শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

গল্প নিয়ে আলোচনাঃ অমিত গুপ্তর ‘তিনকালের এক খিদে

রম্যাণী গোস্বামী

অমিত গুপ্তর ‘তিনকালের এক খিদে’ গল্পটি নিয়ে এই আলোচনা। কবি, গল্পকার অমিত গুপ্তর সঙ্গে আপনাদের কতটা পরিচিতি রয়েছে তা আমার জানা নেই।
আমি তাঁর খুব বেশি গল্প পড়িনি। কিন্তু সেই একটি দুটি গল্পই আমার মনে আলোড়ন তুলতে ও স্থায়ী ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছে। তার মধ্যে এই গল্পটি অন্যতম।


এবার চলে যাই গল্পের কথায়। গল্পের শুরুতে পাঠক দেখতে পান এক দম্পতির নিভৃত আলাপের ছবি। রতন আর বীণা। রাতের অভ্যস্ত আদরে বাধা দিয়ে বীণা ওর স্বামীকে বলছে যেন সে আগামীকাল জিলিপি কিনে এনে তার মা’কে প্রাণভরে খাইয়ে দেয়। এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রস্তাবে যারপরনাই অবাক হয় রতন। কারণ ছোটবেলা থেকে সে দেখে অভ্যস্ত যে খেয়ে নয়, খাওয়া দেখেই ওর মায়ের সুখ।

রতন কী বলছে একবার শুনে নেওয়া যাক –

“দিলেও খায় না।” “মা পালটা আমাদের খাইয়ে দেবে।”

“সব চেয়ে ছোট মাছের টুকরোটা মার। দশটা পরোটা হলে বাবার পাঁচটা আমার চারটা মার একটা। দেখে দেখে আমাদের এমন সয়ে গেছে যে কিছুই মনে হয় না।”

বীণা এসবের উত্তরে যা বলে তাতে রতন হতভম্ব হয়ে যায়। রতনের মা আজকাল ঠিক জলখাবারের সময়টিতে গিয়ে হাজির হচ্ছে প্রতিবেশীর বাড়ি। গিয়েই খাবারের ঘ্রাণ নিতে নিতে স্তুতি করছে সেই খাদ্য সম্ভারের। এমনভাবে বলছে যে তাকে একটুখানি না দিয়ে পারা যায় না। এর পরেও ঘটনা আছে। আজ গোনাগুনতি জিলিপি থেকে নিজের ভাগ আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে রতনের মা তাদের প্রতিবেশিনীকে কথা শোনাতেও ছাড়েনি। সেই প্রতিবেশিনী বীণাকে ডেকে সদুপদেশ দেওয়ার ছলে হুল ফুটিয়েছে, “মাসিমাকে তোমরা পেট ভরে খেতে দিও।”

লজ্জায় যেন মরে যায় রতন। পরদিনই মাকে সে পেট ভরে জিলিপি খাওয়ায়। বুড়ি খুব খুশি। এবার পাঠকের মনে রতনের মায়ের জন্য বিন্দু বিন্দু সমবেদনা জন্মায়। “বুড়ি ফোকলা হাসিতে বড় সুন্দর হয়ে উঠল। রতন অনেকদিন পর মাকে ভাল করে দেখল। বড্ড রোগা হয়ে গেছে আর ফ্যাকাশে।” এই অংশটি পড়ে ভিজে যায় মন। তবে রতন কিঞ্চিৎ বিব্রত। মা’কে জানায় এবার থেকে কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হলে মা যেন রতন আর বীণাকেই বলে। মায়ের ঘর থেকে বেরতেই বীণার ঝাঁঝের মুখে পড়ে রতন। বউয়ের মুখে মা সম্পর্কে ‘লোভিস্টি’ কথাটা ঠিক নিতে পারে না সে। বীণা যেমন সইতে পারে না রতনের কাছ থেকে ওর মা’কে ঠিকমতো খেতে না দেওয়ার অভিযোগটি।

মনে রাগ পুষে নিয়েই রতন বাজারে যায় আর আর একটা বড়সড় রুইমাছ এনে হাজির হয়। তা এতকিছু থাকতে রুইমাছ কেন? কারণ রতনের মা বলছে -

“মাছ ভাজার বাস দুর্গাপুজোর ধুনোর গন্ধের চেয়ে আমার বেশি ভাল লাগে।”

বিধবা হওয়ার পর নয় বছর কেটে গেছে মায়ের। সেই যে সেবার বাবা পকেট ঝেড়ে নিয়ে এল বিশাল বড় পাকা রুই। ইয়া বড় বড় এক একটা পেটি আর গাদা যার! বাড়িতে হঠাৎ করে এসে হাজির রতনের পিসতুতো দিদি তার ছেলেপুলে নিয়ে। সবাইকে দিতে দিতে মায়ের নিজের জন্য রইল না আর একটুকরোও। “ভাবলাম, আবার একদিন আনলে খাব। হল না। সেই বছরই লোকটা চলে গেল।”

বীণাও তার মনের ক্ষোভ ফিরিয়ে দেয় যথাযথভাবেই। অফিসে বেরনোর সময় পাতলা একখানা পিস রতনের পাতে দিয়ে দুপুরে শাশুড়ির থালায় তুলে দেয় সে আস্ত মুড়োটা। ভাবখানা এই যে, বেশ হয়েছে, দেখো বুড়িকে কেমন জব্দ করেছি!

বিব্রত? তা একটু হয় হয়তো। প্রথমটা সামান্য ইতস্তত করে বটে, তারপর সমস্ত মানসিক বাধা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে রতনের স্নেহময়ী বিধবা মা দু’হাতে সাপটে ধরে মাছের মুড়ো। বাসনার স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় এতদিনের সংস্কার, কঠোর কৃচ্ছসাধন। এখানেই গল্পটিতে মোচড় আসে। লেখকের বর্ণনায় গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে পাঠকের।

“দাঁত নেই তো অত বড় মুড়ো খাওয়া কি সহজ কথা! চোখ ঠিকরে নাকের পাটা ফুলে উঠেছে আর মাড়ি ক্ষতবিক্ষত হয়ে কষ বেয়ে রক্তের রেখা। বীণা শাশুড়ির গলায় অস্পষ্ট গরগর শব্দ পেল। বেড়াল ইঁদুর ধরলে যেমন করে।”

এই জায়গায় এসে পাঠকের মনে একটা অসহায়তা জন্মায়। আতঙ্কিত হয়ে পাঠক চোখ সরিয়ে নিতে চান কিন্তু পারেন না। এই আগ্রাসী খিদের মুখে আজন্মলালিত শালীনতার আবরণ খসিয়ে দেন লেখক। ধস নেমে আসে সংযমের পাহাড়ে। খুবই আন-রোমান্টিক ও কর্কশ ভাষায় রতনের মায়ের মাছের মুড়ো খাওয়ার বিবৃতি দিয়েছেন লেখক –

“আঁচড়ে কামড়ে ছিঁড়ে চুষে দু’হাতে জাপটে ধরে রসে রঙে বুক ভাসিয়ে বুড়ি জীবন ভোগ করছেন।”

এবার ধীরে ধীরে পাঠক জানতে পারেন পরিবারটির অর্থনৈতিক অবস্থার কথা। নিতান্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসার। এর উপর নিত্যনৈমিত্তিক মায়ের নানাবিধ চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায় রতন। কিন্তু কী করবে সে? মায়ের “কিছু ভোগ বাকি থেকে গেছে” যে! “পুরো না হলে মরণ নেই।” সুতরাং দু’দিক রক্ষা করার জন্য তাকে কিছু ফাঁকির আশ্রয় নিতে হয়। সেজন্যই সেই বাজারে বারোশ টাকা ভরির কস্তুরি সেন্টের জায়গা নেয় আটচল্লিশ টাকার সিনথেটিক সেন্ট। ঝুলে থাকে তসর শাড়ি, বক্রেশ্বরের মোহন প্যাড়া খাওয়া। বীণার চোখেও একটু একটু করে এই ফাঁকি ধরা পড়ে যায়।

আমরা গল্পের শেষের দিকে পৌঁছে গেছি। সেদিন সন্ধেয় মিহি বৃষ্টি। বুড়ির রসনা জেগে ওঠে প্রবল ভাবে। মাগুর মাছের ঝোল ভাত চাই। এখনই। অফিস থেকে ফিরেই রতনকে ছুটতে হয় বৃষ্টি মাথায়। বাজারে এসব মাছ ওঠে না। যেতে হবে সেই ছয় কিলোমিটার দূরের হাটে। অথচ যতটা সময় লাগার কথা তার অনেক আগেই ফিরে এল রতন। কেটে কুটে ‘মাগুরের’ মতই রান্না করে দিল বীণা। গুছিয়ে খেতে বসেছে বুড়ি। মুখে হাসি আর ধরে না। কিন্তু এ কী! দু’বার খুঁটেই বাটি ঠেলে সরিয়ে দিল শাশুড়ি। এত যত্নে আঁশ ছাড়িয়েছে বীণা তবু ঠিক ফাঁকি ধরে ফেলেছে বুড়ি।

“কি খাওয়ালে আমাকে? অ্যাঁ? মাগুর বলে জল-ঢোঁরা?”

অবিরত বমি শুরু হল রতনের মার। ডাক্তার বললেন, ঘেন্না টেন্না নয়। এটাই হল রোগের শেষ ধাপ। ডাক্তারি পরিভাষায় রতনের মায়ের হয়েছে ইসোফেগাসের কাসিনোমা। এর আগের পর্যায়ে থাকে অ্যানিমিয়ার খিদে। অতি তীব্র খিদে।

মরার আগে রতনের মা দুটো আলুসেদ্ধ ভাত খেতে চেয়েছিল। বীণা শাশুড়ির মাথা পরম যত্নে কোলে তুলে নিয়ে তার মুখে তুলে দিয়েছিল শেষ গ্রাসটি।

গল্পটি এখানেই শেষ। বাঙালি বিধবার দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি, আত্মবঞ্চনা, সমাজের বিধিনিষেধ ও আচার বিচারের তলায় দলিত হয়ে থেকে থেকে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম এবং সবশেষে বিপর্যস্ত বাসনার এক অনিবার্য বিস্ফোরণের রূপকে অত্যন্ত কুশলী ভঙ্গিতে তাঁর শক্তিশালী কলমের মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে। অনেকেই এই গল্পে তারাশঙ্করের ‘অগ্রদানী’র প্রভাব দেখতে পেয়েছেন। হয়তো সর্বোপরি ‘খিদে’ই এই গল্পের মুল উপজীব্য বিষয় বলে। আমার কিন্তু তা মনে হয়নি। আমার কাছে ‘তিনকালের এক খিদে’ একটি বিপন্ন সমাজের দলিল হয়েই বেঁচে থাকবে তার স্বকীয়তায়।



লেখক পরিচিতি
রম্যাণী গোস্বামীর জন্ম ১৯৮০ সালের ১৭ ই অক্টোবর। কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করেন। এরপর ইন্ডিয়ান অ্যাসোশিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স (আইএসিএস) থেকে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৮ সালে শিলিগুড়ি সূর্য সেন কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন এবং বর্তমানে সেখানে বিভাগীয় প্রধান পদে কর্মরতা। গল্প লেখেন। এছাড়াও নেশা - বই পড়া, বেড়ানো আর ফটোগ্রাফি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন