বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

হুমায়ুন আজাদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল : নারী ও নারীবাদের দৈর্ঘ্য প্রস্থ


রোখসানা চৌধুরী


১.

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’ উপন্যাসটির নামেই বোঝা যায় এই উপন্যাসের মূল কথন বাংলাদেশ, যার ৫৬০০০ বর্গমাইলের সীমানার ভেতরকার গল্পটি উপন্যাসের উপজীব্য। এটিই হুমায়ুন আজাদের প্রথম উপন্যাস। এই কাহিনীর মূল প্লট গড়ে উঠেছে পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বিপর্যস্ত বাংলাদেশকে ঘিরে।
উপন্যাসের ১৩টি অধ্যায়ে রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব বিলোপের আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে। সামরিক শাসন ও মৌলবাদের যৌথ অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠা এক যুবক রাশেদের জটিল মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠার মনোজাগতিক বিবৃতির মধ্য দিয়ে এই গল্প এগিয়ে চলে। 

লেখকের প্রথম উপন্যাস বলেই হয়তো, নারী বিষয়ক ভাবনা তার লেখায় যতভাবে বিকশিত হয়েছে তার একটা সম্মিলিতরূপ এই উপন্যাসে পাওয়া যায়। হুমায়ুন আজাদের বারোটি উপন্যাসে উঠে আসা নারীদের অবস্থানকে তিনভাবে সনাক্ত করা যায়। এক, বাংলাদেশের নির্যাতিত নিপীড়িত চিরশোষিত নারী, যারা তাদের জীবনটাকে জন্মমাত্র পরিবার ও সমাজের কাছে অর্পণ করে আজীবনের জন্য শৃঙ্খলিত হয়ে যায়। তাদের নিজস্ব কোনো ভাষ্য উচ্চারিত হয় না। কারণ, জন্মাবধি তারা কখনো পিতা-মাতা, কখনো স্বামী আবার শেষ বয়সে পুত্র-কন্যার অভিভাবকত্বে জীবন কাটিয়ে দেয়। সমগ্র জীবনচক্রকে তারা ভাগ্যের লীলাখেলা বলে সমার্পিত, নিস্পৃহ, নিষ্ক্রিয়, জীবন যাপন করে থাকে।

দ্বিতীয় প্রোটোটাইপটি উচ্চবিত্ত পরজীবী শ্রেণীর নারী। যারা স্বামীর অর্থবিত্ত আয়েশী পরনির্ভরশীল জীবন-যাপন করে। এবং অবিশ্বস্তভাবে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ায়। সম্পর্কগুলো কতটা অনৈতিক তা আসতে সমাজ ও পরিবারের মাপকাঠি দিয়ে নির্র্ণীত হয়।

তৃতীয় টাইপের মেয়েরা নিষ্পাপ কুমারীর মুখচ্ছবি। যে-মুখে কোনো কলঙ্ক স্পর্শ করেনি। তার একাধিক উপন্যাসে নায়ক কীটদষ্ট নারী-পুরুষের সংস্পর্শ থেকে পালাতে গিয়ে এমন স্বপ্ন-কল্পনাময় নারীর দেখা পান। 

২.

‘ছাপান্নো হাজার বর্গমাইল’- এও আমরা এই তিন ধরনের নারীকে উপস্থাপিত হতে দেখি। বিলু আপার চরিত্রটি গ্রাম বাংলার সাধারণ সরল মেয়েদের মুখচ্ছবি, অনেকটা ‘অবরোধবাসিনী’ সংকলনে উল্লেখিত সেইসব অবরুদ্ধ নারীদের প্রতিচিত্র, কিন্তু অন্তরাল থেকে দেখা। কারণ বিলু আপাদের নিজস্ব ভাষ্য অজানাই থেকে যায়। 

এই উপন্যাসে ‘বিলু’ চরিত্রের মাধ্যমে সদ্যবিবাহিত নারীর বৈবাহিক জীবনের যৌন অভিজ্ঞতার ভয়ংকর একটি দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিয়েতে যেমন আজো অধিকাংশ ক্ষেত্রই নারীর নিজস্ব অভিমতের গুরুত্ব থাকে না বললেই চলে, তেমনিভাবে দাম্পত্য সম্পর্কের শুরু যেখানে সেই যৌনজীবন থেকেই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের বিস্তার পরিলক্ষিত হয়। ‘বাসর রাতে বিড়াল মারা’ এই প্রবচনটির মধ্য দিয়ে বিয়ের একেবারে শুরুতেই নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্যকে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। শুরুতেই নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে, নারী নিজের মত করে বেড়ে উঠবে-- যা এই প্রচলিত সমাজের কাম্য নয়। আমরা এই উপন্যাসে পুরুষের এই আধিপত্য বিস্তারের ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করি ‘বিলু’ চরিত্রের মাধ্যমে। জৈবিক অস্তিত্বে আঘাতে আঘাতে বিপর্যস্ত করার মধ্য দিয়ে নারীর ওপর পুরুষের নিজের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বলি বিলু নামের এই মেয়েরা। বিয়ের রাতে সে নৃশংসভাবে ধর্ষণের শিকার হয়। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা তার জীবনে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়ার এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। প্রথমত শক্তিশালী নমস্য দেবতারূপে পুরুষের প্রতি ভয়ের জন্ম হয়। দ্বিতীয়ত নারী তার নিজের শরীরকে অপছন্দ ও ঘৃণা করতে শুরু করে, কারণ এ থেকে তারা কোনো আনন্দ লাভ করেনা। সার্বিকভাবে শারিরীক ও মানসিক পঙ্গুত্ব আনয়নে সক্ষম হয় পুরুষ, যা নারীর ওপর তার আধিপত্যকে নিশ্চিত করে। বিলুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। 

রাশেদ তার বালক দৃষ্টিতে নীরবে অবলোকন করে তার বিলু আপার ‘নারী’ হয়ে ওঠার বা ওঠানোর এই প্রক্রিয়াকে। কোনো নারীর ‘নারী’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে নারীরাও। তারা সদলবলে সম্মিলিত ভাবে পুরুষতন্ত্রের যুপকাষ্ঠে বলি দেয় নতুন নারীটিকে। উপন্যাসে বিশদভাবে এই বিষয়গুলোর দৃশ্যায়ন ঘটেছে। বিলু আপার বাসর রাতে পরবর্তী সকালে রাশেদ দেখতে পায় তার স্বামীর লুঙ্গির সাথে বিলুর কালচে দাগাঙ্কিত শাড়িটা রোদে মেলে দেয়। এই দৃশ্যটি আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে বিবাহ পরবর্তী নারীর সতীত্ব পরীক্ষার প্রথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে বিবাহের পরবর্তী সকালে নারীর সতীত্ব পরীক্ষার জন্য তথাকথিত সতীচ্ছেদ ছেড়া রক্তে ভেজা রুমাল বাশেঁর ডগায় টাঙিয়ে প্রদর্শন করতে হয়, যাতে কন্যার পিতৃকুলের সম্মান বজায় থাকে। 

বিলুর আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশি নারী সদস্যদের আচরণ উৎসাহ প্রণোদনা দাত্রীর (১১০-১১৩ পৃ)। তাদের সভ্যতা-ভব্যতা বর্জিত আচরণই স্বাভাবিক বলে সমাদৃত। পুরুষতন্ত্রের যুপকাষ্ঠে বলি দিতে সমগোত্রীয় নারীগণ ধর্ম ও ঐতিহ্যের বিশ্বাসে পুরুষের কাছে নত হয় সম্মিলিত ভাবে। তবে নারীর এই হয়ে ওঠা প্রক্রিয়াকরণের পরপরই সে পূর্ণমানুষ থেকে বোধহীন জড় অথচ আপাতসুখী মানুষে পরিণত হয়। অবশ্য অল্প কদিনেই নতুন পাওয়া যে কোনোরকম জীবনের সাথে সমঝোতা করে নেয় সে। তার চারপাশটা যেন ঠিক এরকমটিই ঘটবে এমন আবহ তৈরি করে রাখে। বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রীর প্রথম রাত ‘কালরাত’কে ঘিরে এমন একটা আবহের ছবিই লেখক তুলে ধরেন। যখন কালরাতে বিলুর চাপা কান্না ভেসে আসে তখন তার রাশেদের দৃষ্টিকোণকে ছবিটা এভাবে উঠে আসে উপন্যাসে 

‘এক মহিলা বলছে, শুনতে পাচ্ছে রাশেদ, এমন বুড়া মাইয়া আবার কালরাতে কান্দে নি, আমাগ ত বিয়া হইছিল বার বচ্ছর বয়সে, আমরা ত কান্দি নাই, কালরাইতেই ত যা করনের করছিল, রাত ভইর‌্যাই করছিল, লউয়্যে বিছনা ভাইস্যা গেছিল। আরেক মহিলা বলছে, অ নাতি, আমরা ভাবতাছিলাম এর মইদ্যে যার করনের কয়রার কইর‌্যা হালাইছ, অহন দেকছি তুমি মরদ অও নাই, আগে আমাগ কইলেই ত আমরা রান ফাঁক কইর‌্যা ধরতাম, লউয়ে চাদ্দইর ভিজাইতে না পারলে আবার মরদ কিয়ের। আরেক মহিলা বলছে, রাজি না অইলে পাও বাইন্দা লইতে হয়, মাইয়া মানুষ গরুর লাহান, পাও বাইন্দা জবাই করন লাগে।’ (পৃ-১১১) 

এর বিস্তার আগে থেকে পরে বিস্তৃত হতে থাকে। বিলু আপা কালরাতে স্বামীর সাথে রাত কাটানোর আয়োজনের মধ্যেই এই ইঙ্গিত উঠে আসে। 

‘দুলাভাইর দুলাভাই হয় এমন একটা লোক ঘিনঘিনে রসিকতা করার চেষ্টা করছে রাশেদের সাথে, বলছে, আমার শালাডাতো বিয়াইয়ের বোনরে লইয়া থাকব রাইতে, বিয়াই থাকবা কার লগে, আমার লগেই থাইক্ক।’ (পৃ-১১১) 

যখন বিলু পরের দিন জীবনে প্রথমবারের মত পুরুষ সংসর্গে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত--এটা যেন কাঙ্খিত কোন ছবিরই বৃত্তান্ত-- 

‘পাশের বাড়ির বুড়িটি বলছে, মরদ জামাই অইলে অ্যামুনই অয়, মাজা ভাইঙ্গা দেয়, জোয়অইনকাগ কি সবুর সহ্য অয়...” (পৃ-১১২) 

অথবা 

‘জালালুদ্দির বউ ভ-কথা বলতে পারে গান গাওয়ার মতো, কিছু আটকায় না তার মুখে; সে লোকটিকে বলছে, নাতনি ত জামাইয়ের লগে হুইতে চায় না, আমার নাতনিটারে ত খুইদ্যা হালাইছ, আইজ রাইতে আমারে লইয়াই হোও সোনারচান। লোকটিও কম যায় না, নাতনিরে লইয়া আসেন, দুইজনেরে লইয়াই শুই, দুইজনের মাজাই ভাইঙ্গা দেই।’ (পৃ-১১৩) 

এইসব রঙ্গরসিকতার ভেতর দিয়ে মূলত বিলুর মতো মেয়েদের ‘সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার আয়োজন করা হয় সম্মিলিত ভাবে। কেবল শারিরীক ভাবে নয়, মানসিক ভাবেও, সারাজীবনের জন্য। 

উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ পুরুষের বয়োসন্ধিকালীন পরিবর্তনের মুহূর্তটি বর্ণময় ক্যানভাসে দক্ষ শিল্পীর তুলির আচঁড়ে তুলে ধরেছেন বারবার। কিন্তু একই সাথে যৌনতা বিষয়টিকে ঘিরে ট্যাবু জনিত তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও পরিদৃষ্ট হয়। লক্ষ্যনীয় বিষয় যে, পুরুষের বয়োসন্ধিকালের সৌন্দর্য যতখানি মাধুর্য নিয়ে ধরা দেয় ততখানি প্রতিফলিত হয়নি নারীর সম সময়ের পরিবর্তনের উন্মোচন। নারী অধরা রহস্যাকৃত অর্ধপরিচিত অস্তিত্বরূপেই বিরাজমান। 

‘বিলু আপা, আর তার সইরা ইচ্ছে হতো পুষু আপা আর পারুল আপ, এতো মিষ্টি ছিল। তাদের শাড়ি থেকে উঠতো এতো মিষ্টি গন্ধ, চুল থেকে উঠতো এতো মিষ্টি গন্ধ, তারা যেখানে দাঁড়িয়ে গল্প করতো সেখানকার বাতাস গন্ধরাজ ফুলের গন্ধে ভরে যেতো। হাঁটলেই শরীর দুলে উঠতো তাদের, মনে হতো তাদের হাড় নেই, তাদের ভেতরে আছে দুধের জমাট সর, অনেক মাখন আছে তাদের চামড়ার ভেতরে। তারা যখন ব’সে ব’সে গল্প করতো, তাদের ব্লাউজের নিচের প্রান্তের পরে মাংসের ঢেউ দেখা যেতো, ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে রাশেদের’ (পৃ-৮৪) 

‘মেয়েদের বুক প্রথম কুলের মতো ওঠে, তারপর সফেদার মতো হয়, তারপর হয় কৎবেলের মতো, এ-জ্ঞান আজিজ তাকে দিয়েছিল কিছুদিন আগে, রাশেদ কয়েকরাত সহজে ঘুমোতে পারে নি, সে চারদিক দেখতে পারছিল কুল সফেদা কৎবেলের বাগান, পৃথিবীটা ফলের বাগান হয়ে উঠেছিল তার চোখে।’ (পৃ-৮৫) 

তার অন্যান্য রচনার মতোই এই উপন্যাসেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর যৌনতাবোধ, যৌনতা বিষয়ক অভিজ্ঞতাগুলো পুরুষের দৃষ্টিতে ভীতিকর বর্জনীয়, ঘৃণ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যে নারীর গর্ভধারণের বিষয়টি অতিরিক্ত বিদ্বেষপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি অনেকবার নানাভাবে পরিবেশিত হয়েছে। 

‘আজিজ ব’লে বিয়ে হলে পেট হয় ঠিকই, তবে স্বামীর বাড়িতে থাকলে হয়, স্বামী বাড়ি না থাকলে হয় না। এটা এক বিষ্ময় জাগানো নতুন জ্ঞান রাশেদের কাছে; সে মনে করতো বিয়ে হলেই মেয়েদের বছর বছর পেট হয়, কুমড়োর মতো পেট ফুলে ওঠে, কুৎসিত দেখাতে থাকে, তাদের দিকে আকাতে ইচ্ছে করেনা। (পৃ-৮৫) 

জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়াটি পাপ এবং নোংরা আর এই নোংরার সাথে মিলিয়ে নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে। 

‘আজিজই একবার তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বামীরা বউদের পেটে মণি ঢুকিয়ে দেয়, তাতে পেট হয়, বাচ্চা হয়। জিনিশটা কেমন রাশেদ জানে না, তবে খুব ঘেন্না লেগেছিল তার, খুব নোংরা জিনিশ হবে ব’লে তার সন্দেহ হয়েছিলো। তার ধারণা হয়েছিলো বিয়ের পর স্বামীরা বউদের পেট কানায় কানায় ওই নোংরায় ভ’রে দেয়, আর ঐ নোংরা থেকে বছর বছর বাচ্চা হয়।’ (পৃ-৮৬) 

নর-নারীর স্বাভাবিক জৈবিক সম্পর্ক নিয়েও রাশেদ মানসিকভাবে তীব্র ঘৃণা পোষন করতে থাকে। 

‘এরা সবাই সঙ্গমের ফলে উৎপন্ন হয়েছে? এদের প্রত্যেককে আজ দুপুরে গুলিস্তানের চৌরাস্তায় আসার জন্য সঙ্গম করতে হয়েছে একটি মেয়ে মানুষ আর একটি পুরুষ মানুষকে, পুরষমানুষটি আর মেয়েমানুষটি চিৎ আর উপুড় না হ’লে তারা এখানে আজ আসতো না? সঙ্গম ছাড়া এদের কেউ উৎপন্ন হয় নি।- এমন প্রশ্ন ভয়ঙ্কর প্রত্যাদেশের মতো রাশেদের মনে জাগতেই সে শুধু ভয়ই পেলো না, তার শরীর এবং ভেতরে কী একটা যেনো আছে, যেটাকে মনই বলতে চায় সে, দুটিই আঠালো আদিম তরল পদার্থের প্লাবনে চটচট করতে লাগলো। কোটি কোটি সঙ্গমের দৃশ্য তার সামনে; চটের ওপর, মেঝের ওপর, খাটের ওপর, গলির অন্ধকারে, একতলায়, বস্তির ভেতরে কুঁড়েঘরে, দোতালায়, দালানে, তেতলায়, শনের ঘরে, ছেঁড়া পলিথিনের নিচে, ইস্টিশনে, ইটের পাঁজার ভেতরে শুধু নিরন্তর নগ্ন নোংরা সঙ্গম। মেয়েমানুষ দুই পা ফাঁক করে দিয়েছে, ফাঁক করতে চাইছে না, তবু ফাঁক করছে, পুরুষ প্রলম্বিত একটা প্রত্যঙ্গ ভেতরে ঢুকোতে চেষ্টা করছে, ঢুকোতে পারছে না, পিছলে অন্যদিকে চ’লে যাচ্ছে, ঢুকুচ্ছে বের ক’রে আনছে, পারছে না, পারছে, শিথিল হয়ে পড়ে যাচ্ছে। খুব ঘিনঘিনে লাগছে রাশেদের, বারবার তরল পদার্থ ছরকে পড়ে পাঁচতালা দালান ভাঙা বাস রিকশা দোকান প্রকা- প্রকা- অভিনেত্রীদের বক্ষদেশ প্লাবিত ক’রে ফেলছে, সবকিছু চটচট করছে।’ (পৃ-৬৭ - ৬৮) 

মানুষের সহজ স্বাভাবিক প্রবৃত্তির প্রতি এমন ঘৃণা পোষণকারী স্বাভাবিক ভাবেই নারী,নারীর শরীর ও তার জৈবিক নানা প্রক্রিয়াকেও অচ্ছুৎ দৃষ্টিতে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। 

রাশেদ চরিত্রের মাধ্যমে মূলত ট্যাবু আবিষ্ট পুরুষ চরিত্রের রূপায়ণ হতে দেখি। রাষ্ট্রের আদর্শিক স্খলন ও ব্যর্থতা ব্যক্তিমানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতার প্রতীক হসিসেে নর-নারীর স্বাভাবিক সম্পর্ক হয়ে ওঠে বিষ ফলের উপমা। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য। যেভাবে বালকের পুরুষ হয়ে ওঠার মধ্যে বীরত্বের সৌন্দর্য প্রদান করা হয়েছে, নারী রয়ে গিয়েছে পিঞ্জিরাবদ্ধ রহস্যরূপে। আবার রাশেদ চরিত্রের আত্মকথন এর মাধ্যমে বারবার দেশ-কাল-পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতীকীভাবে নারীরই শরীর ও তার যৌনতা বোধের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ নারীর যৌনতা এখানে মানবিকভাবে নয়, প্রতীকে-উপমায় নির্বাক প্রতিমার রূপে রূপায়িত। 

‘হয়তো দুতিন দিনের সান্ধ্য আইনের সুযোগে পেট ভ’রে সঙ্গম ক’রে তারা নতুন বরের মতো শ্রান্ত সুন্দর হয়ে উঠেছে। মাস দশেক পরে দলে দলে জন্ম নেবে সামরিক শিশুরা।’ (পৃ-৩১) 

সুখে-দুঃখে গড়া সত্যিকার মানবীকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। 

‘রেস্ট হাউজটিকে কোমল আবেদনময়ী তরুনীয় মত দেখাচ্ছে, কিছুক্ষণ পর সেও রাশেদের পাশে ব’সে বিয়ার বা হুইস্কি খাবে, নেচেও উঠবে পশ্চিমি তালে, এবং এক সময়, এগারোটা বাজার আগেই, সোফায় মাথা নিচু ক’রে ব’সে বমি চাপার চেষ্টা করে চলবে। তখন তাকে আরও রূপসী দেখাবে, তার শরীর থেকে আরও তীব্র আবেদন পড়তে থাকবে। দারোয়ান দরজা খুলে দিলো, রাশেদের মনে হলো সে এক রূপসীর ভেতরে ঢুকছে, তবে এমন হেঁটে ঢোকা মানাচ্ছে না, রূপসী তাতে সুখ পাচ্ছে না; যদি তার একটা গাড়ি থাকতো, সে গাড়িটি ধীরে ধীরে চালিয়ে ভেতরে ঢুকে পশ্চিমে যেখানে ঘন সবুজের মধ্যে লাল লাল ফুল ফুটে আছে, সেখানে পার্ক করতো, তাহলে দারুণ পুলকে কেঁপে কেঁপে চিৎকার ক’রে উঠতো রেস্টহাউজরূপসী।’ (পৃ-৪৩) 

‘বাঙলাদেশ, তুমি কেমন আছো, সুখে আছো না কষ্টে, নাকি তুমি এসবের বাইরে চ’লে গেছো, তোমার ভূমিকা শুধু চিৎ হয়ে থাকা, কে চড়লো তাতে তোমার কিছুই যায় আসে না, সরাসরি বাঙলাদেশের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে রাশেদের। বাঙলাদেশ কোনো উত্তর দিচ্ছে না, সে কি বলাৎকারে বলাৎকারে অচেতন হয়ে আছে. তার রান বেয়ে রক্ত ঝরছে ? (পৃ-২৯) 


৩.

উপন্যাসের একটি জায়গায় রাশেদ তার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর সঙ্গে তার বাড়িতে যায় মদ্যপানের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশের যে কোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত কিংবা কিঞ্চিত অধিক উচ্চবিত্ত পরিবারে মদ্যপান বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। মাতলামি তো দূরের কথা। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুটি সম্ভবত প্রায়শই বাড়িতে বন্ধু বান্ধব সঙ্গে নিয়ে এসে মদ্যপানের আসর বসায়। এই সব উৎপাতে অভ্যস্ত গৃহিনী স্বভাবতই খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে স্বামীটির প্রতি। অন্যায়ের প্রতি সুস্থির প্রতিবাদ কার্যকর না হওয়ায় বারংবার একই অন্যায়ের সম্মুখীন হতে হতে স্ত্রীট এক সময় ধৈর্যহীন, মুখরা, শালীনতাবর্জিত হয়ে ওঠে। বিশ্বের যাবতীয় রম্যকৌতুকে নারীর এই রণরঙ্গিনী মূর্তিটি রঙ্গরস পরিবেশনের জন্য অসম্ভব জনপ্রিয়। প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কাটুন শিল্পী রনবী কর্তৃক অঙ্কিত ঝাঁটা হস্তে স্থূলঙ্গী ক্রুদ্ধ স্ত্রী সামনে ভীত সন্ত্রস্ত স্বামীর মুখোমুখি দৃশ্যটি মনে পড়ে যায়। কা-জ্ঞানহীন পুরুষের আধিপত্যবাদী অনাচারের প্রতিকার করতে অক্ষম নারীটির অবদমিত রূপটিতে ক্রুরতা ও নিষ্ফল আস্ফালন পরিদৃষ্ট হতে থাকে। কিন্তু রাশেদের দৃষ্টিভঙ্গী বন্ধুপতœীর চাইতেও অধিক শালীনতাবর্জিত মনে হয়। 

ইঞ্জিনিয়ার পত্মীটি ‘লোচ্চা’ বলে তাদের গাল দেয়। দরজা খুলেই ‘মদ লইয়া আইছ, সঙ্গে লোচ্চাগোও লইয়া আইছ’, বলে সম্ভাষন জানায়। 

মহিলা খ্যাঁক খ্যাঁক করতে থাকে, কলেজের ছাত্র প্রথম বেশ্যাবাড়িতে ঢুকতে গিয়ে যেমন গলির কাছে এসে ভয় পায়, ঢুকবে কি ঢুকবে না করতে থাকে, একটু ঢুকতেই একপাল বেশ্যার আক্রমণে গলি থেকে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না, তেমনি অবস্থা রাশেদের। ইঞ্জিনিয়রটি তার স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঠেলতে ঠেলতে শয্যাকক্ষে নিয়ে যায়, বাইর থেকে দরোজা বন্ধ করে দেয়। রাশেদ আরেকটি ঘরে ঘরে একটি কিশোরী আর আরেকটি তরুণীকে দেখতে পেয়ে অত্যন্ত অপরাধগ্রস্থ হয়ে পড়ে, কিন্তু ড্রইংরূমে ঢুকতে বাধ্য হয়। ইঞ্জিনিয়ারটি আধময়লা কয়েকটি গেলাশও একটি পানির বোতল নিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে ঢকঢক ক’রে হুইস্কি ঢালে, আর শয্যাকক্ষ থেকে তার স্ত্রী চিৎকার করতে থাকে। রাশেদ বারবার লোচ্চা লোচ্চা শব্দ শুনতে পায়। রাশেদের হাতের সবুজ গেলাশটিতে পুঁজ জ’মে উঠতে থাকে, পোকা থকথক করতে থাকে, বেশ্যার পঁচে-যাওয়া জিভ থেকে থুথু এসে পড়েত থাকে। (পৃ-৪১) 

রাশেদের প্রতিক্রিয়া আরো অধিক অভিনব এবং গভীরভাবে চিন্তা করলে আরও ভয়াবহ 

‘বাঙলার বউগুলোও পাকা জিনিশ, ভাতারের হাতে মদের বোতল বা মুখে একটু গন্ধ পেলেই তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সতীসাধ্বী হয়ে ওঠে, মুখ থেকে পাড়ার ভাষা বের হতে থাকে, কয়েকদিনের জন্য সুড়ঙ্গে তালা লাগিয়ে দেয়।’ (পৃ-৪০- ৪১) 

ইঞ্জিনিয়ারের বাসায় মদ খেতে থাকা দুটো লোককে দেখে রাশেদ ভাবার চেষ্টা করে তারা কী চিন্তা করছে, কল্পনায় কী দেখছে 

‘তারা কোনো পতিতার নোংরা উরুর দিকে তাকিয়ে আছে ব’লে মনে হলো রাশেদের। তার ঝুলে পড়া স্তন দেখছে, রোগা উরু দেখছে, ভাঁজ দেখছে, অন্ধকার দেখছে, পুঁজ দেখছে এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। ওই মহিলা মদ খাওয়াকে এতো খারাপ মনে করে কেনো, মদ খাওয়া কি দরজা খুলেই, মদ লইয়া আইছ, লগে লোচ্চাগো লইয়া আইছ’ বলার চেয়েও খারাপ, ওই মহিলা কখনও মদ খেয়েছে, খেয়ে বুঝতে পেরেছে খাওয়া খারাপ?রাশেদ সারা বাড়ি ভ’রে বিকারের অজগর দেখতে পেলো, অজগরটি পিচ্ছিল দেহ দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে এ-বাড়ি, শহর, দেশ, লোক দুটিকে, ওই মহিলাকে এবং তাকে।’(পৃ- ৪১-৪২) 

আত্মগ্লানি বা অপরাধবোধের পরিবর্তে মদ খাওয়ার বিপক্ষে থাকা মহিলাকে বেশ্যা এবং পুরো পরিবেশকে নরকের সাথে তুলনা করেছে রাশেদ। তার বন্ধুটিও যিনি গৃহকর্তা, তিনি স্ত্রীর এহেন আচরণে রনবী অঙ্কিত কার্টুনের নির্জীব নিরীহ আপাতদৃষ্টিতে ভুক্তভোগী স্বামীটির মত বন্ধুর সাথে মদপান করলেও আসলে যে স্ত্রীকে ভেতরের ঘরে আটকে রেখে এসেছে। স্বামীটি জানে যে, তার স্ত্রীর এর চেয়ে বেশি কিছু করবার ক্ষমতা নেই। এমনকি তাকে ছেড়ে যাবার মতো সাহসও হয়তো নেই। তাই যে কোনো দাম্পত্যেই সাধারণত স্ত্রীরা অতিরিক্ত কথা বলেই তাদের অবদমিত ক্ষোভকে উজাড় করে দেয়। 

উপন্যাসটি মোট ১৩টি অধ্যায় বিভক্ত। এর মধ্যে ৯ নম্বরে বিলু আপা, ১০ নম্ভরে বহুগামিতায় অভ্যস্ত অধ্যাপিকা, ১১ নম্বরে নিষ্পাপ স্বপ্নের কিশোরীর সাথে সামায়িক সাক্ষাৎ ঘটে রাশেদের। 

৪.

এর মধ্যে অধ্যাপিকা চরিত্রটির জন্য বিভাজিত অধ্যায়টির শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘নরক ভ্রমণ’। রাশেদের বন্ধু রফিকের পরকীয়া সম্পর্ক দেখানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকার সঙ্গে। উপন্যাসে যার কোনো নামকরন করা হয়নি। সিনিয়র আপা হিসেবে পরিচয় বলেই তাকে ‘আপামনি’ নামেই সম্বোধিত করা হয়েছে। অথবা নরকের অগণিত অনৈতিক এবং চরিত্রহীন চরিত্রদের একজন বলেই হয়তো তাকে কোনো নামে অলংকৃত করার প্রয়োজন মনে করেননি লেখক। এই চরিত্রটিকে আরো বেশি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিস্তারিত আকারে অন্যত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম উপন্যাসে বহুগামী, অবিশ্বস্ত, কামুক লোভী নারীর এই ইমেজটি নকশাকারে সামান্য রেখায় তুলে ধরা হয়েছে। রাশেদের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় অধ্যাপিকা রফিককে ছেড়ে দিয়ে আরো জুনিযর এক প্রভাষকের সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত। রফিকের সাথে আপার সম্পর্কটির বয়ানে পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের বিষয়ে পুরষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে যেখানে মূল অনুসঙ্গই হয়ে ওঠে ভোগ এবং সবকিছুকে নিজের করায়ত্ত্ব করা। পুরষের আধিপত্য উপভোগের বিষয়টি উঠে আসে রফিক এবং অধ্যাপিকার মিলনের চূড়ান্ত মুহূর্তের ঠিক রফিকের আপার স্বামীর সাথে ফোনে কথা বলার মধ্য দিয়ে। 

‘রফিকের একটা প্রিয় সুখ ওঠার পর আপার স্বামীকে ফোন করা; মজা করার জন্যই এটা শুরু করেছিল, রফিক, পরে এটা তার প্রধান সুখ হয়ে দাঁড়ায়; প্রথম যেদিন ওঠার পর সে নম্বর ঘোরাতে শুরু করেছিলো লাফিয়ে উঠে আপা তাকে মেঝের ওপর ফেলে দিয়েছিল, কিন্তু অশ্বীটিকে বশ মানিয়ে নিয়েছিলো রফিক, চড়তে যে জানে সে প’ড়ে গেলেও আবার উঠতে জানে; তার পর থেকে আপা এটা উপভোগ করতে থাকে, টেলিফোন দূরে থাকলে সে প্রস্তুতি হিশেবে সেটটি এনে রাখে বিছানার পাশে, পুলকের পূর্বমুহূর্তে সে চিৎকার করে টেলিফোন, টেলিফোন, রফিক নিশ্চল হয়ে আপার স্বামীকে ফোন করে, ব্যবসা কেমন চলছে তার সংবাদ নেয়, সামরিক আইন, গণতন্ত্র সমাজ রাষ্ট্র নীতি সততা রাষ্ট্রধর্ম হিন্দি সিনেমা এনজিও পান পর্ণগ্রাফি সম্পর্কে আলোচনা করে, আপার সংবাদও নেয়; চোখ বন্ধ করে আপা তখন অধিত্যকাপর্ব যাপন করতে থাকে, আর রফিক খোদা হাফেজ বলার সাথে সাথে প্রচ-ভাবে বিস্ফোরিত হয় আপা। পুলক কাকে বলে আপা তা জানতো না, তিনটি মেয়ে একটি ছেলে জন্ম দেয়ার পরও, রফিকই তা তাকে শেখায়, এবং এক সময় সে তিনটি চারটি পাঁচটি দশটি পনেরোটি বিশটি পুলকে চুরমার হয়ে যেতে থাকে।’ (পৃ-১১৭-১১৮) 

১১ নং অধ্যায়ে গোলাপ মেয়ের সঙ্গে স্বর্গযাত্রা করতে চায় রাশেদ, যাকে উপন্যাসে ‘বালিকা’ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। এই বালিকা চরিত্রটি লেখকের স্বপ্ন চরিত্র। একাধিক উপন্যাসে যে বিশুদ্ধতার হাত ধরে তিনি পরিত্রাণ পেতে চান প্রতীকী নরকবাস থেকে। কম্পিত বলেই লেখকের ফ্যান্টাসির ভেতর বিচরণরত এই স্বপ্ন সফলতা পরিদৃষ্ট হয় না শেষাবধি। ১১ নং অধ্যায়ের স্বর্গযাত্রা স্থগিত হয়ে যায় বলেই ‘বর্তমানহীন ভবিষ্যৎহীন’ শিরোনামে ১৩ নং অধ্যায়ের মাধ্যমে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে। 

প্রথম উপন্যাস বলেই হয়তো যৌনতা বিষয়ক শুদ্ধাচারী মনোভাব কিঞ্চিৎ অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তাই বালিকার সঙ্গে স্বর্গভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হলেও রাশেদের স্থান-কাল বিবেচনা কাজ করত। শহর ছাড়িয়ে শহরতলীর নির্জন স্থানে যেখানেই তারা মিলিত হতে যায় সেখানেই বাধা আসে। সবাই তাদের উদ্দেশ্যে অশ্লীল ইঙ্গিত করতে থাকে। নর-নারীর পরিশুদ্ধ মানবিক প্রেমকে কেউই পবিত্র ভাবতে রাজি নয়। স্বল্পকালীন শারীরিক চাহিদার ক্রয়-বিক্রয়ই সর্বোচ্চ সত্য মানুষের কাছে। এমন কি স্বামী-স্ত্রীর আইনানুগ সম্পর্কও একসময় প্রভুদাসী কিংবা ভালোবাসাহীন দায়ভারে পরিণত হয়। 

তাই নৌকার মাঝি কিংবা রিকশাওয়ালা তাদের আড়ালে যেতে বলে, ঘন্টাচুক্তিতে। তাদেরকে জন্ম নিরোধক গ্রহণের প্রস্তাব করে। তাদের সঙ্গী সহযোগীরা তাদেরকে অস্ত্রের মুখে ‘কাম’ করার অভিযোগে চাঁদা আদায় করে। 

সবশেষে দেখা যায়, প্রকৃতির ভেতরেও তারা বিশুদ্ধ প্রেমের সন্ধান পায়না। অথচ বালিকার মাংসে রাশেদ গোলাপের গন্ধ পেয়েছিল। মুখটিকে ভোরের চড়–ই বলে মনে হয়েছিলো। নর-নারীর সহজাত স্বাভাবিক জৈবিক আকাক্সক্ষাকে এভাবে নিগৃহীত হতে দেখে রাশেদের মনে হয়েছে যেন, গোলাপগন্ধী বালিকাটি চূড়ান্তভাবে ধর্ষিত হয়েছে। 

‘বালিকাটিকে এখন ধর্ষিতাই মনে হচ্ছে, সে মুখ নিচু করে বসে আছে, তার কোনো কিছু দেখতে ইচ্ছে করছে না, যেনো তার বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ থেকে রক্ত ঝরছে। রাশেদ দেখছে লোক দুটি বালিকাকে ছিনিয়ে নিয়েছে, সে আহত হয়ে পড়ে আছে, একটা ময়লা ট্রাউজার আর একটা কাস্তে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে চলছে বালিকাটিকে, বালিকাটি চিৎকার করতে পারছে না, বালিকাটি কিছু দেখতে পাচ্ছেনা।’ (পৃ-১৩৯) 

অর্থাৎ প্রথম উপন্যাসেই লেখক বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক, ফুল-পাখি, চাঁদের সাথে উপমাযোগ্য নারীর ইমেজকে উপস্থাপন করেছেন। 

অবরোধবাসিনী বিলু আপা, বহুগামী স্বৈরিণী অধ্যাপিকা, কিংবা গোলাপগন্ধী বালিকার মধ্যে রক্তে মাংসে গড়া, সুখে দুখে চাওয়া পাওয়ার পূর্ণ প্রতিবাদ-প্রতিরোধে স্বতঃস্ফূর্ত কোনো মনুষ্য-অস্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে।




লেখক পরিচিতি
রোখসানা চৌধুরী

(পিএইচডি গবেষক, প্রাবন্ধিক-সমালোচক)
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাো
বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর
বাংলাদেশ, ঢাকা।

1 টি মন্তব্য:

  1. মুখবন্ধে গল্পের সমালোচনাংশে প্রধান চরিত্র রাশেদ রাষ্ট্রিয় অবক্ষয়েের দূর্দান্ত শিকার আর শেষান্তে
    তুলে আনা নারী চরিত্রাদিকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহন-অবস্থানকে গূরত্বের মাননির্ণয়ে ক্রমশ ম্রিয়মান-অবলুপ্ত হয়ে উপলব্ধ।

    উত্তরমুছুন