বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৮

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জার্নাল--চাই ল্যাটে : ভয়ের উৎপাদন ও কল্পনার স্বর্গরাজ্য

ভাইরাস 'আর', সিন্ড্রোম 'জে' ও নিউরনের আয়না 


উৎসর্গঃ জ্যোতির্বিজ্ঞানী শ্রী দীপেন ভট্টাচার্য কে

“When I do good I feel good, when i do bad I feel bad. That is my religion.” 

-আব্রাহাম লিঙ্কন


জানাজানি করে, ইস্তেহার দিয়ে এদেশে ঋতুরা আসেন। অফিসিয়াল মতে এইবারও এসেছেন তিনি। ললিতের রাগে। ঋতুর রানী। তবে সারা আমেরিকা জুড়ে ভরভরন্ত বরফে তিনি চাপা পড়ে আছেন। যেভাবে শীত ঘুমে থাকেন কোন শস্য-বীজ। তেমনই এবারের বিলম্বিত বসন্ত টি। এসেছেন কিন্তু আসেননি। আছেন কিন্তু নেই।

যেমন ঈশ্বর। স্বর্গ থেকে আঁখ-মিচোলি করার, না-দেখা এলিয়েন। ঈশ্বর এলিয়েন। অনুপ্রবেশকারীরা এলিয়েন। আমরা সবাই ও তো পরস্পরের কাছে এক একটি নীল সবুজ, রঙ্গিন, বেরঙ্গিন এলিয়েন।

এ সব সাত-দশ আলগা ভেবে ভেবে দুপুরের কফির সাথে অফিসের ঘরে কাগজ খুলে বসে দেখি- নরক নাই! অফিসিয়াল মতেই নরক নাই। ভ্যাটিকান মতে নরকের এন্তেকাল হইয়াছে।

ভাটিক্যানের রকস্টার সম পোপ বলিয়াছেন- 'নরক নাই'।

হা আল্লা। তবে তো ইবলিশ ও নাই । যম রাজা নাই। মুগুর নাই। ক্যালাইত বদন চিত্রগুপ্ত নাই। আহা নচিকেতা । সে তো সত্য সন্ধান করিতেছল। সে ও তবে নাই ।

আমি ফোন করে আমার ছাত্রী রাবেয়া কে ডাকি। এ খবরটি এখুনি তাকে দেওয়া দরকার। কালচারাল স্টাডিজ এর দ্বিতীয় বর্ষ তার। গত কয়েক দিন নানা ট্রোল এর শিকার হয়ে চলেছে সে। ক্লাস-ঘরের আলোচনা ফেসবুকে ও ফেসবুকের আলোচনা ক্লাস-ঘরে সপ্তাহ ভর তাকে তাড়া করেছে। তার আপত্তি ছিল- 'আর- আই- পি' এই তিন অক্ষর নিয়ে।

একটি ফেসবুক পোস্টে রাবেয়া লিখেছিলেন- 'রেস্ট ইন পীস' শব্দ বন্ধটির কোনই গুরুত্ব নেই তার কাছে । তিনি নেই, অনেক দূরে না ফেরার দেশে শান্তিতে থাকুন। এই কল্পিত সুখ-রাজ্যটি নিয়ে সংশয়ের প্রশ্ন তুলে বিপাকে পড়েছেন রাবেয়া।

রাবেয়া সিরিয়া দেশের মানুষ। রিফিউজি হয়ে তাদের পরিবার এদেশে এসেছেন কয়েক বছর হল। ঘন কালো এক পিঠ চুল ছড়িয়ে মিষ্টি এক অ্যাক্সেন্টেড ইংরাজিতে চমৎকার ব্যাখ্যা করছিলেন তার সহপাঠীদের কাছে। সেই নিয়ে যত জোট। গোল-মাটোল। ক্যাথলিক ঘন বিশ্বাসের কিছু সহপাঠীর রোষে'র মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। স্বর্গ নেই, মৃত্যুর পর সুখ- আরাম ভোগের এমন বায়বীয় পাকা বন্দোবস্ত নেই, এই না থাকার ভয় এর কল্পনা তার ধর্মপ্রাণ বন্ধুদের বিপর্যস্ত করেছে। ধর্ম তাদের এই সুখ-রাজ্যের সন্ধান দিয়েছে, সে অমৃত সমান সুখ-রাজ্য হারাতে চাওয়া না পসন্দ তাদের। না-মুমকিন ও।

লম্বা ফুলেল স্কার্ট দুলিয়ে আমার ঘরে এলেন রাবেয়া। বাইরে অনুপম চেরী-সমাগম। চেরী ফুলের ভরন্ত ডাল চুয়ে পড়ছে জানলা বেয়ে। তার মেধাবী চোখে বসন্ত দুপুরের মাখন রোদ আভা।

শুনেছ- পোপও বলেছেন - নরক নেই। অতএব স্বর্গের এন্তেকাল ঘনিয়ে এলো। আর বেশী দূর নেই।

আমি বলি রাবেয়া কে।

আপন মনে নখ দিয়ে নখ খুঁটতে থাকে সে। এখনো সোশ্যাল-সাইটে ঝড় বইছে তার পাতায়। বিষণ্ণ মুখটিতে তার ছায়া।

-বেশীর ভাগ ধর্মেই তো সেই স্বর্গ আর নরকের উপাখ্যান। পুরস্কার আর শাস্তির লোভ আর ভয় দেখানোর কিসসা।

আস্তে আস্তে মুখ তুলে বলে সে।

-কিন্তু কেন বলত ?

রাবেয়া চুপ করে থাকেন।

-আধুনিক যুদ্ধ ব্যক্তিগত ঘৃণা'র থেকে উৎসারিত হয়না। হয়- প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ও রাজনীতির এজেন্ডা থেকে ।

বলি আমি রাবেয়া'কে।

পড়ছিলাম মার্গারেট মীড। মীড বলছেন-
'কোন অচেনা কিছু দেখে শিশুদের প্রাথমিক প্রকাশ যা তা'হল- ভয়ের। একটি বাদামী চামড়ার শিশু প্রথম যখন কোন শাদা চামড়ার মানুষ দেখে সে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠতে পারে। একই ঘটনা ঘটতে পারে একটি শাদা চামড়ার শিশুর ক্ষেত্রেও। প্রথম বার দেখা কোন কৃষ্ণকায় মানুষ দেখে সে একই ভয় প্রকাশ করতে পারে। এই ভয় কে সহজ ভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে, তার থেকে জন্ম নিতে পারে ঘৃণা।'

-কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানো রাবেয়া- মজার ব্যাপার হোল এই ঘৃণাকে নিয়ন্ত্রন এর পুর্ববর্তী ধাপটিই সবচে ধোঁয়াশার বিষয়। তা হোল- সেটিকে চিহ্নিতকরণ। অনুধাবন।

এ প্রসঙ্গে মার্ক টোয়েন মনে পড়ে যাচ্ছে এবার। আমি মনে করার চেষ্টা করি।

মার্ক টোয়েন মনে করার চেষ্টা করছেন - 'আমার ইস্কুলের দিন গুলিতে, আমার পষ্ট মনে আছে দাস প্রথা নিয়ে আমাদের মনে কোন খারাপ লাগা ছিলনা। আমি ভাবিনি এর মধ্যে কোন খারাপ কিছু আছে। কেউ কখনো এ নিয়ে কোন ধারণাও আমাদের মনে ঢোকায়নি। লোক্যাল খবরের কাগজেও কখনো কিছু দেখিনি। লোক্যাল পালপিট আমাদের শিখিয়েছিল যে- ভগবান স্বয়ং দাসপ্রথা অনুমোদন করেছেন। কারণ তিনি তাই চান।এটি একটি পবিত্র বিষয়। তারা চার্চে দাসত্ব সম্পর্কে বাইবেলের অনুমোদন এর অংশ গুলি জোরে জোরে পাঠ করত। এমনকি স্লেভরাও কখনো কিছু বলেন নি। তাদেরও কোন আপত্তি দেখিনি। "

শাদা খ্রিষ্টান জগত এই মিথ্যা উৎপাদন করেছিল। শুধুমাত্র ক্ষমতা হাত করার স্বার্থে। I

কারণ কল্পিত স্বর্গের ঈশ্বর তা অনুমোদন করেছেন। রচনা করছেন অনুদেশ- পৃথিবীর সব শাস্তি পাওয়া হলে স্বর্গের উদ্যানে অপেক্ষা করে আছে অনন্ত সুখ । স্নিগ্ধ সকাল, মায়াময় হলুদ দুপুর অনন্ত কালের মত থেকে যাওয়া সময়ের আশেপাশে ছড়ানো ভোগের অক্ষয় উপাদান। এই আশার টোপে আমরা জিহাদ করি, মুসালমান মারি, দলিত দলন করি, গির্জার পাদ্রীকে জ্বলন্ত জ্বালাই শিশুপুত্র সহ। এই আমাদের স্বর্গরাজ্য। কারণ সে আসন্ন হবে। তাই পৃথিবী জুড়ে এই নরক গুলজারের আয়োজন।

সেই সুখ হারিয়ে ফেলা ভয়ের। মৃত্যুর পর কি আশা তবে টিকে থাকবে আর? যাতে করে মর্ত্যবাসে অসীম দুঃখ আর যন্ত্রণা তারা সহ্য করে নিতে পারে।

অতএব আবার সেই মীডে'র কথায়। ভয়ের উৎপাদন ও নিরসনে'র ন্যারেটিভে। এই সেই ভয়- যার মুলে আছে ধর্মের গোঁড়ামিতে ফুটে থাকা ভাইরাস এক। ভাইরাস- আর।

রাবেয়া'র চলে যাওয়ার পথটির দিকে তাকিয়ে ভাবি আমি।

এ বছর ক্যাম্পাস জুড়ে ড্যাফোডিল লাগানো হবে। অথচ শীত যাই যাই করে যায়না । চারাগুলোর গোড়ায় পুঞ্জ পুঞ্জ তুষার এখনো পড়ে আছে।




ব্যক্তি বা সমষ্টি ও সাইকোসিস

ধর্মীয় অন্ধতার মুলে আছে ভয়। ব্যক্তির ও সমষ্টির। এই ভয় টিকিয়ে রাখা দরকার। ভয় এর যন্তর-মন্তর নির্মান লাগবে। তার মধ্যে জনমন কে সেঁধিয়ে দিতে হবে। তারপর রাষ্ট্র তাহাদিগকে ব্যবহার করিবে। তার জন্যে সংগঠন চাই। সমষ্টির এই ভয়, কারখানা গড়ে তোলে কোন কোন ব্যক্তি মনে। দেখা দ্যায় সাইকোসিস।

ধর্ম এই অ্যান্টিথিসিস কে জয় করতে আসার এক হাতিয়ার। যদি ঈশ্বর নামের কেউ এই দুনিয়াদারীর মালিক হন, বা তাকে হওয়ানো যায় এবং তিনি অমর এই বলে মনুষ্যকে তার দুনিয়াদারীর লোভ দেখানো যায় যে তারাও মৃত্যুর পর বেহেস্তে যাবে, অমরত্বের অংশীদার হবে, তবে মরণের ভয় ও জাগতিক শাস্তির ভার ও তার সাথে আঠার মত জুড়ে থাকা ভয় অনেকই কেটে যাবে। কারণ ধর্মই এই সকল রক্ষা করে।

অতএব ধর্ম হারাবার ভয় পয়দা করিতেই হইবে। প্রয়োজনে সন্ত্রাস। সে সন্ত্রাসে মুনাফা উঠবে ধনতন্ত্রের। অনেক মুখী ফায়দা-ব্যাবস্থা সে। ধর্মের টিকি বাঁধা থাকতে হবে তাই এই সন্ত্রাসে। সে তার সন্তান। সে মৃত্যু'র ভয় কে প্রশমন করিবার চেষ্টায় থাকে। কল্পিত স্বর্গ ও অমৃতের ব্যাবস্থা করে থাকে। সে অমৃত যোগ হবে ঈশ্বরের করুনা'র ধারায়।

এইখানেই এসে যাবে সাইকোসিস। আমার মনে পড়ে যাছে রেবেকার কথা। আমি ফ্লোরিডা থাকাকালীন আলাপ হয়েছিলো রেবেকা'র মার সাথে। হাজার ডাক্তার-বদ্যি দেখিয়েও সুস্থ করে তোলা যায়নি রেবেকাকে।



রেবেকা, স্বর্গরাজ্য ও হোশান্না

'হোশান্না হোশান্না
ওই এলেন শান্তিরাজ
ধন্য তিনি ধন্য
পথ খুল যীশুর জন্য
নিজ রাজ্য লইবেন আজ'

গুনগুন করে গায় রেবেকা। সুরের মধ্যে কি যেন এক কান্দন। মায়া করে তার। জেরুসালেমের পাথুরে পথে খেজুর পাতা ওড়ে। তার মন উড়ে যায়। সেই মাখন রঙ্গা পাথুরে দেওয়াল। মধ্য পৃথিবীর প্রাচীনতর মায়া-আলোক ছড়িয়ে আছে জেরুসালেমের পাথরে পাথরে। সেপিয়া রঙের রাস্তাগুলিতে।

রেবেকা'র শীর্ণ হাত দুটি বুকের কাছে ওঠে। তার নরম স্তন ছুঁয়ে থাকে সেই হাত, স্তনের তলায় তিরতির করে বইছে কাঁদন, না দেখা মেসাইয়াহ'র জন্যে। ধারাস্নানে ভাসতে থাকে তার গণ্ডদেশ, গ্রীবা, বুকের উপত্যকা অঞ্চল। নাকে আসে তার- জর্ডন নদীর ঘ্রাণ।

আমার পাড়ার মেয়ে রেবেকা। জেরুসালেমের মানসিক হাসপাতালে এক মাস কাটিয়ে ফ্লোরিডায় ফিরে এসেছে।

অজানা স্বর্গের হাতছানি তার চোখের তারা-দুখানিতে। তার ধারণা তার গর্ভে এসেছেন শিশু যীশু। তেমনই তার প্রত্যয়। এদিকে কোন মেডিক্যাল পরীক্ষাতেই তার গর্ভধারণ প্রমাণিত হয়নি। বছর উনিশের এই তরুণীর জন্যে তার মায়ের অশ্রুপাত করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা।

রেবেকার কথায় আবার পরে ফিরবো।

ধর্ম যে অ্যাজেন্ডায় কাজ করে মূলত আর তার থেকে যা উৎপাদন হয়, তা ঘুরে ফিরে মীনের মত খেলে চলে বদ্ধ জলাশয়ে। কথা হোল- সমস্যা ঘুরেফিরে সেই একই শব্দবন্ধের আশেপাশে এবং তাদের পরপর সাজালে পাওয়া যাবে কয়টি শব্দ-কোলাজঃ

অন্তিম দিন
অমরত্বের সত্যসন্ধান
পবিত্র যুদ্ধ
অন্ধ বাধ্যতা
আদর্শ দিন

যেমন ভারতে মোদী বলেছেন- আচ্ছে দিন এসে গেছে। যেমন বাংলাদেশে প্রায়ই নানান তথাকথিত ইসলাম-তকমা'র প্রচার-ভিডিও দেখা যায়। সেখানে বলা হচ্ছে- মরলেই আচ্ছে দিন আসবে। দারুণ হুর-পরী সঙ্গম হবে।

যদিও নারীদের কি হবে, এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা যাচ্ছেনা বলে মনে হয়েছে। তবে উল্লেখ আছে- তারা হুর পরীদের থেকেও সুন্দরীতম হবেন। যাতে হুরদের প্রতি ঈর্ষায় না ভোগেন। মানে কমপ্লিট মেকওভার, আর হাতে রইল পেন্সিলের মত থাকছে- তাদের ইহজীবনের স্বামীরা। তাদের সাথেই কাল কাটাতে হবে। খাড়াচ্ছে- পুরুষদের ভাগে ৭২ হুরী প্লাস ইহজীবনের বৌ সকল। আর নারীদের ভাগে শুধুই ইহজীবনের স্বামী সকল। অর্থাৎ বেহেস্তে শরীর ছাড়ার পর শারীরিক পরিচয়ই মূল্যবান পরিচয়। পুরস্কার- সৌন্দর্য ও সঙ্গম। এই নিয়ে বেহেস্ত। নয়া জেরুসালেম। ইন্দ্ররাজ্য। এই হল আদর্শ দিন। আচ্ছে দিন ।

এ নিয়ে বলতে গিয়ে অবশ্যম্ভাবী ভাবে এর নারীবাদ এর প্রেক্ষিত চলে আসবে। কিন্তু এর মিসজিনিষ্ট দিকটি নিয়ে পৃথক ও বিস্তর আলোচনার প্রয়োজন আছে। এখানে এই পরিসরে তা আপাতত স্থগিত রাখলাম।




প্রাচীন মরাল ও বর্জাইস অক্ষরে লেখা

বিপন্ন মরাল ওড়ে। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের সার প্রাচীন সে কোন পুঁথি বা পাথরে লেখা আছে। তাই বায়ু দূষণ বা জনস্ফীতি বা জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়জনীয়তা তাতে নাই। তার সুরাহাও নাই।

আছে মৌলবাদ আর জাতীয়তাবাদের সুষম বণ্টন। সব মৌলবাদেরই চেহারা এই মত মোটামুটি এক।

হিন্দু এক্সট্রিমিস্টদের তৈরি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, আল-কায়দা বা অন্যান্য সমগোত্রীয় র‍্যাডিকাল ধর্মতান্ত্রিক দলের থেকে অভিন্ন কোন দৃষ্টিপাত নয়। যার জন্মের শুরু ১৯২০ সাল এর গড়া থেকে। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ কে কাউন্টার করতে। ধর্মকে প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলতে। প্রতিদিনকার খাবারে মিশিয়ে দেওয়া আজিনামোতোর মত সুস্বাদু বিষ। ফেনিল ফ্যাসিবাদ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার আগে 'হিন্দু' শব্দের কোন সুঠাম অবয়ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সিন্ধু জলধারার পথের দুপাশের অঞ্চলে বাস করা মানুষজন সবাই হলেন হিন্দু। হিন্দু অধিবাসী। কোন বিশেষ ধর্ম-মতাবলম্বী না। ১৮৭১ এ জনগণনা'র সময় হিন্দু দের এক পৃথক ধর্মমতাবলম্বী বলে এক ছাতার নির্মান শুরু করা হয়। ভারতীয়রা তাদের বসবাসের অনির্দিস্ট বিস্তৃত অঞ্চলটিকে 'হিন্দু-ধর্মের' দেশ বলে ভাবতে শুরু করেন।

সেই পথ বিস্তৃত হয়ে ক্রমে দ্বিজাতি তত্ব। দেশভাগ। পাঞ্জাব থেকে লাহোর, কলকাতা থেকে ঢাকা। আমরা এখন বিচ্ছিন্ন জাতি। বাঙালী ও বাংলাদেশী। ভারতীয় ও পাকিস্তানি। মুসলমানদের জন্যে একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে জিন্নার গড়া 'পাকিস্তান' এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামিক রাষ্ট্র। হিন্দুদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র ভারত সেকুলার হয়ে জন্ম নিলেও সে এখন স্বপ্ন দেখছে এক রামরাজ্যের। তাকে হতে হবে হিন্দু-রাষ্ট্র। বাংলাদেশ বাংলা ভাষার অক্ষর থেকে এখন সংস্কৃতির আরবী-করণের দুঃস্বপ্ন-রাজ্য। 

এ সহজ কাজ নয়। এর জন্যে ম্যানুফাকচার করতে হবে ভাবাবেগ। যাতে বুদ্ধি-যুক্তি অবশ হয়ে আসে। ভাবাবেগ হয়ে দাঁড়ায় সাইকোসিস। ক্রমে কালেক্টিভ সাইকোসিস। তা মানুষ মারতে যেমন দক্ষ, তেমনই দক্ষ কল্পনার স্বর্গ-রাজ্য রচনায়। যেমন 'সিন্ড্রোম-জে'। এইখানেই রেবেকা আসবেন। স্পষ্ট করব তার মন-কথা। 



সিন্ড্রোম 'জে'- জেরুসালেম সিন্ড্রোম

একদিকে ভূমধ্য আর অন্যদিকে লোহিত সমুদ্রের হাতছানি। ঝলমলে রোদ। শাদাটে বালু রঙের পাথর-বাড়ি। এক কিলোমিটার ব্যাপী দেওয়ালের পবিত্র বিস্ময়-থান- জেরুজালেম। খ্রিস্ট ধর্মের আঁতুড় ঘর। ফি বছর তিন বিলিয়নের অধিক জন জমায়েত।

এরপর, পরপর রাখছি কয়েকটি নাটকের কোলাজঃ 

একঃ এক আইরিশ ইশকুল মাস্টারনী জেরুসালেমে এসে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি সন্তান সম্ভবা। আর সেই সন্তানের জন্ম দিতেই তিনি জেরুসালেম এসে পড়েছেন। অতএব সে শিশু নির্ঘাৎ দেবশিশু। শিশু যীশু।

দুইঃ আবার এয়েচেন এক পেশীধারী পুরুষ, সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। তিনি ভাবতে শুরু করেছেন যে তিনি মহান বাইবেলের গল্প-গাথার স্যামসন চরিত্রটি। তাই উদোম উদ্যমে কঠিন পাথরের দেওয়াল মখমলী পর্দার ন্যায় হাত দিয়ে চিরে ফেলতে চাইছেন।

তিনঃ এয়েচেন এক শ্মশ্রুময় ইমোশনাল পুরুষ। এখানে আসা ইস্তক তার ধারণা হয়েছে তার শেষ জীবন সমাগত। এই ভেবে তিনি শেষ নৈশভোজ, 'লাস্ট সাপার' খেতে ছুটেছেন রেস্তোরাঁয়। তার দাবী রেস্তোরাঁ'র মালিক কে তার লাস্ট-সাপার এর জোগান দিতে হবে।

এদের সবার এবং এরকম আরও হাজার হাজার মনোরোগীদের ঠাই হয় জেরুসালেমের মানসিক হাসপাতালে। জেরুসালেমের স্বাস্থ্য-দপ্তর দাবী করছেন যে বছরে অন্তত গড়পড়তা ৫০ টি এইরকম ঘটনা ঘটে থাকে। যার মেডিক্যাল নাম- জেরুসালেম সিন্ড্রোম। বিষম এক সাইকোটিক ফেজ। আমি যাকে বলতে চাইছি- সিন্ড্রোম- জে।

কি এই জেরুসালেম সিন্ড্রোম ?

আসলে ধর্ম-সিস্টেমের ক্ষমতায়ন। মানুষের ব্যবহার ও ভাবাবেগ কে উস্কানি দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনায় ইন্ধন দেওয়া।

দেখুন মিল তৈরি হচ্ছে। একই মেকানিজমে এই উপমহাদেশেও চলে আসছে নিজেকে পয়গম্বর বা বাবাজী প্রচার করা। বেশীর ভাগই জেনে বুঝে, কখনো মনোরোগের শিকার হয়ে। কল্পিত স্বর্গের গল্প রচনা করে অন্যকে প্রলুব্ধ করা । সন্ত্রাসের ক্যাডার তৈরি করতে চাই এই সুখ স্বর্গের রচনা। স্বর্গে পুরস্কারের দাওয়াত। ধর্মীয় ঢপ সৃষ্টি। এই হোল মোটামুটি ধর্মের ক্ষমতায়নের অ্যানাটমি।

ঠিক এ জিনিশই ঘটেছিল রেবেকার সাথেও। 

পুলিশ বা সিকিওরিটি'র লোকদের বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হয় এই সব লোকেদের খুঁজে বের করতে। তবে মৌলবাদের বাড়বাড়ন্তে এদের খুঁজে পাওয়ার দরকার নেই। দরকার চিকিৎসার। আর চিকিৎসার শেকড় আরও গভীরে। যুক্তিহীন ধর্মবিশ্বাসের মূল সেখানে হাওয়ায় দুলে ওঠে। সে বাতাসে মিশে যাচ্ছে বাংলার গ্রামে পোলে বেঁধে রাখা উচ্চগ্রাম মাইক। সেখান থেকে চৈত্রের চটুল হাওয়ায় গান ভাসে-


'ও টুনি'র মা, টুনি তোমার কথা শোনে না'

জমে ওঠে জমজমাট উল্লাস। মদ মাখা রাত। নারীর চোখ থেকে উপড়ে নেওয়া প্রেম। কোমরের বেল্ট থেকে খুলে নেওয়া টাঙ্গি, চাকু, চকচকে পিস্তল।

গরু- শুয়োর। ঘোলা জল। জল- পানী বৈষম্যের ভাষ্য- বিরুদ্ধ সংলাপ।
শহর জুড়ে বুদ্ধিজীবী মিছিল। পহেলা বৈশাখের ফুলগাছ। সড়ক-ছাপ গান।
কখনো পদ্মার ওপারে জামাতী কোপ।
কখনো এপারে রাম নবমীর অস্ত্র মিছিল।

মনে পড়ছে- কিভাবে ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে হিন্দু মেয়ে, ধরা যাক রেবা মুহুরি বা রেবা মিস্তিরি'র ঘর। আছড়ে ফেলা হয়েছে তুলসী মঞ্চ। ফেসবুকে রেবা ছাড়ত ভয় দেখানো মা সন্তোষীর দর্শন খোদানো মিম- দেখা মাত্র শেয়ার করুন, না হলে অমঙ্গল হবে। শেষ অবধি তুলসী, শনি, সন্তোষী কেউই তার ঘরদোর রক্ষা করতে পারেনি।

পারেনি রাবেয়ার ধর্ম-ভীরু সিরিয়ান পরিবারটিও। পারেনি ঈশ্বরের জন্মস্থান সুরক্ষা দিতে রেবেকার তরুণী মনকে।

তবু ধর্ম সুরক্ষা বেঁচে আছে। সুরক্ষা মতে স্বর্গ আছে। ইবলিশ আছে। হুর-পরী অপেক্ষা করে আছে অনন্তের বিছানায়। শিবলোক আছে, ব্রহ্মলোক আছে। মৃত্যু'র পর আচ্ছে জীবন আছে। পুরস্কার আছে, বহুমূল্য ঘর-বাড়ি, ডলার-সোনা, উর্বশী নারী-শরীর সব আছে।

আর আছে ভয়। এ জীবন হারাবার ভয়। তাই আবার তাকে ফেরত পেতে হবে।

আর সেই মত জিইয়ে রাখতে হবে ভয়। করতে হবে তার উৎপাদন। তাই ম্যানুফাকচার কর গোষ্ঠী, চাপিয়ে দাও বানানো অনুদেশ।

যেই স্বামী স্বর্গের হুর-পরীদের ভোগ করার জন্যে সন্ত্রাস প্রচার করছেন। জীবদ্দশায় প্রেমহীন ব্যবহারে স্ত্রী'তে উপগত হচ্ছেন, সমাজে ধর্মীয় ক্যাডার তৈরির সন্ত্রাসে'র অংশীদার হয়েছেন, তারই জন্যে বাচ্চা উৎপাদন করে সেই স্ত্রী তার ইহজন্মের শরীর ভোগের সাপ্লাই দিতেছেন। যাতে পরকালে সে স্বামী হুর-পরী সঙ্গম করতে পারেন।
এদেরই কেউ কেউ রেবেকা, রেবা বা রাবেয়া। তাদের ভ্যাজাইনায় এভাবেই ধারণ করে যাবে এদের সন্তান।

এ এক আশ্চর্য কুমীর-লেজ খেলা। ভয় ও তার পুনরুৎপাদনের।

মানে ওই নৈরিৎ কোণে অপেক্ষা করে আছেন 'ভ', ওরফে ভয়। তিনি আপনার যুক্তি-বুদ্ধি পপ্সিকেলের মত চেটে খেয়ে কাঠিটা ফেলে দিচ্ছেন। তার দেখাদেখি আপনিও। তারপরই আপনি একটি পুষ্টিকর মীল খেয়ে নিচ্ছেন। হিসি ও মল ত্যাগ করে পুনরায় 'পুনঃ-উৎপাদন' করছেন। মানে বিলকুল এক ছোঁয়াচে হাই। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে যাচ্ছে। মানে ভয় পাচ্ছেন ও ভয় পাওয়াচ্ছেন। মানে পুনরুৎপাদন করছেন।

ছড়িয়ে দিচ্ছেন আরব অঞ্চল থেকে মাদ্রাসা হয়ে জ্যাক্সন হাইটস। পাদ্রী স্টেইনের কবর থেকে বাবরি মসজিদ হয়ে রানীগঞ্জ-আসানসোল। গ্লোবাল-লোক্যাল-গ্লোবাল এবং গ্লোক্যাল । ফ্যাসাদ নির্মান করছেন নয়া ঢপে।

কারণ ঈশ্বর কে মারা সহজ, বাবাজী-পয়গম্বর কে- নয়।

কারণ ধর্ম জনিত সকল ভয়ই আসলে মৌল। ওরফে অন্ধ। ওরফে বিচ্ছেদকামী। ওরফে গন্ডমুর্খ। ওরফে সন্ত্রাসী। ওরফে নারীবিরোধী। তাই তাদের স্বর্গটিও মুর্খের। 'গণ্ড'দের ক্লাসিক ঢপের। সর্বৈব মিথ্যের।




নিউরনের আয়না

নতুন এক সড়কের সন্ধান এসেছে।

ধরা যাক সারি সারি রঙ্গী-বেরঙ্গী আরশি। রঙ্গিন মাছেদের মত রঙ সেসব সার্শীর গায়ে। তড়িতে সরে সরে যায় সে মাছ যেমন। তেমনই চলন মস্তিষ্কেও।

সে এক আশ্চর্য নিউরন। ইন্দ্রজাল।

গিয়াকোমো রিজোলাত্তি ১৯৯০ সালে খুঁজে পেলেন এক সূত্র।

তার মাথায় প্রশ্ন জাগল- আমরা ভালোত্বের দিকে ধাবিত কেন? প্রশংসা ও স্তুতি করি কেন?

এর উত্তর হিসেবে পেলেন- মিরর-নিউরনকে। জানতে পারলেন- নিউরো-বিজ্ঞানে এই সেই মির‍্যাকেল যা আমাদের মস্তিষ্কে 'এম্প্যাথি' তৈরি করার জন্যে দায়ী। যার ইশারায় আমরা অপরের সহমর্মী হই, বেদনা বুঝতে চেষ্টা করি। একা ও অন্যকে সমস্বরে হাসতে দেখলে হেসে উঠি। আনন্দধারা বয়ে চলা'র ভুবনটিতে ধরা এক আয়না । আর মস্তিষ্কে পড়ছে তার প্রতিফলন। মিরর নিউরনের জাদু। ইন্দ্রজাল। 


মনো-বিজ্ঞানী ভি.এস রামচন্দ্রনের মতে মিরর নিউরন হল-
"single most important unpublicized stories of the decade."


আর আছে প্রেমের অণু- অক্সিটোসিন।

আমাদের ভেগাস নার্ভ আরও বেশী করে অক্সিটোসিন উৎপাদন করে যখন আমরা মানুষের ভালোত্বে অনুপ্রাণিত হই। বলা হচ্ছে আমরা আসলে প্রাকৃতিক ভাবে এই ব্যবহারে অভ্যস্ত। এই নিউরন বিজ্ঞানীরা বলার চেষ্টা করছেন- বলার হোমো-সেপিএন্স প্রজাতি'র মুখ্য অংশই প্রকৃতিগত ভাবে ক্ষতিকারক নয়। যা আদ্যন্ত ইতিবাচক। মিরর নিউরন আর অক্সিটোসিন আমাদের মস্তিষ্কে এই খেলা খেলছে অবিরত।

তবে কেন ধর্মীয় থান আর ঈশ্বরের ভয়ে নীতিশীল থাকার ধারণা?

ধর্ম আমাদের খারাপ কাজ থেকে বিরত করেনা। জনহত্যা, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গার মত খারাপ কাজ করিয়ে নেয়।

ভাবছিলাম এই আবিষ্কার মানুষের ঈশ্বরের ধারণাকে পালটে দিতে পারে। নীতিবোধ বজায় রাখতে ধর্ম বা ঈশ্বরকে ভয় করার প্রয়োজনই নেই তবে ? ঈশ্বর নামক স্বর্গীয় গাজরের আলাদা করে কোন ভূমিকাই নেই। সৃষ্টির ধারণার মুলে পৌছতে লাগবে যুক্তি ও বিজ্ঞান । কল্পিত মিথ্যের কোন ভূমিকা সেখানে নেই।

হয়ত শেষ কথা বলার সময় আসেনি। হয়ত গবেষণা জারী আছে। কিন্তু আসল কথাটি হলমিরর-নিউরন মানবিক ভালোত্বর দিকটি প্রকাশ করে ঈশ্বরের ভালোত্ব কে চ্যালেঞ্জ করেছে।

এখানে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতটি করেছেন মর‍্যাল সাইকলজিস্ট জনাথান হেইড। তার কথা হল - হোমো সেপিয়েন্স আত্ম ও অপরে'র, ব্যক্তি ও সমষ্টি'র দ্বন্দ্বে আদিকাল থেকেই জীর্ণ। আমাদেরআমাদের ইভ্যোলিউশন মতে এর থেকে 'উত্তীর্ণ' হতে হবে। আয়না-নিউরন এই বিবর্তনে আমাদের সহায়ক হতে পারে।

নিউরনের আয়নায় স্পিসিজের লেন্সে তার হাল্কা ছায়া পড়ে আছে। এক পিঠে আছে অন্ধকারের উৎসে থাকা সিন্ড্রোম ‘জে’ ও নীল নীল ভাইরাস ‘আর। অন্য পিঠে প্রেমের অণু। গোলাপী অক্সিটোসিন। থিওলজির সাথে এদের কারো কোনও যোগ নেই । ততক্ষণ হে হোশান্না, চৈতন্য-পরমার্থ, হে কল্পিত স্বর্গরাজ্য- স্বর্গরাজ্য কাহারো নহে।

ততক্ষণ আমরা বেদনার সন্তান।

*****

আজ দিনশেষে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় দেখি- ভরা বসন্তে ছেয়ে গেছে পাহাড়তলী। আসমান-জমিন। চেরী, ম্যাগনোলিয়ায় হুহু-ময় বসন্ত-উৎসব। চক্রবাল জুড়ে বেদনার রঙে

গলে গেলে অস্তে যাচ্ছেন সুবৃহৎ এক গলন্ত তারা। উপত্যকা জুড়ে ম্যাজিক-আওয়ার।

ঘাস ফুলটির পাশে উপুড় হয়ে মনে হয় জ্বলন্ত তারাটি বলে যাচ্ছেন-
-- উই আর অল স্টারডাস্ট।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন