বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

বই নিয়ে আলাপ : ইউনুসের গল্পের বই-- মোহসূত্র

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

কর্মসূত্রে দিল্লি-প্রবাসী তরুণ ইউনুসের প্রথম গল্প সংকলন ‘মোহসূত্র’ প্রকাশিত হল এবার, ২০১৮-তে। শাম্ভবী থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি সাতটি গল্পের সংকলন। গল্পগুলির পরতে পরতে অদ্ভুত একটা মায়া জড়িয়ে আছে। গল্পের বুনন, চরিত্র—সব কিছুর মধ্যে আছে মায়া। কখনও-বা বিষাদবোধ। আমাদের প্রতিদিনকার কিছুটা স্বার্থপর, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা মানুষদের থেকে ইউনুসের গল্পের মানুষরা আলাদা। দার্শনিক, ভাববাদী, অস্থিরচিত্ত, উদাস, অসুখী, স্ববিরোধী। মানুষ না বলে যুবক বলা ভালো।
কারণ সংকলিত গল্পের চরিত্ররা সকলেই প্রায় যুবক। তারা আর পাঁচজনের মতো গোছানো নয়। কেরিয়ার সর্বস্ব নয়। গত দু-আড়াই দশকে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি ছাড়িয়ে কর্মক্ষেত্রে পা দিয়েছে। অথচ তারাও গ্লোবাল। সময় সম্পর্কে সচেতন। তারই মধ্যে একটু অন্য রকম। অনেকদিন পর বাঙালি পাঠক এরকম যৌবনের গল্প শুনল। 
=====================================================================
=====================================================================
গল্পগুলির পটভূমি কলকাতা। কিন্তু কলকাতার বর্ণনা গুরুত্ব পায়নি তাঁর কোনও গল্পে। চরিত্রদের আচার আচরণের ভিতর দিয়ে লেখক শহর কলকাতার চরিত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। মানুষ এখানে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো। সমাজের যান্ত্রিক চাপে সে কোণঠাসা। কিন্তু এই আচরণকে সকলে তো মেনে নিতে পারে না। সে তখন আলাদা হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য ‘দমের পুতুল’ গল্পটি। 

পরিমলের মৃত্যুর খবরে অন্তরঙ্গ বন্ধু স্বায়ন্তন দৌড়ে গেছে। তারপর স্বায়ন্তনের ভাবনায় আমরা পরিমলের পরিচয় পাই। সে সবসময় চাইত অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে। অথচ তাদের অপছন্দও করত। নিজেকে প্রশ্ন করত সবসময়। আর বাকিদের সে মনে করত মেকি, যন্ত্রের মতো অভ্যেসের দাস। 

উল্টোদিকে পরিমলকে সবার মনে হত অন্যগ্রহের জীব। সকলের মধ্যে থেকেও একা। নির্বাসিত নায়ক যেন। মনে পড়ে— আলবেয়ার কাম্যুর আউটসাইডার। হিরোশিমা দিবসের দিন সকলে যখন আমেরিকান সেন্টারে বিক্ষোভ দেখাতে গেল, পরিমল গেল না। স্রোতের বিরুদ্ধে চলা এই পরিমলই একসময় মনমরা হয়ে যায়। মৃত্যুর সাথে সত্যি কি সব কিছু মুছে যায়। এই ভাবনা তাড়িত করে। 

স্বায়ন্তন তাকে বলে চারপাশের হাজার সমস্যা ছেড়ে মানুষ তার মতো এসব ভাবতে যাবে কেন। রেগে গিয়ে সে বলেওছিল স্বায়ন্তনকে “ওরা মানুষ নয়, দম দেওয়া পুতুল, পুতুল সব। এদের কারো কোনো প্রশ্ন নেই। জিজ্ঞাসা নেই। ওরা তো সব মরা, লাশ। রাস্তায় হাঁটলে আমার মনে হয় সব কঙ্কাল হেঁটে যাচ্ছে। বাসে বসলে মনে হয় সব যাত্রী জীবন্ত শব।” 

একদিন পরিমলও সত্যি লাশ হয়ে গেল। আর তার স্মরণসভায় বক্তৃতা শুনতে শুনতে স্বায়ন্তনের মনে হল সবাই দম দেওয়া পুতুলের মতো কথা বলছে। পরিমলের স্মৃতিচারণ করছে। সে চীৎকার করে ওঠে। আর দমের পুতুলের মতো থেমে যায় সব। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে আমরা সবাই পুতুল। দম দেওয়া খেলনা পুতুলের মতো পূর্ব নির্ধারিত খেলাটুকু খেলে যাই। দম ফুরিয়ে গেলে থেমে যেতে হয়। যতই দিন যাচ্ছে মানুষের মানবিক দিকগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সবাই যন্ত্র। সবাই পুতুল। এই পৃথিবীতে যন্ত্র-পুতুলের মতো নড়াচড়া করাটাই বেঁচে থাকা। দম দেওয়া পুতুলের অনুষঙ্গে ইউনুস চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন আমাদের যাপন। 

‘রামধনুর অষ্টম রঙ’ গল্পের অভি অস্তিত্বের সংকটে ভোগে। অনেক দূরের অচেনা এক কিশোর সে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে এনসিয়েন্ট মেরিনারের মতো সমুদ্র যাত্রায় বেড়ায়। হঠাৎ করে চুপ করে যায়। কখনও আক্রমণ করে। স্ববিরোধিতায় ভরা এই মানুষটিকে স্বাভাবিক যাপনে আনার চেষ্টা করে তার বান্ধবী রঞ্জিতা। রঞ্জিতার অনুরোধে লেখাপড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারে না। কোথা থেকে জমাট বাঁধা একরাশ জোয়ার এসে সব উদ্যোগকে ভাসিয়ে দেয়। হারিয়ে দেয় তার সবকিছু। আর পাঁচজনের মতো গোছানো হতে পারে না সে। তার মনে হয়—“চারদিকের সমস্ত অন্ধকার আমাকে চেপে আসছে...আমার দম বন্ধ হয়ে আসে...তখন চারদিকের কোথাও আলোর লেশমাত্র দেখতে পাই না।” সমগ্র গল্পেই দেখি অভি নিজেকে খুঁজে বেড়ায়। বেঁচে থাকার মানে খোঁজে। অন্যরকম ভাবে বাঁচতে চায়। অচৈতন্য অবস্থায় চোখ বুজে সে দেখে চারদিকে আর্যযুগের নচিকেতা। 

“সারা আকাশে নচিকেতা। মাটিতে নচিকেতা। মানুষ-পাখি-গাছ-গাছালি—সবকিছুর মধ্যে নচিকেতা। আর এসবের মধ্যে থেকে অভির আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। সেও গভীর নিষ্ঠায় নিজের ভিতর ডুব দেয় তার নচিকেতাকে খোঁজার চেষ্টায়”। 

ছিন্নমূল, হতাশ, অসহায় মানুষদের আশ্চর্যভাবে গল্পে তুলে ধরেছেন ইউনুস। নিজেরই মুদ্রাদোষে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়া মানুষের অভিনব এক মানস শিল্পিত এই গল্পে। 

নাম গল্পটি—‘মোহসূত্র’। অবশ্যই মনে রাখবার মতো একটি গল্প। বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত অনুভবের কাছে হঠাৎ একটা ফোন আসে। বহু বছর পর তারই ক্লাসমেট তনিমা ফোন করে বলে পরেরদিন সকালে এয়ার পোর্টে দেখা করতে। তারপর ফ্ল্যসব্যাকে গল্প এগোয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর চমৎকার সব টুকরো ছবি। অনুভব চেয়েছিল তনিমার সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে। তনিমাকে সে ভালোবেসে ছিল তার সব কিছু দিয়ে। তনিমা রাজি হয়নি কিছুতেই। কারণ তার প্রেমিক ছিল। বিয়ের কথাও ছিল তার সঙ্গে। লাস্ট ইয়ারে পুজোর ছুটির আগে তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে শান্তি নিকেতন বেড়াতে গেছিল। সেখানে ঘনিষ্ট হয় তারা। ছুটির পর তনিমা আর ফেরে না। শিলিগুড়ির বাড়িতে ফোন করে অপমানিত হয় অনুভব। তনিমাকে ফোনে পায় না। তারপর এত বছর পরে এই ফোন। সেদিনই আবার অনুভবের স্ত্রীর ডেলিভারি হচ্ছে হাসপাতালে। 

নির্দিষ্ট সময়ে তনিমার সঙ্গে এয়ার পোর্টে দেখা হয় তার। কথায় কথায় জানায় দিল্লিতে একটা স্কুলে পড়ায়। সে বিয়ে করেনি। একমাত্র সন্তান আদিত্যকে নিয়ে থাকে। অনুভব হতভম্বের মতো আবিষ্কার করে আদিত্য আসলে তারই সন্তান। তনিমার বাড়িতে চেয়েছিল অ্যাবরশন করতে। সে রাজি হয়নি। দিল্লিতে মাসির কাছে চলে যায় তখন। আদিত্য জানে ছোটবেলা থেকে তার বাবা মিসিং। সে আর্মিতে কাজ করত। 

আর কথা বলতে পারে না অনুভব। তনিমা যোগাযোগ না করতে বলে চলে যায়। আর তখনই শ্যালক দীপ ফোনে জানায় তার মেয়ে হয়েছে। মাথার মধ্যে জেগে ওঠে শান্তিনিকেতনে শোনা বাউলের গান—“তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা...মন জানো না...”। 

নিজেকে ভীষণ অসুখী মনে হয় অনুভবের। যেন রূপকথার সেই দুঃখী রাজকুমার। যার সব সময় মন খারাপ। এক কান্নাভেজা অনুভূতি ঘিরে আছে তাকে। গল্প শেষ এখানে। কিন্তু সত্যি কি শেষ ? আমাদের ভাবনায় আরেক গল্প শুরু হয়ে যায়। আমাদের অনুভবেও চারিয়ে যায় অনুভবের অমোঘ বিষণ্ণতা। প্রত্যেকের ভিতরের একটা দুঃখী রাজকুমার জেগে ওঠে এই সুযোগে। প্রাত্যহিক জীবনের অনেক অনিচ্ছাকৃত অপরাধের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে ওঠে এই গল্প। 

প্রেমেরই গল্প। অথচ প্রথাগত প্রেমভাবনার বাইরে। এই শহরের আরেকটি অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প ‘ভাঙাকাচ আয়না’। কলকাতার অন্য এক বাস্তবতা মূর্ত এখানে। বিদিশার বড় সাধ একটা আয়নার। সামান্য একটা জিনিস। তার জন্য কত আকাঙ্ক্ষা। অলোক এই তুচ্ছ বস্তুটিও কিনে দিতে পারে না স্ত্রীকে। লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক। মাইনের অনেকটা টাকা পাঠাতে হয় বীরভূমে মাসির কাছে। মেয়ে তানিয়ার টিউশন ইত্যাদির খরচ। ধরাকরা করতে পারে না বলে তার প্রমোশনও হয় না। সস্তায় কোথাও জমি কেনার কথা ভাবে। অথবা কোনও ভদ্রস্থ ফ্ল্যাট। বস্তি থেকে উঠে যেতে চায়। পারে না। ছুটির দিনগুলিতে দুজনে বসে প্ল্যান করে শুধু। অলোক এমন একজন মানুষ যে টাকা থাকলে না করতে পারে না। নিজের সমস্যার কথা ভুলে অন্যকে সর্বস্ব দিয়ে দেয়। 

ফ্ল্যাশব্যাকে এসেছে তাদের প্রথম আলাপের কথা। সিউড়ি কলেজে পড়ত বিদিশা আর অলোক। অলোক দারুন ফুটবল খেলত। ১৯৯২-এ ইন্টার কলেজ টুর্নামেন্টে ফাইনালে উঠেছিল তাদের কলেজ। ট্রেনে যেতে যেতে বিদিশা সেদিন বলেছিল গোল করতে বিনিময়ে সে তাকে কিছু দেবে। অলোক ডাকাবুকো ছিল না কোনও কালে। তবুও সেদিন জিতে ফেরার সময় বিদিশার কাছে এসে বলেছিল, সে কথা রেখেছে। বিদিশার জন্য দুটো গোল দিয়েছে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে প্রেম। সাধারণ বি-কম পাশের পর কলকাতা পুরসভার ক্লার্কের চাকরি। খেলার সার্টিফিকেটের কল্যাণে চাকরি হলেও খেলাটা আর থাকে না। 

অস্বাচ্ছন্দ্য, খিটিমিটির মধ্যেও দশ নভেম্বর বিয়ের দিনটা মনে থাকে তাদের। অলোক ছুটি নিয়ে নেয়। বিয়ের আগের দিনগুলোর মতো অলোক কিছু দিতে চায় স্ত্রীকে। সামান্য একটা আয়না চেয়ে বসে বিদিশা। স্পর্ধা ভরে অলোক জানায় আজই সে আনবে। কিন্তু ডিসেম্বরের দশ পেরিয়ে যায় সে আয়না আর আসে না। পুরনো আয়নার রঙ চটে গেছে কবে। 

তবে চেষ্টা সে কম করেনি। অফিস ফেরত বিভিন্ন দোকানে আয়নার দর করেছে। শেষমেশ একটা আস্ত আয়নাই কিনে ফেলে সে। সাড়ে ছ-শো টাকা দিয়ে। দোকানদার বলে এছাড়াও ডেলিভারি চার্জ চল্লিশ আর ফিটিং চার্জ একশো। এই টাকা বার করতে পারে না সে। নিজে বড় যত্ন করে পাঁচ-ফুট বাই দু-ফুট আয়নাটা ঘরে এনে বিদিশাকে চমকে দেয়। তানিয়া, তার টিচার অভিমন্যু সকলে এসে দেখে এই মহার্ঘ্য বস্তুটিকে। 

উপরের ভাড়াটের কাছা থেকে ড্রিল মেশিনটা চেয়ে আনে বিদিশা। বিদিশার সাহায্যে অলোক ড্রিল করে আয়নায় ফুটো করে। স্ক্রু টাইট করে হাতুড়ি পেটায়। উপরের দুটো স্ক্রু আটকানোর পর নিচের বাঁদিকে হাতুড়ি মারতে গিয়ে চড়... চড়... চড়াং... ঠন্‌ ঠন্‌... ঠন্‌ঠন্‌...। অনেকক্ষণ তারা কথা বলতে পারে না। অলোক আবার এনে দেবে বলে। বিদিশা জানায় পুরনোটাতেই সে কাজ চালিয়ে নেবে। গল্পটি শেষ হচ্ছে এভাবে—

“আয়না, সখের আয়নাটা সদ্য কেনার পর পরই ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু দুপুর রাত্রে বাল্বের আলোয় দুজনের অক্ষিপটলে দুটো পূর্বায়ব সচল মানুষ। কী জীবন্ত! কী প্রাণময়! উভয়ের বাহু জড়িয়ে নেয় উভয়কে। যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। আরও জল-ঝড়-বন্যা বিপর্যয় এলেও এরা হেলায় জয় করতে পারে সব বাধা বিপত্তি। ছেলেটা লেফ্‌ট ফরোয়ার্ড থেকে বল নিয়ে টাইফুন গতিতে ছুটে চলেছে। একজনকে কাটিয়ে, দুজনকে ডজ্‌ করে একেবারে বিপক্ষ গোলকিপারের কাছাকাছি। মেয়েটা উত্তেজনায় থরথর। বুড়ো আঙুলের উপর সারা শরীর ভর করে দেখে নিতে চায় কী হচ্ছে। উত্তেজনায় তার ঠোঁট কাঁপে। ছেলেটা ডান দিকে এক বাঁকানো শটে বল জাল বদ্ধ করেই ছুটে আসে উত্তরের গ্যালারির দিকে। তার দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ। মেয়েটার সারা মুখে রোদের ঝিলিক। দু-হাতের আঙুলে ভিক্ট্রি সাইন।”

শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের দাম্পত্য সম্পর্কের একটি অন্তরঙ্গ ছবি। এই একটি ঘটনা সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। না পাওয়ার বেদনায় দীর্ণ, একঘেয়ে সম্পর্কটা আবার আগের মতো জেগে ওঠে। দুটি নরনারী প্রেমে, আবেগে আবারও বেঁচে থাকার একটা মানে খুঁজে পায়। ছোটখাটো বস্তুগত চাহিদা তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। অপ্রাপ্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা, ঘৃণা—এসবই হয়তো সত্য। কিন্তু তার থেকে বড় সত্য ভালোবাসা। এসব না থাকলে চাপা পড়া ভালোবাসাকে চিনতে অসুবিধে হয়। কৌতুক-শ্লেষ-দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ঘটনার ঘনঘটা ছাড়াও শুধুমাত্র পরিবেশ রচনার মধ্য দিয়ে ইউনুস এই গভীর বার্তাটি প্রকাশ করতে পেরেছেন। অসাধারণ পরিবেশ রচনা ও উপস্থাপনা ইউনুসের গল্পের মূল আকর্ষণ। 

নিটোল কাহিনি গুরুত্ব পায় না ইউনুসের গল্পে। মানুষের অনুভূতি, বোধ, ভাবনারই শিল্পিত প্রকাশ তাঁর গল্পগুলি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে পারি এই সংকলনের ‘একটি মৃত্যুদণ্ডের ধারাবিবরণী’ গল্পটি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এক আসামীর মৃত্যুর আগের রাতের ভাবনাই এই গল্প। পরদিন সূর্যোদয়ের পর চারজন বন্দীর জবাই হবে। মরুশহরের একটি বন্দিশালায় তাদের ঠাঁই। চারজনের মধ্যে তিনজন ঘুমে-স্বপ্নে বিভোর। আর গল্পের কথক শেষ রাত্রের ওম-চিন্তায় মগ্ন। এলোমেলো চিন্তার ভিড়, স্মৃতিকাতরতার ভিতর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। যাবতীয় মনঃসংযোগ সকালের জন্য হলেও তারই মধ্যে সে চায় একটু নিজস্ব চিন্তাভাবনায় কাটতে। কথকের নাম ইনসান। 

"আশ্চর্য আমার নাম—ইনসান; সত্যিই তো, আমরা সবাই ইনসান—মানুষ। কেবল এর মধ্যে আমার নামটা মধ্যে মধ্যে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—হে ইনসান, তুমি উট নও, বকরি নও—তুমি ইনসান। তোমার বুদ্ধি আর শক্তি আছে, যা দিয়ে তুমি তোমার খুশি মতো পৃথিবীকে গড়ে নিতে পার। ইচ্ছে করলেই পার। তো আমার কী দোষ ? আমি আমার ইচ্ছে মতো একটু কাজ করেছিলাম। পিতৃভূমির দাস ইনসান সার্থকনামা হতে চেয়েছিল।” আর তার ফলেই মৃত্যুদণ্ড। ইনসানের সঙ্গে এই জেলখানায় দেখা হয়ে যায় তার কৈশোর সঙ্গী রাবেয়ার সঙ্গে। গল্পের শেষে কথক রাবেয়ার উদ্দেশ্যে বলে—“সত্যি বলছি রাবেয়া, আমি চিরদিন এমনটাই হতে চেয়েছিলাম। আমার পিতৃভুমির সন্তানরা যাতে নারীর ওড়া চুলে এমন ফুল গুঁজে দিতে পারে, এমন করে প্রেম-উষ্ণতা পায়, তাই আমি চেয়েছিলাম। তুমিও তা জানো রাবেয়া, আমার যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, ভালোবাসা—আমাদের জানো। তাই তো তুমি লাল ফুলে লাল হতে চেয়েছিলে। তুমি বেঁচে থাক রাবেয়া, অনুভব করবে একদিন না একদিন আমার এই পিতৃভূমিরই কোনও এক সন্তান তার নারীর চুলে গুঁজে দেবে লাল ফুল, আর এই মরুশহর সকালের রংমাখা বালির মতোই চিকচিক করে উঠবে সমস্তটা আনন্দ নিয়ে।” 

কবিতার মতো এক প্রচ্ছন্ন অনুভূতির গল্প। স্বপ্নের কুয়াসা মাখা গল্প। এক অসহায় প্রেমিক হৃদয়ের ছবি আঁকা এখানে। ইনসানের আবেগ আমাদেরও স্পর্শ করে। লেখকের সম্মোহনী কলমে প্রতিভাত প্রেমিকের আর্তি বারবার মনে পড়বে আমাদের। 

সংকলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প ‘যেন বা লবণ পুত্তলি’ অন্য রকম স্বাদ নিয়ে আসে। কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্রর চৈতন্যে পুরুষ-প্রকৃতি সবই একাকার হয়ে গেছে। দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা মিলে তিন। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। মানুষের ত্রিমাত্রিক সত্তার অলৌকিক একটি সংকটের কথা এসেছে। দেশ-কাল-পাত্র একাকার হয়ে গেছে এই গল্পে। কবিতার মতো করে লেখক শুভ্রের চৈতন্যের আলো আঁধারকে অসামান্য দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। আর তারই ভিতর দিয়ে অস্তিত্বের নানান জিজ্ঞাসা। শেষ পর্যন্ত এই গল্প একটি দার্শনিক মাত্রা পেয়ে যায়। 

গল্পের শেষ অনুচ্ছেদটি এরকম—“দুটি দেহ যেন বা দুটি শাখা, দুটি নক্ষত্রের মতো দুটি অঙ্গ, গভীর কান্নায় গলে যায়, দ্রবীভূত হয়। যেন তরল তারা, যেন বা নদী, যেন বা জল হয়ে ভেসে যায় দুকুল ছাপিয়ে মোহনার দিকে—তখনও আকাশে ছিল তারা... পূর্ণ চন্দ্র, তখনও মশারি ভাঁজ করা, টানটান, খাটের কলকব্জা অলসভাবে দেখছিল চাদরের লয়কারী। তখনও ভৈরব রাগ... তখনও সত্য পৃথিবী—পুরুষ ও প্রকৃতি।” 

অলৌকিক এক বিভ্রমের গল্প। কিছুটা নিরীক্ষামূলক গল্পটিতে আছে রূপক প্রতীকের আবরণ। শেষ পর্যন্ত এ শুধু আর গল্প থাকে না। তার থেকেও বেশি কিছু। 

প্রায় প্রতিটি গল্পেই এসেছে ফ্ল্যাশব্যাক। ইউনুসের গল্পের স্টাইল এটা। টানা কাহিনি কথন নয়, ঘটনার বর্ণনা নয়, ছোট ছোট ঘটনা, টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে সমগ্র গল্পের বিন্যাস। অনেকটা কোলাজের মতো। কবিতার মতো সেই কোলাজের মধ্যে জেগে থাকে নস্টালজিয়ার স্মৃতি।

ইউনুসের গল্পের চরিত্ররা আমাদের ঠিক অচেনা নয়। তবে অন্যরকম। আমাদের চারপাশে এমন মানুষ থাকেই তো। তাদের আমরা এতোটা গ্রাহ্যের মধ্যে আনি না। ইউনুস তাদের ভিতর দিয়ে একটা সময়কে খুঁজতে চান। হয়তো নিজেকেই খোঁজন। সমবয়সী চরিত্রদের সঙ্গে লেখকের একাত্মতা টের পাওয়া যায়। তাই গল্পগুলির উপস্থাপন এতটা প্রাণবন্ত। ইউনুস, আরও লিখুন, আপনার হাত ধরে আমরাও আমাদের যৌবনকে খুঁজে পাই। যৌবন নাকি জীবন কে জানে! 



---------
মোহসূত্র
ইউনুস
প্রকাশক : শাম্ভবী, ২০১৮, ২৫০/- টাকা



লেখক পরিচিতি
বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন