বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

বিশ্ব সাহিত্যে সেরা পনের নারী

বিশ্ব সাহিত্যে সেরা পনের নারী
শত বাধা বিপত্তি আর অন্ধকারকে উপেক্ষা করে কলমকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যেসব নারী চলমান বিশ্বে নারীদের অবস্থানকে মজবুত করতে সহায়তা করেছেন তাদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিত তুলে ধরা হল। 
১। ম্যারি ওলস্টোনক্রাফট (১৭৫৯ -১৭৯৭) 
নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে ম্যারি ওলস্টোনক্রাফটের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। ম্যারির সাহিত্য জীবন ক্ষণস্থায়ী, মাত্র ৯ বছর জুড়ে তার ব্যাপ্তি। এই সময়ে তিনি নারীবাদ সহ দর্শন, শিক্ষা, রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস, ইত্যাদি নিয়ে লেখালেখি করেছেন। ওলস্টোনক্রাফটের শ্রেষ্ঠ রচনা আ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ ওম্যান যেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে নারী প্রাকৃতিকভাবেই পুরুষ অপেক্ষা হীন,এমনটি নয়। শিক্ষার অভাবেই নারী পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে। তিনি প্রস্তাব করেন নারী এবং পুরুষ উভয়কেই যুক্তিবাদী সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং এর মাধ্যমে তিনি যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক শৃঙ্খলা খুঁজে পাওয়ার কথা কল্পনা করেছেন। তিনি এডওয়ার্ড জন ওলস্টোনক্র্যাফ্‌ট ও এলিজাবেথ ডিক্সনের সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। পরিবারটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পতনের মধ্য দিয়ে তকে বেড়ে উঠতে হয়। ১৭৮০ সালে মায়ের মৃত্যুর পর উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। ১৭৮৪ সালে বোন এলিজা ও বান্ধবী ফ্যানিকে নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া গভর্নেস ও অনুবাদকের কাজসহ বিভিন্ন কাজ করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও নানা ভাঙাগড়া রয়েছে। তার মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী উইলিয়াম গডউইন প্রকাশ করেন মেমোয়ার অব দ্য অথর অব এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব উইম্যান (১৭৯৮) নামে জীবনী। সেখানে মেরির জীবনের অনিয়ন্ত্রিত দিক উঠে আসে। যার কারণে প্রায় এক শতাব্দি তার কাজের ভালো মূল্যায়ন হয়নি। তবে বিশ শতকে এসে তিনি নারীবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন। কারণ নারীর অধিকার ও নারীত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো ভাঙতে লেখাগুলোতে রয়েছে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি। বর্তমানে তাকে নারীবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তার জীবন ও কর্ম থেকে নারীবাদীরা প্রভাবিত হন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো- ‘থটস অন দ্য এডুকেশন অব ডটার্স: উই থ রিফ্লেকশানস অন ফিমেল কনডাক্ট, ইন দ্য মোর ইম্পর্টেন্ট ডিউটিজ অব লাইফ’ (১৭৮৮), ‘মেরি: আ ফিকশন’ (১৭৮৮), ‘অরিজিনাল স্টোরিজ ফ্রম রিয়েল লাইফ: উইথ কনভারসেশনস ক্যালকুলেটড টু রেগুলেট দ্য অ্যাফেকশনস অ্যান্ড ফর্ম দ্য মাউন্ড টু ট্রুথ অ্যান্ড গুডনেস’ (১৭৮৮), ‘এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব ম্যান, ইন আ লেটার টু দ্য রাইট অনারেবল’ (১৭৯০), ‘এ ভিন্ডিকেশান অব দ্য রাইটস অব উইম্যান উইথ স্ট্রাকচারস অন মোরাল অ্যান্ড প্রাকটিক্যাল সাবজেক্টস’ (১৭৯২) ও ‘দ্য রঙস অব উউম্যান, অব মারিয়া’ (১৭৯৮)।

২। জেন অস্টেন (১৭৭৫-১৯১৭) 
জেন অস্টেন ছিলেন একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক। ইংল্যান্ডের ভদ্রসমাজের পটভূমিকায় রচিত তাঁর রোম্যান্টিক কথাসাহিত্য তাঁকে ইংরেজি সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা বহুপঠিত লেখকদের সারিতে স্থান দিয়েছে। তাঁর বাস্তবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও তীক্ষ্ণ সমাজ বিশ্লেষণ গবেষক ও সমালোচক মহলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানটি পাকা করেছে। অস্টেন তাঁর সমগ্র জীবন কাটিয়েছেন নিম্ন উচ্চবিত্ত সমাজের এক একান্নবর্তী পরিবারে। তিনি মূলত তাঁর পিতা ও ভাইদের কাছে লেখাপড়া শেখেন এবং কিছুটা নিজে পড়াশোনা করেও শেখেন। পেশাদার লেখক হিসেবে তাঁর উত্থানের পিছনে তাঁর পরিবারের স্থায়ী সমর্থনের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কৈশোর থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি শিল্পের শিক্ষানবিশি করে গেছেন। এই সময়কালের মধ্যে তিনি একাধিক সাহিত্যিক রূপ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এর মধ্যে তিনি পত্রোপন্যাস রচনার কাজেও হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই রূপটি পরিত্যাগ করেন। তিনি তিনটি উপন্যাস রচনা করে সেই উপন্যাসগুলি বারংবার সংশোধন করেন এবং চতুর্থ একটি উপন্যাস রচনায় হাত দেন। ১৮১১ থেকে ১৮১৬ সালের মধ্যে তাঁর ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’, ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’, ‘এমা’ নামে চারটি উপন্যাস প্রাকাশিত হয় এবং তিনি সাফল্যও অর্জন করেন। এছাড়া তিনি নরদ্যাঙ্গার অ্যাবি ও পারসুয়েশন নামে দুটি উপন্যাসও রচনা করেন। এগুলি তাঁর মৃত্যুর পর ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। অস্টেন স্যান্ডিটন শিরোনামে আরও একটি উপন্যাস রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। অস্টেনের উপন্যাসগুলি অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ভাবোপন্যাসের সমালোচনামূলক পুনরীক্ষণ। এগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতাবাদের উত্থানের একটি সোপানও বটে। তাঁর উপন্যাসের প্লট মূলত হাস্যোদ্দীপক হলেও তা সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সেকালের মেয়েরা যে বিবাহ ব্যবস্থার উপর কতটা নির্ভরশীল ছিল,তারই প্রতিফলন ঘটায়। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। এই সময় মাত্র কয়েকজন সমালোচকই তাঁর রচনার সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন। ১৮৬৯ সালে তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্র আ মেমোয়ার অফ জেন অস্টিন নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলে, তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। 
জেন অস্টেন সম্পর্কে ইউটিউবে ডকুমেন্টরী দেখুন। 
৩। সেলমা ওতিলিয়ানা লভিসিয়া লাগেরলফ (১৮৫৮-১৯৪০) 
সুয়েডীয় ঔপন্যাসিক যিনি সুইডেনের অধিবাসীদের অতীত জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি ১৯০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি নোবেল বিজয়ী প্রথম মহিলা। তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: "তার লেখনির মহৎ আদর্শ, সুতীব্র কল্পনাশক্তি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্বীকৃতি স্বরুপ।" সেলমা লাগেরলফ ১৮৫৮ সালের ২০ নভেম্বর তিনি সুইডেনের মারবাকা অঞ্চলের ভার্মল্যান্ড শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এরিক গুস্তাফ লাগেরলফ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। মাত্র তিন বছর বয়সের সময় লাগেরলফ পক্ষাঘাতের কারণে পঙ্গু হয়ে যান। এরপর আর কখনও খুব একটা চলাচল করতে পারেন নি। তিনি ছোটবেলায় বাবা, মা, ঠাকুরমা ও প্রিয় সেবিকা কায়েসোর কাছ থেকে মজার মজার গল্প শুনতেন আর কোন গল্প বা কবিতার বই পেলে সাথে সাথে পড়ে ফেলতেন। পঙ্গুত্বের কারণে ছোটবেলা তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্ভব হয়নি, ঘরে বসে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছেন। ১৮৮২ সালে তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করার প্রত্যাশায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের "রয়্যাল উইমেন্‌স সুপিরিয়র ট্রেনিং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। ১৮৮৫ লান্ড্‌সক্রোনায় অবস্থিত একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত এই স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮৯৫ সালে শিক্ষকতা ত্যাগের পর পুরোদমে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি বিশেষ জনপ্রিয় ও বিখ্যাত হয়ে উঠেন। তার পারিবারিক কোন জীবন ছিলনা। কারণ একটি প্রেমে ব্যর্থ হওয়ায় কখনই বিয়ে করেননি। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর তিনি ১৯৪০ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। সেলমা লাগেরলফের প্রথম বই দ্য স্টোরি অফ গোস্টা বার্লিং প্রকাশিত হয় ১৮৯১ সালে। দুই খণ্ডের এই বইটি ছিল ভার্মল্যান্ডের লোককাহিনীর একটি গীতিধর্মী বর্ণনাকেন্দ্রিক উপস্থাপনা। এই বই রচনার ক্ষেত্রে তিনি স্কটীয় লেখক টমাস কার্লাইল কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালে এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তার দ্বিতীয় গ্রন্থের নাম ইনভিজিব্‌ল লিংক যা ছিল একটি গল্পসংগ্রহ। ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৯৯ সালে। ১৮৯৫ সালের পর তিনি লেখালেখিকে একমাত্র পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ইতালি ভ্রমণের পর তিনি দ্য মিরাক্‌ল্‌স অফ এন্টি ক্রাইস্ট বইটি লিখেন যা ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। প্যালেস্টাইন সফর শেষে রচনা করেন জেরুজালেম: আই ডালারেন। দুই খণ্ডের এই উপন্যাসটি ১৯০১-১৯০২ সালে লিখিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। এর কাহিনী ছিল সুইডেনের একটি প্রাদেশিক ধর্মীয় আন্দোলন যার ফলে লোকজন সেখান থেকে প্যালেস্টাইনে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ পায়। লাগেরলফের অন্য বিখ্যাত উপন্যাসের নাম এডভেঞ্চার অফ নিল্‌স যা মূলত রূপকথাধর্মী। মিশর ভ্রমণের প্রভাব পড়েছিল এই বইটিতে। তার সাহিত্য মূলত সুয়েডীয় লোককাহিনীর উপর ভিত্তি করে রচিত যার বিশেষ আকর্ষণীয় দিক হল বাস্তবতা এবং নির্মল বিশুদ্ধতা। তার সাহিত্যের চরিত্রগুলোকে বেশ সাধারণ বলে মনে হয়, অর্থাৎ চরিত্রগুলো তাদের কাজের ক্ষেত্রে অনেকটাই সাদামাটা। তিনি খারাপের উপর ভালোর বিজয় দেখাতে পছন্দ করতেন। কোন ঘটনার বর্ণনামূলক বহিঃপ্রকাশে তিনি যেকোন সুয়েডীয় সাহিত্যিককে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম।
৪। ভার্জিনিয়া উল্‌ফ (১৮৮২-১৯৪১)
এ্যাডেলাইন ভার্জিনিয়া উল্ফ ইংরেজি ভাষার একজন সাহিত্যিক। উনিশ শতকের ব্রিটিশ আধুনিকতাবাদী লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কালে তিনি লন্ডন লিটারেসি সোসাইটি এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হল, মিসেস ডাল্লাওয়ে, টু দ্যা লাইটহাউজ, ওরলান্ডো, তাঁর রচিত ভাষন সংকলন। এ রুম ওয়ান’স ওন বইটতে তিনি লিখেছেন, ‘নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন। উল্ফ ডিপোলার ডিজঅর্ডার নামক এক‌টি মানসিক রো‌গে ভু‌গে‌ছি‌লেন। তিনি ১৯৪১ সলে ৫৯ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। ভার্জিনিয়া উল্ফ এর কুমারী নাম ছিল এ্যডেলাইন ভার্জিনিয়া স্টিফেন। তাঁর বাবার নাম স্যার লেসলী স্টিফেন এবং মার নাম জুলিয়া প্রিন্সেপ ডাকওয়ার্থ স্টিফেন। বাবার লেখালেখি ভার্জিনিয়াকে একজন সাহিত্যিক হতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। ভার্জিনিয়ার মা জুলিয়া স্টিফেনের জন্ম তৎকালিন ব্রিটিশ ভারতে। পরে তিনি ইংল্যান্ডে চলে আসেন। ভার্জিনিয়ার বাবা মা দুইজনই পূর্বে একাধিকবার বিয়ে করেন। ছোটবেলায় ভার্জিনিয়া উল্ফ তার বেশ কয়েকজন সৎ ভাইবোনের সাথে একই পরিবারে বসবাস করতেন। পেশা হিসাবে উল্ফ লেখালেখি শুরু করেন ১৯০০ সালে। টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট এ তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ভয়েজ আউট’ প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে। প্রকাশিত হয় তাঁর সৎ ভাইয়ের কোম্পানি গেরাল্ড ডাকওয়ার্থ এন্ড কোম্পানি লিঃ থেকে। তাঁর বেশীরভাগ লেখার প্রকাশক তিনি নিজেই। প্রকাশিত হয়েছিল হগার্থ প্রেস থেকে। উল্ফ তাঁর লেখায় চরিত্রগুলির মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগের বিষয়গুলি নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর সুনাম কিছুটা কমে আসে। ভার্জিনিয়া উল্ফ এর শেষ উপন্যাস ‘বিটউইন দ্যা এ্যাক্টস’ লেখা শেষ করার পর তিনি বিষন্নতায় ভূগতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর লন্ডনের বাড়ি ধ্বংস হওয়া এর পিছনে একটি কারণ। অবশ্য এর আ‌গেও তিনি বিভিন্ন কারনে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। ২৮শে মার্চ ১৯৪১ সালে উল্ফ তার ওভারকোটের পকেট ভারি পাথর দিয়ে ভর্তি করে ওউজ নদীতে আত্মহত্যা করেন। ১৮ই এপ্রিল নদীতে তার দেহাংশ পাওয়া যায়। রডমেল, সাসসেক্স এর মংক হাউজে একটি এলম গাছের নিচে তাকে সমাহিত করা হয়।
ভার্জিনিয়া উলফ সম্পর্কে ইউটিউবে ডকুমেন্টরী দেখুন।
৫। আগাথা ক্রিস্টি (১৮৯০ -১৯৭৬) 
আগাথা ক্রিস্টি একজন ইংরেজ অপরাধ কল্পকাহিনী লেখক। তিনি ৮০টি রহস্য উপন্যাস লেখেন, যাদের মধ্যে গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো (Hercule Poirot) ও মিস মার্পল-এর (Miss Marple) কাহিনীগুলো অন্যতম। তাঁকে রহস্য উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্ভাবনী লেখকদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর ডাকণাম "দ্য কুইন অফ ক্রাইম" (অপরাধ উপন্যাসের রাণী)। তাঁর লেখা অনেকগুলো রহস্য কাহিনী থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এর তথ্যানুসারে অগাথা ক্রিস্টি বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের লেখক এবং যেকোন ধরনের সাহিত্যকর্মের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক, যে ক্ষেত্রে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারই কেবল তাঁর সমকক্ষ।তাঁর রচিত প্রায় চারশ কপি বই বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয়েছে, যার চেয়ে কেবলমাত্র বাইবেলই অধিকসংখ্যক বিক্রি হয়েছে। ইউনেস্কোর বিবৃতি অনুসারে তিনি একমাত্র লেখক যার রচনা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ওয়াল্ট ডিজনী কর্পোরেশনের সম্মিলিত কাজই কেবল এ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ক্রিস্টির বই সর্বমোট ৫৬টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

৬। পার্ল এস বাক (১৮৯২-১৯৭৩)
মানবতাবাদী এই ঔপন্যাসিক এর পুরো নাম পার্ল সিডেনস্ট্রিকার বাক। ১৮৯২ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার হিলসবরোতে তাঁর জন্ম। পার্লের মিশনারি বাবা-মা দুজনই বিয়ের পর স্থায়ী হন চীনে। তাঁর জন্মের সময় কিছুদিন আমেরিকায় ছিলেন পার্লের বাবা-মা। মায়ের কাছে ইংরেজি ও কিং নামের এক চীনা ব্যক্তির কাছে চীনা ভাষা শিখেন পার্ল। তবে চীনা ভাষায় তাঁর ব্যাপ্তি ঘটে বাড়ির আয়ার কাছে। পড়াশোনার কারণে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত চীন-আমেরিকা যাতায়াতের মধ্যে ছিলেন পার্ল। ১৯১৪ সালে তিনি চীনে ফিরে জন লসিং বাক নামের একজন মিশনারিকে বিয়ে করেন। নিজেও মিশনারি হয়ে বসবাস শুরু করেন চীনের সজোতে। পরে তিনি মিশনারির কাজ ছেড়ে দেন। সেখানকার পটভূমিতে লেখেন ‘দ্য গুড আর্থ’। ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তাঁরা দুজন নানকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করেন। পার্ল এস বাক পড়াতেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। মায়ের মৃত্যুর পর পার্ল বাক আমেরিকায় ফিরে যান। সেখানে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষায় এমএ করেন। নানজিং প্রদেশে থাকাকালে চীনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা আন্দোলনে ঝুঁকির মধ্যে পড়েন পার্ল এস বাক দম্পতি। চিয়াং মাইশেকের দল, কমিউনিস্ট দল এবং কিছু যুদ্ধবাদী মানুষের সংঘর্ষে তাঁদের থাকা বেশ কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। 

একপর্যায়ে চীনে বিদেশি কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে বিপন্ন হয়ে পড়েন তিনি। সে সময় স্থানীয় গরিব এক চাষির বাড়িতে লুকিয়ে থাকেন তাঁরা। পরে তাঁদের সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে সাংহাই ও পরে জাপানে পালিয়ে যান তাঁরা। এক বছর জাপানে থাকার পর প্রাণের ভয় উড়িয়ে দিয়ে আবার তাঁরা নানজিংয়ে ফিরে যান। এরই মধ্যে ভেঙে যায় পার্লের প্রথম বিয়ে। এর পর তিনি বিয়ে করেন প্রকাশক রিচার্ড ওয়ালশকে। চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পার্ল এস বাককে আখ্যায়িত করা হয় রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হিসেবে। সেই সঙ্গে চীন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও তিনি চীন যেতে পারেননি। তখন বাধ্য হয়ে তিনি আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় বসবাস শুরু করেন।
পার্ল এস বাক লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অসংগতি নিয়ে লিখেছেন, আন্দোলন করেছেন সমানতালে। নারী অধিকার, শিশু অধিকার, ভারতীয়দের চীনে থাকার দাবি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিচয়হীন সন্তানদের নানা বিষয়ে। তাঁর একটি সন্তান ছিল মানসিক প্রতিবন্ধী। এ দরদ থেকেই তিনি পালক সন্তান নেন। পিতৃপরিচয়হীন সন্তানদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠা করেন বেশ কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠন। ১৯৪৯ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সন্তান পালক সংস্থা বা আন্তর্জাতিক অ্যাডোপশন কমিটির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এশিয়ান দেশগুলোর অভাব ও সন্তান প্রতিপালনে বাধা দূরীকরণে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যাড্রেস পোভার্টি অ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন ফেসড বাই চিলড্রেন ইন এশিয়ান কমিউনিটি’। বিশেষ করে যেখানে আমেরিকান সৈন্য গিয়ে অবাঞ্ছিত সন্তান জন্ম দিয়েছেন, সেখানেই তাঁদের অধিকার আদায়ে চেষ্টা করেছেন পার্ল। দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনে এসব শিশুর জন্য এতিমখানা স্থাপন করেন। শিশুদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তিনি আমেরিকায় বর্ণবাদ প্রথা নিয়েও সোচ্চার ছিলেন। সে সময় বেশির ভাগ মানুষ এসব নিয়ে ভাবতেন না। পার্লের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে চীনে। নিজের ভাষা শেখার আগেই তিনি শিখেছিলেন চীনা ভাষা। তাই তাঁর লেখায় চীন জীবন্ত ও জ্বলন্ত। সব মিলিয়ে পার্ল এস বাক লিখেছেন ৪০টি উপন্যাস, ২১টি গল্প, ১২টি নন-ফিকশন, রান্নার বই ও চারটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। তাঁর বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘দ্য গুড আর্থ’, ‘দ্য সান’, ‘দ্য মাদার’, ‘কাম মাই বিলাভেড’, ‘সাটান নেভার স্লিপস’, ‘ইমপেরিয়াল ওম্যান’, ‘প্যাভিলিয়ন অব ওম্যান’, ‘গডসমেন’, ‘লেটার ফ্রম পিকিং’, ‘দ্য চিলড্রেন হু নেভার গ্রো’, ‘মাই সেভারেল ওয়ার্ল্ড’, ‘এ ব্রিজ ফর পাসিং’, ‘দ্য একজাইল অ্যান্ড ফাইটিং অ্যাঞ্জেল’। বাকের লেখায় উঠে এসেছে চীনা জীবনযাত্রা, মিশনারিদের কাজ ও যুদ্ধের কথা। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৩৮ সালে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও ১৯৩২ সালে পুলিৎজার, ১৯৩৫ সালে উইলিয়াম ডিন হাওয়েলস মেডেল পান তিনি। 

৭। সিমোন লুসি এর্নেস্তিন মারি বেরত্রাঁ দ্য বোভোয়ার ( ১৯০৮-১৯৮৬)
সিমোন দ্য বোভোয়ার ছিলেন একজন ফরাসি লেখক, বুদ্ধিজীবী, অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, রাজনৈতিক-কর্মী, নারীবাদী ও সমাজতত্ত্ববাদী। যদিও তিনি নিজেকে একজন দার্শনিক মনে করতেন না, তার নারীবাদী অস্তিত্ববাদ ও নারীবাদী তত্ত্বতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ছিল। তিনি দর্শন, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়াবলির উপর রচনা, গ্রন্থ ও উপন্যাস এবং জীবনী ও আত্মজীবনী রচনা করেন। বর্তমানে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর অধিবিদ্যামূলক উপন্যাস শী কেইম টু স্টেই এবং দ্য ম্যান্ডারিন্স, এবং ১৯৪৯ সালে লেখা তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ল্য দোজিয়েম সেক্স-এর জন্য। শেষোক্ত গ্রন্থটিতে নারীর উপর নিপীড়নের বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এটিকে নারীবাদের একটি অন্যতম ভিত্তিগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিমোন সারাজীবন অবিবাহিত ছিলেন, তাঁর ফরাসী দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র্‌ এবং মার্কিন লেখক নেলসন এ্যালগ্রেন এর সঙ্গে প্রেম এবং যৌন সম্পর্ক ছিল। তার বাবা জর্জে বেরত্রাঁ দ্য বোভোয়ার ছিলেন আইনজীবী যিনি একসময় অভিনেতা হতে চাইতেন, মা ফ্রাঁসোয়া ব্রাসেয়ো গৃহিণী যিনি ছিলেন একজন টাকাওয়ালা ব্যাংকারের সন্তান, এবং এই মহিলা খুবই ধার্মিক ছিলেন (ক্যাথলিক)। সিমোনের আরেকটি বোন ছিলো যার নাম হেলেন (১৯১০ - ২০০১)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায় সিমোনদের। এ সময় সিমোনের মা সে সহ হেলেনকে ধর্মবাদী বিদ্যালয়ে পাঠাতে চেয়েছিলেন। সিমোন ছোটবেলায় ব্যাপক ধর্মবাদী ছিলেন, তিনি অবশ্য ১৪ বছর বয়সে ধর্মের উপর বিশ্বাস হারান এবং সারা জীবন নাস্তিক থাকেন। সিমোন ১৯২৫ সালে গণিত এবং দর্শনে ব্যাকালরেট পরীক্ষায় পাশ করেন, এরপর তিনি 'প্যারিস ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়'তে গণিত নিয়ে পড়েন, এবং সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে পড়েন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে। তিনি পরে সরবনে দর্শন নিয়ে পড়েন এবং ১৯২৯ সালে এ্যাগ্রিগেশন পাশ করেন। 

৮। ডোরিস লেসিং (১৯১৯-২০১৩)
ডোরিস লেসিং ছিলেন একজন ব্রিটিশ উপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার, জীবনীলেখক এবং ছোটগল্পকার। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে দি গ্রাস ইস সিঙ্গিং (১৯৫০), পাঁচটি ধারাবাহিক উপন্যাস যেগুলোকে একত্রে বলা হয় চিলড্রেন অফ ভায়োলেন্স (১৯৫২-৫৯), দি গোল্ডেন নোটবুক (১৯৬২), দি গুড টেররিস্ট (১৯৮৫), এবং একত্রে পাঁচটি উপন্যাস যেগুলোকে বলা হয় ক্যানোপাস ইন আরগোস: আর্কাইভস (১৯৭৯-১৯৮৩)। লেসিংকে ২০০৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। লেসিং ছিলেন একাদশ নারী এবং সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইংরেজী সাহিত্য তথা ফেমিনিস্ট সাহিত্যের কর্ণধার হিসেবে তিনি সুপরিচিত। তার আত্মজীবনীমূলক প্রথম উপন্যাস ‘দি গ্রাস ইজ সিংগিং’ লিখে তিনি প্রথম পাঠক ও সমালোচক্দের নজরে আসেন। জিম্বাবুয়ের এক শ্বেতাংগ খামারে বেড়ে ওঠার কাহিনী ছিল সেটি। আফ্রিকার শ্বেতাংগ সমাজের বর্ণবিদ্বষ তাঁর প্রথমদিকের রচনায় ঘুরেফিরে আসে। পরবর্তীতে ফেমিনিজম, কমিউনিজম ও মার্কসবাদী দর্শনও তাঁর উপন্যাসে বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পায়। বিশেষত ১৯৬২ সালে রচিত ‘দি গোল্ডেন নোটবুক’ উপন্যাসটি নারীবাদী সাহিত্যের একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়াও সাইন্স ফিকশনের সফল রচয়িতা হিসেবেও তিনি সুনাম করেছিলেন। ৭০-৮০র দশকে তিনি ফিকশন উপন্যাস Canopus in Argos লেখেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় লিখেছিলেন ‘দি গুড টেররিস্ট’ উপন্যাসে তিনি রাজনৈতিক বিষয়বস্তুতে ফিরে যান। ৯০ দশকে তার আত্মজীবনী প্রচুর সমাদৃত হয়।
৯। মায়া এ্যাঞ্জেলু (১৯২৮-২০১৪)
মায়া এ্যাঞ্জেলুর জন্ম ১৯২৮ সালের ৪ এপ্রিল। আমেরিকান মায়া এ্যাঞ্জেলু লেখক এবং কবি। তিনি ছয়টি আত্মজীবনী, বেশ কয়েকটি কবিতার বইসহ নাটক, সিনেমার স্ক্রীপ্ট লিখেছেন এবং টেলিভিশন শোতে অংশগ্রহণ করেছেন। এ্যাঞ্জেলু ডজন খানিক এ্যাওয়ার্ডের পাশাপাশি ৩০টি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। শৈশব থেকেই এ্যাঞ্জেলুর মেধা প্রকাশ পায়, যার ফলে ধ্রুপদী নারী হিসেবে সবার শীর্ষে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। ৮৫ বছর বয়সী এ্যাঞ্জেলুর আফ্রো আমেরিকান অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ছয়টি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশিত হয়েছে, যা চলমান নিউইর্য়ক টাইমসের সর্বাধিক বিক্রিত তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে। কিশোরী বয়সে এ্যাঞ্জেলু তার মায়ের প্রেমিক দ্বারা সম্ভ্রমচ্যুত হন। সেই ঘটনা তার মনে গভীর দাগ কাটে এবং আজীবন তিনি নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে আসছেন। 
১০। এলিস মুনরো (১৯৩১- )
এলিস এন মুনরো। কানাডার কথাসাহিত্যের বিশিষ্ট নাম। দ্য নিউ ইয়রকার, দি আটলান্টিক মান্থলি, দ্য প্যারিস রিভিউ-এর মতো প্রসিদ্ধ সাহিত্য পত্রিকার নিয়মিত লেখক; কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একাধিক সাহিত্য-সম্মাননায় সংবর্ধিত এই ছোটগল্পকার কানাডার সাহিত্যজগতের মধ্যমণি হয়েছিলেন এতদিন। ২০১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৩১ সালে কানাডার অন্টারিওর ক্লিনটন নামক ছোট শহরের কাছে। বাবা ছিলেন পশু খামারের মালিক, শীতবস্ত্রে ব্যবহৃত মূল্যবান লোম ও পশম যেসব পশু থেকে পাওয়া যায়। মা ছিলেন শিক্ষিকা। মাত্র ১১ বছর বয়সেই মুনরো ঠিক করে ফেলেন, বড় হয়ে একজন লেখকই হবেন। সে মতোই এগিয়েছে সবকিছু। নিজের পেশা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আর কখনো তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি। মুনরোর মায়ের দিকের আত্মীয়রা শহরবাসী। বাবার জীবনজীবিকা গ্রামকেন্দ্রিক। মন-মানসিকতায়, অভিরুচিতে, জীবনযাপন পদ্ধতিতে দুই পরিবারে ছিল পার্থক্য। ছিল দ্বন্দ্ব। শহুরে শিক্ষাভিমানী ভদ্রসমাজের গ্রামের মানুষজনকে অবজ্ঞার চোখে দেখাটা আমাদের দেশের মতো সেই দেশেও আছে। এই দ্বন্দ্ব এলিস মুনরো আশ্চর্য কুশলতায় তাঁর গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর গল্পে কর্তৃত্বপরায়ণা অনেক মাসি, দিদিমার দেখা মেলে। গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব এই সব চরিত্রের মধ্যে রূপায়িত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গল্পের উপাদান এসেছে তাঁর কৈশোর-যৌবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। খুব কাছে থেকে দেখা, নিবিড় অন্তরঙ্গভাবে জানা কানাডার বিশেষ অঞ্চল অন্টারিওর হিউরন কাউন্টি, যেখান পৈতৃক বাড়ি এবং দ্বিতীয় স্বামী গ্যারি ফ্রেম্লিনের বাড়ি, এই ভূখণ্ডই এলিস মুনরোর প্রিয় স্থান। এই ভূভাগের প্রেক্ষাপটে গল্পগুলি রচিত। লরেন্সের উপন্যাসে যেমন নটিংহাম, হার্ডির উপন্যাসে যেমন ওয়েসেক্স, ফকনার ও ফ্ল্যানারি ও কনরের উপন্যাসে আমেরিকার মধ্য দক্ষিণাঞ্চল যেমন বারবার ঘটনাস্থান হিসেবে চিত্রিত হয়েছে, কানাডার অন্টারিওর হিউরন কাউন্টির নিসর্গ, ছোট শহর ও গ্রাম মেশানো অঞ্চলটি এলিস মুনরোর বহু গল্পে অবিস্মরণীয়তা পেয়েছে। ছোট শহর ও গ্রাম এলাকার রক্ষণশীল সংকীর্ণ মানসিকতার সমাজে একটি মেয়ের বেড়ে ওঠা, পরিবার ও সমাজের সাথে সংঘাত- এই বিষয়টি তাঁর অনেক গল্পের উপজীব্য। আরো একটা বিষয়, উল্লেখ করবার মতো। পুরুষ চরিত্রের চেয়ে তাঁর গল্পের নারীরা বহুমাত্রিক, বহুকোণিক জটিলতা ও গভীরতায় রূপায়িত হয়েছে। পরিণত বয়সের গল্পে বৃদ্ধা-মধ্যবয়সী নিঃসঙ্গ নারীদের আলেখ্য, যাদের সাধারণ, আটপৌরে, আপাততুচ্ছ দিনানুদৈনিক জীবন গভীর কোনো উপলব্ধি বা বোধের হঠাৎ উদ্ভাসনে অর্থময় হয়ে যায়। জেমস জয়েস যাকে বলেছেন, এপিফেনি, বোধের হঠাৎ উদ্ভাসন, সেই আলোয় এলিস মুনরোর গল্পের চরিত্রদের চেতনার জগৎ দীপ্যমান। প্লট ও ঘটনা নিতান্ত স্বল্প বা গৌণ। বোধের হঠাৎ আলোর উৎসারণই মুখ্য তাঁর গল্পে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে, সমালোচকরা তাঁকে রাশিয়ার গল্পকার আন্তন চেখভের সাথে তুলনা করেছেন। 
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে যেভাবে সংগ্রাম করে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়, তেমন সংগ্রাম করেই এলিস মুনরোকে সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে। ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকের ছাত্রী ছিলেন। নানা ধরনের চাকরি করেছেন পড়ার খরচ জোগাতে। ১৯৫০ সাল, তখনো তিনি ছাত্রী, তাঁর গল্প ছাপা হয়। ১৯৫১-তে বিয়ে করেন সহপাঠী জেমস মুনরোকে। স্বামী ও এলিস মিলে বইয়ের দোকান দেন। এই দোকানই ছিল সংসারের আয়ের উৎস। এই সংসারে আসে চার কন্যা সন্তান। দশ বছর পর জেমসের সাথে বিচ্ছেদ ১৯৭২ সালে। অতঃপর ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল লেখার শিক্ষকতা। এই বিশ্ববিদ্যালয় পরে তাঁকে ডি-লিট সম্মানে বরণ করেছিল। সেটা ১৯৭৬ সাল। সেই বছর জেরাল্ড ফ্রেমলিনকে বিয়ে করেন। জেরালডের সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পেশায় জেরালড ছিলেন ভূগোলবিদ, মানচিত্রকার। বিয়ের পর অন্টারিওর ছোট শহর ক্লিনটনের কাছে জেরাল্ডের খামার বাড়িতে তাঁরা নতুন সংসার পাতেন। এই বাড়িতে ৮৮ বছর বয়সে ২০১৩ এর ১৭ এপ্রিলে এলিস মুনরো দ্বিতীয় স্বামী জেরালড ফ্রেমলিনের মৃত্যু হয়। এলিস নিজে দুরারোগ্য ব্যাধির জটিলতায় আক্রান্ত। ২০০৯ সালের টরন্টো শহরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এলিস তাঁর হৃদপিণ্ডের বাইপাস অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি এবং ক্যানসার-চিকিৎসা গ্রহণের কথা জানিয়ে ছিলেন। রোগযন্ত্রণার নির্মম অভিজ্ঞতা এবং অনেক আপনজন, নিকটাত্মীয় (পিতা, মাতা, কন্যা, স্বামী ও অন্যান্য) জনের মৃত্যুর নিদারুণ আঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের এতটা বছর পার করে এসেছেন তিনি। আঘাত, শোক, প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁর রচনায় বারবার। তাঁর জীবন ও রচনার এই বৈশিষ্ট্যকে আলোকপাত করে অনেক সমালোচক গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন।
১৯৯৪ সালের প্যারিস রিভিউ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্তরঙ্গভাবে নিজের সম্পর্কে তিনি অনেক কথা বলেছিলেন। বলেছেন পঠনপাঠন, প্রিয় লেখক, লেখালেখির অভ্যাস, সমকালীন সাহিত্য সমাজ নিয়ে নানা কথা। বলেছেন ত্রিশ বছর বয়স অবধি বই পড়াটাই এক অর্থে তাঁর জীবন। প্রিয় লেখক কারা? লেখিকাদের নাম উল্লেখ করেছেন বেশি। তাঁদের মধ্যে আছেন ফ্ল্যানারি ও কনর, ক্যাথারিন এন পোটার, কারসন ম্যাক কালার্স, ইউডোরা ওয়েলটি। অকপটে জানিয়েছেন ডিএইচ লরেন্সের লেখা ভালো লাগে না। বিশেষত, লরেন্সের উপন্যাসে যৌনতার বর্ণনা। ভালো লাগে জাদুবাস্তবতার রীতিতে লেখা উপন্যাস। বিশেষভাবে বলেছেন, উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের উপন্যাস সো লং, সিইউ টুমোরো-এর কথা। মার্কেজের ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউডকে বলেছেন অনন্য, অনণুকরণীয়, কানাডার সাহিত্য সমাজ, যাতে পুরুষ লেখকদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ, তাকে বরাবর এড়িয়ে চলেছেন। মনে হয়েছে, নামিদামি পুরুষ সাহিত্যরথীরা লেখিকাদের অবজ্ঞা ও কৃপার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। বলেছেন, সাহিত্যিকদের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ সংসর্গে হয়তো তাঁর লেখার ক্ষতিই হতো। তাঁদের বক্রোক্তি ও আক্রমণে তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগত। তাই বেছে নিয়েছেন নিভৃতি। মমত্ব দিয়ে লিখেছেন নারীর চোখে দেখা নারী পৃথিবীর কুশীলবদের কথা। নারীর কুমারীজীবন, দাম্পত্য, পারিবারিক, সামাজিক সম্পর্কের বহু জটিল অভিজ্ঞতার কথা, যেন আমাদের সাহিত্যের আশাপূর্ণা দেবী। মূলধারার বড় বড় উপন্যাস লেখা- এ যেন কেবল পুরুষদের পক্ষেই সম্ভব। একজন নারী হয়ে নারীত্ব, মাতৃত্ব, কারো প্রেমিকা, কারো বা স্ত্রীর ভূমিকায় তিনি যেন কেবলই প্রান্তজন, নিম্নবর্গীয়, ব্রাত্য, প্রান্তিক বিষয়বস্তুর কথাশিল্পী।
কিন্তু তাঁর গল্প ও কথাসাহিত্যের বদৌলতে যে সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাতে তিনি আজ স্বদেশের ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলধারার অন্যতম প্রধান সাহিত্য রচয়িতার আসনে অধিষ্ঠিত। সাহিত্যে প্রথম কানাডা-অধিবাসী নোবেল বিজয়ী। ১৯৬৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত সময়কালে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা চৌদ্দ। কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনবার। আমেরিকার, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া থেকে এক ডজনের বেশি সাহিত্য পুরস্কারে হয়েছেন সম্মানিত।
১১। মার্গারেট অ্যাটউড (১৯৩৯ -)
কানাডার অধিবাসী মার্গারেট অ্যাটউড একজন কানাডিয়ান কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্য সমালোচক, প্রাবন্ধিক এবং পরিবেশবিদ। বুকার প্রাইজ এবং অন্যান্য বহু পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাটউড তাঁর উপন্যাসের জন্যেই অধিক পরিচিত। উপন্যাসের পাশাপাশি তাঁর ১৫টি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে তিনি সদা সচেতন এবং পরিবেশ আন্দোলনের একজন সক্রীয় কর্মী। কথা সাহিত্যের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে সন্মানিত লেখকদের মধ্যে তিনি একজন। মার্গারেট আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কারের পাশাপাশি সাহিত্যের উপর 'প্রিন্সেস অফ অস্ট্ররিয়াস' পুরস্কার লাভ করেন তিনি। মার্গরেট বুকার পুরস্কার পেয়েছেন মোট পাঁচ বার। এছাড়াও সপ্তমবার চূড়ান্তভাবে মনোনীত হন গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের জন্য। মার্গারেট 'ট্রাস্ট অফ কানাডা'র প্রতিষ্ঠাতা। এটি একটি অলাভজনক সাহিত্য সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এই সংগঠন কানাডার সর্বস্তরের লেখক সম্প্রদায়কে উত্সাহিত করে থাকে। একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে মার্গারেটের যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। মার্গারেটের রূপকথার উপর লেখা উপন্যাসটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যেখানে লাখ লাখ পাঠকের সাড়া মিলেছে সমান্তরাল ভবিষ্যতের জৈবিক নিয়তিবাদ এবং লিঙ্গ বৈষম্য সংক্রান্ত বিষয়ের উপর। বইটি মূলত বিশ্বের নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সতর্কীকরণধর্মী উপন্যাস। এই উপন্যাসটি আফগানিস্তানে তালিবান শাসন ব্যবস্থার বাহুল্যতা রোধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। ৭৬ বছর বয়সী বর্ষীয়ান এই লেখকের সাহিত্য জগতে বিচরণ অনেক বর্ণিল। আনুষ্ঠানিক প্রাপ্তিযোগও অনেক। বুকার পুরস্কার (ক্যাটস আই ১৯৮৭), কানাডীয় গভর্নর জেনারেল অ্যাওয়ার্ড (দ্য হ্যান্ডমেইডস টেইল ১৯৮৫), আর্থার সি ক্লার্ক অ্যাওয়ার্ডসহ (দ্য হ্যান্ডমেইডস টেইল) আরও অনেক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। হার্ভার্ড থেকে শুরু করে পৃথিবীর ১৯টি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানজনক ডিগ্রিপ্রাপ্ত এই লেখক ২০০১ সালে কানাডার ওয়াক অব ফেমে অভিষিক্ত হন। কানাডার সর্বোচ্চ সম্মানজনক অর্ডার অব কানাডা প্রাপ্তিও ঘটেছে তার। উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, মার্গারেট অ্যাটউড একজন ক্রিটিক্যালি এক্লেইমড লেখক হওয়ার পাশাপাশি, তার বইও কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেস্ট সেলার। লেখালেখির পাশাপাশি মার্গারেট অ্যাটউড একজন সংগঠক ও অ্যাকটিভিস্ট। কানাডাসহ সারা পৃথিবীর লেখকদের জন্য নানান প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও রাইটার্স অব কানাডার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি গ্রিফিন পোয়েট্রি পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। অ্যাটউড একজন অত্যন্ত সক্রিয় পরিবেশবাদীও। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এই লেখক কানাডার পরিবেশবাদী রাজনৈতিক দল গ্রিন পার্টির একজন সমর্থক ও এই দলের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এলিজাবেথ মের একনিষ্ঠ ভক্ত। মার্গারেট অ্যাটউড গত ৫০ বছর ধরে রচনা করেছেন অসংখ্য উপন্যাস (১৭), কাব্যগ্রন্থ (২০), ছোট গল্প (১০), শিশু সাহিত্য (৭), অ্যানথলজি (৫) ও নন ফিকশন সাহিত্য (১০)। তার লেখার মূল উপজীব্য কানাডীয় পরিচয় নির্মাণ, নারীবাদ, পরিবেশ, প্রাণী ও মানুষ ইত্যাদি।
সারা পৃথিবীতে অত্যন্ত আলোচিত এই কানাডীয় জীবিত কিংবদন্তিসম ও প্রবাদপ্রতিম লেখককে ঘিরে তার ভক্ত, পাঠক, অনুরাগীদের আগ্রহের অন্ত নেই। গত ১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার পুরো কানাডা জুড়ে বিস্তৃত বইয়ের চেইন স্টোর চ্যাপ্টার-ইনডিগো-কোলসের টরন্টোর কুইন্সওয়ে শাখার উদ্যোগে এক ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। যেখানে মার্গারেট অ্যাটউড নিজে উপস্থিত থেকে তার রচিত বইয়ে স্বাক্ষর করেন পুরো সন্ধ্যা জুড়ে। শুধুমাত্র বইয়ের স্বাক্ষর প্রত্যাশীদের জন্যই ইভেন্টটি উন্মুক্ত ছিল। মার্গারেট অ্যাটউডকে এক নজর দেখার আগ্রহ থেকেই হাজির হই সেই বৃষ্টি ও দুর্যোগ আবহাওয়াপূর্ণ সন্ধ্যায় টরন্টোর কুইন্সওয়ের চ্যাপ্টারে। সেদিন তিনি মূলত তার সদ্য প্রকাশিত দ্য হার্ট গোজ লাস্ট বইটিতে স্বাক্ষর করবেন বলে কথা থাকলেও, তার অন্য রচনাতেও স্বাক্ষর করবেন বলে জেনেছি। আমার আগ্রহ তার লেখা ছোটগল্পে। ফলে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম ছোট গল্পের বই ড্যান্সিং গার্ল ওই স্টোর থেকে কিনে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি লেখকের পাঠক-ভক্তদের সুদীর্ঘ সারিতে। প্রায় ঘণ্টা দুই পরে গিয়ে পৌঁছানো যায় তার কাছে। বইতে স্বাক্ষর করিয়েই এক সুযোগে তাকে ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশের লেখক-ব্লগার হত্যার প্রতিবাদে স্বাক্ষর করায় ও সহমর্মিতার জন্য। আর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের কবি পারভেজ চৌধুরীর বাংলায় অনূদিত তার দুটি কবিতা। অনুবাদক ও আমার পারস্পরিক আগ্রহে এবং অনুবাদকের অনুমতিক্রমেই তুলে দিই তার হাতে অনূদিত দুটি কবিতা। এই কবিতা দুটো যে আবার বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিতব্য কানাডার সমকালীন কবিতা' নামক একটি কাব্যগ্রন্থেও ঠাঁই পেতে যাচ্ছে শীঘ্রই, তাও বলি। তাকে জানান দিই শুধু কানাডীয় বাংলাদেশিরাই নন, সুদূর বাংলাদেশেও তার পাঠক আছে।
১২। টনি মরিসন (১৯৩১- )
প্রদত্ত নাম ক্লো আর্ডেলিয়া উওফোর্ড। টনি মরিসন একজন মার্কিন ঔপন্যাসিক, সম্পাদিকা ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপিকা তাঁর উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হল মহাকাব্যিক রীতি, তীক্ষ্ণ কথোপকথন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ চরিত্রায়ন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলো হল দ্য ব্লুয়েস্ট আই (১৯৭০), সুলা (১৯৭৩), সং অফ সলোমন (১৯৭৭) এবং বিলাভেড(১৯৮৭)। ১৯৮৭ সালের লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘বিলাভড’। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকার গৃহযুদ্ধ পরবর্তী পটভূমিতে রচিত হয়েছে উপন্যাসটি। আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাস মার্গারেট গার্নারের জীবনী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয়েছিল উপন্যাসটি। ১৯৮৮ সালে ফিকশনের জন্য পুলিৎজার পুরস্কার জেতে ‘বিলাভড’। ১৯৯৮ সালে উপন্যাসটি নিয়ে একই নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এতে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত টেলিভিশন উপস্থাপিকা অপরাহ উইনফ্রে।
১৩। সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ (১৯৪৮-)

বেলারুশীয় প্রমিলা সাংবাদিক এবং লেখিকা। তিনি ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি বেলারুশের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ৬৭ বছর বয়সী সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ হলেন চতুর্দশ নারী, যিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেন। নিজের দেশে আলেক্সিয়েভিচ সরকারের একজন সমালোচক হিসেবে পরিচিত। আর তিনিই প্রথম সাংবাদিক, যিনি সাহিত্যের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কার পেলেন। এই লেখিকা এ মনুমন্টে টু সাফারিং অ্যান্ড করেজ ইন আওয়ার টাইম বইয়ের জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে আলেক্সিয়েভিচ ১৪তম নারী যিনি এ পুরস্কার পেলেন। পুরস্কারের অর্থমূল্য আট মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার বা নয় লাখ ৫০ হাজার ইউএস ডলার।

চেরনোবিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে লেখা বইয়ের মাধ্যমেই আলেক্সিয়েভিচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত অর্জন করেন। এই দুই ঘটনার ভয়াবহতা তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে আবেগ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সেই বইগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ১১২তম লেখক হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে সুইডিশ অ্যাকাডেমির প্রধান সারা দানিউস বলেন, “আলেক্সিয়েভিচ তার অনন্যসাধারণ লেখনি শৈলীর মাধ্যমে সতর্কভাবে বাছাই করা কিছু কণ্ঠের যে কোলাজ রচনা করেছেন, তা পুরো একটি যুগ সম্পর্কে আমাদের বোধের জগৎকে নিয়ে গেছে আরও গভীরে।" সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচের চল্লিশ বছর কেটেছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পরের সময়ের অসংখ্য মানুষের জীবন কাহিনী শুনে। তবে তার গদ্য কেবল ইতিহাসকে তুলে ধরেনি, ধারণ করেছে মানুষের আবেগের ইতিহাস। প্রায় অর্ধ-শতক পর একজন সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হল, যিনি মূলত ‘নন-ফিকশন’ লেখক।
১৪। অরুন্ধতী রায় (১৯৬১-) 
একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তাবাদী। তিনি পরিচিত হয়ে আছেন তাঁর পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংসের জন্যে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এ উপন্যাসটি ১৯৯৮ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেছিল। এছাড়াও তিনি পরিবেশগত সংশ্লিষ্টতা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও জড়িত আছেন। ভারতের আসাম রাজ্যের শিলংয়ে অরুন্ধতী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রঞ্জিত রায় বাঙালি হিন্দু হিসেবে চা-কর্মী এবং মা সিরিয়ান খ্রিস্টান ম্যারি রায় নারী অধিকার কর্মী ছিলেন। কেরালার আয়মানাম এলাকায় শৈশবকাল অতিক্রান্ত করেন। কত্তায়ামের কর্পাস ক্রিস্টি বিদ্যালয়ে গমন করেন। এরপর তামিলনাড়ুর নীলগিরিতে লরেন্স বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্থাপত্যবিদ্যা বিষয়ে দিল্লির পরিকল্পনা ও স্থাপত্য বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানেই তিনি তার প্রথম স্বামী স্থাপত্যবিশারদ গেরার্ড দ্য কুনহা'র সাথে পরিচিত হন। ১৯৮৪ সালে প্রদীপ কৃষাণ নামীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাকে দ্বিতীয়বারের মতো স্বামীত্বে বরণ করেন। ১৯৮৫ সালে পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র মাসি সাহিবে উপজাতীয় বালিকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দ্য গড অব স্মল থিংসের সাফল্যের পূর্বে আর্থিক সচ্ছলতা আনয়ণে অনেকগুলো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তন্মধ্যে - দিল্লির পাঁচতারা হোটেলে এরোবিক্‌স ক্লাশ পরিচালনা করা অন্যতম। অরুন্ধতী'র কাকাতো ভাই প্রণয় রায় প্রচার মাধ্যমের অন্যতম পুরোধা হিসেবে টিভি মিডিয়া গ্রুপ এনডিটিভির প্রধান। বর্তমানে অরুন্ধতী রায় দিল্লিতে বসবাস করছেন। দ্য গড অব স্মল থিংস উপন্যাসের জন্যে ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করেন অরুন্ধতী। এ পুরস্কারের অর্থ মূল্য ছিল $৩০,০০০। পুরস্কার প্রদান উৎসবে আয়োজক কমিটি উল্লেখ করেন, 'বইটিতে সকল বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যা ইতোমধ্যেই সৃষ্ট হয়েছে'। এর পূর্বে তিনি 'ইন হুইচ এনি গিভস ইট দোজ ওয়ানসে'র জন্যে ১৯৮৯ সালে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে ন্যাশনাল ফিল্ম এ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। ২০০২ সালে তিনি লান্নান ফাউন্ডেশনের 'সাংস্কৃতিক মুক্তি পুরস্কার' লাভ করেন। 'বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকার ও সংস্থাগুলো কর্তৃক সাধারণ নাগরিকগোষ্ঠীর উপর প্রভাব বিস্তার' শিরোনামীয় প্রবন্ধে তাঁর জীবন উৎসর্গ এবং মুক্তি, ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়াবলি তুলে ধরা হয়েছিল।
১৫। ঝুম্পা লাহিড়ী (১৯৬৭-)
নীলাঞ্জনা সুদেষ্ণা লাহিড়ীর জন্ম ইংল্যান্ডের এক বাঙালি পরিবারে ১৯৬৭ সালে। খুব ছোটবেলায় মা-বাবার হাত ধরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন – রোড আইল্যান্ড রাজ্যের কিংস্টন শহরে। সাত বছর বয়সে তাঁর গল্প লেখার শুরু – অল্পস্বল্প লেখা চালিয়ে যান স্কুলে পড়ার ফাঁকে-ফাঁকে। বার্নার্ড কলেজ থেকে ঝুম্পা ইংরেজি সাহিত্যে বিএ পাশ করেন। তারপর মা-বাবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও চাকরি – প্রথমে একটি পুস্তকালয়ে ক্লার্কের কাজ এবং পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টের পদে। এই কর্মের সূত্রে তাঁর ডেস্কে আসে একটি কম্পিউটার এবং কাজের ফাঁকে-ফাঁকে সেই কম্পিউটারেই তাঁর সিরিয়াস ও নিয়মিত সাহিত্যচর্চার সূচনা এবং একটির পর একটি গল্প। শুধু তাই নয়, তিনি নাম লেখালেন বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল সাহিত্য বিভাগে স্নাতকোত্তর পঠন-পাঠনের জন্যে। সেখানে পরপর কয়েকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, যেগুলো তাঁর বাবা-মা সস্নেহে সাজিয়ে রেখেছেন ঘরের দেয়ালে। একদিকে তিনি চালাতে থাকলেন ‘রেনেসাঁস স্টাডিজ’ বিষয়ে ডক্টরেটের কাজকর্ম,অন্যদিকে নিয়মিত গল্প লেখা। দুবছরের ফেলোশিপ পেলেন প্রভিন্স্টাউন শহরের ফাইন আর্টস ওমার্ক সেন্টারে। তারপর প্রায় অলৌকিকভাবেই ঘটতে লাগল একের পর এক ঘটনা – সুখ্যাত দ্য ন্যু ইয়র্কার পত্রিকায় প্রকাশিত হলো প্রথম গল্প, জোগাড় হলো তাঁর নিজস্ব সাহিত্য-এজেন্ট। চুক্তি হলো প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশের – সবই অতি অল্প সময়ের মধ্যে। গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হলেও পুরোপুরি বাস্তব ঘটনা। ১৯৯৯ সালের শেষ নাগাদ প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ, ব্যাধির প্রতিবেদক (Interpreter of Maladies। যদিও লেখিকা প্রায় তাঁর সারাজীবন মার্কিন দেশে কাটিয়েছেন এবং সম্ভাবনাময় মার্কিন কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তাঁর সুনাম, গ্রন্থটি বিপণনে প্রকাশক হিউটন মিফলিন কিন্তু তাঁকে হয় ভারতীয় লেখিকা অথবা এক বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর (Ethnic) লেখিকা বলে জ্ঞাত করতেই আগ্রহী। ঝুম্পার গল্পের চরিত্রগুলো সাবলীলভাবে ঘোরাফেরা করে ভারতবর্ষে, বিশেষ করে কলকাতায়, সেখান থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বে, ‘নবীন ইংল্যান্ড’ অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে। প্রধান চরিত্রগুলো বেশিরভাগই অভিবাসী, তার মধ্যে পশ্চিমে বসবাসকারী অর্থনৈতিক অভিবাসী বাঙালিই সিংহভাগ, তবে বুড়িমার মতো পূর্ব পাকিসত্মান থেকে ভারতবর্ষে আসা রাজনৈতিক কারণে ছিন্নমূল অভিবাসীও আছেন। তিনটি গল্পের পটভূমি ভারতবর্ষ,বাকিগুলোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ছোটবেলায় লেখিকা মা-বাবার সঙ্গে ছুটি কাটাতে নিয়মিত কলকাতায় গিয়েছেন-সেই অভিজ্ঞতার রসে জারিত হয়েছে তাঁর ভারতীয় চরিত্রগুলো; এছাড়া রয়েছেন মার্কিন দেশে অভিবাসী বাঙালিরা, যাঁদের সাহচর্যে তিনি বেড়ে উঠেছেন, আর মূলত গল্পের প্রয়োজনে পাদপূরণের মতো এসেছে কিছু মার্কিন চরিত্রও। কলকাতা শহরটি তার ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত মিলে বারবার ফিরে আসে ঝুম্পার রচনায়। 

তথ্য সূত্রঃ
https://www.kaliokalam.com (এপার বাংলা,ওপার বাংলা এবং ঝুম্পা লাহিড়ীর সাহিত্যভুবন)

তথ্য সম্পাদনা ঃ মৌসুমী কাদের

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন