রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

পাঠকৃতি : পাপড়ি রহমানের নির্বাচিত গল্প

আলোচনা
এণাক্ষী রায়

শীত শীত ভাব এসে গেল। ভোররাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি পশ্চিমে কোমর বাঁকাচ্ছে কালপুরুষ। আর পুব দিকের হালকা মেঘেরা গায়ে দিচ্ছে গোলাপি জামা। ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে সব তারারা। গোলাপি থেকে কমলা, হালকা বেগুনি রঙ ছড়িয়ে ছড়িয়ে পুব দিকে উঠছে লাল গনগনে গোলক।
রোজকার একই দৃশ্যপটেও রোজই যেন নতুন নতুন সুর আচ্ছন্ন করে দেয়। মুগ্ধ করে দেয় এই জাগরণ। পাপড়ি রহমানের গল্পগুলো পড়তে পড়তে এই রকমই ঘোর লাগে হৃদয়ে। অতি বাস্তব, রোজকার ঘটনায় নানা রকম রঙ ছড়িয়ে রেখে সেই ঘোর ঘনিয়ে তোলেন পাপড়ি। পড়তে পড়তে দেখি, নিজেই যেন সেসব গল্পের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সেখানে থেকে শহরজীবনের টানাপড়েন আর আধুনিক সব সমস্যা থেকে অনেক দূরে বয়ে চলা গ্রামজীবনের ঢেউ এসে গায়ে লাগে।

সম্প্রতি পড়ে ওঠার সুযোগ হল পাপড়ি রহমানের নির্বাচিত গল্প। এ যাবৎ প্রকাশিত পাপড়ির মোট সাতটি গল্প সংকলন থেকে বাছাই পঁয়ত্রিশটা গল্প নিয়ে গ্রন্থিত এই সংকলন। এর আগে তাঁর কোনো গল্প পড়া না-থাকলেও, এই সংকলনের প্রথম গল্পটাই মনে এমনভাবে দাগ কেটে গেল যে, বাকিগুলো না-পড়ে আর থাকা গেল না।

বলছিলাম প্রথম গল্পের (আগুন জলের জীবন) কথা। সেখানে ইন্তির জীবনচলাচলের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে একটা সমাজ। গল্পের প্রথম লাইন, “ আরো দু কদম হাঁটলেই পৃথিবীর মতো পুরোনো পুকুর” কবিতার মতো আবিষ্ট করে দেয়। প্রথম লাইন থেকেই একেবারে গল্পের ভেতর টেনে নেয় পাঠককে।

“-’ওই ইন্তি চুলে গিট্টু দে। দুইফর কালে চুল খোলা রাখলে বদজ্বিনের আছর হয়।’ অথচ ইন্তি জ্বিন-পরী বোঝে না; বালা মুছিবত বোঝে না। ইন্তি শুধু একমগ গরম চা বোঝে। এক মগ গরম চা পেলে জ্বিন-পরী-দেওদানো, বালা- মুছিবত দুনিয়া ধ্বংস করুক, তাতে ইন্তির কোনোরকম মাথা ব্যথা নেই। এক মগ গরম চা, কড়া জর্দার পান আর লাল টুকটুকে একখানা শাড়ির খুব সখ ইন্তির। কবেকার সখ ইন্তি তাও মনে করতে পারে না। “

গল্পের মুল চরিত্র ইন্তি এপিলেপ্সির রোগী। তাকে আত্মীয়রা বেড়ানোর নাম করে ফুফাতো বোনের বাসায় রেখে গেছে। ফিরিয়ে নেবার কথা কেউ বলেনি। ইন্তি, আলেয়া, আর আলেয়ার বছর সাতেকের মেয়ে মিঠুকে নিয়ে এই গল্প ডালপালা মেলেছে। শেষ পর্যন্ত পুকুরে ভেসে উঠছে মিঠু। “ আলেয়া আতঙ্কে নীল হয়ে দেখল ইন্তির চাপা রঙ কপালের নিচে গভীর দুটি গর্ত। গর্তের চোখ দুটো যেন ঠিকরে বের হতে চাইছে।"

পাপড়ির গল্প আসলে আমাদের জীবনের গল্প। গল্পের মধ্যে অনায়াসে ঢুকে পড়ে গ্রাম্য জনজীবনের মিথ, উৎসব, কথকতা,গান। ‘হলুদ মেয়ের সীমান্ত ‘ গল্পের কাব্যময় শুরু হচ্ছে, “তঞ্চবটি গ্রামে একদিন হলুদ উৎসব ঝেঁপে নেমে আসে। হলুদ রঙের তোড়ে ভেসে যায় প্রকৃতি। উড়নচণ্ডী বাতাস পুষ্পের সোনালি রেণু উড়িয়ে নিয়ে যায়। আসমানে, জমিনে যত্রতত্র গুঁড়ো গুঁড়ো পুষ্পরেণু ঝরে পড়ে। আর তঞ্চবটির বুকের ভেতর বয়ে-চলা কালিন্দীর জল উড়নচণ্ডী বাতাসে উথালপাথাল করে। চান্দের-বুড়ি রাতভর চরকায় সুতো কেটে কেটে তার মস্তবড় লাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখে। অতঃপর রূপার ময়ূরপঙ্খীর গলুইয়ে সেই সুতো বেঁধে ভাসিয়ে দেয় কালিন্দীর জলে। উথালপাথাল বাতাসে বিশাল ঢেউ ভেঙে ভেঙে পড়ে। সেই ঢেউয়ের ধাক্কায় চান্দের-বুড়ির ময়ূরপঙ্খী নিমেষে কালিন্দীর জলে তলিয়ে যায়। এতে বুড়ি বেদনার্ত হয়। আর তখন চান্দের আলো কেমন যেন ঘোলাটে দেখায়। বুড়ি আবার নতুন উদ্যমে রাত জেগে-জেগে চরকা ঘোরায় ঘটর ঘট...ঘটর ঘট....”। রূপকথা দিয়ে শুরু হলেও এই গল্পের চরিত্রদের জীবনের কথকতায় লেগে আছে ঘোর বাস্তব। গুড়িমালা, হিরেমন, কলির মা-রা হাটে গুঁড়ো মশলা বেচে। হলুদ বেচা থেকে তাদের ব্যাবসা শুরু বলে তাদের বলে হইলদ্যা বিবি। হাটের একপাশে শিশু গাছের তলে তাদের শিলমোহরহীন ব্যবসা। সকাল হলে বাচ্চাদের হাত ধরে মশলার চুপড়ি নিয়ে হাটের এক কোনে এসে বসে। মায়েরা পশরা সাজায় আর বাচ্চাগুলো ধুলি মেখে খেলে বেড়ায় আসেপাশে। এদের জীবনের হা-হুতাশ, অদম্য লড়াই একদিন শেষ হয়ে যায় এই হাটেই। চেয়ারম্যানের নির্দেশে, তার লোকজন হামলে পড়ে এদের ওপর। বাচ্চাদের চোখের সামনেই মশলা আর রক্তে মাখামাখি হীরেমন আর গুরিমালারা তখন চান্দের দেশের দিকে পাড়ি দেয়। এই গল্পের প্রতিটা পর্বের শুরুতে শ্লোকগুলোয় মেঠো গন্ধ লেগে থাকে। গল্পটাকে জড়িয়ে থাকে শ্লোক।

ঢোলসমুদ্দুর -এ এসে আবার প্রচলিত গল্পকথার সঙ্গে পাপড়ি মিশিয়ে দেন ঘোর বাস্তবকে। ঘরে বাইরে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তাহীনতা এই গল্পে মিশে যায় আড়ম্বরহীনভাবে। এই গল্পের “সোনাভান কি জানে না অন্ধকার মানেই বোঁচা কুয়া। কুয়ার ভিতরে পতন হলে দেহটাকে আর টেনে তোলা যায় না।”

পঁয়ত্রিশ টা গল্পের প্রত্যেকটিই একটার থেকে অন্যটা স্বতন্ত্র। অর্ধাঙ্গ, মোতাহার আর কণার ভালোবাসার গল্প। বিয়ের আগে হিজলের ছায়া ছায়ায় কণার কামিজের ভিতর খেলা করা মোতাহারের হাতের ছোঁয়ার জলে টলমলে কণা বিয়ের পর অনুভব করে মোতাহারের ভালোবাসা স্তন আর যোনিতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কণার স্তন ক্যান্সার ধরা পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে মোতাহার হাওয়া হয়ে যায়। এই সব বাস্তবের মধ্যেও পাপড়ির গল্পে ঢুকে পড়ে তুরাগের পানি। কোনো গল্পে ঢাকা শহরের এক রাতপাহারাদার ভাসিয়ে দেয় তার মন পবনের নাও। বসন্তের শুকিয়ে যাওয়া তুরাগের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া নুজাতার জীবনে পারিজাত ও হাওয়ার সংহরণ।

উৎসব গল্পে বছর বছর মেয়ে-বিয়ানো ফুলমতী ফের পোয়াতি। বর নতুন বিয়া করতে যায়। “ কিস্তি টুপি মাথায় দিয়ে মইজুদ্দি গেছে বউ আনতে। সুস্বাদু খাবারের কথা ভেবে ফুলমতীর পোয়াতি শরীর আঁইঢাঁই করে।” চার কন্যা সন্তান নিয়ে ফুলমতী ট্রেন লাইনের ওপর বসে থাকে। “ ছন্দ তুলে বিশাল ট্রেনটি দ্রুত এসে পড়ে। পাঁচটি শরীর এক নিমেষে খণ্ড-বিখণ্ড হয়”!

অতল জলের মধ্যে মাছের ঝাঁক ভেসে এলে পানকৌড়ির যে-দশা হয় পাপড়ির নির্বাচিত গল্প নিয়ে লিখতে বসে আমারও সেই দশা। এতগুলো গল্পের কোনোটাই কোনোটার থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই সময়ে পাপড়ি রহমানের মতো জোরালো অথচ মৃদু সুবাস-ছড়ানো লেখা খুব বেশি যে পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি, এটুকুই বলার। পাপড়ির প্রত্যেকটি লেখাতেই আছে ওনার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর । তাৎক্ষণিক আনন্দলাভের থেকেও গভীর কোনো পাঠে পাঠককে নিয়ে যান পাপড়ি রহমান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন