বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ ও মেটামরফোসিস পাশাপাশি রেখে আলোচনা

মোজাফফর হোসেন

বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা দুটি বড়গল্প হলো দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ ও মেটামরফোসিস। রচয়িতা বিশ্বসাহিত্যের দুই প্রভাবশালী লেখক – লিও তলস্তয় এবং ফ্রানৎস কাফকা। রচনাকালের মধ্যবর্তী ব্যবধান প্রায় তিন দশক।
গল্পদুটি ভিন্ন দুটি কাল, দেশ ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও গল্পের বিষয়বস্তু, প্রধান দুটি চরিত্রের পরিণতি, নির্মাণশৈলী এবং সর্বোপরি লেখকের বয়ানস্বরের অমত্ম্যমিল গল্পদুটিকে তুলনামূলক পাঠের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। দুটি গল্পই নৈরাশ্যবাদী চেতনার; শুরু হয় এক ধরনের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ শুরু হয় এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইভান ইলিচের মৃত্যু আর মেটামরফোসিস শুরু হয় এর মূল চরিত্র গ্রেগর সামসার দৈহিক পরিবর্তন অর্থাৎ মানুষ থেকে পোকা হওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে কাফকা শুরুটা করেছেন একটা ফ্যান্টাসির মধ্য দিয়ে, তলস্তয়ের শুরুটা সেখানে চরম বাস্তবতার নিরিখে। এভাবেই দুটি গল্প শুরু হলো তাদের অন্তিম বা চূড়ান্ত পরিণতি দিয়ে।

এখানে নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক ও নগরকেন্দ্রিক সমাজবাস্তবতার ভীষণ জটিল ও কুটিল বিষয় উপস্থাপন করা হলেও লেখকদ্বয়ের বলার স্বর খুবই সরল ও স্বাভাবিক। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা নামের এক ব্যক্তির পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনাটি যেন সিঁড়ি থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পাওয়ার মতো অতি সাধারণ একটি ঘটনা! অন্তত কাফকা যেভাবে কোনো ভনিতা ছাড়া নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে ফেললেন – As Gregor Samsa awoke one morning from uneasy dreams, he found himself transformed in his bed into a gigantic insect – তাতে তেমনটিই মনে হয়। আধুনিক সাহিত্যে এর চেয়ে ভয়ংকর সূচনা আর নেই বলে স্বীকার করে নিয়েছেন অনেক সমালোচক। এই বাক্য পড়েই তরুণ বয়সে বিছানা থেকে উঠে বসেছিলেন কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেস। তিনি বলেছিলেন, ‘One night a friend lent me a book of short stories by Franz Kafka. I went back to the pension where I was staying and began to read The Metamorphosis. The first line almost knocked me off the bed. I was so surprised… when I read the line I thought to myself that I didn’t know anyone was allowed to write things like that. If I had known, I would have started writing a long time ago. So I immediately started writing.’

অন্যদিকে দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচেও আমরা দেখি শুরুতেই একটি দৈনিকে ইভান ইলিচের মৃত্যুসংবাদ পড়ছে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। আর পাঁচটা খবর পড়ে আলোচনা করার মতোই তারা ইভান ইলিচের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে আলোচনা শুরু করে। কেউ কেউ ইভান ইলিচের মৃত্যুতে তার কর্মস্থলে সৃষ্টি হওয়া শূন্যপদে কাকে বসানো যায় সে-প্রসঙ্গও টেনে আনে। এই গল্পের শুরুতে মেটামরফোসিসের মতো চমক না থাকলেও মানুষের এমন বৈষয়িক অমানবিক চরিত্র আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। কোনো কোনো সমালোচক এই সূচনাকে existential horror বলে উল্লেখ করেছেন।

এভাবেই দুটি গল্পে একটি সরল আখ্যানের মধ্য দিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি মানব জীবনের গাঢ় ও গূঢ় রহস্যের মধ্যে। এক্ষেত্রে দুটি গল্পেই কাঠামোগত আয়রনির প্রয়োগ হয়েছে। কেননা, আখ্যানভাগ অতিসরল বা ফ্ল্যাট মনে হলেও বিষয়বস্ত্ত মোটেও তা নয়। পরবর্তীকালে আইরিশ কথাসাহিত্যিক জোনাথন সুইফ্ট একই টেকনিক অবলম্বন করে রচনা করেন স্যাটেয়ার প্রবন্ধ ‘অ্যা মডেস্ট প্রোপোজাল’।

গল্পদুটির নামকরণ করা হয়েছে সরলভাবে। নাম থেকেই বিষয়বস্ত্ত আন্দাজ করা যায়। অর্থাৎ ‘ডেথ অব ইভান ইলিচ’ নাম থেকেই বোঝা যায় কাহিনির কোথাও, বিশেষ করে শেষের দিকে, ইভান ইলিচের মৃত্যু ঘটবে এবং সত্যিকার অর্থেই গল্পটি শুরু এবং শেষ হয় ইভান ইলিচের মৃত্যু দিয়ে। মেটামরফোসিসে ও অনুরূপভাবে বোঝা যায় – গল্পের কোথাও রূপান্তরের ঘটনা আছে, এবং এটিই গল্পের কেন্দ্রস্থ বিষয়। এরপর পাঠক গল্পদুটির প্রারম্ভিক প্যারাতেই মৃত্যু ও রূপান্তরের ঘটনা জেনে যান এবং তখন গল্পের মূল চরিত্রের মৃত্যু কিংবা পোকায় রূপান্তর হওয়ার ঘটনাটি আর মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে না। মুখ্য হয়ে ওঠে অন্যকিছু। তবে সেটি কী তা জানার জন্য গল্পদুটি শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে হয়। আপাত-অস্তের বিষয় প্রারম্ভিকে উন্মোচন করে এ দুই মাস্টার কথাশিল্পী জীবন সম্পর্কে তাঁদের যে ক্রিটিক্যাল ভিউ তা উপস্থাপন করেন। ইভান ইলিচের জীবদ্দশায় কিংবা গ্রেগর সামসার পোকায় রূপান্তরপূর্ব জীবন থেকে তাদের সামাজিক অবস্থানটা যতটা না বোঝা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যায় তাদের মৃত্যু কিংবা রূপান্তর-পরবর্তী সময়ে।



খ.

‘দ্য অব ডেথ ইভান ইলিচ’ গল্পের ফ্ল্যাশব্যাকে তলস্তয় আমাদের ইভান ইলিচের অতীত জীবনে নিয়ে যান। এখানে তিনি একটা কথা দিয়েই ইভান ইলিচের জীবন সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়া বা স্টাডি অনেকখানি পরিষ্কার করে তোলেন – অতিসরল, অতিসাধারণ এবং সেই কারণেই ভীষণ ভয়ানক (most simple and most ordinary and therefore most terrible)। ইভান ইলিচ তার জীবনব্যাপী প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মাপকাঠিতে সুখী হতে চেয়েছিল। সে তার বাবার তৃতীয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়জন – প্রথমজনের মতো অত ভদ্র-শান্ত নয়, আবার ছোটজনের মতো অত অভদ্র-অশান্তও নয়। তেরো বছর বয়সে সে আইনের স্কুলে ভর্তি হয়, একজন আদর্শ ছাত্র হিসেবে সেখানকার নিয়মকানুন মেনে চলে। সমাজের আরোপিত কোনো নিয়মের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা সে করেনি। পোশাক পরেছে, খাবার খেয়েছে – সবই প্রচলিত নিয়মে। বিয়ে করেছে প্রচলিত বিশ্বাসে। তার সন্তান হয়েছে, সংসার হয়েছে; কারণ সমাজে একজন সুখী মানুষের এসব থাকে। আরো যা থাকে তা হলো সুন্দর একটা বাড়ি। ইভান খুব সুন্দর একটা বাড়ি করার পেছনে যথেষ্ট শ্রম দিয়েছে। বিবাহের কিছু বছর পর ইভান বুঝতে পারে, বিবাহ সম্পর্কে তথাকথিত যে-ধারণা – ‘conducive to the pleasures and amenities of life,’ তা সবসময় খাটে না। দাম্পত্য অশামিন্তর কারণে সে আরো বেশি কাজের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। সমাজ-স্বীকৃত জীবনযাপন করার জন্য স্ত্রীর সঙ্গে একটা ঠান্ডা সম্পর্ক বজায় রাখে। এমনিভাবে তলস্তয় ইভান ইলিচকে খুব সাধারণভাবে একটি সমাজের সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ইভান হয়ে উঠেছে একটি সমাজের ‘everyman’। ইভান তৎকালীন রাশিয়ার পুঁজিবাদী সমাজের মস্ত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে তার অজাস্তেই। সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণি থেকে নির্ধারিত জীবনকে সত্য বলে মেনে চলেছে সারাটা জীবন। তলস্তয় এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে উচ্চবিত্ত শ্রেণির সম্পর্ককে মেটাফর হিসেবে দেখিয়েছেন – ‘that of a fly being drawn to a bright light’। একটি মাছি যেমন আলোর মায়ায় তার কাছে ছুটে যায় এবং সেখানে পৌঁছানো মাত্র মারা পড়ে, তেমনি ইভান ইলিচ জীবন ভেবে যে-জীবনের পেছনে ছুটে চলে, সে-জীবনই তাকে জীবিত থেকেও মৃতের স্বাদ এনে দেয়।

ইভানের মতো গ্রেগরও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। সেলসম্যানের চাকরি করে সে। যদিও চাকরিটা তার মোটেও ভালোলাগে না, তথাপি পরিবারের কথা ভেবে ছাড়তেও পারে না। প্রতিনিয়ত নিজের মনের সঙ্গে আপস করে বেঁচে থাকতে হয় তাকে। আপস করতে হয় অফিসের বস, পরিবার এবং সমাজের সঙ্গেও। আপস করতে করতে একসময় গ্রেগর হারিয়ে ফেলে তার মানবসত্তাকে। তার দৈহিক পরিবর্তনটা তারই চূড়ান্ত বা প্রতীকী প্রতিফলন। গ্রেগরের অফিসে যেতে এক ঘণ্টা দেরি হওয়ায় অফিসের বড়কর্তা গ্রেগরের খোঁজ নিতে বাড়ি আসে – অর্থকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় গ্রেগরের প্রতি ঘণ্টা বিক্রি হয়ে যায় টাকার কাছে। অতিরিক্ত এক ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়া মানেই বাণিজ্য থেকে এক ঘণ্টা দূরে থাকা। গ্রেগরের দরজা খুলতে দেরি হলে গ্রেগরের মা বড়কর্তাকে আশ্বস্ত করে – গ্রেগর সারাদিন কাজের মধ্যেই থাকে, এমনকি সন্ধ্যায়ও বাইরে যায় না। গ্রেগরের পোকা হয়ে যাওয়ার পর পরিবার কিংবা সমাজের আর কোনো কাজে লাগে না সে। ফলে সে পরিবার এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

আপাতদৃষ্টিতে ‘ডেথ অব ইভান ইলিচ’ হচ্ছে ইভান ইলিচ ও ‘মেটামরফোসিস’ হচ্ছে গ্রেগর সামসা নামধারী খুব সাধারণ দুজন মানুষের গল্প। কিন্তু এঙ্গেলস এবং মার্ক্সের ‘ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক বস্ত্তবাদ’ (Historical Dialectical Materialism) পাঠসাপেক্ষে জানা যায়, গল্পদুটি আধুনিক পুঁজিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার মেটাফোরিক উপস্থাপন। ইভান আর গ্রেগর হচ্ছে এখানে শ্রমিক শ্রেণি (proletariat) আর অফিসের বড়কর্তারা হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণির (bourgeoisie) প্রতিনিধি। পুঁজিকেন্দ্রিক সমাজে একটা মানুষের পরিচয় ও সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয় তার উৎপাদনক্ষমতার ভিত্তিতে। তাই কাজ করতে করতে তারা ভুলে যায় তাদের মানবিক অসিন্তত্বের কথা। তৎকালীন পুঁজিবাদী সমাজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ও নীতিকে চরম সত্য জেনে পরম মমতায় লালন করেছে ইভান ইলিচ ও গ্রেগর সামসা। নিজের অসিন্তত্বকে বিলীন করে সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসে সমাজের চোখে সুখী হতে চেয়েছে তারা। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর তারা প্রচলিত সমাজে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিজ নিজ সত্তার কাছে। সমাজ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আবিষ্কার করেছে ওই সমাজকে, যে-সমাজে কাজ না থাকলে কাছের মানুষগুলো অচেনা হয়ে যায়; যেন খারিজ হয়ে যায় সমাজের সদস্যপদ।



গ.

ইভান ইলিচের মৃত্যুসংবাদ শুনে তার সহকারী বন্ধুদের মাথায় প্রথমেই যে-চিন্তাটি আসে তা হলো – ইভান ইলিচের মৃত্যুর ফলে সৃষ্ট খালি পদে কাকে নিযুক্ত করা যায়। বন্ধু হারানোর শোক নয়, পদোন্নতি তাদের আলোচনার প্রাথমিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অন্য যে-বিষয়টি তাদের মধ্যে স্বসিন্ত এনে দেয়, তা হলো – যে মারা গেল সে আমি নই, অন্য কেউ (it is he who is dead and not I)। ইভান ইলিচের বন্ধুরা তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যায় যেতে হয় তাই। এটা তাদের কাছে কেবলই একটা সামাজিক রীতি। ইভান ইলিচের স্ত্রী প্রাসকোভইয়া ফেদেরোভনা ইভানের মৃতদেহ এক ঘরে রেখে অন্যঘরে স্বামীর ঘনিষ্ট বন্ধু পিটার ইভানোভিচের সঙ্গে আলোচনা করে কী করে ইভান ইলিচের পেনসনের টাকার পরিমাণটা বাড়ানো যায় এবং কোনো কবরস্থানের জমির দাম অপেক্ষাকৃত কম হবে এসব বিষয় নিয়ে।

ফ্লাশব্যাকে দেখা যায়, ইভান যখন অসুস্থ ছিল তখন স্ত্রী ও কন্যা রুটিন করে তাকে দেখতে যেত। খুব দ্রুতই অসুস্থ ইভান ইলিচের বেঁচে থাকা তাদের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ ও পরিবার থেকে উপেক্ষেত ইভান ইলিচের আন্তজিজ্ঞাসার জায়গাটা কেউই অনুভব করতে পারে না। এমনটি ডাক্তারও তাকে রোবটের মতো দেখে চলে যায়। ইভান ইলিচ বুঝতে পারে, তাকে কেউই বুঝতে পারছে না বা বুঝতে চাচ্ছে না। সবার কাছে তার অসুস্থতা এবং সুস্থ থাকা সমানভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। পরিবারের সবার ধারণা, এই রোগের জন্য সে নিজেই দায়ী এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনে সেরে উঠবে। ফলে ইভানের শারীরিক সমস্যার থেকেও ভয়ংকর হয়ে ওঠে তার মানসিক সমস্যা। স্ত্রী-কন্যা যখন তাকে অসুস্থ রেখে সাজসজ্জা করে থিয়েটারে যায়, তখন তার শেক্সপিয়রের অ্যাজ ইউ লাইক ইট নাটকের চরিত্র জ্যাকের মতো মনে হয়, জীবনটা একটা নাট্যমঞ্চ, এখানে চারপাশের সবাই অভিনয় করে চলেছে এবং তাদের জগৎটা হচ্ছে – ‘mesh of falsity’। আমরা পরবর্তীকালে দেখতে পাই, এই তথাকথিত অগ্রসর সভ্যতার মিথ্যা ও কৃত্রিমতা ইভান ইলিচের মৃত্যুর জন্য দায়ী। মানব জীবনের প্রকৃত সত্যটা ইভান ইলিচ যখন অনুভব করতে পারে, তখন তার উপলব্ধি হয়, ‘illness is not a question of health or sickness, but of life or death.’

অন্যদিকে, গ্রেগর সামসার পোকাতে রূপান্তর ঘটলে তার চারপাশের মানুষগুলোর স্বার্থপর চেহারা পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয়। মা-বাবা-বোন – এই নিয়ে গ্রেগরের পরিবার। পোকা হওয়ার আগ পর্যন্ত আর পাঁচটা সুখী পরিবারের মতোই ছিল সব। গ্রেগরের দৈহিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিংবা আয়ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন ঘটল পরিবারের অন্যদের আচরণের। বাবা আপেল ছুড়ে গ্রেগরকে ঘরের ভেতর বন্দি থাকার ঈঙ্গিত দেয়, মা গ্রেগরকে দেখলে ভয়ে মূর্ছা যায়, বোন প্রথমদিকে গ্রেগরের খাবার-দাবারের দিকে খেয়াল রাখলেও পরে আর রাখে না। গ্রেগরের ব্যবহার্য কোনোকিছু কেউ স্পর্শ করে না। আপাতদৃষ্টিতে গ্রেগর পোকা হয়ে যায় বটে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে মনুষ্যগুণাবলি হারায় না বরং আশেপাশের মানুষরাই আপাতদৃষ্টিতে ঠিক থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই মানবিক গুণশূন্য হয়ে ওঠে। এটিই আপাতবাস্তবতার চরম আয়রনি। গ্রেগর যখন পশুর মতো খাটুনি খেটে সংসার চালাত, বাবার ঋণের টাকা পরিশোধ করত, তখন পরিবারের আর সবাই আয়েশ করে দিনযাপন করত। আর গ্রেগর যেইমাত্র কাজ হারাল তখনই তাকে ছুড়ে ফেলা হলো আবদ্ধ কক্ষে। পরিবারের সকলের কাছে গ্রেগরের মৃত্যু হয়ে উঠল একমাত্র কাম্য। আসেন্ত আসেন্ত গ্রেগরের রুম থেকে আসবাবপত্র সরিয়ে বানানো হলো স্টোররুম।



ঘ.

‘দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ’ গল্পে আফিমের ঘোরে যখন ইভানের শারীরিক যন্ত্রণা কিছু সময়ের জন্য থমকে থাকে, ইভান তখন স্বপ্ন দেখে, তাকে একটি গভীর কালো বস্তার ভেতর ঠেলে ঢুকানো হচ্ছে। সে ওই অন্ধকারে পতিত হওয়ার কামনা যেমন করে, তেমন ভয়ও করে। যেন সে সাহায্য ও সহযোগিতা দুটোই করে। ঘুম ভেঙে গেলে সে কাঁদতে কাঁদতে ঈশ্বরকে বলে, ‘Why hast Thou done all this? Why have Thou brought me here? Why, why dost Thou torment me so terribly?’ তারপর সে নীরব হয়ে যায়, তার ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে, ‘What is it you want?’ ইভান উত্তর দেয়, সে ভালোভাবে এবং শামিন্ততে বসবাস করতে চায়, যেমনটি সে সারাজীবন চেয়েছে। এরপর সে তার অতীত জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। অনুভব করে, যতবেশি সে তার বাল্যকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ততবেশি হতাশ হয়ে পড়েছে। মূল্যহীন হয়ে উঠেছে তার জীবন।

ইভানের স্বপ্নের কালো বস্তাকে যদি কবর বা মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে সে মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করছে আবার তীব্রভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার বস্তাটিকে যদি মাতৃগর্ভের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, চিন্তাচেতনার জগতে ইভানের পুনর্জন্ম ঘটছে। বস্তায় প্রবেশমুহূর্তে যে-যন্ত্রণা সে অনুভব করছে তা হলো জন্মমুহূর্তের যন্ত্রণা। ফলে যেটাকে ইভান ইলিচের মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে, সেটা আসলে তার আত্মার বা আধ্যান্তবোধের পুনর্জন্ম। আমরা জানি, তলস্তয় নিজেও অনুরূপ কনভারশনের ভেতর দিয়ে যান। এরপরই তিনি লেখেন এ-গল্পটি। ইভান তার নিজের জীবন দিয়ে যে অনুভব করে – ‘Life, a series of increasing sufferings, flies further and further towards its end – the most terrible suffering’ – তা তলস্তয়ের নিজের জীবনেরও অনুভূতি। ইভান খতিয়ে দেখতে চায় – ‘what it is all for.’ এবং জীবনের সমস্ত অধ্যায় ঘেঁটে মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে বুঝতে পারে, তার সমস্ত জীবন ধরে সে যা সঠিক বলে গণ্য ও মান্য করেছে তা সবই ছিল ভুল। সে ছিল সুখী – সমাজের চোখে এবং সে সেটাই হতে চেয়েছিল। ইভানের অধ্যান্তবোধ যখন বস্ত্তবাদী জগৎকে অতিক্রম করে যায়, তখন সে মৃত্যুকে জয় করে নতুন জীবন অর্জন করে, এবং এই মুহূর্তে যখন সে নিজেকে প্রশ্ন করে – ‘What is the right thing?’ ঠিক তখনই তার একটি হাত তার ছেলে ভাস্য়ার মাথা স্পর্শ করে। ভাস্য়ার মধ্যে ইভান তার বাল্যকালের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়, সে তার জন্য দুঃখ অনুভব করে। এবং তার কাছে ক্ষমা চায়। মানুষের শারীরিক সংস্পর্শে এসে ইভান অনুভব করে, সমস্ত জীবনব্যাপী সে শুধু নিজের চারপাশে একটি দেয়াল স্থাপন করে এসেছে, সরে গেছে অর্থপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক থেকে। যখন সে মানব জীবনের প্রকৃতি বা ‘the truth of life and death’ উদ্ঘাটন করতে সমর্থ হয়, তখনই তার পুনর্জন্ম ঘটে – সে মারা যায় শামিন্তপূর্ণভাবে।

অন্যদিকে ‘মেটামরফোসিস’ গল্পে প্রথম বাক্যেই গ্রেগর সামসার মৃত্যু ঘোষিত হয় এবং সমস্ত গল্প জুড়ে সে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। ইভান ইলিচের মতো গ্রেগর সামসাও মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে লড়াই করে চলে প্রতিনিয়ত। সমালোচক মার্টিন গ্রিনবার্গের মতে, ‘… Tolstoy’s work is about death literally and existentially; Kafka’s is about death in life.’। যতক্ষণ না ইভান ইলিচ তার যাপিত জীবনকে মিথ্যা বলে মেনে নেয় এবং স্বীকার করে এটা যেমনটি হওয়ার কথা ছিল তেমনটি হয়নি, ততক্ষণ সে তার আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে সজাগ হতে পারে না। শেষ মুহূর্তে সে আবিষ্কার করে – জীবন এবং মৃত্যুর সত্য। তারপর তার মৃত্যু ঘটে। গ্রেগর সামসার ক্ষেত্রে, জীবিত থেকেও সে মৃত, কাজেই মুক্তি মেলে না সহজে। এক ভোরে গ্রেগর তার যে অসিন্তত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, সেটাই হচ্ছে তার ক্ষেত্রে – ‘the truth of life and death’। এক্ষেত্রে, ‘the dream reveals the reality’ – কথাটি উভয়ের ক্ষেত্রে সত্য বলে খাটে।


-------
দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ ও মেটামরফোসিস পাশাপাশি রেখে
বিশ্বসাহিত্যের কথা।। বেঙ্গল পাবলিকেশনস

২টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. চরম বাস্তব সত্য। বাট ডোন্ত ওয়াণ্ট টু বিলিভ দ্যা ট্রুথ। থ্যাংস ফ্রেন্ড।।

    উত্তরমুছুন