বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

আন্তারেস - দীপেন ভট্টাচার্য

(আন্তারেস - ধারাবাহিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনী)

প্রথম অধ্যায়

গ্রহটাকে আমরা বহুদিন হলই চিহ্নিত করে রেখেছিলাম। লাল গ্রহ, তার মধ্যে নীল আর সবুজের ছাপ। পাহাড় আছে, সবুজ ক্লোরোফিলে ছেয়ে আছে তার চড়াই আর উৎরাই। তার মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ নীল জংলী ফুল।

বায়ুমণ্ডলে ৪০ ভাগ অক্সিজেন, বাদবাকি নাইট্রোজেন, অল্প পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বায়ুচাপ ৮০ হাজার প্যাসকাল, মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ প্রতি বর্গ সেকেন্ডে ৬ মিটার।

মাত্র ০.৩ জ্যোতির্বিদ্যা একক দূরত্বে লাল আলোতে জ্বলছে একটা M টাইপ তারা। আকাশটাও কেমন লাল হয়ে আছে। তারাটার নাম আমরা দিয়েছিলাম মিহির আর গ্রহটার নাম জেমলা।

মা বলল, ‘এই গ্রহটা তোর পছন্দ হয়েছে, শোগি?’

আমি লাফাতে লাফাতে বললাম, ‘হয়েছে, হয়েছে।’ হাঁপিয়ে গেলাম, তারপর বললাম, ‘আমি কি হেলমেট খুলে ফেলব?’

মা বলল, ‘খুলিস না, এতখানি অক্সিজেন হঠাৎ করে বিষ হয়ে যেতে পারে।’

দূরে দেখি লাহে, এমা আর ইলিয়াল লাফাচ্ছে আর হেলমেট খোলার তোড়জোড় করছে। ওদের মা সিয়ানা ওদের কাছে নেই, সে পাহাড়ের একটা পরিখার ধার ঘেঁষে নিচে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। আমি হাত তুলে মা’কে এমা আর ইলিয়ালকে দেখালাম। মা বেতারে তাদের হেলমেট খুলতে মানা করল।

আমার মা’র নাম হল ইন্দল। আন্তারেস মহাযানে যত মা আছেন, প্রায় দশজনের মত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে স্নেহময়ী হল আমার মা। অবশ্য বেলকের সঙ্গে এই নিয়ে আমার প্রায়ই ঝগড়া হয় কারণ ও বলে ওর মার মত বুদ্ধিমান আর সুন্দর মানুষ নাকি মহাবিশ্বে আর নেই। তা যাকগে, বেলককে আমি এই বিষয়ে অনেক সময় ছাড় দিই, কারণ বেলকের বাবা নেই। এদিকে আবার বেলকের বাবা নেই বলে আমার মা ওকে খুব স্নেহ করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার থেকে একটু বেশীই করে। তখন আবার খুব হিংসা হয়। মা আবার সেটা বোঝেন, তাই কখনো কখনো রাতে শুতে যাবার আগে আমার পাশে বসে আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আমাকে বলে, ‘এই মহাকাশে তার সবচেয়ে আদরের জিনিসটা নাকি আমি।’ আমি বলি, ‘বাবার থেকেও?’ মা বলে, ‘বাবার থেকেও।’ মা কথাটা এমনভাবে বলে, মুখের হাসিটা ধরে রেখে, বুকটা আনন্দে ভরসায় ভরে ওঠে।

পৃথিবী ছেড়েছি আমরা সেই কবে। প্রায় এক শ বছর হবে। মহাকাশের নিকষ অন্ধকার ধীরে ধীরে সেই নীল গোলকের স্মৃতি ম্রিয়মান করে এনেছিল। আমাদের মহাকাশযানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়েছিল পৃথিবীর কাহিনী, ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক স্মৃতিফলকে ধরে রাখা পৃথিবীর চলচ্চিত্র উজ্জ্বল করে রাখত আমাদের হলঘর। ছেড়ে আসা পৃথিবীর গান ভরিয়ে রেখেছিল বিশাল মহাকাশযানের করিডর।

আমার ছোটরা কখনো দেখি নি পৃথিবী, আমাদের জন্ম এই মহাকাশযানে। আমাদের মহাকাশযানের নাম আন্তারেস।


কিন্তু আমার মার জন্ম পৃথিবীতে। যখন আরো ছোট ছিলাম মা তার কোলে বসিয়ে আমাকে পৃথিবীর গল্প শুনিয়েছেন, ঘুম-পাড়ানী গান গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়েছেন, চামচে করে খাইয়ে দিয়েছেন। অক্ষর চেনার আগে, ছবি দেখে জিনিস চিনতে পারার আগে মার কাছ থেকেই আমি পৃথিবীর কথা শুনেছি। সবুজ আর নীল রঙে ঢাকা নাকি সেই পৃথিবী। বনের সবুজ, সমুদ্রের নীল। মাঝে মধ্যে মেঘের সাদা আর মরুভূমির হলুদ। মহাকাশের নিকষ কালোতে এই রঙগুলো যাতে ভুলে না যাই সেজন্য আমাদের খেলার ঘরে, মহাকাশযানের করিডরে সেই রঙগুলো আঁকা আছে। মা এরকম একটা রঙের বর্ণালী দেখিয়ে বলেছিল, এটা রামধনু। ধনুকের মত বাঁকা। ত্রিশিরা কাচে আলো ফেললে যা হয় বৃষ্টির জলের ফোঁটায় সূর্যের আলো পড়লে এরকমভাবে সেই আলো নানা রঙে বিশ্লিষ্ট হয়।

বিশ্লিষ্ট কি মা? এটা বোঝাতে মা সময় নিল। বলেছিল, মনে কর তোমাকে অনেক ক'টা বল দেয়া হল। সেগুলো আবার বিভিন্ন রঙের - লাল বল, নীল বল, সবুজ বল, হলুদ বল। মনে কর তোমাকে আবার কয়েকটা বাক্স দেয়া হল, তাতে লেখা আছে লাল, নীল, হলুদ। তুমি লাল বলগুলোকে আলাদা করে লাল বাক্সে ফেললে, নীল বলগুলোকে নীলে বাক্সে। এই যে রঙ হিসাবে বলগুলো আলাদা করে ফেললে একেই বলে বিশ্লিষ্ট করা।
এরকমভাবে যে মা আমাকে কত কিছু শেখাতেন। 

আমাদের জানালার বাইরে যে অন্ধকার তা যেন অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাতে নীল, লাল, সাদা তারারা জ্বলজ্বল করছিল, দু-একটা ফ্যাকাশে নীহারিকা ঠিক স্পষ্ট দেখা যায় না। সাধারণতঃ সরাসরি আমরা জানালার বাইরে তাকাই না। এর কারণ হল আমাদের মহাকাশযানটির বসাবাস করার জায়গাটি ক্রমাগতই ঘোরে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি করার জন্য। আমাদের মূল জাহাজটির দৈর্ঘ ৮০০ মিটার। তার সামনের দিকে রয়েছে একটা ৩০০ মিটার ব্যাসার্ধের চক্র। সেই চক্রটি ঘুরছে, প্রতি পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডে সে একবার করে ঘুরছে। আমারা ঐ চক্রের মধ্যেই থাকি। চক্রের ঘূর্ণনে আমরা বাইরের দিকে যেন ছিটকে যেতে চাই, কিন্তু মহাকাশযানের দেয়াল আমাদের ধরে রাখে।তাই সেই দেয়ালটা মেঝের মত কাজ করে, আমাদের মনে হয় মেঝের দিকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মধ্যেই আমর আছি। 

আমরা হাঁটি সেই মেঝের ওপরে, আমাদের দুপাশে থাকে বাইরের আকাশ দেখার জানালা। এগুলোকে জানালা বললে ভুল হবে, বরং বড় টেলিভিশনের স্ক্রিন বলাই সঙ্গত হবে। সেখানে বাইরের জগতের চিত্রটাকে প্রতিফলিত করা হয়। সেই চিত্রটা পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডে একবার করে ঘুরে আসে না, বরং আমরা না ঘুরলে যেমন হত তেমনভাবে স্থির থাকে যার ফলে আমরা বুঝতে পারি না আমরা ঘুরছি। ঐ জানালায় অভিক্ষিপ্ত ছবিগুলো দেখে মনে হবে আমরা একটা সরলরেখায় চলেছি, দুদিকের জানালায় আমরা বাঁদিকের আর ডানদিকের দৃশ্য দেখছি। 

আমরা খুঁজছি নতুন গ্রহ যেখানে আমরা গড়তে পারব নতুন বসতি। আমাদের পৃথিবী নাকি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বেতারে মা লাহে, এমা আর ইলিয়ালের মা সিয়ানাকে ডাকল, বলল,
পরিখার ধারে দাঁড়িয়ে কী করছ?

সিয়ানা উত্তর দিল,
নিচে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, জ্বলজ্বল করছে।

এটা শুনতে পেয়ে আমরা ছেলেমেয়েরা দৌড় তো দৌড়, কে কার আগে পৌঁছাবে পরিখার ধারে। সবার আগে পৌঁছে গেল মালাই আর তিলাই দু-ভাই। এদের দুজন এমনই যমজ যে আমি কখনই তাদের আলাদা করে চিনতে পারি না। আর এখন তো নভোচারী পোষাকে তো কে মালাই আর কে তিলাই বোঝার কোনোই উপায় নেই। এরপরে পৌঁছলাম আমি, তারপর এমা, ইলিয়াল আর লাহে। এই গ্রহে দৌঁড়াতে ভালই লাগছিল, লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিলাম বড় বড় পাথর। ওদিকে মা তো চিৎকার করে যাচ্ছেন,
লাফিও না, পাথরে পা হড়কে পড়ে যাবে। কে কার কথা শোনে!

বেতারে শুনলাম সিয়ানা বলছে,
সাবধান ছেলে মেয়েরা, এখানে কিন্তু পাহাড়ের পাড় নেই। আস্তে এস। সত্যিই তাই। পাহাড়ের ধারে আসতে চমকে গেলাম, হঠাৎ করেই যেন ভূমি এখানে ভেঙে গেছে, প্রায় ৫০০ মিটার খাড়াই দেয়াল। বহু নিচে কি যেন জ্বলজ্বল করছে লাল রঙে। মিহির তারার লাল রঙ প্রতিফলিত হচ্ছে কি কোনো কাচের আয়নায়? সিয়ানা মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি মনে হয়, জমাট বরফ নাকি লবণের হ্রদ?

মা বলল, আমরা এরকম আগে দেখেছি অনেক গ্রহে আর গ্রহাণুপুঞ্জে। সেখানে ওরকম দুটো জিনিসই ছিল - বরফ অথবা লবণ। দেখি বর্ণালী-বিশ্লেষকটা ব্যবহার করে।

আমাদের পেছনেই ছিল উড়ে-চলা ছোট বিমান-রোবট যাকে আমরা খুব ভালবাসতাম। তার নাম ছিল সাইবোক। সাইবোকের দেহটা ছিল বিমানের চোঙার মত, দুপাশে ডানা, কিন্তু ওর মুখটা ছিল অনেকটা মানুষের মত দেখতে। সাইবোক সব কাজের কাজী, সে আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে পারত। তাকে মা বলল নিচে উজ্জ্বল জিনিসটাকে কাছ থেকে দেখতে আর সেটার বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে।

সাইবোকের হাস্যরস খুব প্রখর ছিল, সে মিনমিন করে বলল,
আমাকেই এসব বিপজ্জনক কাজ করতে হবে? কিন্তু এই বলেই ভীষন বেগে গিরিখাদে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিছুক্ষণ বিনাবাধায় পড়ার পর সে তার ডানার এরোফয়েলগুলোকে সক্রিয় করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মা আর সিয়ানার কাছে সাইবোকের পাঠানো উজ্জ্বল জিনিসটার ছবি আর বর্ণালী তথ্য আসা আরম্ভ হল। আমরা বাচ্চারা তো খুব এক্সাইটেড, আমরা ওদের দুজনকে ঘিরে ধরে লাফাতে লাফাতে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখছে সাইবোক?

কিন্তু মার আর সিয়ানারর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল, মা
র ভুরুদুটো কুঁচকে অনেকটা একসাথে হয়ে গেল। সিয়ানা বলল, বাচ্চারা এটা একটা প্রাকৃতিক বরফ আগ্নেয়গিরি বলতে পার, মাটির নিচ থেকে পার্মাফ্রস্ট বা চিরতুষার ঊর্ধ্বচাপে বের হয়ে আসছে। চল আমাদের এখন আন্তারেসে ফিরে যেতে হবে। এত তাড়াতাড়ি কেন আন্তারেসে ফিরতে হবে সেটা আমরা কেউ বুঝলাম না। শুধু মনে হল এমন একটা কিছু ব্যাপার আছে যেটা মা কিংবা সিয়ানা আমাদের খুলে বলতে চায় না। যাইহোক আমরা তো লাফাতে লাফাতে আবার আমাদের ছোট সাটলে ফিরে এলাম। সাইবোক আমাদের পেছনে উড়ে উড়ে এল। সবাই সাটলে ডোকার পরে হুশ করে আমাদের পেছনে পরপর দুটো দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সিয়ানা সামনে বসে একটা নিয়ন্ত্রক প্যানেলে একটা বোতামে চাপ দিল। আমাদের পায়ের নিচে ইঞ্জিন মৃদু স্বরে গর্জে ওঠে। কম্প্রেসরের শব্দ শোনা যায়, বাইরে থেকে বাতাস নিচ্ছে, মুহূর্তে সেই বাতাসের অণু, পরমাণু আয়নিত হয়ে যায় আর সেই ধণাত্মক আয়ণিত কণা আকর্ষিত হয় একটা ঋণাত্মক বলয়ের দিকে, অবশেষে প্রবল বেগে ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে সেই আয়নিত কণাগুলো বের হতে থাকে, আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ধাক্কা দেয় আমাদের সাটলে। আমরা হেলমেট খুলে যার যার আসনে বসে বেল্ট বেঁধে নেই।

গ্রহ থেকে ওপরে ওঠা বা কক্ষপথ থেকে নিচে নামা আমাদের কাছে প্রথম প্রথম খুব এক্সাইটিং ছিল, কিন্তু এখন আমাদের একটু ভয়ই করে। সাটল খুব দ্রুত তার গতিবেগ বাড়াতে থেকে। আমাদের শরীর যেন সিটের সাথে গেঁথে যায়, ওজন বেড়ে যায় প্রায় তিনগুণ। এরকমভাবে ছয় মিনিট, ততক্ষণে আমরা আন্তারেসের কক্ষপথে প্রায় পৌঁছে গেছি। সিয়ানাকে কিছুই করতে হয় না, জেমলা গ্রহ থেকে আমাদের সাটল একটা পূর্ব নির্ধারিত পথে জেমলার কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযান  আন্তারেসে পৌঁছে যায় আধঘন্টার মধ্যে। পৌঁছনোর আগে আমরা ওজনশূন্যতা অনুভব করি। সাটল আন্তারেসের সাথে ডক করে 
মহাকাশযানের মাঝখানের চুরুটের মত অংশে। এই অংশটা ঘোরে না, কাজেই এখানেও ওজনশূন্যতা বর্তমান। এখান থেকে একটা লিফট আমাদের বাইরের ঘুরন্ত চক্রের অংশে নিয়ে যায়। লিফটটা যত বাইরের দিকে যায় তত আমাদের ওজন বাড়ে। লিফট যেখানে থামে সেখানে আমাদের ওজন প্রায় পৃথিবীর সমান হয়।             

চক্রে পৌঁছনো মাত্র মা আমাকে বলল,
ঘরে চলে যা রে, শোগি। এই বলে সিয়ানা আর মা আমাদের ফেলে দৌড়ে চলে গেল, এরকম আগে কখন হয় নি। আমি বুঝলাম না জেমলার সেই গহ্বরের বরফের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখে তারা কেন এত ঘাবড়ে গেল।  

আমি কথাটা বেলককে কখন বলব ভাবছিলাম। বেলক আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। বেলককে লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে নিশ্চয়। আসলে লাইব্রেরিটা ছিল বিশাল একটা মিউজিয়াম, মূলতঃ পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সমস্ত ধরণের তথ্য সেখানে পাওয়া যেত। মহাশূন্যের পোষাক ছেড়েই দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরিতে। আমাদের লাইব্রেরি বইয়ে ঠাঁসা, মেঝে থেকে অনেক উপরে তাকের পর তাক সাজানো বই। আসলে ঠিক বই নয়, বলা যায় বইয়ের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে প্রাচীন সময়ে নাকি এভাবেই বই লাইব্রেরিতে সাজানো থাকত। সেই অনুভূতিটা বজায় রাখতে এই জাহাজেও সেভাবে বই রাখা হয়েছে, শুধু সেগুলো আসলে বই নয়, কম্পুটার দিয়ে গড়া বইয়ের ছবি মাত্র।  আমরা যদি কোনো বই পড়তে চাই বা শুধুমাত্র মাত্র দেখতে চাই তাহলে সেদিকে হাতের তর্জনী তুললেই সেটা একটা পড়ার টেবিলের ওপর ভেসে উঠবে। লেজারের আলোয় মুর্ত হয়ে উঠবে পুরো বইটা, আমি আঙুল দিয়ে পাতা সরাতে পারব, পড়তে পারব শুন্যে ভেসে ওঠা অক্ষরগুলো।

বেলক দেখলাম ঘরের কোনায় উপর হয়ে একটা পাথর দেখছে। আমাকে দেখে বলল,
জান এই জিনিসটা কি? এর নাম হল রোজেটা স্টোন। এটা দেখে গবেষকরা প্রথম মিশরীয় ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিল। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে জিনিসটা দেখলাম, একটা বিশাল পাথরের চাঁই। তাতে নানান ধরণের বর্ণমালায় লেখা। আমার দিকে বেলক তাকিয়ে বলল, জানো এর জন্য কত লোক কত শ্রম করেছে। শেষ পর্যন্ত হঠাৎ করেই একটা জায়গায় এই পাথরটা পাওয়া যায় যেখানে মিশরীয়, গ্রীক ও আমহারিক ভাষায় লেখা আছে।

এটাই কি সেই আসল পাথর? জিজ্ঞেস করি আমি। হ্যাঁ, বলে বেলক।

পৃথিবী ছাড়ার সময় আমাদের অনেক প্রাচীন স্মৃতি দিয়ে দেওয়া হয়। হামুরাব্বির প্রথম আইন ফলক, পৃথিবীর দেশসমূহের বিলুপ্তির সনদ। বেলক বলল,
এসব সামনাসামনি না দেখলে এগুলোর অর্থ বোঝা যায় না।

কিন্তু আমার বেলকের কথা শোনার মত ধৈর্য ছিল না। আমি বললাম,
বেলক, আমরা জেমলা থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরে এলাম। একটা পরিখার নিচে কি যেন জ্বলজ্বল করছিল। সাইবোক সেটা পর্যবেক্ষণ করে তথ্য পাঠালো আর সাথে সাথে মা আর সিয়ানা আমাদেরকে আন্তারেসে ফিরিয়ে নিয়ে এল।

কথাটা শুনে বেলক মনে হল একটু আশ্চর্য হল। এখানে বলি বেলক আমাদের বয়সী হলেও আমাদের মত নয়। আমরা যখন একটা কিছু দেখে খুব আনন্দ বা দুঃখ পাই আবার পরক্ষণেই ভুলে যাই, বেলক ভোলে না, তাই নিয়ে চিন্তা করে। সে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল, আমি ওর পাশে। নিচে জেমলা গ্রহ দেখা যাচ্ছে। আগেই বলেছি, আমাদের জানালাগুলো ঠিক জানালা নয়, বরং আমাদের মহাকাশযানের দেয়ালের ধারে সেগুলো ছিল টেলিভিশন স্ক্রিনের মত। আমাদের চক্রাকার টরাস আকৃতির বাসস্থান ক্রমাগতই ঘুরছে। কিন্তু জানালা দিয়ে নিচে স্থির জেমলা দেখা যাচ্ছে, সেই গ্রহ ঘুরছে না। না ঘুরলে যেরকম দেখা যেত সেরকমভাবেই দেখাচ্ছে। এর কারণ আগেই বলেছি জানালাগুলো আসলে জানালা নয়, বরং সেগুলো হল টেলিভিশন বা কম্পুটারের স্ক্রিন। আমাদের বাসস্থান না ঘুরলে যেমন বাইরেটা যেমন দেখা যেত, সেই স্ক্রিন সেভাবেই আমাদের তা দেখায়।         

সেদিকে তাকিয়ে বেলক কিছুটা আনমনাভাবেই বলল,
কি আছে এই গ্রহতে যাতে বড়রা এত ভয় পেল? আমাদের সঙ্গে বেলক জেমলাতে যায় নি, ওর যাবার কথা ছিল আগামীকাল। আমি বললাম, চলো, খাবারের সময় হয়ে গেছে, পরে এই নিয়ে ভাবা যাবে।

খাবারের জায়গাটা লাইব্রেরির পাশেই। সেখানে যেয়ে দেখি লাহে, এমা, ইলিয়াল, মালাই, তিলাই সবাই এসে গেছে। দূরে আর একদল ছেলে মেয়ে ক্লাভান, মিলা, রিনা, লেনাক এরা সব জটলা করছে। আগামীকাল ওদের জেমলাতে যাবার কথা। বড়রা কেউ নেই। এই সময়ে কারুর না কারুর থাকার কথা খবরদারি করতে। লাহে, এমা আর ইলিয়াল তিন বোন। অন্যদিন ওরা আমার সাথে বসে না, কিন্তু আজ তিনজনই এসে আমার আর বেলকের সাথে বসল। এর পরে দেখি মালাই আর তিলাইও এসেও হাজির। কিন্তু খাবার কোথায়? অনেক সময় সাইবোক খাবার নিয়ে আসে, অনেক সময় সাইবোকের সাথী রোবোক আসে। আজ এই দুজনের কেউই নেই। আমি বললাম,
জেমলাতে কী পাওয়া গেছে সেই নিয়ে ওরা নিশ্চয় সভা করছে।  

সব মিলিয়ে খাবার ঘরে প্রায় পঞ্চাশজন ছেলেমেয়ে। কেউ হইচই করে কথা বলছে না, কিন্তু সবার নিচুস্বরের কথা এক হয়ে একটা গুঞ্জন তুলছে। এখানেও একটা বিশাল জানালা দিয়ে নিচে জেমলা দেখা যাচ্ছে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছয়-সাতজন আঙুল তুলে জেমলার বিভিন্ন জায়গাকে একে অপরকে দেখাচ্ছে - নদী, বড় পাহাড়, সমুদ্র। মেঘে ঢেকে আছে একটা বিরাট অংশ। এইসব দেখতে দেখতে আমার খিদে পেয়ে গেল, সবারই বোধহয় একই অবস্থা। খিদের চোটে জেমলাতে যে আজ কী ঘটেছে সেটা অন্যদের সাথে আলোচনা করবারও ইচ্ছে রইল না। খাবারের হলঘরটার পাশেই একটা বড় দরজা, সেটা দিয়ে একটা সম্মেলনকক্ষে যাওয়া যায়। সেই সম্মেলনকক্ষের দরজাটা খুলে গেল। মা ও সিয়ানাসহ পাঁচজন বড়মানুষ ঢুকল, তার মধ্যে রয়েছে আমাদের মহাকাশযানের অধিনায়ক ড্রেগলস। ড্রেগলস ড্রেগলসের মতই দেখতে, অর্থাৎ তার নামটা যেমন ভয় জাগানোর চেহারটাও তেমন। আমরা তাকে সবসময় এড়িয়ে চলতাম। প্রায় দুমিটার লম্বা, চৌকো মুখ, থুতনিও কেমন জানি চ্যাপ্টা, তবে চওড়া। বড় দুটো চোখের ওপর ঘন ভুরুজোড়া, ছোট করে ছাঁটা চুল সমতল মাথার সঙ্গে লেগে আছে।

ড্রেগলস ঘরে ঢোকা মাত্র সব গুঞ্জন বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হবারই কথা, ওকে আমরা সবাই ভয় পেতাম। করিডরে দেখা হলে মুখ নিচু করে চলে যেতাম। ড্রেগলসও আমাদের কোনো সম্বোধন করত না, হ্যালো, হাই, সুপ্রভাত এসব কিছুই বলত না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম মহাকাশযানের যে সার্বিক দায়িত্বে আছে তার বোধহয় এরকমই হবার কথা - খুব কঠিন এক লোক, হাসি ঠাট্টা করা তার সাজে না। আরও একটা ব্যাপার তার কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না, এর ওপর তার স্ত্রীও ছিল না। ছেলেমেয়ে থাকলে বা স্ত্রী থাকলে সে হয়তো আমাদের সাথে সহজে মিশতে পারত এরকম একটা ধারণা আমাদের ছোটদের মধ্যে ছিল। যাইহোক ড্রেগলসের খাবার ঘরে আগমন মানে আমাদের খাবার দিতে আরো দেরী হবে এটা ধরে নিলাম। বোঝাই যাচ্ছে এতে আমার খুশী হবার কোনো কারণ নেই। সবার চোখেই দেখলাম এরকম ভাব, উফ এ লোকটা আবার এখানে কেন, পেটে তো খিদেয় ছুঁচো ডন-বৈঠক দিচ্ছে। ছুঁচো আমরা কেউ চোখে দেখি নি, কিন্তু ছবিতে তার যেরকম চেহারা দেখেছি তাতে তাকে পেটে বেশীক্ষণ রাখাটা সমীচীন হবে না।

দেখলাম ড্রেগলস কিছু বলার জন্য তোড়জোড় করছে, কিন্তু মনে হল ঠিক কি করে শুরু করবে বুঝে পাচ্ছে না। তার পাশে অন্যান্যদের সাথে মা আর সিয়ানাও দেখলাম একটু ভয়াতুর। তবে ড্রেগলস যে ছোটদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাবে সেটা আমাদের কল্পনাতেও আসে নি। অন্য একটা টেবিলে দেখলাম মিলা, রিনা আর লেনাক ফিসফিস করছে আর তাদের পাশে বসে ক্লেভান হিহি করে হাসছে। হাসিটা ড্রেগলসের কান পর্যন্ত যে পৌঁছেছে সেটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হলাম যখন সে একটু কেশে বলতে শুরু করল,
ছেলেমেয়েরা, তোমরা  অনেকেই জেমলাতে গিয়েছ। জেমলা অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতই। আমরা ভেবেছিলাম জেমলাতে স্থায়ী আস্তানা গাড়তে পারব, এটা হবে নতুন পৃথিবী। এখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ একটু বেশী, সেটা ক্ষতিকর হলেও আমরা তাকে শোধন করতে পারতাম। এখানে লতা রয়েছে, ফুল আছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এর মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর শতকরা ৬০ ভাগ। পৃথিবীর মত সমস্ত গুণ নিয়ে এরকম আর কোনো গ্রহের কথা আমাদের তথ্যকেন্দ্রে নেই।

মনে হল ড্রেগলস একটা বড় বক্তৃতা দেবার জন্য তোড়জোর করছে। এসব মনোযোগ দিয়ে শোনার মত অবস্থা আমাদের কারুরই ছিল না, সবাই উশখুশ করতে লাগল। কিন্তু মা
র দিকে চোখ পড়তে দেখলাম উনি আমার দিকে খুব শাসনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেটা দেখে আমি আমার পিঠ সোজা করে ড্রেগলসের ওপর চোখ রাখলাম, এসব করতে গিয়ে ড্রেগলসের কিছু কথা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। যখন আবার মনোযোগ দিলাম, শুনলাম সে বলছে, জেমলাতে আমরা একটা ভয়াবহ জিনিস আবিষ্কার করেছি যার জন্য খুব শীঘ্রই আমাদের জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হচ্ছে।

এটুকু শুনেই তো ভয়ে আমার পাদুটো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কী এমন জিনিস আমরা জেমলায় দেখেছি যার জন্য আমাদের পালাতে হবে? ওদিকে ড্রেগলসও দেখলাম তার তার পাদুটোকে এদিক ওদিক সরাচ্ছে, এমন যেন তার শরীরের ভর একবার ডান পা আর একবার বাঁ পায়ের ওপর রাখছে। ওরও কি পা আমার মত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে?

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ড্রেগলস বলতে আরম্ভ করে,
ছেলেমেয়েরা, পৃথিবীর মত আর একটি গ্রহ এই গ্যালাক্সিতে নেই। এর সুনীল সাগর, ধবল মেঘ, নরম মাটি, সবুজ বনের সমারোহ গালাক্সির অন্ধকারে আর একটিও পাওয়া যাবে না।  সেখানে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে পরিশ্রম করে তাদের মেধায় শ্রমে খুবই উন্নত এক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই সভ্যতা গ্যালাক্সির অন্যান্য উন্নত জীবের ঈর্ষার কারণ হয়েছে। তাই বহুকাল ধরে পৃথিবী গ্যালাক্সির নানান সভ্যতার আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। এগুলোকে ঠিক সভ্যতা বলা ঠিক হবে না, বরং এদেরকে অসভ্যতা নামে অভিহিত করা উচিত। এমনই একটি অসভ্য সমাজের নাম হল আউরেউরগথ। এদের নামটা উচ্চারণ করা যতই সহজ হোক না, এরা আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে বর্বর সভ্যতা।

আউরেউরগথ - কি খটমট নাম রে বাবা! আমরা একে অপরের দিকে চাইলাম। না, উচ্চারণ করা একেবারেই সহজ নয়। আমি নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম,
আউরেউরগথ। হয়তো একটু জোরেই বলে ফেলেছিলাম। দেখি ড্রেগলস কথা থামিয়ে আমার দিকে চাইছে। সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তো লজ্জায় একেবারে পারলে মেঝের সাথে মিশে যাই। মাথা নিচু করে আড়চোখে মার দিকে তাকালাম, দেখি মা মিটিমিটি করে হাসছেন। আমি তো আশ্চর্য! মা তাহলে রাগ করে নি।
    
ড্রেগলস আবার গলাটা পরিষ্কার করে নিল। বলতে আরম্ভ করে,
আউরেউরগথের কাজই হল উন্নত সভ্যতার গ্রহগুলিতে আক্রমণ করে তাদের প্রকৌশল লুট করা। শুধুমাত্র প্রকৌশলের মধ্যে তাদের তাণ্ডব সীমায়িত থাকলেও হত, কিন্তু তারা সেই গ্রহের অধিবাসীদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণের পরে তাদের কি হয় আমরা জানি না, হয়তো তাদের দাস বানানো হয়। দাসপ্রথা কি সে সম্বন্ধে তোমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এককালে এই ন্যাক্কারজনক অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। এমনও হতে পারে…’

পরের কথাগুলো বলতে ড্রেগলস ইতস্ততঃ করে, পাশে দাঁড়ানো অন্যান্য বড়দের দিকে চায়, তারপর বলে,  ‘…আউরেউরগথরা অন্য গ্রহের অধিবাসীদের হত্যা করে তাদের পাশবিক আনন্দ , বাক্যটা ড্রেগলস শেষ করতে পারে না। পাশবিক মানে কী, আমি ভাবি। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলে ক্যাপ্টেন নেনা, নেনা বেশ সশব্দে গলা খাঁকারি দেয়। ড্রেগলস নেনার দিকে তাকায়, বোঝা যায় ড্রেগলসের কথা নেনার পছন্দ হচ্ছে না। দেখলাম মার মুখটাও কেমন অন্ধকার, মারও ড্রেগলসের কথা পছন্দ হয় নি। নেনা হল বেলকের মা, বেলক তার সমস্ত অনুসন্ধিৎসা আর সাহস নেনার কাছ থেকেই পেয়েছে।

ড্রেগলস তার বাক্যটা আর শেষ করে না। বলে, আমরা আমাদের এই যাত্রায় আউরেউরগথদের সম্মুখীণ যাতে না হই তার জন্য সর্বরকম চেষ্টা করেছি। দু-একবার আমাদের রাডারে তাদের মহাকাশযানের চিহ্ন ধরা পড়েছিল, আমরা সুকৌশলে সেগুলো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু আজ জেমলাতে তাদের একটা কেন্দ্র আমরা আবিষ্কার করেছি। যদিও সেই কেন্দ্রে কোনো আউরেউরগথ নেই, কিন্তু জেমলার কক্ষপথে আমাদের উপস্থিতি নিশ্চয় সেই কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই মুহূর্তে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করতে হবে, তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যেয়ে মহাকাশযানের ত্বরণের জন্য প্রস্তুতি নাও।

আউরেউরগথ! এতদিন আমাদের কেন তাদের সম্বন্ধে বলা হয় নি। তারপরই মনে হল আমাদের মন যাতে অশান্ত না হয়ে সেজন্যই আমাদেরকে আউরেউরগথ সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। আউরেউরগথ তাহলে জেমলা পর্যন্ত এসে গেছে। ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম, সেটা বেলকের দৃষ্টি এড়াল না, সে আমার হাতের ওপর ওর হাত রেখে আশ্বাস দিতে চাইল। কীরকম দেখতে আউরেউরগথরা? আমি ভাবলাম। তার কি অক্টোপাসের মত দেখতে?

এদিকে লাহে, এমা আর ইলিয়ালের মুখ দেখলাম একদম চুপশে গেছে, সেটা ভয়ে না ক্ষিদেয় বোঝা গেল না। তবে ইলিয়াল একটু জোরেই বলে ফেলল,
ক্ষিদে পেয়েছে। দেখলাম ক্যাপ্টেন নেনা সামনে এগিয়ে এল। সে বলল, ছেলে মেয়েরা, তোমাদের একটা করে খাবারের প্যাকেট দেয়া হবে, সেটা নিয়ে তোমরা ঘরে চলে যাও। ঘরে গিয়ে, ঘরের যে সমস্ত জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলো আলমারিতে তুলে তালা দেবে। মহাকাশযানের ত্বরণ-চেয়ারটিতে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নেবে। এর আগে তোমাদের খাবারের জন্য দশ মিনিট সময় দেয়া হল। আন্তারেস পনেরো মিনিটের মধ্যে জেমলার কক্ষপথ ত্যাগ করবে। 

নেনার কথা শেষ হতে না হতেই
রান্নাঘরের দরজা খুলে গেল। সাইবোক আর রোবক একগাদা খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকে প্রতিজনকে একটা করে প্যাকেট দিতে আরম্ভ করল। আমরা প্যাকেট নিয়ে দৌড় দিলাম। দৌড় দৌড়। করিডর দিয়ে, জানালা দিয়ে নিচে জেমলা গ্রহ দেখা যাচ্ছিল।  আমার সাথে বেলকও দৌড়াচ্ছিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বেশ চিন্তিত মনে হল। আমার ঘরের আগেই বেলকের ঘর, ও বাই বলে ঢুকে গেল। আমার ঘরের সামনে আসা মাত্র দরজা নিজ থেকে খুলে গেল। আসলে এর মধ্যে তিনটে ঘর। একটা আমার, একটা বাবা মার, আর একটা পড়াশোনা করার, খেলার। বাঁদিকে বাবা মার ঘর, ডানদিকে প্রথমে পড়াশোনার ঘর, তারপর আমার ঘর, মাঝখানে একটা করিডর। শুনেছি পৃথিবীর ছোট ছোট ফ্ল্যাটবাড়ি নাকি এরকমই হয়।

আমার বাবা এই মহাকাশযানের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার, তাকে বেশীরভাগ সময়ই ইঞ্জিন ঠিকমত চলছে কিনা সেটা দেখে রাখতে হয়। উনি আবার মহাকাশযানের ত্বরণের সময় ঘরে থাকেন না। মাও এই সময়ে সে মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকেন। কাজেই আমি একাই আমার ঘরে ঢুকে ত্বরণ-চেয়ারে বসি। হাঁপিয়ে গেছিলাম পুরোই। বসামাত্র সামনে টেলিভিশনের স্ক্রিনে নিয়ন্ত্রণকক্ষ দেখা গেল। ড্রেগলস, মা, নেনা সবাই ছুটোছুটি করছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষের বিশাল স্ক্রিনে আবার বাইরের মহাকাশ দেখা যাচ্ছে। তাতে মাঝে মধ্যেই জেমলার কিছু অংশ এবং মিহির তারাটিও দেখা যাচ্ছে।

আমি খাবার প্যাকেটটা খুলে সামনের টেবিলে রাখি। খেতে আরম্ভ করি। 

পর্ব ২-এর লিঙ্ক  



২টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. পড়তে পড়তে নিজেকে শোগি বলেই মনে হচ্ছিল। আউরেউরগথ জানতে পারবে না তো যে আমরা এত কাছে আছি ! লেখকের প্রতিটি গল্পের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা ও অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়। নাঃ, নিবারণ চক্রবর্তীর দেখা পাবার ভয় অন্তত নেই, আউরেউরগথ-টাই বেশ ভাবনার কারণ হয়েছে। তবে আশা করছি শীঘ্রি আমরা তার আওতার বাইরে চলে যেতে পারবো বা তাদের পরাজিত করতে পারব... বেশী অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না...

    উত্তরমুছুন