বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

কয়েকটি চিঠি : সেলিম জাহান

‘ভালো বুঝতে পারলাম না। বানান ভুল, ভাষা ভুল, ছেদচিহ্নহীন এ চিঠিখানা কার? নিরুপমা? কে নিরুপমা? আচ্ছা এও কি সম্ভব? আমার এতকাল আগেকার পরলেকগতা স্ত্রী নিরুপমার চিঠি এল আজ ত্রিশ বছর পরে? এতকাল এ চিঠি কোথায় ছিল? কোন ডাকঘরের কোন আলমারির অন্ধকার কোণে আত্মগোপন করেছিল সুদীর্ঘ ত্রিশটি বছর?'


পড়ছিলাম বিভূতিভূষণের ছোট গল্প 'চিঠি'। পড়া শেষে আস্তে করে বইটা মুড়ে রাখলাম। চিঠির আর্তিটি কেন জানি মনের মধ্যে ঘুরতে থাকল - 'লিপিখানি ডাকঘরের কর্মচারীরা এতকাল লুকিয়ে রেখে কি রসিকতা করতে চেয়েছিল আমার সঙ্গে? ত্রিশ বছর পরে এ চিঠি পেয়ে লাভ কি আমার?'

মনে পড়ল চিঠি জিনিসটি এখন তো প্রাগৈতিহাসিক। লিখি বটে লিখন-গণন যন্ত্রে নানান বার্তা নানান মাধ্যমে। কিন্তু ঐ যে টাটকা কাগজে কলমের আঁচড়ের যে পত্র - সে তো বিলুপ্ত প্রায় আমাদের আধুনিক জীবনে। অথচ ঐ চিঠি, ঐ কাগজ, পত্রের ভাষা, হস্তাক্ষর সবই তো  পত্র প্রেরকের পরিচয়কে তুলে  ধরত। আর প্রাপক? তিনি পেতেন খামটি ছিঁড়ে, একটু ফুঁ দিয়ে খামটি ফুলিয়ে চিঠিটি বের করে আনার আনন্দ, অতি আলতো করে পত্রটির ভাঁজ খোলার সুখ, তারপরে তারিয়ে তারিয়ে বক্তব্যের স্বাদ গ্রহন - বার বার চিঠিটি পড়ে।

কত রকমের কাগজে আসত চিঠি। ফকফকে সাদা, গাঢ় নীল, আকাশী নীল, হাল্কা গোলাপী। মোটা কাগজ, পাতলা কাগজ, দাগ টানা, দাগ ছাড়া। লেফাফার রকমফেরও তো ছিল মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো - লম্বাটে, চৌকো, মুখ আটকানোর জায়গাটা ঢেউ খেলানো খাঁজ কাটা অথবা সমান, আঠা লাগানো অথবা আঠা ছাড়া।

আরো তো ব্যাপার ছিলো। তখন আমরা তিনতলা এক বাড়ীর দোতলায় থাকি একটি সরু রাস্তার ওপরে। আশে পাশে আরও বাড়ী-ঘর, দালান-কোঠা আছে - অনেকটা গা ঘেঁসাঘেঁসি করে।

পাশের বাড়ীর নীরা বৌদি যখন প্রবাসী স্বামীকে চিঠি লিখতেন, তখন লেফাফার কোনায় একটা ছোট্ট গোলাপ ফুল এঁকে দিতেন। জানতাম কারন, তাঁর চিঠিগুলো ডাকবাক্সে ফেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমাকে। বিনিময়ে পূজোর প্রসাদ - বাতাসা, নাড়ু, কাটা শসা পাওয়া যেত।

ওপরের তলার আসমা আপার কাছে চিঠি আসত দু'বাড়ী পেরিয়ে খালেদ ভাইয়ের কাছ থেকে। গোপনীয় সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য ও চিঠি আসত আমাদের বাড়ীর ঠিকানায়। অসুবিধে নেই। বাড়ীর বড় ছেলে হিসেবে চিঠির বাক্সের চাবি থাকত আমার কাছে এবং চিঠি বের করে আনার দায়িত্বও। খালেদ ভাইয়ের চিঠি সন্তর্পনে আলাদা করে সঙ্গোপনে নিয়ে যেতাম আসমা আপার কাছে। চিঠি প্রতি এক আনা পাওয়া যেত। আয়ের অমন সহজ পথ আর পেলাম না এ জীবনে।

 কত রকম সম্বোধন ছিল চিঠির - 'শ্রীচরনকমল্ষু', 'পূজণীয়া মা', 'সন্মানীয় আব্বাজান'। শেষটাতেও চমক কম ছিল না - 'প্রনত', 'দোয়া খায়ের'। মা'র বাক্স থেকে চুরি করা উপন্যাসে পেয়েছিলাম 'সুচরিতাসু' এবং 'প্রিয়তমাসু'। অর্থ বুঝিনি প্রথমটির এবং দোষও দেখিনি দ্বিতীয়টিতে। অতএব, দ্বিতীয়টি ব্যবহার করে পাশের বাড়ীর খেলার সঙ্গিনীকে চিঠিও লিখেছিলাম একটি। তারপর মায়ের হাতে মার খেয়েছিলাম, কারন সে অর্বাচীন বালিকা চিঠিটি আমার মা'র হাতে তুলে দিয়েছিল।

চিঠির আসল অত্যাচার শুরু হল স্কুলে এসে। বাংলা দ্বিতীয় পত্রে চিঠি ও আবেদন পত্র লেখার ছড়াছড়ি এবং পরীক্ষা পর্যন্ত গড়াগড়ি। আর কি ভয়ংকর সব বিষয় - 'পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লিখ', 'স্কুলে বিনা বেতনে পড়িবার জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদনপত্র লিখ'। সব পত্রের মূল কথা হচ্ছে 'ভিক্ষে চাও'। 'যথাবিহিত সম্মানপূর্বক ...' - ঐ সব পত্রের প্রথম লাইন মনে করলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।

কিন্ত এই সব পেরিয়ে চিঠির ব্যাপারে একটি কবিতার লাইন সবসময়ে আমাকে টেনেছে - 'আকাশের  ঠিকানায় চিঠি দিও।' রুদ্রের কবিতার লাইন, প্রথম কখন পড়েছি, ভুলে গেছি, কিন্তু কেমন করে যেন মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। তাই এখনএ কোথাও কথাটা যখন শুনি, পড়ি বা দেখি -চুপ করে যাই। কি যেন আছে কথাটায়, কেমন যেন লাগে।

আর একটি চিঠির শেষ পর্যন্ত কখনও যেতে পারি নি- রবীন্দ্রনাথের 'শেষ চিঠি' -

"অমলার ঘরে বসে সেই আখোলা চিঠি খুলে দেখি,
                   তাতে লেখা -
     'তোমাকে দেখতে বড্ডো ইচ্ছে করছে'।
                        আর কিছুই নেই।"

২টি মন্তব্য:

  1. লেখাটি পড়ে মহাদেব সাহার চিঠি কবিতাটি মনে পড়লো। এরই অংশ বিশেষঃ
    করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও

    আঙুলের মিহিন সেলাই

    ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,

    এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো

    অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।

    চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও

    সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়

    বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও!

    আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি

    আসবেন অচেনা রাজার লোক

    তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।

    উত্তরমুছুন