বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়'এর প্রবন্ধ : পিঙ্ক ইন দ্য ভ্যালি ও রুপালী জলসশ্য

Edit with the Docs app
Make tweaks, leave comments, and share with others to edit at the same time.


পিঙ্ক ইন দ্য ভ্যালি ও রুপালী জলসশ্য ঃ নেতিকরণ ও মাইক্রো-আক্রমণের দাবাও নির্মাণ
(অন্দরের বাহিরানা, বাহিরানার অন্দরঃ নেতিকরণ ও মাইক্রো-আক্রমণের দাবাও-নির্মাণ)

-অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

Violence is a calm that disturbs you
- Jean Genet


হাল-অধুনা আমেরিকার টেক-ইন্ডাস্ট্রির কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের মুল দুটি সমস্যাকে সমাজবাদীরা চিহ্নিত করছেন- মাইক্রো-আগ্রাসন ও পারিশ্রমিকের অসম বণ্টন। এ ব্যাপারে সিলিকন ভ্যালি অস্কার দৌড়ের প্রথম সারিতে রয়েছে। এই বৈষম্য যা কোন খণ্ড চিত্র না। বিচ্ছিন্ন ঘটনাও না সারা পৃথিবী ভেদে।

তারসাথে যোগ হচ্ছে ব্যক্তির পার্সোনাল, যা আসলে পলিটিক্যাল। অন্দরের বাহিরানা ও বাহিরানার অন্দর। তিনি নারী হলে বা মাইনরিটি, অবস্কিওর রাংতায় মুড়ছে কর্মজীবণ।

শুধু সিস-জেন্ডার স্ট্রেইট শাদা-পুরুষ না, সিলিকন ভ্যালি এখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, গেরুয়া আমদানীতে উব্জে উঠেছে। এদের বুলিবাজীর আরও পালক আছে । সেখানে মেয়েদের গায়ের রঙ, যৌনাঙ্গের গড়ন, যৌন ইচ্ছার ধরণ ছাড়াও আছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত চাড্ডি -অধ্যুষণ।

এমনিতেই পঁচাত্তর শতাংশ আমেরিকান কর্মক্ষেত্রে বুলির শিকার। বুলির শিকার সব ডেমোগ্রাফির মানুষজনই হতে পারেন । তবে মাইনিরিটিরাই এই বুলিবাজির পছন্দের টার্গেট। একটি সমীক্ষা বলছে ( 2014 WBI U.S. Workplace Bullying Survey, এরা নন বাইনারিদের গণ্য করেননি), তাদের মতে মূলত টার্গেট হলেন নারীরা এবং আর তা ঘটিয়ে থাকেন পুরুষ কর্মীরা। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় এই যে এরা ভারতীয় হন বা মার্কিনী, মুলস্রোত কর্পোরেটে তারা রং-জাত-ভেদে উভয়ই উভয়ের আত্মীয়, সমাজ চালাতে একই জাঁতা দিয়ে এরা সুপারি কেটে থাকেন।

এদের পোশাকের ঝুল আলাদা হোলেও আইসক্রিমের ফ্লেভার সেই এক।

এর বিরুদ্ধে যাওয়া মানে অঘোষিত ফতোয়া। যার মানে যদি হও বিরুদ্ধ মতের সংখ্যালঘু, তোমাকে গ্রহণ করব না, টিকতেও দেব না।

তা টেক-ভ্যালি হোক বা ভারত, ফিউডাল রক্ষণশীল প্রথায় এই একটি ছবি কখনো বদলাচ্ছেনা। তা হল- অ্যাবিউজকারীর সাথে ভিক্টিম কে থাকতে বাধ্য করা। সমঝোতা নির্মাণ। নারী এই সমঝোতায় রাজী না হোলে তাকে দ্বিতীয় দফায় ব্লেমিং বা ব্লক করা।

সে চাকরী হোক বা বিয়ের প্রতিষ্ঠান। অথবা বিয়ের বাইরের ইমোশনাল সম্পর্কের অ-প্রতিষ্ঠান মূলক প্রতিষ্ঠান।

ব্লেমিং ও শেমিং এর মতই নেগিং ও জারী থাকে।
সেই ছবি এইখানে। অংশত ন্যারেটিভ। বা গল্পের মত।

গল্পের মতঃ এক
আয়লার বাদাবন
গীতা সরদার।

গীতা'দি'র আয়লা বিধ্বস্ত গ্রামে যখন পৌঁছেছি, তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। নৌকো করে, ভটভটি ঠেঙ্গিয়ে তারপর কুলতলির এই গ্রাম।

কুলতুলিতে জল এখন অনেক নেমে গেছে। তবে দোকানবাজার স্বাভাবিক নয় এখনো।

আমরা কলকাতা ফিরলেই বাইট-বিশেষজ্ঞ রা আমায় ফোন করে জেনে নেবেন, জল কতটা। কাদের কাদের বাড়ি গেলাম। বাইট অনেক নিখুঁত হয় তাতে।

নানা পরিবারের সাথে কথা বলে বেলা বাড়ল। গীতা সর্দারের বাড়িতে বসে একটু জিরিয়ে নেওয়া। গীতা সর্দার কে অঞ্চলের সবাই চেনেন।

গীতাদির একটিই মেয়ে- উমা। আর দুটি ছেলে। তারা ইশকুলে পড়েন। স্বামী মাছ ধরার ব্যবসা করেন, ও কিছুটা জমি থাকায়, ফল-সবজীর চাষে আয় আরও খানিক হয়। মেয়েটিকে এইট অব্ধি পড়িয়ে কাছেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। এখন সে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে মায়ের কাছেই থাকে।

-মেয়ে তো ঘর করতে পারলনি

দূরে দরোজায় আলগা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েকে দেখিয়ে আমাদের বললেন গীতাদি।

-এখন পড়ছে

-- সেতো আরও ভালো কথা
বলি আমি।

-আমাদের দেশ-গাঁয়ে নানান বেপার
বলেন গীতাদি।

উমা মুখ নিচু করে নখ খুঁটতে থাকেন।

-- কি হয়েছিলো
জানতে চাইলাম

ততক্ষণে তাদের সাথে অনেক গল্প-গাছা হয়ে গেছে। তারাও একটা অস্থায়ী আত্মীয়তা অনুভব করছেন বলেই মনে হতে শুরু করেছে।

-- "পুকুরে ডুব দিতে যেতাম, আমার দেওর, আমার শ্বশুর লুকিয়ে আমার শরীর, ভিজে কাপড়ের ওপর চোখ দিয়ে থাকত। প্রথন প্রথম বুঝিনি। তারপর নানা অছিলায় আপত্তিকর ভাবে গায়ে হাত দিতে থাকলেন। আমার স্বামীকে বল্লে তিনি উলটে আমায় নির্লজ্জ ভাবে শরীর দেখাই বলে দোষারোপ করতে শুরু করলেন।

সবুজ- হলুদ ছাপা লম্বা ম্যাক্সির ওপর গায়ের গামছাটা ভালো করে টেনে দিয়ে, নখ খুঁটতে খুঁটতে বলেন উমা।

-কাউকে বলে কোন কাজ হয়নি। বরং শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসায় কাকা-কাকীমা আত্মীয়-স্বজনরা বলতে শুরু করলেন- 'স্বামী তো আর কিছু করেনি, তা বলে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে, বাচ্চা নিয়ে কেউ চলে আসে। আমরা এর চেয়ে অনেক বেশী সহ্য করেছি।"

অর্থাৎ সেই এক জবানী। এই সেই লব্জ। যা বার বার বলে সমঝোতার রাস্তা প্রস্তুত করা হবে। অর্থাৎ বলতে চাওয়া হবে- এগুলি প্রায় কালচারাল, সংস্কৃতির অংশ-বিশেষ। মেয়েদের সংসারে টিকে থাকার সংস্কৃতি। কিন্তু অন্যায়, ক্ষতিকর ভাবনা, শারীরিক ও মানসিক দমন, এসব কালচারাল কেন হবে, কেন অপরাধমূলক নয় এই প্রশ্ন করার পরিসর রচিত হবেনা। এমনকি তথাকথিত 'শিক্ষিত' পরিবেশেও সেভাবে না।

গীতাদির পাড়ায় একটি এন-জি-ও পরিবেশের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে আসে। গীতাদি তাদের এক নারী সদস্যের কাছে পরামর্শ চান। ঠিক করেন মহিলা কমিশনে অভিযোগ জানাবেন। ভাশুর, শ্বশুর, পাড়া-তুতো 'মরাল' জ্যাঠা-শ্বশুর কে এড়িয়ে মহিলা কমিশনে চিঠি দেওয়ায় তাকে পাড়ায় একঘরে হতে হয়।

আমি জেনে বুঝেও উস্কে দেওয়ার জন্যে প্রশ্ন করি।

-- কেন ?

-- মহিলা কমিশন নাকি মেয়েদের চরিত্র খারাপ করে, সংসারে ভাঙ্গন ধরায়। তাই এদের নিয়ে নানা ভীতি।

আনমনে ছেঁড়া ছাপা শাড়ীতে একটা গিঁট দিতে দিতে বলেন গীতাদি।

নিমপাতা-হাসিটা ভেতরেই হেসে নিলাম। বুঝলাম, অব্যর্থ ভাবে এসব ক্ষেত্রে যা যা ঘটে থাকে ঠিক তাই তাই। অ্যাকাডেমিক লব্জ হলে এককথায় প্রকাশে সহজতর ভাবে আমরা যাকে বলি- সিস্টেমেটিকাল শেমিং। যেই মুহূর্তে যিনি নির্যাতিত, তিনি, সচেতন হয়ে পড়ছেন- দানা বাধছে প্রতিরোধ। কারণ সেই হোল সঠিক সময় তাকে থামাবার। অতএব দাবাও নির্মাণ। অতএব দোষারোপ। লজ্জা পেতে বাধ্য করে চলে সংকুচিতকরণ।

হিজলের ওপর রোদ দ্রুত পড়ে আসছে। গীতাদি বলে চলেন।

আরও অনেক মেয়েদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। ক্রমে তার উদ্যোগে তৈরি হয় এক ছোট ক্লাব, যা অঞ্চলের মেয়েদের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কথা বলবে।

গীতাদির বাড়িতেই বসত তার আলোচনা। মেয়েরা আলোচনা করে ভাগ করে নিতেন তাদের বঞ্চনার কথা।

নারীবাদ খতরনাক, এই নিয়ে ভীতি শহুরে ইশকুল-কলেজের ডিগ্রী পাওয়া জন-মানুষেও ভরভরন্ত। মহিলা কমিশন এর কর্মীরা সবাই নারীবাদ জানেন বা বোঝেন কিনা, বুঝলেও তার সঠিক প্রয়োগ করেন কিনা, এই নিয়ে তুমুল প্রশ্ন আছে। থাকতে পারে। এক্ষেত্রে আমার নো-চাপান-উতোর একমেবাদ্বিতিয়ম উত্তর হোল - ব্যবহারিকগত বা বুঝতে ভুল হলেও তাতে নারীবাদের দর্শন ভুল হয়ে যায়না। পুরুষতন্ত্র নারীবাদকে ভয় পান, তাই এই অপপ্রচার তাদের এক এজেন্সি স্বরূপ । যদি ছেলে-মেয়েরা নারীবাদের আদর্শ জেনে সচেতন হয়ে পরেন, তারি এই অচেতন চাপ-সৃষ্টি প্রয়াস। সেন্সর জারী রাখা। সেই চাপের কাছে ভিক্টিমও যাতে প্রো-সেন্সরশিপ হয়ে পড়েন। অর্থাৎ ভিক্টিম সেই ত্রাস সৃষ্টিকারীদের কোলাবোরেটরে পরিণত হতে পারেন। এই সেই বধ্যভূমি যেখানে ভিক্টিম ও ত্রাস সৃষ্টিকারী উভয়ই প্রো-সেন্সরশিপের জালে আটকা পড়বেন।

-- নানা চোখ রাঙ্গানী সহ্য করেই টিকে আছি দিদি।

মেয়েটা আবার পড়তে চায়। বিয়ে করে কি হোল তা তো দেখলাম। পড়তে চায় পড়েই দেখুক না । যদি ভালো কোনো কাজ পায়। এখানের মেয়েদের কাজ পাওয়া মানে তো শহরের লোকের বাড়ির মজুরী করা। প্রাণ আত্মসম্মান থুয়ে থাকতে সে কাজ আমরা করতে পারবনা দিদি। সামান্য চাষ হোতো, আর হবে কি জানিনা। যাই হোক, মাছটা, মধুটা'র দয়ায় খাবার টা জুটে যাবে।

বাঘের পেটে না গেলে এ ক'টা পেট চালিয়ে নেব দিদি।

গীতাদির মুখ কঠিন। একটা গরাণ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে চুল এলো করে শুকিয়ে নিচ্ছেন। বিকেলের ম্যানগ্রোভ রোদে সুন্দরীদের ঠেস-মুলের দিকে তাকিয়ে আছেন উমা, গীতাদির টীনেজার মেয়ে। দুই সন্তানের নাবালিকা মা।

দূরে ঘন সবুজ জলছাপ এর দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে গীতাদি তার সহজিয়া মেটাফরে বলে উঠলেন- "দিদি, মেয়েটাকে পেটে ধরতে পেরেছি আর বুকে ধরতে পারবনা।"

কিছুদিন আগের দিল্লিতে মঞ্জুলা দেবক নামের এক সাতাশের তরুণী, আই আই টি 'র পি.এইচ.ডি ছাত্রী, আত্মহত্যা করেছেন। মেয়েটি'র ওপর শ্বশুর-বাড়ির লোকজন 'ডাউরী' নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতেন। দেশে, বিদেশে লেখাপড়া-শেষে একটি সাতাশ বছরের প্রিভিলেজড তরুণী কেন আত্মহত্যা করলেন, তা তার প্রিভিলেজড পিতার জবানী থেকে মুহূর্তে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

মেয়েটির আত্মহত্যা করার পর তার শোকার্ত পিতা বলেছেন ঃ It was a mistake to educate my daughter and send her to IIT. I should have saved all the money for her dowry.”

২০১৭ সালে বসে এটিই সম্ভবত পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতকে, কোলোনিয়াল ভারত ও প্রি -কোলোনিয়াল ভারতের সাথে যুক্ত করার সবচে সার্থক 'এককথায় প্রকাশ'।

মঞ্জুলার স্বামী তার থেকে ২০ লাখ টাকা দাবী করেছিলেন। সঙ্গে টুথপেস্টের সাথে টুথব্রাশ ফ্রি। মঞ্জুলা কে লেখাপড়া চাকরী সব ছেড়ে দিতে হবে।

এসব শোনার পর তার বাবার এই উক্তি। তার মা নাকি তাকে বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু আই আই টি, আমেরিকায় লেখাপড়া করা মেয়ে প্রতিবাদ ও ডিভোর্স এর পথ না নিয়ে তার পরিবারের রেপুটেশন সম্পর্কেই বরং চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কেন, তার সদুত্তর পাওয়ার জন্যে মঞ্জুলা কে আর পাওয়া যাবেনা।

মানহানির ভয়ে এই স্ট্যাটাস-ক্যুও। সময়ের লোক্যাল- গ্লোব্যাল এর এক বিস্মরণ। যাকে কুন্দেরা বলবেন ঃ সংগঠিত বিস্মরণ। মাত্র সাতাশ বছরের ু চ্চ শিক্ষিত এই মেয়েরো এই বিস্মরণ কাজ করে। বিস্মরণ 'ডেস্পেয়ার' (despair) এর দিকে নিয়ে যায় অনেক ভাবেই। স্ট্যাটাস-ক্যুও আপনাকে বিশ্বাস করতে বলে যে এটি অনিবার্য। এবং স্মৃতির মায়োপিয়া নিয়ে নিরন্তর বদলাতে থাকা একটা সমাজ এই ভিউ কেই জোরদার করে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না যে তারা বদলাচ্ছে। কারণ সিস্টেমেটিক শেমিং। ঘনিয়ে তোলা লজ্জা। ধমনীতে ঢুঁসিয়ে দেওয়া মিথ্যা ভয়।

দাবাও নির্মাণ।
বাদা গাঙ, ভাটি গান ও রুপালী জল-শস্য

এরপর বছর খানেক গেছে। গীতাদি একদিন ফোন করলেন আমাকে। বললেন- দরকার আছে। শহরে রয়েছেন, একবার দেখা করতে চান।

জানলাম, গীতাদির মেয়ে মাধ্যমিকে পাশ করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে চান। একটি স্বেছহাসেবী সংস্থার ফাইল-পত্র দেখার অস্থায়ী কাজ পেয়েছেন।

কিন্তু আয়লা পরবর্তী গ্রামে নোনা জলে চাষ আবাদ প্রায় বন্ধ। জমানো টাকার কিছুই বেঁচে-বর্তে নেই। ।

মেয়েটাকে অনেক দূর ঠেঙ্গিয়ে ইশকুলে যেতে হয়। তার বাইরে সে আর বাড়ির অর্থনীতিতে কোন সাহায্য করতে পারেনা। গীতাদি'র স্বামীর কঠিন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। এই অবস্থায় নাতি নাতনিদের খরচ সহ মেয়ের পড়াশোনা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে তার পক্ষে।

তাই সামান্য যা ছোট-মোট মাছ ধরা পড়ে তা নিয়ে তার স্বামী চলে আসেন কসবা বাজারে বিক্রি করতে। সপ্তায় একবার। আর গীতাদি বালিগঞ্জ গারডেন্সে এক বাড়িতে আয়ার কাজ নিয়েছেন।

গীতাদি আর গীতাদির স্বামী বসবেন কিনা ভাবছেন আমার প্রশস্ত কাউচে। ওদের হাতের দিকে চোখ গেলো। দুটো মাঝারি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি। হাঁড়ির মুখে মোটা দড়ি বাঁধা। ঝুলিয়ে ধরে রেখেছেন।

গীতাদি বললেন- অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে করে জলে জিয়োনো সরপুঁটি, চিংড়ি, কাঁকড়া উপহার নিয়ে এসেছেন আমার জন্যে।

আমার জন্যে এনেছেন শুনে আমি অবাক- ইতস্তত ইত্যাদি করাতে বললেন-

-- এগুলো বিক্রি হয়নি। তাই নিয়ে এলাম।

বসতে বসতে বললেনঃ

-- সবাই বলছে আর দু'বছর যদি পার করে দি দিদি, আর এসব করতে হবেনা। মেয়েটাও একটা দোকানে, ছোট কোন অফিসে কিছু একটা কাজ পেয়ে যাবে। নিজেরটা নিজে দেখতে পারবে। আমাকেও আর এই গু-মুতের কাজ করতে হবেনা।

একটু থামেন। আমার দিকে এক্টু সরে এসে বলেন-

-- কিন্তু আমার মন সায় দ্যায় না, তাই তোমার কাছে এলাম ঃ ইশকুলে পড়ানোর চাকরীতে বলে নাকি আরও পড়তে হয়। তুমি যদি একটু বুদ্ধি দাও। তাই আজ ছুটি নিয়ে এলাম।

বুঝলাম, কাউন্সেলিং টাও বিনা পয়সায় করাতে তার আত্মসম্মানে লাগছে, তাই এই রুপোলী জল-শস্য বয়ে এনেছেন। পয়সা দিতে চেয়ে আঘাত দিয়ে ফেলব কিনা ভেবে বললাম, বিক্রি যখন হয়নি, আজ থেকে যাও। কাল আবার চেষ্টা কোরো বাজারে। তারপর না হয় বাড়ি যেও। আর রাতে তোমার ধরা মাছ দিয়েই খাব নাহয়।

গীতাদি ওর স্বামীকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন
-- 'উমার বাবা থাকলে অসুবিধে হবেনি?'

আমি " না " বললাম।

গীতাদির স্বামী মনোহর সর্দার। শখ ছিল পালাগানের। ছোট থেকেই সুযোগ পেলেই কাজ ফেলে বনবিবির পালাগান গাওয়া, এই ছিল তার পরম আহ্লাদ। পাউডারে রঙ মাখিয়ে, তা তুলোয় করে মুখে বুলিয়ে হাল্কা গোলাপি আভা ফুটিয়ে কখনো 'ধোনাই-মনাই', কখনো 'দুখে' সেজে গান ধরতেন -

'তারা বলে ভাইবোন আমরা দুইজন
মদিনা শহর হওতে আইনু এখানে'
সরু খাঁড়ি বেয়ে গান ছুটছে-
'যাব মোরা বাদাবনে
দিলেন আঠার ভাটি করিয়া যাই গীত'

রাতে তেঁতুল দিয়ে চিংড়ির টক রান্না করে খাওয়ালেন গীতাদি। কালো গ্রেভিতে পাঁচফোড়নের সুষম ঘ্রাণ। গ্রীষ্মের রাত। বৈশাখী পূর্ণিমা'র জোছনায় হাওয়া উথাল-পাতাল। খাওয়া শেষে ছাদে গিয়ে বসেছি। মনোহর দা হাঁটু গেড়ে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে নৈশভোজ পরবর্তী সুখ আমেজ নিচ্ছেন।

আমি বল্লাম- মনোহর'দা'র গান তো কখনো শুনিনি।

মনোহর'দা'র ঈষৎ লজ্জা মাখানো মুখে জ্যোৎস্নার নরম আভা।

গীতাদি তাকে ঈষৎ কনুই এর ঠেলা দিয়ে বললেন- তবে ধরো একটা। শুনাও।

মানুষটি স্বল্পাভাষী। একবার গীতাদি'র মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়িটা ঘষে নিভিয়ে নিলেন।

জলের ট্যাঙ্কের দিকে একটু সরে গিয়ে বসলেন। বাবু হয়ে। যেন আড়াল চাইছেন।

'বল মোরে কোনদিকে কত দূরে যাব ?
কতদূরে গেলে সেই ভাটিদেশ পাব...ও… "

হঠাৎ সুর উঠে শহরের মেঘ-মাখা ছাদে সবুজ খাঁড়ি-জল ছলাৎ করে দ্যায়।

জোছনার আলোয় ছাদে রাখা অ্যালুমিনিয়াম-হাঁড়ির অতলে শুয়ে থাকা সরপুঁটি গুলি থির-থির করে কেঁপে যায় অলস তালে।

বৈশাখী পূর্ণিমা। মেঘ সরে সরে যাচ্ছে।
অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে জোছনা ছলকে ওঠে।

কোথাও গন্ধ এলো, যেন সবুজ জলছাপের ক্যানভাসে কাঠের বাক্স ভরা মৌ। উঠছে- নামছে।

একপ্রস্থ মেঘে চাঁদ ঢেকে যাওয়ার আগেই জল ভরতি হাঁড়ি থেকে মাছ লাফালো। তুড়ুক লাফ দিলো দু'একটা।

********


গল্পঃ দুই
নিউইয়র্ক নিউইয়র্ক

Curtains forcing their will
against the wind,
children sleep,
exchanging dreams with
seraphim. The city
drags itself awake on
subway straps; and
I, an alarm, awake as a
rumor of war…

Maya Angelou

আদরের নিউইয়র্ক শহর। এতো যেঁ উঁচু তা গুমোর নেই একটুও।

আগে ঈহার মনে হত দুর্ভেদ্য, কংক্রিটের অচেনা। এখন মনে হয় সব বাড়িতেই ঠাণ্ডা দুধ খেতে খেতে বাড়ি গুলোকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে আদর করে যেতে পারে ঈহা। চলমান শহর। তার প্রেমে মজে থাকা দিবানিশি।

বিকেলের ছড়ানো রোদ লেগে হাডসন গোলাপী হয়ে আছে।

দু'মাসের মধ্যে বাড়ি খুঁজে চলে যেতে হবে তাকে। এক বছরের বাড়ি ভাড়ার লিজ শেষ। বাড়িওলা রিনিউ করতে পারবেনা। তার ফরেস্ট হিলস এর পুরনো বাড়ি। ফ্লোর সহ দেয়াল সবকিছ মেরমতি করে নতুন ঝাঁ-দুরস্ত অ্যাপার্টমেন্ট গড়তে চায়। ১৭ তলা'র জাতিসঙ্ঘ দপ্তর থেকে, সিকিউরিটি পেরিয়ে নিচে আসে ঈহা।

রাস্তার এপার থেকে অপেক্ষারত দালাল দের চোখে পড়ে। এই নিয়ে বাইশ দিন টানা ঘোরাঘুরি চলছে।

হাতে আর বেশী সময় নেই। আজ থেকে আর দু'সপ্তাহের মধ্যে ছাড়তে হবে বাড়ি, এই বাবদ বারিওলা ছয়মাস আগেই রেসিডেন্ট দের নোটিস দিয়ে রেখেছে।

ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট তলানিতে ঈহার। নতুন বাড়ী নেওয়ার মত অর্থ বা টেম্পোরারি চাকরীর পে-স্লিপ কিছুই দেখাতে পারবেনা এখন হাজার চেষ্টা করলেও। দালাল দের অফিসে ধর্না দিয়ে নানা ফাঁক ফোকরের সন্ধান করে অরধ-উন্মাদের মত বাড়ির তালাশ চলছে।

গত আটমাস সে চাকরীর খোঁজে। বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ-শেষে সব ভারতীয় ছাত্রকেই পাঠ-শেষ আর চাকরী পাওয়ার মধ্যবর্তী এই এই পরিসর টুকু পার করতে হয়।

রিসেশন-পরবর্তী আমেরিকায় অ্যাকাডেমিক চাকরী, তায় হিউম্যনিটিজে, তায় লিবেরাল মিডিয়ায়- তার সম্ভাবনা ক্রমেই ফ্ল্যাট চাকার মত থেবড়ে গিয়ে বসে যাচ্ছে। ভিসা লাগবে এমন কোন প্রারথী'র বদলে ভিসা লাগবেনা এমন কোন প্রাথীরই অগ্রাধিকার হয়তো হবে। এই শহরে থেকে ছেলেকে ইশকুলে পাঠায় ঈহা। এই শহরে তার বিছানা-বালিশ, বইয়ের তাক, প্যাটিও'র কোনায় হলুদ গোলাপ। রাত জেগে বসে থাকার সময় টের পায় হলুদ গোলাপ গুলি কালো হিজাবের মত থম হয়ে থাকে। তার জন্ম শহর মনে পড়ে। হলিউডে ধাঁচায় স্মৃতি প্রদর্শনের টেকনিক - এক্সরে প্রজেকশন।

সারা শহর ঘুরে বাড়ি-ভাড়া না পেয়ে হতাশ । কলকাতা শহরে বাচ্চা-সহ একলা মেয়েদের বাড়ি ভাড়া না দেওয়ার প্রাগৈতিহাসিক ট্যাবু আর এদেশে অভিবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা।

খুব সহজেই ওয়াকিং সিগন্যাল হয়ে গেলো। এক লহমায় রাস্তাটুকু পার করে ঈহা।

জুইশ ছেলেটি দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।

আজ কি কোন বাড়ি দেখা হবে ? না কালকের ফরেস্ট-হিলস এর বাড়িটির কোন খোঁজ আছে ? তারা কি রাজী হলেন? জানতে চায় ঈহা। সঙ্গের আমেরিকান ছেলেটি গাড়ির চাবির রিং ঘণ্টির মত ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে তার অপারগতা বলে।

গত ছয়মাসের পে-স্লিপ না দেখালে ফরেস্ট হিলস এর মত জায়গায় বাড়ি পাওয়া না মুমকিন।

জ্যাক্সন-হাইটস এ একটা বাড়ি দেখা যেতে পারে। ওখানে অনেক তো বাংলাদেশী থাকেন তোমাদের নেইবার, একবার কথা বলে দেখতে পারো। যতদিন না পে-স্লিপ জমে, ততদিন শেয়ার করেও থাকতে পারো। তেমন হলে কম দালালীতে আমরা খুঁজেও দিতে পারি। তুমি মাইনে পেয়ে দিয়ে দিও।

ঈহার নাস্তানাবুদ জীবনের তাপ কিছু হলেও বা এতদিনে ছাপ ফেলেছে তাদের মনে। নয়ত এমন 'বদনামী' পেশাতে থেকে এমন কথা যখন বলে।

একবার একটি বাংলাদেশী মেয়ে কে ক্রেইগ-লিস্টে বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেছিল। তার সাথে মুম্বাইয়ের একটি ভারতীয় মেয়ে থাকেন। তারা দুজনে শেয়ার করে। একটির বেশী ঘর থাকায় আরেকজন কে তারা ভাড়া দিতে চায়। ভারতীয় মেয়েটির একটি ছোট কন্যাসন্তান ও আছে। সেই শুনে উৎসাহ পেয়েছিল ঈহা। কিন্তু কদিন বাদে বাংলাদেশের মেয়েটি তাকে ফোন করে জানায়- মুম্বাইয়ের মেয়েটি রাজী নয়। তার মেয়ে ছোট। আমার যদি ছোট মেয়ে থাকতো তাহলে সে রাজী হত। প্রি-টীন কোন ছেলে-বাচ্চা কে সে অ্যালাও করতে চায়না।

সারা বিকেল ঘোরাই সার হোল। ছেলে দুটি চলে যেতে হেমন্তের পাতা পায়ে পায়ে সেন্ট্রাল পার্কে এসে বসে ঈহা। পরম মমতায় গড়া পার্কটার শরীর। অবসন্নতা একটু কাটলে সাবওয়ে নেবে।

আর দশদিনও নেই। এর মধ্যে বাড়ি পাবে কোথায়।

ঈহার ছেলে বলে মা আমরা গাড়ির মধ্যে তো ঘুমিয়ে থাকতে পারি পারকিং লটে। সকালে উঠে স্টারবাক্স এ ঢুকে পটি করে নেব।

তাই তো, চমৎকার ভেবছিস। ঈহা একবার চোখ কচলায়। বাম হাতের তালুটিকে একবার আনুভূমিক ও উল্লম্ব করে চোখের ওপর টানে। রাস্তা থেকে দেখলে হেমন্তের কুয়াশায় তেমন বোঝা যায়না।

ছোটবেলায় লেপ দিয়ে তাঁবু বানিয়ে ইগলু-ইগলু খেলা ছিল তার প্রিয় শীতের মজা।

শীত কালে হোমলেস মানুষগুলিকে রাস্তায় বসে থাকতে দেখে তার মনে হয়, বেশ কয়েকটা ইগলু যদি এই উপচোনো বরফ দিয়ে বানিয়ে ফেলা যেত।


গরম ও তিব্বত

বরফ ভাবতেই ইগলু ও ঠাণ্ডা ধূসর দেশ ভেসে উঠল। যেমন তিব্বত। যেমন উষ্ণতার সমীকরণে এক ঘটি জল।

বয়ান ও জবানী নিয়ে কথা বলছি যখন, এই অনুষঙ্গেও শহুরে নিদান এর নমুনা পাওয়া যাবে। নিখাদ অভিবাসী সুলভ মলম-সমাধান।

তার মধ্যে একটি অতি পরিচিত হোলঃ ভিসার এতো সমস্যা যখন বিয়ে করে নাও কোন আমেরিকান কে।

অনেকটা সুকুমারীয় ধাঁচায়ঃ যেন- গরম যখন, তিব্বত গেলেই পারো, বলার মতই নির্মল-কোক-সিম্পল। বিয়ে, প্রেমিক, মা--বাবার অর্থ সাহায্য, বাড়ি সম্পত্তি ছাড়া লেখাপড়া করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে ছেলে মানুষ ও জীবনের লক্ষ্য বাবদ কাজ করে বেঁচে থাকা- দেশ হোক বা বিদেশ, আসলে তা একটি নিখাদ অক্সিমোরন।

কোন ধাঁচাতেই মেলানো যাচ্ছেনা, এইরকম একা নারী জীবনএর নাম- আতান্তর। বিয়ে করে বা সংসার করতে, ছাত্র হয়ে বা কর্মসূত্রে ঈহা'র মত যারা আমেরিকা বা বিদেশে এসেছেন, তার মধ্যে একটি জটিল কম্বিনেশন হোল- মা- ছাত্র কম্বিনেশন। যেমন ঈহা এক সিঙ্গেল মা ও ছাত্রী। স্কলারশিপের টাকায় থেকে-পড়ে, ছেলে মানুষ করতে হয়েছে তাকে। অতএব ঈহা'র মত যারা, যাদের পক্ষে স্বামী'র ভিসা-সাহায্য বা বাবা-মার কেটে দেওয়া টিকিটে পড়তে আসা সম্ভব হয়নি বা সচেতন ভাবেই আসেননি তারা এই আপাত বাইনারির কোনটিতেই আঁটেন না। তাই তাদের জন্য আরেকটি প্রচলিত বয়ান বরাদ্দ আছে। যেমন এই নিম্নোক্ত টি -

" হোয়াই ইউ আর নট টেকিং হেল্প ফ্রম ইয়োর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস? আই ডোন্ট নো হু টট ইউ গাইজ দিস থিংগস।"

যাক।
ইহার ঘটনাক্রমে ফেরা যাক।

এরপর যা ঘটবে।

একটুও না বাড়িয়ে বল্লেও প্রায় কাকতালীয় ভাবে সুযোগ আসে লিঙ্কড-ইন মারফৎ। তিনদিন পরেই। গল্পের প্লটের মত প্রায়। একটি আই.টি কোম্পানি, তারা সিনেমা ও টেকনোলজি সংক্রান্ত অ্যাপ বানাতে চায়। তাতে একজন ট্রেইন্ড সিনেমা টেকনিশিয়ান এর সাহায্য প্রয়োজ। তারা চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করেছেন। 'উইথ অ্যা সিনেমাটিক ভিশন', এই ট্যাগ্ -লাইনে আটকায় ঈহার চোখ। কোথা বলে বোঝা গেলো নেহাত কলকব্জা ছাড়াও স্পিসিফিসিটির কথা বলতে চাইছে, পড়ানোর মত দর্শন জনিত কাজ না থাকলেও যা লাগবে তা হোল ডিজিটাল সিনেমা-মাধ্যম সম্পর্কে ভবিষ্যৎ চিন্তা ভাবনা করতে পারার ক্ষমতা।

মুহূর্তে পিঠে হাল্কা ডানা অনুভব করে ঈহা। সিল্কের মত না হলেও খানিক ফুরফুরে।

ফোন করবে ভেবে ফোন করলনা মারথা কে। অথচ খুবই ভালো বন্ধু তার। তাকে নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় থাকে মারথা। সে নিউইয়র্ক শহরে থাকলে আশ্রয় নিয়ে এই নাকাল হতে হতনা। কিন্তু অনুমান করে ঈহা, শেষ পর্যন্ত আই-টি-তে, তুমি, এতো নারীবাদী, বাম-বাদী বিতন্ডা শেষে কিনা আই টি কেন ? এইসব প্রলাপ শুনতে পেতে হবে তাকে। তার আগে যাওয়াটা নিশ্চিন্ত করা যাক।

দুদিনের মধ্যে উড়ে যেতে হবে ফ্লোরিডা। আছে প্যাকিং। যা না নিয়ে যেতে পারবে তার বিক্রি-বাঁটা, বিতরণ। সবই দু দিনের অন্দর।

এই আমাদের তুলো-রোঁয়া অভিবাসী জীবন। ভাবে ঈহা। বদলে যায় চেনা শহর-রাস্তা, হাইরাইজ, স্কাইলাইন। অভ্যস্ত হতে হয় নতুন মানচিত্রে। ঈহা ভাবে- গরম যখন তিব্বতই যাওয়া যাক। প্রিয় শহরে ফিরবে কি আর নাকি তিব্বত উষ্ণায়ন এর বাইরে?

এই মায়া-দ্বন্দ্ব বড় স্বল্প তো নয়।

রবিবার। গাড়ি হু-হা দৌড়ছে জে.এফ.কে র দিকে।
দ্রুত মুছে যায় শহর। কার্নিশ-রেখা।


পিঙ্ক ইন দ্য ভ্যালি

এবার ইহার ফ্লোরিডা পর্বের দ্রুত কয়েকটি দৃশ্যপট এর প্রজেকশন এ চলে যাব।

শুরুটি রচনা করা যাক । আর কিছু কথোপকথন। তার আগে কয়েকটি চরিত্র।

এঞ্জেলা- ঈহার সহকর্মী। 'ব্ল্যাক' আমেরিকান মেয়ে। বয়েস তিরিশ। একা থাকেন। কোলীগরা আড়ালে, ইনি কটি অ্যাবরশন করিয়েছেন, তাই নিয়ে চুটকি সময় প্রায়ই ব্যয় করে থাকেন।

ঈহার সুপারভাইজার- শাদা আমেরিকান। পুরুষ। ক্যাথলিক, এভাঞ্জেলিস্ট ও হতে পারেন। আসন্ন ভোটে ট্রাম্প কে সমর্থন করছেন ও তার জন্যে র‍্যালি করেছেন।

ঈহার সুপার বস ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর- ভারতীয়। বসেন পলো-অল্টো অফিসে। মাসে একবার ফ্লোরিডা অফিস ঘুরে যান। দিল্লী গেলে মোদীর সাথে সেলফি তুলে আসেন।

এবার প্রেক্ষাপট।

শুরুর অল্প কিছুদিন বাদেই ঈহা তবে জানতে পারে বছরে চার হাজার ডলার কম টাকায় রফা করেছে তার সাথে কোম্পানি। এতক্ষণে মগজে আসে ঈহার। তার দ্রুত চাকরী পাওয়ার পেছনের ইনসেন্টিভ তবে এই। তার আগেই মাথায় আসা উচিত ছিল। অনিশ্চয়তা আর প্রতিকূলতার সংকটে কাঠিকে কে আইসক্রিম ভেবে নেবে মেয়েরা, এই ভাবেই এই আপাদমস্তক সেক্সিস্ট মডেল কাজ করে আসছে।

এঞ্জেলার সাথে বন্ধুত্ব জমে উঠেছে তার।

এঞ্জেলা জানায়, ঈহা কেন অফিসের সব মেয়েরাই তুলনায় তাদের কম পেয়ে থাকে।

-- আপত্তি করনি, কখনো

স্থির স্বরে বলে ইহা।

--- রেইজ চাইতে গিয়ে এর আগে আমি চাকরী খুইয়েছি

কফির কাপে হেজেলনাট মেশাতে মেশাতে বলে এঞ্জেলা।

স্টাটিস্টিক্স ও তাই বলছে।

যখনই নারীরা বেতন- বৃদ্ধি বা মার্কিনী পরিভাষায় 'রেইজ' এর দাবী তোলেন, তাদের অ্যাগ্রেসিভ ও ডিমান্ডিং তকমায় দেগে দেওয়া হয়। অথচ একই দাবী যেকোনো পুরুষ করলে তাকে ভাবা হবে উন্নতিকামী ঝকঝকে পুরুষ।

অনেকেরই মনে পড়বে মাইক্রোসফটের ভারতীয় সি-ই-ও সত্য নন্দেলা'র সেই ঘোটালা কমেন্ট টি।

"Women, It's Bad Karma to Ask For a Raise"

অর্থাৎ নারীরা কেন মাইনে বাড়াতে চাইবেন। তার চে' মহান-মা জাত এই সব সনাতন-ভারতীয়-নারীর আদল-অবয়বের বাঁধা মস্তিষ্ক-প্রক্ষালনের বুলি আউড়ে ধুয়ে পিচ্ছিল করে দাও পা ফেলবার সামনের ধাপ। সিলিকন ভ্যালি উব্জে উঠছে এই নিও-হিন্দু, ভারত-বংশীয়, গেরুয়া-কেপ, ফেক-সুপারম্যান ঘাপলায়। 'ক' অক্ষর মানে সত্যই- এখানে গোমাংস। আপনার বস বা ঊর্ধ্বতন যদি হন নিও-হিন্দু ভক্ত-কিসিম, তবে বীফ বার্গারটি সামলে। অফিশিয়ালি তিনি কি বলতে পারেননা, ভুলে যান। মনে রাখুন আন-অফিসিয়ালি সেখানেই আপনার সেপারাশন লেটারের ভূমিকা লেখা থাকল। এখানে এই আমেরিকায়, এই সিলিকনের ভ্যালিতে আজ গেরুয়া ভজন উৎসব।

সিলিকন ভ্যালির 'সেন্সাস ডেটা ইনডেক্স' বলছেঃ সিলিকন ভ্যালিতে স্নাতক ডিগ্রীধারী পুরুষ কর্মীরা চল্লিশ শতাংশ বেশী আয় করেন সম-যোগ্যতার নারী-কর্মীদের তুলনায়। আরও পরিষ্কার করে বল্লেঃ পুরুষরা যে যোগ্যতা ও কাজের জন্যে এক ডলার পান, সে একই যোগ্যতা ও কাজের বিনিময়ে এক নারীকর্মী পান গড়পড়তা আটাত্তর সেন্টস।

আরও সঠিক হিসেব পেতে একটি ২০১০ সালের ডিসেন্ডিং গ্রাফ এর সাহায্য নিতে পারি। একজন শাদা পুরুষকর্মীর এক ডলার আয়ের সাপেক্ষে একজন এশিয়ান-আমেরিকান নারী কর্মী এ মুহূর্তে আয় করছেন সাতাশি সেন্টস। একজন শাদা নারী-কর্মী এ মুহূর্তে আয় করছেন আটাত্তর সেন্টস। একজন আফ্রিকান-আমেরিকান নারীকর্মী আয় করছেন চৌষট্টি সেন্টস। একজন 'ল্যাটিনা' নারী-কর্মী আয় করছেন তিপ্পান্ন সেন্টস।

মাইক্রো আগ্রাসনের সূচনা হতে পারে আপাত-নিরীহ কিছু বাক্যালাপ দিয়ে।

ধরা যাক একটি কোম্পানির কোন প্রজেক্ট এর সমালোচনা-পূর্ণ সফল প্রেজেন্টেশন দেওয়ার পর আপনার সহকর্মী আপনাকে বলছেন- আমি তো জানতাম আপনি সিঙ্গেল মা। বাহ, আপনাকে দেখে বোঝা যায়না, আপনি বেশ কনফিডেন্ট তো।

অর্থাৎ এতো সাহস আসে কোত্থেকে? আপনি কোথায় আস্তে করে থিতু হতে চাইবেন। কারণ আপনি ভালনারেবেল। এক উওম্যান অফ কালার, ফরেইন এলিয়েন, তার পৃথিবীটাকে এতো দাবড়ানোর শখ তো মোটে ভালা না বাপু।

পতিত জমির মতই এই পতিত বাক্যালাপের ওপর কোন ফসল ফলেনা।

শুধু নিঃশব্দে নেগিং জারী হয়। নেতিকরণ।

নেগিং এসেছে নেগেটিভ থেকে। যখন একটি বিশেষ জেন্ডার বা শ্রেণী বা জাতি সম্পর্কে সম্পর্কে নেগেটিভ কমেন্ট করা হয় পেছনের হাত দিয়ে। অর্থাৎ সুমিষ্ট ভাষণে, মিষ্টি কথায়, আপাত অর্থে একেবারেই না-আপত্তিকর লব্জ ব্যাবহার করে। ভিক্টিমের পায়েরতলা থেকে জুতোর শুকতলা ছাড়িয়ে নেওয়া আর তার পর তাকে মুচি'র সাহায্য লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করা। সূক্ষ্ম দক্ষতায় ঘোল পান করানোর প্রক্রিয়া।

যেমনঃ সত্যি মেয়েরা পারো বটে, মেয়েরাই কর্মক্ষেত্রে এইগুলি বেশী করে খোঁজে এবং দেখতে পায় পুরুষ দের তুলনায়।

আসলে বলা হল, মেয়েরা কল্পিত অথবা বানানো কিছুর সন্ধান করছেন, এবং সুযোগ খুঁজছেন কিভাবে ফায়দা করা যায়। বলা হলনা, মেয়েদের সাথে এইগুলি ঘটে চলে সর্বতো ভাবে, অতএব মেয়েরাই যে দেখতে পাবেন, এতো হিসি করার মতই সিম্পল।

নেগিং এর মুল ধাঁচাটি এই ভাবে কাজ করে যেতে থাকে। যাতে টার্গেট আরও 'ভালনারেবেল' হয়ে পড়ে।

যেমন এঞ্জেলাকে প্রায়ই তার সুপারভাইজার ও অন্যান্য সহকর্মীরা মদ খেতে যেতে অতি উৎসাহ দিয়ে থাকেন। সে আরও মদ খেতে পারে কিনা বাজী ধরেন। উল্লাস করে বলেন - কামান, কি হোল এতেই হয়ে গেলো?

অর্থাৎ তোমার তো সামাজিক কোন বাঁধন নেই , ভেসে থাকো। আনন্দ দাও আমাদের । এই মেয়েরাই তো হবে পার্টি পপার।

আবারো আপাত-নির্দোষ উল্লাসের আড়ালে নেগিং জারী হয়।

এই নিয়ে ইহা একদিন এঞ্জেলার হয়ে বলতে গেলে শুনতে হয় ঈহাকে-

-- ইউ আর আলএজ মেকিং থিংগস আউট অফ নাথিং

তো তার প্রাথমিক ভাবে শুরুয়াৎ হয় নেগিং এ। তার বাড়- বৃদ্ধি ঘটতে তাহকে বুলিবাজ দের হাতে। আর শেষতো জানাই আছে। অনেকেই প্রথমটায় ঠাহর করতে পারেননা। বিশেষত নতুনরা। বুলি যে একটা অ্যাবিউজ তা প্রথমে অনুভব করতে পারেন না। কারণ কোন ব্যবহার বা বাক্যালাপে তাদের খারাপ লাগলে,- ' ও কিছুনা , সামান্য জিনিশ, এটুকু তো মানিয়ে চলতে হয়' এই তৈরি বয়ানের আখ্যান চালু হয়ে হয়ে যায়। অর্থাৎ সেই একই সমঝোতার গল্প। আরে তেমন কিছু বলা বা করা হয়নি । হলেও মিটমাট করে নাও।

না করলে প্রথমে সুভদ্রভাবে বলা হবে -
'ইউ আর ট্যু সেন্সিটিভ'

তাতে কাজ না হলে, তোমার কাজের ভুল ধরা শুরু হবে। অর্থাৎ এবার যোগ্যতায় আঘাত করে তাকে নস্যাৎ করা।

'ইউ নেভার রিমেম্বার থিংগস কারেক্টলি' গোছের কিছু লব্জ।

ঈহাকেও শুনতে হল একদিন।

এবং শেষ পর্যন্ত সংলাপ গিয়ে যা দাঁড়াল- যা জানাই ছিল-
You don’t even know what abuse is. You have never seen real abuse.

এইযে অন্দরের জবানী ও বয়ান এর আখ্যান বলা হোল, তাতে মনে হতে পারে ইহা সম্পূর্ণ অন্দরের জিনিশ, বাহিরানার যা কিছু- রাষ্ট্র, ধর্মীয় ভাষ্য বা ভোটের রাজনীতি এতে কোনই প্রভাব ফেলবেনা। তাহা ডাহা হাসজারু মাত্র।

তাই এরই মধ্যে একটি প্লট নির্মাণ করব, অন্দর ও বাহিরানার পরিপূরকতা টানতে।

ধরা যাক ঈহা প্রাক-নির্বাচনী পর্বে, বার্নি স্যান্ডারস এর হয়ে ক্যানভাসিং ও অন্যান্য প্রচার এর কাজে ফি রোববার বেরোচ্ছিল। তার বস তাকে দেখে ফেলে। কিছুদিন আগেই তার সেই বস ট্রাম্প এর র‍্যালিতে গলা ফাটিয়েছেন। এই দৃশ্যপট-শেষে এরপর কি হতে পারে তা পাঠক অনুমান করতে শুরু করুন ।

এর সাথে ডালে সম্বরের মত করে মিশিয়ে নিন ঈহার মোদী- ভক্ত সুপার বসের অনুসন্ধান। শোনা গেছে ইনি নাকি ট্রাম্পের কল্যাণার্থে যাগ-যজ্ঞ করাতে সম্প্রতি ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন।

ঈহার অবাধ্য, বাচাল 'নারীবাদীতা' ' সম্পর্কে তিনি তার সুপারভাইজারের থেকে আগেই অবগত ছিলেন। এক্ষণে বাহিরানার আলো তাহাকে আরও নিশ্চিত করল। এই হোল সেই মেয়েরা, যারা জামার ঝুল ইচ্ছাকৃত ছোট রাখে, চরম ভারত বিদ্বেষী, কথায় কথায় অরুন্ধতী রায়ের মত বদ মেয়েদের উজিয়ে রাখে। এবং বস যখন ভারতীয়, বস যখন মোদী-ফ্রীক- সেই বসের সাথে বসে রেস্টুরেন্টে বীফ-বার্গার খায়।

অতএব- শেষটি রচিত হয়।

এই হল নেগিং এর বিশুদ্ধ কর্ম-পদ্ধতির ভুলভুলাইয়া-মানচিত্র।

ভুলে যাওয়া চলবেনা যেহেতু এটি পরিকল্পিত তাই নেগিং এর চিহ্নিতকরণটিই সবচে সূক্ষ্ম ব্যাপার।

এর মোকাবিলা করার রাস্তাটি তাই অন্যভাবে ভাবতেই হয়।

গুরুত্বপূর্ণ হোল- অ্যাবিউজ, মাইক্রো হোক অথবা ম্যাক্রো, অ্যাবিউজার কে চিহ্নিত করাই সর্বপ্রথম ধাপ।

তারপর তার সাথে মোকাবিলা করা।

মাইক্রো-আক্রমণের লক্ষ্যই হোল বারবার হিউমিলিয়েট করা, আপনার করা কাজ কে গুরুত্ব না দেওয়া, আপনার করা কাজকে নস্যাৎ করা।

দ্বিতীয় হোলঃ তাড়াতাড়ি এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। আগ্রাসনের স্বরূপতই বুঝতে দেরী করে। ততদিনে তার পারপিট্রেটর অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে।

এটি প্রায় গর্ভরক্ষা করার মতই যত্নশীল এক অধ্যায়।

--- মানতে হবে তোমাকে এঞ্জেলা যে বুলি জিনিশটা আসলে একটা অ্যাবিউজ।

ঠাণ্ডা স্বরে বলে ঈহা এঞ্জেলা কে। পীড়িত মন নিয়ে একমনে কাজ করে বসের থেকে কোন স্বীকৃতিই সে কখনো পায়না।

আর বিশেষত তুমি যদি মারজিনালাইজড হও, মাইনরিটি হও। তোমাকে চুপ করানোর এটা তো একটা কৌশল।

একজন মর্যাদাবান মানুষ যে কোনো লিঙ্গ-ভেদে এই কাজ কক্ষনো করবেন না।

নেগিং এর কাজই হোল এই- খুব সূক্ষ্ম ভাবে আপনার কাজ কে, কিস্যু হয়নি বলে হেয় করে আপনার আত্মবিশ্বাসের বনেটটি নাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।

কারণ কর্মরত অবস্থায় সে ঊর্ধ্বতন কে আপনি চট করে না বলতে পারছেনা। নেগষিএত করতে চাইছেন।

আর তা যদি আসে সহকর্মীর থেকে, তো সে ধরণের বুলি-বাজ দের প্রথম কম্মই হোল তাদের 'টার্গেট' কে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। বাকী কর্মীদের সাথে সংযোগ বাড়িয়ে, বস এর সাথে আন্তরিক হয়ে উঠতে চেষ্টা করার। যাতে কোন ভাবেই বুলি র বিরুদ্ধে টার্গেট রা মুখ খুলতে না পারে । এক্ষেত্রে প্রথমেই তারা এক ছদ্ম-নারীবাদীদের স্টিরিওটাইপ নির্মাণ করে থাকে। যা আসলে নারীবাদের বিপ্রতীপে অবস্থান করে। অর্থাৎ কোন ভাবেই নারীবাদের অ্যাজেন্ডা বা দর্শনের সাথে এক না। যাতে করে নারীবাদের আসল লক্ষ্য ও আদর্শ গুলিয়ে দেওয়া যায়। এই হোল হেটেরো-প্যাট্রিয়ার্ক ব্যাবস্থার 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতি।

আর আপনি যদি দল করেন, প্রতিবাদ ঘনিয়ে তোলেন, আপনার জেন্ডার যদি হয় নারী বা মাইনরিটি অর্থাৎ এর অবধারিত বটম-লাইন হবে এই অনবদ্য ট্যাগ গুলির অর্জনঃ দেশ ভেদে স্পেস ভেদে সকল কর্মশীল নারীদের এই অর্জন সমসত্ব। প্রায়।

যা আমি পরপর ও র‍্যান্ডমভাবে সাজাতে চেষ্টা করছিঃ

নারীবাদী, লিবেরাল, বামবাদী, সিঙ্গল-মা, নাস্তিক, ছোট জামা / স্কার্ট

উওম্যান অফ কালার, মাইনরিটি ইত্যাদি ইত্যাদি এবং অবশ্যই সবশেষে কেকের মাথায় চেরির মত একখান আলট্রা অল্টারনেটিভ সংস্কৃতির অ্যান্টি- হলিউড উপপাদ্য।

অতএব হাতে রইল সিলিকনের ভ্যালি মাইনাস মাদী-হাতীর দাঁত।

ভুশুণ্ডির মাঠ।
কাগায় নমঃ ।

এপিলোগ

(শেষ পর্যন্ত ঈহার ক্ষেত্রে এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল বিষয়ক এপিলোগ)

ক্যান্টিনে, প্যান্ট্রিতে, সেমিনারে ঈহার যাবতীয় বাক্যালাপ, তা সে আইসক্রিম হোক বা বব ডিলান, তা 'নারীবাদী' তকমার ঘুশঘুশানিতে সেজে ফিরতে লাগল হাওয়ায় হাওয়ায়। তারপর তার সুপারভাইজার তাকে একদিন বলেই ফেলল-

-- সো ইউ ওয়ান্ট আ ফেমিনিস্ট জব, হাহ ?

ঈহা তাকায় একবার, তার হাতের তালুতে মুখ রেখে। সোজা।

জানলার ঠিক নীচে হাল্কা যাওয়ায় ঝিলের জলে ছোট তরঙ্গ তোলে।

-- এনি জব ক্যান বি আ ফেমিনিস্ট জব ইফ ইউ আর ইউসিং ইওর কোয়ালিফিকেশন, স্কিলস, এক্সপেরিয়েন্স টু প্রমোট জেন্ডার ইকুয়ালিটি

স্মিত হেসে জানায় ঈহা।

নারীদের বিরুদ্ধে যা যা অপরাধ সংবদ্ধ হয় তার মধ্যে ট্র্যাফিকিং এর মতই মাইক্রো-আগ্রাসন অন্যতম। গীতা সর্দার, থেকে এঞ্জেলা সবাইকেই সংগঠিত নির্মাণের এর বিরুদ্ধে লড়তে হয়। একইভাবে কর্পোরেট সেক্টরেও তুমুল গোছানো আপাত নির্দোষ বুলিবাজীর এই অরগানাইজড ক্রাইম। স্টিরিওটাইপ খাড়া করে, সংবদ্ধ ভাবে শুরু করা হয় নেতিকরণ।

বিরোধিতা করলে, যার অবধারিত শেষ, প্রায় নোটিশ না দিয়েই ছাঁটাই।

ঈহার ক্ষেত্রে তা আরও মশলাদার করে তোলা গেলো।

ঈহা কয়েকদিন ধরেই টের পেয়েছিল।

একদিন এইচ.আর থেকে ঈহাকে ডেকে পাঠানো হোল। নানা অস্বস্তির ভান-ভনিতা করতে করতে বের করে একটা কাগজ। এগিয়ে দ্যায়। প্রথম তিন লাইনের পরই জ্বালা লাগে রেটিনার পাশে। গরম নিশ্বাস পড়ে।

না খেলা জমল আরও পরে।

যখন ঈহা যখন জানতে চাইল এই হঠাৎ চাকরী ছাড়ার নোটিশ তাকে এতো কম সময়ে কেন দেওয়া হোল।

বিশেষত চারদিন বাদে আমেরিকায় এইচ-ওয়ান-বি ভিসার আপ্লিকেশন জমা করার শেষ দিন। তার কোম্পানির তো তার হয়ে ভিসা তোলার কথা, তার কি হবে ?

-- এখন তো আমার পক্ষে একদিনের অন্দর অন্য সংস্থাকে বলে ভিসা করানো সম্ভব না । আমার ছাত্র ভিসার এক্সটেনশন ফুরিয়ে আসছে দু'মাসের মধ্যে।

ঈহা জানতে চায় শীতল স্বরে।

ছেলের ইশকুলে পাঠানোর কথা মাথায় চাগাড় দ্যায় সবচে বেশী করে। ছেলের পরীক্ষা তো শেষ হবেনা। মাথা গরম চলবেনা, ঠাণ্ডা রাখতে হবে।

এঞ্জেলা বলে-
-- এবার কি করবে ঈহা। আমার জন্যে মুখ খুলতে গিয়ে তোমারি কাজ গেলো। আমিও ছেড়ে দেবো। কিন্তু আমার তো তোমার মত বিপদ না। আমি সিটিজেন। তুমি দু'মাসের মধ্যে চাকরী না পেলে তো তোমাকে ফিরে যেতে হবে।

-- ফিরে যাব।

বলে ঈহা।

--তার আগে চেষ্টা করে দেখবো।

উই নীড টু স্টপ বিলিভিং ইন আ সাক-ইট-আপ প্রফেশনাল কালচার।

দেশে ফেরার মত খুব সহজ রাস্তা সবার থাকেনা। আবার সেই বাড়ি ভাড়া, ট্যাবুতে পড়তে হবে তাকে। এদশে লেখা বাচ্চাকে লেখাপড়া শেখানোর কোন খরচ লাগেনা। একার রোজগারে ভারতে ভালো ইশকুলে পড়ানর হ্যাপা ভালোই জানে সে।

তার দুই কোলীগ এই ঘোর অপরাধ মেনে নিতে না পেরে তার হয়ে সিলিকন ভ্যালিতে হেড-অফিসে কথা বলেছেন। যদি অন্য প্রজেক্টে তাকে কিছুদিনের জন্যেও রেখে দেওয়া যায়।

শেষ তাস টি পড়ল যখন বুলি-কাউন্সিলে অভিযোগ জানালেন এঞ্জেলা। তার সাথে ঈহা সহ আরও চারজন।

বুলি নিয়ে কমপ্লেইন করায় এদিকে লোক্যাল অফিস এর যেসব মুখ পুড়ল, তার একটা শোধ তো নিতেই হয়।

অতএব দারুণ চাল চাললেন ফ্লোরিডা অফিস।

ঈহা কে ডেকে বলা হল যে তারা তার ভিসার ব্যাপারে দায়িত্বশীল। যেহেতু সব কাজ হয়ে গেছে, কোম্পানীর তো টাকা খরচ হয়েই গেছে, সে চাইলে আরও তিনমাস থেকে যেতে পারে।

কিন্তু তার পোস্ট টি খালি হয়ে যাওয়াতে অন্য কাউকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

এখন আর তার কাজ করার মত পরিসর কোম্পানি খুঁজে পাচ্ছেন না ।

কিন্তু ম্যানেজমেন্ট ঈহার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন । তারা তাকে সাহায্য করতে চান।

তাই নিম্নোক্ত ক্লারিকাল কাজগুলিতে ঈহা তাদের সাহায্য করতে পারে।

নীচে তার লিস্ট থেকে কয়েকটিঃ
১। স্টক সোডা ইন ফ্রিজ
২। চেঞ্জ পেপার টাওয়েল আন্ডার দ্য ক্রীমার
৩। ওয়াইপ ডাউন দ্য সিঙ্ক
৪। চেক টু মেক সিউর দ্য বোর্ড ইস ওয়াইপড ক্লীন ......

আর পড়েনা। নিমফলএর স্বাদে মিষ্টির আস্বাদ পায় ঈহা।

তার জন্যে প্রায় মাপ দিয়ে জামা বানানোর মত করে এই চক্রান্ত করেছে সারা ম্যনেজমেন্টএর তাবড় মাথা-ওয়ালারা, একথা ভেবে সামান্য আত্ম-জয় অনুভব করার চেষ্টা করে ঈহা।

চকিতে মনে আসে গত সামারে পরা রেবেকা সলনিটের একটা বিদ্যুৎ লাইন ঃ

"the city of silence has only one street or one route through it that matters"

ঈহা উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে দ্যায় তার দরখাস্ত পত্র। পড়ে থাকে ঝুলন্ত চোয়াল। মেহগনি চেয়ার। টেবিল আর মধ্যবর্তীতে দুটো রাস্তা।

ফ্লোরিডার গ্রীষ্ম বিকেলের ঘনিয়ে আসা ঝড়বৃষ্টি তার ট্রপিকাল আত্মাকে হোমসিক বানায়।

এদিকে তার এক অধিবাস্তব ইল্ল্যুশন শুরু হোল কি! যেদিকেই তাকায় দুখানি রাস্তা দেখে সে।

পারকিং-লটে যাওয়ার রাস্তাও দু'খানা। কাল অব্ধিও তো ছিলনা। যেন একদিকে নিউইয়র্ক তো আরেকদিকে কলকাতা। একদিকে রিও তো আরেকদিকে উগান্ডা।

- কোথায় যাবে কিছু ঠিক করলে ঈহা?
এঞ্জেলা জানতে চায়।

ঠিক করে ফেলেছে ঈহা। ক্যালিফোর্নিয়া।
ওখানে সমুদ্র, পাহাড় দুইই আছে।
লাফিয়ে ওঠে কিশমিশ। ঈহার ছেলে।

গুগল আর্থ থেকে নতুন শহরের ম্যাপ খুলে দেখে ঈহা।
সজোরে জুম করে গুগলের ক্যামেরা নীল নীল জলটায়।

-এইখানে তোমার ইশকুল, আর এইযে বাড়ি।
এই বাড়িটায় তোমার ঘর।

মার্থার সাথে আপাতত তার এই বাড়িতে থাকব আমরা। আর খুঁজে যাব কাজ।

কাজ পেয়ে গেলেই নতুন বাড়ি।
বলে ঈহা।

ছোট্ট কিশমিশ, ল্যাপটপে মুখ ঢুকিয়ে ঘরটা দেখতে চেষ্টা করে।

-শুধু বাইরেটা আর বাড়িটা দেখতে পাচ্ছি মা।
ঘরটা তো নয়।

ঈহা মনে মনে কিশমিশ কে বলতে চায়- বাড়িও তো বাহিরানাই।

তার ভেতরে অন্দরমহল।
তার ভেতরে ঘর।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন