বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

আন্তারেস - দীপেন ভট্টাচার্য

(আন্তারেস - ধারাবাহিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনী)

আন্তারেস প্রথম অধ্যায়

গ্রহটাকে আমরা বহুদিন হলই চিহ্নিত করে রেখেছিলাম। লাল গ্রহ, তার মধ্যে নীল আর সবুজের ছাপ। পাহাড় আছে, সবুজ ক্লোরোফিলে ছেয়ে আছে তার চড়াই আর উৎরাই। তার মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ নীল জংলী ফুল।

বায়ুমণ্ডলে ৪০ ভাগ অক্সিজেন, বাদবাকি নাইট্রোজেন, অল্প পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বায়ুচাপ ৮০ হাজার প্যাসকাল, মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ প্রতি বর্গ সেকেন্ডে ৬ মিটার।

মাত্র ০.৩ জ্যোতির্বিদ্যা একক দূরত্বে লাল আলোতে জ্বলছে একটা M টাইপ তারা। আকাশটাও কেমন লাল হয়ে আছে। তারাটার নাম আমরা দিয়েছিলাম মিহির আর গ্রহটার নাম জেমলা।

মা বলল, ‘এই গ্রহটা তোর পছন্দ হয়েছে, শোগি?’

আমি লাফাতে লাফাতে বললাম, ‘হয়েছে, হয়েছে।’ হাঁপিয়ে গেলাম, তারপর বললাম, ‘আমি কি হেলমেট খুলে ফেলব?’

মা বলল, ‘খুলিস না, এতখানি অক্সিজেন হঠাৎ করে বিষ হয়ে যেতে পারে।’

দূরে দেখি লাহে, এমা আর ইলিয়াল লাফাচ্ছে আর হেলমেট খোলার তোড়জোড় করছে। ওদের মা সিয়ানা ওদের কাছে নেই, সে পাহাড়ের একটা পরিখার ধার ঘেঁষে নিচে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। আমি হাত তুলে মা’কে এমা আর ইলিয়ালকে দেখালাম। মা বেতারে তাদের হেলমেট খুলতে মানা করল।

আমার মা’র নাম হল ইন্দল। আন্তারেস মহাযানে যত মা আছেন, প্রায় দশজনের মত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে স্নেহময়ী হল আমার মা। অবশ্য বেলকের সঙ্গে এই নিয়ে আমার প্রায়ই ঝগড়া হয় কারণ ও বলে ওর মার মত বুদ্ধিমান আর সুন্দর মানুষ নাকি মহাবিশ্বে আর নেই। তা যাকগে, বেলককে আমি এই বিষয়ে অনেক সময় ছাড় দিই, কারণ বেলকের বাবা নেই। এদিকে আবার বেলকের বাবা নেই বলে আমার মা ওকে খুব স্নেহ করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার থেকে একটু বেশীই করে। তখন আবার খুব হিংসা হয়। মা আবার সেটা বোঝেন, তাই কখনো কখনো রাতে শুতে যাবার আগে আমার পাশে বসে আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আমাকে বলে, ‘এই মহাকাশে তার সবচেয়ে আদরের জিনিসটা নাকি আমি।’ আমি বলি, ‘বাবার থেকেও?’ মা বলে, ‘বাবার থেকেও।’ মা কথাটা এমনভাবে বলে, মুখের হাসিটা ধরে রেখে, বুকটা আনন্দে ভরসায় ভরে ওঠে।

পৃথিবী ছেড়েছি আমরা সেই কবে। প্রায় এক শ বছর হবে। মহাকাশের নিকষ অন্ধকার ধীরে ধীরে সেই নীল গোলকের স্মৃতি ম্রিয়মান করে এনেছিল। আমাদের মহাকাশযানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়েছিল পৃথিবীর কাহিনী, ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক স্মৃতিফলকে ধরে রাখা পৃথিবীর চলচ্চিত্র উজ্জ্বল করে রাখত আমাদের হলঘর। ছেড়ে আসা পৃথিবীর গান ভরিয়ে রেখেছিল বিশাল মহাকাশযানের করিডর।

আমার ছোটরা কখনো দেখি নি পৃথিবী, আমাদের জন্ম এই মহাকাশযানে। আমাদের মহাকাশযানের নাম আন্তারেস।


কিন্তু আমার মার জন্ম পৃথিবীতে। যখন আরো ছোট ছিলাম মা তার কোলে বসিয়ে আমাকে পৃথিবীর গল্প শুনিয়েছেন, ঘুম-পাড়ানী গান গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়েছেন, চামচে করে খাইয়ে দিয়েছেন। অক্ষর চেনার আগে, ছবি দেখে জিনিস চিনতে পারার আগে মার কাছ থেকেই আমি পৃথিবীর কথা শুনেছি। সবুজ আর নীল রঙে ঢাকা নাকি সেই পৃথিবী। বনের সবুজ, সমুদ্রের নীল। মাঝে মধ্যে মেঘের সাদা আর মরুভূমির হলুদ। মহাকাশের নিকষ কালোতে এই রঙগুলো যাতে ভুলে না যাই সেজন্য আমাদের খেলার ঘরে, মহাকাশযানের করিডরে সেই রঙগুলো আঁকা আছে। মা এরকম একটা রঙের বর্ণালী দেখিয়ে বলেছিল, এটা রামধনু। ধনুকের মত বাঁকা। ত্রিশিরা কাচে আলো ফেললে যা হয় বৃষ্টির জলের ফোঁটায় সূর্যের আলো পড়লে এরকমভাবে সেই আলো নানা রঙে বিশ্লিষ্ট হয়।

বিশ্লিষ্ট কি মা? এটা বোঝাতে মা সময় নিল। বলেছিল, মনে কর তোমাকে অনেক ক'টা বল দেয়া হল। সেগুলো আবার বিভিন্ন রঙের - লাল বল, নীল বল, সবুজ বল, হলুদ বল। মনে কর তোমাকে আবার কয়েকটা বাক্স দেয়া হল, তাতে লেখা আছে লাল, নীল, হলুদ। তুমি লাল বলগুলোকে আলাদা করে লাল বাক্সে ফেললে, নীল বলগুলোকে নীলে বাক্সে। এই যে রঙ হিসাবে বলগুলো আলাদা করে ফেললে একেই বলে বিশ্লিষ্ট করা।
এরকমভাবে যে মা আমাকে কত কিছু শেখাতেন। 

আমাদের জানালার বাইরে যে অন্ধকার তা যেন অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাতে নীল, লাল, সাদা তারারা জ্বলজ্বল করছিল, দু-একটা ফ্যাকাশে নীহারিকা ঠিক স্পষ্ট দেখা যায় না। সাধারণতঃ সরাসরি আমরা জানালার বাইরে তাকাই না। এর কারণ হল আমাদের মহাকাশযানটির বসাবাস করার জায়গাটি ক্রমাগতই ঘোরে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি করার জন্য। আমাদের মূল জাহাজটির দৈর্ঘ ৮০০ মিটার। তার সামনের দিকে রয়েছে একটা ৩০০ মিটার ব্যাসার্ধের চক্র। সেই চক্রটি ঘুরছে, প্রতি পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডে সে একবার করে ঘুরছে। আমারা ঐ চক্রের মধ্যেই থাকি। চক্রের ঘূর্ণনে আমরা বাইরের দিকে যেন ছিটকে যেতে চাই, কিন্তু মহাকাশযানের দেয়াল আমাদের ধরে রাখে।তাই সেই দেয়ালটা মেঝের মত কাজ করে, আমাদের মনে হয় মেঝের দিকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মধ্যেই আমর আছি। 

আমরা হাঁটি সেই মেঝের ওপরে, আমাদের দুপাশে থাকে বাইরের আকাশ দেখার জানালা। এগুলোকে জানালা বললে ভুল হবে, বরং বড় টেলিভিশনের স্ক্রিন বলাই সঙ্গত হবে। সেখানে বাইরের জগতের চিত্রটাকে প্রতিফলিত করা হয়। সেই চিত্রটা পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডে একবার করে ঘুরে আসে না, বরং আমরা না ঘুরলে যেমন হত তেমনভাবে স্থির থাকে যার ফলে আমরা বুঝতে পারি না আমরা ঘুরছি। ঐ জানালায় অভিক্ষিপ্ত ছবিগুলো দেখে মনে হবে আমরা একটা সরলরেখায় চলেছি, দুদিকের জানালায় আমরা বাঁদিকের আর ডানদিকের দৃশ্য দেখছি। 

আমরা খুঁজছি নতুন গ্রহ যেখানে আমরা গড়তে পারব নতুন বসতি। আমাদের পৃথিবী নাকি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বেতারে মা লাহে, এমা আর ইলিয়ালের মা সিয়ানাকে ডাকল, বলল,
পরিখার ধারে দাঁড়িয়ে কী করছ?

সিয়ানা উত্তর দিল,
নিচে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, জ্বলজ্বল করছে।

এটা শুনতে পেয়ে আমরা ছেলেমেয়েরা দৌড় তো দৌড়, কে কার আগে পৌঁছাবে পরিখার ধারে। সবার আগে পৌঁছে গেল মালাই আর তিলাই দু-ভাই। এদের দুজন এমনই যমজ যে আমি কখনই তাদের আলাদা করে চিনতে পারি না। আর এখন তো নভোচারী পোষাকে তো কে মালাই আর কে তিলাই বোঝার কোনোই উপায় নেই। এরপরে পৌঁছলাম আমি, তারপর এমা, ইলিয়াল আর লাহে। এই গ্রহে দৌঁড়াতে ভালই লাগছিল, লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিলাম বড় বড় পাথর। ওদিকে মা তো চিৎকার করে যাচ্ছেন,
লাফিও না, পাথরে পা হড়কে পড়ে যাবে। কে কার কথা শোনে!

বেতারে শুনলাম সিয়ানা বলছে,
সাবধান ছেলে মেয়েরা, এখানে কিন্তু পাহাড়ের পাড় নেই। আস্তে এস। সত্যিই তাই। পাহাড়ের ধারে আসতে চমকে গেলাম, হঠাৎ করেই যেন ভূমি এখানে ভেঙে গেছে, প্রায় ৫০০ মিটার খাড়াই দেয়াল। বহু নিচে কি যেন জ্বলজ্বল করছে লাল রঙে। মিহির তারার লাল রঙ প্রতিফলিত হচ্ছে কি কোনো কাচের আয়নায়? সিয়ানা মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি মনে হয়, জমাট বরফ নাকি লবণের হ্রদ?

মা বলল, আমরা এরকম আগে দেখেছি অনেক গ্রহে আর গ্রহাণুপুঞ্জে। সেখানে ওরকম দুটো জিনিসই ছিল - বরফ অথবা লবণ। দেখি বর্ণালী-বিশ্লেষকটা ব্যবহার করে।

আমাদের পেছনেই ছিল উড়ে-চলা ছোট বিমান-রোবট যাকে আমরা খুব ভালবাসতাম। তার নাম ছিল সাইবোক। সাইবোকের দেহটা ছিল বিমানের চোঙার মত, দুপাশে ডানা, কিন্তু ওর মুখটা ছিল অনেকটা মানুষের মত দেখতে। সাইবোক সব কাজের কাজী, সে আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে পারত। তাকে মা বলল নিচে উজ্জ্বল জিনিসটাকে কাছ থেকে দেখতে আর সেটার বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে।

সাইবোকের হাস্যরস খুব প্রখর ছিল, সে মিনমিন করে বলল,
আমাকেই এসব বিপজ্জনক কাজ করতে হবে? কিন্তু এই বলেই ভীষন বেগে গিরিখাদে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিছুক্ষণ বিনাবাধায় পড়ার পর সে তার ডানার এরোফয়েলগুলোকে সক্রিয় করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মা আর সিয়ানার কাছে সাইবোকের পাঠানো উজ্জ্বল জিনিসটার ছবি আর বর্ণালী তথ্য আসা আরম্ভ হল। আমরা বাচ্চারা তো খুব এক্সাইটেড, আমরা ওদের দুজনকে ঘিরে ধরে লাফাতে লাফাতে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখছে সাইবোক?

কিন্তু মার আর সিয়ানারর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল, মা
র ভুরুদুটো কুঁচকে অনেকটা একসাথে হয়ে গেল। সিয়ানা বলল, বাচ্চারা এটা একটা প্রাকৃতিক বরফ আগ্নেয়গিরি বলতে পার, মাটির নিচ থেকে পার্মাফ্রস্ট বা চিরতুষার ঊর্ধ্বচাপে বের হয়ে আসছে। চল আমাদের এখন আন্তারেসে ফিরে যেতে হবে। এত তাড়াতাড়ি কেন আন্তারেসে ফিরতে হবে সেটা আমরা কেউ বুঝলাম না। শুধু মনে হল এমন একটা কিছু ব্যাপার আছে যেটা মা কিংবা সিয়ানা আমাদের খুলে বলতে চায় না। যাইহোক আমরা তো লাফাতে লাফাতে আবার আমাদের ছোট সাটলে ফিরে এলাম। সাইবোক আমাদের পেছনে উড়ে উড়ে এল। সবাই সাটলে ডোকার পরে হুশ করে আমাদের পেছনে পরপর দুটো দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সিয়ানা সামনে বসে একটা নিয়ন্ত্রক প্যানেলে একটা বোতামে চাপ দিল। আমাদের পায়ের নিচে ইঞ্জিন মৃদু স্বরে গর্জে ওঠে। কম্প্রেসরের শব্দ শোনা যায়, বাইরে থেকে বাতাস নিচ্ছে, মুহূর্তে সেই বাতাসের অণু, পরমাণু আয়নিত হয়ে যায় আর সেই ধণাত্মক আয়ণিত কণা আকর্ষিত হয় একটা ঋণাত্মক বলয়ের দিকে, অবশেষে প্রবল বেগে ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে সেই আয়নিত কণাগুলো বের হতে থাকে, আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ধাক্কা দেয় আমাদের সাটলে। আমরা হেলমেট খুলে যার যার আসনে বসে বেল্ট বেঁধে নেই।

গ্রহ থেকে ওপরে ওঠা বা কক্ষপথ থেকে নিচে নামা আমাদের কাছে প্রথম প্রথম খুব এক্সাইটিং ছিল, কিন্তু এখন আমাদের একটু ভয়ই করে। সাটল খুব দ্রুত তার গতিবেগ বাড়াতে থেকে। আমাদের শরীর যেন সিটের সাথে গেঁথে যায়, ওজন বেড়ে যায় প্রায় তিনগুণ। এরকমভাবে ছয় মিনিট, ততক্ষণে আমরা আন্তারেসের কক্ষপথে প্রায় পৌঁছে গেছি। সিয়ানাকে কিছুই করতে হয় না, জেমলা গ্রহ থেকে আমাদের সাটল একটা পূর্ব নির্ধারিত পথে জেমলার কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান  আন্তারেসে পৌঁছে যায় আধঘন্টার মধ্যে। পৌঁছনোর আগে আমরা ওজনশূন্যতা অনুভব করি। সাটল আন্তারেসের সাথে ডক করে 
মহাকাশযানের মাঝখানের চুরুটের মত অংশে। এই অংশটা ঘোরে না, কাজেই এখানেও ওজনশূন্যতা বর্তমান। এখান থেকে একটা লিফট আমাদের বাইরের ঘুরন্ত চক্রের অংশে নিয়ে যায়। লিফটটা যত বাইরের দিকে যায় তত আমাদের ওজন বাড়ে। লিফট যেখানে থামে সেখানে আমাদের ওজন প্রায় পৃথিবীর সমান হয়।             

চক্রে পৌঁছনো মাত্র মা আমাকে বলল,
ঘরে চলে যা রে, শোগি। এই বলে সিয়ানা আর মা আমাদের ফেলে দৌড়ে চলে গেল, এরকম আগে কখন হয় নি। আমি বুঝলাম না জেমলার সেই গহ্বরের বরফের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখে তারা কেন এত ঘাবড়ে গেল।  

আমি কথাটা বেলককে কখন বলব ভাবছিলাম। বেলক আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। বেলককে লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে নিশ্চয়। আসলে লাইব্রেরিটা ছিল বিশাল একটা মিউজিয়াম, মূলতঃ পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সমস্ত ধরণের তথ্য সেখানে পাওয়া যেত। মহাশূন্যের পোষাক ছেড়েই দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরিতে। আমাদের লাইব্রেরি বইয়ে ঠাঁসা, মেঝে থেকে অনেক উপরে তাকের পর তাক সাজানো বই। আসলে ঠিক বই নয়, বলা যায় বইয়ের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে প্রাচীন সময়ে নাকি এভাবেই বই লাইব্রেরিতে সাজানো থাকত। সেই অনুভূতিটা বজায় রাখতে এই জাহাজেও সেভাবে বই রাখা হয়েছে, শুধু সেগুলো আসলে বই নয়, কম্পুটার দিয়ে গড়া বইয়ের ছবি মাত্র।  আমরা যদি কোনো বই পড়তে চাই বা শুধুমাত্র মাত্র দেখতে চাই তাহলে সেদিকে হাতের তর্জনী তুললেই সেটা একটা পড়ার টেবিলের ওপর ভেসে উঠবে। লেজারের আলোয় মুর্ত হয়ে উঠবে পুরো বইটা, আমি আঙুল দিয়ে পাতা সরাতে পারব, পড়তে পারব শুন্যে ভেসে ওঠা অক্ষরগুলো।

বেলক দেখলাম ঘরের কোনায় উপর হয়ে একটা পাথর দেখছে। আমাকে দেখে বলল,
জান এই জিনিসটা কি? এর নাম হল রোজেটা স্টোন। এটা দেখে গবেষকরা প্রথম মিশরীয় ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিল। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে জিনিসটা দেখলাম, একটা বিশাল পাথরের চাঁই। তাতে নানান ধরণের বর্ণমালায় লেখা। আমার দিকে বেলক তাকিয়ে বলল, জানো এর জন্য কত লোক কত শ্রম করেছে। শেষ পর্যন্ত হঠাৎ করেই একটা জায়গায় এই পাথরটা পাওয়া যায় যেখানে মিশরীয়, গ্রীক ও আমহারিক ভাষায় লেখা আছে।

এটাই কি সেই আসল পাথর? জিজ্ঞেস করি আমি। হ্যাঁ, বলে বেলক।

পৃথিবী ছাড়ার সময় আমাদের অনেক প্রাচীন স্মৃতি দিয়ে দেওয়া হয়। হামুরাব্বির প্রথম আইন ফলক, পৃথিবীর দেশসমূহের বিলুপ্তির সনদ। বেলক বলল,
এসব সামনাসামনি না দেখলে এগুলোর অর্থ বোঝা যায় না।

কিন্তু আমার বেলকের কথা শোনার মত ধৈর্য ছিল না। আমি বললাম,
বেলক, আমরা জেমলা থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরে এলাম। একটা পরিখার নিচে কি যেন জ্বলজ্বল করছিল। সাইবোক সেটা পর্যবেক্ষণ করে তথ্য পাঠালো আর সাথে সাথে মা আর সিয়ানা আমাদেরকে আন্তারেসে ফিরিয়ে নিয়ে এল।

কথাটা শুনে বেলক মনে হল একটু আশ্চর্য হল। এখানে বলি বেলক আমাদের বয়সী হলেও আমাদের মত নয়। আমরা যখন একটা কিছু দেখে খুব আনন্দ বা দুঃখ পাই আবার পরক্ষণেই ভুলে যাই, বেলক ভোলে না, তাই নিয়ে চিন্তা করে। সে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল, আমি ওর পাশে। নিচে জেমলা গ্রহ দেখা যাচ্ছে। আগেই বলেছি, আমাদের জানালাগুলো ঠিক জানালা নয়, বরং আমাদের মহাকাশযানের দেয়ালের ধারে সেগুলো ছিল টেলিভিশন স্ক্রিনের মত। আমাদের চক্রাকার টরাস আকৃতির বাসস্থান ক্রমাগতই ঘুরছে। কিন্তু জানালা দিয়ে নিচে স্থির জেমলা দেখা যাচ্ছে, সেই গ্রহ ঘুরছে না। না ঘুরলে যেরকম দেখা যেত সেরকমভাবেই দেখাচ্ছে। এর কারণ আগেই বলেছি জানালাগুলো আসলে জানালা নয়, বরং সেগুলো হল টেলিভিশন বা কম্পুটারের স্ক্রিন। আমাদের বাসস্থান না ঘুরলে যেমন বাইরেটা যেমন দেখা যেত, সেই স্ক্রিন সেভাবেই আমাদের তা দেখায়।         

সেদিকে তাকিয়ে বেলক কিছুটা আনমনাভাবেই বলল,
কি আছে এই গ্রহতে যাতে বড়রা এত ভয় পেল? আমাদের সঙ্গে বেলক জেমলাতে যায় নি, ওর যাবার কথা ছিল আগামীকাল। আমি বললাম, চলো, খাবারের সময় হয়ে গেছে, পরে এই নিয়ে ভাবা যাবে।

খাবারের জায়গাটা লাইব্রেরির পাশেই। সেখানে যেয়ে দেখি লাহে, এমা, ইলিয়াল, মালাই, তিলাই সবাই এসে গেছে। দূরে আর একদল ছেলে মেয়ে ক্লাভান, মিলা, রিনা, লেনাক এরা সব জটলা করছে। আগামীকাল ওদের জেমলাতে যাবার কথা। বড়রা কেউ নেই। এই সময়ে কারুর না কারুর থাকার কথা খবরদারি করতে। লাহে, এমা আর ইলিয়াল তিন বোন। অন্যদিন ওরা আমার সাথে বসে না, কিন্তু আজ তিনজনই এসে আমার আর বেলকের সাথে বসল। এর পরে দেখি মালাই আর তিলাইও এসেও হাজির। কিন্তু খাবার কোথায়? অনেক সময় সাইবোক খাবার নিয়ে আসে, অনেক সময় সাইবোকের সাথী রোবোক আসে। আজ এই দুজনের কেউই নেই। আমি বললাম,
জেমলাতে কী পাওয়া গেছে সেই নিয়ে ওরা নিশ্চয় সভা করছে।  

সব মিলিয়ে খাবার ঘরে প্রায় পঞ্চাশজন ছেলেমেয়ে। কেউ হইচই করে কথা বলছে না, কিন্তু সবার নিচুস্বরের কথা এক হয়ে একটা গুঞ্জন তুলছে। এখানেও একটা বিশাল জানালা দিয়ে নিচে জেমলা দেখা যাচ্ছে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছয়-সাতজন আঙুল তুলে জেমলার বিভিন্ন জায়গাকে একে অপরকে দেখাচ্ছে - নদী, বড় পাহাড়, সমুদ্র। মেঘে ঢেকে আছে একটা বিরাট অংশ। এইসব দেখতে দেখতে আমার খিদে পেয়ে গেল, সবারই বোধহয় একই অবস্থা। খিদের চোটে জেমলাতে যে আজ কী ঘটেছে সেটা অন্যদের সাথে আলোচনা করবারও ইচ্ছে রইল না। খাবারের হলঘরটার পাশেই একটা বড় দরজা, সেটা দিয়ে একটা সম্মেলনকক্ষে যাওয়া যায়। সেই সম্মেলনকক্ষের দরজাটা খুলে গেল। মা ও সিয়ানাসহ পাঁচজন বড়মানুষ ঢুকল, তার মধ্যে রয়েছে আমাদের মহাকাশযানের অধিনায়ক ড্রেগলস। ড্রেগলস ড্রেগলসের মতই দেখতে, অর্থাৎ তার নামটা যেমন ভয় জাগানোর চেহারটাও তেমন। আমরা তাকে সবসময় এড়িয়ে চলতাম। প্রায় দুমিটার লম্বা, চৌকো মুখ, থুতনিও কেমন জানি চ্যাপ্টা, তবে চওড়া। বড় দুটো চোখের ওপর ঘন ভুরুজোড়া, ছোট করে ছাঁটা চুল সমতল মাথার সঙ্গে লেগে আছে।

ড্রেগলস ঘরে ঢোকা মাত্র সব গুঞ্জন বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হবারই কথা, ওকে আমরা সবাই ভয় পেতাম। করিডরে দেখা হলে মুখ নিচু করে চলে যেতাম। ড্রেগলসও আমাদের কোনো সম্বোধন করত না, হ্যালো, হাই, সুপ্রভাত এসব কিছুই বলত না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম মহাকাশযানের যে সার্বিক দায়িত্বে আছে তার বোধহয় এরকমই হবার কথা - খুব কঠিন এক লোক, হাসি ঠাট্টা করা তার সাজে না। আরও একটা ব্যাপার তার কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না, এর ওপর তার স্ত্রীও ছিল না। ছেলেমেয়ে থাকলে বা স্ত্রী থাকলে সে হয়তো আমাদের সাথে সহজে মিশতে পারত এরকম একটা ধারণা আমাদের ছোটদের মধ্যে ছিল। যাইহোক ড্রেগলসের খাবার ঘরে আগমন মানে আমাদের খাবার দিতে আরো দেরী হবে এটা ধরে নিলাম। বোঝাই যাচ্ছে এতে আমার খুশী হবার কোনো কারণ নেই। সবার চোখেই দেখলাম এরকম ভাব, উফ এ লোকটা আবার এখানে কেন, পেটে তো খিদেয় ছুঁচো ডন-বৈঠক দিচ্ছে। ছুঁচো আমরা কেউ চোখে দেখি নি, কিন্তু ছবিতে তার যেরকম চেহারা দেখেছি তাতে তাকে পেটে বেশীক্ষণ রাখাটা সমীচীন হবে না।

দেখলাম ড্রেগলস কিছু বলার জন্য তোড়জোড় করছে, কিন্তু মনে হল ঠিক কি করে শুরু করবে বুঝে পাচ্ছে না। তার পাশে অন্যান্যদের সাথে মা আর সিয়ানাও দেখলাম একটু ভয়াতুর। তবে ড্রেগলস যে ছোটদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাবে সেটা আমাদের কল্পনাতেও আসে নি। অন্য একটা টেবিলে দেখলাম মিলা, রিনা আর লেনাক ফিসফিস করছে আর তাদের পাশে বসে ক্লেভান হিহি করে হাসছে। হাসিটা ড্রেগলসের কান পর্যন্ত যে পৌঁছেছে সেটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হলাম যখন সে একটু কেশে বলতে শুরু করল,
ছেলেমেয়েরা, তোমরা  অনেকেই জেমলাতে গিয়েছ। জেমলা অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতই। আমরা ভেবেছিলাম জেমলাতে স্থায়ী আস্তানা গাড়তে পারব, এটা হবে নতুন পৃথিবী। এখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ একটু বেশী, সেটা ক্ষতিকর হলেও আমরা তাকে শোধন করতে পারতাম। এখানে লতা রয়েছে, ফুল আছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এর মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর শতকরা ৬০ ভাগ। পৃথিবীর মত সমস্ত গুণ নিয়ে এরকম আর কোনো গ্রহের কথা আমাদের তথ্যকেন্দ্রে নেই।

মনে হল ড্রেগলস একটা বড় বক্তৃতা দেবার জন্য তোড়জোর করছে। এসব মনোযোগ দিয়ে শোনার মত অবস্থা আমাদের কারুরই ছিল না, সবাই উশখুশ করতে লাগল। কিন্তু মা
র দিকে চোখ পড়তে দেখলাম উনি আমার দিকে খুব শাসনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেটা দেখে আমি আমার পিঠ সোজা করে ড্রেগলসের ওপর চোখ রাখলাম, এসব করতে গিয়ে ড্রেগলসের কিছু কথা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। যখন আবার মনোযোগ দিলাম, শুনলাম সে বলছে, জেমলাতে আমরা একটা ভয়াবহ জিনিস আবিষ্কার করেছি যার জন্য খুব শীঘ্রই আমাদের জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হচ্ছে।

এটুকু শুনেই তো ভয়ে আমার পাদুটো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কী এমন জিনিস আমরা জেমলায় দেখেছি যার জন্য আমাদের পালাতে হবে? ওদিকে ড্রেগলসও দেখলাম তার তার পাদুটোকে এদিক ওদিক সরাচ্ছে, এমন যেন তার শরীরের ভর একবার ডান পা আর একবার বাঁ পায়ের ওপর রাখছে। ওরও কি পা আমার মত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে?

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ড্রেগলস বলতে আরম্ভ করে,
ছেলেমেয়েরা, পৃথিবীর মত আর একটি গ্রহ এই গ্যালাক্সিতে নেই। এর সুনীল সাগর, ধবল মেঘ, নরম মাটি, সবুজ বনের সমারোহ গালাক্সির অন্ধকারে আর একটিও পাওয়া যাবে না।  সেখানে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে পরিশ্রম করে তাদের মেধায় শ্রমে খুবই উন্নত এক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই সভ্যতা গ্যালাক্সির অন্যান্য উন্নত জীবের ঈর্ষার কারণ হয়েছে। তাই বহুকাল ধরে পৃথিবী গ্যালাক্সির নানান সভ্যতার আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। এগুলোকে ঠিক সভ্যতা বলা ঠিক হবে না, বরং এদেরকে অসভ্যতা নামে অভিহিত করা উচিত। এমনই একটি অসভ্য সমাজের নাম হল আউরেউরগথ। এদের নামটা উচ্চারণ করা যতই সহজ হোক না, এরা আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে বর্বর সভ্যতা।

আউরেউরগথ - কি খটমট নাম রে বাবা! আমরা একে অপরের দিকে চাইলাম। না, উচ্চারণ করা একেবারেই সহজ নয়। আমি নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম,
আউরেউরগথ। হয়তো একটু জোরেই বলে ফেলেছিলাম। দেখি ড্রেগলস কথা থামিয়ে আমার দিকে চাইছে। সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তো লজ্জায় একেবারে পারলে মেঝের সাথে মিশে যাই। মাথা নিচু করে আড়চোখে মার দিকে তাকালাম, দেখি মা মিটিমিটি করে হাসছেন। আমি তো আশ্চর্য! মা তাহলে রাগ করে নি।
    
ড্রেগলস আবার গলাটা পরিষ্কার করে নিল। বলতে আরম্ভ করে,
আউরেউরগথের কাজই হল উন্নত সভ্যতার গ্রহগুলিতে আক্রমণ করে তাদের প্রকৌশল লুট করা। শুধুমাত্র প্রকৌশলের মধ্যে তাদের তাণ্ডব সীমায়িত থাকলেও হত, কিন্তু তারা সেই গ্রহের অধিবাসীদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণের পরে তাদের কি হয় আমরা জানি না, হয়তো তাদের দাস বানানো হয়। দাসপ্রথা কি সে সম্বন্ধে তোমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এককালে এই ন্যাক্কারজনক অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। এমনও হতে পারে…’

পরের কথাগুলো বলতে ড্রেগলস ইতস্ততঃ করে, পাশে দাঁড়ানো অন্যান্য বড়দের দিকে চায়, তারপর বলে,  ‘…আউরেউরগথরা অন্য গ্রহের অধিবাসীদের হত্যা করে তাদের পাশবিক আনন্দ , বাক্যটা ড্রেগলস শেষ করতে পারে না। পাশবিক মানে কী, আমি ভাবি। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলে ক্যাপ্টেন নেনা, নেনা বেশ সশব্দে গলা খাঁকারি দেয়। ড্রেগলস নেনার দিকে তাকায়, বোঝা যায় ড্রেগলসের কথা নেনার পছন্দ হচ্ছে না। দেখলাম মার মুখটাও কেমন অন্ধকার, মারও ড্রেগলসের কথা পছন্দ হয় নি। নেনা হল বেলকের মা, বেলক তার সমস্ত অনুসন্ধিৎসা আর সাহস নেনার কাছ থেকেই পেয়েছে।

ড্রেগলস তার বাক্যটা আর শেষ করে না। বলে, আমরা আমাদের এই যাত্রায় আউরেউরগথদের সম্মুখীণ যাতে না হই তার জন্য সর্বরকম চেষ্টা করেছি। দু-একবার আমাদের রাডারে তাদের মহাকাশযানের চিহ্ন ধরা পড়েছিল, আমরা সুকৌশলে সেগুলো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু আজ জেমলাতে তাদের একটা কেন্দ্র আমরা আবিষ্কার করেছি। যদিও সেই কেন্দ্রে কোনো আউরেউরগথ নেই, কিন্তু জেমলার কক্ষপথে আমাদের উপস্থিতি নিশ্চয় সেই কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই মুহূর্তে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হবে, তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যেয়ে মহাকাশযানের ত্বরণের জন্য প্রস্তুতি নাও।

আউরেউরগথ! এতদিন আমাদের কেন তাদের সম্বন্ধে বলা হয় নি। তারপরই মনে হল আমাদের মন যাতে অশান্ত না হয়ে সেজন্যই আমাদেরকে আউরেউরগথ সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। আউরেউরগথ তাহলে জেমলা পর্যন্ত এসে গেছে। ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম, সেটা বেলকের দৃষ্টি এড়াল না, সে আমার হাতের ওপর ওর হাত রেখে আশ্বাস দিতে চাইল। কীরকম দেখতে আউরেউরগথরা? আমি ভাবলাম। তার কি অক্টোপাসের মত দেখতে?

এদিকে লাহে, এমা আর ইলিয়ালের মুখ দেখলাম একদম চুপশে গেছে, সেটা ভয়ে না ক্ষিদেয় বোঝা গেল না। তবে ইলিয়াল একটু জোরেই বলে ফেলল,
ক্ষিদে পেয়েছে। দেখলাম ক্যাপ্টেন নেনা সামনে এগিয়ে এল। সে বলল, ছেলে মেয়েরা, তোমাদের একটা করে খাবারের প্যাকেট দেয়া হবে, সেটা নিয়ে তোমরা ঘরে চলে যাও। ঘরে গিয়ে, ঘরের যে সমস্ত জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলো আলমারিতে তুলে তালা দেবে। মহাকাশযানের ত্বরণ-চেয়ারটিতে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নেবে। এর আগে তোমাদের খাবারের জন্য দশ মিনিট সময় দেয়া হল। আন্তারেস পনেরো মিনিটের মধ্যে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করবে। 

নেনার কথা শেষ হতে না হতেই
রান্নাঘরের দরজা খুলে গেল। সাইবোক আর রোবক একগাদা খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকে প্রতিজনকে একটা করে প্যাকেট দিতে আরম্ভ করল। আমরা প্যাকেট নিয়ে দৌড় দিলাম। দৌড় দৌড়। করিডর দিয়ে, জানালা দিয়ে নিচে জেমলা গ্রহ দেখা যাচ্ছিল।  আমার সাথে বেলকও দৌড়াচ্ছিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বেশ চিন্তিত মনে হল। আমার ঘরের আগেই বেলকের ঘর, ও বাই বলে ঢুকে গেল। আমার ঘরের সামনে আসা মাত্র দরজা নিজ থেকে খুলে গেল। আসলে এর মধ্যে তিনটে ঘর। একটা আমার, একটা বাবা মার, আর একটা পড়াশোনা করার, খেলার। বাঁদিকে বাবা মার ঘর, ডানদিকে প্রথমে পড়াশোনার ঘর, তারপর আমার ঘর, মাঝখানে একটা করিডর। শুনেছি পৃথিবীর ছোট ছোট ফ্ল্যাটবাড়ি নাকি এরকমই হয়।

আমার বাবা এই মহাকাশযানের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার, তাকে বেশীরভাগ সময়ই ইঞ্জিন ঠিকমত চলছে কিনা সেটা দেখে রাখতে হয়। উনি আবার মহাকাশযানের ত্বরণের সময় ঘরে থাকেন না। মাও এই সময়ে সে মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকেন। কাজেই আমি একাই আমার ঘরে ঢুকে ত্বরণ-চেয়ারে বসি। হাঁপিয়ে গেছিলাম পুরোই। বসামাত্র সামনে টেলিভিশনের স্ক্রিনে নিয়ন্ত্রণকক্ষ দেখা গেল। ড্রেগলস, মা, নেনা সবাই ছুটোছুটি করছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষের বিশাল স্ক্রিনে আবার বাইরের মহাকাশ দেখা যাচ্ছে। তাতে মাঝে মধ্যেই জেমলার কিছু অংশ এবং মিহির তারাটিও দেখা যাচ্ছে।

আমি খাবার প্যাকেটটা খুলে সামনের টেবিলে রাখি। খেতে আরম্ভ করি।

আন্তারেস দ্বিতীয় অধ্যায় 

আমি খেতে আরম্ভ করি। এক ধরণের মাংসের চপ, সবুজ শবজি, রাইদানার পাঁউরুটি। সাথে কমলার রস। এই মহাকাশযানে মাংস তৈরি হয় রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় - যন্ত্রে। আর শবজি ও শস্য তৈরির জন্য বড় একটি ঘর আছে, সেখানে অতিবেগুনী আলো জ্বলে, পৃথিবীর মাটিতে গাছ বেঁচে থাকে, তাতে কমলা ফলে।

খিদে পেয়েছিল, পাঁচ মিনিটে খাওয়া শেষ করে বেল্ট বেঁধে তৈরি। কিন্তু দেখলাম নিয়ন্ত্রণকক্ষের লোকেরা তখনো ছোটাছুটি করছে। এর মধ্যেই মা’র ফোন এল। ফোনে মা’র মুখ ভেসে উঠল যদিও তাকে আমি টেলিভিশন স্ক্রিনে নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম। 

মা জিজ্ঞেস করল আমার খাওয়া হয়েছে কিনা, সিটবেল্ট বেঁধে বসেছি কিনা। মহাকাশযান জুড়ে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল, এর সাথে একটা ঘোষণা, নেনার গলা চিনতে পারলাম। “সবাই প্রস্তুত হও, আন্তারেস আর দু’মিনিটের মধ্যে কক্ষপথ ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে।” এই ঘোষণার সাথে সাথেই আন্তারেসের বিশাল ইঞ্জিন গর্জে উঠ্ল এমন যেন এক দানব জেগে উঠেছে। আমি জানি কার হাতের স্পর্শে সেই বিশাল দানব গজরাচ্ছে, আমার বাবার আঙুলের স্পর্শে, বাবা হল এই মহাকাশযানের প্রধান প্রকৌশলী। 

মা’র ফোনের মধ্যেই বাবা ফোন করল। বাবা আন্তারেসের যে জায়গায় কাজ করে সেটা বেশ কঠিন জায়গা। মহাকাশযানের কেন্দ্রীয় অক্ষের কাছে যেখানে কোনো ধরনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই। কারণ সেই জায়গাটা ঘোরে না। মা’র প্রশ্নগুলোই বাবা করল, খেয়েছি কিনা, সিটবেল্ট বেঁধেছি কিনা। এইসব জিজ্ঞেস করতে করতেই দেখলাম বাবা বিশাল ইঞ্জিনঘরের ত্বরণ-চেয়ারে বসে বেল্ট বাঁধছেন। মা দেখলাম একটু উদ্বেগের সঙ্গে বাবার সিটবেল্ট বাঁধাটা দেখছেন। বাবা মাকে বলল, “চিন্তা কর না, ইঞ্জিন খুব ভাল কাজ করছে।” 

ড্রেগলস এই মহাকাশযানের অধিনায়ক হতে পারে, কিন্তু আমার বাবাকে ছাড়া আন্তারেস এক চুলও নড়তে পারবে না। আন্তারেসের হৃদযন্ত্রকে চালু রাখাই ছিল তার প্রধান কাজ, আমার বন্ধুরা তাই বাবাকে ভাবত এক যাদুকর যে যাদুকর তার অসীম জ্ঞানে মহাকাশযানের গভীর গহ্বরের বিশাল ইঞ্জিনের প্রাণ সঞ্চার করে। পৃথিবী থেকে দশ আলোকবর্ষ দূরে, কোটি কোটি কিলোমিটার পার হয়েও সেই ইঞ্জিন গজড়ে চলেছে। কিন্তু সেই ইঞ্জিন থেকে যে তেজষ্ক্রিয় কণা ও রশ্মি বের হয় তার জন্য মা সবসময় বাবার জন্য চিন্তা করত। বাবা মা’কে সান্ত্বনা দিত, বলত, ‘আমি যে পোষাক পড়ে কাজ করি তাতে শতকরা ৯৮ ভাগ তেজষ্ক্রিয়তা আটকে দেয়া যায়।’ 

মা বলত, ‘আর বাকি দু ভাগ?’ 

‘আর বাকি দুভাগ ওষুধের ওপর। আমি তো রোজই ওষুধ খাচ্ছি যাতে শরীর থেকে নষ্ট কোষগুলো সরিয়ে দেয়া যায়।’ 

মা এতে ভরসা পেত না। তেজষ্ক্রিয়তা শরীরের কোষের ক্ষতি করতে পারে, নির্দিষ্ট ওষুধ সেগুলোকে চিহ্নিত করে মেরে ফেলতে পারে। আমি জানতাম মৃত কোষ শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু নষ্ট কোষ যত যন্ত্রণার মূল। একটি নষ্ট কোষ থেকে দুটি, দুটি থেকে চারটি - এরকমভাবে অসংখ্য নষ্ট কোষের জন্ম হতে পারে, আর একেই নাকি বলে ক্যান্সার। মা বলতেন পৃথিবীতে নাকি ক্যান্সার যাতে না হয় সেজন্য অনেক বংশগতিবিদ্যার চর্চা হয়। ‘বংশগতিচর্চা’ মানে জেনেটিক্স, শরীরের কোষের ভেতর জিনকে নাকি নানাভাবে বদলানো যায়, সেসব করে ক্যানসারকে নাকি বিদায় করা হয়েছে। কিন্তু এই মহাকাশযান প্রতিনিয়তই মহাকাশ থেকে ছুটে আসা শক্তিশালী কণিকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেই কণিকারা মানুষের শরীরের ক্ষতিসাধন করতে পারে। এর জন্য আন্তারেস যানের চারদিকে সবসময় একটা প্রবল চুম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। সেই চুম্বকক্ষেত্র তড়িৎ-আধানযুক্ত কণিকাদের মহাকাশযান থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয়। কোথা থেকে আসে সেই দ্রুত কণিকারা, আমি ভাবি। 

এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে শোরগোল শোনা গেল। বাবা মা দুজনেই ফোন ছেড়ে দিল। সামনের স্ক্রিনে দেখলাম নেনা, ড্রেগলস আর বাকিরা দাঁড়িয়ে কক্ষের বড় স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনটায় জেমলা গ্রহের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। বহু দূরে দিগন্ত, সেই দিগন্তের বায়ুমণ্ডল লাল, আমাদের পেছনে মিহির তারা অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু এছাড়াও দিগন্তের ধারে একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু সেটা যে তারা নয় সেটা নিয়ন্ত্রণকক্ষের সবার ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। ড্রেগলসের গলা শোনা গেল, সে চিৎকার করছে, তমাল, ওদের এখানে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে?” তমাল এক জাহাজের সুরক্ষার ব্যাপারটা দেখে। সে একাধারে বিজ্ঞানী আর সেনা-অফিসার। তমাল পনেরো সেকেন্ড সময় নিল, কম্পুটার ঘেঁটে উত্তর দেয়, “ওরা যদি এই গতি বজায় রাখে তাহলে কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট।”

ওরা কারা? ভয়ে সিঁটিয়ে যাই আমি চেয়ারের সাথে? আউরেউরগথ? ঐ উজ্জ্বল আলোটা কি আউরেউরগথদের মহাকাশযান? কুড়ি মিনিটের মধ্যে নিশ্চয় আমরা কক্ষপথ ত্যাগ করতে পারব, কিন্তু তার আগে যদি ওরা আমাদের দিকে লেজার, মিজাইল বা রকেট-জাতীয় কিছু নিক্ষেপ করে? সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার তো কোনোই ব্যবস্থা নেই আমাদের যানে। নাকি আছে? ছোটদের তো অনেক কথাই বড়রা বলে না। 

মিহির গ্রহের দিগন্তের তারাটা উজ্জ্বল থেক উজ্জ্বলতর হতে থাকে। আর একটি মহাকাশযান? আমার এই বারো বছরের জীবনের অন্য কোনো যান আমদের পথে পড়ে নি, এই অনন্ত মহাকাশে আমরা একাই চলেছিলাম। নিশ্চয় এটা একটা মহাকাশযান, কিন্তু সেটা যে আউরেউরগথদেরই হবে সেটা সম্বন্ধে ড্রেগলস এত নিশ্চিত হল কেমন করে? 

দেখলাম ড্রেগলস বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ইঞ্জিন তৈরি। এরপর নেনা ড্রেগলসকে কি যেন বলল। তারপরই নেনার কথা আমার ঘরের লুকানো স্পিকারে ধ্বনিত হল, “আন্তারেসের অভিযাত্রীরা, প্রস্তুত হও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা কক্ষপথ ত্যাগ করব।”

এর পরে কী হবে আমি জানতাম। আমরা যেখানে থাকি, সেই ঘুরন্ত অংশ ধীরে ধীরে তার ঘোরা বন্ধ করে দেবে, উচ্চ ত্বরণের সময় কোনো কিছুর ঘোরা চলবে না। নেনা বলতে থাকে, “কক্ষপথ ত্যাগ করার আগে আমরা মহাকাশযানের মূল চক্রের ঘূর্ণন বন্ধ করে দেব, এর ফলে যাত্রীরা ভারহীন হয়ে যাবে। আশা করি তোমরা সবাই সিটবেল্ট বেঁধেছে। এরপরে সিট স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমাদের জাহাজ যেদিকে ছুটবে সেদিকে ঘুরে যাবে। শুরুতে মহাকাশযানের ত্বরণ হবে প্রতি বর্গ সেকেন্ডে দশ মিটার যা কিনা পৃথিবীর বুকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান। এর ফলে যাত্রীরা আবার তাদের ওজন ফিরে পাবে। এরপরে আমাদের ত্বরণ প্রতি বর্গ সেকেন্ডে কুড়ি মিটার হবে, তখন আমাদের ওজন দ্বিগুণ হবে।”

স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ড্রেগলস, নেনা আর আরো অনেকে চেয়ারে বসে তাদের স্বয়ংক্রিয় সিটবেল্টটা চালু করছে। একটা যান্ত্রিক ভোঁতা শব্দ বাইরে থেকে ভেসে এল, আমাদের বাসস্থান চক্রটা তার ঘূর্ণন থামাচ্ছে। আমি জানি এই থামানোর কাজটা সহজ নয়, এত বিশাল একটা স্থাপনার গতিজাড্য অনেক, তাকে থামাতে হলে - মহাশূন্যে তার ঘূর্ণন বন্ধ করতে হলে - কেন্দ্রীয় অক্ষের সাথে যুক্ত আর একটি চক্রকে উল্টো দিকে ঘোরাতে হবে। আমাদের বাসস্থানের চক্রাকার গতি যত কমে এল, আমার ওজন তত কমা শুরু হল। চার মিনিট মত সময় লাগল চক্রটার থামতে। তত্ক্ষণে আমি নিজের ভারহীন অবস্থাটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। সিটবেল্ট না বাঁধা থাকলে তো ঘরের মধ্যে ভেসে ভেসেই বেড়াতে পারতাম। 

নেনার গলা ভেসে আসে, “রওনা হতে এক মিনিট।” 

ইঞ্জিনের গর্জন আরো প্রকটিত হয়। থর থর করে কাঁপে মহাকাশযানের বিশাল দেহ। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের আগে অনেকবার হয়েছে, কিন্তু এই প্রথমবারের মত আমরা ছোটরা একা একা নিজেদের ঘরে বসে এই ত্বরণের মধ্যে দিয়ে যাব। অন্য সময় আমার সবাই নিয়ন্ত্রণকক্ষের পাশেই একটা বড় ঘরে একসাথে বসি ত্বরণের সময়। কিন্তু আজ সময় ছিল না সেই কক্ষে যাবার। অন্যসময় আমি এতে ভয় পাই না। কিন্তু আজ আন্তারেসকে ধরতে আউরেউরগথদের একটা যান জেমলার অন্যদিক থেকে বের হয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমি সেটাকে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মা নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে নিশ্চয় ওদের দেখতে পাচ্ছে, না হলে এত তাড়াহুড়ো করে আমরা কেন জেমলা ছেড়ে যাব, বিশেষতঃ যখন জেমলা অনেকটা পৃথিবীর মতই দেখতে ছিল। আমরা তো এখানে থাকতেই পারতাম। 

আমি জানতাম জেমলা তার সূর্য মিহিরের চারদিকে সেকেন্ডে ৪০ কিলোমিটার বেগে চলছে। আন্তারেস যেহেতু জেমলার কক্ষপথে সেজন্য আন্তারেসের গতি ইতিমধ্যে সেকেন্ডে ৪০ কিলোমিটার আছে, কিন্তু মিহিরের মাধ্যাকর্ষণ থেকে বের হবার জন্য আন্তারেসের সেকেন্ডে ১০০ কিলোমিটার গতি পেতে হবে। সেটা এই মহাকাশযানের জন্য এমন কিছু নয়, কারণ প্রয়োজনে আন্তারেস আলোর গতির এক দশমাংশ, অর্থাৎ সেকেন্ডে ৩০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি সঞ্চার করতে পারে, তবে সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। 

আবার নেনার কন্ঠ, “প্রস্তুত! দশ সেকেন্ড কাউন্ট-ডাউন। দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন , দুই, এক, শূন্য - শুরু।” 

থরথর করে কাঁপে মহাকাশযান। আমার ভয় করে, এই প্রথমবার মা বা বাবা কেউ সাথে নেই। আমি দু হাত দিয়ে চেয়ারের নিচটা চেপে ধরি। ধীরে ধীরে আমার শরীর চেয়ারের পেছনের দিকে চেপে বসে। সামনের স্ক্রিনে জেমলা গ্রহ ভেসে ওঠে - নীল, সবুজ আর কমলা রঙের সমন্বয়। প্রথমে মনে হল গ্রহটি যেন আমাদের পিছু নিয়েছে, তার আয়তন কমছে না। তারপর খুব ধীরে সেটি ছোট হতে থাকল। মা’র মুখ ভেসে উঠল স্ক্রিনের এক কোনায় - “ভাল আছিস তো, শোগি মা?” আমি বললাম, “আছি, তুমি কখন ঘরে আসতে পারবে?’ মা বলল, “আরো পাঁচ-ছ ঘন্টা লাগবে। তুই এর মধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠিস না। দেখ কোনো ছবি-টবি পাস কিনা এর মধ্যে দেখার মত।” 

আউরেরগথরা পিছু নিয়েছে, এর মধ্যে কি আর ছবি দেখার অবস্থা আছে! তবু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলাম, “মিরা, ভাল একটা ছবি দেখাও তো যেটা আমি এখনো দেখি নি।” স্ক্রিনে একটি বেশ বয়স্কা মানুষের মুখ ভেসে উঠল। ওঁর নাম হল মিরা। মিরা বলল, “তোমাকে কতবার করে বলেছি আমাকে আপনি করে সম্বোধন করবে।” বললাম, “ভুল হয়ে গেছে, আপনাকে তো সবসময় দেখতে পাই নি।” মিরা হাসল, তারপর বলল, “আমি ঠাট্টা করছিলাম, আসলে আমাকে তুমি করেই বল। তোমাকে মনে হয় আমার নাতনী।” 

কেমন করে একটা ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক আমাকে নাতনী ভাবতে পারে সেটা নিয়ে আমি কোনোদিন মাথা ঘামাই নি। কিন্তু স্ক্রিনে মিরার মুখটায় এমন একটা সহৃদয়তা আছে সেটা সবাইকে কাছে টানবে। তার গালে ও কপালে পোড়া চামড়া কুঁচকেছে, কপালের ওপরে সাদা চুল। সে বলে, “মা বুঝি ব্যস্ত? আমাদের মহাকাশযান জেমলা গ্রহ ছেড়ে চলে যাচ্ছে?” আমি বললাম, “সবে ছাড়ছে, আউরেউরগথরা আমাদের পিছু নিয়েছে।” 

আউরেউরগথ নামটা শুনে মিরার মুখটা কেমন জানি অন্ধকার হয়ে গেল। “আউরেউরগথ?” সে যেন স্বগোতিক্ত করল। তারপর বলল, “আউরেউরগথরা এখানে কেমন করে এল?” মিরার থমথমে মুখ দেখে আমি খুব ভয় পেলাম, কিন্তু আমার ভয়ার্ত মুখ দেখেই মিরা তাড়াতাড়ি বলল, “ওঃ, কোনো চিন্তা কর না, আন্তারেস খুব শক্তিশালী মহাকাশযান, ওরা আমাদের কিছু করতে পারবে না।” এট্কু বলে মিরা কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়, আমি জানি ঐটুকু সময়ের মধ্যে ও আন্তারেসের সমস্ত কথাবার্তা, বিভিন্ন স্ক্রিনের ভিডিও সব দেখে নিল মহাকাশযানের ইলেকট্রনিক তথ্যলাইনে, ব্যাপারটাও বুঝে নিল। হয়তো মা কী করছে এখন সেটাও দেখল, তারপর আমাকে বলল, “ঠিক আছে, আমরা একটা সিনেমা দেখি?” আমি বললাম, ‘আমাকে পৃথিবীর কোনো পুরোনো কাহিনী দেখাও।’ মিরা বলল, ‘তুমি কি আশ্চর্যদেশে অ্যালিস ছবিটা দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘বোধহয় দেখেছি, কিন্তু আমি ওরকম রূপকথা জাতীয় কিছু দেখতে চাই না। আমাকে বরং কোনো অ্যাডভেঞ্চারের ছবি দেখাও। মিরা হেসে বলে, “অ্যালিসের কাহিনী ঠিক রূপকথা নয়, তবে ঠিক আছে, তোমাকে দেখাই নেপচুনের অভিযান। আগে দেখেছ কখনো?” 

না, ‘নেপচুনে অভিযান’ আমি আগে দেখি নি। জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কত পুরনো বল তো? তুমি তো আবার সেই সেকেলে সব ছবি পছন্দ কর।” মিরা হাসে, বলে, “তা শ পাঁচেক বছর তো হবেই। দেখ, ভাল লাগবে।” 

নেপচুনের অভিযান শুরু হল, কেমন করে একদল মহাকাশযাত্রীরা নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটনের পাশ দিয়ে গিয়েছিল, তারপর তাদের একজনের মাথা খারাপ হল, তাতে কি সব বিপর্যয় হল, ইত্যাদি। আধঘন্টা দেখে মিরাকে বললাম, “এসব আমার একেবারেই পছন্দ নয়।” এই বলতে না বলতেই মহাকাশযান ভীষণ ঝাঁকুনি খেল, স্ক্রিনে মা’র মুখ ভেসে উঠল, উদ্বিগ্ন। “শোগি মা, ঠিক আছিস তো?” আমি বললাম, “কি হচ্ছে মা?” মা বলল, “আউরেউরগথরা আমাদের পেছন ছাড়ে নি। তারা লেজার দিয়ে আমাদের ইঞ্জিন বিকল করে দেবার চেষ্টা করছে।” মা’র কথা শেষ হতে না হতেই আমি বুঝলাম আন্তারেস তার গতিপথ বদলাচ্ছে, আমার চেয়ার আমাকেসহ ঘুরে গেল, আমার পিঠ সেঁটে গেল চেয়ারের সাথে, আমরা খুব জোরে ত্বরাণ্বিত হচ্ছি। বুঝলাম এই ত্বরণটা অধিনায়ক ড্রেগলসের পরিকল্পনায় ছিল না। বাবার জন্য খুব চিন্তা হল, বাবা তো ইঞ্জিনের ওখানেই বসে আছেন। মা’কে জিজ্ঞেস করলাম বাবার কথা। মা বলল, ‘চিন্তা করিস না, শোগি। বাবা যে ঘরে আছে সেটা খুব মজবুত জায়গা, লেজার কিছু করতে পারবে না।’ 

“আউরেউরগথদের মহাকাশযানটা কি স্ক্রিনে দেখান যাবে?” প্রশ্ন করি মা’কে। “না’রে, এখন এসব দেখিয়ে তোদেরকে আরো ভয় পাইয়ে দিতে চাই না। চিন্তা করিস না, আমাদের ইঞ্জিন খুব মজবুত, ওদের লেজার কিছু করতে পারবে না।” এদিকে মহাকাশযানের ত্বরণ আমাকে আর কথা বলতে দিচ্ছিল না, মা’র মুখটাও দেখলাম কেমন চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। মা ফোন রেখে দিল। 

আমার স্ক্রিনে মহাকাশের কালো ভেসে উঠল, আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেদিকের চিত্র। নিকষ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে কিছু তারা, আমি জানি আমরা যাচ্ছি কালপুরুষের নক্ষত্রমণ্ডলীর বাহুর দিকে। আবারো একটা বড় ঝাঁকুনি, আউরেরগথরা নিশ্চয় ইঞ্জিনে আঘাত করছে। মিরাকে ডাকলাম, তার মুখ স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই জিজ্ঞেস করলাম, “আমার বাবা ঠিক আছেন তো?” মিরা তার দু-চোখ মুহূর্তমাত্র বুঁজল, তারপর চোখ খুলে বলল, “ইঞ্জিনের অংশ খুব সুরক্ষিত, কোনো ক্ষতি হয় নি, তোমার বাবাও ভাল আছেন।” 

“কিন্তু ওরা শুধু ইঞ্জিনকে বিকল করে দিতে চাইছে কেন?” প্রশ্ন করি।
মিরার চোখে একটা ত্রাসের চিহ্ন সেকেন্ডখানেক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। সে বলল, “শোগি, আউরেরগথরা গ্যালাক্সিজুড়ে ঘোরে অন্য সভ্যতার মহাকাশযান দখল করার জন্য যাতে তারা সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। আর সেই যানের মানুষদের বা অন্য গ্রহান্তরীদের আটক করে দাস বানায়। সেজন্য তারা আন্তারেসের ইঞ্জিন নষ্ট করে দিতে চাইছে যাতে এই মহাকাশযানটি মানুষসহ তারা পেতে পারে।” 

মিরার কথাটা শেষ হতে না হতেই আমার শরীর প্রচণ্ডভাবে সিটের সঙ্গে সেঁটে গেল, বুঝলাম আন্তারেস ত্বরাণ্বিত হচ্ছে, গতিবেগ বাড়ছে খুব দ্রুত। মনে হল প্রতি সেকেন্ডে অন্তত সেকেন্ডে ৩০ মিটার করে গতিবেগ বাড়ছে, অর্থাৎ পৃথিবীবুকের ত্বরণের তিনগুণ, তার মানে আমার ওজনও বেড়েছে তিনগুণ। আউরেরগথরাও কি এই ত্বরণের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে? আর আমরাও কি এই তিনগুণ ওজন বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারব? 

মিরা বলল, “আউরেরগথ মহাকাশযান পিছিয়ে পড়ছে।” 

স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। 


আন্তারেস সে যাত্রায় আউরেউরগথদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল, কিন্তু জেমলার মতন অমন সুন্দর একটা গ্রহ থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। মিহির তারার সৌরজগৎ ছেড়ে আসার পরে আমরা বহুদিন অন্ধকারে চললাম। নেনা আমাদের জানাল যে আমাদের সামনে আর একটি ছোট লাল বামন তারা পাওয়া গেছে, তার চারিদিকে একটি সৌরমণ্ডলীও আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে আরো একটা বছর লাগবে। সেই একটা বছরে আমি অনেক কিছু শিখলাম। মা’র কাছ থেকে পিয়ানো আর পদার্থবিদ্যা, বাবার কাছ থেকে গিটার আর প্রকৌশলবিদ্যা, বেলকের কাছ থেকে অঙ্ক আর ইতিহাস। এসবের ওপর আবার পরীক্ষা দিতে হত স্কুলে। সিয়ানা নিত আমাদের পরীক্ষা। এতদিন পরে মনে হয় ঐ একটা বছর আমার ছোটবেলার সবচেয়ে সুন্দর সময়। বাইরে অনন্ত অন্ধকার থাকলেও, ঐ মহাকাশযানের ভেতর আমরা যে পৃথিবী গড়ে তুলেছিলাম তা হয়তো আসল পৃথিবীতে বেড়ে ওঠার স্বাদটা দিত। আমরা খেলা করতাম একটা ছোট হ্রদের পাশে বালুকাবেলায়। সেই হ্রদে ছোট ঢেউ সৃষ্টি করা হত। অনেক সময় বৃষ্টি পড়ত সেখানে, বাজ পড়ার শব্দ হত। একটা ছোট স্রোতস্বিনী এসে পড়ত সেই হ্রদে, তাতে পাথর ছিল। সেই স্রোতের উৎস ছিল আর একটি বড় ঘর যেখানে ছিল একটা ছোট বন। আমরা সেখানে লুকোচুরি খেলতাম। মহাকাশে নিরাপত্তায় আমরা মাঝে মাঝে ভাবতাম পৃথিবীর কথা, সেই পৃথিবী তখন আউরেরগথদের হামলায় বিপর্যস্ত।


আন্তারেস তৃতীয় অধ্যায়

এর মধ্যে আমি যে কত বই পড়লাম। একটা বই ছিল আমার খুব প্রিয়, প্রথম প্রথম যখন পৃথিবী থেকে বিভিন্ন গ্রহে মানুষ যাওয়া শুরু করল সেই সময়ে এই বইটা লিখেছিলেন তখনকার এক বিখ্যাত নভোচারী। সেই বইয়ের এই লাইনক’টি আমার মাথায় সবসময় ঘুরত - “অনেকে মনে করে মহাকাশ যাত্রার মত বড় অ্যাডভেঞ্চার আর হতে পারে না। তারা মনে করে নিকষ কালো অন্ধকারে অভিযানের সাথে সবসময় একটা রোমাঞ্চকর সঙ্গীত বাজতে থাকে যা কিনা সেই যাত্রাকে অর্থময় করে, তাকে প্রাণপূর্ণ করে।
কিন্তু অনন্ত অসীম মহাকাশের নিঃসঙ্গতা নিতান্তই অনুর্বর, সেই প্রকৃতি ক্ষমাহীন, সে সঙ্গীত বুঝতে অক্ষম। দিকহীন আঁধারে যে দু-একটা নক্ষত্র টিমটিম করে সেগুলো মানুষের প্রাণকে প্রজ্জ্বলিত করতে পারে না।
তখন এই ছোট মহাকাশযানে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে উদ্ভূত তার অদম্য ধৈর্য।” 

মা’কে আমি লাইনগুলো দেখালে মা বলল, “এসব পড়ে তোর যেন আবার মন খারাপ না হয়।” 

আসলে মন আমার খারাপ হত না। পৃথিবীকে আমি দেখিনি, পৃথিবীর মাটিতে আমি কোনোদিন পা ফেলি নি, যদিও মহাকাশযানে যে বিষুবীয় অরণ্য আছে সেটার মাটি নাকি পৃথিবী থেকে আনা। সেই অরণ্যের ঘরে আকাশ-ছোঁয়া গাছ ছিল যার নাম হল সেইবা। আকাশ-ছোঁয়া বলছি, মহাকাশযানের বাইরে অনন্ত আকাশ, ভেতর তো বদ্ধ, তবু হলোগ্রামের যাদুতে মনে হত গাছগুলো অনেক উঁচু, তাদের ওপর মেঘ ভাসছে, তার ওপরে নীল নীল আকাশ। অনেক সময় মেঘ থেকে বৃষ্টি হত। মা বলত ঐ ঘরটা তাকে আমাজনের জঙ্গলের কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে সেখানে নাকি বৃষ্টি পড়ে অঝোর ধারায়, ঐ ঘরে যেরকম টিপিটিপি বৃষ্টি পড়ে সেরকম নয়। এই বলে মা বৃষ্টির গান গাইতেন, বৃষ্টির কবিতা পড়তেন, “বাদলের ধারা ঝরে ঝরোঝরো…” 

এরকমভাবেই চলছিল। একদিন স্কুলে যেয়ে দেখি কি কারণে সিয়েনা আসে নি। সিয়েনার তিন মেয়ে লাহে, এমা আর ইলিয়াল এসে বলল তাদের মা’কে নাকি ড্রেগলস কি একটা জরুরী কাজে ডেকে নিয়ে গেছে। স্কুল হবে না, আমরা তো খুব খুশী। মালাই বলল, “চল সবাই সমুদ্রের তীরে যাই।” মহাকাশযানের একটা অংশে একটা বিরাট ঘরের একাংশ বিষুবীয় অরণ্য, আর তার পাশেই একটা ছোট জলাশয়, আমরা তার নাম দিয়েছিলাম সমুদ্র। আমাদের মধ্যে কেউই সমুদ্র দেখে নি, ছবিতে যা দেখেছি তার সঙ্গে এই ছোট জলাশয়ের তুলনা হয় না, তবু দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে আমরা তার নাম দিয়েছিলাম প্রশান্ত মহাসাগর। তবে ঐ জলাশয়ে নেমে সাঁতার কাটা যেত। সেখানে ঢেউও থাকত। আর ঐ ঘরের পাশেই ছিল বিষুবীয় অরণ্য। আমরা মালাইয়ের প্রস্তাবে রাজী হলাম। ঘরে গিয়ে সাঁতাড়ের পোষাক নিয়ে আসব বলে আমরা স্কুল ছেড়ে করিডর দিয়ে যে যার ঘরের দিকে রওনা দিলাম। 

আমাদের ঘরের সামনে আসতেই দরজা খুলে গেল। এ'সময়ে বাসায় কেউই থাকে না, মা থাকেন মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে, বাবা ইঞ্জিনের ঘরে। কিন্তু দেখলাম মা-বাবার ঘরটার দরজা খোলা। ভাবলাম মা কোনো কারণে ঘরে এসেছেন। আমি করিডর দিয়ে এগোই, দেখি মা’র পা-দুটো দেখা যাচ্ছে। হালকা কাপড়ের জুতো মায়ের পায়ের পাতা ধরে রেখেছে, একটা ঘন নীল স্কার্ট হাঁটু ছাড়িয়ে মিলিয়ে গেছে হাঁটুর নিচে। দেখলাম মায়ের দুটো হাত কী যেন একটা ধরে রেখেছে। কোনো কিছু ধরে থাকার মধ্যেও মা’র একটা শৈলী আছে, পেলব আঙুলগুলো আলতো করে ধরে রেখেছে গোলাকার একটা কিছু। গোলাকার, আর এক পা এগোতেই বুঝলাম সেটা হল একটা মাথা। মাথা? মাথার পেছন দিক - লম্বা কালো চুল খোপা করা, অনেকটা মা’র মতই। আর এক পা এগোতেই মা’র পুরো শরীরটা দেখা গেল। কিন্তু মা’র ধরের ওপর কোনো মাথা ছিল না। মা’র মাথাহীন দেহ তার দুটি হাত দিয়ে একটা মাথা ধরে বসেছিল। শরীরের শীতলতা মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, “মা আ আ আ আ আ আ আ আ আ,’ আমার চিৎকারে এক অসামান্য আতঙ্ক বাড়ে সহস্র গুণ। খাটে বসা মুণ্ডুহীন দেহটি দাঁড়িয়ে যায়, তার হাতে ধরা থাকে মা’র মাথা। কিন্তু সেই দেহ তো আমার মা’রই। নাকি না? আমি কিছু বুঝতে পারি না। আমি চিৎকার করি, পেছনে হটি। আমি দেখি পেলব দুটি হাত মাথাটাকে ঘুরিয়ে দেয়, মাথার সামনে বসানো মা’র সুন্দর দুটি চোখ, তাতে পলক পড়ে, আতঙ্কে বিস্ময়ে বিস্ফারিত ছিল চোখদুটি। কিন্তু তবু তা ছিল কমনীয়। মা’র চোখকে কি আমি ভুলতে পারি? চোখের নিচে খাড়া নাকের নাসারন্ধ্রদুটি নিশ্বাসে প্রশ্বাসে কমছিল ফুলছিল। যে মাথা দেহের সঙ্গে যুক্ত নয় সে কেমন করে শ্বাস নেয় - সেই আতঙ্কেও ক্ষণিকের জন্য হলেও এই চিন্তা আমার মাথা এসেছিল। নাকের নিচে লাল লিপস্টিকের ঠোঁট। দেখলাম ঠোঁটদুটি খুলে গেল। সেখান থেকে ভেসে এল যেন আর্তনাদ, “শোগি, মা আমার! শোগি, ভয় পেও না মা!” 

আমি দুহাত দিয়ে আমার মাথা চেপে ধরি। আমার মুখ দিয়ে শুধু ‘আ আ’ ধরণের একটা গোঙানি বের হয়। আমি দেখি দেহটির দুটি হাত মা’র মাথাকে দেহের ওপর বসাচ্ছে। আমি পেছন হটতে থাকি, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। পালাতে হবে, এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কোথায়, মা’র কাছে? কিন্তু মা কোথায়? এই ভীষণ দানব তো আমার মা নয়। কোনরকমে উঠে আমাদের বাসা থেকে করিডরে বের হয়ে আসি। পেছনে মা’র গলা যেন শুনি, “শোগি দাঁড়া, শোগি কোথাও যাস না, শোগি আমাকে ভুল বুঝিস না। শোগি আমি তোর মা।” 

ততক্ষণে আমি করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। ইঞ্জিনঘরে বাবার কাছে যেতে হবে ভাবি। কিন্তু ইঞ্জিনঘরে যাওয়া সহজ নয়, সেটা মহাকাশযানের আবাসিক অঞ্চলের বাইরে, সেখানে কৃত্রিম মহাকর্ষ নেই, সেখান ঢুকতে হলে বিশেষ অনুমতি লাগবে। কিন্তু বাবাকে তো এই খবরটা দিতে হবে। মা কোথায় গেল আমার? দৌড়াতে দৌড়াতে কাঁদতে কাঁদতে “হ্যালো হ্যালো” বলি দুবার, এতে বুকে লাগানো ফোন সক্রিয় হয়। “বাবা, বাবা” বলতেই বাবা ফোনে উত্তর দেন, “শোগি?” “বাবা,” হাঁপাতে হাঁপাতে বলি, “বাবা, মা’র যেন কি হয়েছে। বাবা, মা’র মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু সেই মাথা কথা বলছে। বাবা, আমি বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে।” 

আমি কোনো উত্তর পাই না। মনে হল বাবা যেন কী ভাবছে, হয়তো আমাকে বিশ্বাস করছে না। তারপর তার গলা শুনি, “শোগি, তুমি কি ঠিক দেখেছ, এটা তোমার মনের ভুল নয়তো।” “না, বাবা, আমি ঠিক দেখেছি,” কাঁদতে কাঁদতে বলি। আর একটু থেমে বাবা বলে, ‘শোগি তুমি ঘরে ফিরে যাও, আমি এখনই আসছি।’ 

“আমি ঘরে ফিরতে পারব না, বাবা। তুমি তাড়াতাড়ি এস, আমি সমুদ্রতীরে যাচ্ছি,” কেঁদে বলি আমি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি করিডরের অন্যপ্রান্তে মা দৌড়ে আসছে আমার দিকে। তার দেহের ওপর মাথা ঠিকই আছে। 

আমি দৌড়ে সমুদ্রতীরের ঘরটায় ঢুকি। ঢোকামাত্র সমুদ্রের গর্জন আর গাঙচিলের ডাক আমার কানে আছড়ে পড়ে। দূরে বালির ওপর লাহে, এমা আর মালাই বসে আছে। ইলিয়াল জলে, তিলাইকে দেখলাম না। বালির ওপর দৌড়াতে আমার অসুবিধা হচ্ছিল। লাহেদের কাছে পৌঁছে আমি নিচে পড়ে গেলাম, সারা মুখে বালি লাগল। আমি ততক্ষণে চিৎকার করে কাঁদছিলাম, বলছিলাম, “আমার মা’র যেন কি হয়েছে। আমার মা আর মা নেই।” ওরা তো কিছুই বুঝল না। বোঝার কথাও নয়। আমি বালি থেকে মাথাটা তুলে পেছনের দরজাটা দেখলাম। সেটা এখনো বন্ধ, মা তাহলে আমাকে অনুসরণ করে নি। না, সেই জিনিসটাকে আমি মা কেন বলছি। আমার মা কোথায় গেল? 

আমার ফোন বেজে উঠল। বাবার ফোন। বাবা বলল, “শোগি, তুই সমুদ্রতীরেই থাক, আমি আসছি। ভয় পাস না।” এর মধ্যেই বেলক ঢুকল ঘরে। সবাই একসাথে চিৎকার করে তাকে বলল, “শোগির মা’র যেন কি হয়েছে।” বেলক এসে আমার পাশে বসে। বলে, “কি হয়েছে ইন্দল সানের?” আমি প্রায় মিনিটখানেক কিছু বলতে পারি না। ফুঁপিয়ে কাঁদি। ওদের সব বলি, কিন্তু বুঝি ওরা কেউই আমার কথা বিশ্বাস করছে না। বেলক বলল, “এ সব তোমার মনের ভুল, শোগি। হ্যালুসিনেশন। তোমার মা’কে আমি ডাকছি বেতারে। তাকে দেখলেই তোমার ভুল বুঝতে পারবে।” 

আমি বেলকের হাত চেপে ধরি। “না, কোনোভাবেই নয়। তাকে ডেকো না এখন। বাবা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।” 

কিন্তু বাবা আর এলেন না। তার বদলে মিনিট দশেক পরে সমুদ্রের ঘরে ঢুকল নেনা আর তমাল। বেলকের মা নেনা হল এই জাহাজের সহঅধিনায়ক আর তমাল জাহাজের প্রতিরক্ষা সুরক্ষা এইসব ব্যাপার দেখে। ওরা এসে আমাকে ছাড়া সবাইকে যে যার ঘরে চলে যেতে বলল। বেলক বলল, “কেন আমরা ঘরে যাব কেন। শোগির মনের ওপর অনেক চাপ। আমরা এখানেই থাকব।” নেনা বলল, “বেলক, এটা আমাদের মহাকাশযানের প্রটোকল। শোগির বাবা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শোগির হ্যালুসিনেশন হয়েছে। অনন্ত মহাকাশে এরকম হয়ে থাকে। তার মনস্তাত্বিক পরীক্ষা হওয়া দরকার।” 

আমার মাথা ঠিক ছিল না, কিন্তু নেনার ‘অনন্ত মহাকাশ’ কথাটা শুনে খটকা লাগল। অনন্ত মহাকাশে কি সব মা’ই হারিয়ে যান? 

বেলক গজগজ করল, কিন্তু নিজের মা’র কথার ওপর কিছু বলতে পারল না। 

আমাকে নেনা বালি থেকে তুলে জড়িয়ে ধরল। বলল, “তুমি ঘাবড়িও না, শোগি। আমরা এই যাত্রায় যে কত কিছু দেখেছি, সবই মনের ভুল।” আমি কান্না-জড়ানো গলায় বললাম, “আমার মা কোথায়?” নেনা বলল, “তোমার মা’কে আমরা আসতে নিষেধ করেছি। তুমি কী দেখতে কী দেখেছ? তোমার মা’কে আবার এখন কীভাবে দেখবে কে জানে। আগে তোর শান্ত হওয়া প্রয়োজন।” 

আমি নেনার কথা বুঝলাম না, কিন্তু নেনা এমনই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যে তাঁর কথার ওপর কথা বলার সাহস কারুর হয় না। তমাল আমাকে পাঁজা করে তুলে সমুদ্রঘরের বাইরে নিয়ে এল। করিডর দিয়ে ওরা হাঁটছে, সেই হাঁটা আর শেষ হয় না। আমি ভাবছি ওরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে হাসপাতাল পার হয়ে ‘খেলাঘর’ নামে একটা ছোট ঘরে আমরা ঢুকলাম। এই ঘরটা ‘খেলাঘর’ নাম হলেও আমার এখানে কখনো খেলতে আসি নি। কেন জানি এই ঘরটা সম্বন্ধে আমাদের তেমন কৌতূহলও হয় নি। ঘরে ঢুকে দেখি আমার সব প্রিয় খেলনা সেখানে। দেয়ালে একটা পাহাড়ের ছবি। আমি বললাম, “বাবা কোথায়। বাবাকে ডাক।” নেনা বলল, “তোমার বাবা একটু পরেই আসবে।” 

ওরা আমাকে ঘরের একদিকে একটা বড় বিছানায় শুইয়ে দিল। বিছানাটা যে কি আরামের! সেখানে শোয়া মাত্রই আমার চোখ জড়িয়ে এল ঘুমে। কিন্তু আমি তো ঘুমাতে চাইছিলাম না। “বাবা কোথায়?” বলার চেষ্টা করলাম। মুখ থেকে ‘বাব্বা’ এরকম কিছু একটা বের হল। দেখলাম নেনা আর তমাল আমার ওপর মুখমণ্ডলের কাছে এসে কী যেন দেখতে চাইছে, তাদের সাথে মনে হল আরো একজন। আমার মা? তারপর তারা ঘরের কোনায় চলে গেল। তাদের সাথে আরো একজন যোগ দিল। কে - বাবা? কিন্তু ওরা ফিসফিস করে কথা বলছে কেন? আমি চিৎকার করে সেটাই জিজ্ঞেস করতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে স্বর বের হল না। আমি একটা স্বপ্নে তলিয়ে যেতে থাকলাম। স্বপ্ন নয় দুঃস্বপ্ন। স্কন্ধকাটা মা আন্তারসের করিডরে আমার পেছনে ঘুরছে, আমাকে ডাকছে - ‘শোগি, শোগি’। আমি পালাতে চাইছি, কিন্তু আমার পা’র মাংসপেশী বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এক করিডর থেকে আর এক করিডরে লুকাতে চাইছি। অবশেষে একটা অন্ধগলি করিডরের শেষ প্রান্তে আটকা পড়লাম। সেখানে ছিল একটা প্রকাণ্ড কাচের জানালা, তাই দিয়ে মহাশূন্যের কালো দেখা যাচ্ছিল। সেই কালোতে আমি দেখলাম একটা আলোর বিন্দু, জ্বলছে আর নিভছে। আর একটি মহাকাশযান? স্বপ্নের মধ্যেও বুঝলাম আউরেরগথরা আমাদের পিছু ছাড়ে নি। এই ভাবতে ভাবতেই আমার স্কন্ধকাটা মা’র হাত পিঠে অনুভব করলাম। 

আন্তারেস চতুর্থ  অধ্যায়

আধো-অন্ধকারে দেখি ঘরে কেউ নেই। বিশাল মহাকাশযানের শব্দ শোনা যায়। একটা যান্ত্রিক শব্দ। অসীম শূন্যতায় আন্তারেস চলেছে। এতদিন এই নিয়ে ভাবি নি, কিন্তু আজ গা শিউরে ওঠে। মহাশূন্যের শূন্যতায় ভেসে চলেছে এই ক্ষুদ্র মহাকাশযান। সেই শূন্যতায় মা ছাড়া আমি বাঁচবো কেমন করে? আমি বিড়বিড় করে বলি, মা মা। আমার কথায় ঘরের কোনায় একটা বাতি জ্বলে ওঠে। মিরার মুখ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, মিরা বলে, “শোগি, কেমন আছ?” আমি বলি, “মা কোথায়?” “তোমার মা একটু পরেই আসবে তোমার কাছে। তুমি তো তাকে অন্যভাবে দেখেছ, ভুল দেখেছ, সেজন্য ও তোমার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে।” আমার মা কখনো কিছুতে ভয় পায় না। এ কোন মা আমার? মিরা বলে, “ভেবো না, শোগি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে ডাকছি।” বাবাকে? বাবা কি জানে মা’র কী হয়েছে। একটা হাল্কা বাজনায় ঘর ভরে যায়। বাজনাটা আমাকে যেন কিছুটা স্বান্তনা দেয়। মিরাই নিশ্চয় চালিয়েছে। মিরা জানে কোন বাজনায় আমাকে শান্ত করা যাবে। 

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। আবার স্বপ্ন দেখি, এবার আউরেরগথদের মহাকাশযান আমাদের প্রায় ধরে ফেলেছে। দেখলাম একটা একটা করে আউরেরগথ তাদের মহাকাশযান থেকে বের হয়ে আসছে, মহাকাশের শূন্যতায় তাদের কিছু হচ্ছে না। তাদের দেখতে অষ্টভূজ অক্টোপাসের মত, কিন্তু বিশাল। তাদের লম্বা শূঁড় দিয়ে তারা আমাদের জাহাজকে অনায়াসে জড়াচ্ছে। দুমরে-মুচড়ে যাচ্ছে আমাদের বিরাট মহাকাশযান। আমি চিৎকার করে উঠি, সেই চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘর আগের মতই আধো-অন্ধকার আলোয় ভরা। শুধু এবার মনে হল আর কী যেন শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটা চাপা শব্দ, সাইরেন, আন্তারেসের বিপদ সংকেত। আমাকে যে ঘরে রাখা হয়েছে তার একপাশের কাচের বড় জানালা দিয়ে দেখলাম করিডরের আলো নিভছে আর জ্বলছে, অনেকে করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে সেই জানালার দিকে এগোই। করিডর দিয়ে যারা দৌড়ে যাচ্ছে তাদের মুখ ভয়ার্ত, আউরেরগথরা কি সত্যিই আন্তারেসকে জড়িয়ে ধরেছে? কিন্তু আউরেরগথদের যে কী চেহারা তা তো আমরা কেউ জানি না। অষ্টভূজ অক্টোপাসেরা আন্তনাক্ষত্রিক মহাকাশযান বানাতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আর স্বপ্নে তাদের যেমন দেখেছি, কোনোরকম বিশেষ পোষাক ছাড়াই তারা মহাশূন্যে ভাসছে, চাপশূন্য বায়ুশূন্য মাধ্যমে কী কোনো প্রাণী ঐভাবে ভ্রমণ করবে? সেটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। 

কিন্তু সবাই দৌড়াচ্ছে, আমি দেখলাম ঘরের দরজা খোলা, আমিও বেড়িয়ে আসি করিডরে। বাবাকে ডাকতে হবে, করিডরে ফোন আছে। থেমে বাবাকে ফোনে ডাকলাম, বাবা ফোন ধরল না। মা’কে ও ফোন করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু করলাম না। আমার বন্ধুদের কাউকে দেখলাম না। করিডরে বাচ্চারা কেউ নেই, সবাই বড়, আমার দিকে তাকিয়ে তারা কী যেন বলতে গিয়ে বলছে না, চলে যাচ্ছে। আমি আমাদের ঘরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। করিডরের একটা বাঁক ঘুরতেই দেখি মা, আমার খোঁজেই নিশ্চয় আসছে। আমি দাঁড়িয়ে যাই। ভয়ে শরীরে কাঁটা দেয়। এই মানুষটি আমার মা নয়। এ কোনো যান্ত্রিক রোবট। ঘুরে পালাতে চাই, কিন্তু আমার পা চলে না। মা বলল, যেরকম সবসময় বলে, “ভয় পাস না, শোগি, আমিই তোর মা।” 

আমি কিছু বলতে পারি না। মা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরতে চায়, আমি সিঁটিয়ে যাই, হাত টেনে নিই। মা’র চোখের দিকে তাকাই, আহত হয়েছে বুঝতে পারি। কিন্তু আমি এখানে কী করতে পারি। চোখ নামিয়ে শুধু বলতে পারি, “বাবা কোথায়?” “বাবা ইঞ্জিন ঘরে ব্যস্ত, আউরেরগথদের লেজার আমাদের ইঞ্জিনের ক্ষতি করেছে, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বের হচ্ছে, আমাদের এখন ঘরে যেয়ে বিকিরণরোধী পোষাক পরে নিতে হবে। সেজন্যই তোকে আমি নিয়ে যেত আসছিলাম।” এই মানুষটি আমার মা এত বছর যেভাবে কথা বলেছিলেন সেভাবেই কথা বলছেন। এত বছর তাহলে ইনিই - যিনি রক্তমাংসের মানুষ নন - তিনিই আমার মা ছিলেন। 

আমার হাত ধরে মা চলল। পথে অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলল। সবাই তাকে আগের মতই 'ইন্দল' বলে সম্বোধন করল। এমন যেন কিছুই হয় নি। তারা কি জানে না ইন্দল মানুষ নয়? আমাদের ঘরের সামনে এলে ইন্দল বলল, “আমি আগে যা ছিলাম তাই আছি, শোগি। আমার কিছু পরিবর্তন হয় নি। আগে যদি আমাকে মা বলে চিনতিস এখনো আমি তোর মা’ই আছি। আমার বাইরেটাই দেখলি শুধু, ভেতরটা আমার ক্ষয়ে যাচ্ছে।” এবার সাহস করে আবার তাকাই ইন্দলের দিকে। এ ছাড়া আর কোনো মা’কে আমি চিনি না। তবুও বুকটা কেমন জানি করে। আমরা আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে একটা তাক থেকে বিকিরণরোধী পোষাক বের করি। ওটা পরতে বেশ কয়েক মিনিট সময় নেয়। আমাদের সারা শরীর ঢাকা থাকে, মাথায় একটা কাচের আবরণ, হেলমেটের মত। আমরা তার ভেতরের রেডিও চালু করি। আমার ঘরে ঢুকে আমাকে চেয়ারে বসিয়ে মা আমার বিছানায় বসে। বলে, “তোকে অনেক কথাই বলা হয় নি। আমি জানি না তোকে কতটা আমি বলতে পারব। তবে যত কম তুই জানিস ততই ভাল।” 

এই বলে ইন্দল চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। পরের কথাগুলো তার বলতে কষ্ট হবে, আমি বুঝতে পারছিলাম। ইন্দল বলে, “শোগি, তুই বুদ্ধিমান মেয়ে, আমি যে তোর আসল মা নই তুই বুঝতে পারছিস। পৃথিবীর খুব দুঃসময়ে আন্তারেস পৃথিবী ছাড়ে। আউরেরগথদের আক্রমণে পৃথিবী তখন পর্যুদস্ত। পৃথিবীর কিছু মানুষ যেন বাঁচে সেজন্য বহুবছর ধরে মানুষ মহাশূন্যের গভীরে অন্য একটি গ্রহ খুঁজছিল যা কিনা পৃথিবীর মতই হবে। তারা নতুন নতুন ইঞ্জিনের উদ্ভাবন করছিল যা দিয়ে কিনা আন্তনাক্ষত্রিক শূন্যতাকে অল্প সময়ে পার করা যায়। আয়নিত জেট, নিউক্লীয় ফিশান আর ফিউশন, কণা ও পরাকণার সংঘর্ষ, শূন্যতার শক্তি কত কী চেষ্টা করা হল। অবশেষে কাজ করল এই কণা-পরাকণা বিজ্ঞান। এই প্রকৌশলে আমরা আলোর গতির শতকতা দশভাগ গতি অর্জন করতে পারি, সেকেন্ডে ৩০,০০০ কিলোমিটার। আন্তারেস ছিল ঐ কারিগরী পদ্ধতির প্রথম মহাকাশযান। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষেরা বাছাই করল আঠারোটি তরুণ দম্পতি। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। তারা সবাই এই মহাকাশযানেই জন্মেছ।” 

না, এটা তো সত্যি হতে পারে না, ভাবি আমি। বলি, “তাহলে আমি? আমি কী তোমার থেকে জন্মেছি?”

“না, শোগি, তুই আমার থেকে জন্মাস নি। আমি যা বলব এখন তা তুই কীভাবে সহ্য করবি জানি না। তোকে বলতে আমার ভয় করছে।” এই বলে ইন্দল ঘরের দেয়ালে টাঙ্গানো বড় ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আমি শুনেছি ছবিটার নাম নক্ষত্রের রাত। বিশাল বিশাল তারা জ্বলছে আকাশে, তার মধ্যে আলোর ঘূর্ণী। সেই উজ্জ্বল আকাশের নিচে, ঝাউগাছ পেরিয়ে গ্রামের বাড়ির ছাদ, তার পেছনে পাহাড়ের মসীরেখা, আর পাহাড় পার হয়ে নক্ষত্রের আলোর ঝর্ণা। মনে হয় ইন্দল সাহস সঞ্চয় করতে পারে কিছুটা, বলে, “ঐ সময়ে আউরেরগথরা পৃথিবীর ওপর ক্রমাগতই আক্রমণ করছিল। সেরকম একটি আক্রমণে তোর মা মারা যান।” 

আমি কী করব বুঝে পাই না। এই খবরে আমার কেমন প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ভাবি। আমার মা তো আমার সামনেই বসে আছে। সে যে রোবট সেটা সবসময় মনে থাকছে না। শুধু বলতে পারি, “আর বাবা?” 

উত্তর দিতে ইন্দল সময় নেয়। বলে, “তোর বাবা বেঁচে যান। তুই তখন তোর মা’র পেটে। তোকে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়। পৃথিবীর একটা গবেষণাগারে তোর প্রথম কয়েক মাস কাটে, সেখানেই বলতে গেলে তোর জন্ম। এই মহাকাশযানের ছোটদের মধ্যে একমাত্র তোরই জন্ম পৃথিবীতে।” 

আমার মাথা ঝিমঝিম করে। মনে হয় এই ঘর থেকে দৌড়ে পালাই। কোথায় পালাব? অনন্ত মহাকাশে পালানোর জায়গা কোথায়? বলি, “আমি বাবার কাছে যাব।” 

“যাবি নিশ্চয়, শোগি। কিন্তু আউরেরগথের আক্রমণে ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়েছে। তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বের হচ্ছে। থেলিনই একমাত্র মানুষ যে কিনা সেটা ঠিক করতে পারে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ও এখানে চলে আসবে।” 

“তুমি কি তাহলে আমার মা’র মতই দেখতে?” 

“হ্যাঁ, পৃথিবীতে আমার মত কেউ নেই। আমাদের কৃত্রিম উপায়ে বানানো হয় বটে, কিন্তু আমাদের অনুভব মানুষের অনুভবের থেকে ভিন্ন নয়। আমাদের দুঃখ, আনন্দ, বেদনা খুবই মূর্ত। আমি চোখে যে রঙ দেখি তা আমার মনেই ফুটে ওঠে, বর্ণালী বিশ্লেষণ করে কোনো কম্পিউটার বলে না তোমার এখন এই রঙ দেখা উচিত। তোকে যে ভালবাসি সেটাও ঐ অনুভূতির জায়গা থেকেই, তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তোর মা মারা যাবার পরে ওনার ডিএনএ ব্যবহার করে আমার দেহ গঠন করা হয়।” 

এর মধ্যেই ঘরের টেলিভিশন স্ক্রিনে নেনার মুখ ভেসে ওঠে। নেনা খুব দ্রুত বলে, “তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা যা ভাবা গিয়েছিল তার থেকে বেশী। আমরা অনুরোধ করছি সবাইকে জাহাজের তেজষ্ক্রিয়রোধী ঘরটায় গিয়ে জড়ো হতে। একমাত্র জরুরী কাজে নিয়োজিত কয়েকজন ছাড়া এই আদেশ সবার জন্য প্রযোজ্য। ইঞ্জিনিয়ার থেলিন বলছেন আমাদের ঘাবড়াবার কিছু নেই। প্রতিকণা সংরক্ষাণাগারের দেয়াল আউরেরগথ আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাঁর দল সেটা মেরামত করছে। আগামী এক ঘন্টার মধ্যে আশা করা যাচ্ছে এই কাজটা শেষ হবে।” 

ইন্দল আমার হাত চেপে ধরে। তার চোখে আতংক। বলে, “শোগি, তোর বাবা সাংঘাতিক তেজষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে যাবে।” ইন্দল বাবাকে ভালবাসে। মানুষ না হয়েও ভালাবাসার ক্ষমতা তাহলে থাকে। 

“আমরা কী করব….মা?” মা কথাটা বলতে প্রথমে আমার দ্বিধা হয়। তারপর ভাবি এই মানুষটি ছাড়া আমি অন্য কোনো মা চিনি না। আমাকে হাতে ধরে করিডরে বের হয় মা। অনেককেই তেজষ্ক্রিয়-নিরাপদ ঘরের দিকে দৌড়াতে দেখি। আমরাও তাদের সাথে যোগ দিই। সবার মুখে আতংকের ছাপ। পথে এমা, ইলিয়াল আর লাহের সঙ্গে দেখা, তারা তাদের মা সিয়ানার সাথে দৌড়াচ্ছে। ওরা ইন্দলের দিকে অদ্ভূত ভাবে তাকাল, সবাই যেন গেছে আমার স্কন্ধকাটা মা’র কথা। নিরাপদ ঘরে ঢুকে দেখি কেউ বসে, কেউ ভীড় করে দাঁড়িয়ে। সবাই উত্তেজিতভাবে কথা বলছে। মনে হল আমাদের দেখে সবাই যেন চুপ করে গেল। একটা বেঞ্চে মালাই, তিলাই আর বেলক বসা। তার উল্টো দিকে ক্লাভান, মিলা, রিনা আর লেনাক। ওরা সবাই মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যে মা’র হাত ধরে ভেতরে ঢুকেছি তা ওদের অলক্ষিত থাকে নি। তাহলে ওরা কী ভাবছে আমি যা দেখেছি তা হ্যালুসিনেশনই ছিল। 

আমি বেলকদের সাথে বসতে গেলাম। নেনা আর তমাল ঘরের একদিকে ছিল, মা ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেল। দেখলাম ওদের মুখে হাসি নেই। তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। তারা নিশ্চয় জানে মা যে মানুষ নয়। কিন্তু মা যদি মানুষ না হয় তবে মা কী? মা তো রোবটও নয়। রোবটদের অনুভূতি থাকে না, তারা ব্যথা পায় না। মা’কে কী বলা যায়? নিশ্চয় পৃথিবীতে এরকম মানুষদের কোনো বিশেষ নাম আছে। আমি ভাবতে থাকলাম। 

আমাদের সবারই তেজষ্ক্রিয়তা-প্রতিরোধী পোষাক পরা ছিল। শুধু মাথার হেলমেটগুলো খুলে আমরা টেবিলে রাখলাম। ধীরে ধীরে ঘর আরো মানুষে ভর্তি হওয়া শুরু করল। অধিনায়ক ড্রেগলস তাদের মধ্যে ছিল না, কাউকে তো মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকতে হবে। আমার বাবা থেলিন ইঞ্জিন ঘরে। তার সাথে কে আছে জানি না। হয়তো বিজন, হয়তো আস্টার, হয়তো রুডাবা। নেনা, তমাল আর মা’র মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম ইঞ্জিন ঘরের অবস্থা ভাল নয়। এর মধ্যেই বাবার মুখ ভেসে ওঠে দেয়ালের স্ক্রিনে। সবাই চুপ করে যায়। থেলিন বলে, “আমরা পরাকণার সংরক্ষণাগারের দেয়ালকে মেরামত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের হাতে এখন একটাই উপায়। চক্রাকার গুদামটিকে আমাদের মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করতে হবে, নইলে সেখান থেকে যে তেজষ্ক্রিয়তা বার হচ্ছে তা আর এক ঘন্টা পরেই আমরা সহ্য করতে পারব না।” 

বাবা হেলমেট পরে ছিল। তবু সেটার কাচের মধ্য দিয়ে দেখলাম ও ঘামছে। দূরে দেখলাম মা’র মুখ সাদা হয়ে গেছে। পরাকণা সৃষ্টি করে তাদেরকে চারটা চক্রাকার সংরক্ষণাগারে রাখা হয়। তার মধ্যে তিনটে চক্র সবসময় কাজ করে আর একটা চক্রকে জরুরী সময়ের জন্য ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চারটা চক্রের মধ্যে একটা ফেলে দিলে ব্যাকআপ যে থাকবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু থেলিনের দল কি এই কাজটা নিরাপদে করতে পারবে? 

বাবা বলতে থাকে, “গুদাম চক্রটি ফেলে দিতে হলে আমাদের দলকে মহাকাশযানের বাইরে যেয়ে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে কিছুটা ঝুঁকি আছে। আশা করি কাজটা নিরাপদেই করা যাবে।” 

আমি ছোট হলেও বুঝতে পারছিলাম ১০০ মিটার ব্যাসের একটা বিশাল টরয়েড মহাশূন্যে ফেলে দেয়া সহজ হবে না। বাবারা যে জায়গায় কাজ করছিল সেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই। আমরা দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা ভাসতে ভাসতে কিছু নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের বোতাম টেপার জন্য তৈরি হচ্ছে। বোতাম টিপলে চক্রটির বাধনগুলো খুলে যাবে। সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন টরয়েডটি স্থানচ্যুত হয়ে মহাকাশযান থেকে আলাদা হবে। চারখানা ক্ল্যাম্প খুলতে হবে। চারজন চারদিকের চারটি প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে, তারা একই সঙ্গে বোতামে চাপ দেবে যাতে ক্ল্যাম্পগুলো একই সময়ে খোলে। একই সময়ে যদি তারা না খোলে, কিংবা একটি ক্ল্যাম্প একেবারেই খুলতে ব্যর্থ হয় তবে তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে, কারণ ক্ল্যাম্পগুলো খোলা মাত্র একটা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ টরয়েডটিকে আন্তারেসের পেছনে মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত করবে। সব ক্ল্যাম্প না খুললে বিশাল চক্র মহাকাশযানের একটা বিরাট অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে। 

চারটা স্ক্রিনে চারজনকে দেখাচ্ছে। নেনা কথা বলছে তাদের সাথে, শেষ মুহূর্তের কিছু সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিন ঘরের চারজনই বারে বারে তাদের ঘড়ি দেখছে, সেখানে তাৎক্ষণিক তেজষ্ক্রিয়তার মান দেখা যায়। সেই মানটি আমরাও স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছিলাম। সাধারণ মাত্রা থেকে সেটা প্রায় ২০ গুণ বেশী ছিল। চূড়ান্ত আদেশটি এল অধিনায়ক ড্রেগলস থেকে। আমরা দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা চক্রের চারদিকে একসাথে বোতাম টিপল। ক্ল্যাম্প খোলা মাত্র ঐ চারজনের নিরাপদ জায়গায় ফিরে যেতে হবে যাতে পরবর্তী বিস্ফোরণ তাদের ক্ষতি না করে। বাধনগুলো শব্দ করে খুলে যেতে থাকল, কিন্তু বাবার দিকের ক্ল্যাম্পটি খুলল না। বাবা অন্য তিনজনকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলে ক্ল্যাম্পটা হাত দিয়ে খোলার জন্য দ্রুত সেদিকে ভেসে গেল। মা চাপা চিৎকার করে উঠল। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরণ হওয়াটা কম্পিউটার আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবা হাত দিয়ে ক্ল্যাম্প খুলতে পারল। দ্রুত তার নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে ভেসে এসে একটা বোতাম টিপল, বিস্ফোরণ হল। চক্রটির যেখানে ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে উৎক্ষিপ্ত হবার কথা, আমরা দেখলাম সেটা একদিকে কাৎ হয়ে পড়ছে। সেইদিকের নিয়ন্ত্রণ প্যানেল বাবাসহ কাৎ হয়ে পড়ছে। আমরা সবাই আর্তনাদ করে উঠলাম। তারপর কাৎ হয়েই বিশাল টরয়েডটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হল, সে সঙ্গে নিয়ে গেল আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার ক্লেভানকে। 

২টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. পড়তে পড়তে নিজেকে শোগি বলেই মনে হচ্ছিল। আউরেউরগথ জানতে পারবে না তো যে আমরা এত কাছে আছি ! লেখকের প্রতিটি গল্পের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা ও অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়। নাঃ, নিবারণ চক্রবর্তীর দেখা পাবার ভয় অন্তত নেই, আউরেউরগথ-টাই বেশ ভাবনার কারণ হয়েছে। তবে আশা করছি শীঘ্রি আমরা তার আওতার বাইরে চলে যেতে পারবো বা তাদের পরাজিত করতে পারব... বেশী অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না...

    উত্তরমুছুন