বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে--তৃতীয় অধ্যায়

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
এলেন ও’হারার বয়স বত্রিশ বছর। সেই যুগের মাপকাঠিতে তাঁকে মধ্যবয়স্কা মহিলা বলা যেতে পারে। তিনি ছ’টি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তার মধ্যে তিনটি বেঁচে নেই। ছোটখাটো জেরাল্ডের তুলনায় তিনি প্রায় এক মাথা লম্বা। কিন্তু তাঁর চলাফেরা থেকে এই ব্যাপারটা কাউকে খেয়াল করার সুযোগ দিতেন না। মসৃণ, দুগ্ধফেননিভ ত্বক। গ্রীবা সরু এবং লম্বা। মাথার সঘন কেশরাশিকে সামাল দেবার জন্য সামান্য হেলানো। ফরাসি মায়ের কাছ থেকে তিনি তাঁর গভীর চোখ, চোখের কালো পালক আর কালো কেশরাশির উত্তরাধিকারি হয়েছিলেন।
বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন উন্নত নাসিকা, চৌকর গণ্ডদেশ আর ঋজু কপোল। ১৭৯১ এর বিপ্লবের সময়, তাঁর মায়ের বাবা-মা হাইতিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আর তাঁর বাবা নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন। তাঁর চেহারার মধ্যে যে আত্মাভিমান লক্ষ্য করা যেত সেটা অবশ্য তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ। সেই আত্মাভিমানের মধ্যে কোন ঔদ্ধত্য ছিল না। ছিল ঔদার্য আর বিষন্নতা। অবশ্য কোনরকম কৌতুকরসবোধ তাঁর একদমই ছিল না।

একজন অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর চোখে ছিল দীপ্তির অভাব, হাসিতে উষ্ণতার আর কন্ঠস্বরে ছিল স্বতঃস্ফুর্ততার অভাব। তিনি উপকুলবর্তি জর্জিয়ার বাচনভঙ্গিতে কথা বলতেন। স্বরবর্ণের থেকে ব্যঞ্জনবর্ণের ওপর জোর থাকত বেশি। ফরাসি বাচনভঙ্গির কোন চিহ্ন তাঁর কথাবার্তায় ছিল না। অত্যন্ত মৃদুভাষী – এমন কি কাউকে শাসন করার সময়ও তাঁর কন্ঠস্বর ওপরে উঠত না। তবু টারায় তাঁর আদেশ অমান্য করার সাহস কারও ছিল না। তাঁর স্বামী জেরাল্ডের আদেশ অবশ্য অনেক সময়ই লোকে নিঃশব্দে অগ্রাহ্য করত। 

স্কারলেট যতদূর মনে করতে পারে, ওর মাকে একই রকম দেখে আসছে। মৃদুভাষী, দৃঢ়, ঋজু, দক্ষ এবং অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। তিনটি সন্তানের মৃত্যুর আঘাত সহ্য করেছেন। কিন্তু স্কারলেট তাঁকে কখনও ভেঙ্গে পড়তে দেখেনি। যখন চেয়ারে বসেন, স্কারলেট লক্ষ্য করেছে, কখনই পেছনে হেলান দেন নি। খাবার সময় ছাড়া, কিংবা যখন রোগীর শুশ্রুষা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, মা কখনও খালি হাতে বসে থাকেন না। অন্তত কোন একটা সূচিকর্ম নিয়ে বসবেনই। অতিথির উপস্থিতিতে কোনো সুক্ষ্ণ এম্ব্রয়ডারির কাজ। অন্য সময়ে জেরাল্ডের কোঁচকানো ছেঁড়া শার্টের রিফু, বা মেয়েদের কিংবা দাসদাসীদের পোশাক সেলাইয়ের কাজ। এছাড়া এলেন সময়ে সময়ে রান্নাবান্নার তদারকি, এ ঘর ও ঘর ঘুরে ঘুরে ঘরদোর পরিচ্ছন্ন রাখার তদারকি এই সব নানা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। 

স্কারলেট কখনই তাঁকে তাঁর অনাড়ম্বর প্রশান্তি থেকে বিচ্যুত হতে দেখেনি। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত আচার বিচারেও নিয়মানুবর্তিতা ছিল কঠোর। তা সে দিন কিংবা রাতের যে কোন সময়ই হোক না কেন। যখন এলেন বলডান্সে যাবার প্রস্তুতি নেন, কিংবা কোন অতিথিকে সঙ্গ দেবার প্রয়োজন পড়ে, বা কোন কাজে জোন্সবোরোতে যাবার প্রয়োজন পড়ে তখন ঠিক দু’ঘন্টা, ম্যামি আর দুজন ক্রীতদাসী লাগে সাজগোজ করবার জন্য। অথচ, যখন কোন জরুরি প্রয়োজনে তৈরি হতে হয়, তখন কি সুন্দর চট করে তৈরি হয়ে চলে যান। 

স্কারলেটের শোবার ঘর ছিল হলের অন্য প্রান্তে, মা বাবার ঘরের বিপরীতে। যখন ছোট ছিল তখন থেকেই দেখেছে অনেক সময় ওই ঘরে ভোর হতে না হতেই কোন নিগ্রো বালিকা ভীত সন্ত্রস্তভাবে কড়া নেড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের বেরিয়ে যাবার হালকা পায়ের শব্দ পেয়েছে। কখন কখন দরজা একটু ফাঁক করে দেখতে পেয়েছে মা ওষুধের বাক্স হাতে বেরিয়ে এসেছেন। মার্জিতভাবে সাজগোজ করা, চুল মাথার পেছনে পরিপাটি করে বাঁধা। 

মা হলঘর দিয়ে পা টিপে টিপে যেতে যেতে ফিস ফিস করে দৃঢ় কিন্তু দরদভরা স্বরে বলতেন, “একদম জোরে কথা নয়। মিঃ ও’হারা জেগে যাবেন। আমরা সময় মতই পৌঁছে যাব।” এই কন্ঠস্বর স্কারলেটকে খুব স্বস্তি দিত। ও আবার শুয়ে পড়ত। নিশ্চিন্ত মনে। মা যে খুব ভরসার জায়গা। 

তারপর সকালে এলেনকে যথারীতি ব্রেকফাস্টের আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। তখন তাঁর চোখে মুখে রাত্রি জাগরণের ক্লান্তির ছাপ হয়ত থাকত, কিন্তু কথায়বার্তায় কিংবা ব্যবহারে কিছুই বোঝা যেত না। হয়ত, সারা রাত একা হাতেই জন্ম কিংবা মৃত্যুকে সামলাতে হয়েছে। হয়ত ডঃ ফোনটেন কিংবা তাঁর ডাক্তার ছেলে কেউই অন্য কলে ব্যস্ত থাকার জন্য আসতে পারেন নি। তাঁর চরিত্রে একটা ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা ছিল, যেটা সবাই সমঝে চলত। তাঁর মেয়েরা, চাকরবাকর, এমন কি জেরাল্ডও। অবশ্য জেরাল্ড সেটা মরে গেলেও স্বীকার করতে পারবেন না। 

মাঝে মাঝে রাত্তিরবেলা স্কারলেট চুপি চুপি ঘুমন্ত মায়ের গালে চুমু খেয়ে আসত। মায়ের ঠোঁট দেখে ভাবত, উনি কি কখনও কিশোরিদের মত চটুল হেসে বান্ধবীদের সাথে গোপন কথা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন? মনে হয় না। মা তার ভরসার জায়গা; তার মা সব কিছু জানেন।

কথাটা ঠিক নয়। অবশ্য স্কারলেটের জানার কথাও নয়। এলেন রোবিল্যার তখন পনেরো বছরের কিশোরী। আর পাঁচটা মেয়ের মতই, সেও তার বান্ধবীদের সাথে জীবনের সব গোপন কথা ভাগাভাগি করে নিত। কেবল একটি কথা ছাড়া। সেই বছরই তার জীবনে জেরাল্ড ও’হারার প্রবেশ। ওর থেকে আঠাশ বছরের বড় জেরাল্ড। আর সে বছরই তার জীবন থেকে চিরবিদায় নেয় তার জ্যেঠতুতো ভাই ফিলিপ রোবিল্যার। কাজল-চোখো আর দূরন্ত ফিলিপ রোবিল্যার যখন স্যাভান্না ছেড়ে চিরতরে চলে গেল, সে যেন এলেনের সমস্ত আনন্দ, সমস্ত ফূর্তিও নিয়ে চলে গেল। যে আইরীশ ভদ্রলোক তার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেন, তিনি শুধু এলেনের বাইরের নিরুত্তাপ খোলসটাকেই গ্রহণ করলেন, মন অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছে।

অবশ্য জেরাল্ড এই বিবাহকে তাঁর অভাবনীয় ভাগ্য হিসেবেই নিলেন। কি পাননি তার হিসেব করার কথা মনেও আসেনি। তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর মত একজন মানুষ যার কিনা কোন রকম পারিবারিক আভিজাত্যই ছিল না, তিনি এমন একজনকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেলেন, যাঁর পারিবারিক মর্যাদা প্রশ্নাতীত। জেরাল্ড নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন।

মাত্র একুশ বছর বয়সে, একবস্ত্রে তিনি আয়ার্ল্যান্ড থেকে আমেরিকায় পালিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সমস্ত কুকীর্তিকে পেছনে ফেলে। ইংরেজ সরকার তাঁকে একজন স্বত্বভোগী নিষ্কর্মা জমিদারের খাজনা আদায়কারীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছিল। তাই তাঁকে সময় নষ্ট না করে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। যদিও জেরাল্ডের মতে লোকটা এক নম্বরের বেজন্মা ছিল আর শিস দিয়ে “দি বয়েন ওয়াটার” এর প্রথম কয়েক লাইন গেয়ে তাঁকে রীতিমত অপমান করেছিল। 

বয়েনের যুদ্ধ১ অন্তত একশ বছর আগে হয়েছিল। অবশ্য ও’হারা পরিবার আর তাদের পড়শীদের কাছে মনে হত যেন গতকালকের ঘটনা, - যে যুদ্ধে তাদের সব স্বপ্ন, সম্পদ ধুলোয় মিশে গেছিল। অরেঞ্জের উইলিয়ামের ঘৃণ্য বাহিনীর কাছে যখন স্টুয়ার্টের যুবরাজ পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছিলেন। [১ বয়েনের যুদ্ধ – ১৬৯০ সালে অপসৃত রাজা জেমস ২ এবং ইঙ্গল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম ৩ (অরেঞ্জের যুবরাজ) এর মধ্যে বয়েন নদীর ধারে হয়েছিল। উইলিয়াম এই যুদ্ধে জয়ী হন।]

এই সব নানা কারনে, জেরাল্ডের পরিবার এই ঝগড়াকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কিন্তু ইংরেজ পুলিশ ব্যাপারটাকে সহজে মেনে নেয় নি, কারন ও’হারা পরিবা্রের সরকার বিরোধী ভুমিকা নিয়ে ওদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। এর ভয়াবহ পরিণাম থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য, কেবল জেরাল্ডই নয় তাঁর পরিবারের অনেকেই পালিয়ে গেছিলেন। জেমস আর এন্ড্রুস – জেরাল্ডের বড় দুই ভাই – অনেক বছর আগেই আমেরিকা পালিয়ে এসেছিলেন। জেরাল্ডের শুধু এটুকই মনে আছে যে দু’জন যুবক কখন কখন মধ্যরাত্রে লুকিয়ে বাড়িতে দেখা করতে আসতেন। তাঁদের বাড়ির শুয়োরের আস্তাবল থেকে কিছু রাইফেল উদ্ধার হবার পরে পরেই তাঁরা পালিয়ে যান। এখন সাভান্নায় তাঁরা সফল ব্যবসায়ী। ‘কে জানে ওরা কোথায় আছে’ এই বলে মা এই দুই দাদা সম্বন্ধে বলতেন। জেরাল্ডকে এঁদের কাছেই পরে পাঠানো হয়েছিল।

বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময়, মা তাঁর গালে একটা চুমু দিয়েছিলেন। বাবা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তুমি কে সেটা ভুলে যেও না। আর কারও দয়ার ওপর থেকো না।’ তাঁর পাচজন লম্বা ভাই তাঁকে প্রশংসামিশ্রিত স্নেহের হাসি দিয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন। জেরাল্ডই পরিবারের মধ্যে সব থেকে ছোট, আর ছোট খাট মানুষ ছিলেন। 

তাঁর পাঁচ ভাই আর বাবা সকলেই ছ’ফুটের ওপর লম্বা ছিলেন। জেরাল্ড ছিলেন মাত্রা পাঁচ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি। এর জন্য জেরাল্ডের মনে কোন দুঃখ ছিল না। কোন কিছু অর্জন করার ব্যাপারেও উচ্চতার অভাব কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং তাঁর এই আঁটসাঁট ছোট খাটো চেহারাই তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছিল, তিনি অনেকে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, বেঁটে মানুষকে লম্বা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। আর জেরাল্ড খুবই পরিশ্রমী ছিলেন।

তাঁর লম্বা ভাইয়েরা সকলেই খুব বিষণ্ণ আর চুপচাপ থাকতেন। পরিবারের হৃতগৌরব তাঁদের কাছে খুবই পীড়াদায়ক ছিল যেটা কখনো কখনো তাঁদের শ্লেষের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে যেত। যদি জেরাল্ডও ওঁদের মত শক্তিশালী হতেন তাহলে হয়ত তিনিও একই রকম হতেন এবং গোপনে সরকারের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতেন। কিন্তু জেরাল্ড ছিলেন, তাঁর মায়ের ভাষায়, গোঁয়ারগোবিন্দ, এবং বদমেজাজি আর কথায় কথায় হাত চলত। হেলতে দুলতে চলা খর্বকায় মোরগের মত তিনি সদম্ভে চলাফেরা করতেন। তাঁর পরিবারের সকলেই অবশ্য তাঁকে ভালবাসতেন এবং এটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখতেন। কেবল নজর রাখতেন যে ভাইয়ের মারকুটে স্বভাব যেন কোন গুরুতর অশান্তির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। 

আকেরিকাতে পদার্পণ করার সময় তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা যদি তেমন বলবার মত নাও থেকে থাকে, জেরাল্ড সে ব্যাপারে খুব একটা মাথা ঘামান নি। অবশ্য এ ব্যাপারে কেউ তির্যক মন্তব্য করলেও ঊনি খুব একটা পরোয়া করতেন না।। তাঁর মা তাঁকে পড়তে শিখিয়েছিলেন আর গোটা গোটা অক্ষরে লিখতেও শিখিয়েছিলেন। হিসেব করাতেও তাঁর দক্ষতা ছিল। এইটুকুই তাঁর পুঁথিগত বিদ্যার দৌড়। ল্যাটিন ভাষা বা আয়ার্ল্যান্ডের ইতিহাস সম্বন্ধেও তাঁর উল্লেখযোগ্য কোন জ্ঞান ছিল না। তেমন কোন কবিতা কিংবা সঙ্গীতও তাঁর জানা ছিল না। লেখাপড়া জানা মানুষদের অবশ্য তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। তবে তাঁর মনে হত, এই নতুন দেশে এত রাত জেগে পড়াশুনো করবার কি এমন প্রয়োজন, যখন ্মূর্খ অজ্ঞানী লোকেরাও তো এখানে এসে বেশ কপাল ফিরিয়ে নিয়েছে? এই দেশে দরকার শক্তসমর্থ লোকের যারা কঠোর পরিশ্রম করতে পিছপা হবে না। 

জেরাল্ডের গোটা গোটা হাতের লেখা আর হিসেবের দক্ষতার জন্য জেমস আর এন্ড্রুস ওঁকে নিজেদের স্টোরে বহাল করে দিয়েছিলেন – লেখাপড়া অল্প জানা থাকা সত্ত্বেও। জেরাল্ডের সাহিত্যে রুচি কিংবা সঙ্গীতে পটুত্ব থাকলেই বরং তাঁর মূল্য কমে যেত। সেই সময়ের আমেরিকা আইরিশদের জন্য সম্ভাবনাময় স্থান ছিল। জেমস আর এন্ড্রুস আমেরিকায় জীবন শুরু করেছিলেন ওয়াগনে মাল তোলার কাজ দিয়ে। সেইসব ওয়াগন সাভান্না থেকে জর্জিয়ার ছোট ছোট শহরে মাল সরবরাহ করে থাকত। কিন্তু অল্প দিনেই তাঁরা ফুলে ফেঁপে উঠে নিজেদের একটা স্টোরও খুলে বসলেন। এঁদের সঙ্গ পেয়ে জেরাল্ডও উন্নতি করতে থাকলেন। 

আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চল তাঁর বেশ ভাল লেগে গেল। নিজেকে দক্ষিণের অধিবাসী বলতে তিনি গর্ববোধ করতেন। হয়ত এদের অনেক ব্যাপারস্যাপারই তাঁর বোধগম্য হত না। তবুও তিনি নিজের মত করে এই অঞ্চলের আদবকায়দা রপ্ত করে নিয়েছিলেন – পোকার খেলা, ঘোড়দৌড়, ডুয়েল খেলার নিয়ম, রাজ্যের অধিকার, ইয়াঙ্কিদের অন্তর থেকে ঘৃণা করা, ক্রীতদাস প্রথা, কার্পাস চাষের সুবিধা, বেজন্মা সাদা চামড়ার মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা আর মহিলাদের প্রতি ফলাও করে সৌজন্য প্রকাশ। তামাক চিবোনোর অভ্যেসও রপ্ত করেছিলেন। হুইস্কি খাওয়ার অভ্যেস তাঁর বরাবরই ছিল। কিন্তু জেরাল্ড আসলে জেরাল্ডই রয়ে গেলেন। হয়ত তাঁর অভ্যেস আর জীবনচর্যায় কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু তাঁর আচরণ তিনি পরিবর্তন করেন নি, যদিও অল্প চেষ্টা করলে সেটা অসম্ভব ছিল না। যে সব ধান এবং কার্পাস প্ল্যান্টাররা তাঁদের রাজ্য ছেড়ে সাভান্নায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের মার্জিত আভিজাত্য তাঁর খুব ভাল লাগত। তবে তিনি নিজে খুব একটা মার্জিত হয়ে উঠতে পারেন নি। তাঁদের কথা বলবার মৃদু ভঙ্গী তাঁর কানে মধুর লাগত, কিন্তু তিনি তাঁর অভ্যস্ত ভঙ্গীতে উচ্চস্বরেই কথা বলতেন। এঁরা বাজীতে হেরে গিয়েও মর্যাদাবোধ বিসর্জন না দিয়েও হাসি মুখে হার স্বীকার করে নিতে পারতেন – জেরাল্ড মনে মনে সেটারও তারিফ করেতেন। দারিদ্র কি সেটা একসময় অনুভব করেছেন। তাই কখনও হেরে গেলে সেটা চুপচাপ মেনে নিতে পারতেন না। এই তরুন আইরিশ মানুষটির মধ্যে এক সজীব অস্থিরতা ছিল, যেটা উপকূলবর্তি এইসব মানুষের মধ্যে ছিল না। 

যেটা তাঁর মনে হত প্রয়োজনীয় বলে, সেটা তিনি এঁদের কাছ থেকে গ্রহন করতেন, আর অপ্রয়োজনীয় যেটা, তৎক্ষণাৎ বাতিল করে দিতেন। দক্ষিণের সমস্ত রীতিনীতির মধ্যে পোকার খেলা তাঁর কাছে বিশেষ প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছিল – পোকার খেলা এবং হুইস্কি পান করার ক্ষমতা। তাস খেলবার সহজাত প্রতিভার বলে তাঁর তিনটি মূল্যবান সম্পত্তির মধ্যে দু’টি অর্জন করেছিলেন – এ্‌ তাঁর খানসামা আর দুই, প্ল্যান্টেশন। তৃতীয়জন হলেন তাঁর স্ত্রী। জেরাল্ড মনে করতেন ঈশ্বরের অপার করুণায় স্ত্রীকে তিনি লাভ করেছিলেন। 

পোর্ক – তাঁর খানসামা – নিকষ কালো, কিন্তু বেশবাসে ফিটফাট – একে জিতে ছিলেন সেন্ট সাইমন দ্বীপের এক প্ল্যান্টারের সঙ্গে সারা রাত পোকার খেলে। ধাপ্পাবাজীতে তিনি জেরাল্ডের থেকে কম যেতেন না। কিন্তু নিউ অরলিন্সের রাম হজম করার ক্ষমতায় জেরাল্ডের ধারে কাছেও যেতে পারেন নি। তিনি অবশ্য দ্বিগুণ মূল্যে পোর্ককে আবার কিনে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেরাল্ড কিছুতেই রাজী হন নি, সেটাই তাঁর প্রথম ক্রীতদাস। আর তাঁর স্বপ্নই ছিল অনেক ক্রীতদাসের আর বিস্তীর্ণ চাষযোগ্য জমির মালিক হওয়া। অবশ্য পরে বুঝেছিলেন যে পোর্ক হল সেই অঞ্চলের এক নম্বর খানসামা। 

জেমস আর এন্ড্রুসের মত সারাদিন দর কষাকষিতে ব্যস্ত থাকা কিংবা রাত্রে মোমবাতির আলোয় পাতার পর পাতা হিসেব মেলানো যে তিনি করবেন না এ ব্যাপারে তিনি মনস্থির করেই ফেলেছিলেন। তাঁর মনে হত, তাঁর দাদাদের মত যারা কারবার থেকে পয়সা উপার্জন করে তাঁদের সামাজিক অবস্থান যথেষ্ট সম্মানজনক নয়। তাই তিনি চেয়েছিলেন প্ল্যান্টার হতে। একজন পোড় খাওয়া আইরিশম্যানের মত –যাঁকে নিজের জমি হারিয়ে সেই জমিতেই বর্গাদার হিসেবে কাজ করতে হয়েছে – তিনি বিঘের পর বিঘে সবুজ শস্যক্ষেতের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। নিজের বাড়ি, নিজের প্ল্যান্টেশন, নিজের ক্রীতদাস, নিজের ঘোড়া - দৃঢ়ভাবে এবং অবিচল থেকে তিনি এইসব লক্ষ্যপূরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। এই নূতন দেশে অন্ততঃ দুটো বিপদের সম্ভাবনা নেই। এক, গলাকাটা কর, আর দুই, জমি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবার দুশ্চিন্তা। কিন্তু শুধু উচ্চাশা থাকলেই তো হবে না। সেটা পূরণ করার একটা পরিকল্পনা থাকাটাও প্রয়োজন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সত্যিটা তিনি উপলব্ধি করলেন। উপকূলবর্তি জর্জিয়াকে ধনী সম্প্রদায় যেভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন, তাতে এই লক্ষ্যপূরণ হওয়াটা বেশ দুষ্কর ছিল। 

খানিকটা ভাগ্যের জোরে, আর খানিকটা পোকার খেলার বিশেষ পারদর্শিতার জন্য একটা প্ল্যান্টেশন তিনি শীঘ্রই হস্তগত করে ফেললেন, পরে যেটার নামকরণ করেছিলেন টারা। তারপর তিনি উপকুল এলাকা ছেড়ে পাহাড়ি উত্তর জর্জিয়ায় চলে এলেন। 

বসন্তের এক উষ্ণ সন্ধ্যেবেলা স্যাভান্নার এক পানাগারে বসেছিলেন। এমন সময় কাছেই বসে থাকা এক অপরিচিত ব্যাক্তির কথোপকথন তাঁর কানে এল। বারো বছর দেশের মধ্যভাগে কাটিয়ে ভদ্রলোক সম্প্রতি স্যাভান্নায় ফিরে এসেছেন। জেরাল্ডের আমেরিকা আসবার এক বছর আগের কথা। সরকার মধ্য জর্জিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ইন্ডিয়ানদের থেকে দখল করে একটা লটারির মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে বিতরণ করেছিলেন। ভদ্রলোক সেই লটারিতে কিছু জমি পেয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি প্ল্যান্টেশন প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্ত দূর্ভাগ্যবশতঃ, তাঁর বাড়িটি আগুনে পুড়ে যায়। সেই ‘অভিশপ্ত জায়গাটি’ এখন তিনি যে কোন ভাবে হস্তান্তর করতে আগ্রহী। 

একটা প্ল্যান্টেশনের মালিক হবার অদম্য ইচ্ছে জেরাল্ডের মনে অনেকদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই যেচে সেই অপরিচিত ব্যক্তিটির সাথে গিয়ে আলাপ জমালেন। জানতে পারলেন ক্যারোলাইনা আর ভার্জিনিয়া থেকে অনেকেই উত্তরাঞ্চলে ভাগ্যানুসন্ধানে যাচ্ছে। তাঁর আগ্রহ আরও প্রবল হল। বহুদিন স্যাভান্নায় বসবাস করে জেরাল্ড বুঝতে পেরেছিলেন যে উপকূলবর্তি এলাকার তুলনায় জর্জিয়ার অন্য জায়গাগুলি ছিল অনগ্রসর। আর ইন্ডিয়ানদের উৎপাত তো লেগেই আছে। দাদাদের ব্যবসাসংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি মাঝেসাঝে অগাস্টায় গেছেন। স্যাভান্না নদী থেকে প্রায় একশ মাইল ভেতরে। সেখান থেকে আরও ভেতরে গিয়ে ছোট ছোট পশ্চিমের শহরগুলোও দেখে এসেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, সেখানকার বসতিও উপকূলবর্তি এলাকার বসতির মতই জমজমাট। কথাবার্তা থেকে আন্দাজ করলেন ভদ্রলোক যে সব জায়গার কথা বলছেন সেটা স্যাভান্না থেকে অন্ততঃ আড়াইশ মাইল ভেতরে। উত্তর এবং পশ্চিম প্রান্তে। চ্যাটাহূচি নদী থেকে খুব একটা দক্ষিণে নয়। জেরাল্ড জানতেন সেই নদী পেরিয়ে উত্তর দিকের অংশ এখনও চেরোকী জাতির দখলে। ইন্ডিয়ানদের নিয়ে কোন সমস্যা হয় কি না জানতে চাওয়ায় ভদ্রলোক জানালেন ওইসব জায়গায় নতুন শহর গড়ে উঠছে আর প্ল্যান্টেশনও শ্রীবৃদ্ধিলাভ করছে। 

প্রায় ঘন্টাখানেক পরে যখন কথাবার্তা ঝিমিয়ে এল, জেরাল্ড খুব নিরীহভাবে ভদ্রলোককে পোকার খেলার আহ্বান জানালেন। খেলা চলতে চলতে রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। প্রত্যেকের পেটেই বেশ কিছু তরল পানীয় গেছে। সবাই নিজের নিজের তাস টেবিলের ওপর রেখে হাত তুলে দিলেন। শুধু জেরাল্ড আর সেই ব্যক্তি তখনও পুরোদমে যুদ্ধ করে চলেছেন। ভদ্রলোকটি তাঁর পকেট থেকে পয়সাকড়ি বের করে টেবিলে রাখলেন। সব থেকে ওপরে রাখলেন তাঁর প্ল্যান্টেশনের দলিল। জেরাল্ডও তাঁর পকেট ঝেড়ে সব টাকা পয়সা বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। সবার ওপরে রাখলেন তাঁর টাকার থলি। অবশ্য ওই থলির মধ্যে যে টাকাকড়ি ছিল সেগুলোর মালিক যদি তাঁর দাদারাও হয়ে থাকেন, তাঁর জন্য তাঁর বিবেক খুব একটা দংশন করল না। মনের ইচ্ছে বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি সব থেকে সহজ রাস্তা বেছে নেওয়ারই পক্ষপাতী। এছাড়া নিজের ভাগ্য এবং জুয়া খেলার পারদর্শিতার ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল। হেরে গেলে দাদাদের এই টাকা কি ভাবে ফেরত দেবেন এই চিন্তা তাঁর মাথায় একবারও এলো না। 

“মনে করবেন না যে আপনি খুব জিতে গেলেন। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম যে আমাকে আর ওই জমির ওপর কর গুনতে হবে না। বাড়িটাও বছর খানেক আগে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চার দিক আগাছায় ভরা। যাই হোক জমিটা এখন আপনারই।” ভদ্রলোক কাগজ কলম আনতে বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। 

সে রাত্রে, যখন পোর্ক তাঁকে শোবার জন্য বিছানা তৈরি করে দিচ্ছিল, তখন জেরাল্ড খুব গুরুত্বসহকারে বোঝালেন, “তোর যদি আয়ার্ল্যান্ডের দেশী মদ খাবার অভ্যেস না থাকে, তাহলে তাস খেলার সময় কখনও হুইস্কি খাবি না।” নতুন মালিকের প্রতি সমীহ দেখিয়ে আর তাঁর পা থেকে জুতো খুলতে খুলতে, স্থানীয় ভাষায় অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে যে জবাব সে দিয়েছিল, সেটা বোঝার সাধ্য এই দুজন ছাড়া আর কারও ছিল না।

একদিকে পাইন গাছের সারি। অন্যদিকে ওক গাছের। আঙ্গুরলতার জট। মাঝখান দিয়ে ফ্লিন্ট নদীর কাদা মাখা জল নীরবে বয়ে চলেছে। সেই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে দুদিক থেকে যেন আলিঙ্গন করে রেখেছে। একটা ছোট ঢিপির ওপর দাঁড়িয়ে (যেখানে আগের বাড়িটি ছিল) জেরাল্ড সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর নবলব্ধ সম্পদ। দুদিকে সারিবদ্ধ গাছ তাঁর নিজের, পরিত্যক্ত ঘাসজমি তাঁর, এমনকি ম্যাগনোলিয়া গাছের সারির নিচে থেকে কোমর অবধি বেড়ে ওঠা আগাছাও তাঁরই। অকর্ষিত বিস্তীর্ণ জমি, পাইন গাছের সারি, তলায় লাল মাটিতে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ঝোপ – সবই জেরাল্ড ও’হারার সম্পত্তি। আইরীশ জেদের বশবর্তি হয়ে সর্বস্ব বাজী রাখার পুরষ্কার।

সেই অব্যবহৃত জমির সামনে দাঁড়িয়ে জেরাল্ড চোখ বন্ধ করলেন। এতদিনে তিনি যেন গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। কল্পনায় একটা সাদা চুনকাম করা বাড়ি দেখতে পেলেন। তাঁর বাড়ি। ঠিক যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই তৈরি হবে তাঁর স্বপ্নের সেই বাসস্থান। রাস্তার ওপারে গড়ে উঠবে তাঁর গোয়ালঘর আর আস্তাবল। আর পাহাড়ের কোল থেকে নদীর বুকে এসে পড়া একরের পর একর লাল মাটিতে হবে তুলোর চাষ, যাতে সূর্যের আলো পড়লে হাঁসের পালকের মত সাদা আলো ঝলমল করে উঠবে। ও’হারাদের ভাগ্য আবার ফিরে যাবে।

নিজের সামান্য সঞ্চয় ছিল। অনিচ্ছুক দাদারাও কিছু টাকা ধার দিলেন। জমি বন্ধক রেখেও কিছু টাকা জোগাড় হল। কয়েকজন দাস ক্রয় করে টারায় চলে এলেন। ওভারসিয়ারের পরিত্যক্ত চার কামরার বাড়িতে বানালেন সাময়িক বাসস্থান। তাঁর স্বপ্নের সাদা বাড়িটা শুধু তৈরি হওয়ার অপেক্ষা। 

মাঠ পরিষ্কার করিয়ে সেখানে তুলোর চাষ শুরু করলেন। জেমস আর এন্ড্রুসের কাছ থেকে আরো কিছু টাকা ধার নিলেন। আরো কয়েকজন দাস ক্রয় করার জন্য। ও’হারাদের মধ্যে গোষ্ঠিপ্রীতি প্রবল ছিল। ভাল-মন্দ সব সময়েই একে অন্যের পেছনে দাঁড়াত। তবে এর পেছনে বিশেষ কোন আবেগ কাজ করত না। অনেক দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে তাঁরা বুঝেছিলেন যে পারিবারিক ঐক্য বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই দুনিয়াকে মোকাবিলা করা সহজ হয়। তাঁরা জেরাল্ডকে টাকা ধার দিলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই জেরাল্ড সেই টাকা সুদে আসলে ফেরত দিয়ে দিলেন। উদ্বৃত্ত আয় থেকে ধীরে ধীরে আশেপাশের জমিগুলোও কিনে ফেললেন। তাঁর প্ল্যান্টেশনের সীমানা বাড়তে লাগল। সাদা বাড়িটাও এখন স্বপ্ন নয়। বাস্তব।

নদীর পাড় ধরে ঢালু সবুজ জমি। পুরনো ওক গাছে ঘেরা। সেই জমির ওপর তাঁর দাসেরা খোলামেলা একটা বাড়ি বানাল। ওক গাছের শাখা প্রশাখার স্নেহময় ছায়া দিয়ে ঘেরা। জেরাল্ড এখানে সুদূর অতীতের মমতার ছোঁয়া পান। ঝোপঝাড় সরিয়ে দিয়ে, বারমুডা ঘাস আর গুল্ম লাগিয়ে লনটাকে পুনরূদ্ধার করা হল। যাতে সেটার দেখভাল ঠিক মত হয় সেদিকেও জেরাল্ড নজর রাখলেন। সেডার গাছ আচ্ছাদিত ক্রীতদাসদের বাসস্থান। একটা স্থায়িত্বের সূচনা। ঘোড়ায় চড়ে ফেরার সময় দূর থেকে যখন তাঁর বাড়ির চূড়া দেখতে পেতেন, সবুজ বনানীর মধ্যে থেকে, গর্বে তাঁর বুক ফুলে উঠত। প্রত্যেকবারই নতুন করে দেখার আনন্দ তাঁকে পেয়ে বসত। 

সেই ছোট্ট, একগুঁয়ে মানুষ, জেরাল্ড শেষ পর্যন্ত করে দেখালেন!

প্রতিবেশীদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক। ব্যতিক্রম শুধু ম্যাকিন্টশরা। তাঁর জমির বাঁদিকে ওঁদের জমি। আর স্ল্যাটারিরা। তাঁর জমির ডান দিক থেকে নদীর ধারের জলা জমি আর জন উইল্কসদের প্ল্যান্টেশনের মধ্যে বিস্তৃত এঁদের তিন একর জমির সামান্য সম্বল। 

ম্যাকিন্টশেরা ছিলেন উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের অরেঞ্জ সম্প্রদায়ভুক্ত। তাঁদের যত গুণই থাকুক না কেন, জেরাল্ডের চোখে তাঁরা অত্যন্ত জঘন্য। এঁরা জর্জিয়ায় আছেন সত্তর বছর ধরে। তার আগে তাঁরা কয়েক পুরুষ ধরে ক্যারোলাইনাতেও থেকেছেন। তবু তাঁদের পূর্বপুরুষরা যে উলস্টারের লোক ছিলেন জেরাল্ড মনে করতেন এঁদের ঘৃণা করার জন্য সেটাই যথেষ্ট কারণ।

ওঁরাও ছিলেন খুবই স্বল্পভাষী এবং জেদী ধরনের মানুষ। বিয়েশাদীও নিজেদের আর ক্যারোলাইনার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যপারটা এরকম নয় যে জেরাল্ডই একমাত্র লোক যিনি এঁদের দেখতে পারতে না। আরও অনেকেই এঁদের সম্বন্ধে বিরূপ মনভাব পোষণ করতেন। এঁরা মিশুক লোক ছিলেন, কিন্তু মনে করতেন ম্যাকিন্টশদের মধ্যে সহনশীলতার খুব অভাব। বিশেষ করে একটা গুজব শোনা যেত যে ম্যাকিন্টশেরা নাকি ক্রীতদাসপ্রথা তুলে দেবার পক্ষে। পরিবারের যিনি কর্তা – অ্যাঙ্গাস – তিনি কাউকে ক্রীতদাসত্ব থেকে রেহাই দিয়েছেন বলে শোনা যায় নি। তাঁর কয়েকজন ক্রীতদাসকে কিছু বহিরাগত ক্রীতদাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রী করার মত ক্ষমার অযোগ্য অপরাধও তিনি করেছিলেন। তবু গুজবটা খুব ছড়িয়ে পড়েছিল।

“উনি যে ক্রীতদাস প্রথা বিলোপ করবার পক্ষে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই,” কথায় কথায় জেরাল্ড বলেছিলেন জন উইল্কসকে। “তবে কি জানেন, অরেঞ্জম্যানরা, নীতি আর স্বার্থের মধ্যে সংঘাতে নীতি বিসর্জন দিতে কখনওই পিছপা হয় না।”

স্ল্যাটেরিদের ব্যাপারটা আবার অন্য রকম। ওরা ছিলেন সাদা চামড়ার গরীব মানুষ। এর ফলে, ম্যাকিন্টশেরা প্রতিবেশীদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে সম্মান আদায় করতে পেরেছিলেন, স্ল্যাটেরিদের সে ক্ষমতা ছিল না। তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত অলস আর ঘ্যানঘ্যানে প্রকৃতির মানুষ। জেরাল্ড কিংবা জন উইল্কস অনেকবারই ওঁদের জমি কিনে নেবার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু স্ল্যাটেরি পরিবারের কর্তা প্রতিবারই সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে এসেছেন। তাঁর রুগ্ন চেহারার স্ত্রী অনেক হাড়জিরজিরে সন্তান-সন্ততির জন্ম দিয়েছেন। সন্তান-সন্ততির সংখ্যা প্রতি বছরই বেড়ে চলেছিল। টম স্ল্যাটেরির কোন ক্রীতদাস ছিল না। তিনি আর তাঁর বড় দুই ছেলে কখনসখনো নিজেরাই জমিতে তুলোর চাষ করতেন। তাঁর স্ত্রী অন্যান্য ছেলে মেয়েদের নিয়ে সব্জীর ক্ষেতের দেখভাল করতেন। অবশ্য সঠিক অর্থে সেটাকে এখন আর সব্জী ক্ষেত বলা যায় না। তুলোর উৎপাদন মোটেই ভাল হত না। আর শ্রীমতি স্ল্যাটেরি প্রায়ই গর্ভবতি থাকার জন্য সব্জীর ক্ষেতের ফলনের থেকেও ভরণপোষণ চালানো মুস্কিল ছিল।

টম স্ল্যাটেরিকে প্রায়ই তাঁর পড়শীদের আঙ্গিনায় গিয়ে তুলোর বীজ কিংবা পেট ভরাবার জন্য ‘অল্প’ মাংস ভিক্ষা করতে দেখা যেত। যেটুকু তেজ স্ল্যাটেরিদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল তাই দিয়ে তাঁরা পাড়া-পড়শীদের ঘৃণা করতেন, বিশেষ করে ধনী পড়শীদের ‘উন্নাসিক নিগ্রোদের’। কাউন্টির নিগ্রোরাও সাদা চামড়ার এই সব আবর্জনাদের বেশ অবজ্ঞার চোখে দেখত। স্ল্যাটেরিরা এদের হাবভাবে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যেতেন। কি খাবারদাবার, কি পোশাকপরিচ্ছদ, কি রোগে পড়লে বা বয়স হলে যত্নআত্তি, সব কিছুতেই নিগ্রোরা তাঁদের টেক্কা দিত! এরা এদের মালিকদের গর্বে গর্বিত, আর তাঁদের কিনা সমাজে ছিটেফোঁটাও সম্মান নেই!

ইচ্ছে করলে, টম স্ল্যাটেরি তাঁর জমি তিনগুণ দামে বিক্রী করে দিতে পারতেন। তাঁর প্রতিবেশীরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচতেন। যদিও তাঁর মনে হত বছরে এক গাঁট তুলো বিক্রী করে আর পড়শীদের কাছে চেয়েচিন্তে দিন গুজরান করা অনেক বেশী সুখের। 

এরা ছাড়া জেরাল্ডের সঙ্গে অন্য প্রতিবেশীদের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কারো কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। এই ছোট্ট মানুষটা যখন তাঁর বিশাল সাদা ঘোড়ায় চেপে যাতায়াত করতেন, তখন উইল্কসরা, ক্যাল্ভার্টরা, টারল্টনরা কিংবা ফোনটেনরা তাঁকে হেসে অভিবাদন করতেন। কখন কখনও বা একপাত্র পানীয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন। জেরাল্ডের প্রাণখোলা হাসি, সহানুভুতিশীল হৃদয়, খোলামেলা ব্যবহার, তাঁর চেঁচিয়ে কথা বলার অভ্যেস আর মেজাজকে ছাপিয়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই এঁদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। এই চরিত্রগুণ তাঁর মেয়েরা, কুকুরেরা আর দাসদাসীরাও বুঝে গেছিল।

যখন জেরাল্ড কোথাও যেতেন তখন বেশ একটা শোরগোল পড়ে যেত। তাঁর ঘোড়াকে ঘিরে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করত। ছোট ছোট কালো কালো ছেলেমেয়েরা ছুটে আসত তাঁকে দেখতে আর ঘোড়াটাকে একবার ছুঁয়ে দেখবার জন্য। তাঁর ভালোমানুষি বিদ্রূপকে কেউ গায়েও মাখত না। সাদা বাচ্চারা ঘোড়ায় চেপে ঘোরানোর বায়না করত। কৈশোরত্তীর্ণা মেয়েরা তাঁর কাছে নির্দ্বিধায় নিজেদের প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে পরামর্শ চাইত। আর বেহিসেবী দেনায় জড়িয়ে পড়ে সদ্য লায়েক হয়ে ওঠা ছেলেরাও সম্মান বাঁচানোর জন্য তাঁকেই ভরসা করত। 

“হতভাগা, এক মাস ধরে তুমি টাকাটা ফেরত দাও নি!” জেরাল্ড হুঙ্কার দিয়ে বলতেন। “তা কথাটা এতদিন চেপে রেখেছিলে কেন? আমাকে টাকার কথাটা বলতে কি হয়েছিল?”

তাঁর কথা বলবার রুক্ষভঙ্গীতে সবাই অভ্যস্ত ছিল। তাই কেউ কিছু মনে করত না। বরং ভয়ে ভয়ে হেসে বলত, “কি জানেন স্যর, আপনাকে এই সামান্য ব্যাপারে কষ্ট দিতে চাই নি। আর বাবা – জানেনই তো ______”

“তোমার বাবা যথেষ্ট ভদ্রলোক। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তবে একটু কড়া। টাকাটা রাখ। তবে আর কখন যেন না শুনতে পাই।” 

প্ল্যান্টারদের স্ত্রীরা অবশ্য অনেক পরে জেরাল্ডকে গ্রহণযোগ্য মানুষ বলে মনে করতে পারলেন। শ্রীমতি উইল্কসের সম্বন্ধে জেরাল্ড মনে করতেন “অসামান্য মহিলা যাঁর নীরবতা প্রশংসা করার মত।” একদিন সন্ধ্যেবেলা তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন, “উনি হয়ত একটু রুক্ষভাষী, কিন্তু নিপাট ভদ্রলোক।” সেদিন থেকেই জেরাল্ড আবালবৃদ্ধবনিতার স্বীকৃতি লাভ করলেন। 

তবে এই স্বীকৃতি পেতে পেতে দশটা বছর কেটে গেছে। জেরাল্ড জানতেও পারেন নি যে তাঁর প্রতিবেশীরা প্রতি মুহুর্তে তাঁকে যাচাই করে দেখে তবেই নিজেদের লোক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিজে অবশ্য প্রথম দিন থেকেই মনে করেছেন যে এ তাঁর নিজের জায়গা, আর এঁরা তাঁর নিজের লোক।

দেখতে দেখতে জেরাল্ড তেতাল্লিশ বছর বয়সে পা রাখলেন। পেশীবহুল চেহারা আর মুখের রক্তিমাভা দেখে তাঁকে একজন ছোটখাটো জমিদার বলেই মনে হয়। নিজেকে হঠাৎ খুব নিঃসঙ্গ বলে মনে হতে লাগল। মনে হল, তাঁর টারা, তাঁর বন্ধুবান্ধব, এসব যেন যথেষ্ট নয়। মনে হল একজন জীবনসঙ্গিনী না হলে পরিপূর্ণতা আসে না।

টারারও একজন কর্ত্রীর খুব প্রয়োজন। মাঠের কাজ থেকে তুলে এনে একজন নিগ্রো দাসকে রান্নার কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু তবুও সঠিক সময়ে খাবার পাওয়া যায় না। আরেকজন দাসীকে পরিচারিকার কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু তবু আসবাবপত্র ধূলিধূসরিত। যখন অতিথিরা আসেন তখন সাফ করবার জন্য হুলস্থূল পড়ে যায়। পোর্কই একমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরিচারক। তাঁর কাজ সাধারণ ভাবে সবার ওপর নজর রাখা। কিন্তু জেরাল্ডের ঢিলেঢালা স্বভাবের জন্য সেও আলসে হয়ে পড়েছে। অবশ্য জেরাল্ডের শোবার ঘর আর বিছানা পরিচ্ছন্ন রাখে, আর খাবার টেবিলের আদব কায়দাতেও কোন ত্রুটি রাখে না। বাকি সবই নিজের খেয়ালে চলছে। 

নির্ভুল আফ্রিকান প্রজ্ঞায় প্রত্যেক নিগ্রোই জেনে ফেলেছে যে জেরাল্ড যতটা গর্জান ততটা বর্ষান না। আর এই সুবিধেটা তারা হাড়ে হাড়ে উশুল করে নেয়। উনি প্রায়ই কাউকে না কাউকে বিক্রী করে দেবার হুমকি দেন, নয়ত চাবুক চালানোর ভয় দেখান। তবে এখন পর্যন্ত কাউকেই বিক্রী হতে হয় নি। আর চাবুক একবারই মাত্র চলেছে। সেটাও জেরাল্ডের প্রিয় ঘোড়াকে সারাদিনের শিকারের থেকে ফেরার পর ঠিকমত ডলাই মলাই করা হয় নি বলে।

জেরাল্ড লক্ষ্য করেছিলেন তাঁর প্রতিবেশীদের গৃহিণীরা কত দক্ষভাবে দাসদাসীদের পরিচালনা করে ঘরদোর ঝকঝকে রাখেন। এর জন্য এই সব মহিলাদের উদয়াস্ত কতখানি পরিশ্রম করতে হয় সে সম্বন্ধে অবশ্য তাঁর কোন আন্দাজ ছিল না। তিনি শুধু ফলাফলটা দেখতে পেতেন আর মুগ্ধ হতেন। 

অবশেষে একদিন সকালবেলা তিনি অনুভব করলেন যে একজন গৃহকর্ত্রীর খুব জরুরী প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সেদিন তাঁকে শহরে যেতে হবে আদালতের কাজে। তাই তৈরি হচ্ছিলেন। পোর্ক তাঁর পছন্দের শার্টটা নিয়ে এল, একেবারে দোমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায়। একমাত্র তাঁর পরিচারক ছাড়া সেটা আর কেউ পরার কথা ভাবতেই পারবে না।

“মিস্টার জেরাল্ড,” জেরাল্ডকে রেগে যেতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে পোর্ক বলল। “আপনার যেটা দরকার সেটা হল একজন গৃহিণী। এমন একজন গৃহিণী যাঁর বাড়িতে অনেক ‘নিগার’ আছে।”

জেরাল্ড পোর্কের প্রগলভতার জন্য ধমক লাগালেন। কিন্তু মনে মনে স্বীকার করলেন কথাটা ভুল নয়। তিনি নিশ্চয়ই একজন বউ চান, ছেলেমেয়ে চান। কিন্তু যদি এখনই কিছু না করেন, তাহলে অনেক দেরী হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি মিস্টার ক্যাল্ভার্টের মত যাকে তাকে বিয়ে করতে পারবেন না। মাতৃহীন ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত ইয়াঙ্কি গভর্নেসকেই বিয়ে করে ফেললেন। তাঁর স্ত্রীকে একজন লেডি হতে হবে আর শ্রীমতি উইল্কসের মত অভিজাত পরিবারের মেয়ে হতে হবে। আর টারাকে পরিচালনা করবার ক্ষমতা থাকতে হবে। যেমন শ্রীমতি উইল্কস তাঁর নিজের খাসতালুকে করে থাকেন।

দুটো অসুবিধে ছিল। এক, ওই অঞ্চলে বিবাহযোগ্যা মেয়ের অভাব। আর দুই, যদিও জেরাল্ড এখানে দশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, তবু তিনি এই অঞ্চলে ‘নতুন’ এবং সর্বোপরি বিদেশী। যদিও উপকূলবর্তি অভিজাত পরিবারগুলোর থেকে মধ্য জর্জিয়ার মানুষজন অনেক কম উন্নাসিক ছিল, তবুও কেউই তার মেয়েকে এমন কারও হাতে তুলে দিতে চায় না, যার পূর্বপুরুষের ইতিহাস সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা যায় না। 

জেরাল্ড ভাল করেই জানতেন কাউন্টির মানুষ তাঁকে পছন্দ করলেও – যাঁদের সঙ্গে তিনি শিকারে যাচ্ছেন, মদ্যপান করছেন, কিংবা রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন – তাঁরা কেউই তাঁকে কন্যা সম্প্রদান করতে এগিয়ে আসবেন না। ‘জেরাল্ড ও’হারাকে আমার মেয়ের সঙ্গে মাখামাখি করতে দিইনি’ এরকম ধরনের আলোচনা হোক, সেটাও তাঁর পছন্দ নয়। অবশ্য এর জন্য তাঁর কোন হীনমন্যতা জাগেনি। ব্যাপারটাকে এলাকার একটা উদ্ভট খেয়াল হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন। সৎপাত্র হিসেবে গণ্য হতে গেলে দক্ষিণদেশে বাইশ বছরের থেকে অনেক বেশি সময় অতিবাহিত করতে হবে, তাঁর নিজের জমি জায়গা এবং ক্রীতদাস থাকতে হবে, আর জুয়া খেলায় কেতাদুরস্ত হতে হবে। 

“জিনিসপত্র গুছিয়ে নে। আমরা স্যাভান্না যাব,” পোর্ককে বললেন জেরাল্ড। “আর শোন! বেফাঁস কথা একদম বলবি না। তাহলে কিন্তু তোকে বিক্রী করেই ছাড়ব।” 

হয়ত জেমস আর এন্ড্রুসের তাঁকে বিয়ের ব্যাপারে দু’চারটে উপদেশ দিতে পারতেন। হয়ত তাঁদের পুরনো বন্ধুবান্ধবদের বিবাহযোগ্যা কন্যা থাকলেও থাকতে পারে যে জেরাল্ডের মনোমত হবে আর তাঁরাও জেরাল্ডকে পাত্র হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি করবেন না। জেমস আর এন্ড্রুস খুব ধৈর্য ধরে তাঁর কথা শুনলেন, কিন্তু উৎসাহব্যাঞ্জক কোন কথা বললেন না। স্যাভান্নায় সাহায্য করবার মত সেরকম আত্মীয় স্বজন তাঁদের ছিল না। যখন তাঁরা আমেরিকায় এলেন সে সময় তাঁরা দুজনেই বিবাহিত। আর তাঁদের পুরোনো বন্ধুদের মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গেছে। এখন যে যার সন্তান প্রতিপালন করছে।

“তুই তো তেমন কিছু ধনী নোস। আর তোর খুব একটা বড় পরিবারও নেই,” জেমস বললেন।

“আমি কিছু পয়সা জমিয়েছি। আর আমি একটা বড় পরিবার তৈরি করে নিতে পারব। তবে আমি যাকেতাকে বিয়ে করতে পারব না।”

“ওরে বাবা, তোর তো খুব উঁচু নজর,” জেমস শুষ্কস্বরে বললেন।

তবে ওঁরা জেরাল্ডের জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখলেন না। জেমস আর এন্ড্রুস যথেষ্ট প্রবীন হয়েছেন আর স্যাভান্নায় সকলেই তাঁদের সমীহ করেন। বন্ধুবান্ধবও তাঁদের কম ছিল না। এক মাস ধরে তাঁরা জেরাল্ডকে নিয়ে সেই সব বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করলেন। নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ গ্রহন করলেন।

“একজনকেই আমার পছন্দ হয়েছে,” শেষমেশ জেরাল্ড বললেন। “অবশ্য যখন আমি এদেশে এলাম, তখনও তাঁর জন্মই হয় নি।” 

“কার কথা বলছিস, শুনি?”

“মিস এলেন রোবিল্যার,” কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললেন জেরাল্ড। এলেন রোবিল্যারের ঈষৎ তির্যক কিন্তু গভীর চক্ষুযুগল তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। মাত্র পনের বছরের একটা মেয়ের আচারে ব্যবহারে কেমন নিগুঢ় ঔদাসিন্য! তবু জেরাল্ড একেবারে মোহিত হয়ে গেছিলেন। মেয়েটির চোখের বিষাদগ্রস্ত চাহনি তাঁকে ব্যথিত করে তুলেছিল। আর ওর সাথে আলাপও করেছেন অত্যন্ত কোমল স্বরে। যেটা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। 

“আরে তুমি তো ওর বাবার বয়সী!”

“কিন্তু আমি তো যথেষ্ট শক্ত সবল রয়েছি!” জেরাল্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন।

জেমস শান্তভাবে বোঝাতে লাগলেন।

“জেরি, বুঝতে চেষ্টা কর। স্যাভান্নায় সব মেয়েদের থেকে এই মেয়েটির সঙ্গে তোমার বিয়ের সম্ভাবনা সব থেকে কম। ওর বাবা হলেন একজন রোবিল্যার। ওঁর রক্তে ফরাসী আভিজাত্যের অহঙ্কার। মেয়েটির মা – তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি – একজন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত মহিলা ছিলেন।”

“তাতে কিছু এসে যায় না,” জেরাল্ড বললেন খানিক উষ্মা নিয়ে। “মেয়েটির মা বেঁচে নেই। আর ওর বাবা – রোবিল্যার আমাকে পছন্দ করেন।”

“একজন কর্মঠ মানুষ হিসেবে নিশ্চয়ই। তবে জামাই হিসেবে নয়।”

“তাছাড়া মেয়েটাও রাজী হবে না,” এন্ড্রুস বলে উঠল। “ও তো ওর উড়নচণ্ডে পিসতুতো ভাই – ফিলিপ্স রোবিল্যার – ওকেই ভালবাসে। প্রায় বছরখানেক হল। অবশ্য ওর পরিবারের সবাই দিন রাত মেয়েটার পেছনে লেগে আছে ওকে ভুলে যাবার জন্য।”

“ও তো লুইসিয়ানায় চলে গেছে, এ মাসে, তাই না?” জেরাল্ড বললেন।

“তুমি কি করে জানো?”

“জানি,” জেরাল্ড বললেন। এই অমূল্য সংবাদটা যে পোর্ক জোগাড় করে এনেছে সেটা চেপে গেলেন। এটাও ফাঁস করলেন না যে ফিলিপ্স তার পরিবারের চাপেই পশ্চিমে চলে গেছে। “আমার মনে হয় না ওদের প্রেম এত গভীর ছিল না যে ওকে ভুলতে পারবে না। পনের বছর বয়সে ভালবাসার ব্যাপারে আর কতটুকুই বা ধারণা হতে পারে।”

“ওঁরা বরং ওই উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেটাকেই জামাই হিসেবে পছন্দ করবে তোমার চেয়ে।”


তারপর একদিন যখন জেমস আরে এন্ড্রুস যখন জানতে পারল যে পিয়ের রোবিল্যার তাঁর মেয়ের বিয়ে তাঁদের ছোটখাটো আইরীশম্যান ভাইয়ের সাথেই দিতে চলেছেন, তখন ওঁরা যার পর নাই বিস্মিত হলেন। স্যাভান্নার ঘরে ঘরে ফিলিপ্স রোবিল্যারকে নিয়ে নীরব গুঞ্জন ছিল। তাই কেউ ভেবেই পেল না যে রোবিল্যারদের সব থেকে কমনীয় মেয়েটির সাথে কি ভাবে অট্টভাষী লালমুখো জেরাল্ডের বিয়ে হবে, যে কি না আবার মেয়েটির থেকে অন্তত এক মাথা বেঁটে। 

জেরাল্ড নিজেও ব্যাপারটা এত সহজে মিটে যাবে ভাবতে পারন নি। তাঁর কাছে পুরো ঘটনাটাই অলৌকিক। যখন এলেন ম্লান কিন্তু শান্তভাবে তাঁর বাহুতে আলতো করে হাত রেখে বললেন, “আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজী আছি মিস্টার ও’হারা”, তখন বিনয়ে তাঁর বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিল। 

তড়িতাহত রোবিল্যাররা হয়ত আংশিকভাবে সিদ্ধান্তের কারণ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। শুধু এলেন আর তাঁর ম্যামিই জানতেন আসল ঘটনা। যেটা জানার পর সারা রাত এলেন এক অবোধ শিশুর মত ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে আকুল হয়েছিলেন। সকালে যখন সবার সামনে এলেন তখন তিনি মানসিক ভাবে প্রস্তুত এক নারী।

প্যাকেটটা নিউ অরলিয়েন্স থেকে এসেছিল। অচেনা হাতে এলেনের নাম লেখা। অশুভ কিছু আন্দাজ করেই দুরু দুরু বুকে ম্যামি তার কিশোরি কর্ত্রীকে প্যাকেটটা এনে দিয়েছিল। ওর থেকে বের হল এলেনের একটা ছোট্ট স্ট্যাচু, ওরই হাতে লেখা ফিলিপ্স রোবিল্যারকে উদ্দেশ্য করে চারটে কথা, আর নেউ অরলিয়েন্সের এক যাজকের কাছ থেকে একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি, যাতে তিনি জানিয়েছেন শুঁড়িখানায় মদ্যপ অবস্থায় মারামারি করে ফিলিপ্সের মৃত্যু হয়েছে। একটা আর্তনাদ করে এলেন জিনিসগুলো মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল।

“ওঁরা ওকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। বাপী আর পলিন আর ইউল্যালি! আমি ওঁদের ঘেন্না করি! ওঁদের সব্বাইকে ঘেন্না করি! আমি ওঁদের আর দেখতে চাই না। এমন জায়গায় চলে যেতে চাই, যেখানে ওঁদের মুখ আর কখনও দেখতে না হয়! এই শহরে – যাঁদের দেখলে ওর কথা মনে পড়ে যাবে – তাঁদের কারও মুখ দেখতে চাই না আমি!” 

ম্যামিও সারা রাত কেঁদেছিল। এলেনের কষ্ট ও সহ্য করতে পারছিল না। সকাল হবার মুখে ম্যামি বোঝাতে চেষ্টা করল, “সেটা কি করে হবে, সোনা?”

“হতেই হবে। উনি স্নেহশীল। আমি ওঁকেই বিয়ে করব। না হলে আমি চার্লসটনের মঠে চলে যাব।”

এই মঠে যাবার হুমকি কাজ করেছিল। হতভম্ব, ভগ্নহৃদয় পিয়ের রোবিল্যার বাধ্য হয়ে বিয়েটা মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর পরিবারের সকলে ক্যাথলিক হলেও তিনি মনে প্রাণে প্রেসবিটারিয়ান ছিলেন। মেয়ের মঠবাসিনী হওয়ার থেকে জেরাল্ড ও’হারাকে বিয়ে করা তাঁর কাছে শ্রেয়তর মনে হয়েছিল। পারিবারিক মর্যাদার অভাব ছাড়া মানুষটার বিরুদ্ধে বলবার মত আর কিছু নেই। 

অতএব, এলেন তাঁর মধ্যবয়সী স্বামীর সাথে স্যাভান্না ছেড়ে চলে গেলেন। এখন তিনি আর রোবিল্যার নন। তাঁর সাথে টারায় এল ম্যামি এবং আরো কুড়িজন নিগ্রো দাস-দাসী। আর কখনও ফিরে আসেন নি।

পরের বছর তাঁদের প্রথম সন্তানের জন্ম হল। জেরাল্ডের মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখা হল কেটি স্কারলেট। জেরাল্ড পুত্রসন্তান আশা করেছিলেন। তাই একটু নিরাশ হলেন। অবশ্য এতটা নয় যে তার প্রত্যেক দাস-দাসীদের ‘রাম’ পান করাতে কার্পণ্য করবেন। আর নিজেও আনন্দের আতিশয্যে প্রচুর পান করে বেহেড মাতাল হয়ে পড়লেন।

জেরাল্ডের বিয়ে করার সিদ্ধান্তে এলেনের কোন পশ্চাত্তাপ হয়েছিল কিনা কেউ জানে না, আর জেরাল্ড তো ননই। তবে জেরাল্ড স্ত্রীগর্বে অসম্ভব গর্বিত ছিলেন। শান্ত শহর স্যাভান্না ছেড়ে আসার সময়, এলেন তাঁর স্মৃতিগুলোও পেছনে ফেলে এসেছিলেন। উত্তর জর্জিয়া কাউন্টিতে পদার্পণ করার মুহুর্ত থেকেই এই জায়গাকেই নিজের দেশ বলে মেনে নিয়েছিলেন। 


শুধুমাত্র ফরাসি ঔপনিবেশিক শৈলীতে নির্মিত সুষমামণ্ডিত বিলাসবহুল বাসস্থান চিরতরে পেছনে ফেলে আসা নয়, তার আকৈশোরের পরিচিত পরিবেশ থেকেও নিজেকে দৃঢ়ভাবে বিছিন্ন করে ফেললেন। যে পরিবেশে এলে্ন সেটার বৈপরিত্য সাগর পার হওয়া প্রবাসের সঙ্গেই তুলনা করার মত। 

উত্তর জর্জিয়ার অসমতল ভূমি মানুষকে পরিশ্রমী হতে বাধ্য করেছে। মালভূমির সীমানা পেরিয়ে ব্লু রিজ পর্বতমালার পানে তাকালে পাহাড়ের পাদদেশে অসংখ্য গ্র্যানাইটের টিলা আর বড় বড় পাইন গাছের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে। তাঁর উপকূলবর্তি অঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সব কিছুই কেমন বন্য লাগে, কেমন অশান্ত লাগে। তিনি দেখেছেন জঙ্গলের শান্ত সৌন্দর্য, শৈবালে মোড়া সবুজ দ্বীপ, সাদা বালি ছড়ানো উষ্ণ বেলাভূমি আর তালগাছের সারি। 

গ্রীষ্মের কঠোর দাবদাহ আর তীব্র শীতের প্রকোপ, এখানে দুটোই প্রবল। এখানকার মানুষের প্রাণশক্তি আর ঔচ্ছ্বল্য, এলেনকে বিস্মিত করে। এঁরা উদার, সৌজন্যশীল এবং সহৃদয়। আবার পরিশ্রমী, অসহিষ্ণু আর সহজেই রেগে যান। বেলাভূমির মানুষ, ভাল মন্দ সব কিছুতেই ঔদাসিন্য দেখাতে অভ্যস্ত। অথচ এই উত্তর জর্জিয়ার মানুষের মনে একটা বন্যপ্রকৃতি কাজ করে। স্যাভান্নার জীবনে একটা স্থিতাবস্থা বিরাজ করে। উত্তর জর্জিয়ার জীবনযাত্রা তূলনামূলকভাবে নবীন আর প্রাণোচ্ছল আর চঞ্চল। 

স্যাভান্নার যে সমস্ত মানুষের সান্নিধ্যে এলেন এসেছেন, তাঁরা সকলেই যেন একই ছাঁচে তৈরি। তাঁদের জীবনচর্যা, দৃষ্টিভঙ্গী একই সুরে বাঁধা। এখানে প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট, অন্যের থেকে আলাদা। উত্তর জর্জিয়ার মানুষ আমেরিকার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। এখানে যেমন ক্যারোলাইনা আর ভার্জিনিয়া থেকে মানুষ এসেছেন, তেমনি ইউরোপ থেকেও বহু মানুষ এসেছেন। জেরাল্ডের মত অনেকেই আছেন যাঁরা এসেছেন ভাগ্য অন্বেষণের জন্য। আবার কেউ কেউ আছেন এলেনের মত, যাঁরা বনেদী বংশের সন্তান, কিন্তু পরিবার ছেড়ে দূরে চলে এসেছেন বৈচিত্রের সন্ধানে। আবার অনেকেই হয়ত বিনা কারণেই চলে এসেছেন, নতুন কিছু প্রবর্তন করার তাড়নায়। 

নানা ধরনের সংষ্কৃতি আর পটভূমির মানুষ এসে জড়ো হওয়ায়, এখানে বেশ একটা অনাড়ম্বর পরিবেশ তৈরি হতে পেরেছিল। এলেনের চোখে ব্যাপারটার মধ্যে একটা নতুনত্ব ছিল। উপকূলবর্তী মানুষের প্রতিক্রিয়া কোন পরিস্থিতিতে কেমন হবে সেটা আন্দাজ করা অনেক সহজ ছিল। এখানে সেটা আন্দাজ করা বেশ কঠিন, আর তাঁকে বুঝিয়ে দেবার কেউ ছিল না। 

তুলোর তখন প্রচুর চাহিদা। সারা বিশ্ব জুড়ে। আর তাই এই দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষরা দ্রূততার সঙ্গে স্বচ্ছল হয়ে উঠছিলেন। লাল মাটি থেকে উৎপন্ন তুলো ছিল সেই স্বছলতার হৃৎস্পন্দন। মাত্র এক পুরুষের পরিশ্রমেই তাঁরা ধনী হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে পুরুষানুক্রমে কি হতে পারে! 

একটা নিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি এখানকার মানুষজনকে উদ্বুদ্ধ করত। আর তারা জীবনটাকে উপভোগ করত খোলামেলা ভাবে। এই জীবনযাত্রা এলেনের কাছে অপরিচিত। এঁদের কাছে টাকাপয়সা আর ক্রীতদাস এত প্রভুত পরিমাণে ছিল যে এঁরা অবসর এবং খেলাদূলার অনেক সময় পেতেন আর সেটা উপভোগও করতেন। ওঁরা কখনই এত ব্যস্ত থাকতেন না যে ঘন ঘন শিকারে যাওয়া, কিংবা ঘোড়দৌড়ে অংশ নেওয়া কিংবা বারবেকিউর আয়োজন করতে পিছিয়ে থাকতেন। 

এলেন কোনদিনই পুরোপুরি এঁদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন নি। আসলে তাঁর অস্তিত্বের একটা বড় অংশই স্যাভান্নায় ত্যাগ করে এসেছিলেন। কিন্তু উনি এঁদের সারল্য, অকপটতা আর অমায়িকতাকে সম্মান করতে শিখেছিলেন। এঁদের মধ্যে কোনরকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল না, আর যে যেরকম তাকে সেভাবেই গ্রহণ করতে পারত। 

অল্প সময়েই তিনি কাউন্টির সবার ভালবাসা আদায় করে নিলেন। তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী। দয়ালু কর্ত্রী, স্নেহময়ী মা এবং একনিষ্ঠ স্ত্রী। অন্তরের যে বেদনা আর কর্তব্যপরায়ণতা তিনি চার্চকে সঁপে দিতে চেয়েছিলে, সেটা কাজে লাগল একজন মা হিসেবে, পরিবারের পেছনে আর তাঁর স্বামীর সেবায়। যে স্বামী তাঁকে স্যাভান্না থেকে বের করে আনতে পেরেছিলেন আর কোন অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে সেই বেদনাদায়ক স্মৃতিকে উস্কে দেবার চেষ্টা করেন নি। 

স্কারলেটের বয়স যখন এক বছর, আর ম্যামির মতে মেয়েদের যতখানি স্বাস্থ্যবতী হওয়া উচিত তার থেকেও বেশি স্বাস্থ্যবতী, তখন এলেনের দ্বিতীয় সন্তান সুসান এলিয়নরের জন্ম হল, যাকে সব সময়ই স্যুয়েলেন বলেই ডাকা হত। তারপর যথাসময়ে এলো ক্যারীন, পরিবারের বাইবেলে যার নাম লেখা হল ক্যারোলাইন আইরীন। এর পরে, পর পর তিনজন পুত্রসন্তান হল। কিন্ত দূর্ভাগ্যক্রমে, তিন জনেই, হাঁটতে শেখার আগেই বিদায় নিল। বাড়ি থেকে মাত্র একশ গজ দূরে, একটা সেডার গাছের তলায় তারা ঘুমিয়ে আছে। ‘জেরাল্ড ও’হারা, জুনিয়ার’ এই বলে তিনটে ফলকে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। 

এলেন যেদিন টারায় পা রাখলেন, সেদিন থেকে এখানে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল। মাত্র পনের বছর বয়স কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। তাঁকে শেখানো হয়েছিল, বিয়ের আগে মেয়েরা হবে, সুন্দরী, কমনীয়, শান্ত, আলঙ্কারিক। কিন্তু বিয়ের পরে তাঁদের একটা পরিবার চালাতে হবে, যেখানে সাদা কালো মিলিয়ে শতাধিক মানুষ থাকতে পারে। 

অন্যান্য অল্পবয়সী মেয়েদের মত এলেনও এই শিক্ষা পেয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি ম্যামিকে পেয়েছিলেন, যে অত্যন্ত অলস নিগ্রোর কাছ থেকেও কাজ আদায় করে নিতে পারে। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই, টারার শ্রী আর শৃঙ্খলা ফিরে এল। 

টারার বাড়িটার কোন ছিরিছাঁদ ছিল না। প্রয়োজনমত এখানে ওখানে ঘর তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এলেনের হস্তক্ষেপে এই অপরিকল্পিত গৃহও আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। জর্জিয়াতে সেডার গাছের শোভা ছাড়া কোন প্ল্যান্টারের বাড়িই সম্পূর্ণ হত না। বড় রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত সেডার গাছের সারি লাগিয়ে পথটাকে শীতল এবং ছায়াছন্ন করে তুললেন। এর ফলে চতুষ্পার্শের শ্যামলিমা আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠল। সাদা ইটের দেওয়ালের ওপর হালকা বেগুনি রঙের লতার আবরণ। দরজার পাশে মেদির ঝোপে হালকা গোলাপি ছোট ছোট ফুল। উঠোনে সাদা ম্যাগনোলিয়া ফুলের সমারোহ। সব মিলিয়ে বাড়িটার অনেক ত্রুটিই আড়াল হয়ে গেল।

বারমুডা ঘাসের লন আর ক্লোভার গুল্মের সমাবেশে, গ্রীষ্মে আর বসন্তে এক অনাবিল সবুজের জৌলুষ। জুঁই আর জিনিয়ার কুঁড়ি আর ফুলের লোভে লোভে বাড়ির পেছন থেকে টার্কি আর শ্বেতশুভ্র রাজহাঁসের দল প্যাঁক প্যাঁক করে বেরিয়ে চলে আসত। এগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একজন কালো পাহারাদার মোতায়েন করা হয়েছিল। একটা মোটা তোয়ালে নাড়িয়ে নাড়িয়ে সেই নিগ্রো শিশুটির কাজ ছিল এই দলকে কেয়ারির কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া। কিংবা মুখে আওয়াজ করে ওদের ভয় দেখানো। ওদের পেছনে ধাওয়া করে ধরবার অনুমতি না থাকায় শিশুটির মনের আসল ইচ্ছেটা অপূর্ণই থেকে যেত। 

এক ডজন শিশুকে এই দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছিল। টারাতে একজন পুরুষ ক্রীতদাসের এটাই প্রথম দায়িত্ব। তারপর যখন দশ বছর বয়স হত তাদের ‘বুড়োবাবা’র কাছে কাজ শিখতে পাঠানো হত। প্ল্যান্টেশনের মুচী। অথবা অ্যামোস নামে ছুতোরের কাছে। আর ছিল ফিলিপ, গোয়ালের তদারকির জন্য এবং কাফি নামে খচ্চর দেখভাল করবার ছেলে। এইসব কাজ শেখবার ঝোঁক যেসব শিশুদের মধ্যে থাকত না তাদের মাঠের কাজে সাহায্যের জন্য লাগানো হত। নিগ্রোদের চোখে এরা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার সুযোগ নষ্ট করল। 

এলেনের জীবনও খুব স্বস্তির বা খুব সুখের ছিল না। উনি অবশ্য স্বস্তির জীবন প্রত্যাশাও করেন নি। সুখের জীবন কি মেয়েমানুষের ভাগ্যে জোটে! বিশেষ করে যে সমাজ পুরুষের দ্বারা শাসিত। সেটা না মেনে তো কোন উপায় নেই। বিষয় সম্পত্তি কার নামে? পুরুষমানুষ। সেটা পরিচালনা করার দায়িত্ব? নারীর। সুনাম পুরুষদেরই প্রাপ্য। মহিলাদের কাজ তাঁদের বুদ্ধি বিবেচনার তারিফ করা। সামান্য আঙ্গুলের ব্যাথাতেই পুরুষ মানুষ কাতর হয়ে পড়েন। আর নারীরা প্রসববেদনা মুখ বুজে সহ্য করেন যাতে পুরুষ মানুষের অসুবিধে না হয়। মাতাল স্বামীর রুক্ষ কণ্ঠস্বরকে গায়ে না মেখে তাঁকে ধীরে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল স্ত্রীর কর্তব্য। পুরুষেরা অশিষ্ট এবং স্পষ্টভাষী। নারীরা কোমল, শান্ত এবং ক্ষমাশীল।

অসামান্যা মহিলাদের সান্নিধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছেন।, তাঁরা শিখিয়েছেন কিভাবে প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও নিজের মাধুর্য বজায় রাখতে হয়। তাঁর তিন মেয়েও এরকমই অসামান্যা নারী হয়ে উঠুক, এটাই তাঁর মনোগত বাসনা। তাঁর ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে খুব একটা অসুবিধে নেই। স্যুয়েলেন লেডি হয়ে ওঠার জন্য বদ্ধপরিকর। নিজেকে আকর্ষক করে তোলার জন্য মায়ের উপদেশ মন দিয়ে মেনে চলে। ক্যারীন স্বভাবতই লাজুক আর শান্ত। মুস্কিল হল স্কারলেটকে নিয়ে। ওর মধ্যে জেরাল্ডের স্বভাবটাই বেশি প্রকট। তাই তার কাছে লেডি হয়ে ওঠার ব্যাপারটা সহজ হল না। 

স্কারলেটের খেলাধূলার বন্ধুচয়ন ম্যামির কাছে বেশ শিরঃপীড়ার কারন হল। আশেপাশের নিগ্রো ছেলেমেয়েরা আর প্রতিবেশীদের ছেলেরাই তার বেশি পছন্দের খেলার সঙ্গী। নিজের বোনেদের কিংবা উইল্কস পরিবারের সুশিক্ষা প্রাপ্ত মেয়েদের প্রতি কোন আগ্রহই তার নেই। এলেনের কোন মেয়ে এরকম উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠবে ম্যামি সেটা একেবারেই মেনে নিতে পারত না। মাঝে মাঝেই বলতে বাধ্য হত, “একটু লেডিদের মত ব্যবহার কর।”। এলেন অবশ্য এতটা অসহিষ্ণু ছিলেন না। তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতেন। এই সব খেলার বন্ধুর থেকেই কোন একসময় মেয়েরা তাদের জীবনসঙ্গী বেছে নেয়, এটা তিনি জানতেন। মেয়েদের প্রথম কর্তব্য হল বিবাহিত হওয়া। মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দিতেন সবে তো শৈশব, একটু প্রাণোচ্ছ্বল এই যা। পুরুষদের চোখে কিভাবে লাবণ্যময় হয়ে উঠতে হয় সেটা শেখার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে। 

এলেন আর ম্যামি এটাই নজরে রাখছিলেন। স্কারলেট যত বড় হয়ে উঠতে লাগল, দেখা গেল এই লাবণ্যময়তার গুণটাই সে ভাল মত রপ্ত করে ফেলেছে। অন্য কোন ব্যাপারেই তার অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। বেশ কয়েকজন গৃহ শিক্ষয়িত্রীর প্রয়াস আর বছর দুয়েক ফেয়্যাটভিল ফিমেল অ্যাকাডেমিতে লেখাপড়া করা সত্ত্বেও তার শিক্ষাগ্রহণ অসম্পূর্ণই থেকে গেল। কাউন্টিতে তার মত চারুতার সাথে নাচে অংশ নিতে আর কোন মেয়ে পারে না। কিভাবে হাসলে তার গালে টোল পড়ে সে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে পুরুষের চোখে, সেটাও সে ভাল করেই জানে। এটাও জানে কিভাবে পায়রা পায়ে চললে তার স্কার্টের আন্দোলন পুরুষের বুকে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়েই মুখ নীচু করে চোখের পাতা পিট পিট করে ব্রীড়া প্রদর্শন। সব থেকে বেশি জানত কিভাবে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তাকে পুরষদের কাছে গোপন রেখে শিশুসুলভ সারল্য দেখিয়ে তাদের মন জয় করা যায়। 

যে সমস্ত গুণের সমাহারে একজন আদর্শ এবং কাম্য পত্নী হওয়া যায়, সেগুলো এলেন মৃদুস্বরে উপদেশ দিয়ে আর ম্যামি বকুনি দিয়ে স্কারলেটের মধ্যে সঞ্চারিত করবার চেষ্টা করতেন। 

“তোমাকে আরো শান্ত, আরো ধীর স্থির হতে হবে সোনা,” মেয়েকে বলেছিলেন এলেন। “ভদ্রলোকদের মুখের কথা কেটে কখনও কথা বলবে না। যদি তুমি সেই ব্যাপারে বেশি জান, তবুও। কোন ভদ্রলোকই মুখরা মেয়ে পছন্দ করেন না।” 

“অল্পবয়সী মেয়েরা যদি সব সময় ঘাড় আর থুতনি নেড়ে নিজের মত জাহির করতে থাকে ‘আমি তো এরকম করি’ বা ‘আমি একদম পছন্দ করি না’, তাহলে সেই মেয়েদের কপালে বর জোটে না, বুঝলে!” ম্যামি সাবধান করেছিল। “এরকম সময়ে তোমাকে চোখ নামিয়ে নিয়ে মিষ্টি করে বলতে হবে ‘আপনি ঠিকই বলেছেন স্যর’ অথবা ‘আমিও সেটাই চাই স্যর’।” 

দুজনে মিলে ওকে ভদ্রমহিলাকে কেমন হতে হবে শেখানোর চেষ্টা করতে থাকলেও, স্কারলেট কেবল শান্ত থাকার ভনিতাটুকুই রপ্ত করল। অন্তরের যে অনুভুতি থেকে চরিত্রের এই মাধুর্য উৎসারিত হবে সেটা ও শিখতে পারল না। আসলে শেখার প্রয়োজনই বোধ করল না। এতেই সে রীতিমত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এটাই তো সে চেয়েছিল। জেরাল্ড একবার গর্ব করে বলেছিলেন যে আশেপাশের পাঁচটা কাউন্টির মধ্যে স্কারলেটই হল সবথেকে সুন্দরী। কথাটা আংশিকভাবে হলেও সত্য। ওর পাণিগ্রহণের প্রস্তাব শুধু মাত্র নিকটস্থ যুবমণ্ডলী থেকেই নয় এমন কি অ্যাটলান্টা আর স্যাভান্না থেকেও আসত। 

এলেন আর ম্যামির প্রচেষ্টায়, ষোল বছর বয়সে, স্কারলেটকে খুবই সুন্দরী, কমনীয় আর আকর্ষক লাগত। কিন্তু আসলে সে ছিল অসম্ভব জেদী, দাম্ভিক আর একগুঁয়ে মেয়ে। আইরীশ বাবার বদমেজাজ সে ভাল মতই আয়ত্ব করেছিল। মায়ের মত নিঃস্বার্থ সহিষ্ণুতার প্রকাশ ছিল তার ভান। এলেন অবশ্য এই ছল চাতুরি বুঝতে পারেন নি। স্কারলেট মায়ের কাছে নিপাট ভাল মেয়েটি হয়ে থাকত। মা জানতেই পারতেন না যে তাঁর মেয়ে কত বদমেজাজি আর কেমন উচ্ছৃঙ্খল। মায়ের তীব্র ভর্ৎসনাকে স্কারলেট ভয় পেত। 

ম্যামির চোখকে ধোকা দেওয়া অবশ্য অত সহজ ছিল না। স্কারলেটকে মাঝে মাঝে হাতে নাতে ধরে ফেলত। এলেনের থেকে ম্যামির নজর অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ছিল। ম্যামিকে ও কখনই বেশি দিনের জন্য বোকা বানাতে পারত না। 

এই দুই স্নেহশীলা রমনী অবশ্য স্কারলেটের স্ফূর্তিবাজ প্রকৃতি, চপলতা আর মাধূর্যকে মোটেও অপছন্দ করতেন না। এইসব বৈশিষ্ট দক্ষিণের মহিলাদের কাছে গর্বের বিষয় ছিল। তবে স্কারলেটের মধ্যে জেরাল্ডের উদ্দাম আর উদ্ধত স্বভাবের প্রতিফলন ঘটেছে লক্ষ্য করেই ওঁদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। ওঁরা ভয় পেতেন যে বিয়ের বন্দোবস্ত পাকাপাকি করার আগেই, স্কারলেটের এই দোষগুলো সবার কাছে ধরা পড়ে যাবে। 

বিয়ে করার ভাবনা স্কারলেটের মধ্যেও এসেছিল। অ্যাশলেকে বিয়ে করতে হবে। আর এর জন্য তাকে যদি শান্ত হবার কিংবা নম্রতার অভিনয় করতে হয়, বা শিশুসুলভ সারল্য দেখাতে হয় – ছেলেদের মন পাওয়ার জন্য, তাহলে সেটাই ভাল। কেন যে ছেলেদের এরকম উদ্ভট পছন্দ, সেটা তার মাথাতে কিছুতেই ঢুকত না। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে যে ব্যাপারটা কাজ করে। এর গুঢ় কারনটা বোঝবার চেষ্টাই ও করে নি। মানব মনের জটিলতা – এমন কি নিজের মনের জটিলতাও – বোঝবার ধৈর্য তাঁর নেই। ও শুধু জানে যদি ও ‘এরকম এরকম’ পথে এগোয়, তাহলে অপর পক্ষ থেকে ‘এরকম এরকম’ প্রতিক্রিয়া পাবে। ঠিক অঙ্কের নিয়মে! আর যখন লেখাপড়া শিখত, অঙ্ক ব্যাপারটাই তাঁর কাছে সব চাইতে সহজ মনে হত। 

পুরুষদের মনস্তত্ব স্কারলেট যদি বা সামান্য বুঝত, মেয়েদের মনস্তত্ব সম্বন্ধে তার ধারণা আরও অস্পষ্ট ছিল। মেয়েদের সম্পর্কে তাঁর কোন আগ্রহই ছিল না। বান্ধবী বলতে সেরকম কেউ ওর কখনই ছিল না। সে জন্যে ওর মধ্যে কোন অভাববোধও ছিল না। ওর চোখে যে কোন নারী – নিজের বোনেরা সহ – তার স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ। মোহের জাল বিছিয়ে পুরুষদের বশ করাই সবার একমাত্র লক্ষ্য। 

সব মেয়েই – একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন তার মা।

এলেন ও’হারা আলাদা। স্কারলেটের ভাবনায় তার মা পবিত্রতার প্রতীক। অন্য কোন মানুষ তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। শিশু বয়সে ও প্রায়ই মায়ের সঙ্গে কুমারী মা মেরীকে মিলিয়ে ফেলত। বড় হয়ে এখন মনে হয় তার মা সত্যিই মা মেরীর থেকে কোন অংশে কম নন। ওর কাছে এলেন হলেন এক স্বর্গীয় নিরাপদ আশ্রয়। ওর মা হলেন ন্যায়, সত্য, স্নেহ আর অসীম জ্ঞানের সাক্ষাত প্রতিভূ – এক কথায় এক অসামান্যা নারী।

স্কারলেট মনে প্রাণে চাইত মায়ের মত হতে। মুশকিল হল ন্যায়সঙ্গত, সত্যবাদী আর নিঃস্বার্থ হতে গেলে জীবনের অনেক আনন্দই জলাঞ্জলি দিতে হয় আর একই সাথে অনেক প্রণয়ীকেও। জীবন এত ছোট যে এই সব সুখকর মুহুর্তগুলো ছাড়তেই ইচ্ছে হয় না। একদিন যখন ওর অ্যাশলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাবে তখন ও ঠিক এলেনের মত হয়ে যাবে। তার আগে অন্তত ....... 

ক্রমশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন