বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

লেখক,ঔপন্যাসিক এবং সাহিত্য সম্পাদক ‘নাসরীন জাহান’ এর সাক্ষাৎকার

গল্পপাঠ : আপনি আপনার বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে শৈশব থেকেই আপনার জীবনে সাহিত্য একটি অবিভাজ্য অংশ হয়ে ছিল। জাদুকরের মতন পরী কাহিনীগুলো আপনাকে ভর করে থাকতো। এ সম্পর্কে আপনার জন্মের শহর ময়মনসিংহের স্মৃতি থেকে কিছু বলুন ।

নাসরীন জাহান : আমার বাবা মরহুম গোলাম আম্বিয়া ফকির ছিলেন একজন সরকারি চাকুরিজীবী এবং মা উম্মে সালমা ছিলেন একজন গৃহিণী। বাবার চাকরির কারণে আমাদের থাকতে হত মামাবাড়িতে, ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটে। বাবা ভীষন অন্যরকম একজন মানুষ ছিলেন, ধর্মটর্মে বিশ্বাস করতেন না। তিনি কোষ্ঠিতে বিশ্বাস করতেন। আমার জন্মের পরই নাম রাখার সময় উনি কোষ্ঠিতে লেখা পেলেন ‘কবিত্ব সাহিত্য যোগ’। তখন থেকেই বাবা বলতে শুরু করলেন, ‘ওতো রবীন্দ্রনাথ হবে’, কোষ্ঠিতে আছে,ও লিখবে। ও এখনো লিখছেনা কেন? সেই থেকে বাবার সাথে যুদ্ধ করে পাঠ্য বই থেকে ছন্দ শিখে একটা ছড়া লিখে ফেলি যেটা পরবর্তী’তে স্কুলে একটা পরিচিত ঘটায়। ছোটোবেলা থেকেই পরীকাহিনী দিয়ে আচ্ছাদিত ছিলাম প্রচন্ডভাবে। ক্লাস টু-থ্রির দিকে আমি বিশ্বাস করতাম যে পরীদের একটা আলাদা জগত আছে আকাশে। আমাকে যদি কেউ গল্প করতো যে সুন্দর বাচ্চাদের পরীরা তুলে নিয়ে যায় আমি সেটা বিশ্বাস করতাম। একবার কুয়াশা-টুয়াশা পেরিয়ে দূরে চলে গিয়েছিলাম যাতে পরীরা আমাকে নিয়ে যায়। টেনশনে আমার বুক ধরফর করছিল, তারপরও আমি উঠে আসিনি। যখন দেখলাম ভোরটা কেটে যাচ্ছে, পরীরা কেউ আমাকে নিয়ে যায়নি তখন মনে হয়েছিল যে আমি বোধহয় দেখতে সুন্দর না, তাই আমাকে নেয়নি। সেই সময়টায় আমাদের গ্রামটা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং আমরা শহরে চলে আসি। তখন অনেকটা অভাবের মধ্যে পড়ে যাই। যেহেতু নানাবাড়িতে তেপান্তরের মাঠ দেখে বড় হয়েছিলাম তাই শহরের জীবন মানতে পারছিলাম না। শৈশবেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম ‘বিয়ে’টা কী...। যখন সাহিত্যটা শুরু করে দিলাম তখন এতটাই নিমগ্ন হয়ে ছিলাম যে ধরেই নিয়েছিলাম, আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না এবং এমন কারো সাথে থাকতে হবে যেন সাহিত্যচর্চা টা অব্যাহত রাখতে পারি। বাবা ছাড়াও ‘চাঁদের হাট’ শৈশবে আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছিল। আমার বান্ধবী পারভিন সুলতান রুবি আমাকে নিয়ে গিয়েছিল চাঁদের হাটে। সেখানে প্রতি সপ্তাহে লেখা পাঠ হত,এবং তার ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হত। সেখানে বিশ্বসাহিত্যে কী...লেখা চলছে সেগুলো সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান ছিল। সে সময়ই তারা আমার লেখার প্রশংসা করতেন। 

গল্পপাঠ : এ পর্যন্ত আপনি প্রায় আঠাসটির মতন উপন্যাস লিখেছেন, এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য গল্প। ‘পাগলাটে এক গাছ বুড়ো’ গল্পের জন্য আপনি অর্জন করেছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার। ‘উড়ুক্কু’র জন্য আপনি ১৯৯৪ সালে ফিলিপ্স পুরস্কারটি পান। এইযে সফলতা দিয়েই আপনার যাত্রা শুরু তার আগেই কি আপনি জানতেন যে আপনি একজন দারুণ কথাসাহিত্যিক হবেন? এই শুরুর পেছনের গল্পটা আসলে কী ছিলো ?

নাসরীন জাহান : আমি আসলে গল্প লিখেই হাতটা মজবুত করে ফেলেছিলাম। বিশ্বসাহিত্যও তখন মোটামুটি পড়া। বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তখন নিয়মিত লিখতাম। তারপর যখন উপন্যাস লিখতে শুরু করলাম, তখন একটা মাকড়শা দিয়ে শুরু করলাম, যেন গল্পটা পরাবাস্তবতার দিকে যায়। একটা গল্পের মতন হত আমার উপন্যাস। বিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লেখার পর দেখা গেল যে আমি আর লিখতে পারছি না। এরকম অনেক চেষ্টা করতেই থাকলাম। ঘুমাতে গেলেই মনে হত আমি আজকেও চেষ্টা করলাম, কালকেও চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই হলো না। বছর যাবত চেষ্টা করে যাচ্ছি,কিছুই হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত এতসব চিন্তা না করে আমি আমার শৈশব কৈশর নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। আমার দেখা জগতের সাথে কল্পনা যুক্ত করলাম। একারণে নিজের বিষয়টা নিয়ে শুরু করলাম যে আমি অনেক পৃষ্ঠা লিখতে পারবো। এবং হলোও তাই। বিশ পৃষ্ঠা লেখার পরও মনে হল যেন আমি এক লাইনও লিখিনি। আমার অনেক কথা লেখা বাকি আছে। আমার দেখা জগতটাকে এখন পর্যন্ত আর কোন উপন্যাসে আমি এইভাবে আনতে পারিনি। উড়ুক্কু উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত মেয়ের জীবন এবং এটা ছিল আমার কবজির জোর,যা ভীষণ চেনা। যে বছর উড়ুক্কু বেরিয়েছিল সে বছর মাত্র ৫ টি বই বিক্রি হয়েছিল। খুব কষ্টকর ছিল অভিজ্ঞতাটি। প্রকাশকের মুখ বিষন্ন, বইমেলায় যেতে ইচ্ছা করে না। একটা দারুণ পীড়ন। এত মোটা বইটা বের করে প্রকাশককে ঠকালাম, এরকম মনে হচ্ছিল আমার। পরের বছর ফিলিপস পুরুষ্কার পাওয়ার পর বিক্রিটা শুরু হয়েছিল। ফিলিপস পুরস্কারের জন্য বইটা পারভেজ হোসেন ঠিক শেষ দিনে গিয়ে জমা দিয়ে এসেছিল। এই একটা পুরস্কার যেটা নিয়ে কোন গুঞ্জন শোনা যায়নি। দারুণ নিরপেক্ষ একটি পুরস্কার।

গল্পপাঠ : আপনার উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে দেখা যায় ‘সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তির রঙিন জগতে ভাসতে, জীবনের নিষ্ঠুরতা, দুঃখ বিপর্যয় এসব নানাদিক সরাসরি অথবা প্রতীক রূপে আপনি চরিত্রগুলোতে ঢুকিয়ে দেন। এই দক্ষতাটি কেবলই কি আপনার দেখার শক্তি? নাকি, সামাজিক, পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা আপনাকে বাধ্য করেছে এসব লিখতে?


নাসরীন জাহান : সচেতনতা, কষ্ট, দুঃখ, এসবের কোনটাই কোন চরিত্রে আমি সরাসরি লিখিনি। ম্যাজিক রিয়েলিজমটা ভাষার মধ্য দিয়ে প্রতীক হিসেবে আসে এবং কল্পনা থেকে সৃষ্টি হয়। চারপাশের দেখার জগত এবং কল্পনাশক্তি দুটোই সমান গুরুত্ব পায়। যখন আমি ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কী ভাবে যেন জেনে যাওয়া হয়। আমি সাংঘাতিক ভক্ত ছিলাম তার। যখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি তখন অনেক কষ্ট করে পড়ে ফেলি ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটা। অনেকে বলে, উড়ুক্কু পড়ে কষ্ট হয়েছে, তেমনি এই বইটি পড়েও আমার তীব্র কষ্ট হয়েছিল। মাথা খারাপ হয়ে যাবার অবস্থা হয়েছিল। তখন আমি চিন্তা করতাম যে, আমার পাঁচটা পাঠক যদি থাকে, তাও থাক। যার ফলে আমি ডিকশনারি থেকে সুন্দর সুন্দর শব্দ বের করে লেখায় ব্যবহার করতাম। তখন কিশোর বাংলায় লেখা দিতাম। ওরা বলতো, নাসরীন, এগুলো বন্ধ করো। তোমার যা আছে তাই নিয়েই তুমি অনেক জোড়ালো আছো। একটা ভাল লেখা পড়লেই ভাল লেখা যায়। তেমনি মানিক, জীবনানন্দ, এদের জীবন এবং লেখা আমাকে প্রভাবিত করেছিল। বিশ্বসাহিত্যে মার্কেজের লেখা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি কখনো প্রবন্ধ পড়ে লেখার অনুপ্রেরণা পাইনি। তবে দর্শন পড়ে পেয়েছি। 

গল্পপাঠ: আপনার লেখায় প্রায়শই চরিত্রগুলো ‘অস্তিত্ব সংকটে ভোগে এবং ভঙ্গুর নৈতিক সীমার ফাঁদে’ পড়ে দুলতে থাকে জীবন ধাঁধায়। আপনি ল্যাটিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতা দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজমের সঙ্গে আপনার ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজমের পার্থক্য কি আছে? থাকলে সেগুলোকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

নাসরীন জাহান : আমাদের দেশের আবহের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার আবহের মিল আছে। আমাদের দেশে মানুষ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করতে গিয়ে আত্মহত্যাও করে ফেলে। ওদের সাথে কোথায় যেন সূতোর মিল পায় তারা। ফতুর মানুষ, কালো মাকড়শা, অভাবের কষ্ট এগুলো আমি তাদের লেখায় দেখেছি। কী ভাবে তারা লিখছে সেই কাঠামোটা হয়ত একটা প্রভাব ফেলে। কিন্তু তারপরও ওদের জীবন আমাদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। আমার যাদুবাস্তবতাটা তৈরী হয় দেশের মাটিকে কেন্দ্র করেই। যেমন আমি তেইশটা গল্পের সমন্বয়ে একটা গল্পের বই করেছিলাম ‘এলেনপোর বিড়াল’। এর সবগুলো গল্পই ছিল ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে লেখা। ওর মধ্যে ৫, ১০, ১৫ লাইনেরও গল্পও আছে। কিন্তু প্রত্যেকটি গল্পের শেষলাইন একটি কমন লাইন। ইশপের গল্পে যেমন থাকে। তেমনি ‘এলেনপোর বিড়ালে’ একটা কমন লাইন ছিলো যে, ‘একটি রক্তাক্ত কালো বিড়াল মরে পড়ে আছে।’ তেইশটি গল্পেরই শেষ লাইন এটা। আমি শেষ লাইন লিখে তারপর গল্প লিখেছি। সনেটের মত,অবশ্য পার্থক্য হল,সনেট এর বাক্য একই থাকে না। যেমন ‘র‍্যাব’ গুলী করছে কালো বেড়াল দেখে, তারা বলছে, আমরা কালো পোশাক পড়ি, এই বেড়ালটাও কালো, এ বোধহয় আমাদের শত্রু, এই বলে গুলি করে ফেলছে। আবার যেমন, পোড়ো বাড়িতে একজন মহিলা অসুস্থ, তার কেউ নেই, এই মহিলার জন্য অসুধ আনতে গ্যাছে বিড়ালটা। বাস্তবের সাথে কল্পনার অদ্ভুত এক মিথস্ক্রিয়া। 

গল্পপাঠ : আপনার লেখার ভাষা ঠিক যেন সাধারণ নয়, একটু কঠিন, কখনোবা অনেক কাব্যময়। এই ভাষার দক্ষতাটি কী ভাবে অর্জন করলেন।

নাসরীন জাহান : ডিকশনারি থেকে যে শব্দগুলো পড়তাম সেটা ছিল শুরু। ছোটবেলা থেকেই এই চর্চার ফলে অনেক শব্দ মাথার ভেতর জমা হয়ে গেল। তারপর বিশ্বসাহিত্য পড়ে পড়ে আরো অনেক ভাষার সংগে পরিচয় হলো। আর বাকিটা সহজাত। আমার স্বভাবে কবিয়াল ব্যাপার আছে এবং সেটা আমার কাছের মানুষেরা জানে। একসময় মনে করতাম যে ভাষাটা সবচাইতে জোড়া্লো করলেই বোধহয় ‘বিষয়’কে পাওয়া যায় বা পিঁপড়ে থেকে অজগর হয়। কিন্তু এখন আমি মনে করি ‘ভাষা’ এবং ‘বিষয়’ দুটোই আমার কাছে সমান। একটার চেয়ে আরেকটা কম না। 

গল্পপাঠ : কেউ কেউ বাংলাদেশের জন্য আলাদা ভাষা নির্মাণের কথা বলছেন। চেষ্টাও করছেন। তারা বলছেন,পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের ভাষা বাবুদের ভাষা। এটা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য চলতে পারে না। এ বিষয়টিকে আপনি কী ভাবে দেখেন? 

নাসরীন জাহান : পশ্চিমবঙ্গের বাবুরা কী লেখেন সেটা আমার ভাবনার বিষয়ই না। সাহিত্যের শুরুর সময় ভাবতাম। এসব খুব চাইল্ডিশ ব্যাপার,আমার কাছে লাগে। 

গল্পপাঠ :  আপনি প্রায়ই বলেন, লেখার মগ্নতা একই সংগে আপনাকে উদ্দেপিত ও ক্লান্ত করে। ‘ঈশ্বরের বামহাত’ লেখার পর আপনাকে সাময়িক বিরতি নিতে হয়েছিল। এই দুটো দিক আলাদা করে যদি একটু বলেন। 

নাসরীন জাহান : আমি গল্পের চরিত্রের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে যাই যে এটা আমাকে ডিপ্রেশনেও ফেলে দেয়। যেমন আমার বাড়িতে মুরগী জবাই হয়। কিন্তু কোনো টাইপের জবাই-ই আমি সহ্য করতে পারি না। কোথাও হতে থাকতে দেখলে অসুস্থ বোধ করি। অথচ ‘প্রতিপক্ষ শকুনেরা’ গল্পে এই আমিই একটা জ্যান্ত গরুকে জবাই করে চামড়া ছিলছে সে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছি, যেন ওটার মধ্যে ঢুকে আমি নাই হয়ে যাই, এই পৃথিবীতেই আমি আর থাকি না। যখন আমি লিখতে থাকি, কলম চলতে থাকে এবং কে লিখছে আমি জানি না। আমি আত্মস্ত করে ফেলি লেখাটা আগে, তারপর লিখতে থাকি। প্রায় ৪০ বছর হয়ে গেল আমি লিখি। লেখাটা একদম শেষ হবার পর আমি পড়ি না। পড়লে ছিড়ে ফেলে দেবো আমি জানি। মনে হবে ‘কিচ্ছু হয়নি’, ডিপ্রেশনটা তখনই গ্রাস করে। তাই যখন প্রুফ আসে তখন পড়ি। 

গল্পপাঠ : উড়ুক্কুতে যে রেজাউলের চরিত্রটি আপনি নির্মাণ করেছেন এরকম চরিত্র সমাজে অনেক। মেয়েদের ছোটোবেলাটা নানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়,নানারকম যৌন হয়রানির শিকার হয় তারা। বাংলাদেশে ধর্ষণের প্রকোপ যে হারে বাড়ছে তা নিয়ে নারী সমাজে প্রচন্ড ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। একজন নারী কথাসাহিত্যিক হিসেবে আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? 

নাসরীন জাহান : সাংঘাতিক আহত আমি। আমার ছায়াকোষ ভেঙে পড়ে একদম। সহ্যই করতে পারি না। ধর্ষকদের টুটি চেপে ধরতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রেতো এটা ভাবাই যায় না। এরকম একটা দেশে কোন ধর্ষকের বিচার হয়েছে বলে আমি শুনিনি। আমি খুবই হতাশ। সরকার প্রচ্ছন্নভাবে পুরুষরাই চালায়। পুরুষতন্ত্রই চলে। যেখানে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া উচিত সেখানে বিচারই হয় না। একটা মেয়ে কোনভাবে যদি কোর্টে যায়, তাহলে তাকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়, চিন্তাই করা যায় না। আমি আমার ‘ইয়েস আর নো’ গল্পের মধ্যে এরকম একটা ঘটনা লিখেছি। ‘ছেলেটি যে মেয়ে মেয়েটি তা জানত না’ এই বইয়ে আছে। 

গল্পপাঠ : ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চন্দ্রের প্রথম কলা’। রূপকথাধর্মী এই উপন্যাসটি প্রথমটির তুলনায় কম সাড়া লাভ করে। রূপকথা নিয়ে লেখার ইচ্ছে কেন হোলো? আর কেনই বা এটি পাঠক জনপ্রিয়তা পায়নি বলে আপনার মনে হয়।

নাসরীন জাহান : প্রথমত এটা রূপকথাই না,মূলত মিথ নিয়ে লেখা। তবে রুপকথার আদলে লেখা এবং কাঠামোটা রূপকথার মতন। ভেতরের বিষয়গুলো পুরাই মিথ। মহাভারত, রামায়ণ, বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছে। এটা যখন লিখতে গেলাম তখন আমার ভয় হয়েছিল। আমার দুবার এরকম ভয় হয়েছিল। প্রথমবার আমি যখন কলাম লিখছিলাম ‘নিরানব্বইয়ের যাত্রীরা’ তখন পাঠকদের মধ্যে সারা পড়ে গেল। এটা উপন্যাস লেখার আগের ঘটনা। তখন তসলিমা কলাম লিখে বিখ্যাত। তখন আমি ভাবলাম, সর্বনাশ!! কলাম লিখতে থাকলেতো আমার মৌলিক সাহিত্য থেকে পাঠকের দূরত্ব হবে। তখন আমি ভয় পেয়ে কলাম লেখা বন্ধ করে দিলাম। ঐ লেখা কোনদিন বেরোয়নি আমার। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও ‘উড়ুক্কু’ যখন চারদিকে সারা পড়ে গেল তখন আমি ভাবলাম এখন মানুষজন উড়ুক্কুর মতন লেখা চাইবে আমার কাছে। অসম্ভব! আমি এই কাজ করব না। আমি এমন লেখা লিখবো যাতে পাঠকরা সরে যাবে আমার কাছে থেকে। আমি এইরকম একটা নিরীক্ষা নিজের সংগে করবো এবং দেখাবো যে এটা আমি পারি, আমি ভেসে যাইনি। পাঠক পাবার জন্য আমি পাগল না। দু একজন সিনিয়র লেখক বলেছিলেন, এসব কি করছো? উড়ুক্কু লেখার পরতো তোমার একটা দায়বোধ আছে। যারা আমাকে খুউব পছন্দ করতেন তারাও মানতেই পারলেন না যে আমি এসব করছি। এখন না মানুষ বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখে, কিন্তু তখন ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। কিন্তু এটাও সত্যি যে একইসংগে সেই সময়ে কিছু সলিড পাঠকও পেয়েছিলাম।

গল্পপাঠ : ‘সিসেম দুয়ার খোল’ উপন্যাসটিতে নায়ক মুনতাসির ঘোর বিভ্রাটের শিকার। সে স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য বুঝে না। স্বপ্নকে বাস্তব ও বাস্তবকে স্বপ্ন মনে হয় তার। এই ঘোর বিভ্রাটের সূচনা ঘটে যখন তার বয়স মাত্র চার বছর। চোখের সামনে এক রমণীর ধর্ষণ ও বিভীষিকাময় মৃত্যু মাত্র চার বছর বয়সের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি,যা পরবর্তীতে তাকে ভ্রম ও বাস্তবের মাঝামাঝি জগতে বাস করতে বাধ্য করে। এই ধরনের একটি অন্যরকম চিন্তা নিয়ে উপন্যাস লিখলেন কেন আপনি?

নাসরীন জাহান : উপন্যাসটি মূলত স্বপ্নভ্রম ও যাদুবাস্তবতার উপর লেখা। তখন আমার আচমকা মনে হচ্ছিল যেন আমি ফুরিয়ে যাচ্ছি। নানা টাইপের উপন্যাস লিখতে গিয়ে একটা থেকে আরেকটা আলাদা করার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রবল চাপ অনুভব করছিলাম। এবং প্রতিবারই আমি চেষ্টা করছিলাম এবার যা লিখলাম পরের বার আরেক রকম লিখবো। সিরিয়াস পাঠক এই লেখাগুলো খুব ভালো ভাবে নিয়েছে, বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় খুব প্রশংসিত হয়েছে। আমার লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যরকম সার্থক বলে মনে করি। 

গল্পপাঠ : একজন নারী কথাসাহিত্যিক হয়েও আপনি পুরুষ চরিত্রগুলো কীভাবে এত সুক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলেন?

নাসরীন জাহান : আমার ভাগ্যই বলো, চাঁদের হাট করে শৈশবেই ছেলেদেরকে চিনে ফেলেছি। আমার বাড়িতে ছেলেরা আসতো। আমরা একসাথে আড্ডা দিতাম। সাহিত্যিক আড্ডাগুলোও অনেক উপকার করেছে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে্র ছাদেও ৯ জন ছেলে তুখোর আড্ডা দিতো, পাভেল ও ছিলো তাদের একজন, এছাড়াও সেলিম মোর্শেদ, কাজল শাহনেওয়াজ, আরো অনেকে ছিল। এরা একজনের চেয়ে আরেকজন ভাল। ওদের সংগে আমার বন্ধুত্ব হলো। আমার বিয়ে হয়েছিল যখন আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। ঢাকায় এসে যখন লালমাটিয়া কলেজে পড়ি তখন থেকেই আমি কেন্দ্রে যাই। সাজ্জাদ শরীফ আমার পাড়ায় থাকতো। ওই আমাকে কেন্দ্রে বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ওখানে নানাধরণের বিষয় নিয়ে কথা হতো। যেমন মেয়ে বন্ধুরা পরকীয়া করলে সহজে সেটা বলতো না কিন্তু ছেলেরা খুব সহজেই সেটা বলতে পারতো। অবশ্য সেই সময়ে মেয়েদের পক্ষে এত কথা বলা সম্ভব ছিলোনা। আমিইযে বলতাম তাতে অনেকেই ভীষন তীর্যকভাবে তাকাতো। 

গল্পপাঠ : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আপনাকে এবং আপনার ভাইকে ভারতের সীমান্তবর্তী একটা বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কি লেখা ‘সেই সাপ জ্যান্ত’? এই উপন্যাসে আপনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সমান্তরালে নাজিয়ার জীবনযুদ্ধ এবং বিপর্যস্ততার কথা। যুদ্ধপরাধীদের বিচার আন্দোলন, মৌলবাদ, বীরাঙ্গনা ইত্যাদি ছাড়াও মানুষের বদলে যাওয়া চেহারা নিয়ে লিখেছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা’ এখন বাংলাদেশে কোন অবস্থায় আছে বলে আপনার মনে হয়? এ নিয়ে কি পর্যাপ্ত লেখালেখি হচ্ছে বলে মনে করেন? এ নিয়ে আপনার নিজের কোন পরিকল্পনা আছে কি?

নাসরীন জাহান : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অবশ্যই আমার লেখার ইচ্ছে আছে। শৈশবের অভিজ্ঞতাতো আছেই, আরো আছে বর্তমান জীবন যুদ্ধ, সব মিলিয়েই হয়ত পরের বছরের উপন্যাস হবে এটি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে কিন্তু খুউব ভাল উপন্যাস কিন্তু পাচ্ছি না। আর সত্যিকার অর্থে ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা’ বলতে যা বোঝায় সেটি নিয়ে কাজ হচ্ছে কম। একজন মুক্তিযোদ্ধাই বলছেন, ‘কেন আমি মুক্তিযুদ্ধটা করতে গেলাম’। অবশ্যই এ বিষয়ে লেখার প্রয়োজন আছে।

গল্পপাঠ : আপনি গল্প লেখেন,উপন্যাস লেখেন। এই দুয়ের কোনটি আপনার প্রিয়? লেখক হিসেবে আপনাকে ‘নারীবাদী কথাসাহিত্যিক’ হিসেবে চিন্থিত করলে বিষয়টি কী ভাবে নেবেন? 

নাসরীন জাহান : নারীবাদী বলে আমাকে একটি আলাদা জায়গায় ফেলে দেবারতো কোন দরকার নেই। সংবাদের আবুল হাসনাত বলেছিলেন আমাদের নারী পাতাটা খুব ভাল হয়। তখন মেয়েদের পাতায় মেয়েরা লিখতো আর সাময়িকী পাতায় পুরুষরা লিখতো। তখন আমার জেদ হয়েছিল যে সাময়িকী পাতাতো শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য নয়। এখানে নারী পুরুষ উভয়েই লিখতে পারে। আমি ‘মহিলা’ কেন্দ্রিক কোন কিছুতেই যেতাম না। মানুষ হিসেবে আমি ‘নারীবাদী’ কিন্তু লেখক হিসেবে আমার ‘নারী বা পুরুষ’ আলাদা কোন পরিচয় নেই। লেখক হিসেবে নারীর বিষয় বেশী আসে কারন আমি অভিজ্ঞতায় একজন নারী। যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন অভিজ্ঞতায় পুরুষ। কিন্তু তার হাত দিয়েই আনন্দ বা মালতীর মতন চরিত্রগুলো তৈরী হয়েছে। পুরুষ যখন নারীদের নিয়ে লেখে তখন সেটা চোখে পড়েনা খুব বেশি। কিন্তু আমি যখন নারী হিসেবে ‘পুরুষ’ চরিত্রগুলো লিখি তখন সেটা চোখে পড়ে। অথচ আমার পুরুষ চরিত্রগুলো কিন্তু ভিলেন হয় না। এরা রক্ত মাংসের মানুষ। 


গল্পপাঠ : উনবিংশ এবং বিংশ এই দুই শতাব্দীর একটা বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী আপনি। সেটা তথ্য, প্রযুক্তি সাহিত্য,সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নারীর বিচরণ এখন সবখানেই, কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কি নারীরা সেই অদৃশ্য পরাধীনতাকে জয় করতে পেরেছে? এ সম্পর্কে আপনার কী মত?

নাসরীন জাহান : এই শতাব্দীর আগের সময়টা অনেক দীর্ঘ ছিল। আমরা চিঠি লিখতাম। তখন জানজট ছিলো না। সবমিলিয়ে একটা প্রলম্বিত জীবন ছিল। তখন সবকিছু হেঁটে চলতো, এখন যেন দৌড়ে চলছে। আমরা সময় পেয়ে পেয়ে জীবনের সম্পূর্ণতাকে নেড়ে চেড়ে দেখে পথ চলতাম। তথ্য প্রযুক্তি বা যে কোন কারণেই হোক, আমরা যারা আগের দশক থেকে এই দশকে এসেছি, একেবারে নাস্তানাবুদ দশা আমাদের। এই প্রজন্মের সাথে পাল্লা দিয়ে চলাটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখতে লাগে নারীরা সব করছে, এভারেস্ট জয় করছে, অভিনয় করছে, সিনেমায় যাচ্ছে, ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু আগে হলে মারপিট খেয়ে হলেও সংসারে থেকে যেত মেয়েরা। এখন অনেকেই সংসারে থাকছেনা, একা হয়ে যাচ্ছে। আবার পুরুষরা আগের চেয়েও বেশী হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। কারণ বহু কিছু দেখার সুযোগ ঘটছে তাঁদের। অত্যাচারগুলো তারা করে ধীরে; যে মহিলাটি এর মধ্য দিয়ে যায় সে বুঝে। কাজেই, মেয়েদের অবস্থা আগে একরকম ছিল এখন আরেক রকম। আগে মেয়েরা আপোষ করতো বেশী, এখন করে না।


গল্পপাঠ : ‘নিঃসঙ্গতার পাহারাদার’ আপনার সর্বশেষ উপন্যাস। একটি সাক্ষাতকারে আপনি বলেছেন প্রচন্ড একটা কষ্টের সময়ে এই উপন্যাসটি লিখেছেন। আবেগ, অস্তিত্ব অস্তিত্ত,অনস্তিত্ত,নীতিনৈতিকতার দ্বন্দ্ব, কষ্ট আপনাকে পুড়িয়েছে ঐ সময়ে। সাম্প্রতিককালে সাহিত্য সৃষ্টিতে সবমিলিয়ে কোন বিষয়টি আপনাকে পোড়াচ্ছে, বা দহন করছে?

নাসরীন জাহান : ঐ উপন্যাসটি হাসপাতালে বসে লিখেছিলাম। বসতে পারিনি। শুয়ে শুয়ে লিখেছি। ডাক্তার যখন আসতোনা তখন লিখতাম। এক্সিডেন্টে আমার ব্যাক আর হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। ডাক্তারের বারণ ছিল এসব কিছু করার। আমি কিন্তু আমার জীবন নিয়ে লিখছিলাম না। একটা রাত এবং দুটো চরিত্র ছিল এতে। উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম যে দাঁড়াতে পারতাম না আর মনে হত কোনভাবে মরে যেতে পারলে বাঁচি। আগে কিছুটা লিখে রেখেছিলাম, ভাবলাম এটাই শেষ করি। ভীষন শারীরিক যাতনার মধ্য দিয়ে লেখা। সেই অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে পেরেছি এখন। মনটাও খুব সুস্থ।

গল্পপাঠ : এ বছর কাজুমো ইশিগুরো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি মাত্র ৮টি উপন্যাস লিখেছেন। অদ্বৈত মল্লবর্মন তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাস লিখে চিরায়ত সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মাত্র দুটি উপন্যাস ও ৩৮টি গল্প লিখেছেন। আবার অনেকেই শত শত বইপত্র লিখে ফেলছেন। তাদের অনেক লেখাই পুরবাবৃত্তি। আপনার নিজের বইয়ের সংখ্যাও বেশ চোখে পড়ার মতো। আপনি কি মনে করেন আপনার সব লেখা ধারাবাহিকভাবে মান সম্পন্ন?

নাসরীন জাহান : ইলিয়াস ভাই বেঁচে থাকলে হয়ত আরো লিখতেন। আর লেখা সম্পর্কে আমার নিজের একটা বিচারতো আছেই। নূন্যতম মানসম্পন্ন না হলে আমি বই করি না। একটা মান থাকেই। আমার মনে হয় ‘মৃত্যুসখীগণ’টা ঈশ্বরের বাম হাত’ লেখার ফাঁকেই লিখেছি, যার জন্য ওটা অত মানসম্পন্ন হয়নি। কিন্তু তারপরও অনেক বোদ্ধারাও এই উপন্যাসটিকেই ভাল বলেছে। আর সারা বছরতো আমি আর কিছু করি না। লেখার জন্যই স্কুলের চাকরীটা ছেড়ে দিলাম। গড়ে একটাই উপন্যাস লিখি বছরে। খুব বেশী হলে দুটো। নিজের কাছেও আমার একটা জবাবদিহিতার ব্যাপার থাকে। এই বছর গ্যাপ দিয়েছি। লিখিনি। কিন্তু বইমেলাতে এমন হয়ে দাঁড়ায় যে সবাই নতুন বই চায়। আমি অনেকবার বলেছি, যে বইটা পড়া হয়নি সেটাই নতুন বই। এটাতো পোশাক নয়। যেমন আগামী বছর সব্বাই জিজ্ঞেস করবে আপনার নতুন বই কি? আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। পাঠকের চাপ তো আছেই। কখনও কখনও এই চাপে ভাল লেখাও হয়েছে। আর আমি সারাবছর ধরেই গল্প লিখি। সেগুলো জমিয়ে রাখি হয়ত পরের বছরের জন্য। লেখাটা তৈরী করেই পত্রিকায় দেবার জন্য নাচানাচি করি না।

গল্পপাঠ : এ সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুক্ততথ্য প্রবাহের জগতে আমরা বাস করছি। বিশ্বসাহিত্য আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। বিশ্ব সাহিত্যের কী কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে মনে করেন? বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনায় বাংলা সাহিত্যের মানে কি আপনি সন্তুষ্ট? 

নাসরীন জাহান : বাংলাদেশের সাহিত্য ভালো হচ্ছে। তবে বিষয়ভিত্তিক নিরীক্ষা ও আলাদা ভাষা নির্মাণের ব্যাপারটা অনেক কম। 

গল্পপাঠ : সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছেন। নিজের লেখালেখি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী ?

নাসরীন জাহান : আজ থেকে আঠারো বছর আগে নিরানব্বই সালে আমি সমগ্র সাহিত্যের জন্য এককভাবে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাই। ওই বছরের আগে বা পরে একাডেমী কাউকে একক পুরস্কার দেয়নি। এর দু বছর আগেও আমার পুরস্কার পাওয়ার গুঞ্জন উঠেছিলো। শুনেছি, আমার বয়স কম অজুহাতে দুপুরে বোর্ড মিটিং এর সিদ্ধান্তে সে বছর কাউকে পুরস্কার দেয়নি। ফলে দু,বছরে আমার বয়স বেড়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। কমপক্ষে দশ বছর আগে এ বিষয়ে আমাকে নিয়ে আমার ভাবনা নেই। আমি আমার কন্যা আর হাজবেন্ড আশরাফ মেলায় গিয়ে আইস্ক্রিম খাচ্ছিলাম। সে বছর কড়াকড়ির জন্য কোন গুঞ্জনও উঠেনি। আচমকা ঘোষিত হলো আমার নাম। ভিড় করলো সাংবাদিক। আমার হাত থেকে আইস্ক্রিম খসে পড়ল। পুরস্কারের দিন মঞ্চবক্তৃতায় আমার লেখার জীবনে সুবিশাল অবদানের জন্য আশরাফের কথা উচ্চারণ করায় আনিসুজ্জামান স্যার আশরাফ’কে মঞ্চে ডেকে নেন। আমি সেসময় একটা ডিপ্রেশনে ভুগছিলাম। ফলে মঞ্চ উত্তেজনায় কিছুটা সময় উচ্ছ্বসিত থাকলেও যখন মঞ্চ ছেড়ে ডি.জি.সাহেবের রুমে পানাহারের জন্য যাচ্ছি, তখন আমার আঁধার ডিপ্রেশন জুজুবুড়ি হয়ে আমাকে ঘিরে ধরলো। কী যেন খসে পড়লো। ডি.জি. সাহেবের রুমে এসে পেছনে দাঁড়ানো আশরাফ বলে, এই যে দেখেন, মঞ্চ-মেঝেতে নাসরীন চেক ফেলে এসেছে। সবাই তুমুল হাসতে থাকলো, ভালোইতো, নাসরীন এমন ভুল করবে,আর আপনি তার সংশোধন করতে থাকবেন। প্রচুর সাংবাদিক, বন্ধু মহলের প্রশ্ন ছিল; পুরস্কার আমার দায়িত্ব বাড়িয়ে দিলো কী না। আমি তুমুল হেসে বলেছি,প্রশ্নই উঠে না। লেখক নিজ দায়িত্ব লেখেন,পুরস্কার কখনোই লেখকের চেয়ে বড় হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

গল্পপাঠ : তরুণ প্রজন্মকে ‘লেখক’ হতে হলে কোন বিষয়টিতে তাদের খুব বেশী মনযোগী হতে হবে বলে আপনি মনে করেন?

নাসরীন জাহান : বইমেলায় এখন সারাদিন ‘বই উন্মোচন’ হয় আর টেলিভিশনে দেখানো হয়। এদের অনেক বই-ই যাচ্ছে তাই। আমরা প্রচুর কষ্ট করে লেখা ছাপাতাম। সাহিত্য পাতায় লেখা ছাপতাম। এসব তরুণ প্রজন্মকে জানাই। সবসময় বলি, পত্রপত্রিকায় দিয়ে দিয়ে লেখাটা পরিচিত করো আগে সাহিত্য মহলে। আমরা কিন্তু অনেক জুনিয়র অবস্থায় আনিসুজ্জামান এবং আরো অনেকের কাছে যেতাম। জানতে চাইতাম লেখা কিছু হলো কিনা। তখন লেখকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করতেন। এখন তারা করে কিনা জানিনা। তবে আমি কিন্তু বলি। কাউকে না কাউকে পড়িয়ে জানতে হবে লেখাটা কেমন হল। আমরা বন্ধুদেরকে লেখা পড়াতাম। একজন আরেকজনের লেখা পড়তো। সেটা ছিল একটি সাপ্তাহিক আড্ডা। এছাড়াও নতুন প্রজন্মকে প্রচুর ভাল বই পড়তে হবে। লেখকের গুরুই হলো ‘বই’। বিশ্ব সাহিত্যের সেরা গল্পগুলো যেভাবেই হোক পড়তে হবে। 

গল্পপাঠের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মৌসুমী কাদের।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন