শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

গল্পের পিছনের গল্প : এলিস ইন দি ওয়ান্ডারল্যান্ড



রঞ্জনা ব্যানার্জী

হেনরি লিডেলের সাথে চার্লস লাটুইজ ডজসনের পরিচয় না হলে জগতের কী লাভক্ষতি হতো জানি না তবে শিশুসাহিত্য অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

প্রায় ত্রিশ বছর বয়েসী ডজসন তখন সবে যোগ দিয়েছেন অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে। একই বিভাগের প্রফেসর হেনরী লিডেল ভাবলেন বেচারা একা একা ছাইপাশ রেঁধে খায় অন্তত একদিন বাড়িতে ডেকে ভালো মন্দ কিছু খাওয়ানো দরকার! আহা বেচারা প্রফেসর ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ত্রিশ বছরের এই বুড়ো শিঘ্রই তার কচি মেয়েটার প্রেমে পড়বে আর সেই সাথে পাল্‌টে যাবে শিশুসাহিত্যের চেনা ধরণ!

ডজসনের বন্ধুসুলভ ব্যবহার লিডেলের বাচ্চাদের মন কেড়ে নিয়েছিল তুড়িতে, বিশেষ করে দশ বছরের এলিসের। অতঃপর সেই প্রথম সাক্ষাৎ ক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় থেকে প্রায় প্রতিদিনে পাল্‌টে যায় অনায়াসে। এবার বলি সেই বিশেষ দিনের কথা যেদিন শিশু সাহিত্যের সেই অমর সৃষ্টির সূচনা ঘটলো। দিনটা ছিল শুক্রবার। ১৮৬২ সন। ৪ঠা জুলাই। আসলে দিনটা কেমন ছিল তা নিয়ে আবহাওয়াবিদরা পরে অনেক গবেষনা করেছেন , দুপুর দুটোর পরে বৃষ্টি ছিল বলে রেকর্ড আছে কোথাও। লন্ডনের জুলাইয়ের ম্যাড়ম্যাড়ে মেঘলা দিন ছিল বলেও কেউ কেউ বলেছেন তবে সেই পিকনিকের দলের মূল তিন পা্ত্রপাত্রী কিন্তু বলেছেন আসলেই একটা ঝাঁ চকচকে রোদেলা দিন ছিল সেদিন, পিকিনিকের জন্যে এক্কেবারে যেমনটা চাই তেমন টাইপ। যেমনই হোক, পিকিনিকটা যে হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। লিডেলের তিন কন্যা লোরিনা, এ্যালিস আর ইডিথ কে নিয়ে ডাজসন এবং তাঁর বন্ধু রেভারেন্ড রবিনসন ডাকওয়ার্থ টেইমস নদীতে পিকিনিকে বেরোন। বাচ্চাদের আবদারে ডাজসন একের পরে এক গল্প বানাতে থাকেন। অদ্ভুত সব গল্প। অন্য দুনিয়ার গল্প। যেখানে খরগোশ দুপায়ে হাঁটে, ঘড়ি দেখে। যেখানে চেশায়ার ক্যাট কেবল হাওয়ায় হাসি ঝুলিয়ে থাকে। বাচ্চারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে। ডজসন ওদেরও এই গল্পের চরিত্রে ঢোকান। পরবর্তিতে গল্পটা যখন বই হয় তখন এর তৃতীয় অধ্যায়ে সেই পিকিনিক দলের সদস্যদের প্রত্যেকে স্থান পায়।

এলিস সেদিন এতটাই মুগ্ধ হয় যে মিঃ ডজসনের কাছে জোর বায়না ধরে এই গল্প ওকে অতি অবশ্যই লিখে উপহার দিতে হবে।

উপহার দিয়েছিলেন ডজসন কিন্তু নিয়তি ভাবছিল আরও বড় কিছু। কোন এই ছুতোয় এই পান্ডুলিপি পৌঁছে যায় জর্জ ম্যাকডোন্যাল্ডের কাছে। জর্জ ম্যাকডোন্যাল্ড নামী স্কটিশ লেখক এবং ডজসন তাঁর মুগ্ধ পাঠক। জর্জ ম্যাকডোন্যাল্ড তাঁর বাচ্চাদের এই পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনান এবং লিডেল কন্যাদের মত ম্যাকডোনাল্ড ছানারাও এই গল্প ভালোবেসে ফেলে। ম্যাকডোন্যাল্ডের উৎসাহেই এই গল্প তিনি পরিবর্ধন করেন। গল্পের সেই পান্ডুলিপির নামকরণ Alice’s adventure underground থেকে পালটে হয়ে যায় Alice’s Adventure in the Wonderland, আর ডজসন তাঁর আসল নামে নয় ছদ্মনামে গল্পটা ছাপেন। ডজসনের কেন জানি মনে হয়েছিল অক্সফোর্ডের অঙ্কের মাস্টারের জন্যে শিশুকাহিনী লেখাটা ঠিক শোভা পায়না। অতএব জন্ম হয় বিখ্যাত লেখক লুইস ক্যারলের। উৎসর্গে কিন্তু লুকোছাপা ছিলনা --

Alice! A childish story take
And, with a gentle hand,
Lay it where Childhood’s dreams are twined
In Memory’s mystic band,
Like pilgrim’s withere’d wreath of flowers
Pluck’d in a far-off land.

আর একটু আগে যা বললাম এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে ৪ঠা জুলাই ১৮৬২র সেই শুক্রবারে নৌকায় যারা ছিলেন তারা সবাই অমর হয়ে গেলেন ; ডজসন হলেন ডোডো, রেভারেন্ড ডাকওয়ার্থ দ্য ডাক, লোরি হলো লোরিনা, ইগ্লেট আর কেউ নয় ইডিথ আর এ্যালিস তো শুরু থেকেই এই গল্পের মূল চরিত্র হয়েই ছিল।

Alice’s Adventure in the Wonderland এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে রানী ভিক্টোরিয়া, ডজসন ওরফে লুইস ক্যারলের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে অনুরোধ করেছিলেন যেন এই সিরিজের পরের বইটা তাঁকেই উৎসর্গ করা হয়। লুইস ক্যারল রানীর সে কথা রেখেছিলেন কি?

এই সময়ে ডজসনকে ফোটোগ্রাফির নেশায় পায়। তাঁর প্রায় সব ছবির মডেল হয় একজনই, এ্যালিস লিডেল। Begger Maid বা ভিখিরি মেয়ে ছবিটা বহুল প্রচারিত হয়। আর তখনই মিসেস লিডেলের টনক নড়ে। ছবিতে এ্যালিসের পোশাক তাঁর কাছে দৃষ্টিকটু এবং অনৈতিক মনে হয়। তিনি কড়া করেই লুইস ক্যারলকে লিডেলদের বাড়ির ত্রিসীমায় আসতে না করেন। গুজব আছে ডজসন মিসেস লিডেলকে বলেছিলেন এ্যালিস বড় হলে তিনি এ্যালিসকে বিয়ে করবেন। তাতে করে মিসেস লিডেল যে কোন স্বাভাবিক মায়ের মতই অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন এবং এ্যালিসকে লেখা সমস্ত চিঠি পুড়িয়ে ফেলেন।

পরের বইটা যখন লেখেন তিনি তখন এ্যালিসের সাথে তার যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ। ডজসন তখন বিরহে কাতর। Through the looking glass হলো সেই বই। আমার সৌভাগ্য হয়েছে এই বইয়ের চামড়ায় বাঁধাই করা ১৯০০ সনের সংস্করণের কপি চাক্ষুষ করার। গতবছর ভ্যান হর্ণের খামারবাড়িতে তাঁর নাতির ঘরে কাচবন্দী মূল্যবান স্মৃতিস্বাক্ষরের মধ্যে এই বইটাও ছিল।

না, রানী ভিক্টোরিয়াকে তিনি এই বই উৎসর্গ করেন নি। উৎসর্গ এ্যালিসকেই। বেশ লম্বা এই উৎসর্গ শেষ স্তবকটা এমন -

And , though the shadow of a sigh
May tremble through the story,
For ‘Happy Summer days’ gone bর
And vanishe’d summer glory
It shall not touch, with breath of bale,
The pleasure of our fairy-tale’

Through the Looking Glass আসলে কাকে দেখছিলেন ডজসন? নিজের আয়নায় নিজেকে কি?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন