শনিবার, ১০ মার্চ, ২০১৮

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প : বাদুড় ও অন্যান্য প্রাণীরা

বরফ পিছল রাস্তায় এখনো হামাগুড়ি দিচ্ছে কিছু গাড়ি। হিমশীতল হাওয়ার কামড় বাঁচিয়ে বাকি সবাই নিজের নিজের কোটরে।

ঝুপ করে নামা শীতের সন্ধ্যায় ট্র্যাফিক লাইনের শুরু আর শেষ না মানা বরফের কফিন। স্টিয়ারিং একটু এদিক ওদিক হলেই ব্যাস! ইনা এমনিতেই খুব সাবধানে চালাচ্ছিল। শহরের এইদিকটা অনেকটা উঠে গেছে, গাছপালাও ঘন। এর মধ্যে পথ সরু হতে হতে বেমক্কা কাঁচা রাস্তা শুরু হয়ে গেল। আশ্চর্য! চারদিকে এত বড় বড় বাড়ি, অথচ রাস্তা পাকা করে নি? একবার সন্দেহ হয়েছিল, ঠিক আসছে তো? কিন্তু অচেনা রাস্তার ভরসা জিপিএসে তো এটাই দেখাচ্ছে।


জুলিয়ার বাড়িতে পৌঁছে এর কারণটা জানা গেল। টাউনশিপ অনেকবার রাস্তা বাঁধানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু এলাকার লোক হতে দেয়নি। কারণ রাস্তা ভাল হলেই শহরের সমস্ত গাড়ি এই পথে শর্টকাট নেবে, সাথে সাথে নির্জন শান্তির ছয়লাপ। বরং কাঁচা রাস্তা নিয়ে এই সুন্দর সাজানো বাড়িগুলোর বাসিন্দা আর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান কাঠবেড়ালি ও হরিণেরা সুখেই আছে। 

মাথার একঝাঁক কালো কোঁকড়া চুলের থেকে বরফের কুচি ঝাড়তে ঝাড়তে ইনা কোটটা খুলে জুলিয়ার হাতে দিচ্ছিল। ওয়াও জুলিয়া, ইউ আর গেটিং দ্য বেস্ট অফ বোথ ওয়ার্ল্ড! শহরের মধ্যে থেকেও প্রকৃতির এত কাছাকাছি। 

জুলিয়া মুচকি হাসল, শিয়াল আর কেওটেও আছে, তাছাড়া যতরকমের কীটপতঙ্গ। এভরিথিং ইস নট সো হাঙ্কি ডোরি। 

ইনা যতক্ষণে পৌঁছেছিল, সবাই প্রায় এসে গেছে। আরলিন, রোসা, সিমোন আর নিশি ডাইনিং প্লেসে গুছিয়ে বসেছে। ইনা ঘরের চারধারে চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে হাই করল সবাইকে। প্রথম চোখ আটকালো নিশিতে। নিশি, তোমার আউটফিটটা কি সুন্দর! আই লভ ইন্ডিয়ান ড্রেসেস। 

কালারফুল আর সেক্সি! রোসার এই মন্তব্যে লজ্জা পেয়ে দুপাট্টাটাকে বুকের উপর টেনে নিল নিশি। 

কাম অন নিশি, তোমার কিচ্ছু লুকোনোর নেই। 

আই লভ ইন্ডিয়ান ব্রেস্টস টু! অ্যালাও আস টু সেভার ওর ভলাপচুয়াস বিউটি। আরলিন এমনভাবে বলল যেন ইন্ডিয়ান খাবারের আলোচনা করছে। ওইরকমই মেয়েটা, আটকে রেখে কথা বলতে জানে না। সঙ্গে চোখের হাসির ঝলকে কথায় চকচকে মোড়ক পড়ে, সেটাই ভরসা। 

ঠিক বলেছ আরলিন, ভলাপচুয়াস ইস দ্য রাইট ওয়ার্ড। আমি যখন কাজুরা গেছিলাম – আমি কি ঠিক উচ্চারণ করলাম নিশি? 

নিশি সিমোনের জন্য উচ্চারণ করে দেখায় – খাজুরাহ। সিমোন সাজপোষাক, কথাবার্তা সবকিছুতেই পারফেকসনিষ্ট। তার যত্নে রাঙ্গানো ঠোঁটটাকে সরু করে ভারতীয় উচ্চারণে খাজুরাহ বলতে চেষ্টা করতে থাকে। 

সন্ধ্যার এই জমায়েতটা হালকা মেজাজে আড্ডা জমাবোর জন্যেই। দূর থেকে চেনা সবাই, কিন্তু দুদিনের এই ওয়ার্কশপে আসার আগে ওরা অনেকেই কেউ কাউকে দেখেনি। কিন্তু যেভাবে জমে গেছে কে দেখে বলবে এদের আগে শুধু ফোনেই কাজের কথা হয়েছে, মুখোমুখি নয়? জুলিয়া অ্যামেরিকার অফিসের। কিন্তু সিমোন এসেছে প্যারিস থেকে, রোসা মেক্সিকো, নিশি ইন্ডিয়া। ইনা এই দেশেরই, কিন্তু তার অফিস ক্যালিফোর্নিয়ায়। আর আছে ইওলান্ডা জেং সাংহাই থেকে, আজ এখনো এসে পৌছায় নি। ওরা সবাই জুলিয়ার টিমে, কিন্তু সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে। এই জন্যই জুলিয়া আজ সন্ধ্যায় সবাইকে নিজের বাড়িতে ডেকেছিল অফিসের বাইরে গপসপের জন্য। আরলিন একবার অফিসের কথা তোলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জুলিয়া থামিয়ে দিল – লেটস কীপ দ্যাট ফর টুমরো, কালকে তো আবার অফিসে যাচ্ছিই। তাই কাজের কথা ছাড়া এখন সব কথাই চলছে। 

ইনা ওভারকোট খুলে হাতে হাত ঘষছিল গরম করার জন্য। তাপমাত্রা শূন্যের নীচে, গ্লাভস ভেদ করেও শীতলতা পোঁছে গেছে হাতের খোলসে। দেখে জুলিয়া বলল, টেকিলা চলবে নাকি? রোসা দেশ থেকে নিয়ে এসেছে টেকিলা কন ভিবোরা, নিমেষে গরম হয়ে যাবে। 

বোতলটা দেখেই চমকে উঠল ইনা। হোলি কাউ! ওটা কি বোতলের তলায়? 

রোসা হেসে উঠল, ভয় পেলে ইনা? ওটা একটা মরা সাপ, গিভস আ গ্রেট স্মেল অ্যান্ড টেক্সচার টু দ্য ড্রিঙ্ক! 

সাপ? 

হ্যাঁ, র‍্যাটল স্নেক। 

ইনা একটু থমকে গেল। বোতলের ঘোলাটে তরলের মধ্যে পেঁচিয়ে পড়ে আছে একটা সাপ, দেখেই তো গা শিরশির করে। জুলিয়া অভয় দিল, গো ফর ইট ইনা, আমরা সবাই নিয়েছি। ডেলিসিয়াস! 

রোসা শট গ্লাসে ঢালতে ঢালতে ইনাকে চোখ টিপল, জ্যান্ত সরীসৃপে যত ভয়, মরা সরীসৃপের রসে তত নেশা। দেখবে কেমন স্বাদ বদলে গেছে, হ্যাভ ওয়ান। চিয়ার্স! 

সিমোন টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে সুরেলা গলায় চেঁচাল, অ্যান্ড অলওয়েজ টেক ইট উইথ আ পিঞ্চ অফ সল্ট। রোসা, আমাকেও আর একটা, প্লীজ। 

সিমোন যখন পিনো নোয়ার ছেড়ে সাপের ছোবলের জন্য হাত বাড়াচ্ছে, ইউ টু ক্যান ট্রাই দ্য স্টাফ। 

ইনা আর দ্বিরুক্তি না করে গ্লাসটা মুখে উপুড় করে দিল। গ্লাসের ধারের নুন চাটতে চাটতে বুঝল সত্যিই ভাল লাগছে, মাথাটাও একটু হালকা হয়ে গেল। 

ততক্ষণে জুলিয়া একটা পাথরের ছোট্ট মূর্তি নিয়ে এসেছে, খাজুরাহর অপ্সরার অনুকরণ। আমি কক্ষনো যাইনি, কিন্তু আমার ঘর সাজাতে আমি দেশ বিদেশের আর্ট ওয়ার্ক আনিয়েছি। সিমোন তুমি তো গেছো। বলোতো, এইরকম না? 

জুলিয়ার বাড়িটা এমনি অনেক জিনিসে সাজানো। ইনা তারিফ না করে পারল না, হাউ লাভলি জুলিয়া! তোমার ইন্টেরিয়র ডেকরেটর হওয়া উচিত ছিল। 

তৃপ্তির হাসি ছড়াল জুলিয়ার চোখেমুখে। জানো এটা আমার খুব সাধের বাড়ি। যখন বুড়ি হবো - আমি চাই যেন লাঠি হাতে এইভাবে বাড়িময় ঘুরে বেড়াতে পারি। বলতে বলতে জুলিয়া তার শরীরটাকে কুঁজো করে অদৃশ্য লাঠিহাতে হেঁটেও দেখাচ্ছিল, যেটা দেখে ঘরে হাসির ফোয়ারা ছুটল। 

ইনা, সবাই বাড়িটা ঘুরে দেখেছে। চলো ওরা বসুক, আমি তোমাকে একবার দেখিয়ে আনি। 

জুলিয়া আর ক্যাথির বাড়ি। ক্যাথি অফিসের ট্যুরে এখন বাইরে। জুলিয়া একটা ছবি দেখাল, ওদের একটা অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ফ্রেমে বেঁধে ঝুলছিল ফায়ার প্লেসের উপরে। খুব মিষ্টি চেহারা ক্যাথির, একরাশ ঝাঁকরা সোনালী চুলে ঝলমলানো সুন্দরী। ক্যাথির কাঁধজুড়ে হাত রেখে দাঁড়ানো লম্বা,শক্তপোক্ত চেহারা আর উঁচু চোয়ালের জুলিয়ার চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা আছে যাতে বোঝা যায় এই সম্পর্কের রসি কার হাতে। 

অসম্ভব সুন্দর কিন্তু বাড়িটা, চারদিকটা প্রায় কাঁচের জানলায় মোড়া। জুলিয়া বলছিল তার বাড়িটা নর্থভিল শহরের সবচেয়ে উঁচুতে, দারুন ভিউ। সানরুমের লাভসীটে বসে জ্যোৎস্না আর ঝিরঝিরে বরফের ককটেলে বুঁদ হয়ে থাকা পাতাশূণ্য গাছেদের অলীক রূপে বিভোর হওয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ইনার খুব ভাল লাগছিল। 

হঠাত লিভিং রুমে তুমুল হইচই! তারপরেই দুদ্দার দৌড়ে একরকম ধাক্কাধাক্কি করতে করতেই বেরিয়ে এল রোসা, সিমোন, নিশিরা। জুলিয়া আর ইনার অবাক চোখের সামনে দিয়ে সানরুমের দরজা ঠেলে একেবারে বাইরে। সবাই চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বেরোনোয় কে যে কি বলছে একদম ধরা গেল না। কিন্তু ভয়ার্ত চোখমুখ। সবচেয়ে বড় কথা ঘরে ঢুকে সবাই গরম জামা খুলে বসেছিল, খুব ভয় না পেলে এই মাইনাস দশ ডিগ্রী ঠান্ডায় স্বল্পবস্ত্রে বাইরে বেরিয়ে যাবার সাহস করা মুশকিল। 

জুলিয়া অবাক হলেও নিজেকে সহজে হারায় না। ভুরু কুঁচকে সানরুমের দরজা খুলে ওদের ভেতরে ঢুকতে প্রায় আদেশ করল, আরে, কি হয়েছে বলবে তো। তার আগে সবাই ভিতরে এসো। 

সবাই প্রথম ধাক্কা সামলে উঠেছে, তাছাড়া ভয়ের আস্তরণ ফুঁড়ে এবার ঠান্ডা হুল বেঁধাচ্ছে। তাই দরজা ঠেলে ঢুকে আসলো ভিতরে, মুখে তখনও আতঙ্কের ছবি আঁকা। বিভিন্ন ভাবে জেরা করে জানা গেল ফায়ার প্লেস দিয়ে কোন বিজাতীয় প্রানীর আগমন ঘটেছে। জুলিয়ার মাথা বেশ ঠান্ডা, সবাইকে দাঁড়াতে বলে একটা লাঠি নিয়ে একাই ঢুকে গেল। 

তারপর হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল। ইউ নো হোয়াট? একটা চিপমাঙ্ক। বেচারা চিমনি দিয়ে ঢুকে এখন বেরনোর পথ পাচ্ছে না। 

চিপমাঙ্ক শুনে সবার মুখে হাসি ফুটল। নিশি সঙ্গে সঙ্গে গুগুল করে ফেলেছে। বলল, শোনো শোনো গুগুল কি বলছে- হাউ টু ডিল উইথ চিপমাঙ্ক ইন দ্য চিমনি। 

হ্যাঁ, এবার ইউ টিউবে গেলে চিপমাঙ্ক চিমনি থেকে বের করার ভিডিও-ও পেয়ে যেতে পারো। ভয় ছেঁড়া আকাশে হাসির রোল উঠল। 

সেই গুগুলের কথা শুনেই কিন্তু চিপমাঙ্ক বিদায় হল। ঘরের সব কটা দরজা জানালা বন্ধই ছিল, কিন্তু এখন সব পরদা নেবে আসল। ঘরের আলো বন্ধ করে একটা জানালা খুলে জ্যোতস্নার আলো ঢুকিয়ে দেওয়া হল ঘরে। এরপর জুলিয়া আস্তে করে ফায়ারপ্লেসের হ্যাচটা খুলে দরজা পেরিয়ে ঘরের বাইরে। চিপমাঙ্ক দুদ্দার শব্দে খোলা জানালা দিয়ে হারিয়ে গেল বাইরের আলো অন্ধকারে। 

সবাই স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাতের গ্লাস নিয়ে এবার নিজের নিজের জায়গায়। উফ, কি একটা ঘটনা! খিলখিলে হাসিতে এখন আর ভয় মিশে নেই। 

দেখলে তো, সব কিছুতে ওভার রিয়াক্ট করার দরকার নেই। মোস্ট অফ দ্য টাইম, দেয়ার ইজ আ ওয়ে টু ডিল উইথ ইট। জুলিয়া জ্ঞান দেবার এমন সুযোগ ছাড়েনি। 

সামটাইমস দেয়ার ইজ নো ইজি ওয়ে টু, জুলিয়া। আরলিন তার নিজস্ব মতামত এমনি স্পষ্ট করেই বলে। আরলিন সালভাতর স্কটিশ, গ্লাসগোর বাসিন্দা। বেশ লম্বা, হালকা গড়ন, একঝাড় লালচুলের ফ্রেমে চোয়ালচাপা মুখে স্বনির্ভর দৃঢ়তা। সেটা অবশ্য সারাদিন মিটিঙে অনেকবার টের পাওয়া গেছিল। 

অনেকজোড়া চোখ এখন আরলিনের দিকে। কি বলতে চাইছে মেয়েটা? 

হ্যাঁ, সব সময়ে এত সহজে বের করে দেওয়া যায় না। আমার সাথে একবার এমনটাই হয়েছিল। ছুটির দিন ছিল, বোধহয় রবিবার। নিজের বাড়িতে স্নান করতে বাথরুমে গেছি। বাথটবে গা এলিয়ে সবে হাতে একটা ম্যাগাজিন নিয়েছি – 

অভিজ্ঞ গল্প বলুয়ের মত এক মুহূর্ত চুপ করে আরলিন সবার আগ্রহী মুখগুলোকে জরিপ করল। গলা খাদে নামতে নামতে থমকে গেল। একটা বাদুড়। ঠিক বাথটবের মাথায় কালো ডানা ছড়িয়ে দেয়াল আঁকড়ে ঝুলছে। আচমকা ভয়ে জল থেকে একলাফ মেরে ওইভাবেই দৌড়ে বেরিয়ে গেছিলাম সেদিন। 

ওই অবস্থায়? হেসে গড়িয়ে পড়ল রোসা। আরলিন, কিছু মনে করো না। আমার এটা অনেক দিনের কৌতূহল, তোমার মত যাদের মাথার চুল লাল, মানে কি সব জায়গায়, আই মীন পিউবিক হেয়ারও কি ওই রঙেরই হয়? 

বোধহয় অনেকগুলো টেকিলা সটের প্রভাব। না হলে এমন ব্যাক্তিগত প্রশ্ন রোসার মুখ দিয়ে কেন বেরোবে? প্রশ্নটা আরলিনকে করা হলেও, একরাশ লজ্জা আর বিরক্তি যেন গ্রাস করল নিশিকে। সিমোন আর ইনা একবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, হল কি রোসার? জুলিয়া খুব খুশি হল যদিও, বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা নিজের টিমের মধ্যে এই অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলাই তো উদ্দেশ্য ছিল আজ। 

আরলিন বিন্দাস! রাগ দুরের কথা, বরং হেসে ফেলল। কাছাকাছি, কিন্তু পারফেক্ট ম্যাচ নয় রে। মোর অফ আ স্ট্রবেরী ব্লন্ড, দ্যান রেড। 

বিষয়টা মোটেই পছন্দ হয় নি, নিশি ছটফট করে বলে উঠল, তারপর কি হল? ওই বাদুড়টাকে নিয়ে করলেটা কি? 

ইনা দাঁত দেখিয়ে হাসল, আরে আমি তো শুনেছি তোমাদের ওখানে বাদুড় তাড়ান মানা। একবার ঢুকলে নিজে থেকে না গেলে বের করতে পারবে না। 

ঠিক তাই। যতক্ষণ বাদুরটা নিজে থেকে না যাচ্ছে, তাড়ান যায় না। ইটস ইললিগ্যাল। 

মাই গড! তোমাকে অ্যাটাক করেনি তো? সিমোনের নিখুঁত করে আঁকা ভুরুতে চিন্তার প্রশ্নরেখা। 

রোসা হেসে উড়িয়ে দিল, ধুর! বাদুড় কি অ্যাটাক করে? ওরা খুব টিমিড হয়। দেখে ভয় লাগলেও আসলে কিছু করার সম্ভাবনা খুব কম। 

সত্যি তাই? দপ করে জ্বলে ওঠা চোখে হঠাত অকারণে রেগে যেতে যেতে আরলিন বলল, মনে করো তুমি রোজ বাথটাবে স্নান করছ আর দেখছ একটা বাদুড় তোমার মাথার ওপর ছাদে উল্টো হয়ে ঝুলছে, ওর কাল পাখাটা ছেদরে আছে তোমার বাথটবের ঠিক ওপরের ছাদটা জুড়ে, আর ওই শয়তানটা তার কাল পুঁতির মত চোখ তোমার দিকে মেলে রয়েছে, কেমন লাগবে তোমার? ও কিন্তু তোমায় কোনভাবে অ্যাটাক করেনি। ওর আওয়াজ তোমার কান অবধি পৌছায় না। শুধু ওর ঘিনঘিনে চেহারাটা নিয়ে তোমার মাথার উপর ঝুলছে, দিনের পর দিন। হোক না একটা বাদুড়, হোক না আপাতনিরীহ, আমি জানি আমাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা বা সাহস ওর নেই, কিন্তু কেন ওটা তাকিয়ে থাকবে আর ওই কুৎসিত জুলজুলে চোখ দিয়ে আমায় চাটবে? কেন সহ্য করবো আমি? বলতে বলতে আরলিনের গলাটা খসখসে হয়ে গেল। একটু হাঁপাচ্ছিল মেয়েটা, চুলের রক্তাভা মুখেও ছড়িয়ে পড়েছিল। 

আরলিনের এই প্রতিক্রিয়ায় সবাই খুব চমকে গেছিল। হঠাত কেন এত উত্তেজিত হয়ে গেছে আরলিন? রোসা আফসোসের গলায় বলল, সরি আরলিন, আমি বুঝতে পারিনি। 

জুলিয়া মধ্যস্ততায় ব্যাস্ত হল, তুমি কি করলে? কিভাবে তাড়ালে বাদুড়টাকে? 

প্রথমে ওকে মারব ঠিক করেছিলাম, থেঁতলে দেবো ওই নোংরা মাথাটা। কিন্তু যদি ঠিক মতো মারতে না পারি? যদি বেঁচে যায় আর আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে? আর বাদুড় মারার খবরটা যদি কোনভাবে ছড়িয়ে যায়? তখন কি হবে? 

এই সময়ে ইওলান্ডা এসে পৌঁছল। বাড়ি খুঁজে না পাওয়ায় দেরী হয়ে গেছে। কিন্তু তখন সবাই বাদুড়ের গল্পে এত মশগুল, কারুর ওদিকে নজর দেবার উপায় নেই। সবাই এতক্ষণে আরলিনকে প্রায় ঘিরে বসেছে। কি করল আরলিন? ওই বাদুড়ের সাথে একই বাথরুমে স্নান করা চালিয়ে গেল? ওইভাবে কতদিন? 

না, ওই বাদুড়টাকে ঘরে রেখে আমি স্নান করতে পারতাম না, ভাবলেই আমার গা ঘিনঘিন করত। তিনদিন আমি স্নান না করেছিলাম। বাথরুমে মাঝে মাঝে উঁকি দিতাম। দেখতাম ওটা ঠিক ওইখানে এসে বসে আছে। রাত্রিবেলা বেরোত, কিন্তু ফিরে আসত আর বসত ঠিক ওইখানেই। তখন আমি ওটাকে অন্যভাবে মারব বলে ঠিক করলাম। বাদুড়টা একদিন বেরিয়ে যেতেই আমি একটা প্লাস্টিক বোর্ডের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লু লাগিয়ে ছাদে ঠিক ওইখানে লাগিয়ে দিলাম। ঠিক ওইখানটায়, যেখান থেকে ঝুলত বদমাশটা। জ্বলজ্বল করছিল আরলিনের চোখ, কবে ঘটেছে এই ঘটনা, কিন্তু জিঘাংসার আগুন ঝলকাচ্ছিল ওর চোখে আজও। 

তারপর? তারপর কি হল? 

আরলিনের ঠোঁটের ফাঁকে ঘৃনার হাসি ছলকে উঠল। আর কি হতে পারত? ওখানেই আটকে গেল। বেচারা! ওই গ্লু বোর্ডের আঠায় নিজেকে লেপটে দিয়ে ঝুলেছিল ওখানেই, তিলে তিলে মরার আগে অবধি। আমার আর স্নান করতে ভয় করত না। বরং স্নান করতে করতে ওটাকে মরতে দেখতাম। রোজ। একটু একটু করে, ওখানেই। 

কেউ কথা বলছিল না, কান পাতলে বাইরে বরফ পড়ার শব্দ শোনা যেতে পারত হয়তো। ইনাই প্রথম কথা বলল, বেশ করেছো। আমি হলেও হয়তো এমনি করতাম। তোমার কথা শুনে মনে পড়ে গেল। জানো, একবার আমিও এমনি ভাবে- 

তোমাকেও বাদুড়? আরলিনের জিজ্ঞাসায় সমব্যাথীর অন্তরঙ্গতা। 

না, আরশোলা। এক ঝাঁক সাদা আরশোলা। 

দুপাট্টাটাকে মুখের কাছে মুঠো করে শিউরে উঠল নিশি। ও মাই গড! আমার তো আরশোলা দেখলেই গা রি রি করে। 

আমারও। তোমরা সাদা আরশোলা দেখেছো? আরও খারাপ। স্বচ্ছ পাখা কাঁপিয়ে যখন উড়ে বেড়ায়, মনে হয় একটা লার্ভা শূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

সো ডিসগাস্টিং! 

সবার চোখ এবার ইনার দিকে। সবাই শুনতে চায় কিভাবে ওই আরশোলাগুলোর থেকে নিজেকে সামলাল ইনা। ল্যাম্পের আলোটা তেরচা হয়ে পড়েছে ইনার মুখে, তিরতির করা চোখের পাতায় পুরনো কথার ছায়া, কিন্তু ঠোঁটের কোনে চাপা হাসি বলে দেয় যাই হয়ে থাকুক, আরশোলাতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসার মেয়ে ও নয়। অ্যাফ্রিকান আমেরিকান মেয়ে ইনা, বেশ শক্তসমর্থ চেহারা – আরশোলা কেন, দু তিনটে মরদ জোয়ানকেও এক হাত নিয়ে নিতে পারে। 

ইনার ভরাট গলা নিস্তব্ধ ঘরে ছড়িয়ে পড়ছিল। 

আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সিড়ির মুখে রিসাইক্লিং বিনটা রাখা থাকে। পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি, তিনটে সাদা আরশোলা ফড়ফড় করে উড়ে আসল ওই বিনটা থেকে। কি সাহস ওদের, একটা আমার মুখের আশেপাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল, একটা নাকের ডগায়, আর একটা হামলে পড়েছে ঠিক বুকের উপর। হোক না আরশোলা, আমার যে নিজেকে কি ভায়োলেটেড লাগছিল! আমি হাঁটছি, আর ওগুলোও আমার সঙ্গে সঙ্গে উড়ছে। ঘাড়ের কাছে, মাথার উপর, কানের লতিতে - ওদের পাখাগুলো খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে, আমি তার ঝাপ্টা পাচ্ছি। দে ইনভেডেড মাই প্রাইভেট স্পেস। ভয়ে, আতঙ্কে আমি ছটফট করে দৌড় দিলাম। লিফট নিতেও ভুলে গেলাম, সিঁড়ি দিয়ে দুড়দাড় করে উঠতে থাকলাম। আরশোলাগুলো একটুক্ষণ এলো, তারপর আর নয়। কিন্তু অনেকক্ষণ অবধি আমার কানে ওদের পাখার ফরফরানি বিদ্রুপের হাসির মত লেগে ছিল। নিজের ঘরের দরজায় পৌঁছেও আমি থরথর করে কাঁপছিলাম। 

এত সহজে ছেড়ে দিলে? পারলে না জুতোর তলায় পিষে দিতে? 

রোসার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হাসল ইনা। না ছাড়িনি। প্রথমে মনে হয়েছিল ছেড়ে দিই। আমার ঘরের মধ্যে তো নয়। কিন্তু ভাবলাম রোজ ওই বিনটার পাশ দিয়ে যেতে হবে আমায়। এতদিন নিজের খুশিতে এসেছি, গিয়েছি। কিন্তু এখন থেকে আমার মনে একটা ভয় লেগে থাকবে। যখনই ওটার পাশ দিয়ে যাবো, মনে হবে এই বুঝি বেরিয়ে এল আরশোলাগুলো। নিরুদ্বিগ্ন মনটাকে ফিরে পাবার জন্যই আমার কিছু একটা করার দরকার ছিল। আমি আমার ঘর থেকে একটা স্প্রে ক্যান নিয়ে বেরোলাম। ডান হাতটাকে পিছনে রেখেছিলাম, হাতে ধরা ছিল স্প্রে ক্যানটা। দেখতে দেবো না শয়তানগুলোকে। বিনটার কাছে আসতেই আবার ফড়ফড় করে উড়ে আসল সবকটা, যেন খুশির ফোয়ারা ছুটেছে। আমি এক ঝটকায় স্প্রে ক্যানটা বন্দুকের মত বাগিয়ে ধরে তাক করে করে স্প্রে করলাম একটা একটা করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই জুতোর হিলে পিসে দিলাম বাস্টার্ডগুলোকে। একটাকেও ছাড়িনি। বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে এবার দম ফেলে ইনা। 

বাট দেয়ার ক্ল্যান উইল সারভাইভ। স্পট স্প্রেইং ডাজ নট এলিমিনেট দেম। 

আরলিনের দিকে অদ্ভূত ঠান্ডা বিষাদভরা চোখে তাকাল ইনা। আরশোলা ডাইনোসরের যুগ থেকে টিঁকে আছে, ওদের পুরোপুরি এলিমিনেট করবে কি ভাবে? কিন্তু চোখের সামনে যেটা আসে তাকে পিষে মারতে পেরেছি সেটাই শান্তি। 

তুমি পেরেছ ইনা, কিন্তু আমি পারিনি। কাঁদছিল নিশি। সবার চোখ এতক্ষণ ইনার উপরে ছিল, নিশি যে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে কেউ দেখেনি। 

জুলিয়া খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই নিশি, কি হয়েছে? রিল্যাক্স, ইটস ওকে। অনেক মেয়েই তো আরশোলা দেখে পালায়, তাতে কান্নার কি হয়েছে? 

না, আরশোলা নয় জুলিয়া। বিছে, ওটা ছিল বিছে। উদ্গত কান্নাকে কোনমতে গলার ভিতরে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে নিশি। 

বিছে? 

হাতের চেটোয় চোখ মুছছিল নিশি। গলার স্বর তখনো কান্নায় ভেজা। তবু বলতে চাইছিল নিশি, যেন বললেই তার বুকের ভার হালকা হবে। 

আমি যে জায়গাটায় বড় হয়েছি, জায়গাটার নাম ভান্ডারা। এমনিতেই খুব গরম। গরমকালে টেম্পারেচার একশো দশ ছাড়িয়ে যায়, বাইরে বেরোলে আগুনের হলকা, ঘরের মধ্যে তেমনি গুমোট। ফ্যানের হাওয়াও তার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা তাই বাড়ির উঠোনে খাটিয়া পেতে শুতাম। তাতেও কি গরম লাগত! মাটি থেকে যেন গরম ভাপ উঠে আসত। শুধু গভীর রাতে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হত, চারপাশটা নিথর হয়ে পড়ত, ফুরফুরে হাওয়ায় তখন ঘুমিয়ে পড়তে পারতাম। প্রতিটা বাড়িতে বাড়িতে এমনি অবস্থা, সবাই খাটিয়া পেতে বাইরে শুয়ে যেতো। ঘুমিয়ে আছি, হঠাত ফিল করলাম আমার সারা শরীরে কি একটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সারা শরীরময় ছড়িয়ে যাচ্ছে। গলায়, বুকে, পেটে, পায়ে এমনকি দুপায়ের মাঝখানে, বলতে বলতে শিউরে উঠছিল নিশি। আমাকে ছুঁচ্ছিল, সারা গায়ে কিলবিল করছিল ওর দাঁড়াওলা হাত পা গুলো। আমি একটুও নড়তে পারলাম না, জানি নড়লেই ওর দাঁড়ায় ডাঁশবে আমায়। কাউকে ডাকতে পারলাম না, গোঙ্গানি গলায় চেপে মরার মত পড়ে রইলাম। অনেকক্ষণ বাদে ওটা নেমে চলে গেল, গায়ে লেগে রইল ওর রস আর খসখসে স্পর্শের বিশ্রী অনুভুতি। 

সবাইকে বলতে পেরে নিশি এখন একটু হালকা। ওর কান্নাও থেমে গেছিল। কিন্তু তাই বলে কেউ ইউলেন্ডার খিলখিল হাসির জন্য তৈরী ছিল না। 

ইউলেন্ডা খুব কম কথা বলে। ওর ইংরাজীটা অত পোক্ত নয়, কথা বলতে বলতে শব্দ হাতড়াতে হয়। তাছাড়া একটু লাজুক। তাই ওর এই হাসিতে চমকে যাওয়া স্বাভাবিক। 

আমি হলে কি করতাম জানো নিশি? খেয়ে নিতাম। 

মাই গড! বিছে খেয়ে নেবে? 

কত খেয়েছি, ধরেওছি নিজে। বিছেগুলো এত বোকা হয়, খুব সোজা ওদের ধরা। খুব যখন গরম পড়ে, বিছেগুলো ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়ায় জলের সন্ধানে। একটা ছোট চ্যাদনা মত বাটিতে করে সামান্য জল নিয়ে উঠোনে রেখে দিতাম। আর যেই একটা বিছে শুঁড় বাগিয়ে ওই জলের মধ্যে আসত, ব্যাস! আর একটা বাটি দিয়ে চেপে দাও। 

তারপর ওটাকে রান্না করে খেতে? 

একঝাক সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসল ইউলান্ডা, আমরা চাইনিজ মেয়েরা সব কিছু রান্না করে খেতে পারি। যা কিছু নড়েচড়ে বেড়ায়, সব। 

ইউলেন্ডা এমনভাবে বলল, সকলের মধ্যে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল। 

রোসা লাফাতে লাফাতে উঠে গিয়ে আর একটা টেকিলা শট বানাল, টোস্ট টু ইওর গাম্পসন অন বিহাফ অফ অল উইমেন। ইউলেন্ডা, ইউ মে লাইক টু স্ন্যাক উইথ দ্য স্নেক অ্যাজ ওয়েল? 

গার্লস, স্যামন ক্রস্টিনি আর শ্রিম্প ককটেলগুলো পড়ে আছে। আমার কাছে স্করপিওন বা কক্রোচ ককটেল জাতীয় এক্সোটিক কোন খাবার তো নেই, তার জন্য সাংহাই যেতে হবে। বাট ট্রাই হোয়াট আই হ্যাভ। 

আবার হাসির পিচকিরি ছুটল। সবাই নিজের নিজের পাত্রে পছন্দের পানীয় ঢেলে স্যামন আর শ্রিম্প নিয়ে বসল। 

রোসা একটা স্ট্রবেরী মারগারিটা নিয়েছিল। লাল নেলপলিশ লাগানো লম্বা লম্বা আঙ্গুলগুলোয় ডিম্বাকার ককটেল গ্লাসটাকে জড়িয়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসল। হাবভাবে বোঝা যাচ্ছে কিছু বলবে। 

ছোট্ট একটা চুমুক মেরে তারপর মুখ খুলল। আমি তাহলে আমার টারান্টুলার গল্পটা তোমাদের শোনাই। শুনবে? 

আগ্রহের কোন অভাব ছিল না। 

আমি তখন হাই স্কুলে পড়ি। আমরা টারান্টুলা হাইকে গেছিলাম। সেটা মেটিং সীজন, তাই ছেলে টারান্টুলাগুলো পাগলের মত ঘুরে বেড়ায়। সাইটিং খুব ইজি। আমাদের ইন্সট্রাক্টর মিস রামিরেজ বলছিল , আট পা ওলা এই ট্যারান্টুলাগুলো বেশ বড়সরো হয়, এক একটা ক্রীম ডোনাটের মতন। কিন্তু ভয়ের কিছু নেই, ওরা তাড়া করবে না যদি তুমি ওদের ক্ষতি না করো। তাছাড়া যদি কামড়ায়ও, এটা কোন মৌমাছির কামড়ের থেকে মারাত্মক কিছু নয়। মিস আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, বাট গার্লস, কীপ ওর পেডিপাল্পস ক্রসড দো, ইউ নেভার নো। 

সেটা কি? 

ওটাই মেয়ে স্পাইডারের যৌনাঙ্গ। 

তোমার রামিরেজ বেশ রসিক ছিল বোঝা যাচ্ছে। তারপর? মনে হচ্ছে কোন টারান্টুলা তোমার পেডিপাল্পসে অ্যাটাক করেছিল? 

জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল রোসা। না, ট্যারান্টুলা না। মিগুয়েল। আমারই এক ক্লাসমেট। আমরা ছেলে মেয়ে মিলিয়ে জনা কুড়ি ছিলাম। ট্যারান্টুলার খোঁজে এদিক ওদিক ছিটকে গেছি। হঠাত এই শর্মা হাজির। আমি ঝুঁকে পড়ে ট্যারান্টুলার বাসা খোঁজার চেষ্টা করছি, ওদিকে ও আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি অবাক হয়ে মুখ ফেরাতেই জবরদস্তি চুমু। ঠেলে সরিয়ে দিলাম একধাক্কায়, কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়। মিগুয়েলের চেহারাটা বেশ বড়সড়, বাস্কেটবল খেলত স্কুলের টিমে। আমি ওর সঙ্গে পারবো কেন? আমার ব্লাউজের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমি বললাম, মিগুয়েল, এমন করিস না, ছাড় ,ছাড়! ও অদ্ভুত ভাবে হাসল, বলল, মনে নেই মিস কি বলেছে, এটা মেটিং সীজন। আমি আমার লম্বা নখ দিয়ে ওর গালটাকে খিঁচড়ে দিতে চাইলাম। ও অনায়াসে আমার ডান হাতটাকে বেঁকিয়ে পিঠের পিছন দিয়ে মুড়ে দিল। আমার অসম্ভব ব্যাথা লাগছিল, কিন্তু ও পরোয়াই করল না। আমার স্কার্টটাকে তুলে পিছন দিক দিয়ে – আমি চ্যাঁচালাম, আমার লাগছে, স্টপ ইট মিগুয়েল, আমি সবাইকে বলে দেবো। কিন্তু ওকে তখন আর থামান যাচ্ছিল না। আমার মাথাটা মাটির দিকে নাবিয়ে দিয়েছিল, আমি তখন একদম হামাগুড়ি দেবার মতন অবস্থায়। হঠাত দেখি আমার চোখের সামনে একটা টারান্টুলা। বড়, গোল, গর্ত থেকে একটুখানি শুঁড় বাড়িয়েছে। একরাশ কালো রোমে ভরা টারান্টুলাটা এবার আটখান পা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে বেরোচ্ছে। অন্য সময় হলে আমি নিশ্চই ওটাকে দেখে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠতাম। কিন্তু তখন আমার সঙ্গে যা হচ্ছে এর থেকে ভয়ের আর কি আছে? আমি কিচ্ছু না ভেবে বাঁ হাত দিয়ে ওর একটা ঠ্যাং ধরে পিছন দিকে ছুঁড়ে দিলাম। ইট স্টাং মিগুয়েল হোয়ার ইট রিয়ালি ম্যাটারড। অসম্ভব বিকট একটা চিৎকার দিয়ে মিগুয়েল উলটে পড়ল। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে একলাফে সেই ঝোপের বাইরে। মিগুয়েলের চিৎকার শুনে তখন সবাই ছুটে আসছে। 

ওর কি হল? 

অনেকদিন ওকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। টারান্টুলাটা যেভাবে ওর পিনাসটাকে আঁকড়ে ধরেছিল! 

সারভড হিম রাইট! 

ওই ছেলেটাই তাহলে ছিল আসল টারান্টুলা! 

হয়তো, কিংবা তার চেয়েও খারাপ। 

গল্পের নেশাটা ছড়িয়ে পড়েছিল। আরলিন এবার সিমোনকে নিয়ে পড়ল। আজকে গল্পের দিন সিমোন, সবাই বলছে - এবার তোমার পালা। 

সিমোন কিন্তু কিন্তু করছিল, আমার সেভাবে কিছু মনে পড়ছে না, কি বলি বলোতো? 

আর একটা টেকিলা শট লাগবে নাকি? মুচকি হাসল রোসা। 

নাহ, তার দরকার নেই। আসলে কিভাবে বলব ভাবছি। সিমোনের কপালে চিন্তার রেখারা খেলা করে। তোমরা গিরগিটির গল্প শুনবে, এক রং বদলানো গিরগিটি? 

আই অলওয়েজ নিউ, উ আর দ্য মোস্ট কালারফুল ওয়ান! আরলিন খুব আড়ম্বর সহকারে সিমোনের গালে চুমু খেলো। 

হাসির পরিপূর্ণতায় আরলিনের দিকে তাকাল সিমোন, দেখো তোমাদের মত আমি গল্প বলায় অত দড় নই। যেমন যেমন মনে হচ্ছে বলছি। আমার ইংরাজিও তেমন ভাল নয়, তোমাদের ঠিকঠাক বুঝে নিতে হবে। 

লম্বা চুলের গোছার বাদামি রং আঙ্গুলে পাকাতে পাকাতে গল্প শুরু করল সিমোন। তখন স্কুলে পড়ি, ত্রয়াজিয়েম ইয়ার। বাড়িতে আমার রিডিং টেবলটা ছিল ঠিক জানালার ধারে। আর জানালার বাইরেই আমাদের আঙ্গুর বাগান। গিরিগিটিটা ওই বাগানে আসতো। কখনো জানালার ধারে ঝুলে থাকত আঙ্গুরলতায়, কখনো জানলার রেলিঙে। আমার খুব মজা লাগত, ওর সঙ্গে খুনসুটি করতাম আর ও রং বদলে বদলে ঘুরে বেড়াত। কেমন যেন মনে হত, ওর রং বদলানো, সে তো আমারই জন্যে। আমি জানলার ধারে চিনি দিয়ে রাখতাম, পিঁপড়েরা দল বেঁধে খেতে আসত আর আমার গিরগিটি মহারাজের পিঁপড়েভোজ হত। 

সিমোন, তুমি কি করে জানলে সেই একই গিরগিটি রোজ আসত? ঘুরে ঘুরে অন্য গিরগিটিও তো আসতে পারে। 

চেনা যায় কোন না কোন অসম্পূর্ণতায়। রোজ দেখতে দেখতে সব খুঁতই তো নজরে এসে যায়, তাই না? সিমোন যখন চুল ঝাঁকিয়ে মাথাটা একদিকে হেলিয়ে কথা বলে, তখন ওর যে কোন কথা কাটাই খুব মুশকিল। 

তো একদিন এমনি গিরগিটিটা রেলিঙে তিড়িং বিড়িং করছে – সিমোন ওর ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে গিরগিটির লাফিয়ে লাফিয়ে চলা দেখাচ্ছিল, পিছনের দেওয়ালে তার ছায়াটা একটা সত্যি গিরগিটির মতই লাফাচ্ছিল। আঙ্গুলগুলো হঠাৎ থেমে যেতে সবার চোখ আটকালো স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দেওয়ালের ছায়া গিরগিটিতে। ওটার ওঁতপাতা শরীর শক্ত, চোখের দৃষ্টি স্থির। 

তাকিয়ে দেখি একটা প্রজাপতি, রঙের ফোয়ারায় প্রানবন্ত। সিমোনের গলার স্বর এবার বিষাদে জারিয়ে যাচ্ছিল। আমি প্রজাপতিটার কথা ভেবে ভয়ে আঁতকে ওঠার আগেই আমার গিরগিটিটা লোভার্ত জিভটা ছুঁড়ে দিয়ে এক লহমায় ওকে মুখে পড়ে নিল। আমার ভীষন ভীষন রাগ হয়েছিল – বলতে বলতে সিমোনের নাকের পাশ কেঁপে কেঁপে উঠে সারা ঘরে তার রাগ ছড়িয়ে দিল। পাজী গিরগিটিটা! 

আমি কদিন আর ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম না, ওর জন্য পিঁপড়ে ভোজের ব্যবস্থাও আর করিনি। অমন সুন্দর প্রজাপতিটার জন্য কষ্ট হয় না, বলো? সিমোনের গলায় এখন দমকা হাওয়ায় নিবতে জ্বলতে, জ্বলতে নিবতে থাকা মোমবাঁতির কাঁপন। সিমোনের সেই রাগ, দুঃখ আর কষ্টের পাকে পাকে ঘরের সবাই জড়িয়ে পড়েছিল। তাই যখন আবার তার গলায় ঝঙ্কার ফিরে এলো, সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হ্যাঁ গো, গিরগিটিটা আবার আমার এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর মন কাড়ার চেষ্টা করছিল। আমার তখন কি বা বয়স, আমার রাগ ভাঙ্গানোটা কঠিন ছিল না। কদিন বাদে সব আবার আগের মত চলছিল। কিন্তু কদিন আর? গিরগিটি তো গিরগিটিই থাকে। আবার একদিন আমার রেলিঙে একটা দারুন সুন্দর প্রজাপতি এসে বসেছে। বলতে বলতে সিমোনের গলা বুঁজে যেতে যেতে দপ করে জ্বলে উঠল - না, আবার হতে দিই নি। চোখের কোনা দিয়ে দেখি আমার গিরগিটিটা। জানি এক্ষুনি ওর লম্বা জিভ আছড়ে পড়বে এই সুন্দর প্রজাপতিটার উপরও। আমি তার চেয়েও দ্রুতগতিতে আমার হাতের বইটা ছুঁড়ে মারলাম ওর দিকে। বইটা গিয়ে লাগল ওর ল্যাজে, বেচারা ল্যাজ খসিয়ে পালাল। 

বিষাদভরা চোখের পাতা এলিয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে নিজেকেই যেন স্বান্তনা দিল সিমোন, প্রজাপতিটা তো বাঁচল। গিরগিটির ল্যাজ, জানি আবার গজাবে। কিন্তু নতুন ল্যাজ নিয়ে সে যেখানেই যাক, আমার জানালার ধারে আর আসে নি। সিমোনের গলার স্বর এমনভাবে নৈশব্দে মিলিয়ে গেল, কেউ বুঝতেই পারেনি কখন গল্পের শেষ হয়ে গেছে। 

চমক ভাঙতে জুলিয়া তাড়া লাগাল, চলো সবাই। ডিনারটা করে নিই। মনে রেখো, কালকে সানডে নয়। 

কিচেনের দিকে পা বাড়ানো জুলিয়াকে আরলিন জিজ্ঞেস করল, কিন্তু জুলিয়া, তুমি এমন জঙ্গলের মধ্যে থাকো, কীট পতঙ্গ নিয়ে তোমার কি কোন গল্প নেই? 

জুলিয়া ডিনারের প্লেট সাজাচ্ছিল। মুখ ফিরিয়ে তাকাল। অদ্ভুতভাবে হাসল। হ্যাঁ, আছে তো। একটা সাপের গল্প। 

সাপ? 

হ্যাঁ, আমার বেডরুমে একবার একটা সাপ ঢুকেছিল। অনায়াস শব্দের সঙ্গে ডিনার সেট করছিল জুলিয়া। 

কি সাপ? কোবরা? 

নাহ, তাহলেও তো বুঝতাম।। এ সাপটা ছিল নেহাতই নিরীহ, বিষ ছিল না মোটেই। কিন্তু হলদে আর কালো রঙের মিশ্রনে দেখতে ছিল কুৎসিত। ঠান্ডা, তেলতেলে, ঘিনঘিনে একটা সাপ। কুন্ডলী পাকিয়ে আমার বেডরুমের চেয়ারটার তলায় যখন বসে থাকত, ইচ্ছা করত মেরে থেঁতলে দিই ওর মাথাটা। 

মারলে সেই সাপটাকে? 

নাহ, হাসল জুলিয়া। আমিই ওই বেডরুমটা ছেড়ে দিলাম। 

1 টি মন্তব্য: