শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

সালেহা চৌধুরীর গল্প : শয়তানের মুখ

ভোর বেলা উঠেই হিরামিয়ার মনে পড়লো আজ একটা বড় কাজ আছে। কাজটা তেমন কিছু নয় এই একজনাকে ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দিতে হবে। এই কাজের জন্য নগদ দুই হাজার টাকা পেয়েছিল কাল। যাকে ফেলে দেবে সে একজন মোটামুটি বড়লোক। এমনিতেই পড়ে যেতে পারে।
কতইতো রিকশার দূর্ঘঘটনা হয়। যদি না হয় তাই তাকে ফেলে দেবার কাজটা করতে হবে। মনে মনে ভাবে এমন একটা ছোট কাজও করতে হয় তাকে। টাকা পেয়েছে তাই দিয়ে চুটিয়ে মদ আর নারী করেছে ও। গতরাতে এই করতে করতে আকাশ ফর্সা করে ফেলেছে। মেয়েটাকে আমদানি করেছে মহব্বত। ওর জিগরি দোস্ত। দুজনের গলায় গলায় ভাব। বলেছে--সাঁইত তোকে দিয়েই হোক। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল মেয়েটা। মহব্বত একেবারে ছালায় ভরে সোজা রহিমাখালার পল্লিতে। মহব্বত এমন করে রহিমাখালার পল্লির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে। কেউ মারা যায় কেউ বেঁচে থাকে। কাউকে মহব্বত চড়া দামে বিক্রি করে। কাউকে পাচার করে। কোন পুলিশও মহব্বাতের চুল স্পর্শ করতে পারে না। মহব্বত সবদিক সামলাতে পারে। আর এই মহব্বতই হিরাকে শিখিয়েছে কেমন করে পুলিশমুক্ত অপকর্ম করা যায় এবং একদিন অপকর্মের মাস্টরা হওয়া যায়। হিরা কেবল মাস্টার নয় অপকর্মে পি এইচ ডি।

মনে পড়ছে মেয়েটা ওকে একবার বাবা, একবার ভাই, একবার চাচা বলেছিল। পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেওছিল। এত বেশি রহম নেই হিরামিয়ার কলিজায় মেয়েটাকে না ছুঁয়ে চলে আসবে। ছুঁয়েছে, ছেনেছে। নতুন কচি মেয়ে বলে খাতির করেনি। কচি খাসির মাংস আর কচি মেয়ে দুটোই তার পছন্দ। একটু মদ আর কাবারের সঙ্গে তুলনাহীন। খাতির? না ওসব হিরামিয়ার রক্তে নেই। এরপর মেয়েটার কি হবে কে ভাবছে সেসব। মরলে মরবে। মেয়েমানুষের কাজইতো এই। দুনিয়াতে মেয়ের সুখ, বেহেশতেও মেয়ে। অনাঘ্রাত হরিণচোখের মেয়ে।

বাসিমুখে কাপে ঢালা একটু শরাবুন তহুরায় দিন শুরু। পাশে রাখা চানার ডাল। গতকাল যে বুড়ি ওকে রেঁধে দেয় সে এগুলো টেবিলে রেখে চলে গেছে। রাতে ওখানেই খাওয়াদাওয়া সেরেছে। এখন একটু চানাডাল আর এক কাপ পানীয়। ও রোজাও ভাঙ্গে এই পানীয় দিয়ে। হুইসকি। একেবারে বিলাতি। দেশি বিলাতি যখন যা পায়।

হিরা বাড়িতে আছো?

এ কার গলা? হিরা গলা চিনতে পারে না। ও বলে-- হ বাড়িত। আপনি কে?

লোকটা বাইরে থেকে বলে-- আমি কি ভেতরে আসতে পারি? যারা হিরামিয়ার কাছে আসে তারা কেউ এই ভাষায় কথা বলে না। ও একটু অবাক। এ আবার সাধারণ কাপড়ে পুলিশ নাকি? ও বলে--কি দরকার।

আসতে দাও। বলবো।

হিরা ভালো করে উঠে বসে। বলে--আসেন। কে আপনি?

যখন লোকটা ঘরে ঢোকে হিরা ঠিক তখনো ওকে চিনতে পারছে না। ফর্সা রং। পরিস্কার কাপড়। আঁচড়ানো চুল। পায়ে সুন্দর স্যান্ডেল শু। পরিচ্ছন্ন দাড়ি কাটা ঝকঝকে সাবান ধোওয়া মুখ। চিবুকের কাছে একটা খাঁজ। আর এই খাঁজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলে--রতন? তুই মানে তুমি রতন?

রতন হাসছে। বলে--যাক শেষপর্যন্ত চিনতে পারলে তাহলে। আমি রতন। সর্দার মুইনুদ্দিন স্কুলে পড়তাম। কাজিপাড়া খুলনায়।

মনে পড়েছে। ক্লাশে প্রথম হওয়া রতনকে। মুখচোরা লাজুক রতন। পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। পেছনের বেে র ধাড়ি ধাড়ি ছেলেদের সঙ্গে বসে হিরা। রতনকে হিরার মনে আছে একটা কারণে।

বলে--কি মনে করে তুমি আমার বাড়িতে। আমিতো কাজিপাড়াতে থাকিনা আজ পঁচিশ বছর।

আমিও না। তবে কিছুদিন আগে বাড়ি গিয়েছিলাম। খুলনায় তারপর কাজি পাড়ায়। কথা বলতে বলতে মদের বোতল লুকায় হিরা, বিছানাটা টান টান করে। গায়ে একটা ধোওয়া পাঞ্জাবী পরে ফেলে।

ভালো করে এই ঘুপসি ঘরটা দেখে রতন। যে এখন কলেজে পড়ায়। বই লেখে। ছবি আঁকে। গান শোনে। বিকালবেলা বউ নিয়ে বেড়াতে যায়। নদী ভালোবাসে। গাছাপালা ভালোবাসে। সুন্দর করে সবকিছু নিয়ে সংসার গুছিয়ে বসেছে। দেয়ালের ছবিগুলো একবার দেখে। এমন ছবি আগে দেখেনি। বলে আবার--তোমার চাচা তোমাকে একটা কথা বলতে বলেছেন।

কোন চাচা? হিরা প্রশ্ন করে।

তোমার নিজের চাচাতো একটাই। কাজি মোবাশ্বের আলি।

ওনার কি কথা?

এবার রতন বলে--ওইসব ন্যাংটা মেয়ের ছবি গুলো টাঙিয়ে রেখেছো কেন? যেন এটা গুন্ডা হিরা নয়। সর্দার মঈনউদ্দিন স্কুলের পেছনের বেে র ছেলে। যাকে একদিন হেডমাষ্টারের কঠিন বেত থেকে বাঁচিয়েছিল রতন। তখনও প্রশ্নটা এমন ছিল--এত গুন্ডামি কর কেন? তখন এই গুন্ডামি শব্দটা কেবল একটা শব্দ। এখন এটাইতো ওর জীবিকা। স্কুল ছেড়েছে। মা বাবা মরে গেল কলেরায়। ঢাকা শহরে এটা সেটা করতে করতে এখন মস্ত গুন্ডা। রতনের এসব জানবার কথা নয়। বলে হিরা--রতন তুমি ঠিকানা পেলে কোথায়?

তোমার চাচা দিয়েছেন।

তিনি কেমন করে আমার ঠিকানা জানেন?

সেটা আমি কি করে বলি বলতো হিরা। পেয়েছেন। হয়তো তোমার কোন চেনাপরিচিত কেউ দিয়েছেন।

হিরা হাত দিয়ে টেনে কয়েকটা ছবি নামায়। দেয়ালের দিকে মুখ করে ছবি নামাতে নামাতে বলে-- এ গুলো আমি টাঙাইনি। আমার একজন চেনা মানুষ আছে মানে যে আগে এ ঘরে থাকতো ছবি গুলো তার। শস্তা ঘর। এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। বেশ চমৎকার করে এইসব আজে বাজে বস্ত্রহীন নারী শরীরের ব্যাখ্যা করে হিরা।

রতন কিছু বলে না। বলে আবার-- কাল চলে যাব। আজ ঢাকায় কাজ ছিল।

কোথায় যাবে?

আমি ঢাকয় থাকি না। আমি কুমিল্লায় কলেজে পড়াই। ওখানেই আমার বাসা।

ও। কি বলেছেন চাচা?

শরীর ভালো না। তোমাকে দেখা করতে বলেছেন। ওঁর তো আর ছেলেপুলে নেই।

হিরা হাসছে। চাচা কি তার জমিজিরাত ওকে দেবেন? টাকা পয়সা, পুকুর, ফলের বাগান। তার সুদ খাটানো, নিজের বুদ্ধির জোরে, মানুষ ফাঁকি দেবার টাকা। ক্রিতদাসের রক্তঘামে বানানো টাকা। নানা ধান্দায় ওস্তাদ চাচা। বাবাকে কিছু দেননি কোনদিন। ওকে দেবেন? মানুষ তো এসব দিয়ে মসজিদ, পুকুর বানায়, রাস্তা পাকা করে যেন এমন কোন পাকা রাস্তা ওপারে গিয়ে পায়। যেন পুলসেরাত হয়ে যায় যমুনা সেতু। তা না তিনি খুঁজছেন তার ভাতিজাকে? চাচা তো আর জানেন না তাঁর একমাত্র ভাতিজা এখন নরকের জীব।

তোমাকে কি যে খাওয়াবো বুঝতে পারছি না। হিরা বলে।

ওসব দরকার নেই। আমি তোমার চাচাকে কথা দিয়েছিলাম সেটা রাখলাম। এবার যাব।

তুমি ভালো ছেলে। হিরা বলে।

হবে। রতন উঠে দাঁড়ায়। এই ঘুপসি ঘর, চারপাশের পরিবেশ, এমন জীবনযাপন, হিরার লোমভরা খালি গা, দেয়ালের লেংটা মেয়ের ছবি, ওর ভালো লাগছে না। হিরা যে এমন কিছু হবে সেটাতো সকলেই ভেবেছিল। তারপরেও? সত্যটা মেনে নেওয়া মুশকিল।

আসবার সময় ওর নামের কার্ডটা হিরাকে দেয়। বলে-- আমরা মাঝে মাঝে ঢাকায় থাকি। জিগাতলায় দশতলার উপরে আমাদের একটা ছোট এ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমি আর চাঁপা। ধানমন্ডির কাছে। এ্যাপার্টমেন্ট চাঁপার। ও ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছে।

আমি আসবো তোমাকে দেখতে। চাঁপাভাবীকে দেখতে।

রতন মাথা নাড়ে। না করতে পারে না।




ঠিক একমাস পরে হিরা এসেছে রতনের এ্যাপার্টমেন্টে। চাঁপা সেবার কুমিল্লা থেকে আসেনি। একটা কিন্ডারগার্ডেনে কাজ করে চাঁপা। রতন খুশী হয় চাঁপা এখানে নেই। মুখে বলে--কি ব্যাপার হিরা? কি মনে করে।

চাচার সঙ্গে দেখা করলাম। কথাবার্তায় মনে হলো আমাকে সবই দেবেন। তবে এখন তাঁকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যেতে হবে। কিডনির সমস্যা। হিরার কাপড়চোপড় সুন্দর। তারপরেও দীর্ঘদিনের জীবনযাপনের একটা রং ওর মুখে। দেখেই বোঝা যায় হিরা সহজ পথের মানুষ নয়। গিলে গিলে শরীর আর কঠিন কলিজার মজবুত মানুষ। দবেজ শরীর, পাথুরে হ্রদয়।

অনেক লাথ্যি খেয়ে ঢাকা শহরে একটা জিনিস শিখেছি সেটা হলো বাজু শক্ত করতে হবে সঙ্গে সঙ্গে কলিজাও। তোমরা বলতে আমি একদিন গুন্ডা হবো। আমি তাই রতন। আমি তোমার কাছে মিথ্যা কথা বলবো না। ভানও করবো না আমি তোমার মত ভালো ছেলে।

রতনের সাজানো ঘরটায়, প্রচুর বইএর শেলফ আর আলমারি। কিছু বড় বড় প্লান্ট। দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ। এ ঘর হিরার নয়। এখানে ভালো মানুষের জীবনযাপনের নিজস্ব স্বাক্ষর। সোফার ঢাকনিতেও রুচি। রতন বলে-- ঠিক আছে এতদিন যা করেছো করেছো। এখন তোমার চাচা তোমার জীবনে আসছেন। তিনি তোমাকে সন্তানের মত কাছে পেতে চান। ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে সংসারী হও। ভালো জীবনযাপন কর।

হিরা হাসছে। বলে-- এতদিনের অভ্যাস ছেড়ে দেব। ওসব ভালোমানুষ টানুষ হওয়া আমার পোষাবে না।

ঠিক পোষাবে। তারপর যখন সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন আগের জীবনটাকে পুরণো পোশাকের মত শরীর থেকে খুলে ফেলতে পারবে।

তুমি কলেজের মাস্টার। এমন কথাতো বলবেই তুমি। আমি কতগুলো অভ্যাসের ভেতর জীবনযাপন করি। মদ খাই, মেয়েমানুষ চাখি। লোকেরা আমাকে টাকা দিয়ে অনেক আজেবাজে কাজ করায়। সেসব ফট করে বন্ধ করে দেব। ওই একখানা সুন্দরী মেয়ে সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে সেটা আমার পোষাবে না। আমি এক মেয়েতে সুখী হবার মানুষ নই। টাটকা মাংস আমার পছন্দ। রোজদিন নতুন মাল। রতন তাকিয়ে দেখে। যে অনায়াসে নিজের জীবনের নানা কথা বলছে তাকে কি আর বলবে রতন। বলে কেবল-- আমার কাছে এসেছো কেন?

কেন? এত কষ্ট করে আমাকে খুঁজে বের করেছো সে কথা ভুলে যাব? আমাকে চাচার কথা বলেছো। চাচা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছেন সিঙ্গাপুরের বিলি ব্যবস্থা করতে। আমার কাপড়চোপড় এটাসেটা কিনতে। তারপর ইচ্ছামত খরচ করতে। আমি সেখান থেকে তোমাকে কিছু দিতে চাই। তুমি নিলে আমি খুশী হবো।

প্রশ্নই ওঠে না। ওসব তুমি যেমন ভাবে খরচ করবার কর।

শোন বন্ধু, শোন ভালো ছেলে, তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাই। এই যে শরীর আমাদের তার দেখাশোনা করে শয়তান আর তোমরা যাকে আত্মা বল তার দেখাশোনা করে আল্লাহ। শরীর মাানি, শয়তানের কথা শুনি, নিজের খায়েশ মেটাই।

এমন অভিনব ব্যাখ্যা রতন কোনদিন শোনেনি। শরীর দেখাশোনা করে শয়তান আর আত্মা দেখাশোনা করে আল্লাহ। বলে--কে বলেছো তোমাকে এমন কথা?

আমি জানি।

হিরা হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে নাশতা নেয়। হপ হপ সপ সপ করে মুহূর্তে সবটুকু খেয়ে ফেলে। বলে--কেন আমার কথা তোমার ঠিক মনে হয় না? রতন বলে--কোন বইতে এমন কথা পড়িনি। শরীর দেখাশোনা করে শয়তান আর আত্মা আল্লাহ। এটা তোমার কথা।

তা হবে। হিরা একটু উদাস হয়। চাঁপার মিষ্টি ছবিটার দিকে তাকায়। তারপর বলে--ভাবীতো খুবই সুন্দর।

হিরা একটু থেমে বলে--হেডমাস্টার বলতেন মনে আছে? বলতেন-- তোর ব্রেনটা ভালো। এই ব্রেনটা ঠিকমত কাজে লাগালে অনেক বড় একটা কেউ হতে পারতি তুই। আমি ব্রেনটা অন্যভাবে খাটাই। খুনখারাপি ঠিক করি না। তবে আরো নানা কাজ। বেশি টাকা পেলে সেসবও করবো। আমি নর্দমার পাশে বসে ভাত তরকারি কুকুরের সঙ্গে ভাগ করে থেয়ে ঢাকা শহরে বড় হয়েছে। বিন থেকে কুড়িয়ে নিয়েছি তোমাদের ফেলে দেওয়া নানাকিছু। অনেক লাথ্যি, অনেক অত্যাচার সহ্য করতে করতে এই আজকের হিরামিয়া হয়েছি। এখন শয়তান আমাকে পথ দেখাবে। আমার আল্লাহর দরকার নাই। শয়তানের দরকার।

রতন উঠে দাঁড়ায়। বলে--আমার একটু কাজ আছে হিরা। কালকেই কুমিল্লা চলে যাব। কিছু বইপত্র কিনবার ব্যাপার আছে।

আমাকে ভালো লাগছে না তো?

রতন কোন উত্তর দেয় না। হিরা ওঠে। বলে-- দেখি শালা চাচার কিডনির চিকিৎসায় তার কিডনি কতটা মজবুত হয়। শালা মরবে না এখন। মরলেই হতো। না উনি কিডনি সারাতে চলেছেন।

উনি তোমার বাবা, তোমার চাচা, তোমার ভবিষ্যত। ওঁর যত্ন করবে হিরা।

আমি কি তোমার মত ভালো ছেলে?

হিরা চলে যায়।

মাস খানেক পরে চাচাকে চিকিৎসা করিয়ে ফিরে এসেছে ওরা দুইজন। চাচার একজন আত্মিয়ের বাড়িতে ওরা। দুই দিন পর ও আর চাচা কাজিপুরে চলে যাবে। চাচার বয়স সত্তুর পার। একটু নড়বড়ে শরীরটা সিঙ্গাপুরের চিকিৎসায় বেশ সতেজ হয়েছে। এখন তিনি লাঠি ছাড়াই চলতে পারেন। বেশ জোরবল হয়েছে। কথায় কথায় বলেছেন তিনি মারা গেলে সবকিছু হিরা পাবে। তাঁর নিজের ছেলেমেয়ে নেই। তবে এইজন্য হিরাকে ওর চাচার সঙ্গে থাকতে হবে। তাকে দেখাশোনা করতে হবে। বলেন তিনি--আর দশটা বছর। সে কথাইতো বললো সেখানকার ডাক্তার। আল্লাহর কি শান বাবা হিরা। ভাবছিলাম কয়েকদিনের মধ্যেই জীবন শেষ সেখানে আরো দশ বছর। তুমি একটু আমারে দেখবা। হিরা ভাবছে
এই স্বাধীন জীবন ফেলে চাচার চাকর হযে থাকা। সেটা কেমন হবে? চাচার পাঁচকোটি টাকার সম্পত্তি। জমি, পুকুর, বাড়ি।


বাবা হিরা বাঁকি জীবন তুমি আর আমি একসঙ্গে থাকি। রিয়াজুলতো সেই কবে মারা গেছে। তোমার চাচি অনেকদিন আগে ইন্তিকাল ফরমাইছে। আমাদের কোন সন্তান নাই। এখন এই দুনিয়াত আপন বলতে তুমিই হিরা বাবা।


হিরা বলে--সেটাতো ঠিকই চাচা।

লোকজন যারা আসে সব ওই সম্পত্তির লোভে। রক্তের সম্পর্ক কেবল তোমার সঙ্গে। তুমি আমার ভাই কাজি রিয়াজুলের এক মাত্র ছেলে।

আমার বাবা গরীব ছিলেন। আপনি নানা ধান্দায় বড়লোক হইছেন চাচা। এখন আমারে মনে করছেন সেটা তো খুবই ভালো কথা। মনে মনে ভাবছে হিরা পাশের বাড়িতে যে গরীব ভাই কত কষ্ট করে দিন গুজরাণ করেছে তার খবর কতটা রাখতেন এই চাচা। এখন তাঁর ছেলেকে ডেকেছেন বুড়ো বয়সে দেখাশোনা করবার জন্য।

আমার ধান্দা খারাপ ছিল না বাবা। তবে তোমাকে সব কিছু দেবার আগে একটি মসজিদ করবো। কোটি খানেক টাকা ব্যয় হবে ওই মসজিদের পেছনে। বাঁকিটা বাবা সব তোমার। বিশ বিঘা জমি, পুকুর, ফলের বাগান, জমানো টাকা। সব। আমারে একটু দেখাশোনা করবা, পারবা না? তিনবার হজ করেছি। এরপর মসজিদ। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। পাকা রাস্তাও করবো। তারপর যা থাকবে সব তোমার।

কেন পারবো না চাচা। ও একটা হাত রাখে চাচার কোলের উপর। চাচা হাতটা স্পর্শ করেন। মনে মনে ভাবছে হিরা রতন যেমন বলেছিল গায়ের সেই পোশাকটা খুলে একটা নতুন পোশাক পরার মত তিনবার হজে আর মসজিদে হাজি শেখ মোবাশ্বের আলী এখন পাতলা পাঞ্জাবীতে আর ফুরফুরে মেহেদি দাড়িতে একেবারে অন্য এক মানুষ। এখন তিনি নাকি লোকজনকে পানি পড়াও দেন।

আর একটা বিয়া করতে পারতাম। সেটা আর করলাম না। কোন মেয়েমানুষ আইসা খপ করে সবকিছু নিয়া পগার পার হবে সেটা চাই না। এই বয়সে আমার শরীরের জন্য কেউ তো আর আসবে না, আসবে টাকার জন্য।

হিরা কেবল হাসে। বলে--কিইবা আপনার বয়স চাচা?

তিনি দাঁড়িতে খেলাল করতে করতে বলেন-- থাক সেসব। এখন বল বাবা তুমি আমাকে ঠিকমত দেখাশোনা করবা তো? যদি দশ বছর বাঁচি তুমি আমারে দেখবা। দেখবা না?

বললাম তো চাচা করবো, দেখবো। আমার বাঁকি জীবন আপনার সেবায় উৎসর্গ করলাম। এই বলে মিষ্টি করে হাসে হিরা মিয়া গুন্ডা।

দুজনে ঢাকার পথ দিয়ে চলেছে। চাচা বাড়ি যাবার আগে কিছু সওদাপাতি করবেন। হিরা আর চাচা এইসব গল্প করছে। চাচা বেশ ভালো বোধ করছেন, হাসছেন। চারপাশে সুন্দর দিনের জলছাপ। রিকশাটা একটা বড় ডোবার পাশে দিয়ে চলেছে। চাচা বলেন--একটা সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়া কর। দুজনে মিলে আমারে দেখবা। মনে রাখবা আমিই তোমার ইহকাল আর পরকাল।

বলে হিরা মিয়া গুন্ড-- মনে রাখবো। আর ভাবছে-- আরো দশ বছর? মাথা খারাপ! বলতেই বলতেই রিকশাটা পাশের ডোবার মধ্যে পড়ে যায়। হিরা জানে কি করে একটা রিকশাকে এইভাবে ডোবার ভেতর ফেলা যায়। ও লাফ দিয়ে নেমে গেছে। ওর কিছু হয়নি। রিকশাওয়ালা পানি গিলে কোনমতে বেঁচে গেছে। লোকজন পারলে রিকশাওয়ালাকে মেরে লাশ বানিয়ে ফেলে। হিরা বলে--থাক ওরা মাইরা আর কি লাভ?

চাচা হাসপাতালের বেডে ধুকতে ধুকতে মারা যান। হিরার সামনে এখন পাঁটকোটি টাকা। কোন চাচা ফাচাকে দেখাশোনা করবার দরকার নাই। কোন মসজিদ বা রাস্তার পেছনে টাকা নষ্ট করবার ব্যাপার নাই। দশ বছর চাকরগিরির কাজ শেষ। মনে মনে বলে-- মসজিদের পেছনে এক কোটি টাকা খরচ? না সেসব আর হবে না। কাজটা একেবারে নিখুঁত হবার আনন্দে ইয়ার দোশত নিয়ে একটা মদ, তাড়ির আসর করে নিজের সেই বাড়িতে। মনে মনে বলে এ বাড়িতে আজই আমার শেষ দিন।

পুরণো বন্ধুদের কারণে ফিরে এসেছে নিজের বাড়িতে। বড়লোক হবার দিনেও এইসব ইয়ারবন্ধুদেরও মনে আছে বোধকরি সেটা দেখাতে। তবে ইয়ারবন্ধুরা এত কিছু জানে না। কেবল জানে হিরামিয়া সউদিতে কি একটা কাজ পেয়ে গেছে। হিরার নিজের ঢাকায় কিছু কাজ কারবার সামলানোর আছে। সেগুলো শেষ করে দেশে গিয়ে চাচার সবকিছু বিক্রি বাট্টা করে ভালো কোন জায়গায় চলে যাবে ভাবছে। একটা মজবুত বাড়ি কিনবে ঠিক রতনের মত দশতলায়। লোহার গেট করবে। মাছি, মানুষ কেউ যেন সেখানে আসতে না পারে। যেদিন যেমন একটা করে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে। এখানে একটা মেয়ে এসে মাঝে মাঝে ওর সেবা করে যায়। সে রাতে সেও একসময় চলে গেছে। বোতল খালি। স্টমাক পূর্ণ। মেয়েটা একটা সোনার চেন পেয়েছে। খুশী ভয়ানক। আর কোন ইয়ারদোশতও নাই। হিরা কেন জানি সে রাতে কাউকে থাকতে দেয়নি।

রাতে ইলেকট্রিক আলো নাই। পাওয়ার কাট। মোমবাতি জ্বলছে। প্রচুর পান করে হিরামিয়া বেসামাল। হঠাৎ লক্ষ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে ওর চাচা। তার দাড়িটা লম্বা হয়ে তার বুকের তলায় নেমে গেছে। গরম চোখে তিনি হিরাকে দেখছেন। যেন চোখের আগুনে পুড়িয়ে ফেলবেন হিরার সবকিছু। মদের নেশা। শালা চাচা আসবো কোনখান থেকে? বিড় বিড় করতে করতে পাশ ফিরে শোয়। একসময় মোমবাতির শেষ অংশ জ্বলতে জ্বলতে টেবিলের কাগজে, কাগজ থেকে কাপড়ে, কাপড় থেকে বিছানায়, বিছানা থেকে ওর শরীরে। মদের নেশায় হিরার আর ঘুম ভাঙ্গে না।

একটা পোড়া শরীর। রতন এসেছে দেখতে। পোড়া মানুষের যেখানে চিকিৎসা হয় সেখানে। বেগুনপোড়া হিরার প্রাণ যে কোন মুহূর্তে চলে যাবে। ও নাকি মরতে মরতে রতনকে দেখতে চেয়েছিল। বোঁচা, কালু, আমির, মোটকু, পাতলা, মোহব্বত, মিরাজ কাউকে নয়। রতনকে। শয়তান দেখতে চায় ফেরেশতাকে। কারণ? না হিরা কোন কারণ বলেনি। মরতে মরতে পুড়তে পুড়তে নতুন কোন উপলদ্ধির কথা কি ও রতনকে জানাতে চেয়েছে? ওকে ডেকে দেবার ইচ্ছার কথা বলবার সময় যেটুকু প্রাণ ছিল এখন তা নিঃশ্ষে। স্কচ হুইসকির সবচাইতে বড় বোতল বা ‘বালথাজারএর’ শেষ বিন্দুর মত নিঃশেষ। কিন্তু কেন ও দেখতে চেয়েছিল রতনকে? এ কেনর উত্তর কখনোই জানা যাবে না।

লক্ষ করে রতন হিরার একটা হাত ব্যান্ডেজমুক্ত। মানে সেখানে কোন ব্যান্ডেজ নেই। ঘটনা কী? সব পুড়ে গেছে হাতটা পোড়েনি কেন? ডাক্তারও বলাবলি করছে এমন একটা ব্স্মিয়কর ঘটনা। চমৎকার সুন্দর একটি হাত। একফোঁটা পোড়ার দাগও নেই সেখানে। রতন কাছে যায়। হাতটা একটু উল্টে দেয়। জীবন স্পন্দনে ঝক ঝকে হাত। আর উল্টে যাওয়া হাতে কি দেখে রতন? সারা হাত শুদ্ধো একটা ভয়াবহ দানবের মুখ। টাটু করা। সিঙ্গাপুর থেকে খুব সুন্দর করে টাটু করে এনেছে। নিচে লেখা--শয়তানের মুখ। দি ফেস অফ ডেভিল। চমকে যায় রতন।

হিরা বিশ্বাস করতো শরীর দেখাশোনা করে শয়তান আর আত্মা থাকে আল্লাহর কাছে। শয়তানের মুখ ওর একটা হাত রক্ষা করেছে তবে পুরো শরীর নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন