শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

নতুন বই : শামিম আহমেদের উপন্যাস--আখতারনামা

নীলুজানের মুখে রাজা ওয়াজিদ আলির মহাভারত

মিহির সেনগুপ্ত

রাজা ওয়াজিদ আলি শাহের বিচিত্র বর্ণময় সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জীবন নিয়ে বিশেষ কোনও গ্রন্থ বাংলা ভাষায় পড়ার সৌভাগ্য আমার ঘটেনি। এজন্য অবশ্যই আমার ব্যক্তিগত পাঠ-বিস্তৃতির দারিদ্র্যই দায়ী। তার অর্থ এই নয় যে, বিষয়টির প্রতি কোনও আকর্ষণ বোধ করিনি।
ইতিহাস-আশ্রিত জীবন-আলেখ্য, বিশেষ করে কোন আকর্ষক চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত উপন্যাস ইত্যাদি পাঠ আমার অত্যন্ত প্রিয় বিনোদন। খুব প্রাচীন বিষয়বস্তু না হলেও, অন্তত, অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকের ব্যক্তিচরিত্রকে কেন্দ্র করে, সমাজসংস্কৃতি-সমৃদ্ধ যে কোনও রচনা পাঠ আমার পাঠস্পৃহাকে উদ্দীপ্ত করে। কিন্তু সমস্যা হল আমার মতো সাধারণ পাঠকের পক্ষে তদনুসারী বই হাতের কাছে পাওয়া বা সংগ্রহ করা। তবুও যতটা সম্ভব, একেবারে পড়িনি বা পড়ি না – এমন বিনয় করতে পারব না।

রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ সম্পর্কে সাধারণ কিছু সংবাদ ছাড়া বিশেষ কিছু পড়িনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ দেখে, এদিক-সেদিক খোঁজখবর করে যেটুকু জেনেছিলাম তাতে পিপাসাই বেড়েছে, তেষ্টা মেটেনি। খোঁজ জারি ছিল। তবে যেহেতু নানা কারণে মনে হয়েছিল যে, বাঙালি সংস্কৃতিগর্বীরা অবাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমী কোনও ব্যক্তিকে যথার্থ মর্যাদায় গ্রহণ করতে চান না, তাই আমার মতো অলস পাঠকের এই খোঁজ ব্যর্থ হতে বাধ্য। কথাটা একান্তভাবেই আমার নিজস্ব ধারণার কথা।

তবে, আকাঙ্ক্ষারও বোধহয় একটা ভিন্ন সার্থকতার পরিণতি আছে। মিল্টন বলেছেন, ‘হি অলসো সার্ভস হু স্ট্যান্ডস অ্যান্ড ওয়েটস।’ সে যা-ই হোক, অবশেষে যথার্থ ভারবান গ্রন্থ প্রায় অলৌকিকভাবেই আমার অলস পড়ার টেবিলে এসে পৌঁছল, ‘বই’ না বলে গ্রন্থ বলাই সঙ্গত। গ্রন্থটি ‘আখতারনামা’। লেখক শামিম আহমেদ। আজকাল পত্রিকা এটির পর্যালোচনা করার জন্য আমাকে অনুজ্ঞা করেছেন। কিন্তু পরিসর বড়ই দুর্লভ। আমি যথাসাধ্য সংক্ষিপ্তভাবে পর্যালোচনা করব। তবে, বলা বাহুল্য, বিষয়টিতে উপযুক্ত বিদগ্ধজনের হস্তক্ষেপ বাঞ্ছনীয় ছিল।

সিবতায়নাবাদের ইমাম-বাড়ায় ওয়াজিদ আলি শাহের প্রপৌত্র মহরমের শোকগাথার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে আলিজানের প্রপৌত্রী নীলুজান বিনতভাবে উপস্থিত হলেন। এই নীলুজানকে অবলম্বন করে গ্রন্থের উপস্থাপনা লেখক শুরু করেছেন। ওয়াজিদ আলি শাহ রচিত বিচিত্র ‘আখতারনামা’ আর ‘ইশকনামা’ নীলুজান যেভাবে তাঁর শ্রুতিতে ধরে রেখেছিলেন, ইমাম-বাড়ায় মৌলবিদের কাছে তিনি তাই বিস্তারিতভাবে বিবৃত করেছেন। কাহিনীকার শামিম আহমেদ তারই বিন্যাস ঘটিয়েছেন তাঁর গ্রন্থে এক অসম্ভব পদ্ধতি অবলম্বন করে।

“নীলুজান বললেন, চরাচরগুরু হজরত মহম্মদকে সালাম জানিয়ে এবং হজরত আলি, ইমাম হাসান-হোসেন থেকে ইমাম মেহেদি পর্যন্ত বারোজন ইমামকে কলিজায় রেখে আখতারনামা আরম্ভ করছি। কয়েকজন মাঝি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর মাঝিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য মাঝিরা বলবেন। ওয়াজিদ আলি শাহ আখতারনামা সংক্ষেপে বলেছেন, আবার সবিস্তারেও বলেছেন। কোনও কোনও মাঝি এই গ্রন্থ আদি থেকে, কেউ সাদাত আলি খানের আখ্যান থেকে, কেউ বা আমজাদ আলি শাহর উপাখ্যান থেকে পাঠ করেন।” এ যেন কূলপতি মহর্ষি শৌনকের নৈমিষারণ্যের দ্বাদশ বর্ষব্যাপী যজ্ঞস্থলে পুরাণকথক সৌতি কতৃক ব্যাস রচিত মহাভারতকথন। সৌতি জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞ দর্শন এবং বৈশম্পায়নের মুখে মহাভারতকীর্তন শুনে বিভিন্ন তীর্থ পর্যটন করে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। নীলুজান যেন ঠিক সৌতির অনুরূপ ভাবেই তাঁর কথকতার মুখপাতটির সূচনা করলেন। সৌতি বলেছিলেন, ‘চরাচরগুরু হৃষীকেশ হরিকে নমস্কার করে আমি ব্যাসপ্রোক্ত মহাভারতকথা আরম্ভ করছি। কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।’ শামিম পুরাণকথনের ভঙ্গিতেই তাঁর গ্রন্থের কথন-বিশ্ব পরিক্রমা করেছেন। ‘আখতার’ নামটি রাজার ছদ্মনাম।

রাজশেখর বসু মশাই যেভাবে এবং ভঙ্গিতে ব্যাসকৃত মহাভারতের সারানুবাদের বিন্যাস করে আমাদের কাছে তাকে একটি সুখপাঠ্য উপন্যাসের আকারে রেখেও তার ভারবত্তা অটুট রেখেছেন, শামিমও যেন ঠিক তেমনই ভাবে এক বিরাট তহজিব তমুদ্দুনের সারবস্তুর আদ্যন্ত আমাদের গোচরীভূত করলেন। আমাদের এই হতচ্ছাড়া উপমহাদেশীয় মনুষ্যসমাজে এমন কোনও সম্প্রদায় বা উপজাতি নেই, যে বা যারা এই মহান প্রচেষ্টাটিকে সাম্প্রদায়িকতা দোষদুষ্ট বলে কটাক্ষ করতে পারে। যদি সেই প্রচেষ্টামাত্রও কেউ করার কথা ভাবে, তা নিতান্তই জবরদস্তি বলেই গণ্য হবে। ধ্রুপদি এবং লোকায়ত তাবৎ সংস্কৃতির মিশ্রণে এ এক ব্যাতিক্রমী নির্মাণ।

গঠনশৈলীতে গ্রন্থখানি যদিও মহাভারত নির্ভর। কিন্তু পূর্ব ভারতীয় লোকায়ত এবং ধ্রুপদী শিল্প-সংস্কৃতির তাবৎ শাখা-প্রশাখাকে মন্থন করেই এক বিচিত্র সামগ্রিকতায় এটির নির্মাণ অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। লোকায়ত সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারাকে এভাবে একটি প্রবাহে পরিণত করার অনুশীলন লেখকের অসামান্য শ্রম এবং মেধা-মননের পরিচয় প্রদান করে। এরকম প্রচেষ্টা এবং সার্থকতা লাভ আমার ইতিপূর্বের অধ্যয়নে কদাপি অভিজ্ঞতায় লব্ধ হয়নি।

রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ ভারতের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য অবধ বা আউধের শেষ রাজা, যার কাছ থেকে তৎকালীন বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছলে-বলে-কৌশলে এবং বিশ্বাসঘাতকতায় রাজ্যটি গ্রাস করে। যে-পদ্ধতিতে রাজা ওয়াজিদ আলি শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে, অসম্ভব রকম অসম্মান এবং নির্যাতনে রাজ্যটি দখল করে তাঁকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসন দিয়েও তাদের নির্যাতন অব্যাহত রেখে তারা তাঁর বংশ ও কীর্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, তা পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র হারামখোর, লোভী ‘বর্তনিয়া’র পক্ষেই সম্ভব। সে-তথ্য সবারই জানা।

মহাভারত অষ্টাদশ পর্বে সম্পূর্ণ। আখতারনামা শামিম সম্পূর্ণ করেছেন একাদশ পর্বে। একমাত্র কারবালাপর্ব নামে একটি পর্ব এবং অরণ্যপর্ব ছাড়া বাকি ন’টি পর্বই মহাভারতের পর্বগুলির নামের অনুরূপ। আর একটি সামঞ্জস্য সেই মহাভারবান মহাগ্রন্থ মহাভারতের সঙ্গে তুলনীয়। তা হচ্ছে, সেখানেও যেমন অতিকথন এবং ঘটনার পুনরুল্লেখ, শামিমের গ্রন্থেও তা প্রায় অনুরূপই। পাঠক হিসাবে আমি তাকে একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর বলে মনে করি না। পদ্ধতিটি আমার কাছে পুরাণপাঠের মগ্নতাপ্রদায়ী। তবে, পর্ব বিভাজন ব্যাপারটির একটি সূচি-নির্দেশিকতার প্রয়োজন ছিল। প্রত্যাশা, পরবর্তী সংস্করণে প্রকাশক বিষয়টি খেয়াল করবেন। দায়িত্বটি প্রকাশকেরই।

সর্বশেষ কথাটি বলি, গ্রন্থখানির ভাষামাধ্যম বাংলা হলেও, মূলত মিশ্র স্বভাবের। সেখানে অবাধে আরবি, ফার্সি উর্দু, হিন্দুস্থানি, ব্রজবুলি ইত্যাদি বহু ভাষার শব্দ, পদ ও বাক্যসম্ভারের ব্যবহার সাবলীলভাবেই গদ্য ও পদ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। তার মহিমা প্রশংসনীয় হলেও সব সম্প্রদায়ের সাধারণ পাঠকের কাছে কষ্টসাধ্যই হবে। শেষে একটি পরিভাষা-কোষ আবশ্যক ছিল। তবে সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি বাদ দিলে বাংলা সাহিত্যে এটি অমূল্য সংযোজন।

আখতারনামা। শামিম আহমেদ

অভিযান পাবলিশার্স। ৫০০ টাকা।

------------------------------------------------------------------

অসামান্য নজরানা
সুপর্ণা দেব

গঙ্গা যমুনি তেহজিব বা হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির যৌথ ধারা উত্তর ভারত কে বর্ণিল করে রেখেছিল একসময় । সেই ধারার অগ্রদূত ছিলেন আওয়াধ লখনউ এর নবাবেরা। দিল্লির সফদরজং মকবরায় শাম এ আওয়াধ এর বৈঠকে পড়ন্ত বিকেলে সেদিন আসিফ খান দেহেলভি তার কিসসা আফসানায় জাদুমায়ার আতশ জ্বালিয়েছিল। সেই জাদুজোনাকি মুঠোয় ভরে রেখেছিলাম অনেকদিন । এর মধ্যে লখনউ ঘুরে এসেছি । লেখা হয়েছে মছলি বিবি, আমার ব্লগে ।

রুমি যেমন লিখেছিলেন, যা তুমি খুঁজছ , আসলে সেই তোমাকে খুঁজে চলেছে । ঠিক সেইভাবেই সমাপতনের মজাদার পথে আমার হাতে এলো । লেখক শামিম আহমেদ । প্রকাশক অভিযান পাবলিশার্স ( মারুফ হোসেন) ।

আখতারনামা ওয়াজিদ আলি শাহের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস । আসিফ দেহেলভি যেখানে দাস্তান থামিয়েছে শামিমের কলম সেখান থেকে শুরু । কলকাতার মেটিয়াবুরুজ বা মাটির কেল্লায় জীবনের শেষ ভাগ কাটিয়েছিলেন ওয়াজিদ আলি ।

যায়ে বাবুল ঘর অপনো , ম্যায় চলি পিয়া কি দেশ । প্রিয় বাসভূমি লখনউ ছেড়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে গুলিস্তান বানিয়েছিলেন এই বর্ণময় অসাধারণ মানুষ টি , শামিম যাকে এঁকেছেন অসম্ভব পরিশ্রমে ,গবেষণায় আর নিবিড় মমতায় । গঙ্গা যমুনি তেহজিব , ফল্গুধারার মতো সমগ্র উপন্যাসে বিন্যস্ত ।

“আমি বিনোদিনীর মুখে ঠাকুর রামকৃষ্ণের নাম শুনলাম । তুমি জানো যে আমি ভীষণ কৃষ্ণ ভক্ত । কে এই প্রেমের ঠাকুর রামকৃষ্ণ! আমাকে তাঁর কথা বলো ...”

“সেই ঠাকুরের কাছে আমি যেতে চাই । ভাসাও নৌকা । মালকা জান, আপনিও চলুন আমার সঙ্গে । ঠাকুরের সঙ্গে আমি বাংলায় কথা বলতে পারব ।“

“রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ গিরীশ্চন্দ্র ঘোষ কে বললেন ,আফসানে ইসবাগ কিংবা ইন্দ্রসভা দুটির একটা মঞ্চস্থ করতে পারেন আপনি । ঠুমরি আর কথক না জানলে অবশ্য আপনি আমার ৩৬ রকমের রাহাসের কোনোটাতেই অভিনয় করতে পারবেন না।”

“হে নক্ষত্র, তুমি হুজনে আখতারির অর্থ জানো?”

-না, বলে দাও।

“নক্ষত্রের দুঃখ”

এই নক্ষত্রের দুঃখ নিয়েই কলকাতার মাটিতে জলে বাতাসে মিশে আছেন নির্বাসিত ওয়াজিদ আলি ।

পরতের পর পরতের মিশেলে তাঁর অসামান্য প্রতিভা আমাদের বিস্মিত করে । শামিম আহমেদের এ এক অসামান্য নজরানা ।

-----------------------------------------------------

আখতারনামার কথা হীরকসমান
নবনীতা মুখোপাধ্যায়

শামিম আহমেদ-এর আখতারনামা পড়লাম। রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ-র জীবনীমূলক উপন্যাস। সেই বই-চিত্রে প্রবেশ করার আগে দু একটি অন্য কথা।

‘প্রিন্স’ ইয়াকুব হাবিবুদ্দিন তুসি হায়দরাবাদের লোক। তিনি দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ মানে জাফর সাহেবের বংশধর, এই মর্মে নাকি ডিএনএ টেস্টে ‘উত্তীর্ণ’ হয়েছেন এবং তাজমহল নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করেছেন। ওয়াইসি নামের যে ভদ্রলোক হায়দরাবাদের এমপি, তিনি বলেছেন যে তিনিও আদমের আওলাদ, সুতরাং তুসির যুক্তিতে ওয়াইসি পৃথিবীর মালিক! দ্বিতীয় ঘটনা, আজ (১৪ নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ও শিশু দিবস) মানজিলাত ফাতিমা বলেছেন যে তাঁর পিতা জনাব কাউকাব কদর শেষ ‘প্রিন্স’, ওয়াজিদ আলির পুত্র ব্রিজিস কদরের বংশধর। দিন কয়েক আগে, এক ‘রাজপুত্র’ দিল্লির মালচা মহলে নীরবে মারা গেলেন অনাহারে, তিনি ছিলেন বিলায়াত মহলের পুত্র। বিলায়াত মহল কয়েক বছর আগে (১৯৯৩ সালে) হীরকচূর্ণ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। বিলায়াত মহল দাবি করেছিলেন তিনি রাজা ওয়াজিদ আলির প্র-প্রপৌত্রী, তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। প্রতিবাদ হিসাবে দিল্লির এক স্টেশনে তিনি বেশ কয়েকটি বিদেশি কুকুর নিয়ে প্রথম শ্রেণির বিশ্রাম কক্ষে কয়েক বছর অবস্থান করেন। ১৯৮৩ সালে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে মালচা মহলে বাস করতে বলেন। মালচা মহল ফিরোজ শাহ তুঘলক বানিয়েছিলেন। সেই সময় ব্রিজিস কদরের বংশধরেরা বিলায়াত মহলের নামে সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন যে উনি আসল নন, নকল। সেই মোতাবেক সহি তথ্যও পেশ করা হয়।

রাজকুমারী জাহানারা ফে অ্যারি নামের এক ইরানি মহিলাও দাবি করেছেন যে তিনি ওয়াজিদ আলির বংশধর। তিনি বেশির ভাগ সময় বাস করেন দুবাই ও প্যারিসে। ওয়াজিদ আলির এক পুত্র ডাক্তার বাবর আলি মির্জা (প্রিন্স)-র পৌত্র সাহেবজাদা ওয়াসিফ মির্জা থাকেন পার্ক সার্কাসের তালবাগান লেনে, তাঁর পুত্র শাহানশা মির্জা কেন্দ্রীয় সরকারের বড় অফিসার। তাঁরা সেই ২০০৯ সালেই বলেছিলেন যে ফে অ্যারি ফেক মানে নকল।

রাজা-বাদশাদের অনেক স্ত্রী। শিয়া বাদশা-নবাবরা অস্থায়ী বিবিও রেখেছেন অসংখ্য। মানজিলাত ফতিমা যে ব্রিজিস কদরের বংশধর সেই ব্রিজিসের মা হজরত মহল ছিলেন রাজা ওয়াজিদ আলির অস্থায়ী বেগম যাঁকে রাজা তালাকও দিয়েছিলেন। ডাক্তার বাবর আলি মির্জার মা অখিল-আরা-মুমতাজ বেগমও রাজার অস্থায়ী পত্নী ছিলেন। খাস মহল, আখতার মহল, কায়কুস মহল(যাঁকে রাজা তালাক দেন) বাদ দিলে রাজা ওয়াজিদের বাকি ৩৭৪ জন স্ত্রী অস্থায়ী ছিলেন। এদের মধ্যে দাসী-বাঁদিও ছিলেন। রাজার এক ছেলে তাঁর দাদিমা অর্থাৎ রাজমাতার সঙ্গে গিয়েছিলেন বিলেতের রাণীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি সেখানে ছিলেন অনেক কাল। তাঁর স্ত্রী একা ছিলেন মেটিয়াবুরজে। বিলেত, ফ্রান্স অনেক জায়গা ঘুরেছিলেন তিনি। তাঁর নাম মির্জা মুহাম্মদ হামিদ আলি ওরফে কাইবান কদর। সে সব স্থানে তিনি বিবাহ করেননি বা সন্তান উৎপাদন করেননি, এমন কোনও দলিল আছে কি! ওই সময় মুর্শিদাবাদের এক নবাব ফেরাদুন জাহ (যিনি ১০১ জন সন্তানের জনক) বিলেতে গিয়ে একাধিক মেমের সঙ্গে পরিণয়-সুত্রে আবদ্ধ হন।

সে সব গল্প অনেক। তবে বিবাহ, সন্তান ইত্যাদির কথা থাক। উঠুক শিল্পের কথা। একজন রাজা, ওয়াজিদ আলি তাঁর নাম সেই মানুষ জ্যোতিষ শাস্ত্রে এত পারদর্শী হলেন কী করে? আজও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে তাঁর হাতে লেখা পঞ্জিকা রয়েছে। এই আলমানাখ তিনি লিখেছিলেন ফোর্ট উইলিয়মে বন্দি থাকাকালীন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় সেটা। শুরু করেছিলেন মারেফতি গুপ্তবিদ্যার চর্চা। কাঞ্চন হারিয়ে, কারাবাসে কামিনীর অভাবে তিনি কি পরবর্তীকালে সাধক হয়ে উঠলেন? গঙ্গা দিয়ে সামান্য পিছোলে দক্ষিণেশ্বর, সেখানেও এক বিরাট সাধক জগত আলো করে বসে আছেন, তিনিও বলছেন কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগের কথা। এ কি তবে ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় বৈশিষ্ট্য, নাকি বাংলার, বা কলকাতার? যদি আরও পিছনে যাওয়া হয় গঙ্গা ধরে, তবে কানপুর—অবধ রাজ্য। একটু দূরে লখনউ, পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে গোমতী। তার তীরে ফারহাত বখশ প্রাসাদ। বালক ওয়াজিদ আলি গেরুয়া আলখাল্লা পরে বিভূতি মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁর দাদু তখন লখনউর সিংহাসনে। কায়জার বাগে বসছে যোগিয়া মেলা। খেলা হচ্ছে দোল। এ কোন ভারতবর্ষ! হিন্দুস্তান? না।

ভারতবর্ষ। মহাভারতের ভারত—ভারবান। রাজা ওয়াজিদ আলি বাবরি মসজিদ নিয়ে দাঙ্গা থামাতে পাঠালেন সৈন্য। সুন্নি মুসলমানদের মেরে তাড়িয়ে দিলেন। মারা গেল ৫০০ মুসলমান। শান্তি প্রতিষ্ঠা পেল। কোন শান্তি? ভারতের শান্তি, হিন্দুস্তানের নয়। ফে অ্যারি কিংবা বিলায়াত মহল একদিকে, অন্য দিকে বাবর আলি মির্জা আর ব্রিজিস কদর—এখনকার দিনে শাহানশা মির্জা আর মানিজিলাত ফাতিমা।

রাজা ওয়াজিদ আলি ওপেন থিয়েটার করলেন। ভারতে প্রথম। লিখলেন বই। চল্লিশেরও বেশি। তার মধ্যে শুধু মসনভি আর গজল আর ঠুমরি নেই, আছে ভারতের রাগ সঙ্গীতের ইতিহাসও, আর আছে অভিধান। মেটিয়াবুরজে বানালেন শাহি ছাপাখানা।

এই অসামান্য এক প্রতিভাকে শুধু আওয়াধি বিরিয়ানির মধ্যে রেখে দিয়েছি আমরা। আর রেখেছি অসংখ্য পত্নীদের মধ্যে। আলিপুর চিড়িয়াখানা শুরু হয়েছিলে রাজার মেটিয়াবুরজের পশু নিয়ে। রামব্রহ্ম সান্যাল। মনে করতে পারেন?

মনে করা যায় দেবেন ঠাকুর, সৌরিন ঠাকুরদের? যদু ভট্ট, অঘোরনাথ, শ্যামলাল, মালকা জান!

মনে করার দরকার নেই। কারণ আমার কাছে আছে আখতারনামা। মহাকাব্যিক ঢঙে লেখা ঊনবিংশ শতকের ভারতকথা। বাংলার কথা। কলকাতার উপাখ্যান।

ইংরেজদের কথা আছে। আছে ধূর্ততার ইতিহাস। বৈঠকখানা বাজারে বিক্রি হয়ে গেল রাজার মুকুট।

অনেক কথা বলা হল না। আখতারনামা নিয়ে কথা ফুরোবে না।

আখতারনামার কথা হীরকসমান।

#####

আখতারনামা (উপন্যাস)/ শামিম আহমেদ/প্রকাশক : অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা/ দামঃ ৫০০ টাকা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন