বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

শামীম আখতার এর সাক্ষাৎকার

শামীম আখতার : সাহিত্য সম্পাদক, চিত্রনাট্যকার ও  চলচিত্র নির্মাতা

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে স্ফুরণ ঘটে শামীম আখতার এর আধুনিক মানসিকতার। এসময়ে ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় খন্ডকালীন কাজ করেন তিনি এবং চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখতে শুরু করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশুনা শেষ করে তিনি গবেষণায় যুক্ত হন ‘সেন্টার ফর সোস্যাল স্টাডিজ’ নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিতে। পরবর্তিতে কাজ শুরু করেন ইউনিসেফে। পর্যায়ক্রমে লেখালখির ঝোঁক থেকে যুক্ত হয়ে পড়েন দৈনিক সংবাদ পত্রিকাটিতে এবং দীর্ঘ ১৪ বছর সেখানে কাজ করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ‘মেয়েদের পাতা’র সম্পাদনার কাজ করেন তিনি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশি-বিদেশী প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই প্রথম নারী চলচ্চিত্রকার। ১৯৯১ সালে তারেক মাসুদের সাথে যৌথ উদ্যোগে ‘সে’ নামের নারীমুক্তি বিষয়ক একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেন। এরপর নির্মাণ করেন ‘গ্রহণকাল’,মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র ‘ইতিহাস কন্যা’(১৯৯৮),‘শিলা লিপি’(২০০০)এবং সর্বশেষ চলচিত্র ‘রিনা ব্রাউণ’ যা ২০১৭ তে মুক্তি পায়। এছাড়াও রয়েছে ৩০ টিরও বেশি বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র। নারী বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনন্যা’ তেও কাজ করেছেন তিনি। সংবাদ পত্রিকায় সুদীর্ঘ ১৪ বছর সময়ে কাজের সূত্রেই অনেক লেখা লিখতে হয়েছে তাঁকে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত দুটি বই রয়েছে। একটি অনুবাদ সাহিত্য,এ্যাগনেস স্মেডলির ‘ডটার অব আর্থ’ যা ‘মৃত্তিকা কন্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে এবং অন্যটি নারী বিষয়ক ভাবনার উপর একটি মৌলিক রচনা ‘আমাদের সনাক্তকরণ’।)

গল্পপাঠঃ সাহিত্যের সংগে তোমার যোগাযোগ হয়েছিল কিভাবে?

শামীম আখতার : সাহিত্যের সংগে যোগাযোগ হয়েছিল একদম শৈশবে, স্কুলে। তখন আমার বাবা ইংরেজী কবিতাগুলো নানাভাবে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। শুরুটা ছিল ইংরেজী মাধ্যমে। সাত বছর পর্যন্ত আমি বাংলা কি জানতাম না। তারপর মা আমার নানাকে চিঠি লিখতে শেখাতে গিয়ে বাংলা চর্চাটা শুরু করলেন। এরপর ভাই আর বাবা এবং বাবার বন্ধু রমেশ চন্দ্র রায় এর সহায়তায় সেই চর্চা অব্যাহত থাকলো এবং ছ’মাসের মধ্যেই আমি পড়তে শুরু করি ‘রামের সুমতি’। এরপর ঐযে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করলাম, ১০/১১ বছরের মধ্যে বড় বড় সাহিত্য পড়া শেষ হয়ে গেল। কড়ি দিয়ে কিনলাম, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, কিরিটী রায়, বঙ্কিম সব পড়া শেষ। গোগ্রাসে যেন গিলে খেতে থাকলাম বাংলা সাহিত্য। এমনকি স্কুলে হাইয়েস্ট মার্কও পেতে শুরু করলাম। টিফিন পিরিয়ডে খাওয়া ফেলে চলতে থাকলো গল্প বলা। এমনকি লিখতেও শুরু করলাম দুঃখী দুঃখী গল্প। তবে সেসব গল্পে সবগুলো নায়ক নায়িকাকে মেরে ফেলতাম। এরপর ইংরেজীতেও লিখেছি ইয়ং অবজারভার লীগার এ। এটা ছিল অনেকটা কঁচি কাঁচার আসরের মতন। এরপর ইউনিভার্সিটি সেকেন্ড ইয়ারে পৌছে আমি ‘সচিত্র সন্ধানী’তে কাজ করতে শুরু করলাম। সাপ্তাহিক বিচিত্রার সাথে প্রতিযোগিতা করে এটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কবি বেলাল চৌধুরী ছিলেন এর নির্বাহী সম্পাদক। এবং সেখানেই কলেজ ইউনিভার্সিটির তরুন তরুনীদের বিষয়গুলো নিয়ে মূলত আমি ইনোভেটিভ লেখাগুলো লিখতে শুরু করলাম। তখন একটা কভার স্টোরী করেছিলাম যেখানে কাইয়ুম চৌধুরীর সিলেকসনে আমার একটা ছবিও দেয়া হয়েছিল প্রচ্ছদে, যেটা তুলেছিলেন পাভেল রহমান। তখন বেলাল ভাই ‘ঘুম নেই’ বলে একটা সাইন্স ইস্যূ নিয়ে লিখবো কিনা জানতে চাইলে আমি বলেছিলাম, আমি উইমেন্স ইস্যু নিয়ে লিখতে চাই। তখন নারী বিষয়টি নিয়ে নতুন চোখ খুলতে শুরু করেছিল। এবং তখনই ‘অন্তত পঞ্চাশ পঞ্চাশ’ নাম দিয়ে ‘ইকুয়েল রাইটস’ বিষয়টি নিয়ে লিখতে শুরু করি। প্রথম বিশ্ব এবং তৃতীয় বিশ্বের সংগে তুলনা করে বললাম, পুরুষ হলো প্রথম বিশ্বের মতন প্রভাবশালী আর নারী হলো তৃতীয় বিশ্বের মতন নিষ্পেষিত, সব দিক থেকেই। এর পর দেড় বছর টানা লেখালেখি চললো, ইউনিভার্সিটি পাশ করলাম। এবং তারপর এক বছরের জন্য সিএসএস এর কাজে গ্রামে চলে গেলাম। এরপর ইউনিসিফে ঢুকি এবং ওদের পলিসি ছিল যে ওদের নিজস্ব লেখা ছাড়া আর কোন লেখা অন্য কোথাও ছাপানো যাবেনা। সেই সময়ই আমার হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায় এবং চাকরী ছেড়ে দিই। টেলিভিশনে টুকটাক কাজ করতে শুরু করলাম। ঠিক সেই সময়ে শুনতে পেলাম সংবাদে লোক নেয়া হবে। এবং এরপর আমাকে মেয়েদের পাতার দায়িত্বটি দেয়া হল। মেয়েদের পাতাটি তখন নতুন অবয়বে আবার শুরু হল। এরিক ইয়ং এর কবিতা, কবি সুফিয়া কামাল সহ আরো অনেক নতুন নতুন লেখা নিয়ে প্রথমবার ‘নারী পাতা’টি সাজিয়ে ফেললাম। 

গল্পপাঠঃ তখন কারা তোমাকে লেখার জন্য প্রভাবিত করেছিল?

শামীম আখতার : বিশ্ব সাহিত্য থেকে ১৮ শতকের ইংরেজী সাহিত্যিক ও নারীবাদী এরিকা ইয়ং এর প্রথম উপন্যাস,‘ফিয়ার অফ ফ্লাইং -১৯৭৩’। উপন্যাসটিতে একজন নারীর যৌন ইচ্ছা সহজভাবে প্রকাশের জন্য পাঠকের মধ্যে যে একধরণের স্পর্শকাতরতা তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে অনেক লেখা লিখে ছেপে ছিলাম। 

গল্পপাঠঃ ‘নারী পাতা’ আলাদা করে গুরুত্ব দিয়ে কেন ছাপানো হলো? এর মূল ফোকাসটি আসলে কি ছিল? নারী সাহিত্য সম্পর্কে পাঠককে জানানো ? নাকি নারীর ক্ষমতায়ন?

শামীম আখতার : নারী পাতা মানেই মনে করা হত মেয়েদের ‘রোল ওরিয়েন্টেড’ লেখালেখি, যেমন ‘ঘর সাজানো’, ‘সাজ সজ্জা’ এসব লেখা। সে সব থেকে বেড়িয়ে এসে নারীর ক্ষমতায়নটাকে আলাদাভাবে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি; তবে সেটা ঠিক এনজিওরা যেভাবে ক্ষমতায়নকে বর্ণনা করে ঠিক সেটা নয়; এর মূল উদ্দেশ্যে ছিল সেরিব্রাল উইমেন ক্রিয়েট করা যেখানে মেয়েদের ভাবনা, চিন্তা-চেতনা আরো জোরদার হবে, পরিপুষ্ট হবে। সে লেখা নারী বা পুরুষ যেই লিখুক না কেন, তবে তাঁর সাহিত্য মান থাকতে হবে। যেমন, ইতালিও লেখক ওরিয়ানা ফাল্লাচির 'Letter to a Child Never Born’ উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন আনু মুহাম্মদ ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ যা ধারাবাহিকভাবে সংবাদে মেয়েদের পাতায় ছাপা হয়েছিল। ফরাসি লেখক,বুদ্ধিজীবী,অস্তিত্ববাদী দার্শনিক,রাজনৈতিক-কর্মী,নারীবাদী ও সমাজতত্ত্ববাদী ‘সিমোন দ্য বোভোয়ার’ দর্শন,রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়াবলির উপর নানারকম লেখা ছাপা হতো। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ল্য দোজিয়েম সেক্স (দি সেকেন্ড সেক্স) থেকেও অনুবাদ ছাপা হতো। তাছাড়া, রাণী রাসমণি, বেগম রোকেয়াকে নিয়েও লেখা হতো। আবার পাশাপাশি নারীর শারীরিক সুস্থতা বিষয়ে যখন লেখা হচ্ছে তখন ‘আমার শরীর আমার সিদ্ধান্ত’ নামে একটি কলাম ছাপা হত যেখানে লেখা হয়েছে পুরুষশাষিত সমাজে মেয়েদের কিভাবে অবদমিত করা হয়। যখন পুরুষ শিশুর প্রয়োজন তখন প্রজননকে গুরুত্ব দেয়া হয়, আবার যখন প্রয়োজন নেই, তখন লাইগেশন করতে বলা হয়। এক্ষেত্রে মেয়েদের সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষমতা বা স্বাধীনতা থাকেনা। জন্মের পর থেকেই ‘যৌনাঙ্গ’ই যেন হয়ে ওঠে একটি বিশেষ লক্ষ্য বস্তু। যেমন নারীকে সতী থাকতে হবে, কেউ ধর্ষণ করলে তার সতীত্ব নষ্ট হয়ে যাবে, কাজেই পোশাকের আড়ালে তাঁর শরীর ঢেকে রাখতে হবে এবং এক পর্যায়ে শরীটা অদৃশ্য হয়ে যেতে বাধ্য হবে। নারীর এই জীবনটা পরিপার্শ্বের সংগে ভীষনভাবে সাংঘর্ষিক ও রাজনৈতিক। এখানে সমাজ, রাষ্ট্র সবই কিন্তু নারীর অবদমনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এটা ভাঙার জন্যই মূলত পত্রিকার সাথে কাজ করাটাকে আমি একটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছি। 

গল্পপাঠঃ বাংলাদেশে নারীবাদী চেতনাটি কিভাবে গড়ে উঠলো এবং এর মধ্যে তুমি কিভাবে নিজেকে আবিষ্কার করলে?

শামীম আখতার : ৬০/৭০ দশকে উইমেন ইস্যূ নিয়ে পুরুষের মধ্যে নানা প্রতিবাদ দেখা দিচ্ছিলো যখন নারীদের মনে একধরণের বুদবুদ তৈরী হয়েছিল। ১৯৭৫-১৯৮৫ সালকে ‘নারী দশক’ ঘোষনা দেয়া হয়। পুরুষের নানা প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যই মেয়েরা তখন লিখতে শুরু করলেন। সেইসময় প্রচুর সাহিত্য আমার পড়া হয়েছে। যেমন এডনা’ও ব্রায়ান এর নারীবাদী লেখাগুলো, সিমোন দ্য বোভোয়ার সেকেন্ড সেক্স পড়তে শুরু করলাম, নারীবাদ বুঝতে চেষ্টা করলাম। বেলাল চৌধুরী তখন আমাকে এরিকা ইয়ং পড়ালেন, অনুবাদ করতে বললেন, তাসলিমাকেও পড়িয়েছিলেন। আমরা কিন্তু লিখেছি। তখনও কিন্তু পুরুষদের সেই চেতনা হয়নি যে তারা আমাদের গ্রহণ করবে, দু-চারজন ছাড়া বেশীরভাগই নারীর শরীরের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু মনের দিকে নয়। বরং উল্টো তারা চরম ‘পুরুষ’ হতে শুরু করেছিল, নারীবাদের বিপক্ষে ক্ষমতা দেখাতে শুরু করেছিল। তখন নারীপাতাটি আমাকে একটা বিশেষ জায়গা দিয়েছিল লিখতে। 

গল্পপাঠঃ বর্তমানে সফল এমন অনেকেই সংবাদের নারীপাতায় লিখতেন? তাদের কথা একটু বলুন।

শামীম আখতার : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত শাহীন আকতার, শাহাদুজ্জামান, ছাড়াও আনু মুহাম্মদ, সোনিয়া নিশাত আমিন, পাপড়ীন নাহার, হাসান মামুন, মৌসুমী কাদের অনেকেই ধারাবাহিকভাবে লিখতেন। নারীপাতায় একটা পলিটিক্যাল অংশ রেখেছিলাম, যতই ‘কাঠখোট্টা নারীবাদী’ বা দূর্বল হোক না কেন তবুও যেন ‘নারীবাদ’ নিয়ে কিছু লেখা হয়। ইকোনোমিস্টের দৃষ্টিকোন থেকে জাহানারা হক লিখতেন খুব ভাল। ১৯৮৪ তে কামলা ভাসিনের প্রথম এক্সুসিভ ইন্টারভিউ ছাপানো হয়, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ডেভেলপমেন্ট ইকোনোমিক্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের অধ্যাপক বিনা আগারওয়াল লিখেছেন ‘অর্থনীতি এবং নারী’ বিষয়ে, ড সোনিয়া নিশাত আমিন লিখেছেন ‘বস্টন ডায়রী থেকে’, মালেকা বেগমের ‘আমি নারী’ বইটি বেরিয়েছে, নাজমা জেসমিন চৌধুরী, মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, তাসলিমা নাসরিন এরা সবাইই লিখেছেন। এছাড়াও চলচিত্র নিয়ে নানা অনুবাদ সহ নানাধরণের লেখা ছাপা হয়েছে। 

গল্পপাঠঃ তসলিমা নাসরিনের লেখা কি ছাপা হতো? তার সাহিত্যমান কেমন ছিল?

শামীম আখতার : তাসলিমা নাসরিনের দারুণ কিছু কবিতা ছাপা হয়েছিল। নারী-১, নারী-২ নাম করে সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতেন। ওর খুব সুন্দর গোটা গোটা হাতের লেখা ছিল। সেগুলো ময়মনসিংহ থেকে ও পাঠাতো।

গল্পপাঠঃ আর কি বিষয় তুমি আলদাভাবে নারী পাতায় তুলে ধরতে পেরেছিলে?


শামীম আখতার :  ‘তাৎক্ষনিক টাটকা সংবাদ’ নামে কিছু রিপোর্টিং এর কাজও চালু করেছিলাম। চট্রগাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কিছু ছেলে যখন একটি মেয়েকে ধর্ষণ করলো তখন সেটি রিপোর্টেড হয় মেয়েদের পাতায়। দূর্গাপূজো ঠিকমত হয়নি, সেই রিপোর্টগুলো আলাদাভাবে প্রকাশ করা হতো। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলে ধরাটাও ছিল এ পাতার লক্ষ্য। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে এই মেয়েদের পাতা। সামরিক সৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে এটি। তখনও কিন্তু সতর্কভাবেই লিখতে হ্ত যেহেতু কঠিন সেন্সরশীপ ছিল।

গল্পপাঠঃ ‘রূপান্তর’ নামের যে নারীবাদী একটা প্ল্যাটফর্ম তুমি তৈরী করেছিলে তার উদ্দেশ্য কি ছিল?

শামীম আখতার : আমার ইচ্ছে ছিল অনেক নারী লেখক তৈরী হোক। নারী বা পুরুষ উভয়েই নারী ইস্যূতে অনেক লেখালেখি করুক। তখন ঐ চাপবোধটা টের পেয়েছিলাম। ১৯৯১ সালে এরশাদ পতনের পরপরই সংবাদে থাকাকালীন সময়েই চাকরীর পাশাপাশি মাসিক পত্রিকা হিসেবে রূপান্তর বের করি। রূপান্তরে শুধুমাত্র সাহিত্য বিষয়েই লেখা বা কথা হতো তাই-ই নয়, এখানে একটি সচেতন নারীবাদী গ্রুপ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যেখানে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নিয়মিত অংশগ্রহণ করত। যাদের জন্য নানারকম ক্লাসেরও ব্যবস্থাও ছিল। দাউদ হোসেন ‘দাস ক্যাপিটাল’ বোঝাবার জন্য ক্লাস নিতেন। তাছাড়া নারী ইস্যূতেও আমরা স্টাডি সার্কেল করতাম। নারীর বিবর্তণ, ইতিহাস, উঠে দাঁড়ানো, সবই আলোচনা হত। সকলে এককাতারে একই প্ল্যাটফর্মে, একই চেতনার অংশীদার হয়ে কাজ করতাম আমরা। ঐ চেতনার জায়গা থেকে যারাই সেসময়ে লিখেছে, আজকে কিন্তু তারা প্রচন্ডভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া মানুষ। নিজের বোধের সংগে চেতনার সীমানার জায়গাটা খুঁড়ে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা ছিল সকলের। পুরুষতো সীমানার চারদিকে বিরাজমান কিন্তু নারীর জায়গা থেকে ঐ পার্স্পেক্টিভটা ছিল অনেক ফোকাসড। 

গল্পপাঠঃ ৮০ এবং ৯০ দশকে দুটো প্রজন্ম তোমার চোখ দিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে চিনেছে। সেই তুমি কীভাবে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে চলচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলে?

শামীম আখতার :  আমার চলচিত্রপ্রীতিটা আগে থেকেই খুব তীব্র ছিল। আমি আরো বৃহত্তর মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। আর লেখালেখিতে তখন মেয়েরা আসছিলো, তাই ধরেই নিয়েছিলাম আরো আসবে। আর চলচিত্রে নারীদের জন্য একটা জায়গা তৈরীর কথাও ভাবছিলাম এবং সেই চিন্তা থেকেই ধেয়ে চলে গেলাম সেদিকে। স্ক্রিপ্ট লেখার কাজটিও প্রচন্ড কষ্টসাধ্য ব্যাপার, একটা উপন্যাস লেখার মতই। ৭৭ সাল থেকেই আমি সক্রিয়ভাবে চলচিত্র সংসদ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম। এই সংগঠনটি বিভিন্ন এম্বাসি থেকে সেরা সিনেমাগুলো এনে দর্শকদের দেখাবার ব্যবস্থা করতো। সেই সূত্রে বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপেও যোগ দিয়েছি। আমার সংগে শাহাদুজ্জামান, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর আরো অনেকেই ছিল। খসরু চৌধুরী ছিলেন মূল অরগানাইজারদের একজন। এখান থেকেই শুরু হয় নানারকম দার্শনিক ভাবনা চর্চা, বিনোদন, এবং সর্বোপরি চলচিত্র পাঠ। অর্থাৎ চলচিত্রের ইতিহাস, তার নান্দনিকতা, নির্মাণশৌলী, নির্মাণরীতি, ইত্যাদি সম্পর্কে জানা এবং শেখা।

গল্পপাঠঃ চলচিত্রে তোমার গুরু কে? এবং চলচিত্র নিয়ে তোমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

শামীম আখতার :  সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র আমার গুরু। আমার কনিষ্ঠের কাছেও আমি শিখি। বয়সের তারতম্য নিয়ে ভাবিনা। তবে সত্যিকার ভক্ত সত্যজিৎ রায় এর। আর আমার পাগলা গুরু হল ঋত্বিক ঘটক। এ পর্যন্ত ইতিহাসকন্যা, শিলালিপি বা রিনাব্রাউণের স্ক্রিপ্ট নিজেই লিখেছি যার সবগুলোই ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। তারপও মনে হয় ঠিক মনের মত যেন অনেক কিছুই বলতে পারিনি। এর পরের চলচিত্রটি হবে একদম নারী ইস্যু এবং বীরাঙ্গনাদের নিয়ে। ‘নারীর চোখে পৃথিবী দেখা’। 

গল্পপাঠঃ তোমার চলচিত্র নিম্নবিত্তকে প্রতিনিধিত্ব করেনা বলে যে মন্তব্যটি শোনা যায় সেটি তুমি কিভাবে ব্যখ্যা করো?

শামীম আখতার :  ভাবনা চিন্তার দিক থেকে মধ্যবিত্তই কিন্তু সবচাইতে সমৃদ্ধ একটা শ্রেনী। কারণ তারা আত্মিকভাবে এমন একটা দৈন্য অবস্থানে থাকে যেখান থেকে সে নিচ এবং উপর দুদিকটাই দেখতে পায়। ভাবের মধ্যে পড়ে নিম্নবর্গকে নিয়ে চলচিত্র করতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলো কিন্তু তাদের যন্ত্রণাকে ঠিকভাবে তুলে ধরছেনা বরং মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভংগীটাই প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মধ্যবিত্ত এখনও পর্যন্ত আষ্টেপৃষ্ঠে ভীষনভাবে সংস্কারাবদ্ধ। সেই জায়গা থেকেই আমি নারীদের ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছে রাখি ভবিষ্যতে। 

গল্পপাঠঃ সাহিত্য বা চলচিত্র উভয়ক্ষেত্রেই ওপার বাংলার সাথে তুলনা করলে আমরা পিছিয়েই আছি। এর কারণটা আসলে কি?

শামীম আখতার :  চলচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অনেক কম। প্রশিক্ষণ লাভের ক্ষেত্রে তারা খুব একটা আগ্রহী নয়। আমিতো মাঝে মাঝে বিভিন্ন ইন্সটিটিউটে পড়াই। সেদিন পড়াতে গিয়ে দেখি ২৫ ছাত্র-ছাত্রী রেজিস্টার করেছে। ক্লাসে গিয়ে দেখি ২৩ জন ছাত্র আর ২ জন ছাত্রী। তাও সেদুটো মেয়ে এসেছে এডিটিং করে নিজের সংসার চালাবে সেই তাগিদে। ‘আমি চলচিত্র নির্মাতা হবো’ এই স্বপ্নটা তাদের মধ্যে হয়ত সুপ্ত থাকে কিন্তু পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক চাপ, এবং নারী হিসেবে সাপোর্ট না থাকার কারনে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে। 

গল্পপাঠঃ আশি বা নব্বই দশকে মেয়েরা যতটা সচেতন ছিল বা সাহিত্য-সংস্কৃতির সংগে যুক্ত ছিল এখনকার বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রটা কেমন?

শামীম আখতার :  এখন চিত্রটা একদম বদলে গেছে। স্বপ্ন, চেতনা এগুলো মুছে দিয়ে কর্পোরেট জগত তৈরী হচ্ছে যেখানে ঘরে টাকা আনাটাই মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও এগুলোতে তারা কাজ পাচ্ছে। উপার্জনটাই মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মোহভংগ না হলে কোনদিনই কোনকিছু হবেনা। তখনকার মেয়েরা চাকরীও করত পাশাপাশি রাত জেগে লিখতো। আজকাল সেই বোধ বা উত্সর্জনটা নেই; আর মধ্যবিত্ত যেন আরো সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ধর্মীয় সংস্কার তাদের পেয়ে বসেছে যেকারণে আগের মতন দর্শক হয়না যে তারা দৌড়ে দৌড়ে সিনেমা দেখতে যাবে। ফেসবুকে চ্যাট করতে তারা যতটা ব্যস্ত ততটা ব্যস্ত নয় গুরুত্বপূর্ণ এবং সৃজনশীল লেখালেখিতে। যারা লিখছেন তাদের লেখায় নারীর অবস্থান সুদৃঢ় না। 

গল্পপাঠঃ নারী উন্নয়নে রাষ্ট্রের দায়ভারটিকে তুমি কিভাবে দেখো?

শামীম আখতার : চেতনার জায়গাটি সম্পূর্ণ মার খাচ্ছে কিন্তু পূজির কাছে। যেমন গার্মেন্টসের মেয়েরা কাজ করে টাকা এনে জিডিপিতে যোগ করছে আর রাষ্ট্র দেখাতে পারছে আমাদের অর্থনীতিতে নারীর যুক্ততা এত পার্সেন্ট। ৫০% নারী আর ৫০% পুরুষ। সেখানে ৫০% নারীকে হিজাব চাপিয়ে সক্রিয় দেখতে পারলেই খুশী । রাষ্ট্র তাকে সচল রাখবে, বাইরে বেরুতে দেবে, অর্থনীতির সাথেও যুক্ত করবে। আজকাল হিজাবের পাশাপাশি প্রচুর মেয়েরা কিন্তু প্যান্ট-শার্ট পড়ে হাটছে, মোটরবাইক চালাচ্ছে। কাউকে ঘাটানো হচ্ছেনা। কিন্তু নারী চেতনার জায়গাটি কতটা সুদৃঢ় হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। যারা নিজেদের একসময় প্রগতিশীল বলে প্রচার করেছে তারাই আজ কনফিউজড। এরশাদ পতনের পর জামাতের এত প্রসার এবং মৌলবাদের উত্থান, এসবই সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ সবকিছুকেই কচুকাটা করেছে। যারা প্রগতিশীল বলে নিজেদের দাবী করত বা করে তাদের মধ্যেই তো চেতনা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। নারী ইস্যুতে বড় বড় পত্রিকাগুলোতে আলাদা কোন গুরুত্ব নেই। এরশাদ পতনের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা জামাতকে এত প্রসার ঘটিয়েছিল যে এর চাপ এখনো বহন করতে হচ্ছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্ত্রনালয়, সব জায়গাতেই জামাত তলায় তলায় যুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং আমরাই ‘জগাখিচুরী’ রয়ে গেছি চিন্তাভাবনায়। আমরা যারা দেশের মূল হয়ে কাজ করতে পারতাম তারাই সংখ্যায় হাতে গোনা হয়ে গেছি। আজকাল মেয়েরা যে সব আধুনিক পোশাক পড়ছে সেটা ট্রেন্ড এর অংশ হিসেবে পড়ছে। সংস্কার ভাঙার ভাবনা থেকে পড়ছেনা। সহজ পোশাক বলেই গ্রহণ করছে। আমাদের সময়ে সেটা সংস্কার ভাঙার জন্য করা হত। নারীবাদ মূলত পিতৃতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করে । ‘নারীবাদ’ শুধু কথার কথা না, বা শুরু থিওরী না। এটাকে প্র্যাক্টিসে আনাটা জরুরী। আজকে নারীদের জন্য যে সব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেগুলো নারী আন্দোলন এবং নারীবাদী চেতনারই প্রতিফলন। এই পরিবর্তন গুলোকেই আরো সুদৃঢ় করতে হবে। 

গল্পপাঠঃ লেখালেখি নিয়ে নারীদের চর্চার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে তোমার সামগ্রিক মতামত কি ?

শামীম আখতার :  আমি মনে করি অনেক চর্চা হচ্ছে তবে সেটা আরো গভীরভাবে হওয়া প্রয়োজন। আরো ভাল করে বোঝা দরকার ‘কোথায় শাষন’, ‘কোথায় শোষন’। নারী যখন ধর্ষণ অথবা সহিংসতার শিকার হয় তখন সেটি যথাযথভাবে সনাক্ত করতে হবে কেন বিষয়গুলো ঘটছে? নারীবাদ কেবল নারীর জন্য নয় এটা পুরুষের জন্যও। নারীর বিকাশ মানে সমাজের বিকাশ। নারী এবং পুরুষ উভয়ে মিলেই সেটা কার্যকর করতে হবে। এখনও সামাজিক অসংগতিগুলো রয়ে গেছে। নারীর ব্যাপ্ত হবার ক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনুমোদন নেই। সমাজকে নারী বিষয়ে উদার হতে হবে। নারীর পরিসর আরো ব্যপ্ত হোক সেই কামনাই থাকলো।


শামীম আখতার ও তারেক মাসুদ পরিচালিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ মুভি ‘সে’

গল্পপাঠের পক্ষে সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন মৌসুমী কাদের। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন