(৩)
এলেন ও’হারার বয়স বত্রিশ বছর এবং সেই
যুগের মানদণ্ডে মধ্যবয়ষ্কা একজন মহিলা যিনি ছ’টি সন্তানের জন্মদান করেছেন এবং তার
মধ্যে তিনটিকে কবরে শায়িত করেছেন। দীর্ঘাঙ্গী – ওঁর আড্ডাপ্রিয় খর্বকায় স্বামীর
তুলনায় প্রায় এক মাথা লম্বা, কিন্তু চারুতার সঙ্গে উনি নীরবে এমনভাবে চলাফেরা করেন
যে ওঁর উচ্চতা আলাদা করে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। কালো টাফেটা কাপড়ের ঊর্ধ্বাবরণ
থেকে উঠে আসা ওঁর গ্রীবা দুগ্ধফেননিভ, সুগঠিত এবং তন্বী, সূতির জালিকায় সংবৃত করে
রাখা সমৃদ্ধ কেশরাশির ভারে সর্বদা ঈষৎ হেলানো মনে হয়। ওঁর ফরাসী মাতা – যাঁর পিতামাতা ১৭৯১ সালের
বিপ্লবের সময় হাইতিতে পালিয়ে গেছিলেন – তাঁর কাছ থেকে উনি কালো পালক সমৃদ্ধ গভীর
তির্যক চোখ, এবং বিপুল কালো কেশের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। ওঁর
পিতা – যিনি নেপোলিয়নের বাহিনীর একজন সৈন্য ছিলেন – তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন উন্নত
নাসিকা, চৌকর হনু এবং ঈষৎ নম্র
কপোল যা ওঁর মুখের ভাবে কোমলতার ছোঁয়া এনে দিয়েছে। এলেনের চেহারায় যে ঔদ্ধত্যহীন, উদার,
বিষণ্ণ এবং রসবোধহীন আত্মাভিমানের ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়, সেসব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে
উনি নিজেই অর্জন করেছেন।
যদি ওঁর চোখে সামান্য দীপ্তি থাকত,
যদি ওঁর হাসিতে একটু সংবেদনশীল উষ্ণতা থাকত এবং ওঁর কণ্ঠস্বর স্বতঃস্ফূর্ত মাধূর্যের
সঙ্গে ওঁর পরিবার, ওঁর দাসদাসীদের কর্ণকুহরে বর্ষিত হত, তাহলে ওঁকে পরমাসুন্দরী একজন
মহিলা হিসেবে গণ্য করা যেত। কথা বলতেন উপকূলীয় জর্জিয়ার ঈষৎ জড়ানো টানে, স্বরবর্ণকে
যথাসম্ভব অগ্রাহ্য করে ব্যঞ্জনবর্ণের ওপর ঝোঁক দিয়ে এবং ফরাসী স্বরভঙ্গির অতি সামান্য
ছোঁয়া লাগিয়ে। এই কণ্ঠস্বর দাসদাসীদের আদেশ দেওয়ার জন্য বা শিশুদের তিরস্কার করার জন্যেও
কখনও উচ্চগ্রামে যেত না, তবুও এই কণ্ঠস্বরকে টারার সকলেই মান্য করে চলত, যদিও ওঁর স্বামীর
তর্জনগর্জন এবং হুঙ্কার সকলেই নীরবে অগ্রাহ্য করত।
যতদূর মনে করতে পারে, স্কারলেট ওর মা’কে
একই রকম দেখে আসছে, প্রশংসা বা তিরস্কার যাই হোক না কেন, সর্বদাই মৃদু এবং মধুর, জেরাল্ডের
সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক অত্যাবশ্যকতাও উনি অত্যন্ত দক্ষ হাতে এবং নির্বিকার চিত্তে
সামলে নেন, উনি সর্বদাই শান্ত, শিরদাঁড়া সর্বদাই ঋজু, এমনকি ওঁর তিনটি সন্তানের মৃত্যু
হওয়ার পরও উনি নিজেকে ভেঙ্গে পড়তে দেননি। স্কারলেট কখনোই ওর মা’কে চেয়ারে হেলান দিয়ে
বসতে দেখেনি। কখনো অলসভাবে বসে থাকতেও দেখেনি, অন্তত হাতে একটা সেলাইয়ের কাজ তো থাকতই,
কেবল খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া, বা যখন রুগির সেবা করতেন, বা প্ল্যান্টেশনের হিসেবরক্ষার
কাজে ব্যস্ত থাকতেন। সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে থাকলে সুক্ষ্ম এম্ব্রয়েডারির কাজ, কিন্তু অন্যান্য
সময় ওঁর হাতে থাকত হয় জেরাল্ডের লাট খাওয়া শার্ট, বা মেয়েদের ড্রেস অথবা দাসদাসীদের পোশাক। স্কারলেট তো সোনার অঙ্গুলিত্র ছাড়া মায়ের হাত কল্পনাই
করতে পারে না, কিংবা বাচ্চা নিগ্রো মেয়েটা সেলাইয়ের সুতো আর রোজ়উডের তৈরি সেলাইয়ের
বাক্স নিয়ে ওঁর পেছন পেছন ছুটছে না। গৃহস্থালীর কাজের তদারকির জন্য এলেনকে এঘর ওঘর
যেতে হত, যেমন বাসনপত্র ধোয়া, ঘরদোর ঝাড়াই পোঁছাই বা প্ল্যান্টেশনের জন্য পাইকারি হারে
কাপড় বোনানো।
কখনোই ওঁকে ওঁর অনাড়ম্বর গাম্ভীর্য
থেকে বিচ্যুত হতে দেখেনি, এমনকি ওঁর নিজস্ব আচার আচরণও ছিল সর্বৈব নিখুঁত, সে দিন কি
রাতের যে প্রহরেই হোক না কেন। এলেন যখন বলড্যান্সে
যাওয়ার জন্য সাজসজ্জা করেন, বা অতিথি অভ্যর্থনার জন্য, এমনকি জোনসবোরোতে কোনো কাজে
যেতে হলে, দুজন পরিচারিকার এবং ম্যামির প্রায়
দু’ঘন্টা সময় লাগে ওঁর পছন্দমত তৈরি করিয়ে দিতে, কিন্তু যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে
ওঁর দ্রুত প্রসাধন করে নেওয়ার ক্ষমতা সত্যিই অবাক করার মত।
স্কারলেটের কক্ষ হলের অপর প্রান্তে,
ওর মায়ের শয়নকক্ষের সামনাসামনি। ভোরবেলায় কাঠের পাটাতনের মেঝের ওপরে অনাবৃত কালো পায়ের
খসখস করে চলার শব্দ, মায়ের শয়নকক্ষে ত্বরিত করাঘাত, ভয়ার্ত চাপা নিগ্রো কণ্ঠ, শিশুবেলা
থেকেই স্কারলেট এসব শুনে অভ্যস্ত। সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা চুনকাম করা নিগ্রো কোয়ার্টারের
কোনও ক্যাবিনে হওয়া জন্ম, মৃত্যু বা অসুস্থ হওয়ার খবর আসত। শৈশবে প্রায়ই পা টিপে টিপে
দরজার সামনে গিয়ে সরু ফাটলে চোখ রেখে দেখতে পেত, এলেন অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন,
সেখান থেকে জেরাল্ডের অবিঘ্নিত নাসিকাগর্জন ভেসে আসছে, কারও হাতে দপদপ করে জ্বলতে থাকা
একটা মোমবাতি, এলেনের বাহুমূলে ধরা ঔষধের পেটিকা, কেশ পরিপাটি করে বাঁধা, কামিজের প্রতিটা
বোতাম ঠিক ভাবে লাগানো।
পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে
মায়ের দৃঢ় কিন্তু সহানুভূতিপূর্ণ চাপা কণ্ঠস্বর – “চুপ, বেশি আওয়াজ কোরো না! মিস্টার ও’হারা জেগে যাবেন।
ওদের শরীর এত খারাপ নয় যে মরে যাবে!” – সর্বদাই
স্কারলেটকে শান্তি দিয়েছে।
হ্যাঁ, এবার আবার পা টিপে টিপে বিছানায়
ফেরা যেতে পারে, এলেন যখন হাল ধরেছেন সব ঠিকই হবে।
একা হাতে (হয়ত বৃদ্ধ এবং তরুণ ডঃ ফোনটেনদের
অন্য জায়গায় তলব পেয়ে চলে যেতে হয়েছিল) সারা রাত জন্ম আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পরেও
যথারীতি ব্রেকফাস্টের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন, চোখের কোণে কালি পড়লেও হাবেভাবে ক্লান্তির
কোনও চিহ্ন ধরা পড়ত না। কমনীয়তার মধ্যেও ওঁর চরিত্রে ইস্পাত কঠিন এক দৃঢ়তা ছিল, যার
জন্য পরিবারের সবাই ওঁকে সমঝে চলত, এমনকি জেরাল্ড আর মেয়েরাও, যদিও জেরাল্ড মরে গেলেও
সেকথা স্বীকার করবেন না।
মাঝে মাঝে স্কারলেট রাতের বেলা চুপিচুপি
গিয়ে ওর তন্বী মায়ের কপোলে একটি চুম্বন এঁকে দিয়ে আসত, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ওঁর
অপরিসর কোমল ওষ্ঠটি লক্ষ্য করে মনে হত পৃথিবীর
সামান্যতম আঘাতও ওঁকে অতি সহজেই ব্যথিত করবে। অবাক হয়ে ভাবত এই ওষ্ঠ বালিকাসুলভ আবেগে
কখনও কি স্ফূরিত হয়েছে, কিংবা ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের সঙ্গে দীর্ঘ রাত্রির নির্জনতায় গোপন
কোনো কথা ভাগাভাগি করে নিয়েছে? না, সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। মা সর্বদা এরকমই ছিলেন – পরম ভরসার জায়গা, সর্ববেত্তা,
একমাত্র মানুষ যিনি সব প্রশ্নের উত্তর জানেন।
কিন্তু স্কারলেটের জানায় ভুল ছিল। বহু
বছর আগে স্যাভান্নার উপকূলীয় শহরের এলেন রোবিল্যার,
ঠিক পনেরো বছরের একটি কিশোরির মতই কারণে অকারণে খিলখিল করে হেসে উঠতেন। দীর্ঘ রাত্রিগুলো
বন্ধুদের সঙ্গে কানাকানি করতেন, সমস্ত গোপন কথা ভাগাভাগি করে নিতেন, কেবল একটি গোপন
কথা বাদে। সেই বছরেই জেরাল্ড ও’হারা – ওঁর চাইতে বয়সে যিনি আঠাশ বছরের বড় – ওঁর জীবনে
প্রবেশ করলেন, আর ওই একই বছরে কিশোরিবেলা আর অকীর্তিকর কাজ়িন ফিলিপ রোবিল্যার ওঁর
জীবন থেকে বিদায় নেন। অস্থির দৃষ্টি আর দুর্বৃত্ত
স্বভাবের ফিলিপ যখন স্যাভান্না ছেড়ে চিরতরে চলে যান, এলেনের হৃদয়ের দীপ্তিটাও সঙ্গে
নিয়ে যান, বক্রপদ আইরিশম্যান জেরাল্ডের যাঁকে বিবাহ করবেন তিনি একজন উত্তাপহীন জড়ে
পরিণত হয়েছেন।
তবে জেরাল্ডের কাছে সেটাই যথেষ্ট ছিল,
এই মেয়েটিকে বিবাহ করবার অবিশ্বাস্য সুযোগ লাভ করে উনি যারপরনাই বিহ্বল হয়ে পড়লেন। মেয়েটির মধ্যে থেকে
কিছু যদি হারিয়ে গিয়েও থাকে, সেটা তাঁর নজরে পড়ল না। খুবই বিচক্ষণ মানুষ জেরাল্ড, উনি
জানতেন যে ওঁর মত একজন অজ্ঞাতকূলশীল, মধ্যবিত্ত
অকুলীন আইরিশম্যানের পক্ষে উপকূল অঞ্চলের অন্যতম বিত্তশালী এবং দেমাকি পরিবারের কন্যাকে
লাভ করা প্রায় একটি অলৌকিক ঘটনাই বলা যেতে পারে।
কারণ জেরাল্ড ছিলেন একজন স্ব-প্রতিষ্ঠ মানুষ।
***
আয়ার্ল্যান্ড থেকে আমেরিকায় চলে আসার সময়
জেরাল্ডের বয়স ছিল একুশ বছর। আগেও ভাল এবং মন্দ অনেক আইরিশম্যানকে দেশ ছেড়ে পালাতে
হয়েছিল, জেরাল্ডকেও তাড়াহুড়ো করে দেশ ছাড়তে হল। অল্প কিছু কাপড়চোপড় আর রাহাখরচ বাদে বাড়তি দু’শিলিং
সম্বল করে এবং নিজের মাথা বাঁচাতে। ওঁর মাথার ওপর সরকার একটি মূল্য ধার্য করে রেখেছিল,
আর ওঁর মনে হয়েছিল অপরাধের তুলনায় মূল্যটা বেশ বেশি। মূর্তিমান শয়তান ব্রিটিশ সরকারের কাছে কোন অর্যাঞ্জম্যানের১
মাথার দাম এক হাজার পাউন্ড হতে পারে? একজন প্রবাসী জমিদারের গোমস্তার খুন হওয়া্কে ব্রিটিশ
সরকারের যদি এতই গুরুত্ব দেয়, তাহলে জেরাল্ড ও’হারারও সেখান থেকে অবিলম্বে সরে পড়াটাও
খুবই জরুরি। ঐ গোমস্তাকে উনি অবশ্যই ‘অর্যাঞ্জম্যানদের কলঙ্ক’ বলে গালি দিয়েছিলেন,
তাই বলে লোকটার ‘দ্য বয়েন ওয়াটার’ গানের কলি গেয়ে ওঁকে অপমান করার অধিকার জন্মে যায়
না!
বয়েনের যুদ্ধ২ একশ বছরেরও আগে
লড়া হয়েছিল, কিন্তু ও’হারা পরিবার আর তাঁদের প্রতিবেশীদের কাছে মনে হত যেন কালকের ঘটনা।
ওঁদের সমস্ত আশা আর স্বপ্ন সেদিনই ভেঙ্গে টুকরো
টুকরো হয়ে যায়। ওঁদের জমিজমা এবং টাকাকড়্
স্টুয়ার্ট বংশের যুবরাজের প্রাণভয়ে পালিয়ে
যাওয়ায়, ধুলোর মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। আর সেই সুযোগে অর্যাঞ্জের উইলিয়াম আর তাঁর ঘৃণিত
বাহিনী স্টুয়ার্টদের অনুগত আইরিশদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
এই জন্যই এবং আরও নানান কারণে জেরাল্ডের
পরিবার ওঁর কলহের মারাত্মক পরিণামকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, তবে একথা
মানলেন যে এর ফলে পরিস্থিতি ভয়ানক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অনেক বছর ধরেই ও’হারা পরিবার সরকার বিরোধী কার্যকলাপের জন্য স্থানীয়
ইংরেজ পুলিশবাহিনীর সন্দেহের তালিকায় ছিলেন, আর জেরাল্ডই প্রথম ও’হারা নন যিনি প্রশাসনের
চোখে ধুলো দিয়ে রাতের অন্ধকারে আয়ার্ল্যান্ড ত্যাগ করে পালিয়ে যান। ওঁর বড় দুই দাদা
– জেমস আর অ্যান্ড্র্যু – জেরাল্ডের স্মৃতিতে দুজন মুখে কুলুপ আঁটা দুই যুবক, যাঁরা
রাতের অন্ধকারে মাঝে মাঝেই রহস্যময় অভিযানে বেরিয়ে যেতেন এবং তারপর সপ্তাহভর তাঁদের
টিকিটি দেখা যেত না আর তাঁদের মা দুশ্চিন্তায় অধীর হয়ে থাকতেন। বেশ অনেকগুলো বছর আগেই
ওঁরা আমেরিকা চলে এসেছিলেন। ও’হারাদের শুয়োরের খোঁয়াড়ে মাটির নিচে চাপা দেওয়া কিছু
রাইফেল নাকি পাওয়া গেছিল। এখন ওঁরা স্যাভান্নায় সফল ব্যবসায়ী, “যদিও ঈশ্বরই
জানেন সেটা কোথায়” নিজের দুই জ্যেষ্ঠ পুত্রের উল্লেখ ওঁদের মা এইভাবেই করতেন। তরুণ
জেরাল্ডকেও সেখানেই পাঠানো হল।
গালের ওপর মায়ের এঁকে দেওয়া একটা ত্বরিত
চুম্বন আর কানে কানে বলা কিছু আশীর্বাণী আর
বিদায় কালে পিতার উপদেশ, “ভুলে যেও না তুমি কে আর পরের দয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না”,
এই মাত্র সম্বল করে জেরাল্ড ঘড় ছাড়লেন। ওঁর দীর্ঘকায় পাঁচ ভাই স্নেহমিশ্রিত প্রশংসার
হাসি দিয়ে ওঁকে বিদায় জানালেন, কারণ জেরাল্ডই ছিলেন পেশল পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান
এবং সবার চাইতে ছোটখাটো মানুষ।
ওঁর পাঁচ ভাই এবং বাবা সকলেই ছিলেন ছ’ফুটের
ওপর লম্বা এবং সেই মত চওড়া, কিন্তু কনিষ্ঠ জেরাল্ড, একুশ বছর বয়সে, জেনে গেছিলেন যে
পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি দৈর্ঘ্যই পরমেশ্বর তাঁর জন্য ধার্য করে দিয়েছেন। অবশ্য নিজের দৈর্ঘ্যের অভাব নিয়ে হা-হুতাশ করবার
মানুষ জেরাল্ড ছিলেন না, আর এটাও দেখেছিলেন কোনো কিছু হাশিল করার জন্য এই দৈর্ঘ্যের
অভাব কখনোই ওঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং নিজের শরীরের নিবিড় ক্ষুদ্রতাই ওঁকে ওঁর
নিজের মত হতে সাহায্য করেছিল, বেশ তাড়াতাড়িই উনি বুঝে ফেলেছিলেন, দীর্ঘদেহীদের সঙ্গে
লড়াই করতে হলে কষ্টসহিষ্ণু হতে হবে। আর জেরাল্ড
কষ্টসহিষ্ণু ছিলেন।
ওঁর দীর্ঘকায় ভাইয়েরা ছিলেন গম্ভীর এবং
শান্ত প্রকৃতির, যাদের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া অতীত পারিবারিক গৌরবের স্মৃতি নীরবে
দংশন করে চলত আর কখনোসখনো তিক্ততার সঙ্গে প্রকাশ পেত। জেরাল্ড যদি শক্তিশালী হতেন,
তাহলে অন্যান্য ও’হারাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অতি গোপনে সরকার বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পর্ক
স্থাপন করতেন। কিন্তু জেরাল্ড ছিলেন – ওঁর মায়ের স্নেহের সম্ভাষণে, “বাচাল আর গোঁয়ারগোবিন্দ”
– ছিলেন খুবই বদমেজাজি, কথায় কথায় হাত চলত, আর মাথার ছিটটা এত বড় ছিল যে মনে হত খালি
চোখেই সেটা দেখা যাবে। দীর্ঘকায় ও’হারাদের সঙ্গে উনি যখন সদম্ভে চলাফেরা করতেন ওঁকে
মনে হত একপাল পেল্লায় মোরগের মধ্যে একটা খর্বকায় কিন্তু তেজস্বী সহচর। ওঁরা ওঁকে ভালবাসতেন,
প্রশ্রয় দিতেন এবং ততটুকুই শাসন করতেন যতটুকু শাসন একজন শিশুকে করা হয় বিপথে যাওয়ার
হাত থেকে রক্ষা করতে।
আমেরিকায় পদার্পণ করার সময় নিজের শিক্ষাদীক্ষার
অপ্রতুলতা সম্বন্ধে জেরাল্ডের কোনও ধারণাই ছিল না। কেউ যদি ব্যাপারটা তাঁর নজরে এনেও
দিত, তাতেও ওঁর কিছুই আসত যেত না। ওঁর মা ওঁকে পড়তে শিখিয়েছিলেন, আর গোটা গোটা অক্ষরে
লিখতে শিখিয়েছিলেন। অংক করার ব্যাপারে খুব
পারদর্শী ছিলেন। এইটুকুই ছিল ওঁর
পুঁথিগত বিদ্যার দৌড়। সামুহিক উপাসনায় অংশ নেবার জন্য যেটুকু
প্রয়োজন সেটুকুর বাইরে উনি লাতিন জানতেন না, আর ইতিহাস বলতে বুঝতেন আয়ার্ল্যান্ডের
প্রতি নানান সময়ে যেসব অন্যায় আর অবিচার করা হয়েছে তার ফিরিস্তি। মূরের৩ কবিতা ছাড়া আর কারও কবিতা তিনি
জানতেন না, আর গান বলতে পরম্পরাগতভাবে নেমে আসা আয়ার্ল্যান্ডের লোকসংগীত। পুঁথিগত বিদ্যার দৌড়ে কেউ যদি ওঁর চেয়ে এগিয়ে থাকত,
তাঁকে উনি শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু নিজের পিছিয়ে থাকার জন্য কখনও হীনমন্যতা বোধ করেননি।
আর এই নতুন দেশে এসে কী দরকার ওই সব জ্ঞানের
যখন এই এঁদো জমিকে কাজে লাগিয়ে সব চেয়ে মূর্খ লোকটাও নিজের ভাগ্য বদলে ফেলছে? এখানে
প্রয়োজন শক্তসমর্থ লোকের যারা পরিশ্রম করতে ভয় পাবে না।
জেমস আর অ্যান্ড্যুও, স্যাভান্নায় নিজেদের
স্টোরে ওঁকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে, ওঁর শিক্ষার অভাবকে কোনও বাধা বলেই গণ্য করেননি।
ওঁর গোটা গোটা হাতের লেখা, নিখুঁত হিসেব করার
ক্ষমতা আর দরাদরি করার ব্যাপারে ওঁর বিচক্ষণ দক্ষতা, ওঁরা শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তার
বদলে তরুণ জেরাল্ড যদি সাহিত্য আর সংগীতে রুচি
রাখতেন, তাহলেই বরং ওঁরা নাক কুঁচকতেন। সেই শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমেরিকা আইরিশদের সাদর
অভ্যর্থনা জানাত। জেমস আর অ্যান্ড্র্যু, যাঁরা
শুরুতে স্যাভান্না থেকে বন্ধ ওয়াগন ভর্তি মাল নিয়ে জর্জিয়ার প্রত্যন্ত শহরে চালান দিতেন,
অতি অল্প দিনের মধ্যেই ফুলে ফেঁপে স্যাভান্নায় নিজেদের স্টোর খুলে বসলেন, আর জেরাল্ডও
তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলেন।
দক্ষিণ দেশ ওঁর ভাল লেগে গেল, আর কিছুদিনের
মধ্যেই, ওঁর নিজেরই বিবেচনায়, উনি হয়ে উঠলেন দক্ষিণের অধিবাসী। দক্ষিণ দেশের – এবং
দক্ষিণের অধিবাসীদের অধিকাংশ ক্রিয়াকলাপই ওঁর মগজে ঢুকত না; তবে তাঁর চরিত্রে ঐকান্তিকতার
অভাব ছিল না – ফলে ওই দেশের রীতিনীতি, আচার-বিচার নিজের মত করে উনি গ্রহণ করে নিলেন
– পোকার খেলা, ঘোড়দৌড়, গরম গরম রাজনীতি নিয়ে আলোচনা, ড্যুয়েল লড়বার রীতিনীতি, রাষ্ট্রের
অধিকার এবং কথায় কথায় ইয়াঙ্কিদের মুণ্ডপাত করা, ক্রীতদাস প্রথা এবং তুলো চাষের রমরমা,
বেহুদা সাদা চামড়ার লোকদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর মহিলাদের প্রতি অতিরঞ্জিত সৌজন্য
প্রদর্শন। তামাক চিবোনোর অভ্যেসটাও রপ্ত করে ফেলেছিলেন। হুইস্কি পানে তাঁকে আর রপ্ত
হতে হয়নি, হুইস্কি পানের অভ্যেস নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
জেরাল্ড অবশ্য জেরাল্ডই রয়ে গেলেন। তাঁর
অভ্যস্ত জীবনচর্যার বদল এল, বিশ্বাসও বদলে গেল, কিন্তু ধরণ ধারণের পরিবর্তন হল না,
যদি বদলে ফেলতে পারতেনও, তাহলেও বদলাতেন না। নিজেদের স্বর্গভূমি ছেড়ে, উৎকৃষ্ট অশ্বে
আরোহণ করে যেসব ধান এবং তুলোর প্ল্যান্টাররা স্যাভান্নায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাদের কথা
বলার মার্জিত মন্থর ভঙ্গি দেখে জেরাল্ড খুব মুগ্ধ হতেন, মুগ্ধ হতেন তাঁদের পেছন পেছন
আসা তুল্যরূপ মার্জিত মহিলাদের দেখে এবং সঙ্গে আসা ওয়াগন ভর্তি ক্রীতদাসদের সংখ্যা
দেখে। কিন্তু মার্জিত হয়ে ওঠা জেরাল্ডের ধাতেই
নেই। ওঁদের অলস, জড়ানো কণ্ঠস্বর ওঁর কানে মধু বর্ষণ করে, কিন্তু ওঁর নিজস্ব দ্রুতলয়
আইরিশ বাচনভঙ্গি ওঁকে ছেড়ে গেল না। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এঁরা যে উদাসীনতার সঙ্গে
অংশগ্রহণ করেন, কেবল একটা তাসের দানের ওপর সর্বস্ব – অর্থ, প্ল্যান্টেশন, বা ক্রীতদাস
– বাজি রাখার ঝুঁকি নেন, এবং লোকসান হলেও হাসিমুখে মেনে নেন, যেন নিগ্রো শিশুদের দিকে
কিছু পেনি ছড়িয়ে দি্যেছেন – এই মনোভাব জেরাল্ডের বেশ ভাল লাগে। কিন্তু দারিদ্র্য কাকে বলে জেরাল্ডের সেটা জানা আছে,
তাই এঁদের মত হাসিমুখে আর্থিক লোকসান নিয়ে কখনোই উদাসীনতা দেখাতে পারবেন না। এঁরা খুব হুল্লোড়ে জাতের, এই উপকূলীয় জর্জিয়ানরা
– এঁদের মৃদু কণ্ঠস্বর, কারণে অকারণে রেগে ওঠা এবং এঁদের আচরণের আকর্ষক অসঙ্গতির কারণে
জেরাল্ড এঁদের পছন্দই করতেন।
কিন্তু এই তরুণ আইরিশম্যান – যাঁর মধ্যে
চঞ্চল, অস্থির এক জীবনীশক্তি কাজ করত – সদ্য সদ্য এমন এক দেশ থেকে এসেছেন, যেখানে কুয়াশাচ্ছন্ন জলাভূমির আর্দ্র এবং শীতল বাতাস
গায়ে লাগলে জ্বরে পড়তে হয় না, আর ঠিক এই কারণেই উপক্রান্তীয় আবহাওয়া এবং ম্যালেরিয়া
রোগের আকরভূমির এই সমস্ত পরিশ্রমবিমুখ সদ্বংশীয় ব্যক্তিদের থেকে ওঁকে আলাদা করে রেখেছে।
এঁদের কাছ থেকে যা তাঁর কাছে প্রয়োজনীয়
বলে মনে হয়েছে শিখে নিতে দ্বিধা করেননি, অপ্রয়োজনীয় সব কিছু বাতিল করে দিয়েছেন। উনি
আবিষ্কার করলেন পোকার খেলাই হল দক্ষিণী পরম্পরাগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযোগী – পোকার
আর হুইস্কি পান করেও নিজেকে অটল রাখা; তাস খেলার ব্যপারে ওঁর সহজাত প্রতিভা এবং বাদামি
তরল জেরাল্ডকে তিনটের মধ্যে দুটো মূলবান সম্পদ ওঁর দখলে এনে দিয়েছিল – ওঁর খানসামা
আর ওঁর প্ল্যান্টেশন। শেষ মূলবান সম্পদ হলেন ওঁর স্ত্রী, জেরাল্ডের ধারণা কেবল মাত্র
ঈশ্বরের নিগূঢ় করুণা ব্যতিত তাঁকে লাভ করা ওঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ওঁর খানসামা – পোর্ক ওর নাম – পালিশ করা
কালো গায়ের রঙ, গ্রাম্ভারি আর পরিধানের সব রকম কলাকৌশলে নিপুণভাবে প্রশিক্ষিত – ওকে
লাভ করেছিলেন সেন্ট সাইমন্স আয়ল্যান্ডের এক প্ল্যান্টারের সঙ্গে সারা রাত পোকার খেলে।
ধাপ্পাবাজির হিম্মত দেখাতে উনি জেরাল্ডের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারলেও নিউ অরলিয়ান্সের
রাম-এর কাছে নতি স্বীকার করতেই হল। পোর্কের প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মালিক অবশ্য পরমুহূর্তেই
ওকে দ্বিগুণ মূল্যে পুনরায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জেরাল্ড অনড় হয়ে রইলেন – ওঁর
প্রথম নিজস্ব ক্রীতদাস, আর ওই ক্রিতদাসই – যার কিনা উপকূল অঞ্চলের সেরার সেরা খানসামা
বলে সুনাম – ওঁর স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। জেরাল্ড ক্রীতদাসের মালিক এবং একজন জমিদার
হতে চেয়েছিলেন।
জেরাল্ড মনস্থির করে ফেলেছিলেন, জেমস এবং
অ্যান্ড্র্যুর মত উনি দরাদরি করে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন না বা মোমবাতির আলোয় বসে সারা
রাত ধরে পাতার পর পাতা হিসেব মিলিয়ে যাবেন না। ওঁর ভাইয়েরা উপলব্ধি না করলেও উনি গভীরভাবে
বুঝতে পারলেন যে লেনদেনের কারবার করে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। জেরাল্ড একজন প্ল্যান্টার
হতে চাইলেন। পোড় খাওয়া বুভুক্ষু একজন আইরিশম্যানের মত – নিজের জমি হারিয়ে যাঁকে নিজের
জমিতেই বর্গাদার হিসেবে কাজ করতে হয়েছে – উনি বিঘের পর বিঘে সবুজ খেতের মালিক হওয়ার
স্বপ্ন দেখতেন। নিজের একটা ভিটে, একটা নিজস্ব প্ল্যান্টেশন, নিজস্ব কিছু ঘোড়া আর কিছু
ক্রীতদাসের মালিক হওয়া – এই উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মম একরোখা জেদের সঙ্গে সেই লক্ষ্যপূরণের প্রয়াস চালাতে লাগলেন।
আর এই নতুন দেশে, ওঁর ফেলে আসা দেশের দুটো বিপদের সম্ভাবনাই এখানে নেই – গলাকাটা খাজনা
মেটাবার দায়ে জমিজমা, ফসল বিকিয়ে যাবার ভয় নেই, আর নেই যখন তখন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
হওয়ার ভয়টাও। অতএব এই ঊচ্চাকাঙ্খা পূরণ করার জন্য উনি কোমর বাঁধলেন। তবে ঊচ্চাকাঙ্খা থাকা এবং সেটা বাস্তবায়িত করা দুটো
যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার সেটা কিছুদিন যেতে না যেতেই উনি বুঝতে পারলেন। উপকূলবর্তী
জর্জিয়াতে অভিজাতশ্রেণীর শিকড় এমন গভীরে চলে গেছে এবং এই অঞ্চলকে এমন কুক্ষিগত করে
রেখেছে যে সেখানে জায়গা করে নেওয়ার যে স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছেন সেটা সফল করা একপ্রকার
অসম্ভব।
অবশেষে কিছুটা ভাগ্যের জোরে আর তার সঙ্গে
পোকার খেলায় পারদর্শিতার জন্য একটা প্ল্যান্টেশন ওঁর দখলে চলে এল – পরে যেটার নাম উনি
টারা রেখেছিলেন – এবং উনি উপকূলীয় অঞ্চল ছেড়ে উত্তর জর্জিয়ার পাহাড়ি এলাকায় পাড়ি জমালেন।
স্যাভান্নার একটা পানশালায়, বসন্তকালের
এক তপ্ত সন্ধ্যায়, জেরাল্ডের থেকে সামান্য দূরে বসে থাকা অপরিচিত একজন ভদ্রলোকের কথাবার্তা
শুনতে পেয়ে উনি সচকিত হয়ে উঠলেন। সেই অপরিচিত ভদ্রলোক, স্যাভান্নারই স্থানীয় বাসিন্দা,
বারো বছর দেশের অভ্যন্তরে নানা জায়গায় ঘুরে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছেন। মধ্য জর্জিয়ার
বিরাট এক অঞ্চল, জেরাল্ডের আমেরিকায় পদার্পণ করার এক বছর আগে ইন্ডিয়ানরা হস্তান্তর
করে দিয়েছিল, লটারির মাধ্যমে রাষ্ট্র সেটা নাগরিকদের মধ্যে বিলি করে দেয়। এই ভদ্রলোক
সেই লটারির অন্যতম বিজেতা। উনি সেখানে গিয়ে একটা প্ল্যান্টেশন স্থাপন করেন;
কিন্তু ওঁর ভিটেবাড়িটা আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় আর উনিও ওই ‘অভিশপ্ত জায়গা’ নিয়ে হতাশ হয়ে
পড়েছেন আর যে করেই হোক ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারলেই উনি খুশি হন।
একটি প্ল্যান্টেশনের মালিক হবার স্বপ্ন
জেরাল্ডের মনে অহরহ ঘোরাফেরা করতে থাকত, তাই ওই অপরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে নিজে যেচে
আলাপ করলেন। ওঁর কাছ থেকে জানতে পারলেন কীভাবে ক্যারোলাইনা এবং ভার্জিনিয়া থেকে অনেক
মানুষই রাজ্যের উত্তরভাগে গিয়ে বসতি স্থাপন করছেন, এতে ওঁর আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। স্যাভান্নায়
বেশ অনেকদিন কাটানোর পরে উপকূল অঞ্চলের বাকি মানুষদের মতই তাঁরও ধারণা হয়েছিল যে রাজ্যের
অন্যান্য সব জায়গাই অনগ্রসর আর ইয়াঙ্কিদের অতর্কিত আক্রমণের ভয়ও আছে। ও’হারা ভাইদের
ব্যবসার কাজে জেরাল্ডকে অগাস্টায় যেতে হয়েছিল – স্যাভান্না নদী থেকে প্রায় একশ মাইল
দূরে – আর ভেতর ভেতর দিয়ে যাবার সময় পশিম দিকের অনেক পুরনো শহরের ওপর দিয়েই যেতে হয়েছিল।
ফলে ওই সব অঞ্চলও যে উপকূলবর্তী অঞ্চলের মত ঘন জনবসতিপূর্ণ, সেটা ওঁর জানা ছিল। কিন্তু
সেই আগন্তুকটির বর্ণনা অনুযায়ী, ওঁর প্ল্যান্টেশন
স্যাভান্নার উত্তর আর পশ্চিম থেকে থেকে দু’শ পঞ্চাশ মাইলের থেকেও বেশি ভেতরে আর চ্যাটাহুচি
নদী থেকে খুব বেশি দক্ষিণে নয়। জেরাল্ডের জানা
ছিল, সেই নদী পেরিয়ে উত্তরদিক এখনও চেরোকি৪ জাতির দখলে। ফলে ইন্ডিয়ানদের উৎপাত নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করায় ভদ্রলোক
কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলেন আর জানালেন যে ওই সব অঞ্চলে ক্রমে ক্রমে বর্ধিষ্ণু নগর গড়ে
উঠছে আর প্ল্যান্টেশনেরও সমৃদ্ধি ঘটছে।
ঘন্টাখানেক বাদে কথাবার্তা যখন একটু ঝিমিয়ে
এসেছে, জেরাল্ড ভদ্রলোকটিকে পোকার খেলার আহ্বান জানালেন, ওঁর সরল উজ্জ্বল নীল চাহনির
পেছনে যে কোনও ছলনা লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা ধরবার সাধ্য কারও নেই। রাত বাড়তে লাগল,
খেলার সাথে সাথে সুরাপানও চলতে থাকল, তারপর এক সময় সকলেই হাতের তাস ফেলে সরে গেল, কেবল
জেরাল্ড আর সেই আগন্তুক খেলা চালিয়ে গেলেন।
আগন্তুক পকেট থেকে সব কিছু বের করে
টেবিলের ওপর রাখলেন, তারপর প্ল্যান্টেশনের দলিলটাও। জেরাল্ডও সব কিছু বের টেবিলের ওপর
রাখলেন, সবার ওপরে রাখলেন তাঁর ওয়ালেট। সেই ওয়ালেটের টাকাকড়ি যদি কোনও গূঢ় কারণবশত
ওঁর ভাইদের ব্যবসার টাকা হয়েও থাকত, পরের দিন সকালে প্রার্থনার সময় স্বীকারোক্তি দিতে
গিয়ে খুব একটা সঙ্কোচ বোধ করতেন বলেও মনে হয় না।
উনি জানতেন ওঁর কী চাই, আর জেরাল্ড যখন কিছু চাইতেন তখন সেটা পাওয়ার জন্য সব
থেকে সোজা রাস্তাটাই বেছে নিতেন। তাছাড়া নিজের ভাগ্যের ওপর আর জুয়ো খেলার বিজ্ঞতা নিয়ে
আত্মবিশ্বাস এতটাই দৃঢ় ছিল যে জুয়োয় হেরে গেলে
সেই টাকা শোধ করবেন কীভাবে এই কথাটা ওঁকে একবারের তরেও নাড়া দেয়নি।
“বিরাট কিছু দাঁও মেরে নিলেন মনে করবেন
না যেন আর আমিও খুশি ওই জায়গার ওপর আমাকে আর খাজনা গুণতে হবে না,” বাজিমাৎ হওয়া মানুষটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তারপর কাগজ কলম নিয়ে আসতে বললেন। “বড় বাড়িটা এক বছর আগে পুড়ে
গেছে আর জমিটাও কাঁটা ঝোপ আর চারা পাইনে ভরে গেছে। তবে এখন ওসব আপনারই।”
“আইরিশ মদ খাওয়ায় হাতেখড়ি না হয়ে থাকলে খবর্দার তাসের সঙ্গে হুইস্কি মিলিয়ে
ফেলিস না,” সেদিন রাতেই পোর্ক যখন জেরাল্ডকে শোবার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছিল, খুব গম্ভীরভাবে
ওকে বললেন। নতুন মনিবের কেরামতিতে অবাক হয়ে পরম ভক্তিভরে খানসামা ওঁর পা থেকে জুতো
খুলে দিতে দিতে যথাযথ প্রত্যুত্তর দিয়েছিল, গীচ্চী৫ আর কাউন্টি মীথের জগাখিচুড়ি ভাষায়,
এই দুজনে ছাড়া আর কেউ সেটা শুনলে ধাঁধায় পড়ে যেত।
এক ধারে পাইনের জঙ্গল, অন্য ধারে আঙ্গুরলতায়
জট পাকিয়ে জলজ ওক গাছের সারি, তার মাঝখান দিয়ে নীরবে বয়ে চলেছে ফ্লিন্ট নদীর ঘোলাটে
জল – জেরাল্ডের নতুন জমিকে যেন দু’বাহু বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে রেখেছে। একটা ছোট টিলা –
যেখানে ভিটেবাড়িটা এক সময় দাঁড়িয়ে ছিল – তার ওপর দাঁড়িয়ে জেরাল্ডের মনে হল সবুজের এই
সুউচ্চ বেড় ওঁর মালিকানার দৃশ্যমান এবং নান্দনিক নজির, যেন এই বেড় নির্মাণ করে নিজেই
নিজের মালিকানা চিহ্নিত করে নিয়েছেন। পুড়ে যাওয়া ভিটেবাড়ির কালো হয়ে যাওয়া ভিতের ওপর
দাঁড়িয়ে বৃক্ষের সারির ভেতর দিয়ে রাস্তাটা যেখানে সুদূরে মিলিয়ে গেছে, সেদিকে তাকিয়ে
পুলকিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, এমন গভীর পুলক যেন ঈশ্বরের কাছে বারবার কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত
করেও আশ মিটতে চায় না। দু’পাশের সারিবদ্ধ গাছ
তাঁরই, ওই পরিত্যক্ত তৃণাবৃত ঘাসজমিও তাঁরই, শ্বেত-তারকাখচিত ম্যাগনোলিয়া গাছগুলো ঘিরে
যে কোমর সমান ঝোপ উঠেছে, সেসবের মালিকও তিনিই। এই অকর্ষিত মাটিতে পাইনের চারা আর কাঁটা
গাছের ঝোপ অনেক দূর পর্যন্ত লাল মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে – এই সব কিছুই জেরাল্ড ও’হারার
– এই সব কিছুই আজ ওঁর কারণ ওঁর কাঁধের ওপর বোকা না বনে যাওয়া একটি আইরিশ মস্তিষ্ক রয়েছে
আর তাসের দানে সর্বস্ব বাজি রাখার মত দুঃসাহস আছে।
জেরাল্ড চোখ মুদলেন, কাজে না লাগানো বিস্তীর্ণ
প্রান্তরের অসীম স্তব্ধতার মধ্যে অনুভব করলেন উনি যেন নিজের ভিটেয় এসেছেন। ওঁর পায়ের
তলার জমি থেকে চুনকাম করা ইটের একটা বাড়ি উঠবে। রাস্তার ওধারে নতুন করে বেড়া তুলে তৈরি
হবে সুস্থ গবাদি পশুদের রাখার জায়গা আর তেজি ঘোড়াদের আস্তাবল আর টিলার দিকে গড়িয়ে গিয়ে
উর্বর জলাভূমিতে পড়া এই লাল মাটি সূর্যের আলোয় হাঁসের সাদা পালকের মত ঝকঝক করবে – তুলো
– বিঘের পর বিঘে জুড়ে তুলোর সমুদ্র! ও’হারাদের ভাগ্যদেবী আবার মুখ তুলে চাইবেন!
নিজের যৎসামান্য সঞ্চয় আর অনুৎসাহী দাদাদের
কাছ থেকে যতটুকু ধার পাওয়া গেল আর জমি বন্ধক রেখে কিছু নগদ অর্থ – এসব মিলিয়ে জেরাল্ড
তাঁর প্রথম কয়েকজন খেত মজুর কিনে টারাতে এসে ওভারসিয়ারের চার কামরার কোয়ার্টারে উঠে
নিঃসঙ্গ অবিবাহিত জীবন অতিবাহিত করতে আরম্ভ করলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না টারার সাদা ইটের
দেওয়াল দেওয়া ভিটে খাড়া না হয়।
মাঠ পরিষ্কার করিয়ে তুলোর চারা লাগালেন
আর জেমস আর অ্যান্ড্র্যুর কাছ থেকে আরও টাকা ধার করলেন আরও কয়েকজন ক্রীতদাস কেনার জন্য।
ও’হারারা ছিলেন গোষ্ঠীভাবাপন্ন প্রজাতি, সমৃদ্ধি এবং দুর্দশা, দুটো ক্ষেত্রেই এঁরা
এঁকে অপরের পাশে দাঁড়ান, বিশেষ কোনও পারিবারিক মমত্ববোধ থেকে নয়, ধারাবাহিক প্রতিকূলতার
সম্মুখীন হয়ে ওঁরা বুঝে গিয়েছিলেন যে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে দুনিয়ার সামনে পারিবারিক
ঐক্য তুলে ধরাটা খুব জরুরি। ওঁরা জেরাল্ডকে টাকা ধার দিলেন এবং পরের কয়েক বছরে সেই
টাকা তাঁরা সুদ সমেত ফেরত পেয়ে গেলেন। ক্রমশ
সেই প্ল্যান্টেশনের পরিধি বৃদ্ধি পেতে লাগল, কারণ জেরাল্ড তাঁর জমির লাগোয়া জমিগুলো
কিনে নিতে লাগলেন আর এক সময় সাদা বাড়িটাও স্বপ্ন থেকে বাস্তবে পরিণত হল।
বাড়িটা তৈরি করা হল ক্রীতদাসদের লাগিয়ে,
খাপছাড়া, ছড়ানো ছিটোনো এক অট্টালিকা। সামনে দিয়ে ঢালু সবুজ তৃণভূমি নদীর দিকে চলে গেছে।
জেরাল্ডের খুব আনন্দ হল, কারণ নতুন হলেও সেই বাড়িতে সুদূর অতীতের মমতার ছোঁয়াটুকু যেন
পাওয়া যাচ্ছে। ইন্ডিয়ানদের আসা যাওয়ার সাক্ষী বুড়ো ওক গাছগুলো কাণ্ড প্রসারিত করে বাড়িটাকে
জড়িয়ে ধরেছে আর ছাদের ওপর ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া প্রদান করছে। লনটা, আগাছা সাফ করে পুনরুদ্ধার
করার পর, ক্লোভার আর বারমুডা ঘাসের ঘন আস্তরণে ঢেকে দেওয়া হল, সেটা যেন বহাল থাকে সেদিকে জেরাল্ড নজর রাখলেন। সেডারে
ছাওয়া পথ থেকে শুরু করে নিগ্রো কোয়ার্টারের সারিবদ্ধ সাদা কুটীর, টারার সর্বত্র একটা
দৃঢ়তা, একটা স্থিতিশীলতা, একটা স্থায়িত্ব বিরাজ করছে। ঘোড়ায় চড়ে যখনই রাস্তার বাঁক
নিয়ে সবুজ ডালপালার ফাঁক দিয়ে নিজের বাড়িটা দেখতে পেতেন, গর্বে ওঁর বুক ভরে উঠত, প্রতিবারই
মনে হত যেন প্রথমবার দেখছেন।
করে দেখাতে পেরেছেন উনি - ছোটখাটো, বদমেজাজি, তর্জনগর্জন করা জেরাল্ড।
কাউন্টিতে প্রত্যেক প্রতিবেশীর সঙ্গে ওঁর
সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর, ব্যতিক্রম কেবল ম্যাকিন্টশরা – যাঁদের জমি ওঁর জমির বাঁদিক থেকে
শুরু হয়েছে – আর স্ল্যাটারিরা – যাদের সর্বসাকুল্যে তিন বিঘে জমি জেরাল্ডের জমির ডান
দিক থেকে শুরু হয়ে নদী আর জন উইল্কস প্ল্যান্টেশনের মধ্যেকার ঢালু জলাভূমির দিকে চলে
গেছে।
ম্যাকিন্টশরা ছিলেন স্কচ-আইরিশ এবং অর্যাঞ্জম্যান।
ক্যাথলিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সমস্ত পবিত্র
রীতিনীতে যদি ওঁরা মেনেও চলেন, তবুও ওঁদের পূর্বসূরিদের পরম্পরাগত মতবাদের জন্যই জেরাল্ডের চোখে ওঁরা আজীবন ঘৃণ্যই থাকতেন।
এ কথা ঠিক যে ওঁরা গত সত্তর বছর ধরে জর্জিয়াতেই বসবাস করছেন, আর তারও আগে এক প্রজন্ম
ক্যারোলাইনাতেই কাটিয়ে এসেছেন, কিন্তু ওই পরিবারের যে মানুষটা প্রথম আমেরিকার মাটিতে
পা রেখেছিলেন তিনি যে উলস্টার থেকেই এসেছিলেন, সেটাই জেরাল্ডের কাছে ওঁদের অপছন্দ করার
যথেষ্ট কারণ বলে মনে হয়েছিল।
ওঁরা ছিলেন অত্যন্ত মিতবাক এবং একরোখা
এক পরিবার, নিজেদের নিয়েই থাকতেন আর ক্যারোলাইনার আত্মীয়স্বজন আর ওঁদের মধ্যে পারস্পরিক
বিবাহেরই চল ছিল। ওঁরা কেবল জেরাল্ডেরই চক্ষুশূল ছিলেন তা নয়, কাউন্টির অন্যরাও ওঁদের
পছন্দ করতেন না। কাউন্টির মানুষরা ছিলেন বন্ধুবৎসল এবং মিশুক প্রকৃতির, তাই কারোর মধ্যে
এই গুণের অভাব এঁদের সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। তাছাড়া অ্যাবলিশনিস্টদের৬ প্রতি
সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্যও ম্যাকিন্টশদের জনপ্রিয়তায় ঘা লেগেছিল। বুড়ো অ্যাঙ্গাস কখনোই
কোনো ক্রীতদাসকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেননি, এবং ল্যুইসিয়ানায় বেত চাষের জন্য কোনও ক্রীতদাসকে
ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেবার মত ক্ষমার অযোগ্য অপরাধও করেননি, কিন্তু
অপবাদটা থেকেই গেল।
“উনি যে একজন অ্যাবলিশনিস্ট তাতে সন্দেহের
কোনো অবকাশ নেই,” জেরাল্ড জন উইল্কসকে নিজের মতামত জানালেন। “তবে একজন অর্যাঞ্জম্যানের
কাছে নীতি আর স্কচ-প্রীতি – এই দুটোর মধ্যে যদি সংঘাত লাগে, তাহলে সে নীতিটাকেই বিসর্জন
দেবে।”
স্ল্যাটারিদের ব্যাপারটা আবার একটু অন্য
রকম। দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ হওয়ার ফলে, অ্যাঙ্গাস ম্যাকিন্টশের স্বাধীনচেতা ভাবকে যে অনুদার
সম্মানটুকু দেওয়া হত, এঁদের সেটুকুও দেওয়া হত না। জেরাল্ড আর জন উইল্কস বারংবার প্রস্তাব
দেওয়া সত্ত্বেও স্ল্যাটারি বুড়ো ওঁর সামান্য কয়েক বিঘা জমি নাছোড়বান্দার মত আঁকড়ে রেখেছিলেন।
অত্যন্ত অলস প্রকৃতির মানুন আর ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হা-হুতাশ করার স্বভাব। ওঁর স্ত্রী একজন জটি-বুড়ি, রুগ্ন আর রক্তশূন্য চেহারা,
আর এক পাল অস্থিচর্মশার গোমড়ামুখো সন্তানের জননী, ফি বছর এই পালের সংখ্যায় নিয়মিত বৃদ্ধি
ঘটে চলত। টম স্ল্যাটারির কোনও ক্রীতদাস ছিল না। ওঁর সব থেকে বড় দুই ছেলে বিক্ষিপ্তভাবে
নিজেদের সামান্য কয়েক বিঘা জমিতে তুলোর চাষ করত, আর ওঁর স্ত্রী বাদবাকি ছেলেমেয়েদের
নিয়ে – যেটাকে সবজি বাগান বলে ধরে নেওয়া হত – সেটার দেখাশোনা করতেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, তুলোর উৎপাদন সর্বদাই মার খেত,
আর মিসেজ় স্ল্যাটারি নিরন্তর গর্ভবতী হয়ে থাকার কারণে সবজি বাগানেও খুব একটা কিছু
ফলত না যাতে করে ওঁদের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান হতে পারে।
টম স্ল্যাটারি পড়শিদের দোরে দোরে ধর্না
দিয়ে বপন করার জন্য তুলো বীজ আর ‘খারাপ সময় কাটিয়ে ওঠার’ জন্য এক টুকরো বেকন ভিক্ষে
করছেন – এটা ছিল খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য। ওঁদের সৌজন্যের আড়ালে আসলে যে একটা অবজ্ঞা
লুকিয়ে আছে, এটা উপলব্ধি করে স্ল্যাটারি ওঁর পড়শিদের যারপরনাই ঘৃণা করতেন, বিশেষ করে
‘বিত্তশালীদের নাকউঁচু নিগারদের’। কাউন্টিতে গৃহস্থালীর কাজে লাগা নিগ্রোরা বেহুদা
শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় নিজেদের উন্নততর মনে করত। কোনো রকম রাখঢাক না করেই ওরা যখন ঘৃণার দৃষ্টিতে
ওঁকে দেখত, স্ল্যাটারির গায়ে হুল ফুটত, আর ওদের নিরাপদ অবস্থা দেখে হিংসে হত। নিজের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার তুলনায় ওরা পেটপুরে
খেতে পায়, ভাল পোশাক পরিচ্ছদ পরে, বয়সকালে কিংবা অসুস্থ হলে যত্ন পায়। নিজেদের মালিকদের
সুনাম নিয়ে ওদের খুব অহঙ্কার, অহঙ্কার এই কারণে যে ওদের মালিকরা অভিজাত ব্যক্তি হিসেবে
সমাজে সম্মান পেয়ে থাকেন, অথচ তিনি নিজে সকলেরই ঘৃণার পাত্র।
টম স্ল্যাটারি চাইলে খামারটা উনি তিনগুণ
দামে কাউন্টির যে কোনো প্ল্যান্টারের কাছে বিক্রি করে দিতে পারতেন। সেই প্ল্যান্টারও মনে করতেন যে তাঁর অর্থের সদ্ব্যবহার
হয়েছে কারণ একটা উৎপাতের হাত থেকে কাউন্টিকে বাঁচানো গেছে। কিন্তু বছরে এক গাঁঠরি তুলো
আর পড়শিদের বদান্যতার ওপর ভর করে কোনোরকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাতেই স্ল্যাটারি খুশি
ছিলেন।
কাউন্টির বাকি সকলের সঙ্গেই জেরাল্ডের
বন্ধুত্বপূর্ণ এবং কিছু পরিমাণে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উইল্কসরা, ক্যালভার্টরা, টার্লটনরা,
ফোনটেনরা সকলেই এই খর্বকায় মানুষটিকে ঘোড়ায় চড়ে নিজেদের ড্রাইভওয়ে ধরে আসতে দেখলেই
হেসে অভ্যর্থনা জানাতেন আর লম্বা গ্লাসে এক চায়ের চামচ চিনি আর চূর্ণ করা পুদিনা সহযোগে
আধ পেগ ব্যর্বন৭ পানের আহ্বান জানাতেন।
জেরাল্ড পছন্দ করা যায় এমন একজন মানুষ, তাছাড়া সকল শিশু, নিগ্রো আর কুকুর যেটা প্রথম
দর্শনেই বুঝে ফেলত, ওঁরাও ক্রমশ ধরে ফেললেন যে জেরাল্ডের ভেতরে সংবেদনশীল এক হৃদয় আছে,
দরদী এবং শোনার জন্য উৎসুক কান আছে, আর ওঁর হেড়ে গলা আর রুক্ষ আচরণের আড়ালে ওঁর মনটা
একেবারে খোলা খাতার মত উন্মুক্ত।
ওঁর আগমন সর্বদাই এক দঙ্গল কুকুরের ঘেউ
ঘেউ আর ছোট ছোট নিগ্রো শিশুর চেঁচামেচি দিয়ে হত, ওরা ওঁর কাছে আসার, ওঁর ঘোড়াকে একবার
ছুঁতে পারার সুযোগ পেতে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে করতে ছুটে আসত আর হাসিমুখে ওঁর ছদ্ম
রাগের বকাবকি শুনত, কেউ গায়েও মাখত না। শ্বেতাঙ্গ শিশুরা ওঁর হাঁটু ধরে বসার জন্য শোরগোল
করত আর দুলকি চালে চলবার জন্য বায়না ধরত, আর উনিও ওদের গুরুজনদের কাছে ইয়াঙ্কি নেতাদের
নিন্দে করে যেতেন; ওঁর বন্ধুবান্ধবদের কন্যারা নিজেদের প্রণয়ঘটিত ব্যাপারগুলো ওঁকে
চুপিচুপি বলত; আর পাড়ার যুবসমাজ, দেনায় জড়িয়ে পড়ার কথা নিজেদের পিতাদের কাছে কবুল করতে
ভয় পেলেও, জেরাল্ডের মধ্যে একজন দরদী বন্ধুর ঠিকানা পেয়েছিল।
“হতভাগা, তুমি এক মাস ধরে কথাটা চেপে রেখেছ!”
উনি ধমক দিয়ে বলবেন। “আর কী মনে করে আমার কাছ থেকে ধার নেবার প্রয়োজনটুকুও বোধ করনি
শুনি?”
ওঁর কথাবার্তার রুক্ষ ধরণে সকলে এতই অভ্যস্ত
হয়ে গেছিলেন যে কেউ কিছু মনে করতেন না। উলটে বরং তরুণ তুর্কিরা ভয়ে ভয়ে হেসে জবাব দেবে,
“আসলে কী জানেন, আপনাকে বিরক্ত করতে চাইছিলাম না, আর আমার বাপি – ”
“তোমার বাপি খুবই ভাল লোক, একথা অস্বীকার
করা যাবে না, তবে একটু কড়া এই যা। নাও এটা ধর, আর এই ব্যাপারে আর কোনো উচ্চবাচ্য যেন
শুনতে না পাই, বুঝলে?”
প্ল্যান্টারদের অন্দরমহল অবশ্য এত সহজেই
ওঁকে মেনে নিতে পারেননি। তবে যেদিন মিসেজ় উইল্কস – জেরাল্ডের ভাষায়, “একজন মহীয়সী
মহিলা যাঁর মধ্যে নীরবে থাকার বিরল ক্ষমতা আছে” – জেরাল্ডের ঘোড়া ওঁদের ড্রাইভওয়ে ধরে
আসতে দেখে স্বামীর কাছে স্বীকার করলেন, “কথাবার্তায় যদিও উনি খুবই কর্কশ কিন্তু অন্তর
থেকে মানুষটা একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক।” নিশ্চিতভাবে
জেরাল্ডের বিজয়রথ গন্তব্যে উপনীত হল।
গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে ইতিমধ্যে দশটা
বছর যে কেটে গেছে, জেরাল্ড খেয়ালই করেননি, কারণ উনি কখনো বুঝতেই পারেননি যে পড়শিরা
প্রথম প্রথম ওঁকে একটু বক্রদৃষ্টিতেই দেখেছেন। টারাতে পদার্পণ করার প্রথম দিন থেকেই
ওঁর মনে হয়েছে যে এটা ওঁর একান্ত আপনার জায়গা।
জেরাল্ডের বয়স যখন তেতাল্লিশ – পেশিবহুল
শরীর আর লাল টকটকে মুখের জন্য মনে হত একজন জমিদার শিকারে বের হয়েছেন –মনে একটা ভাবনা
এল – টারার গৃহ ওঁর খুবই প্রিয়, কাউন্টির যে কোনও গৃহেই উনি সাদর অভ্যর্থনা পেয়ে থাকেন
– কিন্তু একটা অভাব যেন থেকেই গেছে। েকজন গৃহিণীর অভাব থেকে গেছে।
টারার গৃহস্থালীতেও একজন গৃহকর্ত্রীর অভাব
অনুভূত হচ্ছিল। কাজ চালিয়ে নেওয়ার তাগিদে একজন মোটাসোটা, উঠোনে কাজ করা দাসীকে হেঁসেলের
দায়িত্ব সামলাতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কখনোই সময়ে খাবার পাওয়া যেত না। খেতের কাজ থেকে তুলে এনে এক দাসীকে পরিচারিকার কাজে
লাগানো হয়েছিল, কিন্তু আসবাবপত্রে ধুলো জমতেই থাকত আর একটা পরিষ্কার ঝাড়ন কখনোই ওর
হাতে পাওয়া যেত না, ফলে অতিথি আসার উপক্রম হলেই রীতিমত তোলপাড় পড়ে যেত। পোর্কই ছিল
ওখানে একমাত্র প্রশিক্ষিত নিগ্রো, অন্যান্য দাসদাসীদের ওপর খবর্দারি করার কাজ ওর, কিন্তু
ক্রমশ ওর মধ্যেও একটা ঢিলে ভাব চলে এসেছিল, বিশেষ করে বহু বছর ধরে জেরাল্ডের ঢিলেঢালা
চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে। চাপরাশি হিসেবে জেরাল্ডের শয়নকক্ষ গুছিয়ে রাখত, এবং একজন খানসামা হিসেবে খুব কেতাদুরস্তভাবে আহার
পরিবেশন করত। বাকি সমস্ত ব্যাপারেই ওর গা-ছাড়া একটা ভাব।
নির্ভুল আফ্রিকান প্রজ্ঞায় নিগ্রোরা বুঝে
ফেলেছিল যে জেরাল্ড যত গর্জান তত বর্ষাণ না, আর কামড়ে দেবার তো প্রশ্নই নেই, ফলে ওরা
ওঁর ভালোমানুষির নির্লজ্জ সুযোগ নিত। ক্রীতদাসদের প্রত্যন্ত দক্ষিণে বিক্রি করে দেওয়ার৮
বা চাবকে সিধে করে দেওয়ার হুমকিতে হাওয়া গরম হয়ে থাকত, বাস্তবে কিন্তু টারার একজন ক্রীতদাসকেও
বিক্রি করা হয়নি, আর চাবকে সিধে করে দেওয়ার ঘটনাও একবারই মাত্র ঘটেছিল, কারণ সারাদিন
শিকারে পরিশ্রান্ত জেরাল্ডের প্রিয় ঘোড়ার যত্ন করে দলাইমলাই করায় অবহেলা করা হয়েছিল।
জেরাল্ডের খরশান নীল চোখ লক্ষ্য করেছিল
যে প্রতিবেশীদের গৃহস্থালী কত দক্ষতার সঙ্গে চালানো হয় আর কী স্বচ্ছন্দভাবে মসৃণ-কেশ,
স্কার্ট পরিহিতা গৃহিণীরা তাঁদের দাসদাসীদের পরিচালনা করেন। এই সব মহিলাদের সকাল থেকে
রাত পর্যন্ত কত পরিশ্রম করতে হয় – হেঁশেল, উপচর্যা, সীবন, সাফ-সাফাই, এসবের তদারকিতে
সংসারে বাঁধা পড়ে থাকতে হয় – সেই ব্যাপারে জেরাল্ডের কিছুমাত্র ধারণা ছিল না, উনি কেবল
ফলাফলটাই দেখতে পেতেন, আর সেই ফলাফলই ওঁকে মুগ্ধ করত।
সেদিন ছিল আদালতে হাজিরা দেবার দিন, সকালবেলা জেরাল্ড সেখানে যাবারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন – একজন
গৃহিণীর যে আশু প্রয়োজন, সেটা সেদিনই ওঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ওঁর পছন্দের
শার্টটা পোর্ক নিয়ে এল, এমন লাট খেয়ে আছে, আর পরিচারিকা এতই আনাড়িভাবে রিফু করেছে যে
একমাত্র ওঁর চাপরাসি ছাড়া সেটা আর কারোর পরার যোগ্যই নয়।
“মিস্ট’ জেরাল্ড,” জেরাল্ডকে চটে উঠতে
দেখে শার্টটা পাট করতে করতে পোর্ক বলে উঠল, “আপনের কী দরকার জানেন – একটো বউ – একটো
বউ যার বাড়িতে অনেক চাকর-চাকরানি আছে।”
পোর্কের প্রগলভতার জন্য জেরাল্ড ওকে ভর্ৎসনা
করলেন, কিন্তু মনে মনে বুঝলেন কথাটা ও ঠিকই বলেছে। উনি একজন স্ত্রী চান, সন্তান চান,
আর সেটা এখনই না পেলে, অনেক দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু যাকে তাকে উনি বিয়ে করতে পারবেন না, মিস্টার
ক্যালভার্টের মত – মাতৃহীন শিশুদের জন্য যিনি ইয়াঙ্কি গভর্নেসকেই বিয়ে করে নিয়েছেন।
ওঁর স্ত্রীকে অবশ্যই একজন লেডি হতে হবে, এবং বংশমর্যাদা সম্পন্ন হতে হবে, রূপে গুণে
মিসেজ় উইল্কসের সমতুল হতে হবে আর মিসেজ় উইল্কস নিজের খাসতালুক যেমন সুন্দরভাবে পরিচালনা
করে, ওঁর স্ত্রীরও ঠিক সেইভাবে টারাকে পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
তবে কাউন্টির কোনও পরিবারের মধ্যে বিয়ে
হওয়ার ব্যাপারে দুটো অসুবিধে ছিল। প্রথমত, বিবাহযোগ্যা মেয়ের অভাব। আর দ্বিতীয়ত – এবং এই অসুবিধেটাই
অধিক গুরুতর – গত দশ বছর এখানে থাকার পরেও জেরাল্ড এখানকার ‘নতুন মানুষ’, তার ওপরে
আবার বিদেশি। ওঁর পরিবার সম্বন্ধে কারোরই কিছু জানা নেই। যদিও উপকূলীয় অভিজাতদের মত
জর্জিয়া ততটা দুর্ভেদ্য নয়, কিন্তু কোনও পরিবারই নিজের কন্যাকে এমন কারও হাতে তুলে
দিতে চাইবেন না যার ঠাকুর্দার ইতিহাস তাঁরা কিছুই জানেন না।
জেরাল্ড অবহিত ছিলেন যে কাউন্টির মানুষরা
– যাঁদের সাথে তিনি শিকারে যান, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন, যাঁরা তাঁকে সত্যি সত্যিই
পছন্দ করেন – তাঁদের মধ্যে এমন একজনও নেই যাঁর কন্যাকে তিনি বিয়ে করতে পারেন। আর কোনও
কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা সাপারের টেবিলে বসে বলাবলি করুন যে তিনি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গেই
জেরাল্ড ও’হারার তাঁর কন্যার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেটাও উনি
চান না। অবশ্য এটা উপলব্ধি করেও জেরাল্ড প্রতিবেশীদের
চেয়ে নিজেকে একবারের জন্যেও হীন মনে করলেন
না। উনি যে কোনও ব্যাপারে বা কারোর থেকে হীন,
এই কথা জেরাল্ড কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নন। কাউন্টির এই যে অদ্ভুত প্রথা, কন্যাদের
সেই পরিবারেই বিবাহ দেওয়া হয় যে পরিবার বাইশ বছরের থেকেও অনেক বেশি দিন দক্ষিণে বসবাস
করেছেন, জমিজমা এবং ক্রীতদাসের মালিক, এবং কেবলমাত্র কেতাদুরস্ত বদভ্যাসেই আসক্ত থেকেছেন।
“বাঁধাছাঁদা করে নে। স্যাভান্না যাচ্ছি
আমরা,” পোর্ককে হুকুম করলেন। “আর একটিবারের জন্যেও যদি দিব্যি গেলে কথা বলতে শুনেছি,
তাহলে তোকে হাটে বিক্রি করেই ছাড়ব, আমি নিজেই ওই ধরণের দিব্যি কমই গালি।”
জেমস আর অ্যান্ড্র্যু হয়ত ওঁর বিয়ের ব্যাপারে কিছু পরামর্শ
দিতে পারতেন, আর ওঁদের পুরনো বন্ধুবান্ধবদের অনেকেরই হয়ত মেয়ে আছে যারা জেরাল্ডের চাহিদা
পূরণ করতে সক্ষম এবং ওদেরও জেরাল্ডকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি হত না। জেমস আর অ্যান্ড্র্যু খুব ধৈর্য ধরে ওঁর বক্তব্য
শুনলেন তবে খুব একটা উৎসাহ প্রদান করলেন না। স্যাভান্নায় ওঁদের তেমন কোনো আত্মীয়পরিজন নেই যাঁদের
কাছে ওঁরা সাহায্য চাইতে পারেন, কারণ তাঁরা বিয়ে করেই আমেরিকাতে এসেছিলেন। পুরনো বন্ধুদের মেয়েদেরও বহুদিন হল বিয়ে হয়ে গেছে
আর তারা নিজেরাই এখন শিশু প্রতিপালনে ব্যস্ত।
“দ্যাখ, তুই তো খুব কিছু বড়লোক নোস আর
তেমন বলবার মত বড় পরিবারও তোর নেই,” জেমস বললেন।
“কিছু টাকাকড়ি আমি জমিয়েছি আর বড় একটা
পরিবারও আমি বানিয়ে নিতে পারি। তবে যাকেতাকে আমি বিয়ে করতে পারব না।”
“ওরে বাবা, তোর নজর দেখছি আকাশে লাগিয়ে
আছিস,” অ্যান্ড্র্যু শুকনো গলায় বললেন।
তবে জেরাল্ডের জন্য চেষ্টার ওঁরা কোনও
ত্রুটি রাখলেন না, কারণ বয়সে ওঁরা যথেষ্ট প্রবীণ, আর স্যাভান্নার মানুষ ওঁদের মান্যগণ্যও
করেন। বন্ধুবান্ধবদের সংখ্যাও কম নয়, মাসখানেক ধরে জেরাল্ডকে অনেকের সঙ্গেই দেখা করতে
নিয়ে গেলেন – সাপারে, নাচের আসরে, চড়ুইভাতিতে।
“এদের একজনকেই আমার মনে ধরেছে,” জেরাল্ড
চূড়ান্ত মতামত জানালেন। “তবে আমি যখন এদেশে এসেছিলাম তখনও ওর জন্মই হয়নি।”
“তা কাকে তোর মনে ধরেছে শুনি?”
“মিস এলেন রোবিল্যারকে,” কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব
উদাসীন রেখে জেরাল্ড বলার চেষ্টা করলেন, কারণ এলেন রোবিল্যারের ঈষৎ তির্যক কালো চোখদুটো
শুধু মনে ধরার থেকেও ওঁকে বেশি প্রলুব্ধ করেছিল। আচার আচরণে এক রহস্যময় ঔদাসীন্য – যা কিনা পনেরো
বছরের এক বালিকার পক্ষে একটু অভাবনীয়ই – তা সত্ত্বেও সেই বালিকা জেরাল্ডের হৃদয়কে দোলায়িত
করতে পেরেছিল। তাছাড়া মেয়েটির চোখের বিষণ্ণ হতাশ দৃষ্টি ওঁর হৃদয়কে ব্যথিত করে তুলেছিল।
ফলে স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষতার পরিবর্তে মেয়েটি সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত কোমল আর সহৃদয়।
“বলিস কী রে, তুই তো ওর বাপের বয়সী!”
“কেন? আমি বেশ শক্ত সমর্থ রয়েছি,” জেরাল্ড
আহত স্বরে বলে উঠলেন।
জেমস খুব শান্তস্বরে বলতে আরম্ভ করলেন।
“শোন, জেরি, স্যাভান্নায় আর একটাও মেয়ে
নেই যাকে তোর বিয়ে করবার সম্ভাবনা ওকে বিয়ে করার চেয়ে কম। ওর বাবা একজন রোবিল্যার, আর ওই সব ফরাসি লোকগুলো
অসম্ভব দাম্ভিক হয়। আর মেয়েটার মা – ঈশ্বর
তাঁর আত্মাকে শান্তি প্রদান করুন – অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত একজন মহিলা ছিলেন।”
“কিস্যু এসে যায় না আমার,” জেরাল্ড রেগে
উঠলেন। তাছাড়া ওর মা বেঁচে নেই, আর রোবিল্যার বুড়ো আমাকে পছন্দই করেন।”
“একজন কর্মঠ পুরুষমানুষ হিসেবে অবশ্যই,
তবে জামাই হিসেবে নয়।”
“তাছাড়া মেয়েটাও তোকে বিয়ে করতে চাইবে
না,” অ্যান্ড্র্যু কথার মাঝখানে বলে উঠলেন। ওর সেই উড়নচণ্ডে কাজ়িন, ফিলিপ রোবিল্যার,
গত এক বছর ধরে মেয়েটা ওকেই ভালবাসে, যদিও ওর পরিবারের লোকেরা সকাল সন্ধে ওর পেছনে লেগেছিল,
ছেলেটাকে ভুলে যাবার জন্য।”
“এই মাসেই ও ল্যুইসিয়ানা চলে গেছে,” জেরাল্ড
বললেন।
“তুই কী করে জানলি?”
“জানি আমি,” জেরাল্ড জবাব দিলেন, তবে এই
অতি মূল্যবান খবরটা যে পোর্ক ওঁকে দিয়েছে বা ফিলিপ যে পরিবারের চাপেই পশ্চিমে চলে যেতে
বাধ্য হয়েছে, সেসব কথা আর ভেঙ্গে বললেন না। “তাছাড়া আমার মনে হয় না যে ওর ভালবাসা এতটাই
গভীর যে ওকে ভুলতে পারবে না। ভালবাসা জিনিসটা ঠিকমত বুঝে ওঠার জন্য পনেরো বছর বয়সটা
খুবই অল্প।”
“তোর হাতে মেয়েকে তুলে দেওয়ার চেয়ে ওঁরা
বরং ঐ উচ্ছন্নে যাওয়া ছোকরাকেই বেশি পছন্দ করবেন।”
অতএব যখন জানতে পারলেন যে পিয়ের রোবিল্যার
তাঁর মেয়েকে পশ্চিমা ছোটখাটো এই আইরিশম্যানের হাতেই সম্প্রদান করতে চলেছেন, তখন জেমস
আর অ্যান্ড্র্যু যারপরনাই চমকিত হলেন। স্যাভান্নার ঘরে ঘরে, দরজার আড়ালে আড়ালে, ফিলিপ
রোবিল্যার – যে কিনা পশ্চিমে পাড়ি জমিয়েছে, তাঁকে নিয়ে অনেক রকম কানাঘুষো চলতে লাগল,
কিন্তু সঠিকভাবে কিছুই জানা গেল না। রোবিল্যারদের এমন মিষ্টি একটা মেয়ে কেন ওই হেড়ে
গলার লালমুখো বেঁটে লোকটাকে বিয়ে করবে, যে কিনা ওর কান পর্যন্তও পৌঁছয় না, সেটা সবার
কাছে রহস্যেই মোড়া রইল।
জেরাল্ড নিজেও বুঝে উঠতে পারেননি ব্যাপারটা
হল কীভাবে। ওঁর শুধু মনে হয়েছিল এ এক দৈব ঘটনা। তারপর বিষণ্ণ কিন্তু শান্তস্বরে এলেন
ওঁর বাহুতে কোমল হাতখানি রেখে যখন বললেন, “আমি আপনাকেই বিয়ে করব, মিস্টার ও’হারা” সেটাই
জীবনে একটি মাত্র বার যখন জেরাল্ড বাকরুদ্ধ
হয়ে পড়েছিলেন।
বিস্ময়ে হতবাক রোবিল্যার এই সিদ্ধান্তের
কারণ আংশিকভাবে আন্দাজ করেছিলেন, কিন্তু পুরো ঘটনাটা একমাত্র এলেন জানতেন আর জানত তাঁর
ম্যামি, যেদিন ভগ্নহৃদয় শিশুর মত মেয়েটা সারা রাত কেঁদে আকুল হয়ে গেছিল। ভোরবেলা শয্যা
ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই মেয়ে পরিপূর্ণ এক নারীতে রুপান্তরিত হয়ে গেল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
তার নেওয়া হয়ে গেছে।
অশুভ কোনো খবরের আশঙ্কা নিয়েই ম্যামি ওর
কিশোরী কর্ত্রীর কাছে একটা ছোট মোড়ক নিয়ে এসেছিল, নিউ অরলিয়্যান্স থেকে এসেছে, ওপরে
অচেনা হাতে ঠিকানা লেখা। মোড়কের ভেতরে ছিল এলেনের এক ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি, সেটা দেখেই
ডুকরে কেঁদে উঠে এলেন মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল, ফিলিপ রোবিল্যারকে ওর লেখা চারটে চিঠি,
আর নিউ অরলিয়্যান্সের এক যাজকের একটা সংক্ষিপ্ত চিরকুট – পানশালায় হাতাহাতি করতে গিয়ে
ওর কাজ়িনের মৃত্যুর সংবাদ।
“ওঁরা ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, বাপি আর পলিন
আর ইউল্যালি। ওঁরা ওকে চলে যেতে বাধ্য করেছিলেন। আমি ওঁদের ঘৃণা করি। ওঁদের সবাইকে
ঘৃণা করি। আর কখনও আমি ওঁদের মুখ দেখতে চাই না। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। এমন জায়গায়
চলে যাব যেখানে ওঁদের মুখদর্শন আমাকে করতে না হয়। এই শহর ছেড়ে – এই শহরের সবাইকে ছেড়ে
যাদের দেখলে আমার ওর – ওর কথা - মনে পড়ে যাবে।”
তারপর রাত যখন শেষের দিকে, ম্যামি – যে
তার কর্ত্রীর কালো কেশে মাথা রেখে সমব্যথীর মত কেঁদে গেছে – আপত্তির সুরে বলল, “এটা
তুমি করতে পার না, সোনা!”
“আমি সেটাই করব। উনি কোমল হৃদয়ের মানুষ।
আমি সেটাই করব আর নতুবা চার্লসটনের মঠে গিয়ে দীক্ষা নেব।”
মঠে দীক্ষা নেবার এই হুমকিটাই শেষ পর্যন্ত
বিমূঢ় এবং ভগ্নহৃদয় পিয়ের রোবিল্যারকে সম্মতি দিতে বাধ্য করেছিল। উনি ছিলেন কট্টর প্রেসবিটারিয়্যান, যদিও ওঁর পরিবারের
সকলেই ক্যাথলিক। মেয়েকে সন্ন্যাসিনী হিসেবে মেনে নেওয়ার চাইতে জেরাল্ড ও’হারার সঙ্গে
বিয়ে হয়ে যাওয়াটা বরং মন্দের ভাল। বংশমর্যাদার ব্যাপারটা ছেড়ে দিলে মানুষটার বিরুদ্ধে
বলবার মত আর কিছুই নেই।
অতএব এলেন, আর রোবিল্যার রইলেন না, তল্পিতল্পা
নিয়ে চিরতরে স্যাভান্না ত্যাগ করে টারার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, ওঁর মধ্যবয়সী স্বামী,
ম্যামি আর কুড়িজন ‘গৃহস্থালী সামলানোর নিগারে’র সঙ্গে।
***
পরের বছর জন্ম হল তাঁদের প্রথম সন্তানের,
ওঁরা ওর নাম দিলেন কেটি স্কারলেট, জেরাল্ডের মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। জেরাল্ড কিঞ্চিত
হতাশ হয়েছিলেন, একজন পুত্রসন্তান আশা করেছিলেন তিনি, তবুও ছোট্ট কালো চুলের ওই মেয়েকে
পেয়ে এত খুশি হয়েছিলেন যে টারার প্রত্যেক ক্রীতদাসকে রাম পান করিয়েছিলেন, আর নিজেও
খুশির চোটে মদ্যপান করে মাতাল হয়ে প্রচুর হইচই করেছিলেন।
তড়িঘড়ি জেরাল্ডকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত
নিয়ে এলেন কখনো কোনো অনুশোচনা করেছিলেন কিনা, সেটা কারোর জানা ছিল না, আর জেরাল্ডের
তো নয়ই, স্ত্রীর পানে তাকালেই গর্বে তাঁর বক্ষ স্ফীত হয়ে উঠত। সমুদ্র উপকূলবর্তী মার্জিত
রুচির মানুষদের ছোট্ট শহর স্যাভান্না আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমস্ত স্মৃতিকে পেছনে
ফেলে এলেন যেই মুহূর্তে এখানে পা রাখলেন, তখন থেকেই উত্তর জর্জিয়ার এই কাউন্টিকে তাঁর
নিজের দেশ বলে মেনে নিয়েছিলেন।
চিরতরে পিতৃগৃহ ছেড়ে চলে আসার সময় উনি
এমন একটি ভিটে ছেড়ে এসেছিলেন যার প্রতিটি রেখা নারী শরীরের মতই সুষমামণ্ডিত, পাল তোলা এক জাহাজের মত;
ফরাসি ঔপনিবেশিক শৈলীতে তৈরি হালকা গোলাপি রঙের সুদৃশ্য পলেস্তারা দেওয়া বাড়ি, ভূমি থেকে শৌখিন উচ্চতায় নির্মিত,
গৃহের প্রবেশপথে ঘোরানো সিঁড়ি, পেটা লোহার সুক্ষ্ম জালিকা দিয়ে তৈরি স্তম্ভ, নিষ্প্রভ
কিন্তু সমৃদ্ধ গৃহ, সুশোভন অথচ উদাসীন।
কেবল একটি সুশোভন বাসস্থান ছেড়েই উনি
চলে আসেননি, সমগ্র একটি সভ্যতা, ওই অট্টালিকা নির্মাণের মধ্য দিয়ে যেটির প্রকাশ ঘটেছিল,
সেই সব কিছুই তিনি পেছনে ফেলে এসেছিলেন এবং নিজেকে এমন এক স্থানে আবিষ্কার করেছিলেন
যেটি কেবল অপরিচিতই নয়, এক মহাদেশ পেরিয়ে চলে আসার মত ভিন্ন এক মাত্রার।
এখানকার – অর্থাৎ উত্তর জর্জিয়ার -
ভূখণ্ড বন্ধুর, অসমতল – কষ্টসহিষ্ণু মানুষদের
বসবাস। ব্ল্যু রিজ পর্বতমালার পদপ্রান্তে,
এই মালভূমির যেদিকেই তাকিয়েছেন লাল রঙের টিলার সারির ঢাল নজরে পড়েছে, নজরে পড়েছে সেই
টিলার নিচে থেকে প্রকট হয়ে থাকা গ্র্যানাইটের বিশাল স্তর, আর চারপাশে মাথা উঁচু করে
দাঁড়িয়ে থাকা অস্থিচর্মসার বিষণ্ণ পাইনের সারি। ধূসর শৈবালে মোড়া সমুদ্র দ্বীপের অরণ্যের আর উপক্রান্তীয়
সূর্যের নিচে সমতল বেলাভূমির তালসারির সৌন্দর্য দেখা চোখে এখানকার দৃশ্য বড়ই অশান্ত,
বড়ই অদম্য বলে মনে হয়।
এখানকার তীব্র শীত, গ্রীষ্মের চরম দাবদাহ,
আর এখানকার মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য আর কর্মশক্তি – দেখে কেমন অদ্ভুত লাগে ওঁর। সদাশয়
মানুষ এঁরা, বিনয়ী, উদার এবং উচ্ছ্বাসিত মাধুর্যে ভরা হৃদয়, অপর দিকে বলিষ্ঠ, বীর্যবান
এবং বদরাগী। তটবর্তী অঞ্চলের মানুষ – যাঁদের উনি ছেড়ে চলে এসেছেন – সমস্ত বিষয়ে, এমনকি
দ্বন্দ্ব বা কলহের ব্যাপারেও নিস্পৃহতা দেখিয়ে শ্লাঘাবোধ করেন, কিন্তু উত্তর জর্জিয়ার
মানুষের মধ্যে এক ধরণের বন্য হিংস্রতা কাজ করে। তটীয় অঞ্চলে্র জীবনচর্যা অনেকটাই উদ্ভাসিত,
পরিপক্ক, তুলনামূলকভাবে এই অঞ্চল নবোদ্ভিন্ন, প্রাণবন্ত এবং নবীন।
স্যাভান্নায় যেসব মানুষের সংস্পর্শে
এলেন এসেছেন, তাঁরা যেন একই ছাঁচে তৈরি, অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি, অভিন্ন পরম্পরাগত আদর্শ, অথচ এখানে অনেক বৈচিত্র
আছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে উত্তর জর্জিয়ায় এসে
এঁরা স্থিতু হয়েছেন – ক্যারোলাইনা থেকে, ভার্জিনিয়া থেকে, ইউরোপ থেকে এবং উত্তরদিক
থেকে। এখানে জেরাল্ডের মত অনেকেই আছেন যাঁরা নবাগত, ভাগ্যের সন্ধানে এখানে এসে বসতি
স্থাপন করেছেন। আর আছেন এলেনের মত মানুষ, যাঁরা পুরনো বনেদি বংশের সন্তান, সাবেক গৃহে
জীবন অসহ্য মনে হতে থাকায় দূর দেশে চলে এসেছেন আশ্রয়ের খোঁজে। তবে অনেকে এমনও আছেন যাঁরা কারণ ছাড়াই চলে এসেছেন,
হয়ত পথিকৃত পিতাদের দুর্দমনীয় উচ্চাকাঙ্খা এখনও তাঁদের রক্তে দোলা দেয়।
এই সব মানুষেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে
এসেছেন, বিভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছেন, ফলে কাউন্টির জীবনচর্যায় এক ধরণের আড়ম্বরহীনতা
ছিল যা এলেনের চোখে নতুন, আড়ম্বরহীনতার সঙ্গে উনি কোনোদিনই সেভাবে ধাতস্থ হতে পারেননি।
যে কোনও পরিস্থিতিতে উপকূল অঞ্চলের মানুষ কীভাবে সাড়া দেবেন সেটা ওঁর সহজাত অভিজ্ঞতা
থেকেই জানা। কিন্তু উত্তর জর্জিয়ার মানুষদের সম্পর্কে সেটা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।
সেই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ জুড়ে সমৃদ্ধির
জোয়ার বয়ে যাচ্ছিল তার ফলে এই অঞ্চলের সমস্ত ব্যাপারেই একটা গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
সারা দুনিয়া তুলোর জন্য হাহাকার করছে, আর কাউন্টির
এই নবলব্ধ ভূমি, তখনও অক্ষত এবং উর্বর, প্রতুল পরিমাণে তুলোর উৎপাদন করে যেতে লাগল।
তুলো হয়ে দাঁড়াল এই অঞ্চলের হৃৎস্পন্দন, বপন আর ফসল কাটা হয়ে উঠল লাল মাটির হৃৎপিণ্ডের
প্রসারণ আর সঙ্কোচন। আঁকাবাঁকা হলরেখা ধরে সম্পদ সৃষ্টি হল, তার হাত ধরে এল ঔদ্ধত্য
– বিঘের পর বিঘে সবুজ গুল্ম আর পশমের মত সাদা তুলো দিয়ে নির্মাণ করা ঔদ্ধত্য। মাত্র একটা প্রজন্মেই তুলো যদি ওঁদের এতখানি বিত্তশালী
করে দিতে পারে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে!
ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিশ্চয়তা জীবন সম্বন্ধে
উৎসাহ আর উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছিল বলেই যে কাউন্টির মানুষ আন্তরিকতার সাথে জীবনকে
উপভোগ করতে পারছেন সেটা কখনোই এলেনের বোধগম্য হয়নি। ওঁদের অর্থ আছে যথেষ্ট পরিমাণে,
ক্রীতদাসের সংখ্যাও অনেক, ফলে বিনোদনের জন্য ওঁদের প্রচুর অবসর সময় ছিল, আর ওঁরা বিনোদন
নিয়ে মেতে থাকতে ভালও বাসতেন। জমিয়ে ফিশ-ফ্রাই খাওয়ার জন্যে, শিকারে যেতে বা ঘোড়দৌড়ে
অংশ নিতে, হাতের কাজ ঠেলে হইহই করে বেরিয়ে পড়ার জন্য এঁরা দ্বিতীয়বার ভাবতেন না।
এলেন কখনোই এঁদের সঙ্গে একাত্ম হতে
চাননি, বা একাত্ম হতে পারেননি – স্যাভান্নায় নিজের সত্তার বেশ অনেকটাই ফেলে এসেছিলেন
– তবে উনি এঁদের শ্রদ্ধা করতেন, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এঁদের অকপট আচরণ আর স্পষ্টবাদীতার
সমাদর করতেও শিখেছেন। এঁরা মনের কথা চেপে রাখতে শেখেননি আর মানুষকে মানুষ হিসেবেই সম্মান
দিতে পারেন।
উনি কাউন্টির সবচেয়ে প্রিয় প্রতিবেশী
হয়ে উঠলেন। উনি একজন মিতব্যয়ী এবং সহৃদয় কর্ত্রী, ভাল মা এবং অনুগত পত্নী। মর্মবেদনা
আর পরার্থপরতা যা তিনি চার্চকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন এখন তার বদলে নিজের সন্তান, গৃহস্থালি
আর যে মানুষটা তাঁকে স্যাভান্না আর সেখানকার স্মৃতির ভার থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন
তাঁর প্রতি নিয়োজিত করলেন। একটিও প্রশ্ন করেননি।
স্কারলেট যখন এক বছরের, আর ম্যামির
মতে একজন কন্যাসন্তানের যতখানি স্বাস্থ্যবতী আর তেজস্বী হওয়া উচিত, তার চেয়েও বেশি
স্বাস্থ্যবতী আর তেজস্বী হয়ে উঠেছে, এলেনের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হল, নাম রাখা হল
সুস্যান এলিনর, কিন্তু ডাকা হয় স্যুয়েলেন বলে, এবং তারপরে উপযুক্ত সময়ে এল ক্যারীন,
পারিবারিক বাইবেলে উল্লেখ করা হল ক্যারোলাইন আইরিন নাম। তারপরে পর পর তিনটি পুত্রসন্তান
এল, প্রত্যেকেই হাঁটতে শেখার আগেই মারা গেল – সেই তিনটি পুত্রসন্তানই বাড়ি থেকে একশ
গজ দূরে পাকানো সেডার গাছের তলায় পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছে, তিনটি প্রস্তরফলকেই
নাম লেখা আছে “জেরাল্ড ও’হারা, জুনিয়র”।
যেদিন এলেন প্রথম টারায় এলেন, জায়গাটার
রূপান্তর ঘটে গেল। বয়স পনেরো বছর হলেও একটা
প্ল্যান্টেশনের কর্ত্রীর দায়িত্ব সামলানোর মত মানসিক প্রস্তুতি ওঁর ছিল। অল্পবয়সী মেয়েদের
কাছে আশা করা হত যে বিয়ের আগে ওরা রূপে লক্ষ্মী
গুণে স্বরস্বতী হবে, মৃদুভাষী হবে, শান্ত হবে, কিন্তু বিয়ের পরে তাদের গৃহস্থালীর পরিচালনা
করতে হবে যেখানে সাদা কালো মিলিয়ে শতাধিক মানুষ থাকবে, আর ঠিক সেই কথা মাথায় রেখেই
ওদের শিখিয়ে পড়িয়ে বড় করা হত।
অন্যান্য অল্পবয়সী মেয়েদের মতই এলেনও
বিবাহযোগ্যা হয়ে ওঠার জন্য এই ধরণের শিক্ষাই পেয়েছিলেন। তাছাড় উনি সঙ্গে পেয়েছিলেন
ম্যামিকেও, যে কিনা অলসতম নিগ্রোকে দিয়েও কাজ করিয়ে নিতে পারত। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই
উনি জেরাল্ডের গৃহস্থালীতে শৃঙ্খলা, গৌরব আর লাবণ্য নিয়ে এলেন আর টারাকে এমন মাধুর্য প্রদান করলেন
যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
স্থাপত্য বিদ্যার কোনো রকম নিয়মকানুন
না মেনেই তৈরি হয়েছিল বাড়িটা, প্রয়োজন মত বাড়তি ঘর তুলে নেওয়া হয়েছিল, তবে এলেনের যত্নে
এবং হস্তক্ষেপে পরিকল্পনার অভাব থাকা সত্ত্বেও বাড়িটা শ্রীময়ী হয়ে উঠল। সেডার গাছের
সারি বড় রাস্তা থেকে বাড়ি আসার পথের দুই ধারে নিবিড় শীতল ছায়া চারপাশের শ্যামলিমাকে
উজ্জ্বলতর করে তুলেছে। এই সেডার গাছের সারি ছাড়া জর্জিয়ার কোনো প্ল্যান্টারের বাড়িই
সম্পূর্ণ হত না। বারান্দার চাল থেকে নেমে এসে
উইস্টেরিয়া সাদা চুনকাম করা ইটের দেওয়াল আলোকময় করে তুলেছে।
এছাড়া দরজার পাশে জারুলের ঝাড় আর উঠোনে ফুটে থাকা
ম্যাগনোলিয়ার সাদা সাদা ফুল বাড়িটার অনেক ত্রুটিই আড়াল করে ফেলল।
বসন্তকালে আর গ্রীষ্মে বাগানের লনের
বার্মুডা ঘাস আর ক্লোভার ঘন সবুজ হয়ে ওঠে, টার্কি আর সাদা হাঁসের পাল, যাদের কেবল বাড়ির
পেছনের দিকেই চরে বেড়াবার কথা, এই সবুজের দুর্নিবার আকর্ষণে চলে আসত। সবুজ ঘাস আর সুস্বাদু
জুঁই আর জিনিয়ার কুঁড়ির প্রলোভনে এদের দলপতিরা
সঙ্গী সাথীদের নিয়ে অজ্ঞাতসারে অনবরত এখানে চলে আসত। এদের নাশকতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটা নিগ্রো
শিশুকে পাহারা দেবার জন্য সামনের দালানে মোতায়েন করা হল। জীর্ণ একটা তোয়ালে সম্বল করে সেই নিগ্রো শিশুটি সিঁড়ির
ধাপে অসুখী মনে বসে থাকত, কারণ ওদের পেছনে ছোটাছুটি করার নিষেধ ছিল, কেবল ওই তোয়ালেটা
নাড়িয়েই ওদের তাড়িয়ে দেবার অনুমতি ছিল।
এলেন জনাবারো নিগ্রো শিশুকে এই কাজটা
দিয়েছিলেন, টারাতে কোনো পুরুষ ক্রীতদাসকে দায়িত্ব অর্পণ করার প্রথম ধাপ। দশ বছর বয়স
হবার পর ওদের প্ল্যান্টেশনের মুচি বুড়োবাবার কাছে সেই কাজ শেখবার জন্য পাঠানো হত, কিংবা
কাঠের মিস্ত্রি অ্যামোসের কাছে, অথবা ফিলিপের কাছে যে গোয়ালঘরের তদারকি করে, বা খচ্চরের
দেখাশোনা করার লোক কাফ্-এর কাছে। এর যে কোনো একটা বৃত্তিতেও এদের ঝোঁক না দেখা গেলে
এদের খেতমজুর হিসেবে কাজে লাগানো হত, আর নিগ্রোদের চোখে এদের সামাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার
কোনও দাবিই আর থাকত না।
এলেনের জীবনও খুব সহজসাধ্য ছিল না,
না ছিল খুব সুখকর, তবে জীবনটা সহজসাধ্য হবে এরকম দুরাশা ওঁর ছিল না, আর জীবনটা যদি
সুখকর না হয়, সেখানেও কিছু করার নেই, সেটা নারীদের কপালের লিখন। দুনিয়াটা পুরুষতান্ত্রিক,
এবং দুনিয়াকে উনি সেভাবেই মেনে নিয়েছিলেন। পুরুষরা বিষয়সম্পত্তির মালিক হতেন, আর নারীদের
ওপর ছিল সেই বিষয়সম্পত্তি আগলানোর দায়িত্ব। বিষয়সম্পত্তি আগলানোর কৃতিত্ব পুরুষরাই নিতেন আর
নারীরা তাঁদের বুদ্ধিমত্তার তারিফ করতেন। আঙ্গুলে সামান্য একটা কাঁটা বিঁধলেই পুরুষরা
যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন, আর নারীরা প্রসব বেদনা নীরবে সহ্য করেন পাছে পুরুষদের শান্তি
বিঘ্নিত হয়। পুরুষরা কর্কশ গলায় কথা বলেন,
এবং প্রায়ই মদ্যপ অবস্থায় থাকেন। নারীদের কর্তব্য
পুরুষদের রুক্ষ ভাষণ গায়ে না মেখে মদ্যপ স্বামীকে কটু কথা না বলে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া।
পুরুষমানুষ অশিষ্টভাষী হন, মুখ আলগা হন, নারীরা সদাই সদয় হন, কমনীয় হন, ক্ষমাশীল হন।
অসামান্যা নারীদের সংস্পর্শে তিনি বড়
হয়ে উঠেছেন, সব রকম চাপ সহ্য করেও কীভাবে কমনীয়তা বজায় রাখা যায় সেই শিক্ষা তিনি পেয়েছেন,
এবং ওঁর মনোগত বাসনা যে ওঁর তিন কন্যাও যথাসময়ে অসামান্যা নারীতে পরিণত হবে। ওঁর দুই
কনিষ্ঠা কন্যার ব্যাপারে উনি সাফল্য লাভও করেছেন – নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য
স্যুয়েলেন মায়ের শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, আর ক্যারীন লাজুক প্রকৃতির আর বাধ্য
মেয়ে। কিন্তু স্কারলেট বাপ কী বেটী – জেরাল্ডেরই স্বভাব পেয়েছে – ওর অসামান্যা নারীতে
পরিণত হওয়ার পথটা সুগম হল না।
ম্যামির কপালে ভাঁজ ফেলে স্কারলেটের
পছন্দের খেলার সাথীর তালিকায় ওর শান্তশিষ্ট বোনেরা নেই, বা উইল্কসদের সুশীল মেয়েরাও
নেই, বরং আছে প্ল্যান্টেশনের নিগ্রো বাচ্চারা
কিংবা পাড়ার ছেলেরা। ঠিক ওদের মতই ও গাছে চড়তে ওস্তাদ, পাথর ছোঁড়ার নিশানাবাজীতেও।
এলেনের মেয়ের মধ্যেই কিনা এই সব অবাঞ্ছিত লক্ষণ
দেখা দেবে – ম্যামি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ল
আর উঠতে বসতে ওকে শাসন করে বলত ‘একটু লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকার চেষ্টা কর’। অবশ্য এলেন ব্যাপারটাকে সহিষ্ণুতার সঙ্গে দেখলেন
আর দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টা করলেন। উনি জানতেন শৈশবের সঙ্গীসাথীরাই পরবর্তী
সময়ে প্রেমিক-প্রেমিকায় পরিণত হয়, আর একজন মেয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব হল সুপাত্রস্থ হওয়া।
উনি নিজেকে এই ভেবে আশ্বস্ত করলেন যে স্কারলেট এখনও খুবই ছোট আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর;
কমনীয়তা আর পুরুষের চোখে নিজেকে মনোহর করে তোলার কৌশল শেখানোর জন্য উনি অনেকটাই সময়
পাবেন।
এই কথা মাথায় রেখেই এলেন এবং ম্যামি
পরোক্ষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, আর স্কারলেট যতই বড় হতে থাকল দেখা গেল এই কৌশল রপ্ত
করার ব্যাপারে ওর অপার আগ্রহ, তবে অন্যান্য ব্যাপারে খুব বেশি কিছু শেখা হল না। পর্যায়ক্রমে
বেশ কিছু গৃহশিক্ষিকা নিয়োগ করেও আর বছরদুয়েক নিকটবর্তী ফেয়্যাটভিল ফিমেল অ্যাকাডেমিতে
যাতায়াত করেও ওর শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটা অসম্পূর্ণই রয়ে গেল, তবে কাউন্টির কোনও মেয়েই
ললিত নৃত্যকলায় ওর কাছেও দাঁড়াতে পারত না। কীভাবে হাসতে হয় যাতে গালে টোল পড়ে, পায়ের
আঙ্গুল পেছনে মুড়ে কীভাবে হাঁটলে বন্ধনীযুক্ত স্কার্ট লোভন ছন্দে আন্দোলিত হবে, কীভাবে
পুরুষদের মুখের পানে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিয়ে আর চোখ পিটপিট করে নিজেকে আবেগে কম্পিত
দেখাতে হয়, স্কারলেট এই সমস্ত কলা খুব ভাল করে জেনে গেল। সর্বোপরি ওর শিশুসুলভ সারল্যে ভরা সুন্দর মুখের
আড়ালে যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা রয়েছে সেটা পুরুষদের কাছ থেকে কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয়
সেটাও ও আয়ত্ত করে নিয়েছে।
এলেনের মৃদুস্বরে উপদেশ আর ম্যামির
অবিরাম খুঁত ধরা – এই দুইয়ের সমন্বয়ে স্কারলেটের মধ্যে সেই সব গুণাবলীর প্রকাশ ঘটানোর
প্রচেষ্টা চলতে লাগল যাতে ও একজন আদর্শ পত্নী হিসেবে কাম্য হয়ে উঠতে পারে।
“তোমাকে আরও নম্র হতে হবে, সোনা, আরও
ধীরস্থির,” এলেন মেয়েকে বলতেন। “কোনও ভদ্রলোক যখন কথা বলবেন, তখন তাঁকে কথার মাঝখানে
বাধা দেবে না, এমনকি যদি মনে হয় ওঁর চাইতে সেই বিষয়ে তুমি বেশি জানো, তাহলেও না। ভদ্রলোকেরা
বেহায়া মেয়েদের পছন্দ করেন না।”
“যে আইবুড়ো মেয়েরা সব ব্যাপারে ভুরু
কোঁচকায় আর থুতনি নেড়ে ‘আমি এমনটাই করি’ বা আমি এটা পছন্দ করি না’ এসব বলে তারা কখনোই বর পাকড়াও
করতে পারে না,” মুখ ভার করে ম্যামি ভবিষ্যদ্বাণী করত। “আইবুড়ো মেয়েরা চোখ নিচু করে
বলবে, ‘হ্যাঁ, স্যার, আপনি যেরকমটি বলবেন, স্যার।”
দুজনে মিলে একজন সুশীলা নারীর যা কিছু
জানার প্রয়োজন, সেই সব কিছুর শিক্ষাই ওকে দিয়েছিলেন, কিন্তু স্কারলেট কেবল একজন সুশীলা
নারী হবার ভণিতাটুকুই শিখতে পারল। যে অন্তঃস্থিত মাধুর্যের গুণে ওর সুশীলতা বোধ আপনাআপনিই
জেগে উঠবে, সেটা স্কারলেট আয়ত্ত করে উঠতে পারল না, বা আয়ত্ত করার কোনও কারণ খুঁজে পেল
না। দৃষ্টিগোচর রূপটাই ওর যথেষ্ট বলে মনে হয়েছিল,
কারণ অসামান্যা নারীর এই দৃষ্টিগোচর রূপটাই ওকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল, আর
সেটাই ওর কাম্য ছিল। জেরাল্ড খুব গর্ব করে
বলতেন, আশেপাশের পাঁচটা কাউন্টির মধ্যে স্কারলেটই হল সকল পুরুষমানুষের হৃৎস্পন্দন,
আংশিকভাবে কথাটা সত্যও বটে, কারণ আশেপাশের এবং অ্যাটলান্টা এবং স্যাভান্নার মত দূরদূরান্তের
তরুণদের থেকেও ওর কাছে বিবাহের প্রস্তাব এসেছিল।
মাত্র ষোলো বছর বয়সেই, এলেন আর ম্যামির
যত্নে, স্কারলেট পুরুষমানুষদের মাথা ঘুরিয়ে দেবার মত অত্যন্ত সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া
একজন নারী হয়ে উঠল, তবে প্রকৃতপক্ষে ও ছিল অসম্ভব জেদি, দাম্ভিক আর একগুঁয়ে। আইরিশ পিতার কাছ থেকে ওঁর খামখেয়ালী মেজাজটা ভাল
মতই পেয়েছিল, তবে মায়ের সদগুণের ছিটেফোঁটাও রপ্ত করেনি, কেবল ওপর ওপর মায়ের মত নিঃস্বার্থ
সহিষ্ণুতার ভান করে থাকা ছাড়া। এলেন অবশ্য স্কারলেটের এই ভান করে থাকাটা কোনোদিনই পুরোপুরি
বুঝে উঠতে পারেননি, কারণ স্কারলেট মায়ের সামনে সর্বদাই লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকত, নিজের
উচ্ছৃঙ্খল আচরণ আড়াল করে রাখত, মেজাজ সামলে রেখে যতটা সম্ভব নিজের কমনীয় রূপটাই প্রদর্শন
করত, কারণ মা একবার ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেই ও লজ্জায় জড়সড় হয়ে যাবে।
ম্যামি অবশ্য ওর আচার আচরণ নিয়ে এতটা
নিশ্চিন্ত ছিল না, ওর বহিরাবরণে চিড় ধরে কিনা সেই ব্যাপারে কড়া নজর রাখত। ম্যামির পর্যবেক্ষণ
ক্ষমতা এলেনের চেয়ে বেশি ছিল, আর খুব বেশিদিন ম্যামির চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছে, এমন
কথা স্কারলেটও স্মরণ করতে পারে না।
এই দুই স্নেহময়ী নারী স্কারলেটের প্রাণোচ্ছলতা,
চপলতা আর আকর্ষণক্ষমতা নিয়ে যে খুব পরিতাপ করতেন, এমন নয়। বরং এই সব লক্ষণ থাকাটা দক্ষিণের
সব মহিলারাই গর্বের চোখে দেখতেন। ওঁদের দুশ্চিন্তার
কারণ হল জেরাল্ডের একগুঁয়ে উদ্দাম স্বভাবের স্ফূরণ স্কারলেটের মধ্যে দেখতে পেয়ে, এবং
ওঁদের ভয় ছিল যে স্কারলেট নিজেকে পাত্রস্থ করে না ফেলা পর্যন্ত ওঁরা ওর স্বভাবের এই
ক্ষতিকর দিকটা চেপে রাখতে পারবেন না। কিন্তু স্কারলেট বিয়ে করতেই চায় – আর অ্যাশলেকেই
বিয়ে করতে চায় – তাই নিজেকে সংযত, নমনীয় আর বোকাসোকা দেখানো নিয়ে ওর কোনও আপত্তিই ছিল
না, যদি এই গুণগুলোই পুরুষমানুষের কাছে নারীকে
আকর্ষণীয় করে তোলে তাহলে আপত্তি কিসের? কিন্তু
কেন যে এরকমই হতে হবে সেটা ও জানে না। ও কেবল এইটুকুই জানে যে এই সব কৌশল বেশ কার্যকরী।
কারণটা নিয়ে গভীরভাবে ভাববার যথেষ্ট আগ্রহ ওর কোনোদিনই ছিল না, কারণ মানব মনের জটিলতা
এমনকি নিজের মনের জটিলতাও, ওর জ্ঞানের অতীত। ও শুধু জানে যদি এই রকম এই রকম কিছু করা
হয় বা এই রকম এই রকম কিছু বলা হয়, পুরুষমানুষ বিগলিত হয়ে এই রকম এই রকম প্রশংসায় পঞ্চমুখ
হয়ে যাবে। একেবারে অঙ্কের সূত্রের মতই সহজবোধ্য, আর ইস্কুলে পড়বার সময় অঙ্ক ব্যাপারটা খুব সহজেই ওর মাথায় ঢুকত।
পুরুষমানুষের মনস্তাত্বিক জটিলতা স্কারলেট
যদি বা সামান্য কিছু বুঝত, মেয়েদের মনস্তত্ব আরও কম বুঝত, কারণ মেয়েদের মনস্তত্ব নিয়ে
ওর আগ্রহ আরও কম ছিল। বান্ধবী ওর কোনোদিন ছিলই না, আর সেজন্য কোনও অভাববোধও ওর ছিল
না। ও মনে করত, প্রতিটি মহিলাই, নিজের দুই বোন সহ, ওর সহজাত শত্রু, একই লক্ষ্য নিয়ে
ওরা শিকারে নামত – পুরুষমানুষ।
হ্যাঁ, প্রতিটি মহিলাই – ব্যতিক্রম
কেবল ওর মা।
এলেন ও’হারা সবার থেকে আলাদা, স্কারলেট
ওঁকে পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক বলে মনে করে, মানব প্রজাতির অন্য সকলের ওপরে। স্কারলেট
যখন শিশু ছিল, কুমারী মেরির সঙ্গে মা’কে গুলিয়ে ফেলত, বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মত
বদলে ফেলার কোনো কারণই খুঁজে পায়নি। ওর কাছে এলেন হলেন পরম নিরাপত্তার প্রতীক যা কেবল
মাত্র ঈশ্বর কিংবা মা-ই দিতে পারেন। ও জানে
ন্যায়ের, সত্যের, স্নেহের এবং প্রগাঢ় জ্ঞানের আধার ওর মা – মহীয়সী এক নারী।
স্কারলেট মনেপ্রাণে মায়ের মত হয়ে উঠতে
চায়। তবে সমস্যা হল, ন্যায়পরায়ণ আর সত্যবাদী, স্নেহময় আর নিঃস্বার্থপর হতে গেলে, জীবনের
অনেক আনন্দই বিসর্জন দিতে হয়, বহু প্রেমিক থাকার আনন্দ তো বটেই। কটা দিনেরই বা এই জীবন,
আমোদ বিসর্জন দিলে আর থাকল কী? একবার অ্যাশলের সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়ে যাক, বয়সটা আরও
একটু বাড়ুক, তখন অনেক সময় পাওয়া যাবে, তখন ও এলেনের মতই হয়ে উঠবে। অন্তত ততদিন …
টীকাঃ
১ অর্যাঞ্জম্যান – ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মকে রক্ষা করার
জন্য ১৭৯৫ সালে যে গোপন সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সদস্য। বিশেষ করে প্রোটেস্ট্যান্ট
ধর্মাবলম্বী উলস্টারের আইরিশম্যানরা।
২ বয়েনের যুদ্ধ – ১৬৯০ সালে অপসৃত
রাজা জেমস ২ এবং ইঙ্গল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম ৩ (অরেঞ্জের যুবরাজ) এর মধ্যে বয়েন
নদীর ধারে হয়েছিল। উইলিয়াম এই যুদ্ধে জয়ী হন।
৩ টমাস মূর – একজন আইরিশ কবি।
৪ চেরোকি – আমেরিকার মূল বাসিন্দা এক জনজাতিগোষ্ঠী।
৫ গীচ্চী – জর্জিয়া আর দক্ষিণ ক্যারোলাইনার (ইউরোপীয় আর
নিগ্রোর মিশ্র প্রজাতির) কালো মানুষরা এই ভাষায় কথা বলত।
৬ অ্যাবলিশনিস্ট – যাঁরা ক্রীতদাস প্রথা বিলোপ করে দেওয়ার
পক্ষে ছিলেন।
৭ ব্যর্বন – আমেরিকায় প্রস্তুত এক ধরণের হুইস্কি।
৮ দক্ষিণে বিক্রি করে দেওয়া – আমেরিকায় ১৮০৮ সালে বাইরে থেকে
ক্রীতদাস আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে নতুন ক্রীতদাসের যোগান আমেরিকাতে বিদ্যমান
পুরনো ক্রীতদাস পরিবার থেকেই কেনা বেচা করে পূরণ করতে হত। ক্রমবর্ধমান তুলোর চাহিদা
সামলানোর জন্য প্রত্যন্ত দক্ষিণেও তুলোর চাষ শুরু হয়ে যায় এবং অনেক ক্রীতদাস মালিকই
নিজেদের ক্রীতদাসদের চড়া দামে প্রত্যন্ত দক্ষিণের প্ল্যান্টারদের কাছে বিক্রি করে দিতেন।
একই পরিবারের ক্রীতদাসদের বিভিন্ন মালিকের কাছে বিক্রি করা হত, ফলে নিগ্রো পরিবারগুলো
ভেঙ্গে যেত।


0 মন্তব্যসমূহ