তা তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন সাদা কাগজটি চোখের দৃশ্যগোলককে পুরোপুরি ভরে থাকবে, অর্থাৎ সাদা ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। অন্তত আমি সেরকমই ভাবতাম যতদিন না প্রথমবারের মত একটা নীল অসিতোপল মণি দেখলাম। তারপর থেকে অসিতোপল রঙ আমার মনকে অধিকার করে নিল। অথচ আমি ভেবেছিলাম আমার মন শান্ত সরোবর-পৃষ্ঠের মতন এবং একই সঙ্গে দুর্ভেদ্য। বহু বছরের সাধনায়, শ্বেত শুভ্র কাগজের সান্নিধ্যে, ভেবেছিলাম আমার মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরনকে বশে আনতে পেরেছি। কিন্তু অসিতোপল মণি, যাকে আমরা নীলকান্তমণি বা নীলা বলেও চিনি, তার উজ্জ্বল নীল রঙ আমাকে বিচলিত করল। এরপর থেকে আমার প্রতিটি সচেতন ক্ষণ বিশুদ্ধ নীল রঙের প্রকৌশল সৃষ্টিতে নিয়োজিত হল। 

এতদিন কেন আমি নীল রঙকে অগ্রাহ্য করেছিলাম সেটা বুঝতে চাইলাম। শুনলাম প্রাচীনকালে মানুষ নাকি নীল রঙ চিনত না। তারা অনেকেই নীল আর সবুজ রঙকে আলাদা করে ভাবত না। আকাশের নীল, সাগরের নীল তার মনে দাগ কাটত না যতদিন পর্যন্ত না সে অসিতোপল বা নীলকান্তমণি আবিষ্কার করল আর গুহা থেকে লাপিস লাজুলি নামে এক নীল পাথর আহরণ করল। সেই পাথর গুঁড়ো করে সাথে চুনাপাথর মিশিয়ে সে সৃষ্টি করল নীল রঞ্জক। সেই রঞ্জক ছিল খুবই মূল্যবান। নীল রঙকে চিনতে পেরে মানুষ তাতে সম্মোহিত হল। এরপরে সে বালি, চুন, তামা আর ক্ষারকে মিশিয়ে উত্তপ্ত করে নীল পদার্থের রসায়ন উদ্ভাবন করল। উদ্ভিদ থেকে সে নীল রঞ্জক বার করার পদ্ধতি শিখল, কোবাল্টের সঙ্গে আলুমিনা মিশিয়ে তৈরি করল নীল রঙের হালকা কি গাঢ় ছায়া। 

আমার ছোট বাড়ির একটা ঘরে গড়ে তুললাম গবেষণাগার, তাতে জমা হল মানুষের জ্ঞাত সব রাসায়নিক দ্রব্যই যা কিনা নীল রঙ সৃষ্টিতে লাগে। ঘরের অন্য কোনে ছিল সাদা কাগজ তৈরির সরঞ্জাম। বিশুদ্ধ নীল রঙ তৈরি করে সেই সাদা কাগজে তাকে মুদ্রিত করাই ছিল আমার একমাত্র অভিলাষ। সেই অভিলাষকে পূরণ করতে দশটি বছর লাগল। একদিন সকালে, আমার যখন চল্লিশ বছর বয়স হল, আমি একটি উজ্জ্বল নীলবর্ণ কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরলাম। যেমন ভেবেছিলাম তাই যেন হল, সময়ের স্রোত থেমে গেল, আমার যখন সম্বিত ফিরল তখন দুপুর পার হয়ে গেছে। 

কিন্তু এই সাফল্যের জন্য আমাকে অনেক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। আমার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টাকে উন্মাদনা ভেবে ঘনিষ্ঠজনেরা আমাকে নিরস্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আমার স্ত্রী আমার অবহেলা সহ্য না করতে পেরে পাঁচ বছর আগে কন্যার হাত ধরে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আমাদের মেয়ের বয়স হয়েছিল তখন তিন বছর। 

সেই সময়ে ভেবেছিলাম আমার জীবনকে হয়তো দুভাগে ভাগ করা যায় - প্রথম জীবনটা হল সাদা পর্ব যার রূপ ছিল শান্ত সমাহিত, আর দ্বিতীয় পর্ব যাকে বলা যায় নীল পর্ব যাকে বর্ণনা করা যায় একটা অশান্ত বিপর্যয়ের যুগ হিসেবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই সরলীকরণ টেঁকে নি। পাঠক যদি আর একটু ধৈর্য ধরেন তবে কেন সেই দুই বিভাগ টেঁকে নি সেই কাহিনী এখানে পড়তে পারবেন। 

মনের মত বিশুদ্ধ উজ্জ্বল নীল রঙ দিয়ে আমার গবেষণাগারে একটি বই তৈরি করতে পেরেছিলাম। বইটির নাম দিয়েছিলাম অসিতোপল রঙ। বইটিতে মাত্র সাতাশটি পাতা ছিল, তার মধ্যে তেইশটি পাতা খুব হাল্কা নীল থেকে গাঢ় নীল রঙ দিয়ে পূর্ণ ছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম ঐ নীল রঙের অবগাহনে পাঠক - আসলে যে কিনা দর্শক - তার মন শুধুমাত্র কালিমামুক্ত ও আত্মসন্দেহমুক্তই হবে না, বরং দৈনন্দিন জীবনের মাঝেই এক চিরমুক্তির স্বাদ পাবে। এই অনুকল্পটি পরীক্ষা করার জন্য, যে বন্ধুরা তখনো আমাকে পুরোপুরি ত্যাগ করে নি তাদের মধ্যে বিতরণের জন্য, বইটির দশটি প্রতিলিপি বানাই। দুর্ভাগ্যবশত বইগুলি তাদের দেবার আগেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমাকে শহর ছেড়ে পালাতে হয়। যুদ্ধের সময় কিছু সুযোগসন্ধানী প্রতিবেশী আমার বাড়ির যাবতীয় জিনিস লুট করে, এর মধ্যে নীল বইটির দশটি কপিও ছিল। যুদ্ধের শেষে শহরে ফিরে বাড়িতে শুধুমাত্র ছাপার ভারী যন্ত্রটা পাই, প্রতিবেশীরা নিতান্ত অলসতাবশত সেই ভারী জিনিসটাকে আত্মসাৎ করে নি। তাদের কাছে আমার জিনিসগুলো ফেরৎ দেবার জন্য বললে তারা এই ব্যাপারে অজ্ঞানতা দাবি করে, বরং উল্টে তাদের মান হানি হয়েছে বলে মামলা করবে বলে আমাকে শাসায়।

এই ভাবে আমি আমার দশ বছরের কষ্টকৃত কাজের ফসল হারাই। ততদিনে আমার প্রাক্তন স্ত্রী এক নতুন সংসার বেঁধেছে, তার সঙ্গে আমাদের কন্যাও রয়েছে যে কিনা আমাকে প্রায় বিস্মৃত হয়েছে। অনন্যোপায়  আমি পুরোনো শুভ্র শ্বেত কাগজে সমাহিত হবার অনুশীলনে ফিরে যাই এবং কিছু দিনের মধ্যেই আমিত্ব, আত্মগরিমা ও অহং বিসর্জন দিয়ে উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো জীবনেও এক ধরণের মুক্তির আস্বাদ পাই। গ্রীষ্মের চরম উষ্ণতা আর মাঘের কঠিন শৈত্যপ্রবাহ অগ্রাহ্য করে সেই সময় শহরময় ঘুরে বেড়াতাম। এর মধ্যেই এক সন্ধ্যাবেলায় বই পাড়ার এক দোকানে ঢুকে আনমনাভাবে তাকে সাজানো বইগুলো দেখছি, তখন একটি কথোপকথন আমার কানে আসে। ক্রেতা বিক্রেতাকে প্রশ্ন করে, “অসিতোপল রঙ নামে কোনো বইয়ের সন্ধান আছে কি আপনার কাছে?” আমি চমকে পেছন ফিরে তাকাই। বিক্রেতা যেন আমার প্রতিক্রিয়া দেখেই কী একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল, তারপর ঝুঁকে পড়ে ক্রেতার কানের কাছে গিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “ঐ বই আমি দেখি নি, কিন্তু শুনেছি যারা দেখেছে তারা নাকি উন্মাদ হয়ে গেছে। ঐ বইয়ের খোঁজ আপনার না করাই ভাল।” এই বলে বিক্রেতা আবার ঘাড় সোজা করে আমার দিকে তাকালো। এরা কেউই আমাকে চেনে না, এরা জানে না অসিতোপলের রঙ সৃষ্টি করতে আমার জীবনের দশটি বছর ব্যয় হয়েছে, নিকটজনদের হারিয়েছি। আগেই বলেছি ততদিনে আমি সমস্ত ধরণের অহংবোধ ত্যাগ করেছি, তাই সেই সন্ধ্যায় ক্রেতা-বিক্রেতার এই আলাপকে আমি যেন এক গ্রহান্তরের আগন্তুক হিসেবে দেখলাম, আমার সঙ্গে যেন নীল রঙের বইটির কোনো যোগাযোগ নেই। বুঝলাম বাড়ি থেকে লুট করা বই দেশের বইয়ের বাজারে পৌঁছেছে, আমার প্রতিবেশীরা নিশ্চয় সেই বইগুলো খুলে দেখে নি। বই পড়ে উন্মাদ হবার জনশ্রুতি সম্বন্ধে অবগত ছিলাম, কিন্তু আমার বই দেখে কেউ উন্মাদ হবে এই গুজব আমাকে বিচলিত করেছিল। 

এরপর বেশী দিন হয় নি, এক প্রতিবেশী জাল দলিল করে আমার বাড়ির মালিকানা দাবি করল। মামলায় বাড়ি হারালাম। দেশের পরিস্থিতিও এমনভাবে বদলাল যে বাধ্য হয়ে এক রাতে বিমানে চড়ে বিদেশ পাড়ি দিলাম। যে নতুন দেশে এলাম সেখানে গাছের পাতার রঙ হেমন্তে লাল, বাদামী, হলুদ হয়ে ঝরে যায়, শীতে শুভ্র তুষারে মাঠ ঢেকে যায়, বসন্তে নতুন ফুলে সব গাছ গোলাপী হয়, গ্রীষ্মে সবুজ ত্রিকোণ উঁচু গাছের ওপর দিয়ে উষ্ণ আর্দ্র বাতাস বয়। এই নতুন প্রবাস পর্বকে আমি খুব শীঘ্রই মানিয়ে নিলাম, দেহ-মনকে বিবর্জিত করে পৃথিবী থেকে বিযুক্ত হবার শুভ্র কাগজের অনুশীলন এতে কাজে লেগেছিল।
  
যে শহরে এসে উঠলাম তাতে যাতায়াতের জন্য ট্রামের ব্যবহার ছিল। আমার তিনতলায় ফ্ল্যাটবাসা থেকে বহু রাত পর্যন্ত নিচে ট্রামের ঘরঘর শব্দ শোনা যেত, ট্রামের ওপরে বিদ্যুৎ লাইনের সাথে লাগানো আঁকশি থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ ঘর আলো করে দিত। ঐ শহরে এক দয়ার্দ্র-হৃদয় ব্যক্তি আমাকে একটি কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। বলাই বাহুল্য যে পেশায় আমি শিক্ষিত ছিলাম সেই পেশায় কোনো কাজে যোগ দেবার সৌভাগ্য আমার হল না। তবু অভিযোগ করব না, জীবনযুদ্ধ আমাকে পৃথিবী দেখার একটা সুযোগ করে দিয়েছিল। 

যেখানে কাজ করতাম সেখান থেকে ট্রামেই আমার বাসায় ফিরতাম। শীতের সময় রাত আটটা আর গ্রীষ্মে রাত নটায় কাজ শেষ হত। রোববার দিনটায় ছুটি ছিল। গ্রীষ্মের সময় রাত দশটা পর্যন্ত দিনের আলো থাকত। শহরের সব মানুষ গ্রীষ্মের ক্ষণিক উষ্ণতা ও আলোকে পাবার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত শহরের রাস্তাকে ভীড়াক্রান্ত করে রাখত। রেস্তোরাঁগুলো কালো ইঁটে বাঁধানো উন্মুক্ত চত্বরে খাবার ও পানীয় পরিবেশন করত। গিটার বাজিয়ে দলে দলে তরুণ গান গাইত ফোয়ারা পাশে। এরকমই এক গ্রীষ্মের আলোকোজ্জ্বল রাতে কাজ শেষে ট্রামে চেপে ঘরে ফিরছি, সেদিন ট্রামে একটু ভীড়ই ছিল, অর্থাৎ দু-একজন দাঁড়িয়ে ছিল। বারটা ছিল মঙ্গল। হঠাৎ করেই চোখে পড়ল একটি বছর ত্রিশের তরুণীকে, আমার চেয়ারের ওপাশের চেয়ারে সে বসে, আমাদের মাঝখানে ট্রামের করিডর। মেয়েটির খোলা কালো চুল একটা হাল্কা লাল রঙের জ্যাকেটের ওপর এসে পড়েছে, বুক-খোলা জ্যাকেটের নিচে খোপ-খোপ ফুলের ছাপের জামা, নিচে নীল স্কার্ট। মেয়েটি তন্ময় হয়ে একটা বই দেখছে, বইটি তার কোলের ওপর খোলা, দুটি পাতা জুড়ে উজ্জ্বল নীল রঙ ছড়ানো। আমি চমকে উঠেছিলাম, আমার হৃদপিণ্ড দ্রুত কম্পিত হয়েছিল, বইটি যে অসিতোপল রঙ সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই ছিল না। ঐ বইটির প্রতিটি পাতার রঙ আমার মনে নোঙ্গর দিয়ে আটকে ছিল, আমি দেখলাম চৌদ্দ আর পনেরো পাতার নীলাভ আবেশে মেয়েটি সম্মোহিত। বলাই বাহুল্য এইভাবে বিদেশে আমার বইটা যে দেখতে পাব সেটা আমার সব কল্পনার বাইরে ছিল। কীভাবে মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করব বা তাকে কীভাবে বইটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব এসব ভাবতে ভাবতেই ট্রামটা আচমকা ব্রেক কষল। পাশে দাঁড়ানো একটি ছোট ছেলে টাল সামলাতে না পেরে মেয়েটির ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মেয়েটি চমকে উঠল, ছেলেটি অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “অত্যন্ত দুঃখিত” আর এর মধ্যে ট্রাম চালিকা ট্রাম-স্টপের নাম ঘোষণা করে ট্রাম থামিয়ে দিল। মেয়েটি তড়িঘড়ি ট্রাম থেকে নেমে গেল। তার বাঁ হাতের মুঠিতে দৃঢ়ভাবে ধরা ছিল অসিতোপল রঙ। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে যতক্ষণে আমি সম্বিত ফিরে দরজার কাছে উঠে গেলাম ততক্ষণে ট্রাম ছেড়ে দিয়েছে। কাচের ভেতর থেকে মেয়েটিকে হাঁটতে দেখলাম, তার মুখটিকে ভাল করে দেখে আমার স্মৃতিতে পাকাপোক্ত করে নিতে চাইলাম। পরের স্টপে নেমে যখন দৌড়ে ফিরে এলাম তাকে কোথাও দেখলাম না।

যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জীবনকে সাদা ও নীল পর্বে ভাগ করেছিলাম। পরবর্তীকালে ভেবেছিলাম পৃথিবীতে আমার উপস্থিতির সময়কাল যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ও যুদ্ধোত্তর এই দুটি ভাগে বিভক্ত। সেটাও যে ভুল ছিল এই ঘটনার পর ধীরে ধীরে বুঝলাম। 

যে স্টপে মেয়েটি নেমে গিয়েছিল তার উল্টোদিকে একটা কফির দোকান ছিল। দোকানে বসলে ট্রামের স্টপটা স্পষ্ট দেখা যেত। পরের মঙ্গলবার কাজ থেকে একটু আগে বের হয়ে সেই দোকানে কফি নিয়ে বসলাম। এক ঘন্টা এরকম বসে রইলাম স্টপের দিকে ঠায় চেয়ে। লাল জ্যাকেটের দেখা মিলল না। এইভাবে এক নতুন সাপ্তাহিক কার্যক্রম শুরু হল, প্রতি মঙ্গলবার রাত নটা বাজার একটু আগে আসতাম, দশটার দিকে চলে যেতাম। ধীরে ঐ ট্রাম রুটের সমস্ত চালক-চালিকার মুখ আমি চিনলাম। তাদের অনেকে হয়তো এর মধ্যে অবসরে গেল। আর যে দোকানে কফি খেতাম সেখানকার কর্মচারীরাও আমার রুটিন বুঝে নিল। সেই দোকানের মালিকানাও কয়েকবার বদলাল, কত কর্মচারী এল-গেল । তারপর এক গ্রীষ্মেরই সন্ধ্যায়, ন’টি বছর পরে, সেই লাল জ্যাকেট পড়েই একজন নামল, তাকে এতদিন পরে ‘মেয়ে’ বলাটা হয়তো সঙ্গত হবে না। ট্রাম থেকে নেমে সে হাত বাড়িয়ে দিল। একটি বছর পাঁচেকের বালিকা তার হাত ধরে লাফিয়ে নামল। আমার হৃদপিণ্ড লাফিয়ে গলার নিচে যেন আটকে গেল। হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে তারা এই কফির দোকানের পাশ দিয়ে গেল। বাচ্চা মেয়েটির দু দিকে বিনুনী, সে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছিল, তার বিনুনী দুলতে দুলতে এসে পড়ছিল তার সাদা জামায়। তার পায়ে ছিল লাল ছোট জুতো, সাদা মোজা। মাঝে মাঝে সে মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল, হাসছিল। তার ডান হাত মায়ের বাঁ হাতের মুঠিতে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ ছিল যেমন ন’বছর আগে অসিতোপল রঙ তার হাতে আবদ্ধ ছিল। 

তারা চলে গেল কফি দোকানের বড় কাচের জানালার পাশ দিয়ে। ইচ্ছা করলেই বাইরে যেয়ে তাদের ধরতে পারতাম, সেই নারীকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম আমার বইটি সম্বন্ধে, কিন্তু এত বছর পরে সব প্রশ্নের সময় পার হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে বুঝলাম লাল জ্যাকেটের নারী উন্মাদ হয়ে যায় নি, বরং সে এক ধরনের আত্ম-উপলব্ধি পেয়েছে। তার উজ্জ্বল মুখে এমন এক প্রশান্তি ছিল যা কিনা আমাকে সেই কাচের বাঁধা পেরিয়ে শান্ত করেছিল। মা ও মেয়ের এই যুগলকে দেখতে আমার মাথা এলিয়ে দিই সেই কাচে, তাদের উচ্ছলিত পদযাত্রা দেখি যতক্ষণ না তারা রাস্তার বাঁকে হারিয়ে যায়। 

অসিতোপল রঙ অন্তত লাল জ্যাকেটকে উন্মাদ করে নি। বহুদিন পরে মহাবিশ্ব থেকে একই সাথে সংযুক্ত ও বিযুক্ত হবার যে সাধনা আমি করেছি তা যেন ফিরে আসে। মা ও মেয়ের সম্মিলিত আনন্দে আমিও এক ধরণের প্রশান্তি অনুভব করি। তাদের আনন্দে আমার অবদান থাকলেও থাকতে পারে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তাদের অনাবিল আনন্দধারা আমাকে সংক্রামিত করে। আমার মুখে তৃপ্তির স্মিতহাসি ফুটে ওঠে। অসিতোপল রঙ সার্থক হয়েছে। আমার গালে দোকানের কাচের ঠাণ্ডা স্পর্শের শান্তিতে বহুক্ষণ বসে থাকি। 

তারপর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দেশের এক বন্ধুকে ফোন করি। আমার মেয়ের বয়স এখন কুড়ি ছাড়াচ্ছে, সে আমার সাথে কথা বলতে চায় না। এই বন্ধুর সাথে তার যোগাযোগ আছে, বন্ধুকে বলি মেয়েকে বলতে সে যেন তার বাবাকে ক্ষমা করে দেয়। 

গত নয় বছর একটি নতুন রঙের কথা ভেবেছি। লাল বেরিল পাথরের রঙ যে লালকে শুধু কল্পনা করা যায়। ঠিক চুনি নয়। মৃদু আগুনের আভা, ট্রামের তারের তড়িৎ-স্ফুলিঙ্গ। হয়তো এখন সময় হয়েছে শান্ত নীল পার হয়ে অশান্ত লালকে বরণ করার। প্রকৃতিতে রঙ নেই, রঙ আমাদের মনে। যে আলোকতরঙ্গ আমাদের মনের প্রেক্ষাগৃহে লোহিত রঙের কণিকা সৃষ্টি করে তাকে এখন আমি আহ্বান জানাই। বনের দাবানল নতুন গাছের সৃজন করে। আমার ছোট ফ্ল্যাটবাড়ির কোনায় নতুন এক গবেষণাগারের কথা ভাবি। সাদা, নীল ও অপেক্ষা পর্বের পর এখন লোহিত পর্বের শুরু। আমার অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। 

শেষ একটি কথা বলে এই নীল দর্পণ শেষ করছি। আপনি - পাঠক - কোনোদিন হয়তো অসিতোপল রঙ বইটি আবিষ্কার করতে পারেন। আমি - লেখক - আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেই বইয়ের নীল পাতায় নিশ্চিন্তে আপনার চোখের দৃষ্টি রাখতে পারেন, নীলের গভীরে আত্মসমর্পণ করতে পারেন, সেই নীল আপনাকে উন্মাদ করবে না, সেই অসিতোপল নীল আপনাকে বস্তুজগতের বাইরে নিয়ে যাবে।

২টি মন্তব্য: