বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

ঝুম্পা লাহিড়ী'র সঙ্গে সাহিত্য ও লেখক জীবন নিয়ে আলাপ

'ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিজ', 'দ্য নেমসেক', 'আনঅ্যাকাস্টমড আর্থ' এবং 'দ্য লো-ল্যান্ড'- এ পর্যন্ত এই চারটি ফিকশনের লেখক ভারতীয়-আমেরিকান লেখিকা ঝুম্পা লাহিড়ী। সাহিত্যকর্মের জন্য হেমিংওয়ে পুরস্কার, ও'কোনার ইন্টারন্যাশনাল শর্ট স্টোরি পুরস্কার, দ্য প্রাইজ ফর সাউথ এশিয়ান লিটারেচার-সহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন।

গল্প-সংকলন 'ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিজ'-এর জন্য ২০০০ সালে পেয়েছেন পুলিৎজার পুরস্কার। জন্ম- যুক্তরাজ্যে, ১৯৬৭ সালে। এই সাক্ষাৎকারটি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল। ভাষান্তর : এমদাদ রহমান।




দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
এই মুহূর্তে কোন বইটি পড়ছেন? আপনি কি একই সাথে একাধিক বই পড়েন? 

ঝুম্পা লাহিড়ী :
এখন পড়ছি প্যাত্রিসা ক্যাভালি'র কবিতা, ইতালির রোমে যার সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়াটা ছিল জন্য গভীর আনন্দের। আমি তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করি। তাঁর কবিতা মনে রেখাপাত করেছে। আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলিকে তিনি বর্ণনা করেন এমনভাবে যা অন্য কারও সাথে মিলে না। আমি তাঁর কবিতার ইতালিয়ান এবং ইংরেজি ভাষার একটি দ্বিভাষিক সংস্করণের জন্য শিহরিত হচ্ছি যা আসছে শরতে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে। এছাড়া আমি এখন পড়ছি চেসারে পাভিসি'র চিঠিপত্র, উপন্যাস আর চলচ্চিত্রের আশ্চর্য মিশ্রণে লেখা পাসোলিনি'র 'তিওরেমা'। এভাবে কবিতা, ফিকশন, চিঠিপত্র কিংবা লেখকদের ডায়রি ইত্যাদি একসাথে পড়াকে দারুণ উপভোগ করি।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
এ-বছর এখন পর্যন্ত পঠিত আপনার বিবেচনায় সেরা বই কোনটি? 
ঝুম্পা লাহিড়ী : 
'লাভারস' নামের একটি উপন্যাস যার লেখক একজন ফ্রেঞ্চ, ড্যানিয়েল আরসান্ড। উপন্যাসটিকে আমি প্রথমে ইংরেজি অনুবাদে পড়েছি, তাঁর পর ইতালিয়ানে। এ এমন এক মর্মভেদী প্রেমের উপাখ্যান যা মিশেছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। বইটি অতিকথনের ভারে ন্যুব্জ নয়, ন্যারেটিভের আশ্চর্য কারুকাজ আছে। আমি এই বইয়ে খুঁজে পেয়েছি সাহিত্যপাঠের এক অনাস্বাদিত আনন্দ, গদ্যের ম্যাজিক, এবং এক ব্যতিক্রমী স্বর। একটি গল্পকে যে কতভাবে বলা যায়- এই ব্যাপারে বইটি আমাকে পথ দেখাবে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
যদি প্রিয় ঔপন্যাসিকের নাম বলতে হয়, নামটি কার হবে? 

ঝুম্পা লাহিড়ী :
টমাস হার্ডি। হাইস্কুলে থাকতে তাকে প্রথম পড়ার পর থেকেই আমি তাঁর চরিত্র, স্থান-কাল, মানব জীবনের প্রতি তার নিষ্করুণ দৃষ্টিভঙ্গি- এইসব ব্যাপারের সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক অনুভব করি। সুযোগ পেলেই তাঁর লেখা আমি পড়ি। বারবার পড়ি। হার্ডির উপন্যাসের আর্কিটেকচার চমৎকার। স্থান-কালের ধারণার ভিতর দিয়ে চরিত্রদের পরিভ্রমণকে তিনি স্মরণযোগ্য কুশলতায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। তিনি যে জগতটিকে গড়ে তোলেন তা সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট, তার চিরচেনা; যেন তার নিজেরই মনোভূমি। লেখার জটিলতা স্বত্ত্বেও তার গদ্য মসৃণ, অকপট, মিতবাক। কোনও একটি দৃশ্য, বর্ণনার খুঁটিনাটি, কিংবা একটি বাক্যও তিনি অপ্রয়োজনে লিখেন নি।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস :
আর, আপনার প্রিয় ছোটগল্পকার?

ঝুম্পা লাহিড়ী : 
উইলিয়াম ট্রেভর, মাভিস গ্যালান্ট, গিনা ব্যারিওল্ট, ফ্ল্যানারি ও'কোনার, এলিস মুনরো, আন্তন চেখভ, শিভার, ম্যালামুদ, মোরাভিয়া। সম্প্রতি আমি জর্জিও ম্যাঙ্গনেলি'র কিছু লেখা পড়েছি, 'সেঞ্চুরিয়া' নামে তাঁর গল্পের একটি সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে, একশ'টি গল্প স্থান পেয়েছে সংগ্রহটিতে; প্রতিটি গল্প দৈর্ঘ্যে মাত্র এক পৃষ্ঠা। কিছু গল্প সেখানে পরাবাস্তব, এবং চূড়ান্ত অর্থে-- গভীর জীবনলগ্ন; যুগপৎ হিংস্র এবং পবিত্র, ঠিক যেন এক শট কড়া ব্র্যান্ডি। আমি আবিষ্কার করেছি যে- লিখতে বসবার আগে তাঁর একটি গল্প পড়ে বসলে লেখাটি বেশ ভালভাবে শুরু করা যায়।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
পড়েছেন এবং নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এমন কোনও 'ইমিগ্রান্ট ফিকশন' আছে কি?

ঝুম্পা লাহিড়ী :
আমার সত্যিই জানা নেই ঠিক কীভাবে এই 'অভিবাসী উপাখ্যান' (ইমিগ্রান্ট ফিকশন) টার্মটির জন্ম হয়েছে! লেখকরা সবসময়ই যে মহাদেশ থেকে এসেছেন সেটা নিয়েই লিখেছেন। এই দুনিয়ার তাবৎ লেখকই তো বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ে উঠেছেন; এক সময় তারা তাদের উৎসভূম ছেড়ে অন্যপ্রান্তে চলে এসেছেন চিরিস্থায়ীভাবে, নিজেরাই বেছে নিয়েছেন তাদের পছন্দের জায়গা, কোথাও আশ্রয় নিয়েছেন, কখনও হয়তো চলে আসাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল কিংবা কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশত্যাগ করতে হয়েছে-- তারপর তারা সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। এখন যদি নির্দিষ্ট কয়েকটিকে বইকে 'ইমিগ্রান্ট ফিকশন' নামে একটি বিশেষ টার্মে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে বাদবাকি বইগুলিকে আমরা কী বলব? নেটিভ ফিকশন? পিউরিটান ফিকশন?

এই সহজ চিহ্নিতকরণ বিষয়ে কেউই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের যে ইতিহাস আমরা জেনেছি, তাতে সমস্ত আমেরিকান উপন্যাসকেই 'ইমিগ্রান্ট ফিকশন' হিসেবে শ্রেণিভূক্ত করে ফেলা যাবে। নাথানিয়েল হথর্ন অভিবাসীদের নিয়ে লিখেছেন, উইলা ক্যাথারও লিখেছেন; সাহিত্যের একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই কবি ও লেখকরা তাদের ন্যারেটিভের ভিত্তি হিসেবে একজায়গায় থিতু হয়ে থাকবার পরিবর্তে সীমান্ত অতিক্রম, দীর্ঘ অভিযাত্রা, দেশত্যাগ, নির্বাসন, বিপদের মুখোমুখি হওয়া ইত্যাদি বিষয়কেই বেছে নিয়েছেন। 'আগন্তুক'ই হচ্ছে মহাকাব্য এবং উপন্যাসের আর্কেটাইপ। বিচ্ছিন্নতা এবং মিলনের মধ্যকার যে মানসিক টানাপড়েন, সাহিত্যে সেটাই মৌলিক থিম।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
পাঠের সময় একটি গল্পের কোন দিকটি আপনাকে টানে? কোনও কিছু পাঠে বিঘ্ন ঘটায়? 

ঝুম্পা লাহিড়ী : 
সেই গল্পগুলিই আমি পড়তে আগ্রহ বোধ করি যে-গল্পগুলি আমাকে প্রথম বাক্যটি থেকে পরের বাক্যটিকে পড়তে টেনে নিয়ে যাবে। এছাড়া আমার কাছে আর কোনও মাপকাঠি নেই।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
বুক শেলফে হঠাৎ কোনও বই খুঁজে পেয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন?

ঝুম্পা লাহিড়ী :
আমার শেলফের প্রায় সবগুলি বইই ইতালিয়ান ভাষার। কয়েক বছর ধরেই আমি প্রধানত ইতালিয়ানেই পড়ছি। যে কারণে আমাকে খুবই ধীর গতিতে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু পড়তে হচ্ছে খুব সতর্কতার সঙ্গে, এবং গভীর একাগ্রতায়।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
শুধু নিজের জন্য কিংবা আত্মবলম্বনের জন্য কখনও কি কোনও বই পড়েছিলেন? 

ঝুম্পা লাহিড়ী : 
সাহিত্য সর্বক্ষণ এবং চিরকালের জন্যই আমার একমাত্র আশ্রয়। 

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস :
আপনার বেড়ে ওঠার সাথে কোনও বিশেষ চরিত্রের মিল খুঁজে পান? আপনার জীবনে সাহিত্যিক নায়ক কারা?


ঝুম্পা লাহিড়ী :
'অ্যান অব গ্রিন গাবোলস'-এর মতো বাপ-মা হারিয়ে ফেলা চরিত্র কিংবা লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের চরিত্রগুলি যারা কিছু একটা সব সময় খুঁজে বের করে ফেলে; কিংবা সেইসব শিশুরা যারা এক কল্পলোক থেকে অন্য কল্পলোকে ঘুরে বেড়ায় 'দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওরড্রোব'-এর ভাই বোনের মতো; আর একজন অন্যরকম লেখক আছেন, যার 'লিটল উইম্যান'-এর সেই 'জো' চরিত্রটি। আমি 'ফ্রম দ্য মিক্সড-আপ ফাইলস অব মিসেস বাসিল ই ফ্রাঙ্কউইলার'-এর সেই ভাইবোনদের ভালোবাসি যারা ঘর থেকে একদিন পালিয়ে যায় আর জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে থাকে। আমি কখনোই আর্ট মিউজিয়ামে যেতে পারি না তাদের কথা না ভেবে।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
কোন বইটি নিজের ছেলেমেয়েদের সাথে মিলে মজা করে করে পড়েছেন? তাদের সাথে নিয়ে আপনার আর কোনও বিশেষ নির্বাচন করেছেন কি?

ঝুম্পা লাহিড়ী :
গত প্রায় দশ বছর ধরেই আমি ও আমার স্বামী আমাদের সন্তানদের জন্য প্রতি রাতেই কিছু না কিছু পড়ছি (বড় ছেলেটি এখন ১১'য় পড়েছে)। একেক রাতে আমরা একেকজন পড়ি। আমি পঠিত বইগুলি বারবার পড়তে এবং এটা নিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে পছন্দ করি, আর বইগুলিকে বাচ্চাদের মতোই ভালবেসে ফেলি, যেমন ধরুন- এস্ট্রিড লিন্ডগ্রেনের লেখা 'পিপি লংস্টকিং' সিরিজটি এবং রোয়াল্ড ডালের সবগুলি লেখা। আমি আসলে বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে নতুন নতুন বই পড়তে খুব পছন্দ করি। গত গ্রীষ্মে একসাথে মিলে আমরা দারুণ একটা সিরিজ পড়ে ফেলেছি- মেরিরোজ-এর 'দ্য ইনক্রেডিবল চিলড্রেন অব অ্যাসটন প্লেস'। সেইসব দিনগুলিতে আমি আমার বাচ্চাদের জন্যও ইতালিয়ানে পড়তাম, যা তারা এখনও করছে। আমরা কিছু অসাধারণ কল্পকথা পড়তাম ইতালো কালভিনো যেগুলিকে পুনর্লিখন করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে গিয়েনি রোডারি'র মজাদার উপকথার সংগ্রহ- 'লে ফাভোলেত্তে দি এলিস'। গল্পটি ছোট্ট একরত্তি একটি মেয়ের যে নিজেকে আটকে থাকতে দেখে ছোট ছোট বাক্সের ভেতর, কালির বোতলে, জন্মদিনের কেইকে আর সাবানের ফেনায়।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
সাহিত্যের কোন চরিত্রটি আপনি হতে চান? 

ঝুম্পা লাহিড়ী :
ব্রাইডসহেড রিভিজিটেড-এর সেবাস্টিয়ান ফ্লাই, কিন্তু শুধুমাত্র প্রথম অধ্যায়গুলির ফ্লাই--ঘটনাপ্রবাহ খারাপের দিকে মোড় নেবার আগে। ডিনারের জন্য আমার সব সময়ই উপযুক্ত পোষাক পরার ইচ্ছা ছিল।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
আপনার যদি কোনও লেখকের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছা করে, জীবিত কিংব অ্যা মৃত, তিনি কে হবেন? তার কাছ থেকে আপনি কী জানতে চাইবেন?

ঝুম্পা লাহিড়ী :
যেসব বই আমি ইতোমধ্যে পড়েছি সেগুলির লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাতের আইডিয়াটি আমাকে আগ্রহী করেনি কখনও। আমাকে এটা বলতেই হবে যে- আমি কখনোই এ ব্যাপারে আগ্রহী হবো না। পঠিত বইটি যদি আমার ভিতর সারাক্ষণ জেগে থাকে, বাক্যগুলি যদি আমার সাথে কথা বলতে থাকে- সেটাই অনেক বেশি। একজন পাঠকের সম্পর্ক শুধুমাত্র বইয়ের সাথে, শব্দের সাথে, সেই ব্যক্তির সাথে নয় যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। আমাকে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য লেখককে দরকার নেই, কিংবা লেখার বিষয়ে কোনোরকমের হস্তক্ষেপেরও কিছু নেই। তবুও বলি- একবার শুধু এডওয়ার্ড গোরে'র সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর আগে সাক্ষাৎ করতে চাই শুধুমাত্র তাঁর প্রতিভার উজ্জ্বল দীপ্তিকে স্যালুট জানানোর জন্য।


দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস : 
এখন কোন বইটি পড়বেন বলে ঠিক করেছেন?

ঝুম্পা লাহিড়ী : 
আন্তোনিও তাবুচি'র ভ্রমণবিষয়ক লেখাগুলি এখন পড়ব বলে ভাবছি।


অনুবাদক পরিচয়
এমদাদ রহমান
গল্পকার। প্রবন্ধকার। অনুবাদিক।
লন্ডনে থাকেন।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন