বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

ভাসমান বাঙালির দরদি কাহিনিকার - পৌলোমী সেনগুপ্ত

নবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য, পরিবর্তনহীন রীতিনীতি ও স্বভাব তাঁর লেখায় প্রকাশ পায় বলেই আন্তর্জাতিক ঝুম্পা লাহিড়ী।
---------------------------------------------------------------------------
পৌলোমী সেনগুপ্ত

ঝুম্পা লাহিড়ীর সঙ্গে স্বল্প পরিচয়ে ও তাঁর লেখা পাঠ করে মনে হয়েছে, এই লেখিকার জীবনের দু’টি মূল সত্য প্রকাশ করা যায় দু’টি শব্দে। ‘ভাষা’ এবং ‘ভাসা’। বাঙালির প্রবাসজীবন নিয়ে, সেই প্রবাসে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সংগ্রাম নিয়ে ইংরেজিতে লেখেন ঝুম্পা। এক জায়গা থেকে উৎপাটিত হয়ে অন্য এক মাটিতে শেকড় চারিয়ে দিতে চাওয়া মানুষজনের সংকট বার বার প্রকাশিত তাঁর কলমে। স্থলের স্থিতি ও জলের প্রবাহে চিরভাসমান ও ডাঙায় এসে ঠাঁই পাওয়া মানুষের চেতনা, মনন ও নিজেকে সন্ধান করে নেওয়ার প্রচেষ্টা তাঁর সাহিত্যের গূঢ় এক বোধ। একেই বলা যায় ‘ভাসা’, প্রবাহিত হওয়া। কোথাও নৌকো লাগানো, আবার অন্য স্রোতে ভেসে যাওয়া।

ঝুম্পা নিজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছেন। কলকাতা থেকে সে দেশে পাড়ি দেওয়া দম্পতির প্রথম সন্তান তিনি। তাই তাঁর নিজের অস্তিত্বেই এক ফাটল তিনি বোধ করেছেন। ‘দ্য নেমসেক’ ঝুম্পার প্রথম উপন্যাস। এর মূল চরিত্র নিখিল বা গোগোল এই অস্তিত্ব সংকট বোধ করে। মনে হয়, ঝুম্পার নিজস্ব উভয়-সংকট ছায়া ফেলেছে গোগোলের চরিত্রে। এই সংকটের দ্যোতক গোগোলের নাম। তার ভাল নাম নিখিল। কিন্তু সে নিখিল হতে চায় না। ডাকনাম গোগোল। এই নামেই সে স্বচ্ছন্দ। গোগোল তার ভারতীয় পটচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতা তাকে শান্তি দেয় না। এই অতৃপ্তি গোগোলের নিয়তি। হয়তো ঝুম্পারও। তাই একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘The essential dilemma of my life is between my deep desire to belong and my suspicion of belonging.’ গৃহের খোঁজ তিনি করেন কিন্তু স্বস্তি যেন তাঁর জন্য নয়। 

তা হলে ঝুম্পার স্বস্তি কোথায়? তিনি একটি আলাপচারিতায় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে বাংলা শুনছি, বলতে পারি, কিন্তু বাংলা ভাষা তো পুরোপুরিভাবে আমার জানা নয়, তা হলে তো আমি বাংলাতেই লিখতাম, সেটা আমি পারি না। ইংরেজি ভাষাটা আমি ভাল জানি কারণ আমার পড়াশোনাটা ইংরেজিতে। তবুও আমার মনে হয়, ইংরেজি আমার ভাষা নয়। কারণ ইংরেজি আমার মা-বাবার ভাষা নয়। বাংলা আমার মা-বাবার ভাষা। আমার আছে দু’টো অর্ধ ভাষা। তাই আমি যখন এখন ইতালিয়ান ভাষায় বই লিখছি, আমার খুব মনে হচ্ছে যেভাবে আমার কোনও নির্দিষ্ট একটা দেশ নেই, ঠিক সেভাবেই আমার কোনও নির্দিষ্ট একটা ভাষাও নেই। যে লেখে তার জন্য ভাষাই দেশ। ভাষা আর দেশ কি আলাদা কিছু? একই জিনিস।’’

লেখক হিসেবে ঝুম্পার প্রকৃত দেশ তাঁর অর্ধ ও সম্পূর্ণ পরিচিত ভাষাগুলিতে। তিনি যেন ভাষার ভিতর দিয়েই বাঁচেন। নানা ভাষার নানা শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে তাঁর অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। মাঝে কয়েকবছর ঝুম্পা নিজ ইচ্ছায় আমেরিকা ত্যাগ করে ইতালির রাজধানী রোম শহরে বাস করছিলেন। তখন ইংরেজির প্রতি তাঁর কোনও টানই ছিল না। চেষ্টা করতেন, ইতালীয় ভাষায় লিখতে ও কথা বলতে। যেন আর একটি নতুন দেশের মাটিতে গাঁথা হয়ে গেল তাঁর অস্তিত্বের শেকড়। নতুন শেখা ইতালীয় ভাষায় তিনি একটা বই লিখে ফেললেন। বইটি ইংরেজি অনুবাদসহ প্রকাশিত হয়েছে, নাম ‘ইন আদার ওয়ার্ড্‌স’। বইটির প্রাক্‌কথনে ঝুম্পা লিখছেন, ‘I was reluctant to move back and forth between the two. My impulse at the time was to protect my Italian, Returning to English was disorienting, frustrating, also discouraging.’ ঝুম্পা এইভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন কারণ, তাঁর কাছে দেশ ও ভাষা অভিন্ন। সেকারণেই বলছি, ঝুম্পার দ্বিতীয় সত্য তাঁর ‘ভাষা’।

ঝুম্পা স্বীকার করেছেন যে, যদিও পছন্দের মাটির সন্ধান তিনি করে চলেছেন আজন্ম, কোনও মাটির সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যাওয়াও তাঁর ঠিক ভাল লাগে না। এ কারণেই ফিরে ফিরে আসা তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির বৈশিষ্ট্যে। ‘দ্য নেমসেক’ উপন্যাসের শেষে গোগোল তার বাবার বাড়িতে ফিরে আসে, একটা ঘরে একা বসে নিকোলাই গোগোলের ‘দ্য ওভারকোট’ বইটি পড়তে শুরু করে। ওই বইটিকে কেন্দ্র করে তার বাবার পুনর্জন্ম, তাই এক হিসেবে এটা গোগোলের পক্ষে জন্মের মাটিতে প্রত্যাবর্তনের শামিল। ‘দ্য লোল্যান্ড’ উপন্যাসে সবক’টি চরিত্রই টালিগঞ্জের নিচু বাদা জমিতে আক্ষরিক অর্থে ফিরে আসে।

দূরে যাওয়া ও ফিরে আসা, এই নিয়ে শব্দে-শব্দে আবদ্ধ ঝুম্পার পৃথিবী। ব্যক্তিজীবনেও এভাবেই যেন তিনি ভেবেছেন। আলবের্তো ভুরভুলিয়াস, ঝুম্পার স্বামী। ঝুম্পা বলেছেন, ‘পৃথিবীর বহু দেশে ও (আলবের্তো) বড় হয়েছে। ...ওর সঙ্গে যখন আলাপ হল, ও বলল যে, আমি জানি না আমি কোথাকার। কিন্তু আমি, আমার মা-বাবা-ভাই-বোন, আমরাই একটা ছোট দেশ। শুনে মনে হল ঠিক, এটাই তো আমারও মনে হয়।’

তবে প্রবাস, মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, ফিরে আসা, ভারত-আমেরিকা-ইতালি এ সব কিছুর বাইরেও ঝুম্পার অস্তিত্ব সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে। মানবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য ও পরিবর্তনহীন কিছু রীতিনীতি ও স্বভাব তাঁর লেখায় প্রকাশ পায়। সে কারণেই তিনি বর্তমানের এক বন্দিত সাহিত্যিক, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক বাঙালি। বিদেশি পাঠকও তাঁর লেখায় স্বকীয় মূলস্রোত খুঁজে পায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন