শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

স্বপ্না মিত্র'র গল্প : পুরনো

রাত দশটা বাজে। খাওয়াদাওয়া শেষ। ডিনারের পর আধঘণ্টা গড়িমসি করে সৌমেন এখন স্টাডিতে, তার এক ঘণ্টার কনফারেন্স কল আছে। সারাদিন অফিস আর সংসারের ধকলের পর শাশ্বতীর ঘুম আসছিল, তবু সে ঘুমোয় না, সৌমেনের কল শেষ হওয়া অবধি জেগে থাকার চেষ্টায় সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ইউ-টিউব থেকে একটা সিনেমা লাগায়।
এই  সিনেমাটা শাশ্বতীর মা-র বয়সী হবে, এটা সে আগেও কয়েকবার দেখেছে।   
কনফারেন্স কল শেষ হলে সৌমেন শোয়ার ঘরে আসে, শাশ্বতীর পাশে বসে বলে, উফ আবার সেই মান্ধাতার আমলের সিনেমা দেখছো? নতুন কিছু দেখলে পারো তো!       
শাশ্বতী হাই তুলে বলে, যাই বল, এই সিনেমার গল্পটা ভারি মিষ্টি আর গানগুলো যে চিরকালের হিট--      
বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে টিভির রিমোট কন্ট্রোল নিতে নিতে সৌমেন বলে, তোমার বড্ড পুরোনোর দিকে ঝোঁক, নেটফ্লিক্স লাগাতেই টেগোর ফটাফট দেখে নিলে, ‘হাউস অফ কার্ডস’ কিন্তু এখনও দেখোনি।       
সাদা ধবধবে বালিশটা মাথার নীচে দিয়ে, টানটান পা ছড়িয়ে, আরাম করে কিং সাইজ বেডে শরীরটা ঢেলে শাশ্বতী বলে, দিনের শেষে অত কচকচি আমার পছন্দ হয় না। রাত হয়েছে, আলো নিভিয়ে দিই?         

শাশ্বতী ও সৌমেন, অল্পবয়সী স্বামী-স্ত্রী, শাশ্বতী তিরিশ আর সৌমেন চৌত্রিশ, তিন বছর হল ওদের বিয়ে হয়েছে, এখনও কোন ইস্যু হয়নি। সৌমেন দিল্লীর ছেলে, স্কুলিং এবং কলেজ দুটোই দিল্লীতে, জে-এন-ইউ থেকে পাশ করা সৌমেন খুব মডার্ন, ঝাঁ-চকচকে, চালাক চতুর চৌকস।
তবে রিটায়ারমেন্টের পর সৌমেনের বাবা-মা কোলকাতায় ফিরে গেছেন আত্মীয়স্বজনের মাঝে থাকার ইচ্ছেয়। কোলকাতার সেই আত্মীয়স্বজন থেকেই সৌমেনের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল  শাশ্বতীর সঙ্গে।      
শাশ্বতী যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, চন্দননগরে ওদের পৈতৃক বাড়ি, বাবা-মা কোলকাতায় থাকেন। শাশ্বতীর ছবি দেখে, শাশ্বতীর সঙ্গে ফোনে একবার কথা বলে, দু-দিনের মধ্যেই সৌমেন সশরীরে হাজির হয়েছিল কোলকাতায় শাশ্বতীকে চাক্ষুষ দেখতে। শাশ্বতীর রূপ দেখে, সেই যাকে বলে চন্দ্রাহত, অনেকটা সেই দশা হয় সৌমেনের। সৌমেনের চোখ তখন শাশ্বতীর প্রতি নিবদ্ধ, শাশ্বতীর আশপাশ মানে শাশ্বতীর মা-বাবা, দাদু-ঠাকুমা নিয়ে সে কিছু ভাবেই না, শাশ্বতীদের বাড়ির ধারা সম্বন্ধে  মাথা  ঘামানোর কথা তার মনেও আসে না।       
ছেলের উৎসাহ দেখে সৌমেনের মা-বাবা দেরি করেন না, তারা বিয়েতে মত দিয়ে দেন। সৌমেনের মা বলেন, বৌ নিয়ে ছেলে তো  থাকবে দিল্লীর ফ্ল্যাটে, আর  টোনাটুনির সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মিলটুকুই সম্পদ।           
পাকা দেখা বা সেরকম কিছুই হয় না, যাকে বলে এক কথাতেই বিয়ে তাই, বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। বিয়ের পনেরো দিন পরই শাশ্বতী চলে আসে দিল্লীতে, সৌমেনের বসন্তকুঞ্জের ফ্ল্যাটে।        

বিয়ের বছর ঘোরার আগেই শাশ্বতীকে একদিন সৌমেন বলেছিল, তোমাদের বাড়ির ফার্নিচার, ইন্টিরিওর ডেকোরেশন, আদবকায়দা সবই এত ওল্ড ফ্যাশনড!       
শাশ্বতী হেসে বলেছিল, ইন্টিরিওর ডেকোরেশন আবার কি! আমার মা ওসব জানেই না, বাড়ির মানুষের সুবিধেমত জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। আর হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, আমাদের কোলকাতার বাড়ির খাট আলমারি সবই চন্দননগরের বাড়ি থেকে আনা, বাবার দাদুর আমলের, খুবই সেকেলে ডিজাইনের।     
সৌমেন ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ওই সেকেলে ভূত একালের শাশ্বতীর মধ্যে এখনও বাসা বেঁধে আছে।     
সৌমেনের কথার ধরনে শাশ্বতী রাগে না, বরং হাল্কা হেসে বলে, কেন, সেকেলে কি খারাপ? আমার তো কোলকাতার ফ্ল্যাটের থেকে চন্দননগরের বাড়িটা অনেক বেশি প্রিয়।    
শাশ্বতীর কথা শুনে সৌমেন হা-হা করে হেসে উঠে বলে, বোঝো! আরে, ওই জন্যই তো বলছি, চন্দননগরের পলেস্তারা খসা বাড়িটার মধ্যে ভালো লাগার মত মহান কি আছে?        
শাশ্বতী থেমে থেমে বলে, অত বড় বাগান, বাগানের লাগোয়া পুকুর, দক্ষিণ খোলা টানা লম্বা বারান্দা আর বিরাট খোলা ছাদ--               

সৌমেনের বন্ধু শেখরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ এসেছে।           
শাশ্বতী বলে, ইস কতদিন পর নেমন্তন্ন, খুব সেজেগুজে যাব আমরা, বুঝলে--     
সৌমেন বলে, আগে থেকে পোশাক ঠিক করে রেখো, উইক-ডে, শুক্রবার সন্ধ্যে, অফিস থেকে ফিরে অত সময় হবে না।       
শাশ্বতীও জানে সে কথা, সে আগেভাগেই কিনে আনে পছন্দসই উপহার, ওয়াড্রব ঘেঁটে নিজের জন্য বেছে রাখে বিয়ের নীল রঙের কাঞ্জিভরমটা। শুধু শাশ্বতীর শাড়ি বাছাই হলেই তো হল না, সৌমেনের জন্যও চাই উপযুক্ত পোশাক, মার্চ মাসের ফুরফুরে সন্ধ্যেতে স্যুট টাই বড় বেমানান লাগে, নীল কাঞ্জিভরম শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে শাশ্বতী বাজার ঘুরে নিয়ে এসেছে ঘন নীল রঙের কুর্তা পাজামা।      
নির্দিষ্ট দিনে শাশ্বতী তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে অফিস থেকে, ফেরার পথে শখ করে কিনে আনে এক ছড়া বেলফুলের মালা, খোঁপায় দেওয়ার জন্য। সৌমেনের ফিরতে দেরি হয়। সৌমেন ফেরার আগেই শাশ্বতী সেজেগুজে তৈরি হয়ে নেয়।  
সৌমেন বাড়িতে ঢুকে সোজা স্টাডিতে যায়, ল্যাপটপের ব্যাগ রেখে টাইয়ের নট আলগা করতে করতে ঘুরে তাকায় শাশ্বতীর দিকে, এক মুহূর্ত চুপ করে নিজের স্ত্রী-কে দেখে। দামী সিল্কের শাড়ি, কপালে লক্ষ্মী পূর্ণিমার চাঁদের মত টিপ, ঘাড়ের কাছে আলগা খোঁপায় বেলফুলের কুঁড়ির মালা, সব মিলিয়া শাশ্বতীকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে! শাশ্বতীর সৌন্দর্য সৌমেনের চোখে পড়ে, তবু তার ভুরুর মাঝে হাল্কা কুঞ্চন ফুটে ওঠে,  সে কিছু বলতে যায়, তবে দেওয়াল ঘড়িতে পৌনে আটটা বাজে দেখে চুপ থাকে, তাড়াতাড়ি কুর্তা পাজামা পরে নেয়।       

শেখরের  বাড়ির  ড্রয়িং-রুমের দরজা খোলা ছিল, বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছিল অন্দরের হাসি হৈচৈ। সৌমেন ও শাশ্বতী ভিতরে ঢোকে, ওদের দেখে শেখরের স্ত্রী পূর্বা এগিয়ে এসে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়, শাশ্বতীকে পূর্বার সঙ্গে রেখে সৌমেন এগিয়ে যায় শেখরের দিকে, শেখরের হাতে জন্মদিনের উপহার দিয়ে উইশ করে।     
শেখরের অদূরে দাঁড়িয়েছিলেন সাদা তাঁতের শাড়ি পরিহিতা একজন বয়স্কা মহিলা। বয়স্কা মহিলাকে সৌমেন জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছ আনটি? কবে এসেছ?      
মহিলা হেসে বলেন, ভালো, এই তো গত সপ্তাহে এলাম।      
মহিলা ও সৌমেনের কথোপকথনের মাঝে শাশ্বতী এসে সৌমেনের পাশে দাঁড়িয়েছে, মহিলা জিজ্ঞাসু চোখে তাকান শাশ্বতীর দিকে। সৌমেন আলাপ করিয়ে দেয় বয়স্কা মহিলার সঙ্গে  শাশ্বতীর, আনটি, এ হল আমার স্ত্রী, শাশ্বতী। আর শাশ্বতী, ইনি শেখরের মা।     
শাশ্বতী জানে সৌমেন পুরনো দিনের মত পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা পছন্দ করে না,  তবু সে কাঞ্জিভরম শাড়ির ভারি আঁচল সামলে ঝুঁকে নিচু হয়ে শেখরের মায়ের পায়ের পাতা ছুঁয়ে প্রণাম করে।    
মহিলা হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গী করে বলেন, খুব মিষ্টি বৌ হয়েছে তোমার সৌমেন, ওই যে ওদিকে তোমাদের বন্ধুরা বসে, নিজের বাড়ি মনে করে সব কিছু নিও, যাও এনজয় করো--         
আজ নিমন্ত্রিতদের অধিকাংশই সৌমেনের চেনা, প্রত্যেকেই জে-এন-ইউ থেকে, তারা হয় সৌমেনের ক্লাসমেট, নয় তো ব্যাচমেট। সৌমেনকে দেখে তার বন্ধুরা হৈহৈ করে ওঠে, কেউ এসে হাগ করে, কেউ বা হাত মেলায়। শাশ্বতীর সঙ্গেও সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করে। একজন ফুট কাটে, অ্যাই শাশ্বতীকে সোফায় জায়গা ছেড়ে দে, দেখছিস না শাড়ি পরে আছে, নীচে ঢালা গদিতে বসবে কি করে?       
কাঞ্জিভরম শাড়ির আঁচল সামলে সোফায় বসে শাশ্বতী খেয়াল করে, আজ শেখরের স্ত্রী পূর্বা শাড়ি পরেছে বটে, তবে নিমন্ত্রিত মহিলাদের মধ্যে একমাত্র তার পরনেই শাড়ি। শুধু শাড়ি নয়, শাশ্বতীর মত কারও পায়ে ফ্ল্যাট চটিও নেই, প্রত্যেকেই হাইহিল পরে খটখট করে ঘুরছে, ফটফট ইংলিশ বলছে। সৌমেনের বন্ধুদের এই ফটফট ইংলিশ কথনের সামনে শাশ্বতী একটু গুটিয়ে যায়, আঁচল টেনে পিঠ ঢাকে। এই একটা ব্যপারে শাশ্বতীর যে কি অসুবিধে! শাশ্বতী বাংলা মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী, ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হত, অংকে তুখোড়, ফিজিক্সে মাস্টার, কিন্তু বিদেশী উচ্চারণে পটপট ইংলিশ তার তেমন আসে না। শাশ্বতীর ইংলিশ শুনেই বোঝা যায় সে বাঙালী, কোলকাতার মেয়ে। যে কোন পার্টি থেকে বাড়ি ফিরে এই ইংলিশ নিয়ে শুরু হয় সৌমেনের ধুন্দুমার। সৌমেনের প্রশ্ন, ওরা পারে, তুমি পারো না কেন?     
শাশ্বতী বোঝানোর চেষ্টা করে, ওরা দিল্লীতে বড় হয়েছে, ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী, ওরা তো ইংলিশে সাবলীল হবেই। তবে আমার ডিগ্রির মান তো ওদের থেকে খাটো নয়, বরং বেশি দামী।    
এইবার সৌমেন রেগে যায়, চেঁচিয়ে বলে, পাঁচজনের সামনে তুমি কি পিঠে ডিগ্রি সেঁটে ঘুরবে? তোমার স্টাইল, কথা বলার ধরন সেখানে তোমার পরিচয়।   
সৌমেনের এই নিরন্তর নালিশের কারনে, সৌমেনের সঙ্গে পার্টিতে এলে আজকাল শাশ্বতী চুপচাপ থাকে, যেটুকু কথা বলে সতর্ক হয়েই বলে।  তবু আজ শেখরদের বাড়ি থেকে ফিরে সৌমেন ফেটে পড়ে।         
সৌমেন বলে, সবসময় নিজেকে আলাদা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করো কেন?   
শাশ্বতী বলে, মানে?  
--মানে, আনটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার কি প্রয়োজন ছিল? সবকিছুতে সেকেলেপনা। দেখেছো, প্রতিটি মহিলার হয় শর্ট হেয়ার নয় তো খোলা চুল। তুমি গেলে মা-মাসীদের মত খোঁপা বেঁধে বেলফুলের মালা পেঁচিয়ে।     

--শাড়ির সঙ্গে খোঁপা মানায় বেশি সৌমেন।      
সৌমেন চড়া গলায় বলে, কে বলেছিল শাড়ি পরতে? জন্মদিনে পইপই করে বললাম ইভনিং ড্রেস নিতে। আজ দেখলে, ইভনিং ড্রেসে আমার বন্ধুর স্ত্রী-রা কি স্মার্ট!    
শাশ্বতী বলে, ওরকম পা বার করা পোশাক পরতে আমার রুচিতে বাধে।   
--রুচি? মাই ফুট! ওহ, তুমি তো আবার আঠেরো বছর বয়স থেকেই বাড়িতে শাড়ি পরা শুরু করেছো।  
--হ্যাঁ, ঠাকুমার জোরাজুরিতে।  
--ড্রিঙ্ক নিয়ে অত বাড়াবাড়ি করলে কেন? পূর্বা অত করে সাধলো। একটা ব্লাডি  মেরি বা রেড ওয়াইন নিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত? হ্যাঁ, রোজ রোজ মহিলাদের অ্যালকোহল খাওয়া আমিও পছন্দ করি না। তাই বলে মাঝেমধ্যে পার্টিতেও একটু নেবে না?       

শাশ্বতী বলার চেষ্টা করে, অ্যালকোহল  খাওয়ার দরকার কি? শাশ্বতীর বাবা জার্মানি থেকে রিসার্চ করেছেন, অত ঠাণ্ডাতেও বাবা কোনদিন মদ স্পর্শ করেননি। শাশ্বতীর দাদু ছিলেন সাত্বিক মানুষ, মদ তো দূরের কথা, মাছ মাংসও খেতেন না, কট্টর নিরামিষাশী ছিলেন। শাশ্বতীদের বাড়ির ধারাই এরকম। আর বাড়ির প্রভাব তো বাড়ির মেয়ের ওপর থাকবেই। অবশ্য শাশ্বতী কিছু বলার আগে সৌমেন নিজেই বলে, কি কুক্ষণে যে এইরকম পুরনো ধাঁচের ফ্যামিলির  মেয়ে বিয়ে করেছি! এখন সারাজীবন আউট অফ ডেট মাল নিয়ে জ্বলে মরো---         
তবে শাশ্বতীর এই সেকেলে রুচি ছাড়া স্ত্রী-র বিরুদ্ধে সৌমেনের তেমন নালিশের জায়গা নেই। সৌমেনের চাকরি খুবই ডিম্যান্ডিং, বাড়ি ফিরতে প্রতিদিনই রাত আটটা বেজে যায়, উইক এন্ডেও তার কাজ থাকে। শাশ্বতীরও আটটা পাঁচটা অফিস, তবু ব্যস্ত সৌমেনকে সে সংসারের কাজ থেকে ছুটি দেয়, নিয়মিত অফিস থেকে ফেরার পথে বাজার করে আনে। রান্নার জন্য তাদের কাজের মাসি আছে বটে, তবে সে ঘনঘন ছুটি করে, কাজের মাসির অনুপস্থিতিতে শাশ্বতীই রান্নাঘর সামলায়। জল, ইলেকট্রিক, ফোন ইত্যাদি বিলের পেমেন্ট তো আজকাল অনলাইনেই হয়ে যায়। মোটমাট বিবাহিত জীবনে নিজের চাকরি ছাড়া সৌমেনের তেমন কোন দায়িত্ব নেই, এমনকি স্ত্রী-র ভরণপোষণের দায়িত্বও তো সৌমেনের কাঁধে নয়। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সৌমেন আর শাশ্বতী যে সংসার গড়েছে, তার গুরুদায় যেন শাশ্বতীর, সংসারের খুঁটিনাটি প্রয়োজনের দিকে একা শাশ্বতীই নজর রাখে।      
তবু সৌমেন মাঝেমধ্যেই শাশ্বতীর ওপর রেগে যায়, খারাপ ব্যবহার করে, সৌমেনের মাপকাঠিতে শাশ্বতীর আর কিছুতেই আধুনিকা হয়ে ওঠা হয় না।   
এই যেমন রোজকার খাওয়াদাওয়া।  
বাজার থেকে শাশ্বতী ঠেলে আনে নিমপাতা, সজনেডাঁটা, শিম, বেগুন, মুলো। সেদিন রবিবার, কাজের মাসি আসেনি। দুপুরে শাশ্বতী রেঁধেছে, কাঁচা মুগের ডাল আর আলু ফুলকপি দিয়ে মাছের ঝোল। খেতে বসে ডাল আর পাতলা মাছের ঝোল দেখে বিরক্তিতে সৌমেন মুখ ভ্যাটকায়। ঠিক সেইসময় ডোর বেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে শাশ্বতী দেখে সামনের ফ্ল্যাটের মহিলা, এনারা নতুন ভাড়া এসেছেন, মহিলার হাতে একটা ঢাকা দেওয়া বাটি।      
ভদ্রমহিলা সুখী সুখী গলায় কলকল করে বলেন, জানো তো আমার দিদির রান্নার বই বেরিয়েছে, তার থেকে একটা রেসিপি আজ ট্রাই করলাম, টেস্ট করে জানিও কেমন হয়েছে।    
শাশ্বতী বাটিটা হাতে নিয়ে বলে, নিশ্চয়ই। আপনার দিদির বইয়ের এক কপি আমাকেও দেবেন।     
দরজা বন্ধ করে শাশ্বতী এসে বাটিটা ডাইনিং টেবিলে রাখে। বাটির সব্জির দিকে তাকিয়ে সৌমেন বলে, বাহ দারুণ দেখতে তো! বাটন  মাশরুম আর অ্যাসপারাগাসের সঙ্গে লাল আর হলুদ ক্যাপসিকাম! আমার তো দেখেই খিদে বেড়ে গেল। তারপরই সৌমেন বলে, তুমি এরকম রাঁধতে পারো না? ওই লাউ কুমড়ো সজনেডাঁটার ওপর তুমি আর উঠতে পারলে না, সেই ঠাকুমাদের আমলের রেসিপিতেই আটকে আছ।         

এইভাবেই দিন যায় শাশ্বতী সৌমেনের। শাশ্বতীর তৈরি কুঠি প্রায়ই সৌমেনের নালিশের ঝড়ে দুলে ওঠে, ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে যায় ঘরের চালা,  শাশ্বতীই আবার ধৈর্য ধরে তা মেরামত করে।        

এবছর শাশ্বতীর প্রোমোশন হয়েছে। প্রোমোশনের সঙ্গে বদল হয়েছে শাশ্বতীর ডিপার্টমেন্ট এবং বস দুটোই। শাশ্বতী কাজ করে এক সুইডিশ কোম্পানিতে। শাশ্বতীর পুরনো বস ছিল ভারতীয়, নতুন বস সুইডিশ।
সুইডিশ বস শাশ্বতীকে একটা নতুন প্রোজেক্টের দায়িত্ব দিয়েছে। অফিসের কাজের চাপে  শাশ্বতীর আজকাল প্রায়ই  বাড়ি  ফিরতে দেরি হয়। দেরি করে ফিরে শাশ্বতী আর আগের মত সংসারের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সামলে উঠতে পারে না, সৌমেনের ঘাড়েও একটু আধটু রোজকার ঝক্কি এসে পড়ে, সৌমেনের মেজাজ গরম হয়ে যায়।      
একদিন সৌমেন তিরিক্ষে গলায় বলে, সব কাজ কি তোমার ঘাড়েই?  তোমার পুরনো বস অনেক সেন্সিবল ছিল, বিবেচনা বুদ্ধি ছিল, বিবাহিতা মহিলাদের অফিস ছাড়াও যে সংসারের কাজ থাকে ভদ্রলোকের সেই জ্ঞান ছিল।      
আজ সৌমেনের তিরিক্ষেভাব শাশ্বতীকে যেন স্পর্শ করে না, সে নির্বিকার ভঙ্গীতে বলে, কিছু করার নেই, প্রোজেক্টের ডিম্যান্ড অনুযায়ীই তো আমাকে চলতে হবে।     
সৌমেন বলে, সংসারেরও একটা ডিম্যান্ড আছে তোমার থেকে, সেটা ভুলে যেও না। তেমন হলে চেঞ্জ দ্য জব, মার্কেটে তোমার চাকরির অভাব হবে না,  নতুন চাকরি খুঁজে নাও।    
শাশ্বতী দু-দণ্ড স্থির চোখে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে দেখে, তারপর ধীর গলায় বলে, আমিও সেরকম ভাবছি। জানো, আজকাল আমার আর পুরনো লাগে না ভালো--    

ইদানীং একটু আধটু ঝক্কি নয়, সৌমেনের দায়িত্ব তার নিজের।  
মাশরুম, অ্যাসপারাগাস, ক্যাপসিকাম তো দূরের কথা, সৌমেনের জন্য লাউয়ের ঘণ্ট কুমড়োর ছেঁচকিও কেউ রেঁধে দেয় না। অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার সৌমেনের নিজেকেই রাঁধতে হচ্ছে।      
এক মাস হল শাশ্বতী তার পুরনো সংসার ছেড়ে চলে গেছে--        
আজকাল অফিসই নাকি শাশ্বতীর ধ্যান-জ্ঞান, দিনে সে বারো ঘণ্টারও বেশি সময় অফিসে থাকে শোনা যাচ্ছে।   
অফিস থেকে ফিরে আজও সৌমেন রাঁধছিল।    
কড়াইয়ে ধোঁয়া ওঠা তেলে চৌকো মাছের টুকরোটা ছাড়তেই এক ফোঁটা গরম তেল ছিটকে এসে লাগে সৌমেনের কনুইতে।     
সৌমেন ‘শিট’ বলে হাতটা চেপে ধরে।    
গরম তেলের ছ্যাকায় সৌমেনের মেজাজও গরম হয়ে যায়। সে দাঁতে দাঁত পিষে বলে, নিউ প্রোজেক্ট!  অল বুলশিটস! ওই নতুন বসই যত নষ্টের গোড়া---               


   
  

1 টি মন্তব্য: