শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

দীপেন ভট্টাচার্যের গল্প : করুণাধারা


১.

“জানো, অমল, আমি খুব ঈশ্বরভক্ত ছিলাম,” নিরঞ্জনদার কথাগুলোর মধ্যে যতখানি স্বীকারোক্তি ছিল, তার চেয়ে বেশী ছিল ক্লান্তি। গ্রীষ্মের গুমোটে তাঁর ক্লান্তি আমি অনুভব করতে পারছিলাম। দূরে কোথাও কাক ডাকছিল, গ্রীষ্মের অশান্ত কাক। রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছিল নিদাঘ কমোলতায়। নিরঞ্জনদার কুকুর কানু কুণ্ডলী হয়ে ঘুমিয়ে ছিল বিছানার নিচে।

শুয়ে ছিলেন নিরঞ্জনদা, তাঁর তোবড়ানো গালে তিনদিন না-কামানো দাড়ি, অপসৃয়মান সাদা চুল সময়ের সাথে ক্রমশঃই কপালকে উন্মুক্ত করছে, সেই প্রশস্ততায় জমছে স্বেদবিন্দু, গড়িয়ে পড়ছিল কপালের ধার ঘেঁষে বিছানায়। কপালের নিচে জ্বলজ্বল চোখ, কিন্তু চোখকে ঘিরে নির্ঘুম কালিমা। রাত জেগে নিরঞ্জনদা জীবনের গঠন খুঁজছেন, কিন্তু তাঁর জীবনের সময় ফুরিয়ে আসছিল। নিরঞ্জনদা নিজেকে জার্মান গণিতবিদ গিওর্গ ক্যান্টরের শিষ্য ভাবতেন। ক্যান্টর অসীমের সন্ধান করতেন, অসীম থেকে অসীমতর, মনে করতেন অসীমের ধারনা এসেছে ঈশ্বর থেকে, ঈশ্বর অসীম, কাজেই সেই ঈশ্বরের কীর্তিও অসীম হবে।

“কিন্তু সে আমাকে আশাহত করেছে বারবার।” কথাটা উনি খুব আস্তে বললেন, অনেকটা স্বগোক্তির মত, বাইরের কাকের শব্দে চাপা পড়ল।

“কে আশাহত করেছে আপনাকে নিরঞ্জনদা, ঈশ্বর?”

ঈশ্বরের কাজই হল মানুষকে আশাহত করা, নিরঞ্জনদার এই স্বীকারোক্তি আমাকে বিস্মিত করে না। হতে পারে অসীমের গঠন সন্ধান করতে গিয়ে নিরঞ্জনদা আশাহত হয়েছেন। সসীম জীবনে অসীমকে শেষ পর্যন্ত আয়ত্ত করতে পারেন নি।

তাঁর মাথাটা বিছানার ওপর অল্প নড়ে । তারপর বলেন, “ইসহাক মাস্টারকে ছেড়ে দেয়া উচিত হয় নি।”

“ইসহাক মাস্টার কে, দাদা?”

“ইসহাক মাস্টার আমাদের গ্রামের মেয়েদের স্কুলে পড়াত। অঙ্ক, ভূগোল, ধর্মশিক্ষা যখন যেমন লাগে। ১৯৭১ সন, আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যাব বলে বসে আছি। যুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট অস্ত্র নেই। অস্ত্র কবে আসবে, তারপর আমাদের ডাক পড়বে।”

এটুকু বলে নিরঞ্জনদার কন্ঠস্বর ঘরের বাতাসের কোটি কোটি অণু পরমাণুকে আর আন্দোলিত করার শক্তি রাখে না, স্বরতন্ত্রী হাল ছেড়ে দেয়। তাঁর কপালে ডান করতল রাখি, ঘামের নিচে ত্বক আমার আঙুলকে উষ্ণ করে।

নিরঞ্জনদার পিসীমা, তাঁর একমাত্র জীবিত স্বজন, একটা জলভরা ডেকচি নিয়ে ঘরে ঢোকেন, উনি নিরঞ্জনদাকে জলপট্টি দিতে চান। পিসীমাকে বলতে চাই, “কষ্ট করে লাভ নেই, জলপট্টি ওনার কোনো কাজে আসবে না।” কিন্তু আমি বলি, কিছুটা নিজেকে আশ্চর্য করেই, ‘ইসহাক মাস্টার কী করেছিল, পিসীমা?’

অমিতা পিসীমা নিরঞ্জনদার আপন পিসীমা নন, নিরঞ্জনদার থেকে বছর পনেরো হয়তো বড় হবেন। ঋজু মানুষ। জলের ডেকচিটা নামাতে নামাতে বললেন, “যুদ্ধের সময় ইসহাক মাস্টারকে রাজাকার বলে গ্রামের ছেলেরা ধরেছিল, সে নাকি পাকিস্তানী সেনাদের বল্লায় পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।”

তারপর? জিজ্ঞেস করি।

“ছেলেরা নিরঞ্জনকে সালিশ মানে। নিরঞ্জনই ইসহাককে চাকরিটা করিয়ে দিয়েছিল। নিরঞ্জন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ইসহাককে বল্লা যেতে কেউ দেখেছে?’ কেউ নাকি দেখে নি, কথাটা কিছুটা শোনা। নিরঞ্জনের কথায় ছেলেগুলো ইসহাককে ছেড়ে দিল।”

নিরঞ্জনদার গলা থেকে একটা শব্দ বের হয়। তাঁর মুখের কাছে কান পাতি, নিরঞ্জনদা ফিসফিস করে বলেন, “ঈশ্বরের কথায় ছেড়েছি।”

অমিতা পিসীমা বলতে থাকেন, “দুদিন বাদে ভোরে ইসহাক পাক বাহিনীকে নিয়ে আমাদের গ্রামে নিয়ে আসে। আমরা বাঁচি, তবে অনেকেই বাঁচে না। যুদ্ধের পরে ইসহাককে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।”

নিরঞ্জনদা আবার যেন কিছু বলতে চান। কান পাতি। উনি বলেন, “ঈশ্বর করুণা করতে চেয়েছিল।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়ে। কুকুর কানুর ঘুম ভাঙে। বিছানার নিচ থেকে বেড়িয়ে এসে আড়মোড়া ভাঙে। কানুর গায়ে কালো চুল, কপালে সাদা লম্বা দাগ। পিসীমা ভেতরে যান, কানু তার পেছন পেছন যায়।


২.
ঘরে বই-ঠাঁসা পুরোনো দুটো আলমারি, কাঠের টেবিল, কয়েকটা চেয়ার, আর এক পাশে বিছানা। টেবিলের ওপর চার-পাঁচটা বাঁধানো খাতা। হয়তো তাতে নিরঞ্জনদা লিখেছেন, “সব অসীম সংখ্যা এক নয়। হয়তো অসীম থেকে অসীমতর সংখ্যা কল্পনা করা যায়।” সেইসব খাতা অপরিচিত গাণিতিক সংকেতে পূর্ণ, সেই সংকেতের পাঠোদ্ধার কে করবে? বাইরে সরু রাস্তাটা উপচে পড়ছিল রিক্সার ভীড়ে। গ্রীষ্মের তৃষ্ণার্ত কাকের দল তারস্বরে চিৎকার করছে বিদ্যুতের তারের ওপর বসে। সেই গরমে আমি চাইছিলাম একটা শান্ত শীতল দুপুর, ঠাণ্ডা বাঁধানো মেঝে, বরফ-জমাট জল। আবহাওয়া সংবাদ শুনেছিলাম আজ সকালে, বৃষ্টি শুরু হবে কাল সন্ধ্যা থেকে। বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে ছিল শুষ্ক শহর বহুমাস।

নিরঞ্জনদা সেই সন্ধ্যায় বেঁচে ছিলেন, পরদিন দুপুরেও ছিলেন। ঐ দুপুরে কিছুক্ষণের জন্য জ্বরটা কম ছিল, কন্ঠে জোরও পেয়েছিলেন। বাজার করে নিয়ে এসেছিলাম, অমিতা পিসীমা সেগুলো নিয়ে গেলেন ভেতরে। চেয়ার টেনে নিরঞ্জনদার পাশে বসলে উনি অস্ফূট কন্ঠে কি যেন বললেন। ওনার কাছাকাছি মুখটা নিলে শুনলাম বলছেন, ‘অমল, তুমি আমাকে একটা করুণার গল্প বল, তাহলে আমি তোমাকে একটা বেদনার কাহিনী শোনাব।’

নিরঞ্জনদা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কোনো ব্যর্থতার কথা ভাবছেন, হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত অসমাপ্ত অধ্যায় যা কিনা ভেসে উঠছে আপন প্লবতায় তাঁর মস্তিষ্ককে বেদনায় আপ্লুত করে। সংখ্যা দিয়ে কি করুণা সৃষ্টি করা যায়? গ্রীষ্মের সকালে আমার রাতের না-ধোওয়া খাবার বাসনে যে পিঁপড়ারা আসে তাদের প্রতি কি আমি করুণা করি? নাকি একাধারে পৈশাচিক নরপতি ও ঈশ্বর হয়ে আমি সিদ্ধান্ত নেই হাজার পিঁপড়ার মধ্যে কয়েকটি পিঁপড়াকে বাঁচাতে। সেটুকুই আমার করুণা, এর বেশী কিছু না।

ব্যর্থতা সঙ্গী ভালবাসে, তাই নিরঞ্জনদার প্রশ্নে যে স্মৃতি মুহূর্তে আমার মনে পড়ল তা একান্তই ব্যর্থতার। বহু তীক্ষ্ম বেদনা ছাড়িয়ে একটি স্বল্প-স্থায়িত্বের ঘটনা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, বলতে শুরু করি, “আমার বয়স তখন কম ছিল। এক ভীড় রাস্তায় হাঁটছিলাম। সাদা শাড়ী-পড়া এক তরুণী কোনো অন্ধদের প্রতিষ্ঠানের জন্য সাহায্য তুলছিল। তার কালো লম্বা বিনুনী এখনো মনে পড়ে। সারাদিন হেঁটে তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলল, ‘ভাই, অন্ধদের জন্য একটা টাকা দেবেন?’ আমার কাছে টাকা ছিল, কিন্তু যা হয়, মুখ দিয়ে বের হল, ‘ভাংতি নেই।’ সেই তরুণী আকুল হয়ে বলেছিল, ‘ভাংতি করে দেব, ভাই, আপনি দিন।’ আমাকে আপনি করে সম্বোধন করেছিল, আমি ছোট ছিলাম কিন্তু তবু সে আমাকে আপনি করে বলেছিল। কিন্তু আমি থামি নি, চলে এসেছিলাম। এরপর ২০ বছর পার হয়েছে, সেই স্মৃতি এত বছর পরেও ভুলি নি, সেই মেয়ের আশাহত মুখ মনের কোথায় গেঁথে আছে। সেদিন একটা টাকা দিয়ে চিরদিনের ব্যর্থতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারতাম।”

আমার কাহিনীটা করুণার হল না, বরং বেদনার হল। আমি করুণা করতে পারি নি। নিরঞ্জনদা বুঝলেন, মনে হল হাসলেন - বেদনারই হাসি। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, “তার নাম ছিল করুণা। আমাকে বলেছিল, দাদা আমাকে উদ্ধার করুন। আমি পারি নি।”

পিসীমা ঐ সময়েই চা নিয়ে ঢুকলেন। দু কাপ চা। টেবিলের ওপর রাখলেন। উনি নিরঞ্জনদার কথা শুনতে পেয়েছেন কিনা বুঝতে পারলাম না। করুণার কথাটা তাঁকে জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কি হবে না এ সব ভাবতে ভাবতেই নিরঞ্জনদা বললেন, “করুণার বর ওকে ফেলে চলে গিয়েছিল, হয়তো বিয়ে করেছিল অন্য জায়গায়। পরিত্যক্তা করুণার বাবা-মা আমাকে অনুরোধ করেছিল মেয়েটাকে উদ্ধার করতে, ওকে পাড়ায় রাখা যাচ্ছিল না।” নিরঞ্জনদার কন্ঠস্বর আবার পশ্চাতপটের মৃদু কোলাহলের সঙ্গে মিশে গেল।

পিসীমার দিকে তাকালাম, ওনার দৃষ্টি জানালার কড়িবর্গা পার হয়ে পাশের বাড়ির হতশ্রী দেয়ালটায় আটকে ছিল। উনি সব কথাই শুনতে পেয়েছেন। আবার আমার কান নিয়ে আসি নিরঞ্জনদার মুখের কাছে। শুনি বলছেন, “করুণাকে আমি ঠিকই ঢাকায় নিয়ে আসতাম, কিন্তু গ্রামের অন্য লোকেরা আমাকে ভয় দেখাল। বলল, আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ না হলে ওকে গ্রাম থেকে বের হতে দেবে না। বলবে, আমি অপহরণ করেছি। আর হিন্দু ধর্মীয় মতে তো বিচ্ছেদ হয় না। অগ্নিসাক্ষী করে যে বিয়ে তাতে কি বিচ্ছেদ হতে পারে?” এই বলে নিরঞ্জনদা হেসে ওঠেন - জোর করে অট্টহাসি যেটা পরিণত হয় দমকা কাশিতে। তারপর বলেন, “অগ্নিসাক্ষী - সে শুধু নারীর জন্য, করুণার বর আর একজনকে বিয়ে করে সুখেই আছে। ঢাকায় উকিলের সাথে কথা বলেছিলাম। কোনো লাভ হয় নি।”

“তারপর?” নিজের অজান্তেই প্রশ্নটা মুখ থেকে বের হয়ে এল। “তারপর?” যন্ত্রণায় নিরঞ্জনদার কপালের চামড়া কুঁচকে ওঠে, দুটো ভুরু এক হয়ে যায়। মনে হল এরপর হাসলেন, শুষ্ক ফেটে যাওয়া ঠোঁটের দুদিক প্রসারিত হয় কালো ছোপ-ধরা গালে। “আমার ওপর ভরসা করেছিল করুণা, কিন্তু ঈশ্বর আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছিল। করুণা অপেক্ষাও করেছিল - দশটি বছর। তারপর একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল।”

“করুণার লেখা সব চিঠি ঐ আলমারিটায় পাবে।” হাত দিয়ে আলমারিটা দেখানোর চেষ্টা করেন নিরঞ্জনদা, করুণার ব্যাপারে যেমন সাহস করতে পারেন নি, শীর্ণ হাতটাও যেন তেমন - ঐকান্তিক ইচ্ছের অভাবে - বিছানা ছেড়ে বেশীদূর উঠতে পারে না। নিরঞ্জনদার যুক্তির গণিতে ঈশ্বর কি সরাসরি আবির্ভূত হতেন যে তাকে করুণাকে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন? সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করা হয় না, সেই প্রশ্নের সময় বোধহয় পার হয়ে গিয়েছিল।

বিকেলে নিরঞ্জনদার কলেজের দুজন সহকর্মী আসেন। তারা কানুকে ঘরের মধ্যে দেখে ঘাবড়ে যায়। কানু বিছানার নিচ থেকে, মাথাটা সামনের দু-পায়ের মধ্যে রেখে গভীর কালো চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুই সহকর্মী অস্বস্তি নিয়ে চেয়ারে বসে ঘরটাকে নিরীক্ষণ করতে থাকে। আমি বুঝি তাদের দৃষ্টি টেবিলের ওপর নোটখাতাগুলির প্রায়ই আটকে যাচ্ছে। ভাল লেকচার দিতেন বলে নিরঞ্জনদার সুনাম ছিল, এরা ভাবছিল তাঁর মৃত্যুর পরে যদি নোটগুলো হাতানো যায়। জানতাম ওগুলো দিয়ে এদের কোনো লাভই হবে না। ঐ খাতাগুলোতে নিরঞ্জনদা বাস্তবকে সংখ্যা দিয়ে গঠন করতে চেয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত উনি তাতে সফল হন নি, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টার গাণিতিক ভাষা এদের জন্য হবে দুর্বোধ্য। আমি তাদের প্রায় জোর করে বিদায় করে দিলাম।

এরপরে নিরঞ্জনদা আর ঘন্টা দুয়েক বেঁচে ছিলেন। খবর পেয়ে স্কুলের বন্ধু মোস্তাক হাজির, ও এই পাড়াতেই থাকে, নিরঞ্জনদাকে চিনত, শ্রদ্ধা করত। আমাকে বলল, ‘তোকে কিছু করতে হবে না, ট্রাকের ব্যবস্থা করছি।

নিরঞ্জনদা আচার-অনুষ্ঠান না করতে বলেছিলেন। পিসীমা শক্ত মানুষ, অবশ্যম্ভাবীর জন্য প্রস্তুত ছিলেন, নতুন একটা কাপড় নিয়ে এসে বললেন, “আর কিছু না কর, এই কাপড়টা পরিয়ে দিও।” আমি বললাম, “শ্মশানে চলুন।” উনি বললেন, “তুমি জান মেয়েদের যেতে নেই।” বললাম, “চলুন, আমাদের সমাজ তো এই ক’জনই, আপনাকে ছাড়া আমরা যেতে পারব না।” মোস্তাক, আমি, পিসীমা আর পাড়ার দুজন নিরঞ্জনদার দেহর সাথে ট্রাকের পেছনে উঠলাম। কানু বাড়ির বন্ধ দরজার পেছনে ঘেউ ঘেউ করছিল। ট্রাক ছেড়ে যাচ্ছিল, চালককে থামাতে বললাম। নেমে বাড়ির দরজা খুলে কানুকে বের করে নিয়ে এলাম, ট্রাক যাত্রীদের বললাম, “এও হবে আমাদের শ্মশানবন্ধু।” কেউ আপত্তি করল না, মোস্তাক কানুকে ওপরে তুলতে সাহায্য করল। কানু শান্ত হয়ে গুটিশুটি হয়ে নিরঞ্জনদার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল।

সেই রাতে দিনের গরম কমে আসছিল, বাতাসের আর্দ্রতা আমাদেরকে কিছুটা শীতল করল। শ্মশানে পিসীমাকে চিতায় আগুন দিতে বলেছিলাম। উনি বললেন, “তা কি হয়, আমি বড় হয়ে এই কাজ করতে পারি না।” আমি একটা শলা দিয়ে কাঠে আগুন ধরাই। কানু এবার বোঝে নিরঞ্জনদাকে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, ও আগুনের চারদিকে দৌড়ায়, ঘেউ ঘেউ করতে থাকে, আগুন যে নিরঞ্জনদাকে চিরতরে অদৃশ্য করবে সেটা সেও বোঝে । অন্য লোকেরা বিরক্ত হয়, কানুকে সামলে নিয়ে দূরে ঘাসের ওপর বসি। কানুর চোখে চিতা জ্বলে।

প্রকৃতি যেন দাহ-কার্য সাঙ্গ হবার জন্য বসে ছিল। বৃষ্টি নামার আগে কিছু ছাই সংগ্রহ করি। আমরা বাড়ি ফিরি মুষলধারা বৃষ্টির সাথে। পরদিন গেল নিরঞ্জনদার বাড়ি খালি করতে, তার নোটখাতা আর কিছু বই আমার ছোট ফ্ল্যাটবাড়ির আরো ছোট কামরায় নিয়ে আসি। মোস্তাক আসবাবপত্রগুলো বিলি করে দেয়। দুদিন পরে একটা গাড়ি ভাড়া করি, যদিও গাড়ি ভাড়া করা ছিল আমার জন্য বিলাসিতা। অমিতা পিসীমাকে তার গ্রামের বাড়িতে নামিয়ে দিতে হবে, নিরঞ্জনদারই গ্রাম। কানুকেও শহরে রাখা যাবে না, আমি যেখানে থাকি সেখানে কুকুর রাখা যায় না, তাই কানুও চলেছে আমাদের সাথে, আমার আশা কানুকে ওখানে রেখে আসা যাবে। অমিতা পিসীমা ফিরে যাচ্ছেন তাঁর আপন ভাইপোর বাড়ি, তারা রাজী হয়েছে ওনাকে রাখতে। আমাদের সাথে ঘটে ছাই ছিল, নিরঞ্জনদার গ্রামের পাশে বেনু নদী, সেই নদীতে নিরঞ্জনদাকে ছড়িয়ে দেব বলে।

৩.
নিরঞ্জনদার মৃত্যুতে প্রকৃতি যেন সত্যিই দুঃখিত হয়েছিল, তাঁর চলে যাবার পর থেকে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেটা থামছিল না। সেদিন রাস্তাতেও বেশ বৃষ্টি পেলাম। আমাদের চালক ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর একটি বড় বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের আগে অমিতা পিসীমা চিৎকার দিয়ে উঠেছিলেন, তাতে চালকের ঘুম ভাঙে, শেষ মুহূর্তে সে গাড়িটা তার লেনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। মানুষের কখন মৃত্যু হয় আর কখন হয় না সেটা হয়তো সম্ভাব্যতা তত্ত্ব দিয়ে বিচার করে চলে, এই দেশে বছরে কয়েক হাজার মৃত্যু হয় রাস্তার দুর্ঘটনায়। যতক্ষণ না সেই সংখ্যার কৌটা পূর্ণ হবে ততক্ষণ রাস্তার রক্তপিপাসু দেবতা দাবি করবে আরো মৃত্যুর। অমিতা পিসীমা ঈশ্বরের নাম নেন আর আমি রক্তপিপাসু দেবতাকে ফাঁকি দিয়েছি বলে তৃপ্তি অনুভব করি। চালককে কিছু গালমন্দ করি, ঘটনার আকস্মিকতা সামলাতে সে গাড়ি থামিয়ে চা খায়।

গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর পার হয়ে গেল। জোর বৃষ্টিতে কাঁচা রাস্তায় কাদা জমে গাড়ির চাকা আটকে দিচ্ছিল। গাড়ি আর সেই ভাইপোর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না। দৌড়ে যখন তাদের বাড়িতে ঢুকলাম আমরা দুজনে (এবং কানু) ভিজে একশা। বড় দোতলা পাকা বাড়ি, বাইরে উঠোন। সম্পন্ন বাড়ি, তবে ভাইপো পিসীকে দেখে খুশী হয়েছে বলে মনে হল না। বুঝলাম সেখানে বেশীক্ষণ থাকা যাবে না, কিন্তু কিছু কাজ অসমাপ্ত ছিল। একটা ছাতা মাথায় করে ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে নদীর ধার ধরে হাঁটলাম। নিরঞ্জনদার বেনু নদী বর্ষায় প্রাণ পেয়েছে, তাতে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানা, বালুভর্তি ঘটঘট-করা নৌকা। একটা উঁচু জায়গা থেকে নিরঞ্জনদার ছাই ঢেলে দিই বেনুর স্রোতে, মুহূর্তে সে বিলীন হয়ে যায় জলের নিচে।

অমিতা পিসীমার ভাইপোর বাড়িতে যখন ফিরলাম তত্ক্ষণে বৃষ্টিটা থেমেছে, সূর্য ডুবু ডুবু করছে। আমি বললাম, “যাই পিসীমা। কানুকে কি এখানে রেখে যাওয়া যাবে?” এই প্রথম অমিতা পিসীমার চোখে যেন জল দেখলাম। তাও সামলে নিয়ে বললেন, “অমল, কানুকে রাখতে ওরা রাজি হচ্ছে না।” কানুকে যে ওরা রাখবে না সেটা আগেই বুঝেছিলাম, অমিতা পিসীমাকে যে থাকতে দিচ্ছে এটাই ভাগ্যের ব্যাপার যদিও এই ভাইপোকে পিসী কোলে পিঠে মানুষ করেছিলেন। পিসীকে বিদায় জানিয়ে কানুকে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি ছাড়ল, অল্প কিছুদূর যেয়ে চালককে গাড়ি থামাতে বললাম। তত্ক্ষণে রাতের অন্ধকারটা চেপে বসছে, দিগন্তে একটা আবছায়া লাল আভা ভেসে আছে। আমরা তখনো গ্রামটা ছাড়াই নি। কানুকে গাড়ি থেকে নামিয়ে এক জায়গায় বসালাম। সে বাধ্য ছেলের মত বসে রইল। আমার ওকে ঢাকায় নেবার কোনো উপাই নেই। বললাম, “আমাকে ক্ষমা করিস, কানু। তোকে ঢাকায় রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।” কানু হয়তো আমার কথা বুঝল, সেই অন্ধকারেও কানুর গভীর কালো চোখে মনে হয় বেদনা দেখেছিলাম। রাস্তাটা এখানে কাঁচা, এদিক-ওদিক বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে, নিশ্চয় ওর ভাগ্যে কিছু জুটে যাবে।

গাড়ির চালক আমার এই কাজে আশ্চর্য হয়, কিছু বলে না। কুকুরের সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক যোগাযোগ হতে পারে সেটা সে জানে কিনা জানি না। আবার গাড়িতে উঠে বলি, “চলেন।” আমি পেছনে তাকাই না। গাড়ি বড় রাস্তায় ওঠে, মিনিট দশেক পার হয়, কাচের জানালার বাইরে অন্ধকার বিশ্ব দেখতে দেখতে ভাবি আমার করুণার আধার কতখানি। ভাবি, কানুর কাহিনী আর একটি বেদনার কাহিনী হয়ে রবে, আমারও আর একটি বেদনার বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে। ভাবি, এই বেদনাকে মুছে দেবার সিদ্ধান্ত কি আমার হাতে নয়? চালককে বলি, “গাড়ি ঘোরান”। ফিরে আসি কানুকে যেখানে রেখে এসেছিলাম সেখানে, কিন্তু কানুকে দেখি না।

রাস্তাটার দু-পাশে ছোট ছোট একতলা বাড়ি, তাদের পাশ দিয়ে পায়ে-চলা গলি ঢুকে গেছে। পাশের বাড়িগুলো থেকে ভেসে আসা বিদ্যুতের আলো চেষ্টা করছিল সেই গলিগুলোর পথকে চিহ্নিত করতে। তারই একটাতে ঢুকি, আলো-আঁধারে সংশয়ে পা ফেলি, পা ফেলতে ফেলতে কানুর নাম ধরে চিৎকার করি। পাশ দিয়ে দু-একজন চলে যায়, আমার দিকে তাকিয়ে, তারা ভাবে কানু বোধহয় আমার বন্ধু বা আত্মীয়। তাদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি না, কত পথের কুকুরই না তারা দেখে। এইভাবে মিনিট পনেরো ঘুরি, তারপর বুঝি পথ হারিয়েছি। সময়ের সাথে সব গ্রামের মানুষও যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। বৃষ্টি মুষলধারে না পড়লেও বিরাম দেয় না কোনো। ছাতা চুঁইয়ে জল পড়ে জামায়, প্যান্টে। গলির কাদা জুতো পার হয়ে মোজাকে ভিজিয়ে আঠালো করে দেয়। হঠাৎ হঠাৎ গলিগুলো যেয়ে পড়ে কোনো ডোবার পাশে কিংবা সেগুন বাগানে। মাঝে মধ্যে বিজলির আলো তাদেরকে স্পষ্ট করে তোলে। ধীরে ধীরে একটা আতঙ্ক মনে দানা বাঁধে, এই গ্রাম থেকে আমার আর বার হওয়া হবে না। মনে হল যেন ঘন্টাখানেক এরকম গোলকধাঁধায় ঘুরলাম। মাঝে মধ্যে দু-একটা বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে মানুষ দেখি। ছেলে-মেয়েরা গানের রেওয়াজ করছে, কেউ পড়াশোনা করছে, টেলিভিশন চলছে, রান্নাঘরে পাত্রে তেল ফুটছে, মশলার গন্ধ আসছে। ঐ সন্ধ্যায় তাদের জীবনকে আমি ঈর্ষা করছিলাম। ভাবি, গ্রাম ধীরে ধীরে শহর হচ্ছে। ইচ্ছা করলে এদের দরজা ধাক্কা দিতে পারি, কিন্তু এদের কী বলব, আমাকে আশ্রয় দিতে? কানুর খবর জানে কিনা? আমার গাড়ি কোথায় আছে? এগুলোর কোনোটাই যে ঠিক করা যাবে না সেটা পাঠক আমার থেকে হয়তো ভাল জানেন।

অবশেষে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ি। সেখানে একটা বড় চাতাল দেখতে পেলাম, তাতে বাঁধানো উঁচু জায়গা, প্রায় ত্রিশ ফুট বাই ত্রিশ ফুট। তার ওপর ছাউনি, টিনের ছাদ, কাঠের স্তম্ভ দিয়ে ধরা। একটা টিমটিমে বিদ্যুতের আলো তার থেকে ঝুলছে। সেই আলোয় দেখলাম গোটা পাঁচেক মানুষ বসা শোয়া, নারী ও পুরুষ। হয়তো বৃষ্টিতে আশ্রয় নিয়েছে। এদেরকে কানুর কথা জিজ্ঞেস করব কি, বড়ই দ্বিধায় পড়লাম। একটা কুকুর হারিয়েছে, এরকম বেওয়ারিশ কত কুকুর বাংলার পথে ঘাটে ঘোরে। আমাকে দেখে মানুষগুলো চেয়ে রইল, আমি অজানা লোক। বৃষ্টি ইতোমধ্যে আবার চেপে বসল। উঁচু জায়গাটাতে উঠতে যাব, তখনই সেই টিমেটিমে বালবের আলোয় দেখলাম শ্বেত্পাথরের ফলক, বাধাঁনো চাতালের নিচু দেয়ালে, তাতে কালো লেখা -

এই কাননের মতো সুশীতল ছায়া
কোথা আছে পৃথিবীতে, শ্রান্ত আত্মা যেথা
এক মুহূর্তের তরে করিবে বিশ্রাম! (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

শ্রী ঈশ্বর পাল কর্তৃক ক্লান্ত পথিকের উদ্দেশ্য নির্মিত, ১৪০৫

ঈশ্বর পাল? “ঈশ্বর পাল!” হতে পারে কি আমি এতদিন যা ভেবেছি তা ঠিক নয়? ‘ঈশ্বর পাল’ কথাটা মনে মনে ভেবেছিলাম উচ্চারণ করেছি, আসলে আমার কথা বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বারান্দায় শোয়া-বসা মানুষগুলোর কানে পৌঁছে গিয়েছিল। একজন বছর পচাত্তর বয়সের বৃদ্ধা শুয়ে ছিলেন আঁচল পেতে, তিনি মাথা তুলে বললেন, “ঐ যে আলো দেখা যায় ঐটা উনার বাড়ি।”

সেই বাঁধানো চাতালে আর উঠি না। বৃদ্ধা যে বাড়িটা দেখালেন সেখান থেকে একটা টিমটিমে আলোর বিচ্ছুরিত কিরণরেখা আমাকে পথ দেখায়। দেখি একটা টিনের দরজা, সেটা খোলা। চাতাল ছেড়ে সেদিকে এগোই, দরজাটা ধাক্কা দিতেই খুলে যায় ক্যাঁচক্যাঁচ করে। একটা ছোট আঙিনা, কিছু ফুলগাছ, তারপরে একটা ছোট একতলা ঘর। সেটার দরজায় টোকা দিই। কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু আমার উত্তর দরকার, কিছু কার্যকারণের সমাপতনে গণিতের সমাধান যেন হাতের মুঠোয়, তার শেষ না দেখে আমি তো ঢাকা ফিরতে পারি না। নিরুপায় আমি জোর গলায় চিৎকার করি, “ঈশ্বরবাবু, বাড়ি আছেন?” এর সেকেন্ড ত্রিশ পরে দরজাটা খুলে যায়, ভেতরে দেখতে পাই দাঁড়িয়ে আছে একজন - লম্বা সাদা চুল, শ্মশ্রুমণ্ডিত, চোখে চশমা, সেই চশমার কাচ পার হয়ে তার চোখ দেখা যায় না। সে বলে, “কে?”

আমি উত্তর দেবার আগেই ঘরে ঢুকি - ছাতাটা বাইরে রেখে - আমার কর্দমাক্ত জুতো নিয়ে। দ্বিধা করি না, বলি, “আমি নিরঞ্জনদার বন্ধু। নিরঞ্জনদা মারা গেছেন।”

উনি আমার হাতটা ধরে নিজেকে সামলাতে চান, প্রায় খালি ঘরে একটাই চেয়ার, ওনাকে সেই চেয়ারে বসাই। অস্ফূট কন্ঠে বলেন, “নিরঞ্জন চলে গেল?” আমি তাঁর কথায় আশ্চর্য হই না, এরকমই যেন হবার কথা, নিরঞ্জনদার ঈশ্বরের সঙ্গে এই বাদলরাতে দেখা হবার কথা। বলি, “নিরঞ্জনদা আপনার ভক্ত ছিলেন। আপনার কথা মানতেন।” উনি আমার দিকে তাকান, সেই দৃষ্টিতে অবোধ্যতা। আমার হাতে সময় বেশী নেই, যা বলার এখনি বলতে হবে। বললাম, “আপনাকে ঈশ্বরতুল্য জ্ঞান করতেন?” উনি মাথা নাড়ালেন যেন এই কথাটা অস্বীকার করতে চাইছেন। আমি বলতে থাকি, “আপনিই কি ওনাকে ইসাক মাস্টারকে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন?”

ঈশ্বর পাল অবোধ্য দৃষ্টিতে ঘরের এক কোনায় তাকান, হয়তো মনে করার চেষ্টা করেন সেই সুদূর ঘটনা, তারপর বললেন, “আমি করুণা করতে চেয়েছিলাম।”

এই হল নিরঞ্জনদার ঈশ্বর, যাঁর কথা নিরঞ্জনদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। এই পৃথিবীর ঈশ্বরকে নিরঞ্জনদা বিশ্বাস করেছিলেন? যার করুণার ফলে এই গ্রামের মানুষ মারা গিয়েছিল।

জিজ্ঞেস করলাম, “আর করুণা মেয়েটি? তার প্রতি কি যথেষ্ট করুণা করা হয়েছিল?”

করুণার কথায় ঈশ্বর পালের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “করুণাকে আমি ভালবাসতাম, তাই নিরঞ্জনকে না করেছিলাম।”

এরকম অকপট স্বীকারোক্তি আশা করি নি, তাহলে করুণার সঙ্গে স্বার্থপরতা জড়িত ছিল। “তারপর?” আমার কন্ঠে ছিল তীক্ষ্ণতা।

“আমি করুণাকে উদ্ধার করতে পারি নি, আমি কাপুরুষ ছিলাম।” শেষের কথা কয়েকটা মিলিয়ে যায় নিস্তব্ধতায়, বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।

“করুণার কোনো খবর জানেন?” উনি মাথা নাড়ালেন, জানেন না।

ঈশ্বর পালের কথা শুনে ক্রোধ হল, তারপর ক্রোধ প্রশমিত হল। বললাম, “তাই এখন সমস্ত করুণা ঐ ছাউনির পেছনে ঢালছেন?”

আমার শ্লেষ হয়তো তিনি ধরতে পারলেন, বললেন, “আমি জানি করুণা সবসময় কার্যকরি হয় না, কিন্তু এছাড়া আমাদের কি আছে বলুন?”

আমি শান্ত হই, হয়তো ক্রোধ ও শ্লেষের অর্থহীনতা বুঝতে পেরেই। হয়তো এই কাহিনীতে আমার অংশগ্রহণের সীমাকে অনুধাবন করে, হয়তো পৃথিবীর কাজে আমার অক্ষমতাকে স্বীকার করে। নিরঞ্জনদা অসীমতার মাঝে ঈশ্বরের করুণা খুঁজতে গিয়েছিলেন, কিন্তু মানুষের জীবনে করুণাকে সংখ্যা দিয়ে গড়া অসাধ্য। ঈশ্বর পাল শেষপর্যন্ত সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। দেরি হয়ে গেছে অনেক, আমাকে যেতে হবে, বিদায় জানিয়ে বের হয়ে আসি, বাইরে তখন বৃষ্টি ছিল না। আকাশের তারা দেখা যাচ্ছিল।

চাতালে ফিরে এসে দেখি কানু বসে আছে সেই বৃদ্ধার পাশে। কেন জানি আশ্চর্য হই না। কানু আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়, লেজ নাড়ায়, আমি বসে ওর গায়ে হাত রাখি। বৃদ্ধা আমার দিকে তাকিয়ে হাসেন। সেই হাসিতে যেন নিশ্চিন্ত হই, ঢাকায় কানুর একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি আজ - এই কথাগুলো যখন লিখছি - বলতে পারি ঐ চাতালে বসে, সেই মুহূর্তে যে গভীর প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম সেরকম আর কখনো করি নি। তারপর চোখে পড়ল, একটা বড় আমগাছ ছাড়িয়ে, দূরে অন্ধকারে, গাড়ির আলো। আমাদের চালক আলো জ্বালিয়ে রেখেছে যাতে আমি পথ চিনে তাকে খুঁজে পাই। দিনের বেলায় তার অবিমৃষ্যকারিতায় মরতে বসেছিলাম, এখন তার আলোকবর্তিকা দেখে তাকে মনে ক্ষমা করে দিলাম। ভাবলাম এখন আমার করুণাধারার সময়। ছাউনির পাশ দিয়ে, আমগাছের শাখা ছাড়িয়ে এক চিলতে আকাশ দেখা যাচ্ছিল, তাতে জ্বলজ্বল করছিল বৃহস্পতি, সেদিকে তাকিয়ে রইলাম অনেকক্ষণ - সেই সময়ের স্নিগ্ধতায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন