(৪)
সেই রাতে, মায়ের অবর্তমানে, স্কারলেট সাপারের টেবিল পরিচালনার
দায়িত্ব নিল, তবে অ্যাশলে আর মেলানির ব্যাপারে
ভয়ঙ্কর যে খবরটা শুনেছে সেটা মনের ভেতর তোলপাড় করতেই থাকল। অধীর চিত্তে
স্ল্যাটারিদের ওখান থেকে মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল, মা’কে কাছে না পেয়ে
নিজেকে দিশেহারা আর নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল। স্ল্যাটারিরা আর ওদের চিররুগ্নতা কোন
আক্কেলে এলেনকে বাড়ি থেকে টেনে নিয়ে গেল, আর ঠিক তখনই, যখন ওর, স্কারলেটের নিজেরই,
মাকে এত প্রয়োজন?
আহার চলাকালীন গুমোট পরিবেশে, পুরোটা সময় জুড়ে জেরাল্ডের হেড়ে গলা ওর কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল,
এক সময় মনে হতে লাগল আর ও সহ্য করতে পারবে না। সেদিনই বিকেলে ওর সঙ্গে যে সব কথাবার্তা
হল, সেসব বেমালুম ভুলে গিয়ে, ফোর্ট সামটারের সর্বশেষ খবর নিয়ে নিজের মনে বকবক করে চললেন,
আর তার সঙ্গে সঙ্গেই চলতে লাগল টেবিলের ওপর ঘুসি মেরে আর বাতাসে হাত নেড়ে নেড়ে আস্ফালন।
আহারের সময় কথাবার্তার সিংহভাগ জেরাল্ডেরই
দখলে থাকে, সাধারণত, স্কারলেট আপন ভাবনায় মশগুল হয়ে থাকে, কানে ওর কিছুই ঢোকে না; তবে
আজ কোনোভাবেই কান বন্ধ করে রাখতে পারছে না, কারণ প্রতি মুহূর্তেই এলেনকে নিয়ে ফিরে
আসা ঘোড়ার গাড়ির আওয়াজের জন্য উৎকর্ণ হয়ে বসে আছে।
কেন যে মনটা এত ভার হয়ে আছে, সেটা অবশ্য
মাকে বলা যাবে না, তাহলে এলেন এই ভেবে দুঃখ পাবেন যে তাঁর মেয়ে এমন একজন পুরুষকে কামনা
করে যে কিনা অন্য একটি মেয়ের বাকদত্ত। কিন্তু জীবনের প্রথম বেদনাদায়ক ঘটনার সম্মুখীন
হয়ে, মায়ের সান্নিধ্যে সান্ত্বনা পেতে মন চাইছে। এলেন ওর পাশে থাকলে নিজেকে খুব নিরাপদ
মনে হয়, কারণ এমন কোনও কষ্টই নেই যা এলেন কাছে থাকলে লাঘব হয় না।
ড্রাইভওয়েতে গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় শব্দ
শুনে চকিত হয়ে স্কারলেট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার হতাশ হয়ে বসে পড়ল, কারণ
আওয়াজটা ক্রমে বাড়ির পেছনের উঠোনের দিকে মিলিয়ে গেল। এটা এলেনের হবে না, কারণ উনি হলে
বাড়ির সামনেই নামতেন। এবারে পেছনের উঠোনের অন্ধকার থেকে কিছু নিগ্রো কণ্ঠের কলকলানি
ভেসে এল আর ওদেরই অট্টহাসির তীক্ষ্ণ আওয়াজ। জানলার বাইরে পোর্ককে দেখতে পেল, একটু আগেই ঘর ছেড়ে
বেরিয়েছে, পাইনের গাঁট দিয়ে তৈরি একটা মশাল উঁচু করে হাতে ধরা, আর কয়েকটা অস্পষ্ট মূর্তি
ওয়াগন থেকে নামছে। বেশ হাসিখুশি, ঘরোয়া, চিন্তাশূন্য মেজাজে হাসি আর কথাবার্তা রাতের
অন্ধকার আকাশকে ভরিয়ে তুলল। পেছনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পায়ের আওয়াজ, দালান পেরিয়ে
বড় বাড়িতে ঢোকার আওয়াজ, ভোজন কক্ষে ঢোকার মুখে হলঘরে থমকে দাঁড়ানো। অল্প একটু ফিসফিসানি,
তারপর পোর্কের প্রবেশ, স্বভাবোচিত গ্রাম্ভারি ভাবটা নেই, উজ্জ্বল চোখ, সাদা সাদা দাঁত
ঝিলিক মারছে।
“মিস্ট’ জেরাল্ড,” হাঁপাতে হাঁপাতে
বলল, খুশিতে চকচকে মুখে বরোচিত গর্ব ফুটে উঠেছে। “আপনের নতুন চাকরানী হাজির হয়েছে।”
“নতুন চাকরানী? কই আমি তো কোনো নতুন
চাকরানী কিনিনি,” ছদ্ম কোপে জেরাল্ড বলে উঠলেন।
“জী, হুজুর, কিনেছেন তো, মিস্ট’ জেরাল্ড!
জী, হুজুর! ও বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে আপনের সাথে কথা বলবে বলে,” ফিকফিক করে হেসে হাত কচলাতে
কচলাতে পোর্ক জবাব দিল।
“বটে! তা কনেকে ডাক,” জেরাল্ড বললেন,
পোর্ক হলঘরে উঁকি মেরে বউকে ডাকল। উইল্কসদের প্ল্যান্টেশন থেকে সদ্য এসেছে, ও’হারা
পরিবারের অংশ হবার জন্য। ও ঘরে ঢুকল আর ওর পায়ে পায়ে, মায়ের বৃহদায়তন ক্যালিকো স্কার্টের
পেছনে প্রায় আড়াল হয়ে থাকা ওর বারো বছরের মেয়েও ঢুকল।
ডিলসি বেশ লম্বা গড়নের, শিরদাঁড়া ঋজু
রেখে দাঁড়িয়েছে। ওর বলিরেখাবিহীন অবিচল তামাটে মুখ দেখে বয়স বোঝা দুষ্কর, তিরিশ থেকে
ষাটের মধ্যে যা কিছু হতে পারে। নিগ্রোগোত্রীয় বৈশিষ্টের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে ইন্ডিয়ান
রক্তের সংমিশ্রণটা ওর চেহারায় স্পষ্ট। ত্বকের লালচে রঙ, অপ্রশস্ত উঁচু কপাল, চোখের
নীচের উদ্গত অস্থি, পুরু নিগ্রো ঠোঁটের ওপরে বাজপাখির মত নাকটা এসে সমতল হয়ে যাওয়া,
সব মিলিয়ে দুই জাতের রক্তের সংমিশ্রণ ঘোষণা করছে। বেশ আত্মস্থ ভঙ্গিমা, সম্ভ্রমপূর্ণ
হাঁটাচলায় ম্যামিকেও ছাড়িয়ে যায়, কারণ সম্ভ্রমবোধ ম্যামিকে অর্জন করতে হয়েছিল, আর ডিলসির
সম্ভ্রমবোধ ওর রক্তে মিশে আছে।
যখন কথা বলল, বেশিরভাগ নিগ্রোর মত জড়ানো
নয় ওর কণ্ঠস্বর, শব্দ নির্বাচনেও যত্নের পরিচয় পাওয়া গেল।
“শুভ সন্ধ্যা, মিসেরা। মিস্ট’ জেরাল্ড,
আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আমাকে আর আমার বাচ্চাকে কিনে নেওয়ার জন্য আপনার
সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করছিল। অনেক হুজুরই হয়ত আমাকে কিনে
নিতেন, কিন্তু আমার প্রিসিকে কিনতে রাজি হতেন না, আমাকে দুঃখ পাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য,
আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি জীবন দিয়ে আপনাদের সেবা করে যাব, আপনার দয়া আমি কখনোই ভুলব
না।”
“এহুম – আহ্ - গ্ - ঘ্,” বদান্যতা
এত খোলাখুলি ধরা পড়ে যাওয়ায় জেরাল্ড বিব্রত হয়ে গলা সাফ করতে করতে বললেন।
ডিলসি স্কারলেটের দিকে ঘুরল, হাসির
মত অভিব্যক্তিতে চোখের কোণ সামান্য কুঁচকে গেল। “মিস স্কারলেট, পোক আমাকে বলেছে যে
মিস্ট’ জেরাল্ডকে আপনিই বলেছিলেন আমাকে কিনে নিতে। তাই আমার প্রিসিকে আপনার নিজের পরিচারিকা
হিসেবে দিয়ে দিতে চাই।”
পেছন থেকে হ্যাঁচকা টান মেরে বাচ্চা
মেয়েটাকে সামনে নিয়ে এল। বাদামি রঙের ছোট্টখাট্টো একটা জীব, পাখিদের মত লিকলিকে দুটো
পা, আর যত্ন করে বাঁধা অজস্র বিনুনি মাথা থেকে খাড়া হয়ে বেরিয়ে আছে। তীক্ষ্ণ, সবজান্তা
চোখ, যেন কোনোকিছুই ওর নজর এড়িয়ে যেতে পারবে না, আর সজ্ঞানে মুখের ওপর একটা বোকা বোকা
ভাব ফুটিয়ে রেখেছে।
“ধন্যবাদ, ডিলসি,” স্কারলেট জবাব দিল,
“তবে মনে হয়, এই ব্যাপারে ম্যামির কিছু বলবার থাকতে পারে। আমার জন্মলগ্ন থেকেই ও-ই
আমার পরিচারিকা।”
“ম্যামির তো বয়স হয়ে যাচ্ছে,” ডিলসি
বলল, এমন শান্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলল যে ম্যামির রেগে ওঠার পক্ষে যথেষ্ট। “ও খুবই ভাল
ম্যামি, কিন্তু আপনার বয়স কম, ভাল একজন পরিচারিকার খুব প্রয়োজন, আমার প্রিসি এক বছর
ধরে মিস ইন্ডিয়ার পরিচারিকা হিসেবে কাজ করছিল। একেবারে বড়দের মতই ও সেলাইয়ের কাজ করতে
পারে, চুল বেঁধে দিতে পারে।”
মায়ের খোঁচা খেয়ে প্রিসি চট করে নতজানু
হয়ে স্কারলেটকে ‘বাও’ করে হেসে ফেলল, স্কারলেটও না হেসে পারল না।
“খুদে বিচ্ছু একটা,” মনে মনে ভাবল,
তারপর বলল, “ধন্যবাদ, ডিলসি, মা বাড়ি ফেরার পরই নাহয় এটা নিয়ে ভাবা যাবে।”
“ধন্যবাদ, ম্যা’ম। আমি আপনাদের শুভ
রাত্রি জানাচ্ছি,” ডিলসি বলল, তারপর দরজার দিকে ঘুরে মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল,
পেছনে পেছনে পোর্ক।
সাপারের টেবিল সাফ হয়ে যাবার পর জেরাল্ড
আবার ভাষণ শুরু করলেন, কিন্তু বিশেষ তৃপ্তি পেলেন না, আর ওঁর শ্রোতারা তো একেবারেই
পেলেন না। যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা নিয়ে বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে ওঁর ভবিষ্যদ্বাণী,
আর দক্ষিণের কী ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে আরও অপমান সহ্য করা উচিত কিনা এই প্রশ্ন নিয়ে ওঁর
বাগাড়ম্বর শুনে কিঞ্চিৎ উদাস প্রতিক্রিয়া, “হ্যাঁ, বাপি”, “না বাপি” মাঝে মাঝে ভেসে
আসছে। বড় ল্যাম্পটার পাশে নীচু গদীতে বসে ক্যারীন
ডুবে আছে একটি মেয়ে, যে কিনা প্রেমিকের মৃত্যুর পরে অবগুণ্ঠনের আড়ালে চলে গেছিল, তারই
প্রেমকাহিনীতে, আবেগকম্পিত হয়ে আনন্দের অশ্রু চোখ বেয়ে পড়ছে, নিজেকে সাদা ঘোমটায় কল্পনা
করে খুশিয়াল হয়ে উঠছে। স্যুয়েলেন একটা এম্বয়েডারি নিয়ে ব্যস্ত, মজা করে এটার নাম দিয়েছে
“আশার পেটি”, আর মতলব আঁটছে কী করে কালকের বারবেকিউতে, নিজের রমণীসুলভ কমনীয়তা – যা
কিনা স্কারলেটের এক বিন্দুও নেই – কাজে লাগিয়ে স্টুয়ার্ট টার্লটনকে দিদির দিক থেকে নিজের দিকে ভাঙ্গিয়ে
আনা যায়। আর স্কারলেটের হৃদয়ে অ্যাশলেকে নিয়ে তোলাপাড়া চলছে।
বাপি জানেন যে ওর মনটা ভেঙ্গে খানখান
হয়ে যেতে বসেছে, অথচ, কী করে উনি ফোর্ট সামটার আর ইয়াঙ্কিদের নিয়ে এমন বকবক করে যেতে
পারেন? ছেলেমানুষের মত অভিমান করে ভাবল, মানুষ কী করে স্বার্থপরের মত ওর কষ্টটা ভুলে
যায়? ওর মন খারাপকে কোনো পাত্তা না দিয়ে আনন্দে মশগুল হয়ে থাকে?
মনের অবস্থা এখন এমন যেন একটা প্রচণ্ড
তুফান সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে, এই যে ডাইনিং রুমে সবাই মিলে বসে আছে, প্রতিদিনের
মতই একই রকম শান্ত, অন্য দিনের থেকে কোনও তফাৎ নেই, কী আশ্চর্যের ব্যাপার! মেহগিনি
কাঠের ভারি টেবিল আর কাবার্ডগুলো, বড় বড় রুপোর বাসনপত্র, চকচকে মেঝের ওপর উজ্জ্বল রঙের
কার্পেট, সবই নিজের নিজের জায়গায় বিরাজমান, যেন কিছুই হয়নি। এই ঘরটা বেশ আমোদ আহ্লাদের
জায়গা, বেশ আরামদায়ক, সাধারণত, সাপারের পরে পরিবারের সঙ্গে স্কারলেট এই ঘরে কিছুক্ষণ
নিরিবিলিতে কাটাতে ভালোই বাসে; কিন্তু আজ এই ঘরে এক মুহূর্ত থাকতেই ইচ্ছে করছে না,
চলেই যেত, কিন্তু বাপির হেড়ে গলার প্রশ্নবাণের মুখে পড়ার ভয়ে যেতে পারছে না। চলে যেত
অন্ধকার হলটা পেরিয়ে এলেনের ছোট্ট অফিসঘরে, ওখানে পুরনো সোফাটায় বসে সব দুঃখ উজাড় করে
দিয়ে কাঁদত।
সারা বাড়িতে ওই ঘরটাই স্কারলেটের সবচাইতে
পছন্দের। প্রতিদিন সকালে এলেন ওই ঘরে সেক্রেটারিয়েট টেবিলটার সামনে বসে, প্ল্যান্টেশনের
হিসেব দেখেন আর ওভারসিয়ার জোনাস উইল্কারসনের কাছ থেকে খবরাখবর নেন। এলেন যখন লেজারে
কলম চালাতে থাকেন, তখন পরিবারের সকলে ওখানে জিরোতে আসে, জেরাল্ড বসেন পুরনো একটা দোলনা
চেয়ারে, আর মেয়েরা ঝুলে যাওয়া একটা সোফাতে, সেটা এতই জীর্ণ হয়ে গেছে যে বাড়ির সামনের
কোনো ঘরে রাখা যায় না। এখন স্কারলেটের সেখানেই চলে যাবার জন্য প্রাণ কাঁদছে, এলেনের
সঙ্গে একলা হয়ে, মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে শান্তিতে একটু কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এখনও কি মায়ের
ফেরার সময় হল না?
আর তখনই নুড়ি পাথরে বাঁধানো ড্রাইভওয়ে
থেকে চাকার ঘড়ঘড় আওয়াজ ভেসে এল, আর এলেনের অনুচ্চ স্বর, কোচোয়ানকে ছুটি দিলেন। উনি
দ্রুতপদে ঘরে প্রবেশ করতেই – ওঁর স্কার্টের বন্ধনি দুলছে, ক্লান্ত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে
ওঁকে – সবাই কৌতুহলী চোখে তাকাল। ওঁর প্রবেশ করার সাথে সাথেই লেমন ভারবেনার মৃদু সৌরভও
প্রবেশ করল, ওঁর পোশাকের ভাঁজ থেকে সর্বদাই এই সৌরভ আসে, যে সৌরভ স্কারলেটের মনে ওর
মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কয়েক পা পেছনে ম্যামিও ঢুকল, হাতে চামড়ার ব্যাগটা, নীচের ঠোঁট
বাইরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আর ভুরু কুঁচকে রয়েছে। থপ থপ করে চলতে চলতে ম্যামি কি সব গজগজ
করছে, গলার স্বর এতটা চড়া নয় যে কথাগুলো বোঝা যাবে, আবার এতটাও নীচু নয় যে ওর তীব্র
অসন্তোষটা কেউ লক্ষ্য করতে পারবে না।
“অত্যন্ত দুঃখিত – এত দেরি করে ফেললাম,”
ঝুলে পড়া কাঁধ থেকে ভারি শালটা খুলে স্কারলেটের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বললেন এলেন; আলতো
করে ওর গালে হাতটা ছুঁইয়েও দিলেন।
ওঁকে প্রবেশ করতে দেখে যেন জাদুমন্ত্রবলে
জেরাল্ডের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
“ব্যাপটাইজ় করতে পারলে ছোঁড়াটাকে?”
জানতে চাইলেন।
“হুঁ – বাঁচল না, বেচারা,” এলেন বললেন।
“ভয় পেয়েছিলাম, এমিও হয়ত গেল, তবে এযাত্রা বেঁচে গেল বলেই মনে হয়।”
মেয়েরা চকিত হয়ে ওঁর পানে তাকাল, চোখে
নানা প্রশ্ন, জেরাল্ড দার্শনিক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
“মরে বেঁচেছে ছোঁড়াটা – বাপের ঠিক নেই
– ”
“দেরি হয়ে গেছে। প্রার্থনায় বসে পড়া
দরকার,” এলেন ওঁকে বাধা দিয়ে বললেন, কিন্তু এমন সহজ গলায় বাধাটা দিলেন যে স্কারলেট
যদি ওর নিজের মা’কে ভালভাবে না চিনত, বাধা দেওয়াটা ধরতেই পারত না।
এমি স্ল্যাটারির বাচ্চার বাপটা কে সেটা
জানার খুব আগ্রহ হচ্ছিল, কিন্তু স্কারলেট জানত যে সত্যিটা মায়ের কাছ থেকে জানার কোনও
উপায় নেই। স্কারলেটের সন্দেহ জোনাস উইল্কারসনকে,
অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পরে ওকে প্রায়শই এমিকে নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছে। জোনাস একজন ইয়াঙ্কি আর তার ওপর অবিবাহিত, আর ওভারসিয়ার
হবার কারণে কাউন্টির সামাজিক জীবনে প্রবেশ চিরতরে রুদ্ধ। এমন কোনও সম্পন্ন পরিবার নেই
যাদের মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে হতে পারে, স্ল্যাটারিদের মত নিম্নশ্রেণির কিছু পরিবার ছাড়া
আর কারোর সাথে মেলামেশার করার অধিকারও নেই। শিক্ষাদীক্ষায় যেহেতু ও স্ল্যাটারিদের চেয়ে
অনেক ওপরে, এমিকে নিয়ে সন্ধেবেলা যতই ঘুরুক না কেন, ওকে বিয়ে করতে ও চাইবে না।
স্কারলেট দীর্ঘশ্বাস ফেলল, জানার কৌতুহলটা
তীব্রভাবে অনুভব করছে। মায়ের চোখের সামনে কত কিছুই তো ঘটে যাচ্ছে, অথচ উনি এমন ভাব
করবেন যেন কিছুই ঘটেনি। যা কিছুই ওঁর শোভনতাবোধের সীমা লঙ্ঘন করে, উনি সেই সব কিছুই
অগ্রাহ্য করেন। স্কারলেটকেও সেরকমই করার শিক্ষা দেন, তবে বিশেষ লাভ হয়নি।
এলেন তাকের কাছে গিয়ে ছোট কৌটো, যার
মধ্যে জপমালাটা সর্বদাই গচ্ছিত রাখেন, থেকে সেটা আনতে যেতেই ম্যামি দৃঢ়স্বরে কথা বলে
উঠল।
“মিস এলেন, প্রার্থনায় বসার আগে তুমি
সাপার করে নাও।”
“ধন্যবাদ, ম্যামি, কিন্তু আমার যে খিদে
নেই।”
“আমি নিজের হাতে তোমার জন্য সাপার তৈরি
করে আনছি, আর সেটা তুমি খাবে,” ম্যামি বলল, বিরক্তিতে ওর কপাল কুঁচকে আছে। হলের দিকে পা বাড়িয়ে হাঁক লাগাল,
“পোক! কুকিকে মাছটা একটু গরম করে দিতে বল। মিস এলেন বাড়ি ফিরে এসেছেন।”
ম্যামির ভারি শরীরের চাপে কাঠের তক্তাগুলো
মড়মড় করে উঠল, সামনের হল থেকে ওর স্বগতোক্তির আওয়াজ ক্রমশই জোরালো হয়ে উঠতে লাগল, ডাইনিং
রুমে বসা সকলেই পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলেন।
“কতবার কয়েছি ওই সাদা চামড়ার কীটগুলোর
উবগার করতে যেওনি, কোনো লাভ হয়নে। অকম্মার ঢেঁকির দল, কেতজ্ঞতার ছিটেফোঁটাও নেই। মিস
এলেনের কী যে দায় পড়েছে এদের জন্যি সময় নষ্ট করবার, ভাবখানা এমন করে যেন কোনো নিগ্রো
চাকরানী ওদের সেবা করতিছে। আর আমি তো কয়েই দিয়েছি – ”
মাথার ওপরে একটা ছাদের আচ্ছাদন ছাড়া
পুরোপুরি খোলা লম্বা বারান্দা দিয়ে হেঁসেলে পৌঁছতে পৌঁছতে ওর গজগজানি মিলিয়ে গেল। মালিকপক্ষকে
প্রতিটি ব্যাপারে নিজের অবস্থান জানানোর জন্য এটা ম্যামির নিজস্ব কৌশল। ম্যামি জানে
যে কোনো নিগ্রো যদি নিজের মনে গজগজ করতে থাকে তাহলে বনেদি সাদা চামড়ার মানুষরা সেই
সব গজরানিতে কান দেওয়াটা রীতিমত অমর্যাদাকর বলে মনে করে। এটাও জানে নিজেদের সম্মান
রক্ষার জন্য, ও যা কিছু বলে যাচ্ছে, সবই ওরা না শোনার ভান করবে, এমনকি পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে
তারস্বরেও যদি বলে, তাহলেও। ফলে ও তিরস্কারের হাত থেকে বেঁচে যাবে, আর ওর মতামতটাও
সবার কাছে সন্দেহাতীতভাবে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
একটা প্লেট, রুপোর ছুরিকাঁটাচামচ হাতে
পোর্ক ঢুকল। পায়ে পায়ে ঢুকল জ্যাক, একজন নিগ্রো
শিশু, একহাতে সুতির জ্যাকেটের বোতাম তাড়াতাড়ি করে লাগাতে লাগাতে আর অন্য হাতে খাগড়ার
কাঠির ওপরে সরু লম্বা খবরের কাগজের টুকরো লাগিয়ে বানানো মাছি তাড়ুয়া নিয়ে, যেটা কিনা
ওর চাইতেও লম্বা। এলেনের একটা সুন্দর ময়ূরের পালকের মাছি তাড়ুয়া আছে, কিন্তু বিশেষ
অনুষ্ঠান ছাড়া সেটা ব্যবহার করা হয় না – তাও আবার নানা রকম গার্হস্থ্য অশান্তি সামলে,
কারণ পোর্ক, ম্যামি আর কুকির অন্ধ কুসংস্কার যে ময়ূরের পালক অমঙ্গল ডেকে আনে।
জেরাল্ডের এগিয়ে দেওয়া চেয়ারে এলেন
বসলেন, আর চারজনের কণ্ঠস্বর ওঁকে আক্রমণ করল।
“মা, কাল সন্ধেবেলা টুয়েল্ভ ওকসে যে
নতুন বলড্রেসটা পরে যাব বলে ভেবেছি, ওটার লেসটা আলগা। ওটা ঠিক করে দেবে তো?”
“মা, স্কারলেটের নতুন ড্রেসটা আমারটার
থেকে বেশি সুন্দর আর তাছাড়া গোলাপি রঙে আমাকে খুব বিচ্ছিরি দেখায়। ও কি আমার গোলাপি
ড্রেসটা পরতে পারে না? গোলাপিতে তো ওকে বেশ মানায়।”
“বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, মিসেজ়
ও’হারা – অ্যাই মেয়েরা চুপ কর, যাতে তোমাদের পেটাতে না হয়! কেড ক্যালভার্ট আজ সকালে
অ্যাটলান্টায় গেছিল, বলে কী – চুপ করবে তোমরা, কী বলছি নিজেই
শুনতে পাচ্ছি না? – বলছে যে সবকিছুই তালগোল পাকিয়ে আছে, আর ওখানে ওদের মুখে যুদ্ধ,
সামরিক অনুশীলন, ট্রুপ তৈরি করা ছাড়া আর কোনও কথাই নেই। আরও বলল, চার্লসটন থেকে নাকি
খবর এসেছে যে ওরা নতুন করে ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে অপমান সহ্যই করবে না।”
এলেন পরিশ্রান্ত মুখে একচিলতে হেসে
প্রথমে স্বামীর কথার জবাব দিলেন, পত্নীদের যেমন করা উচিত।
“চার্লসটনের মান্যগণ্য মানুষ যদি সেরকম
করেই ভাবেন, তাহলে মনে হয় আমরাও শিগগিরই একই ভাবে ভাবব,” উনি বললেন, কারণ ওঁর মনে দৃঢ়
একটা বিশ্বাস আছে যে একমাত্র স্যাভান্না ছাড়া, সমগ্র মহাদেশের বেশিরভাগ বনেদি মানুষের
দেখা ওই ক্ষুদ্র বন্দর শহরেই পাওয়া যায়, চার্লসটনের মানুষরাও কথাটা বিশ্বাস করেন।
“না, ক্যারীন সোনা, পরের বছর থেকে।
তখন তুমি বলড্যান্সের জন্য জেগে থাকতে পারবে, বড়দের পোশাকও পরতে পারবে, আর আমার মিষ্টি
গোলাপি সোনা কত মজাই না করবে! মুখ গোমড়া করো না, সোনা। বারবেকিউতে তুমি যেতে পার, সাপার
অবধি থাকতেও পারো, কিন্তু চোদ্দো বছরের আগে বলড্যান্স নয়।
“তোমার গাউনটা দিও আমায়, স্কারলেট।
প্রার্থনার পরে আমি লেসটা ঠিক করে রাখব।”
“স্যুয়েলেন, তোমার কথা বলার ধরণটা যে
আমার ভাল লাগল না, সোনা। তোমার গোলাপি গাউনটা খুব সুন্দর আর তোমার গায়ের রঙের সাথে
খুব মানায়, ঠিক স্কারলেটের সঙ্গে যেমন ওর গাউনটা মানায়। তবে কাল সন্ধেবেলা আমার গারনেটের
হারটা তুমি পরতে পার।”
বিজয়োল্লাশে স্যুয়েলেন মায়ের পেছন থেকে
স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে নাক কোঁচকাল, স্কারলেট ওই হারটা নিজের জন্য মায়ের কাছ থেকে
চাইবার মতলব করছিল। স্কারলেট ওর দিকে তাকিয়ে জিভ ভেংচে দিল। বোন হিসেবে স্যুয়েলেন খুবই জ্বালানে, খুব ঘ্যানঘ্যানে
আর স্বার্থপর, এলেন সামাল দিয়ে না রাখলে, স্কারলেট মাঝে মাঝেই ওর কান মুলে দিত।
“তারপর, বলুন, মিস্টার ও’হারা, চার্লস্টন
সম্বন্ধে মিস্টার ক্যালভার্ট আর কী কী বললেন,” এলেন বললেন।
স্কারলেট ভাল মতই জানে যে যুদ্ধ আর
রাজনীতি নিয়ে এলেনের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, উনি ভাবেন ওসব পুরুষমানুষদের ব্যাপার যা
কোনও লেডিরই মাথা ঘামানোর বিষয় নয়। তবে এসব নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে জেরাল্ড খুব আনন্দ
পান, আর এলেন অনিবার্যভাবেই স্বামীর আনন্দ পাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগী।
জেরাল্ড আরেক প্রস্থ ভাষণ শুরু করতে
না করতেই, ম্যামি নিজের মালকিনের সামনে থালাগুলো সাজিয়ে দিল, সোনালি চুড়ো দেওয়া বিস্কুট,
ফ্রায়েড চিকেন ব্রেস্ট আর ধোঁয়া বেরনো রাঙা আলু সেদ্ধ, তার ওপর থেকে গলানো মাখন গড়িয়ে
পড়ছে। ছোট্ট জ্যাককে ম্যামি ঠ্যালা দিতেই এলেনের পেছনে দাঁড়িয়ে ও কাগজের ফিতেগুলো ধীরে
ধীরে সামনে পেছনে দোলাতে লাগল। টেবিলের পাশে
দাঁড়িয়ে থালা থেকে মুখে চালান দেওয়া প্রতিটা গ্রাসের দিকে নজর রাখল, যেন একটু বেগড়বাই
দেখলেই নিজেই খাবারগুলো এলেনের মুখে ঠুসে দেবে। এলেন একমনে খেয়ে চললেন, কিন্তু স্কারলেট
বুঝতে পারছিল যে উনি এত ক্লান্ত যে কী মুখে দিচ্ছেন সেটা বোঝার চেষ্টাই করছেন না। ম্যামির
নিষ্করুণ মুখের দিকে তাকিয়েই বাধ্য হয়ে খাচ্ছেন।
থালাটা খালি হয়ে গেল, জেরাল্ড সবে ইয়াঙ্কিদের
চৌর্যমনোবৃত্তির ব্যাপারে আলোচনার মাঝপর্যায়েও পৌঁছতে পারেননি (ওরা ইয়াঙ্কিদের স্বাধীন
করে দিতে চায়, কিন্তু স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে এক পয়সাও ঠেকাতে রাজি নয়), এলেন উঠে
দাঁড়ালেন।
“আমাদের এখন প্রার্থনায় বসতে হবে নাকি?”
মুখ ব্যাজার করে জেরাল্ড জানতে চাইলেন।
“হ্যাঁ। অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে – ওই
তো দশটা বেজে গেল,” ঘড়ি ঢং ঢং করে সময়ের জানান দিতেই বলে উঠলেন। “ক্যারীনের এতক্ষণে
ঘুমিয়ে পড়া উচিত ছিল। পোর্ক, আলোটা নিয়ে এসো, আর আমার প্রার্থনার বইটা, ম্যামি।”
ম্যামির ফ্যাসফ্যাসে গলার ফিসফিসানি
শুনে জ্যাক মাছি তাড়ুয়াটা একটা কোণে রেখে থালাগুলো সরিয়ে নিল, আর ম্যামি দেরাজের ড্রয়ারে
এলেনের জীর্ণ প্রার্থনার বইটার জন্য হাতড়াতে লাগল। পোর্ক পা টিপে টিপে গিয়ে শেকলের
আংটায় টান দিয়ে আলোটা আস্তে আস্তে টেবিলের ওপর নামিয়ে আনতেই টেবিলটা উজ্জ্বল আলোয় ভরে
গেল আর ছাদ ছায়ায় ঘিরে গেল। স্কার্ট সামলে নিয়ে এলেন হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়লেন,
প্রার্থনার বইটা খুলে টেবিলের ওপর নিজের সামনে রেখে হাত দিয়ে চেপে রাখলেন। জেরাল্ড
ওঁর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। স্কারলেট আর স্যুয়েলেন টেবিলের অন্য দিকে নিজেদের নিজের
নিজের জায়গায় বসে পড়ল, পেটিকোট হাঁটুর নীচে চেপে রাখল যাতে শক্ত মেঝের থেকে ব্যথাটা
একটু কম রাখা যায়। বয়সের তুলনায় ক্যারীন একটু ছোটখাটো, টেবিলের দিকে মুখ করে বসলে অসুবিধে
হয়, তাই ও চেয়ারের দিকে মুখ করে বসল, কনুই দুটো চেয়ারের আসনের ওপর রাখল। এটাই পছন্দের
ভঙ্গি ওর, প্রার্থনার সময় প্রায়ই ও ঘুমিয়ে
পড়ত, আর এই ভঙ্গিতে বসলে, মায়ের নজর এড়ানো যায়।
পরিচারক-পরিচারিকার দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে
হলঘরের দরজার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। নীচু হতে গিয়ে ম্যামির মুখ থেকে গোঙানির আওয়াজ
বেরিয়ে এল, পোর্ক বসেছে একেবারে সিধে হয়ে,
রোজ়া আর টিনাকে উজ্জ্বল ক্যালিকোর পোশাকে বেশ ভাল দেখাচ্ছে, সাদা কাপড়ে ঢাকা
মাথার তলায় কুকিকে খুব কৃশ আর হলদেটে দেখাচ্ছে, জ্যাকের চোখ ঘুমে ঢলে পড়ছে, চিমটি খাবার ভয়ে ম্যামির
থেকে যতটা সম্ভব দূরে বসেছে। প্রত্যাশায় জ্বলজ্বল করছে সবকটা কালো, কারণ সাদা মানুষদের
সঙ্গে একসাথে প্রার্থনায় বসতে পারা প্রতিদিনের অন্যতম বিশিষ্ট ঘটনা। প্রার্থনাসংগীতের
ভাষার প্রাচীনতা বা অলঙ্কার এবং প্রাচ্যদেশীয় চিত্রকল্প ওদের কাছে খুব একটা বোধগম্য
না হলেও হৃদয়ে ওরা শান্তির স্পর্শ পেত আর তালে তাল মিলিয়ে দুলে দুলে আওড়াতে থাকত –
“হে প্রভু, আমাদের করুণা কর,” “হে যিশু, আমাদের করুণা কর।”
এলেন চোখ মুদে প্রার্থনা করতে আরম্ভ
করলেন, ওঁর স্নিগ্ধ, সুরেলা কণ্ঠস্বর কখনো উঠছে, আবার কখনো নামছে। তাঁর গৃহে, তাঁর পরিবারের এবং তাঁর নিগ্রোদের সকলের
শান্তি আর স্বাস্থ্য বহাল রাখার জন্য তিনি ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন, হলদে
আলো ঘিরে বসে থাকা মাথাগুলো অবনত।
টারার ছাদের তলায় বসবাসকারীদের, তাঁর
পিতামাতা, তাঁর বোনেদের, তাঁর তিন মৃত সন্তান এবং “নরক-প্রাপ্ত ভাগ্যহীনদের মঙ্গল কামনায়
প্রার্থনা শেষ করে লম্বা সরু আঙ্গুলে জপমালা জড়িয়ে নিয়ে জপ করা শুরু করলেন। কৃষ্ণাঙ্গ
এবং শ্বেতাঙ্গ কণ্ঠ স্নিগ্ধ মলয় বাতাসের মৃদু গুঞ্জনের মত গলা মিলিয়ে সুর করে বলতে
লাগত –
“হে, পবিত্র মাতা মেরি, হে, ঈশ্বরের
জননী, আমাদের মত পাপীতাপীদের জন্য প্রার্থনা কর, এখনকার জন্য এবং যেদিন আমাদের পরলোকপ্রাপ্তি
হবে, সেদিনের জন্যেও।”
বিদীর্ণ হৃদয় আর অশ্রু রুদ্ধ করে রাখার
বেদনা সত্ত্বেও, স্কারলেট অন্তরে নিবিড় প্রশান্তি অনুভব করল, যা এই সময়ে ও প্রতিদিনই
অনুভব করে। সারা দিনের বেশ কিছু হতাশা আর আগামীকাল নিয়ে দুশ্চিন্তার অনেকটাই প্রশমিত
হল, মনে একটু আশার আলো দেখতে পেল। এই নয় যে এই প্রশান্তি লাভ করার বিনিময়ে ঈশ্বরের
পদপ্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করে ফেলল, কারণ ধার্মিকতার ধার স্কারলেট ধারে না। বরং ঈশ্বর
আর তাঁর সন্তদের উদ্দেশ্যে প্রিয়জনের মঙ্গলকামনায় নিবেদিত মায়ের নির্মল মুখটাই ওর মনে
শান্তির প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে। এলেনের আন্তরিক আবেদন, স্কারলেটের দৃঢ় বিশ্বাস স্বর্গের
দেবতাদের কানে ঠিক পৌঁছে যায়।
এলেনের প্রার্থনা শেষ হল, এবং যথারীতি
জেরাল্ড, যিনি প্রার্থনার সময় কোনোদিনই জপমালা খুঁজে পান না, আঙ্গুলের কর গুণে জপ করতে
লাগলেন। ওঁর কণ্ঠের মৃদু গুন গুন স্কারলেটের চিন্তার সূত্রগুলো এলোমেলো করে দিতে লাগল।
ওর মনে হচ্ছিল এখন ওর আত্মবিশ্লেষণ করা দরকার। এলেন ওকে শিখিয়েছেন,প্রতিদিনের শেষে
আন্তরিকভাবে আত্মবিশ্লেষণ করতে হয়, সারাদিনের করা সমস্ত পাপের কথা ঈশ্বরের কাছে স্বীকার
করে নিতে হয়, এইসব পাপের পুনরাবৃত্তি হবে না প্রতিজ্ঞা করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
করতে হয়। কিন্তু স্কারলেট তার জায়গায় হৃদয়
বিশ্লেষণ করতে লাগল।
জড়ো করা দু’হাতের মধ্যে মাথাটা ফেলে
দিল যাতে মা ওর মুখটা দেখতে না পান, তারপর বিষণ্ণ হৃদয়ে অ্যাশলের কথা ভাবতে লাগল। কী
করে অ্যাশলে মেলানিকে বিয়ে করতে রাজি হতে পারে যখন আসলে ও স্কারলেটকেই ভালবাসে? স্কারলেট
ওকে কতটা ভালবাসে সেটা জেনেও? কেন ও জেনেশুনে স্কারলেটের মন ভেঙ্গে দিতে চাইছে?
বিদ্যুতচমকের মত একটা কথা ওর মাথায়
ঝলক দিয়ে গেল।
“হয়ত অ্যাশলে জানেই না যে আমি ওকে ভালবাসি!”
ভাবনাটার আকস্মিকতায় আরেকটু হলেই সবার
সামনেই সশব্দ একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে ফেলত। মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ হয়ে মন স্তব্ধ
হয়ে গেল, অবশ বোধ করল, পরমুহূর্তেই আবার দুর্বার গতিতে ছুটতে শুরু করল।
“কেমন করেই বা জানবে ও? সারাক্ষণই তো
আমি শালীনতা আর রুচিশীলতা দেখাতে গিয়ে ওর সঙ্গে থেকেও দূরে দূরে থেকেছি, তাই হয়ত ভেবেই
বসেছে বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কোনও ব্যাপারে আমার ওর সম্বন্ধে আগ্রহ নেই। এবার বুঝেছি,
এই জন্যই মুখ ফুটে কিছু বলেনি! ভেবেছে ওর প্রেম ব্যর্থ হতে বাধ্য। আর সেই জন্যই ওকে
লাগত কেমন যেন – ”
তাড়াহুড়ো করে ওর মনটা পেছনপানে ধাওয়া
করল, সে যেদিন অ্যাশলে ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়েছিল। ওর ধূসর চোখদুটো এমন নিখুঁতভাবে
নিজের ভাবনাগুলো আড়াল করে রাখতে পারে, সেদিন হঠাৎ উন্মুক্ত হয়ে গেছিল, আর সেখানে ওর
মনের হতাশা আর বেদনা প্রকট হয়ে উঠেছিল।
“হয়ত ওর মনে হয়েছে আমি ব্রেন্ট কিংবা
স্টুয়ার্টের প্রেমে পড়েছি, বা কেডের, সেই জন্যই ওর মন ভেঙ্গে গেছে। আর তাই হয়ত মনে
করেছে, আমাকে যদি নাই পায়, তাহলে মেলানিকেই বিয়ে করে পরিবারের লোকজনদের খুশি করে দেওয়াটাই
ভাল। একবার যদি জানতে পারত যে আমি ওকেই ভালবাসি – ”
ওর দোদুল্যমান হৃদয়
হতাশার অতল গহ্বর থেকে সহসা উচ্ছ্বাসের চরম শিখরে পৌঁছে গেল।
অ্যাশলের স্বল্পভাষিতার, ওর অদ্ভুত আচরণের এটাই হল বাস্তবিক কারণ। আসলে ও জানেই
না!
আত্মভরিতা থেকে এই ধারণাটা ওর সঠিক
বলে মনে করতে ইচ্ছে করল এবং পলকের মধ্যে ওর দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হল। একবার যদি অ্যাশলেকে ওর ভালবাসার কথাটা জানিয়ে দেওয়া
যায়, বিনা দ্বিধায় ও স্কারলেটের দিকে চলে আসবে। স্কারলেটকে কেবল একটু –
“ইশ!” ভীষণ খুশি হয়ে কপালের ভাঁজে আঙ্গুল
চালাতে চালাতে ভাবল। “সত্যি কী বোকা আমি, এই সহজ কথাটা আগে মাথাতেই আসেনি! “কথাটা ওকে
জানানোর একটা উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। ওকে আমি ভালবাসি জানলে ওই মেয়েটাকে কিছুতেই
ও বিয়ে করবে না! কেনই বা করবে?”
হঠাৎ খেয়াল করল জেরাল্ডের জপ শেষ হয়ে
গেছে, মা ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। তাড়াতাড়ি জপমালা গুণতে আরম্ভ করল, জপের কথাগুলো
আপনাআপনিই মনের ভেতর জেগে উঠতে লাগল, তবে ওর
কণ্ঠস্বরে আবেগের অস্বাভাবিক প্রকাশ দেখে ম্যামি চোখ খুলতে বাধ্য হল, তারপর সন্দেহের
চোখে ওর দিকে তাকাল। স্কারলেট নিজের জপ শেষ করার পর একে একে স্যুয়েলেন, ক্যারীন জপ
করতে শুরু করল, ওর মন কিন্তু সেই নবোপলব্ধ আনন্দময় ভাবনায় মগ্ন হয়েই রইল।
এখনও খুব একটা দেরি হয়ে যায়নি তাহলে!
এক পক্ষের তৃতীয় কারোর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা – সে তো কাউন্টিতে হামেশাই ঘটছে –
এমনকি বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠেও অন্য কারোর সঙ্গে পালিয়ে গেছে! আর অ্যাশলের বাগদানের ঘোষণা
তো এখনও করাই হয়নি! ঠিক, ঠিক, যথেষ্ট সময় আছে হাতে!
অ্যাশলে আর মেলানির মধ্যে সত্যিই যদি
কোনো প্রেম না থেকেই থাকে, কেবল ছোটবেলায় দেওয়া একটা কথাই বা কেন বাধা হয়ে দাঁড়াবে,
কেনই বা সেই কথার খেলাপ করে অ্যাশলে স্কারলেটকে বিয়ে করতে পারবে না? যদি অ্যাশলে
জানতে পারে যে স্কারলেট ওকেই ভালবাসে, তাহলে অবশ্যই ওকেই বিয়ে করবে। ওকে জানাবার
একটা উপায় বের করতেই হবে! একটা উপায় ও ঠিক বের করে ফেলবে! আর তারপর –
সুখস্বপ্নের কল্পলোক থেকে স্কারলেটকে
আচমকাই নেমে আসতে হল। অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, মা ওর দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
মন দিয়ে আবার জপ শুরু করার সময় পলকের জন্য চোখ খুলে ঘরের চারপাশে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে
নিল। হাঁটু মুড়ে বসে থাকা চেহারাগুলো, দীপের নরম আভা, যেখানে দুলে দুলে নিগ্রোরা জপ
করছে সেখানকার আলোআঁধারি, কিছুক্ষণ আগেই অতিপরিচিত যেসব বস্তুগুলো অসহ্য লাগছিল – সবই
ওর আবেগের রঙে রাঙিয়ে উঠল। আবার এই ঘরটা ভাল লাগতে লেগেছে। এই মুহূর্তটা – এই দৃশ্যটা
– ও কোনোদিনই ভুলতে পারবে না!
“পরম নিষ্ঠাবতী কুমারী মাতা,” ওর মা
সুর করে বললেন। কুমারী স্তোত্র শুরু হচ্ছে। শান্ত মন্দ্রস্বরে এলেন ঈশ্বরের জননী কুমারী মাতার
প্রশস্তি শুরু করলেন, “আমাদের জন্য প্রার্থনা কোরো”, স্কারলেট আজ্ঞানুবর্তীর মত গলা
মেলাল।
সেই ছোটবেলা থেকেই এই প্রার্থনার সময়
কুমারী মাতা নয় এলেনের উপাসনাই করে এসেছে। জানে, এরকম করাটা পাপ, কিন্তু চোখ বুজে,
স্তোত্রের প্রাচীন শব্দবন্ধ শুনতে শুনতে, আশীর্বাদধন্যা কুমারী মাতার নয়, মায়ের মুখটাই
বারবার ওর মনে ভেসে ওঠে। “পীড়িতদের নিরাময়কারিণী”,
“প্রজ্ঞার আধার”, “পাপীতাপীদের আশ্রয়”, “রহস্যময়ী গোলাপ”১ – এই বিশেষণগুলো
শুনতে খুব ভাল লাগে ওর, কারণ এর প্রত্যেকটা বিশেষণই এলেনের সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। তবে
বিশেষ করে আজ রাতে, ওর হৃদয় মহিমান্বিত হয়ে ওঠার ফলে, এই পুরো আচারপ্রক্রিয়া, মন্দ্রস্বরে
উচ্চারিত কথাগুলো, সমস্বরে কথাগুলর পুনরাবৃত্তি হওয়ার গুঞ্জন, স্কারলেটের হৃদয়ে এক
অনির্বচনীয় মাধুর্য নিয়ে প্রতিভাসিত হল, যা এর আগে ও কখনও উপলব্ধি করেনি। অ্যাশলের
বাহুডোরে পৌঁছে যাবার সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য পরম কৃতজ্ঞতায় নিজের সমগ্র সত্তাকে
ঈশ্বরের চরণে নিবেদন করে দিল।
‘আমেন’ কথাটা শেষবারের জন্য উচ্চারিত
হওয়ার পরেই সকলেই উঠে দাঁড়াল, একটু আড়ষ্টভাবেই। টীনা আর রোজ়া দু’দিক থেকে ধরে ম্যামিকে
ওঠাল। পোর্ক তাক থেকে সলতে লাগানো লম্বা একটা শলাকা নামিয়ে একটা বাতির আগুন থেকে জ্বালিয়ে
নিয়ে হলঘরে গেল। পাকানো সিঁড়ির উল্টোদিকে ওয়ালনাটের তৈরি একটা আলমারি, এমন বিশাল যে
খাবার ঘরে রাখার জায়গা হয় না, সেটার চওড়া মাথায়
অনেকগুলো মোমবাতিদান আর থরে থরে মোমবাতি রাখা। একটা বাতি আর তিনটে মোমবাতি জ্বালিয়ে,
বাতিটাকে দু’হাতে মাথার ওপর ধরে, পোর্ক প্রধান গোমস্তার আড়ম্বরপূর্ণ গাম্ভীর্য নিয়ে
রাজা এবং রানীকে যেন শয়নকক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এমন ভাব করে সবার আগে আগে চলতে লাগল।
জেরাল্ডের বাহুতে হাত রেখে এলেন ওর পেছন পেছন চললেন, তিন বোন নিজের নিজের মোমবাতি হাতে
নিয়ে ওঁদের পেছন পেছন চলল।
নিজের ঘরে ঢুকে মোমবাতিটা স্কারলেট
লম্বা দেরাজটার ওপর রাখল, তারপর আলমারির অন্ধকার থেকেই নাচের পোশাক, যেটা সেলাই করা
দরকার, সেটা খুঁজতে লাগল। তারপর সেটা বাহুর ওপর ফেলে, নিঃশব্দ পদক্ষেপে হলঘরের অপর
প্রান্তে গেল। বাবা মায়ের শয়নকক্ষের দরজাটা
অল্প ভেজানো, ঠকঠক করতে যেতেই এলেনের চাপা কিন্তু কঠর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মিস্টার ও’হারা, জোনাস উইল্কারসনকে
বরখাস্ত করে দিন।”
জেরাল্ডের বিস্ফোরণ ঘটল, “তাহলে আরেকজন
ওভারসিয়ার কোথায় পাব যাকে বিশ্বাস করতে পারব?”
“অবিলম্বেই ওকে বরখাস্ত করতে হবে, কাল
সকালেই। বিগ স্যাম খুব ভাল ফোরম্যান, আপনি নতুন ওভারসিয়ার না পাওয়া পর্যন্ত ও-ই কাজটা
চালিয়ে নেবে।”
“তাহলে এই ব্যাপার!” জেরাল্ডের গলা
শোনা গেল। “বুঝলাম! বাপটা তাহলে ওই সুযোগ্য জোনাসই – ”
“ওকে বরখাস্ত করতেই হবে।”
“তার মানে এমি স্ল্যাটারির বাচ্চার
বাপ ও-ই,” স্কারলেট ভাবল। “ভাল, ভাল। একজন ইয়াঙ্কি আর সাদা চামড়ার একটা আঁস্তাকুড়বাসিনী
মাগির কাছ থেকে আর কী আশা করা যায়?”
জেরাল্ডের বকবকানি বন্ধ হবার জন্য কিছুক্ষণ
চুপচাপ অপেক্ষা করার পর দরজায় খটখট করে ভেতরে গিয়ে মায়ের হাতে পোশাকটা ধরিয়ে দিল।
পোশাক বদল করে, মোমবাতিটা নিবিয়ে দিতে
দিতে স্কারলেটের মনে আগামিকালের পরিকল্পনার একটা বিশদ রূপরেখা তৈরি হয়ে গেছে। পরিকল্পনাটা
খুবই সহজ সরল, কারণ জেরাল্ডেরই মত একমুখী স্বভাবের হওয়ায়, ওর নজর কেবল নিশানার দিকেই
ঘুরে থাকে, আর নিশানা ভেদ করার জন্য সবচাইতে সিধে রাস্তাটা বেছে নেওয়াই ওর অভ্যেস।
প্রথমত, ওকে ‘গর্বিত’ ভাবটা বজায় রাখতে
হবে, যেমনটি জেরাল্ড বলেছিলেন। টুয়েল্ভ ওকসে পৌঁছনোর মুহূর্ত থেকেই নিজেকে খুবই উৎফুল্ল
আর উচ্ছল দেখাতে হবে। অ্যাশলে আর মেলানিকে নিয়ে বুকের মধ্যে একটা কষ্ট চেপে রেখেছে,
একথা কাউকে সন্দেহ করতে দেওয়া যাবে না। ওখানকার প্রতিটা ছেলের সঙ্গেই টুস্কি মারতে
হবে। এতে অ্যাশলে অবশ্যই খুব কষ্ট পাবে, কিন্তু ওকে পাওয়ার আকুলতাও বেড়ে যাবে। বিবাহযোগ্য
কোনও পুরুষমানুষকেই বাদ দিলে চলবে না, এমনকি ঝাঁটা-গুঁফো বুড়ো ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি, যে কিনা আবার স্যুয়েলেনের
প্রেমিক, ওঁকে দিয়ে শুরু করে একেবারে মেলানির ভাই – ওই মুখচোরা, লাজুক, লাল্টু চার্লস
হ্যামিল্টন – কাউকেই ছাড়বে না! মধুলোভী মৌমাছিরা যেমন মৌচাকের চারপাশে ঘুরঘুর করে ওরাও
তেমনি ওর চারপাশে ঘুরগুর করতে থাকবে, তখন অ্যাশলেও মেলানির সঙ্গ ছেড়ে ওর উপাসকমণ্ডলীতে
এসে যোগ দেবার লোভ সামলাতে পারবে না। কয়েক মিনিট অ্যাশলেকে একলা পাবার জন্য সুযোগ বুঝে
ওকে ভিড় থেকে বের করে আনবে। মনে মনে আশা সব
কিছু ঠিক পরিকল্পনামাফিকই চলবে, যদ সেটা না হয়, তাহলে ব্যাপারটা খুব জটিল হয়ে পড়বে।
তবে উদ্যোগটা অ্যাশলে যদি নিজে থেকে না নেয়, কুছ পরোয়া নেই, ও নিজেই নেবে।
ওর আশা যে সব কিছুই এই পরিকল্পনা মতই
চলতে থাকবে, কারণ সেটা না হলে ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে যাবে। তবে অ্যাশলে উদ্যোগটা যদি
নিজে থেকেই না নেয়, কোনো সমস্যাই নয়, ও-ই সেটা নেবে।
তারপর ওরা যখন শেষ পর্যন্ত একলা হবে,
পুরুষমানুষেরা কীভাবে স্কারলেটকে ঘিরে ধরেছিল, সেই দৃশ্য তখনও অ্যাশলের মনে টাটকা হয়েই
থাকবে, নতুন করে উপলব্ধি করবে যে সব পুরুষমানুষই
স্কারলেটকে কামনা করে, বিষণ্ণতা আর হতাশা নিয়ে ও তাকিয়ে থাকবে। আর তখনই আসবে অ্যাশলেকে
ওর খুশি করে দেবার সুযোগ। অ্যাশলে আবিষ্কার
করবে যে যতই স্কারলেট অন্যদের নয়নের মণি হোক না কেন, সারা দুনিয়ায় ও অন্যান্য পুরুষমানুষের
থেকে অ্যাশলেকেই সবচাইতে পছন্দ করে। খুব নম্র আর মিষ্টি ভাবে কথাটা অ্যাশলের কাছে স্বীকার
করে নেওয়ার পর, ওর দৃষ্টিতে স্কারলেট আরও দুর্লভ হয়ে যাবে। কথাগুলো অবশ্যই বলবে লেডির মত করেই। সরাসরি বলে দেওয়া
যে ও অ্যাশলেকে ভালবাসে – সেটা ও স্বপ্নেও ভাবতে পারে না – তাতে কোনোই লাভ হবে না। কিন্তু ঠিক কীভাবে জানাবে সেটা নিয়েও ও বিশেষ ভাবিত
নয়। এরকম পরিস্থিতি আগেও সামলে এসেছে, আবারও পারবে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে, জ্যোৎস্না এসে আবছাভাবে
ওর শরীর ভাসিয়ে দিচ্ছে, মনে মনে পুরো দৃশ্যটা কল্পনা করতে লাগল। কল্পনায় অ্যাশলের চোখে
যুগপৎ বিস্ময় আর খুশির অভিব্যক্তি দেখতে পেল – ওর ভালবাসার কথা জানতে পেরে অ্যাশলের
চোখেমুখে যে ভাবটা ফুটে উঠবে। কী বলে ওকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার কামনা ব্যক্ত
করবে সেটাও শুনতে পেল।
অবশ্যই স্কারলেটকে বলতে হবে অন্য কোনও
মেয়ের কাছে বাকদত্ত পুরুষকে বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না, তখন ও বারংবার জোর করতে থাকবে
এবং শেষমেশ ওকে রাজি করিয়ে নেবার সুযোগ দেবে। আর তখনই ওরা জোন্সবোরোতে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত
নেবে, সেদিন বিকেলের মধ্যেই, তারপর –
তারপর, কাল রাতে ঠিক এই সময়ে ও হয়ে
যাবে মিসেজ় অ্যাশলে উইল্কস!
বিছানাতে হাঁটুতে মাথা রেখে বসে পড়ল,
এবং বহুক্ষণ ধরে নিজেকে মিসেজ় অ্যাশলে উইল্কস – অ্যাশলের কনে – হিসেবে কল্পনা করার সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। তারপর
অতি সামান্য শিরশিরে একটা অনুভূতি হৃদয়ে অনুভব করল। যদি ব্যাপারটা ঠিক এভাবে না ঘটে?
যদি অ্যাশলে ওর সঙ্গে পালিয়ে যাবার অনুনয় না করে? দৃঢ়ভাবে ভাবনাটা মন থেকে সরিয়ে দিল।
“এই সব অলক্ষুণে কথা এখন আমি কিছুতেই
ভাবব না,” দৃঢ়ভাবে নিজেকে সংযত করল। “এখন এসব কথা ভাবলেই আমি বিপর্যস্ত বোধ করব। ও যদি আমাকে ভালবাসে – ঠিক যেভাবে চাইছি, সেভাবে
না ঘটার কোনও কারণই নেই। আর আমি জানি যে ও আমাকে ভালবাসে!”
মাথা ওঠাল, জ্যোৎস্নার আলোয় ওর কাজল
পরা চোখ ঝিকমিক করে উঠল। এলেন ওকে শেখাননি যে আকাঙ্ক্ষা করা আর অর্জন করা দুটো ভিন্ন
ব্যাপার; জীবন থেকে ও এই শিক্ষাও নেয়নি যে লড়াইটা দ্রুতগামীদের মধ্যে নয়। রুপোলি আলো
আবছায়ার মধ্যে শুয়ে শুয়ে ওর প্রত্যয় বেড়ে চলল, ষোলো বছরের একজন বালিকা, জীবনটা যার
মাধুর্যে ভরা, যার কাছে ব্যর্থতা একটা অসম্ভব কল্পনা, সুন্দর পোশাক আর শুভ্র ত্বক যার
ভাগ্য জয় করার হাতিয়ার – একদম তারই মত করে ও কল্পনার জাল বুনে চলল।
টীকা –
১ রহস্যময়ী গোলাপ – Mysterious
Rose – Rosa Mystica – কুমারী মা মেরির একটি নাম।


0 মন্তব্যসমূহ