বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্যে'র গল্প মৃত্যু নেই

জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে সারা পাড়া নিঝুম। কোনও সাড়াশব্দ নেই। শুধু গরম বাতাসের দাপটে গাছগুলো বেশ কিছুটা ছটফট করছে। তার আর্তনাদটুকু বাতাসে ঘোরাফেরা করছে। একে ‘লু’ বলে। যার ভয়ে কুকুর-ছাগলেরও দেখা পাওয়া ভার। ফেরিওয়ালারাও লু-এর ভয়ে দুপুরে আর আসে না। অবশ্য পেটের দায়ে যদি বা আসে, হাঁক-ডাক করে লাভ হয় না। গৃহিনীরা দুপুরের অলস ঘুমে ব্যস্ত থাকে। নয়ত কেউ বা সিরিয়ালে মগ্ন। 
শুধু মাত্র উমারানী নিজের বিছানায় শুয়ে জেগে আছেন। ঘুম আসছে না। কিন্তু উঠে বসার ক্ষমতা নেই। কোমরের হাড় ভেঙেছে। দিন কুড়ি আগে শুকনো মেঝেতেই পড়ে গেছেন। তার বয়স আশির কাছাকাছি। এই বয়সে হাড় জোড়া লাগবে না, তার পক্ষে আর উঠে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। যদিও ছেলে-মেয়েরা হসপিটালে দিয়েছিল। কুড়ি দিনের মাথায় স্ট্রেচারে করে বাড়ি ফিরেছেন। দু’জন আয়া রাখা হয়েছে – এক জন দিনের, আরেক জন রাতের। দিনের আয়াটির নাম মালতী, রাতেরটি সন্ধ্যা। 

– মালতী – মালতী, আমায় একটু জল দিবি? 

কোনো সাড়া নেই! মালতী নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। উমারানী নিজে উঠেও যে একটু জল খাবেন, তাও তো পারবেন না। হাতেও তো তেমন জোর নেই যে টেবিলের পাশ থেকে জল নেবেন। একটা ঘণ্টা থাকে, মাঝে মাঝে জোরে বাজান। এই ক’দিনে গলার জোরও কমে এসেছে। আগে একবার হাঁক পারলেই নীচ থেকে তিনতলা পর্যন্ত শোনা যেত। দুই মেয়ে যে যার মত দেখে গেছে। থাকতে তো পারতো, থাকল না – সবাই ব্যস্ত। মালতীকে ডাকতেও মায়া হচ্ছে। এমন অঘোরে ঘুমাচ্ছে – তবু – তেষ্টায় বুকের ছাতি ফাটছে–। উমারানী ঘণ্টাটা জোরে জোরে বাজালেন দু’বার। মালতী ধড়মড় করে উঠল, – কী হল ঠাক্‌মা, কিছু বলবা? কী হল? 

– “জল খাবো রে।” 

– “ও, দিচ্ছি।” 

মালতী কলোনীর মেয়ে। কথাবার্তায় একটু বাঙাল টান রয়ে গেছে। উমারানীও বাঙাল – বরিশালের মেয়ে। সে-সব এখন স্মৃতি। সেই ষোল বছর বয়সে নিজের দেশ ছেড়ে চলে এসেছিলেন শ্বশুর বাড়ি। তারপর আর কোনও দিন যাওয়া হয়নি নিজের দেশে। এখন আর বাঙাল বলা চলে না। ভাষাটাও বদলেছে বহুদিন আগে। তবুও ভাষাটার প্রতি একটা টান তো রয়েই যায়। দেশের প্রতিও অন্তরের গভীরে একটা টান থেকেই যায়। উমারানী ছিলেন মুখার্জি বাড়ির একমাত্র বাঙাল বউ। বাড়ির ছোট বউ, তার তিন জা। শাশুড়ি, ননদ সবাই মাঝে মাঝে খোঁটা দিত – পচা মাছ খায়, ঘাস পাতা, কচু – কিছুই বাদ যায় না। ছোটো ননদ একটা ছড়াও বেঁধেছিল – “গু খাস না গন্ধে, লোহা খাস না শক্তে”। 

ছোটো ননদ আর উমারানী প্রায় এক বয়সই ছিল। তাই তুই-তুকারির সম্পর্ক। বন্ধুই বলা চলে। শ্বশুর, শাশুড়ি, বড় জা, আর মেজো জায়ের কাছে ঘেঁষতে ভয় করত ষোড়শ-বর্ষীয়া উমারানীর। বাড়িতে সবাই উমা বলেই ডাকত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম বাড়ির লোক উমার কথা বুঝতেই পারত না। “পিছাখানা কোন হানে থোব?” বললে সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করত। দরজার বাইরে কেউ ডাকাডাকি করলে উমারানীর মুখ থেকে বেরোত – “কেডা আইসে?” 

– না ছোটো কাকি, আমি কেডা নই। আমি কার্তিক। 

বড় জায়ের ছেলে জবাব দিত। কিন্তু উমারানী ছ’মাসের মধ্যে এ-দেশের ভাষা শিখে ফেলেছিল। কারণ উমারানীর স্বামী আশুতোষ বিশেষ পছন্দ করতেন না বাঙাল ভাষা। বাঙালদের বিশেষ যে পছন্দ এমন নয়, শুধু বাবার আজ্ঞা পালন করতে উমারানীর সিঁথিতে সিঁদুর উঠেছিল। 

বড় ননদের বাঁকুড়ায় বিয়ে হয়েছে। জামাইষষ্ঠীতে নতুন জামাই ঘরে এসেছে। জামাই দুধ ভাত, পোস্ত এক সঙ্গে মেখে খায়। তাই দেখে বাড়ির ছোটো বউ হেসেছে! জামাই রেগে আগুন – “তোমাদের বাড়ির ছোটো বউ তো পচা মাছ খেতে ভালোবাসে। কই – আমি বলেছি, সে নিয়ে কিছু!” 

বড়দি চোখের জলে নাকের জলে। স্বামীর অপমান! সে আর বাপের বাড়ি আসবে না কখনও। ছোটো বউকে সাজা দিতে হবে। উঠোনে বিচার সভা বসেছে। সেটাও ছিল একটা গরমের সাঁঝ বেলা। হয়ত হতে পারত ভীষণ কোনও কঠোর সাজা। দু-দিন বন্দী থাকা, নয়ত এত বড় পরিবারের হেঁশেল সামলানো। কিন্তু ছোটো ননদ টুসি ফুট কাটল – আরে খাওয়া দেখে যখন হেসেছে, ওকে এই খাবারটাই খেতে দাও না – দুধ ভাত আর পোস্ত। 

তাই দেওয়া হয়েছিল। তবে এক গাল খাওয়ার পরই হরহর করে বমি করে ফেলেছিল। কিন্তু সবাই ভীষণ শান্তি পেয়েছিল – শাস্তি তো হল। টুসি আবার হাত ধরে ছাদে নিয়ে এসে আমের আচার খাইয়েছিল। বলেছিল – 

ওরে মুখপুড়ি উমা, এই যাত্রা তোকে বাঁচিয়ে দিলাম। আর কক্ষণও এমন কাণ্ড করিস না কো। 

উমারানীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল – টুসি প্রথমবার আতুর ঘরে গিয়ে আর ফেরেনি। 

বড় বৌমার ঘরে সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি শোনা যাচ্ছে। 

– মালতী, অন্ধকার হয়ে গেল রে। 

– হ্যাঁ ঠাক্‌মা, সাতটা বাজতে চলল, এবারে আমি যাবো। সন্ধ্যাটা বড়ো ফাঁকিবাজ হয়েছে। এখনও এল না! তোমার গা’টা মুছিয়ে দেব ঠাক্‌মা? কিছু করবা? 

উমারানী মাথা নাড়লেন – না রে, সন্ধ্যাটা আসুক। আসলে সন্ধ্যাটা এক জায়গায় রান্নার কাজ ধরেছে। তাই একটু দেরি হয়ে যায়। আমি তো ঠিক আছি। তুই এবার যা। তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা, মালতী আমায় একটু বাথরুমে নিয়ে যেতে পারবি? 

মালতীর চোখ কপালে – কী বল? পাগল! এখানেই কর। আমি বেড প্যান এনে দিচ্ছি। 

– না রে, ভাল লাগে না। 

– কী আর করবা ঠাক্‌মা? 

মালতী কথা শুনল না। বেড প্যানের ময়লা ফেলে এসে গা মুছিয়ে সারা গা সুগন্ধী পাউডার দিয়ে দিল। উমারানীও জানেন পরিষ্কার না থাকলে, শরীরে নাড়াচাড়া না থাকলে শরীরে পচন ধরে। ছোটো বৌমার গলা পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ ঘরে আসছে। রোজ দু’বেলা নিয়ম করে উপর তলা থেকে নীচে নেমে আসে। 

– কেমন আছেন মা? কোনও অসুবিধা নেই তো? 

উমারানী ঠোঁটের কোণে একটু হাসি এনে ভাল থাকার কথা জানালেন। বড় বৌমা কথা বলে না উমারানীর সঙ্গে। কিন্তু আগে তো বেশ বলতো! উমারানীর কেন জানি না মনে হয়, বড়ো বউমার কোথাও রাগ জমে আছে উমারানীর জন্য। উমারানী হসপিটাল থেকে ফেরার পর মেজ বৌমা, ছোটো বৌমা উপর তলায় নিজেদের ঘরে নিতে চেয়েছিল। মেজ ছেলেরও ভীষণ ইচ্ছে ছিল। মা দোতলাতে তার কাছেই এখন থাকবেন। কিন্তু উমারানী বেঁকে বসলেন – না, তিনি এক তলাতেই থাকবেন। এটাই ছিল তাঁর প্রথম শ্বশুর বাড়ি। পরে তা ভেঙে চুরে বদল হয়েছে। ছেলেদের জন্য দোতলা, তিনতলা উঠেছে। তাই তিনি নীচেই থাকবেন। বড়ো বউমাও আপত্তি করেনি তখন, কিন্তু আর কথা বলেনি সেদিনের পর থেকে। উমারানী শুধু শুনেছিলেন, একদিন বড়ো বউমা বলছে – বড়ো বউয়েরই কি সব দায়িত্ব? আর দু’জন তো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। 

উমারানীর সেদিন মনে হয়েছিল, সত্যিই তো, এটা তো ভাবিনি! বড়ো বউমা বাঁধা পড়ে গেল। আর তিনি বোঝা হয়ে গেলেন। 

সুবল উমারানী দেবীর বড়ো ছেলে দু’বছর হল অবসর নিয়েছেন। তিনি স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার ছিলেন। একটি মাত্র মেয়ে রিম্পা। বিয়ে হয়ে গেছে। জামাই স্টেট্‌সে থাকে। মেয়ে-জামাই বছরে-দু’বছরে একবার আসে। সুবলের বউ ঝর্ণা। ঝর্ণার খুব ইচ্ছে ছিল মেয়ের কাছে গিয়ে থাকবে। অন্ততঃ নায়েগ্রা ফল্‌স-টা দেখার ভীষণ ইচ্ছে ছিল। ভিসা-পাসপোর্ট সব রেডি হয়েই গিয়েছিল। এজেন্টকে দিয়ে সামনের মাসের টিকিটের কথাও বলে রেখেছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল শাশুড়িকে নিয়ে। ঝর্ণার মাঝে মাঝে মনে হয়, শাশুড়ি বুঝি ইচ্ছে করেই এই কাণ্ডটা বাঁধিয়ে বসেছেন। হয়ত আঁচ করেছিলেন, বড়ো বউমা এবার উড়বে। ঝর্ণার সারা জীবনে কোথাও একটু টাটকা বাতাসে গা ভাসানো হল না। শুধু মাত্র মাঝে মাঝে সোদপুরে বাপের বাড়ি যাওয়া ছাড়া আর গঙ্গায় ডুব দেওয়া ছাড়া কোথাও যাওয়া হল না। বিয়ের পর হানিমুনে লোকে স্বামীর সঙ্গে পাহাড় দেখে, বরফ নিয়ে খেলা করে। ঝর্ণার সমুদ্র দর্শন হয়েছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে ছোটো ননদও জেদ ধরেছিল – বড়দা, তুই সমুদ্র দেখাবি? 

বড়দাও মাটির মানুষ। সদলবলে সমুদ্র যাত্রা হয়েছিল। মেজ দেওর-ও বাদ যায় নি। ছোটো দেওর যেতে চায় নি। তার তখন প্রেম যমুনার মাঝদরিয়ায় নৌকা টলোমলো। আর বড়ো ননদ স্বামীর সঙ্গে হানিমুনে সিমলা, মনে হল দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছে। 

ঝর্ণার বিয়ের আগেই মুখার্জি বাড়ি ভাগাভাগি হয়ে গেছে। খুব সামান্য কারণেই ভাগাভাগি হয়েছিল। জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপার। মুখার্জি বাড়ির সামনের পুকুরটা বুজিয়ে ফ্ল্যাট করার ইচ্ছা ছিল উমারানী দেবীর স্বামী আশুতোষের। কিন্তু বাদ সেধেছিল আরও দু’ভাই। তারা যে যার ভাগের অংশ নিতে চায়। তাই শেষমেশ সব ভাগাভাগি হয়েছিল। আশুতোষ মুখার্জির বাবা সাংসারিক অশান্তি এড়াতে সব ভাগ বাঁটোয়ারা করে কিছুদিনের মধ্যে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু বুড়ি শাশুড়ির খোঁটা উমারানীকে সহ্য করতে হয়নি বেশি দিন। বছর না ঘুরতেই তিনিও দেহ রেখেছিলেন। কিন্তু ঐ এক বছর শাশুড়িতো ছিলেন তাঁর কাছেই। কই, তখন তো মনে হয় নি, তিনি একাই বাড়ির ছোটো বউ হয়ে বোঝা টানছেন! 

– মা,এখনো জেগে আছেন? 

হ্যাঁ, ছোটোবৌমা । 

– সন্ধ্যাকে দেখছি না? এখনও আসেনি! 

ঝর্ণার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। 

– আজ আর আসবে না রে সীমা। এই তো, আয়া রেখেও শান্তি নেই। 

ছোটো বউয়ের মুখে বেশ চিন্তার ছাপ পড়েছে। 

-কী হবে তাহলে? 

– কী আর হবে? আমি তো এখনও বেঁচে আছি। 

সীমা বেশ আব্দারের গলায় বলল – ওরকম বলো না বড়দিভাই, আমার বাপ্টুর নয় জ্বর এসেছে। নইলে আমিও থাকতাম। 

উমারানী ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন – এই তো বিকেল বেলায় দেখলাম ছেলেটা খেলছিল। কখন এল জ্বর? 

সীমা থতমত খেয়ে বলল, – এই তো, আসার আগে দেখলাম – গা-টা গরম। বলো, সামনের বছর মাধ্যমিক, এখন কত পড়া? আর সারাক্ষণ খেলে যাচ্ছে। বড়দিভাই আমি আসি। 

ঝর্ণার মনে হল, সীমা বুঝি পালিয়েই গেল। হায়রে, সব যেন ঝর্ণার দায়। মেজবৌ রূপারানী তো বেশ বছর বছর বরের সঙ্গে এল.টি.সি. পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবার নাকি কাশ্মীর যাবে। ঝর্ণা নীচ থেকে চেঁচাল – এই রূপা, রূপা–। 

কোনও সাড়া নেই। ঘরও তো অন্ধকার দেখাচ্ছে। না, কেউ নেই মনে হয়। টুস্‌কিটাকেও কলেজ থেকে ফিরতে দেখিনি আজ। মেজ দেওর অমল সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, – অমল, রূপা ঘরেনেই? 

– না, বড়বৌদি। ওর দাদার বাড়ি গেছে। আজ ফিরবে না। আর টুস্‌কি বন্ধুর জন্মদিনে, ফোন করেছিল, ফিরছে। 

আগে হলে ঝর্ণা বলত, তাহলে অমল, এখানে খেয়ে নিও। কিন্তু এখন রাগের চোটে শুধু বলল, – ও। 

অমলও কিছু বলল না, উপরে চলে গেল। রাত দশটা বাজে, উমারানীর খাওয়া-দাওয়া সারা। খাওয়া বলতে এক খানা রুটি দুধের সঙ্গে পেস্ট করে। তাও খেতে ইচ্ছা করে না। টুস্‌কি গান গাইতে গাইতে ঢুকল, ‘বসন্ত এসে গেছে...’। ঝর্ণার মাথাটা আজ বেশ গরম, – টুস্‌কি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। 

– কী হল জেম্মা, এত রাগ কেন আজ? সন্ধ্যামাসী কোথায়? আসেনি! 

- না। 

কি ঠাম্মু, তোমার আজ এই টুস্‌কি আয়াকে চলবে? 

ঝর্ণার অবাক লাগল – মানে? 

– মানে আবার কি? আমি ঠাম্মুর কাছে শোব। তোমাদের ক্যাম্প খাটটা আছে তো। 

ঝর্ণা ক্যাম্প খাটটা পেতে দিল। বিছানা করে দিল। আর মনে মনে হাসছে, রূপা না করুক, ওর ভাগের দায়টা মেয়েই সারুক। উমারানী টুস্‌কিকে যত দেখেন অবাক হয়ে যান। মেয়েটা সকাল-সন্ধ্যা শুধু ঠাম্মু বলে একটা হামি খেয়ে চলে যায়। আর দেখা পাওয়া যায় না। সেই মেয়ে আজ সারা রাত তাঁর সেবা করবে! ঝর্ণা যাওয়ার সময় বলে গেল, – দেখ যদি ঠাম্মুর বেড প্যানের দরকার হয়, আমাকে ডাকবি। তুই পারবি না। 

– ও মাই ডিয়ার জেম্মা, দেখ না আমি পারি কি না? 

ঝর্ণা শোওয়ার আগে গা ধুয়ে ফ্যানের তলায় বসেছে। সুবল একটা বই পড়ছে। পড়তে পড়তে বলল – এটা কি ঠিক করলে ঝর্ণা? একটা ছোটো মেয়ের ঘাড়ে –। 

– এই তুমি চুপ করো। যাও না, নিজের মাকে দেখ। 

– তুমি তো জান ঝর্ণা, আমি এগুলো একদম দেখতে পারি না। ও ঘরে ওষুধের গন্ধে আমার বমি পায়। 

– তাহলে একদম চুপ করে থাকবে। আর টুস্‌কিও ছোটো নয়। যথেষ্ট বড়ো। কলেজে বেশ তো প্রেম করে বেড়াচ্ছে। 

– কে বলল তোমায়? 

– সব খবরই পাই আমি। 

সুবল আর কথা বাড়াল না, শুয়ে পড়ল। 

টুস্‌কি রাতে নাইট ড্রেস পড়ে শুয়ে পড়েছে, – ঠাম্মু, দরকার পড়লে ডেকো আমায়। 

– হ্যাঁ দিদিভাই, ডাকবো। তুমি ঘুমোও। 

– কেন ঠাম্মু? তুমি ঘুমাবে না? 

– আমার ঘুম কই? 

– ওষুধ খাচ্ছ এত, তবু ঘুম পায় না? দাঁড়াও – ডাক্তার কাকুকে বলতে হবে। 

উমারানী হাসলেন। পুরনো কথা মনে পড়ে। টুস্‌কি উঠে বসেছে, – ও বুঝেছি, তোমার দাদুর কথা মনে পড়ছে। 

– হ্যাঁ রে পাজি। 

– যতই বল – প্রথম প্রেম! ঠাম্মু তোমার তো ষোল বছরে বিয়ে হয়েছিল। আর জ্যেঠু কত বছরে? 

উমারানীর ভীষণ লজ্জা করল। 

– তখন আমি সতেরো। 

– ও মাই গড্‌! মানে, আমার বয়সে তুমি ছেলে নিয়ে পাকা গিন্নি! 

– হ্যাঁ। এর পর আস্তে আস্তে তোর বাবা, কাকা, দুই পিসি। 

টুস্‌কি হাসল। দাদু এত ভালবাসত তোমায় – গণ্ডায় গণ্ডায় নিদর্শন রেখে গেছে। 

উমারানীর মনে পড়ছে, একবার মুখ ফুটে বলেছিলেন, আমাদের তো দুটি ছেলে হয়েছে, আর সন্তান নেব না। সেদিন স্বামীর চোখের কোটরে নিজের প্রভুকে দেখেছিলেন – শোন, মেয়েমানুষের জন্মই হয়েছে বিয়োনোর জন্য। 

না, আর কোনও দিন নিজের মত প্রকাশ করেন নি উমারানী। 

– তা দিদিভাই, তুমিও কি প্রেম করছ নাকি? 

টুস্‌কির মোবাইলে মেসেজ ঢুকছে – টুং টাং করে আওয়াজ হচ্ছে। ওই যে চলে এসেছে। রাতেই তো তার সময়। দিনে তাকে পাওয়া যায় না। শুধু পার্টিবাজি করে বেড়ায়। টুস্‌কি ফোনটা দুম্‌ করে সুইচ অফ করে দিল। 

– কি হল দিদিভাই, রাগ হয়েছে? 

– ধুর্‌ ঠাম্মু একদম যা-তা। সারাক্ষণ বলবে রাজনীতিকে শুধু ঘেন্না করলেই চলবে? ময়লায় নেমেই তো ময়লা পরিষ্কার করতে হবে। আমার কিন্তু বেশ ভয় করে। এখন দেখো তো, পলিটিক্স নিয়ে যা হয় – যখন তখন যে কেউ খুন হয়ে যায়। 

‘খুন’ কথাটা উমারানীর মনে কোথাও গিয়ে ধাক্কা দিল। স্মৃতির কুয়াশা কেটে উঠে আসছে একটা মুখ – মানস-দা। আম বাগানের পাশেই ছিল মানস-দা’র ঘর। আম পাড়তে গিয়ে প্রায়ই দেখা হত। মানসদা আর তার বন্ধু গোল বলের মত কি বানাত। একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, - এই গুলান কি বানাও? 

– এগুলা হইল বোম। কোমর থেকে একটা চক্‌চকে যন্ত্র বার করে বলেছিল, – এইডা হইল বন্দুক। 

মানসদার চোখটা উত্তেজনায় নেচে উঠেছিল। কিন্তু উমারানীর বুকটা ধরাস করে উঠেছিল, – এইডা দিয়া কি কাম হয়? 

– এইডা দিয়াই তো হইব, ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হইব, শয়তানগুলারে মাইরা আমাদের দ্যাশ স্বাধীন করতে হইব, ‘বন্দে মাতরম্‌’! 

বাকি ছেলেগুলোও বলে উঠেছিল, ‘বন্দে মাতরম্‌’! 

এরপর প্রায়ই কথা হত ভারত মাতার শৃঙ্খল মোচনে তারা কি কি করছে? শুনতে বেশ ভাল লাগত। মানসদার ভীষণ ভক্ত হয়ে উঠেছিল। মানসদা একদিন হাত ধরে বলেছিল, – উমা, তুই আমারে ছাইরা কুথাও যাস না রে। আমি বাঁচুম না। 

কিন্তু মানসদা সত্যিই বাঁচে নি। পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। 

– কি গো ঠাম্মু, ঘুমিয়ে পড়লে? 

উমারানীর চোখ থেকে জল গড়াল। 

– না রে দিদিভাই, ঘুম কই? দিদিভাই, কাল একবার বিপিনের মাকে আসতে বলিস। প্রায় চার দিন হল দেখা নেই। রোজই তো বিকালে আসত। একটু গল্পো করত। 

– ঠাম্মু, তোমার শুনতে ভালো লাগে? ওই এক গল্পো – আমার বিপিন ডাক্তার, জাপানে থাকে, এতো মাইনে পায়, গাড়ি, বাড়ি – মা গো! তোমার বোর লাগে না? আমার বউমাও ডাক্তার – নাতিটাও ডাক্তারি পড়ছে! বাপরে বাপ, পুরো ডাক্তারের গুষ্টি! 

– দিদিভাই, যে যা বলে সুখ পায়। 

– তো বুড়ি মাকে নিয়ে যায় না কেন? শেষ কবে বিপিন কাকুকে দেখেছিলাম, তাও মনে পরে না। 

– দিদিভাই, ও বুড়িতো যাবে না ভিটে ছেড়ে। আমার মত আঁকড়ে থাকবে। 

– ধুর্‌ যাবে না কি? নিয়ে যায় না, এটাই হল সত্যি কথা। ঠাম্মু, এবার ঘুমিয়ে পড় – রাত অনেক হল। 

উমারানীরও কত কথা ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। শরীরের যন্ত্রণাও পেইন কিলারের চোটে কমে আছে। একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছেন। 

ভোরবেলায় দমকলের আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। টুস্‌কি চোখ কচ্‌লাতে কচ্‌লাতে ব্যালকনিতে এল। ঝর্ণাও ছুটে এসেছে, তিন তলা থেকে সীমাও ছুটে এসেছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে সবাই বেরিয়েছে। গলির মুখটায় দমকলের গাড়িটা থামল। উমারানী কাঁপা গলায় বললেন, – কার বাড়িতে আগুন লেগেছে রে? টুস্‌কিও ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। সামনের বাড়ির জয়ন্তদা গলি থেকে এদিকেই আসছে। বিপিন কাকুর মা কুয়োতে ঝাঁপ দিয়েছে। কথাটা এতটাই চেঁচিয়ে বলল যে, উমারানীর কান দিয়ে বুকে ধাক্কা লাগল। তিনি অস্ফূটে চেঁচালেন – বেঁচে আছে? বেঁচে আছে? – কিন্তু কোনও উত্তর পেলেন না। 

বেলা বাড়ছে। ভীড়ও বাড়ছে। কাজের মেয়ে, দিনের আয়া মালতী – একে একে সবাই আসছে। উমারানীর একটাই প্রশ্ন মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে – কি এমন হল, যার জন্য এই আত্মহত্যা! 

– মালতী, তুই কিছু শুনলি রে, কেন এমন করল? ও তো এমন ছিল না। বেশ হাসি খুশি থাকত। 

মালতী আমের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, – খুশি তো উপরে। কার ভাল লাগে বল তো, ছেলে-বউ-নাতি কেউ কাছে থাকে না। ওই বুড়ির বাড়ি যে কাজ করে – ফেণি, ও তুমি চিনবে না। ওই ফেণিই বলল আজ, চারদিন আগে নাকি ছেলে ফোন করেছিল, কথার শেষে ফোনটা কাটে নি তখনও, এদিকে ছেলের বউয়ের কথা কানে এল – কত তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়, আর তোমার মা ঘাটের মরা হয়ে এখনও বেঁচে! আর কতকাল বাড়িটা আগলে থাকবে? 

উমারানীর মনে পড়ল বিপিনের মা তার চেয়ে দশ বছরের ছোটো তো হবেই। 

– মালতী, ওর তো বয়স বেশি ছিল না! 

–সে হোক গে ঠাক্‌মা, ছেলে মানুষ হয়ে গেছে, বউ হয়েছে, নাতি হয়েছে। যে যার নিজের মত, এখন মা তো ঘাটের মরা হবেই। তা বুড়ি নাকি এই চারদিন ধরেই এক কথা – সময় না হলে যাই কি করে ফেণি? আমি যতদিন, বাড়িটাও ততদিন। আমাদের এখানে আসেনি রে এই চারদিন। 

উমারানীর মনে হল, মানুষের মনের কথা যদি সত্যি সামনে আসে, তাহলে কী অনর্থই না ঘটে যায়। ভাগ্যিস তা শোনা যায় না। কালও ফেণিকে বলেছিলো, – কী করে মরি বল তো? তা সকালে তো কুয়োতে ভেসে উঠেছে, ফেণিই বাড়ি গিয়ে প্রথম দেখে। তারপর তো দমকল। 

উমারানীর বুকটা ভারি হয়ে আসছে – আচ্ছা মালতী, আর যদি কেউ বিছানা থেকে না উঠতে পারে – সে কি করে মরবে রে? 

মালতীর চোখে এবার জল এল। মেজবৌমার গলা পাওয়া যাচ্ছে। মনে হয় এইমাত্র ফিরেছে। বড়দিভাই, কী কাণ্ড বুড়ি বয়সে। ছোটবউমা সীমারও গলা যুক্ত হয়েছে – ভীমরতি! সত্যিরে, রিম্পিকে ফোন করে জানালাম। বড় বউমার গলাটা একটু উত্তেজিত মনে হল, - সত্যি, ভীমরতি ছাড়া কি? বুড়ি বয়সে ছেলের মুখে ঝামা ঘসে চলে গেল। উমারানীর শিরদাঁড়াটা টন্‌টন্‌ করছে। মনে হচ্ছে কোমর নয়, শিড়দাঁড়াটাই বোধ হয় অনেক টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। তবু মৃত্যু নেই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন