বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

জ্যাক এ্যান্ড জগা তুলসি পাতার চা

হাসান আহমদ 

সমুদ্রগামী কার্গো জাহাজের অবসরপ্রাপ্ত নাবিক এবং বর্তমানে অবসরকালীন একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সুলেমান আলির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটির কথা কোনরকম বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই আমি এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারি। মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়- এমন একটি ছোট্র দরজা বিশিষ্ট, টেবিল ফ্যান চলতে থাকা ও দম-বন্ধ করা জানালাবিহীন অফিস ঘরে- আমাদের প্রথম দেখা হয়। তিনি তখন তাঁর দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে চেয়ারে বসে, গভীর মনোযোগের সাথে স্টক খাতা, ক্যালকুলেটর ও গতকালের ডেলিভারি করা পণ্যের চালানগুলোর থার্ড কপি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমি টেবিলের বিপরীত প্রান্তে মুখোমুখি বসে, তাঁর বাম কানের ঠিক মাঝামাঝি অংশে থাকা অস্বাভাবিক ও সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এমন একটি ক্ষুদ্র বৃত্তাকার ফুটোর দিকে কৌতূহলের সঙ্গে তাকিয়ে ভাবছিলাম- মানুষকে তাচ্ছিল্য করে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ ব্যবস্থায় ‘কানকাটা রমজান’দের অভূতপূর্ব স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তিনি খুব সহজে ‘কানফুটো সুলেমান’ এর স্বীকৃতি পেয়ে থাকতে পারেন। ফুটোটা এমন যে, অনায়াসে তার ভেতর দিয়ে একটা মটরশুঁটিকে চালান করে দেয়া যেত। আমি বাম হাতের আঙুল ও তালুটাকে মুঠোর মতো পাঁকিয়ে, মাঝখানে সামান্য একটু ফাঁক রেখে, বাম চোখটা বন্ধ করে ডান চোখের সামনে দূরবীনের মতো চেপে ধরে ফুটোটি বরাবর তাক করে, তার ভেতর দিয়ে পেছনের দেয়ালে টানানো ইনভয়েস এর কপিগুলোয় সবুজ মার্কার কলমের টিক চিহ্ন দেওয়া দাগগুলো পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। 

সুলেমান আলি মাথা তুলে আমার দিকে চেয়ে কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে ম্লান হেসে, আবার নিচের দিকে তাকালেন। আমি নিজের অপ্রাসঙ্গিক বালকসুলভ আচরণের কথা বিবেচনা করে খানিক বিব্রত ও লজ্জিত হই, এবং ভদ্রতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে চেয়ারে সোজা হয়ে বসি। ক্যালকুলেটরে হিসেব মিলিয়ে ইনভয়েসগুলোতে সবুজ মার্কার কলম দিয়ে দাগ টানতে টানতে তিনি বলতে লাগলেন, “ছিদ্রটা দেখতেছেন, তাই না ভাইছাব?” তারপর তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন। “এইটা যুদ্ধের সময় হইছিল, বুঝলেন? আপনি এটাকে যুদ্ধের স্মৃতিও বলতে পারেন”। একটা শব্দহীন তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিলেন তিনি। 

‘যুদ্ধ’ এবং ‘স্মৃতি’, এই শব্দ দুটোর গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি আমার অপ্রস্তুত অবস্থার কথা ভুলে গিয়ে দ্রুততার সঙ্গে বলে ফেললাম, “গুলি লেগেছিল নিশ্চয়ই?” 

“তা লেগেছিল বটে।” সুলেমান আলি মাথা নিচু রেখেই উদাসীন ও নির্লিপ্ত কন্ঠে বললেন। “কিন্তু এই ছিদ্রের পেছনের কথা গর্ব করে বলবার মতো কিছু না”। 

“সেটা হতেই পারে”, আমি তাঁকে দ্রুত সমর্থন জানিয়ে পরিস্থিতিটিকে লজ্জিত অবস্থাটা কাটিয়ে উঠবার একটা মোক্ষম সুযোগ মনে করে জোরের সঙ্গেই বললাম। এবং তীব্র কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাইলাম, “কিন্তু কীভাবে হয়েছিল এটা?” 

“নিশ্চয়ই এটা জানতে চাওয়া আপনার কাজের অংশ না।” বললেন তিনি। মাথা উঁচু করে, একদম ভাবাবেগহীন, ধুসর ও স্থির চোখে তাকিয়ে, কপালের বলিরেখাগুলো সংকুচিত ও যথাসম্ভব দৃশ্যমান করে, মুখ বন্ধ রেখে, চেহারার মধ্যে একটা ভদ্রজনোচিত কাঠিন্যতা আরোপ করে, একজন সদ্য আগন্তুকের ভেতরে কিঞ্চিৎ অপমান-বোধ ছড়িয়ে দিয়ে পুনরায় হাসলেন। যার অর্থ হচ্ছে, আমি স্পষ্টতই বুঝতে পারলাম- আর বেশি এগুতে চেয়োনা বালক। এখানেই থেমে যাও। 

তখন আমি হন্যে হয়ে কিছু একটা করার উপায় খুঁজছিলাম। যেহেতু যেকোনো ভাবে হোক বেঁচে থাকতে হবে, আর বেঁচে থাকা ছাড়া আপনার হাতে আর কোনো বিকল্প নাই। উপায়ন্তর না পেয়ে সবে মাত্র বাজারে নতুন আত্মপ্রকাশ করা ‘জ্যাক এন্ড জগা’ নামের একটি টি কোম্পানিতে ‘তুলসি পাতার চা’ বাজারজাতকরনের চাকরির বন্দোবস্ত করি, তারপর দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী ছোট্র শহর কুলাউড়াতে রিটেইল সুপারভাইজার এর দায়িত্ব পালন করতে চলে যাই। সেখানে আমার প্রাথমিক কাজ ছিল, একজন পরিবেশক নিয়োগ দেওয়া। এমন একজন পরিবেশক- যিনি অন্যান্য কোম্পানির পরিবেশনা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং সেইসাথে আমাদের তুলসি পাতার চায়ের পরিবেশনা ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবেন। 

তো, সেবার হেমন্তের কোনো এক সন্ধ্যাবেলা ট্রেন থেকে নেমে, কুলাউড়া রেল স্টেশন লাগোয়া পুরোনো একটি সরাইখানাতে আমার প্রথম রাতটি কেটে যায়। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে বসের ফোনকলের শব্দে। আধো ঘুম আর আধো জাগরনের মধ্যে বসের কাছ থেকে একগাদা কাজের চেকলিস্ট হাতে নিয়ে শহরে বেরিয়ে পড়ি। বসের চেকলিস্ট অনুযায়ী আমার প্রথম কাজ ছিল সকালের নাস্তা করা। নাস্তা শেষ করে পরিবেশকের সন্ধানে শহর চষে বেড়ানো। কেননা, শুরুতে আমাকে একজন পরিবেশক নিয়োগ দিতেই হবে যা আমার চাকরির পূর্ব শর্ত। তারপর লাঞ্চ। লাঞ্চ করতে করতে বসকে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে একটা ‘হাফ ডে সামারি’ রিপোর্ট এসএমএস করা। লাঞ্চ শেষ করে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে কিছু সময় বিশ্রাম করা। তারপর বাসস্থানের সন্ধানে বের হওয়া। এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা বাসা খুঁজে আবার পরিবেশকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া। সবশেষে রাতে ঘুমোনোর আগে একটা ‘ফুল ডে সামারি’ রিপোর্ট বসকে এসএমএস করে বিছানায় যাওয়া। 

বলাইবাহুল্য, এভাবে আমি এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিই কিন্তু এই ছোট্র আধা-মফঃস্বল শহরের কোথাও কোনো পরিবেশক বা বাসার সন্ধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হই। ক্রমে এমন ধারনা দৃঢ় হচ্ছিল যে, পৃথিবীতে তুলসি পাতার চায়ের পরিবেশক নিয়োগ দেওয়ার মতো কঠিন কাজ বুঝি আর কিছুই হতে পারে না। প্রথমে আমাকে যে-সব কঠিন প্রতিবন্ধকতামূলক ও নেতিবাচক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা হলো- যেহেতু কুলাউড়া ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই চায়ের জন্য বিখ্যাত একটি শহর, তাই এই শহরের মানুষ কেন তুলসি পাতার চায়ের মতো অ-জনপ্রিয় পানীয় তাদের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য তালিকায় সংযোজন করতে যাবেন? এর জবাবে আমাকে এই নতুন পণ্যটির বাজার সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক লাভ এবং এর স্বাস্থ্য উপকারিতা ও ভেষজ গুণাবলী সম্পন্ন কিছু মুখস্ত বুলি আওড়াতে হতো। আমি তখন দাড়ি, কমা, ঢ্যাশ, কোলন ও সেমিকোলন সহ প্রতিটি বাক্য ভরাট কন্ঠে, নির্ভুল উচ্চারণে দ্রুত বলে যেতাম- 

“দেখুন, তুলসি পাতার চা একটি অসাধারণ ভেষজ গুণাবলী সম্পন্ন পানীয়”। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে শুরু করতাম আর লোকগুলো কৌতূহলের সঙ্গে কান খাঁড়া করে আমাকে শুনত। “এই চা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী”। আমি বলে যেতে থাকতাম, “আপনারা হয়তো জানেন না যে, এটা শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা দূর করে। জ্বর কমায়। মানসিক চাপ দূর করে। এমনকি অল্প বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। ডাক্তারি গবেষণায় দেখা গেছে যে, তুলসি পাতার এন্টি অক্সিডেন্ট, ফাইটোক্যামিকেলস ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে বাঁধা প্রদান করে। ইত্যাদি ইত্যাদি”। শুনে কেউ একজন হয়তো মুখে হাই তুলতে তুলতে বলে উঠতো, “ভাই, ফাইটোক্যামিকেল জিনিসটা কি?” আমি তখন কথা সুচতুর ভাবে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতাম, এমন ভাবে, যেন তার কথা আমি শুনতে পাইনি, যেহেতু ফাইটোক্যামিকেলস জিনিসটা যে আদতে কী এক আজব ব্যাপার, তা আমি কেন, আমার চৌদ্দ পুরুষের কেউ জানে কিনা সেটা একমাত্র ঈশ্বর অবগত। অথবা শুনতে পেলেও ভাব করতাম এমন যে, এটা নিছক গুরুত্বহীন একটা প্রশ্ন। জোরাজুরি করলে হয়তো বলতাম, “আগে ব্যবসাটা নিন না, পরে বুঝিয়ে দেব ঠিকঠাক”। কেউ হয়তো বলতো, “কমিশন টেন পারসেন্ট এর পরিবর্তে টুয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট করলে আমি ভেবে দেখতাম নিশ্চয়ই”। আমি তখন মনে মনে বলতাম, “তুই ভেবে দেখতে দেখতে মর গে শালা বাঞ্চোৎ কোথাকার!” 

এভাবে আমি হন্যে হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো প্রতিদিন পরিবেশকের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতাম এবং প্রতিদিনই একইরকম ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও ভগ্ন হৃদয়ে আমার ঢেরাতে ফিরে আসতাম আর সারা রাত ধরে ছারপোকার সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে, বসকে ‘ফুল ডে সামারি’ রিপোর্ট এসেমেস করতাম। আগ্রহ উদ্দীপনা হারিয়ে প্রায়ই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের চা বাগানের ভেতর বাগানিদের কলোনিতে চলে যেতাম। সেখানে রুদ্রপাল সম্প্রদায়ের আকাশপাল বাগানির ঘরে হাড়িয়া গিলতে গিলতে শুয়োর, ইঁদুর আর ভেড়ার চনার গন্ধে মাখামাখি হয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকতাম। কখনো সখনো হয়তো বসের ফোনকলে আমার ঘুম ভাঙত আর তখন দ্রুত মুখে ও গলায় জমে থাকা থুথু ও শ্লেষ্মাগুলো পরিষ্কার করে কন্ঠস্বরে একটা সতেজ ও স্বাভাবিক উদ্যম বজায় রেখে, বসের কল রিসিভ করার আগেই দায়িত্ব পালন করতে থাকা ভঙ্গিতে সম্ভাব্য কাল্পনিক পরিবেশকদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করতাম- “হ্যাঁ ভাই, তুলসি পাতার চা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এটা পেটের গন্ডগোল দূর করে...” একটানা বলতে বলতে বসের ফোন রিসিভ করতাম। রিসিভ বাটনে চাপ দেওয়ার পরও বসকে শুনিয়ে অবশিষ্ট আরো দুয়েকটি লাইন দ্রুত বলে যেতাম— “... তুলসি পাতার চা খারাপ কোলেস্টোরল কমায়। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দূর করে। দাঁত ও মুখের সমস্যা দূর করে... করে... হ্যালো, হ্যালো... স্লামালাইকুম বস...”। “হ্যাঁ, হিমেল, শুনতে পাচ্ছি, কাজ চলছে তাহলে?” “জ্বী বস। চলছে বস”। “গুড। গুড। ভেরি গুড। ক্যারি অন”। বস খুশি হতেন। 


শেষ পর্যন্ত সুলেমান আলি আমাকে উদ্ধার করলেন, বলা ভালো যে, আমাকে তিনি পরিত্রান করলেন। ক্যালকুলেটর, স্টক খাতা, ইনভয়েস ও মেমোগুলো একপাশে সরাতে সরাতে বললেন, “দেখি জনাব, আপনার স্যাম্পলগুলো দেখি তো”। 

আমি স্যাম্পলগুলো বের করে তাঁর হাতে দিলে তিনি একটা প্যাকেট খুলে ভেতরের টি ব্যাগগুলো নাকের কাছে এনে গভীর অনুভূতির সঙ্গে গন্ধ শুঁকতে লাগলেন। চোখদুটো বন্ধ করে প্যাকেটের ভেতরে নাকটা সেঁধিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে লম্বা করে শ্বাস নিলেন। আবার শ্বাস ছাড়লেন। আবার নিলেন। আবার ছাড়লেন। এভাবে বেশ কিছুটা সময় তিনি এমন করে একটা শিথিলায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে ডুবে গেলেন যে আচমকা একটা অপ্রত্যাশিত নীরবতা দমবন্ধ করা ঘরের গুমোট পরিবেশটাকে হালকা ও সহজ করে তুলল। এটা বলা খুবই উচিৎ হবে যে, একজন ষাটোর্ধ মানুষের এমন সাবলীল আচরনে আমি কিছুটা হলেও চমকিত ও আশাবাদী হই। তারপর টেবিলের ওপর একপাশে প্যাকেটটি সরিয়ে রেখে, কমিশন কত পার্সেন্ট, মাসিক সম্ভাব্য বিক্রয় কত টাকা, প্রোডাক্ট কি ক্যাশ অন ডেলিভারি না এডভান্স ডিডি করতে হবে- ইত্যাদি সম্পর্কিত ব্যবসায়ের বেসিক কিছু বিষয় জানতে চাইলেন। তারপর আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, “ব্যবসা তাহলে শুরু করা যায়”। 

হ্যাঁ, সত্যি সত্যি ব্যবসা শুরু হয়ে গেল। 

সুলেমান আলির কল্যাণে ব্যবসা এবং আবাসনের সহজ সুরাহা হলেও পণ্য বিক্রির ব্যাপারটা ততোটা সহজ হলো না। প্রথমে আমাকে পণ্য বিক্রির একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির জন্য ব্যাপক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করতে হলো। সেজন্য কোম্পানির তরফে আমার সহকারী হিসেবে স্থানীয় একজন বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করলাম। শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে, স্কুল কলেজ গির্জা ও মন্দিরগুলোতে ফ্রি স্যামপ্লিংয়ের মাধ্যমে লোকজনদেরকে তুলসি পাতার ভেষজ গুনাগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বোঝাতে হতো। এজন্য আমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থায়ী লোক সমাগম ঘটে এমন জায়গাগুলো বেছে নিতাম। কিন্তু সে সময় তত্বাবধায়ক সরকারের নামে প্রলম্বিত ছদ্ম-সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে, মানুষ জমায়েত হতে বা কিছু শুনতে চাইত না। যে-কোন জটলার কাছেই সাদা পোষাকধারী গোপন পুলিশ নজরদারি করত। সব কিছুতে কেমন একটা অস্বস্তি বা আতঙ্ক কাজ করত। কেউ কেউ আমাদের কাছ থেকে দু’য়েক প্যাকেট চা পাতা ক্রয় করতেন। ওইসব জায়গাগুলোতে মার্কেটিং ও প্রচারনার বিষয়টিকে উপজীব্য করে আশেপাশের দোকানগুলোতে কিছু পণ্য বিক্রয় করার চেষ্টা করতাম। যদিও পুরো ব্যাপারটি ছিল খুবই কঠিন। সারাদিনের বিক্রয়ের পরিমান থাকতো খুবই নগন্য। 

সকালে স্নান সেরে পরিপাটি হয়ে যখন কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তাম, তখন আমাদের শান্ত ও স্নিগ্ধ মুখচ্ছবিতে স্বর্গের আঙ্গুর বাগানে কর্মরত দেবদূতদের চেহারার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেত। দুপুরের পরেই তা পালটে গিয়ে কিম্ভূতকিমাকার শয়তানের মত লাগতো। সন্ধ্যায় যখন এভাবে আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসতাম, সুলেমান আলি আমাদেরকে দেখে হাসতেন। ব্যবসায়ের লাভ লস সম্পর্কে তার খুব একটা যে মাথা ব্যথা ছিল তা নয়। নিজের হাতে ফ্লাস্ক থেকে গরম পানি কাপে ঢেলে তাতে টি ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে দিতেন। এ কাজটা করতে তিনি খুবই পছন্দ করতেন আর তখন তাঁকে প্রানবন্ত ও নিরুদ্বেগ দেখাতো। চা খেতে খেতে আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। উৎসাহ দেয়ার জন্য তিনি তাঁর ফেলে আসা জীবনের গল্প করতেন। আর প্রতিবারই গল্পের শুরু কিছুটা নাটকীয়তার সঙ্গে অবধারিত ভাবে হতো এভাবে- “যখন আমি জাহাজে ছিলাম......!” খুবই আত্মবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তিনি গল্প বলতে পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, পৃথিবীর সব নাবিকেরাই চরিত্রহীন। এবং বিশেষভাবে সমুদ্রই মূলত নাবিকদের চরিত্রহীনতার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আর সমুদ্র এমন একটি খারাপ জায়গা, তিনি মৃদু হেসে বলতেন, সেখানে কোন ফেরেশতাও যদি নাবিকের চাকরি নিয়ে যায়, আর সে যদি বনি ইব্রাহীমের বংশের অনুসারি হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অবধারিত ভাবে একজন পাপিষ্ঠ হিসেবে অবসরে যেতে হবে। 

শুনে আমরা সবাই উচ্চৈস্বরে হো হো করে হেসে উঠতাম। এইটুকু বিনোদন উপভোগ করতে আমরা কার্পণ্য করতাম না। কেননা সারাদিনের পরিশ্রমের পর আমাদের ভেতরটা শুকিয়ে খরখরে শুষ্ক বালুকাবেলার মতো হয়ে যেতো। সুলেমান আলি সেখানে জল ঢেলে দিতেন। 

সুলেমান আলি সম্পর্কে যতটুকু জানতে পারি তা হচ্ছে, তিনি একজন বিপত্নীক পুরুষ। বয়স ষাটের ওপর অথচ তাঁর সুস্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার দরুণ তা বোঝার কোন উপায় নেই। সংসারে একমাত্র বৃদ্ধা মা। আর ছিল একটি মেয়ে। মেয়েটি এখন স্বামীর সঙ্গে ইউক্রেনের খারকিভের এক গ্রামে বসবাস করছে। সতের আঠার বছর আগে অল্প বয়সে মেয়েটির স্বামী ভারত, পাকিস্তান, ইরান হয়ে সাত আটটি দেশ পায়ে হেঁটে পারি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের পথে খারকিভের এক হৃদয়বান নিঃসন্তান কৃষক দম্পতির ঘরে আশ্রয় পায়। পাঁচ ছয় বছরে একবার তারা দেশে আসেন। মেয়েটার ঘরে দুটো নাতি নাতনি রয়েছে। আর একটা ছেলে ছিল ২১ বছর বয়সী। লিবিয়া থেকে নৌকা করে ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের পথে সাগরে তার সলিল সমাধি ঘটে। ছেলের লাশটি পরে আর ফিরে পাননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এএফপি’র এক সাংবাদিকের পেছনে দীর্ঘদিন লেগে থাকার পর জানতে পেরেছেন- মাল্টার সমুদ্র উপকূলের এক আন্তর্জাতিক শরণার্থী সমাধিক্ষেত্রে ‘ডক্টর উইদাউট বর্ডারস’ এর সদস্যরা তাঁকে কবর দেয়। ছেলের কবর দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও নানাবিধ জটিলতার কারণে ভিসার জন্য এখনো আবেদন করতে পারেন নি। ছেলের প্রসংগ উঠলেই তিনি তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বলতেন, “জীবনের বেশিরভাগ সময় সাগরে কাটাইলাম। অথচ দেখুক্কা ভাইছাব, সেখানে আমি ডুবলাম না। ডুবলো আমার ছেলেটা”। যেন আনমনে নিজের সঙ্গে বিদ্রুপ করতেন এমন একটা পরিহাস ঝরে পড়ত তাঁর কন্ঠস্বরে। তারপর কিছুক্ষণ নিরব থেকে উদাসীন ও অন্যমনস্ক কন্ঠে সুলেমান আলি বলতেন, “জীবনে হয়তো কোনো পাপ করছিলাম, ভাইছাব। পোয়াটারে হারাই আমি অউ পাপের শাস্তি পাইয়ার”। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস গভীর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে অসহায় ও উদ্যমহীন করে তুলতো। পরক্ষণেই তাঁর উচ্চারণে একটা তাৎক্ষণিক আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তা জেগে উঠত আর দ্রুত তিনি তাঁর হতাশাকে আড়াল করতে চাইতেন, “কিন্তু সব পাপের শাস্তিই বা তুমি কেনে পাইতায়?” কথা থেমে যাওয়ার পরও তাঁর ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপত। অসহায়ের মতো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতেন আর তাঁর চেহারায় তখন একটা অকৃত্রিম সরলতা ফুটে উঠতো। আমি লক্ষ করতাম, তাঁর চোখ দুটো ততক্ষণে ভিজে উঠেছে। 

আমি ভাবতাম, সুলেমান আলি নিতান্তই একজন মামুলি ব্যবসায়ি হলেও যুদ্ধ এবং সমুদ্রজীবনের কিছু অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে একটা বিশেষ রেখাপাত করেছে, তারওপর দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব, যার অভিঘাত সে একজন স্বল্প পরিচিত অথবা বয়সের ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও বেশি ব্যবধান সম্পন্ন মানুষের সঙ্গে পুরোপুরি ভাগ করতে চাইতেন না। অথবা তাঁর মধ্যে যে চোখে পড়ার মতো একটা বিশেষ ব্যক্তিত্ব ও ভিন্নতা রয়েছে- হয়তো সেটাও তার কারণ। 

এসব কারণেই মূলত সুলেমান আলিকে আমার ভালো লেগে যায়। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তাঁর বাক-কৌশলে একটা নিজস্ব ধরণ প্রয়োগ করতেন, তাতে সহজেই যে কেউ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেত। কখনো এমন হতো যে, একজন লোক তাঁর সঙ্গে কোনো একটা জরুরী প্রয়োজনে সামান্য সময়ের জন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছেন কিন্তু একঘন্টা পরেও ওই লোকটিকে তাঁর সামনে একইভাবে বসে থাকতে দেখা গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকতো না। অন্যান্য কোম্পানির ব্যবসায়িক প্রতিনিধি ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে পুরোপুরি অ-ব্যবসায়িক সুলভ না হলেও হৃদ্যতাপূর্ণই মনে হতো। আমি নিশ্চিত বলতে পারি যে, তাতে এতোটুকু কৃত্রিমতাও ছিল না। মাঝে মাঝে লোকটিকে খুবই উদাসীন ও উদ্ভ্রান্তের মতো লাগতো। তখন তাঁর দিকে তাকালে মনে হতো, আলঝেইমার অথবা ডিমেনশিয়ার প্রাদুর্ভাব তাঁর চেহারার মধ্যে একটা গভীর বিস্মৃতি অথবা রোমন্থনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতিকৃতিকে মূর্ত করে তুলে, বাস্তবতার প্রেক্ষাপট থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। 

এটা ঠিক যে, স্ত্রী ও সন্তানহীন, বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও জীবনের প্রাক-গোধূলি লগ্ন উপভোগ করা একজন মানুষের পক্ষে বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলার চেয়েও বেশি কঠিন ছিল নিজের নিঃসঙ্গতা ও বেদনা-বোধকে অস্বীকার করা। অথচ সবসময় তিনি একটা স্থুল হাসি-ঠাট্রা ও চটুলতার মধ্য দিয়ে তা-ই করার চেষ্টা করতেন। যাতে করে আমাদের সামনে একজন সুখি ও সামর্থ্যবান মানুষ হিসেবে নিজেকে জাহির করা যায়। কিন্তু তাতে কী হয়? আমার মাথায় ঠিকই তাঁর হাসি-ঠাট্ট্রা ভরা মুখ, হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ, তাঁর বৃদ্ধা মা, বিধবা পরিচারিকা, তাঁর নিঃসঙ্গ বিছানা আর সন্তানদের জন্য খা খা করা একটা বিরান হৃদয়ের চালচিত্র ঠিকই ভেসে উঠত। আমার এরকম কল্পনার ওপর কখনোই তিনি তাঁর স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে চেহারাতে সেই ভদ্রজনোচিত প্রবনতাটি আরোপ করে, নিঃশব্দ হেসে, দ্রুত নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন না। 

এভাবে বেশ কয়েক মাস চলে যায়। আমাদের ব্যবসার অগ্রগতি তেমন একটা উল্যেখযোগ্য রকমের না হলেও, আমার আর সুলেমান আলির মধ্যকার সম্পর্কটা ততদিনে একটা বিশেষ মাত্রা পায়। আমাদের দুজনের মধ্যে একটা মিল ছিল এই যে, আমাদের দুজনের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত একটা পেশার সঙ্গে আমরা যুক্ত হয়েছি। আর এটা নিয়ে আমাদের আক্ষেপেরও শেষ ছিল না। 

এদিকে পরিবেশক নিয়োগ দেওয়ার পরও কোম্পানির লক্ষমাত্রা অনুযায়ি বিক্রয় বৃদ্ধি করতে না পারার জন্য আমার ওপর পেশাগত চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকলো। যদিও লক্ষ অর্জনের জন্য কাল্পনিক সব প্রণোদনার মুলো ঝুলিয়ে আমাদেরকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করা হতো; কিন্তু সেসব মুলো কখনোই আমরা আমাদের ঝুলিতে ভরতে পারতাম না। আর এ সময়গুলো আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠলো। হতাশ হয়ে পড়ছিলাম দিন দিন। পাহাড়ি অঞ্চল সংলগ্ন সমতলের এই ছোট্র মফস্বল শহরে ততদিনে শীতের আক্রমন আর রেলগাড়ির ঝমঝম আর প্রাত্যহিক অনিবার্য হুইসেল আমাকে হতোদ্যম করে ছাড়ল। এরমধ্যেই একদিন ম্লান, কুয়াশাময় ও অনুজ্জ্বল রোদের এক দুপুরে, স্টেশন রোডের একটি রেস্তোরাঁয়, কারুকার্য খচিত কাশ্মীরি হিজাবের কালো একটি নিকাবের ভেতর থেকে, কোনরূপ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই, প্রথমবারের মত আমার সমস্ত হতাশা ও অস্থিরতাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললো একজোড়া চোখ, যেন গভীর গিরিখাদের মধ্যে আটকে পড়া দুটো মেঘখন্ড- ভূ-পৃষ্ঠে ঝরে পড়ার অপেক্ষায়! 

আমি তখন হয়তোবা দুপুরের খাবার শেষ করে, একই টেবিলে বসে সদ্য আহার সমাপ্ত করা কয়েকজন লোকের কাছে তুলসি পাতার চায়ের গুনাগুণ ব্যাখ্যা করছিলাম। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে আমার চোখ চলে যাচ্ছিল পেছনের টেবিলে স্থির ও পলকহীন দুটো মেঘখন্ডের প্রতি। ভেতরের উত্তেজনা বশত যদিওবা দুয়েকটি কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল আমার, তথাপি নিজেকে একজন বিক্রয় কর্মীর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একজন স্বাস্থ্য পরামর্শক হিসেবে উপস্থাপন করতে কোন প্রকার ত্রুটি করছিলাম না। 

“...এটা আপনার মানসিক চাপ দূর করবে”। আমি লোকগুলোর উদ্দেশ্যে বলে যাচ্ছিলাম আর আড়চোখে পেছনের দিকে লক্ষ রাখছিলাম। “...অল্প বয়সে বুড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করবে...”। 

শীঘ্রই আমার টেবিল খালি হয়ে যায়। একটা উপযুক্ত মুহূর্ত বিবেচনা করে, গভীর গিরিখাদে আটকে পড়া মেঘখন্ডের কাছে গিয়ে, হাতের প্যাকেটটি বাড়িয়ে দিই। ইতস্তত না করেই সে প্যাকেটটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগল। আমি তাকিয়ে রইলাম- তাঁর হাতের দিকে; দেখছিলাম- উজ্জ্বল বাদামি রঙের স্বাস্থ্যবান হাতের অগ্রভাগে নিখুঁত ভাস্কর্যের অংশবিশেষের মতো যত্ন করে বসিয়ে দেওয়া সুন্দর স্বর্ণাভ আঙুলগুলো। 

আমি শান্ত সমাহিত কন্ঠে ধীরে ধীরে বলতে লাগলাম, “এটা পান করলে চেহারায় বয়সের ছাপ পরবে না। এটার এন্টি অক্সিডেন্ট...” 

“দাম কত?” বলল সে। 

“একশো টাকা”। আমি দ্রুত জবাব দিই। 

“কম হবে না?” মেঘখন্ড দুটো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়। 

আমি আবেগে বিগলিত হয়ে কোনোরকম ভদ্রতা বা ব্যবসায়িক লজিকের তোয়াক্কা না করেই বলে ফেলি, “আপনি যা দিতে চাইবেন”। 

“না না। তা কি করে হয়, একটা উপযুক্ত দাম বলেন অন্তত”। 

“যেহেতু আপনিও একজন উপযুক্ত কাস্টমার”। আমি কিছুটা হাস্য সহযোগে ‘উপযুক্ত’ শব্দটিতে জোর দিয়ে গুরুত্ব আরোপ করে বলি, “যা বিবেচনা করে দেবেন”। 

“তাহলে দুই প্যাকেট দেন”। ব্যাগ থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, “এটা রাখেন”। 

“একটাতেই হবে”। আমি একটা নোট রেখে আরেকটা ফিরিয়ে দিই। 

“লস হবে না আপনার?” 

“সে তো কিছুটা হবে”। বিজ্ঞের মতো গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন ভাবে বলি, যেন লস হওয়াটাই এখানে একমাত্র উপযুক্ত ব্যাপার। 

“তাহলে কম নিচ্ছেন যে?” 

“প্রথম বার, তাই কম নিচ্ছি”। বলি আমি, “ভাল লাগলে দ্বিতীয় বার যখন নেবেন, তখন পুশিয়ে নেবো”। 

‘পুশিয়ে নেবো’ শব্দ দুটি উচ্চারন করতে গিয়ে আমি ভেতরে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা টের পেলাম এবং সেই সাথে ভবিষ্যতের একটা কাল্পনিক সফলতার মিথ্যে আত্মতুষ্টির অনুভব। 

“তো, তখন আমাকে পাবেন কোথায়?” কিছুটা ধাঁধা মিশ্রিত কৌতুকের সঙ্গে বলল সে। 

তাইতো। সেটাতো ভেবে দেখিনি। মুহূর্তে দুঃসাহসী হয়ে উঠলাম। দ্রুত একটি প্যাকেটের নিচে আমার মোবাইল নাম্বারটি লিখে প্যাকেট দুটো এগিয়ে দিয়ে বললাম “খেয়ে ভাল লাগলে ফোন দেবেন। চা পাতা পৌঁছে দেব”। 

সেদিন আর কোন কাজই করলাম না। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে সোজা স্টেশনে এসে সিগ্রেট ধরিয়ে রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভানুগাছ অভিমুখে চললাম। একটা অতি পরিচিত রেল লাইন। যখন আমি হাড়িয়া টানার জন্য বাগানে যেতাম, এই পথ ধরেই যেতাম। কিন্তু আজ আমি স্থির নই যে কোন দিকে যাবো। আজ আমি শুধু এমন একটা অন্তহীন পথের দৃশ্য কল্পনা করতে পারি, যে পথ ধরে আমার এই স্বল্পকালের মফস্বল জীবনের সকল গ্লানি, হতাশা, ব্যর্থতা ও দুঃস্বপ্ন পেছনে রেখে, শুধু ওই মেঘখন্ড দুটোর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যতদূর চোখ যায়, চলে যেতে পারি! 

রাতে বসকে রিপোর্ট করতে ভুলে গেলাম। একটু পরপর মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল। কে জানে, যদি সে আমার নাম্বারটি সেভ করতে গিয়ে ভুল করে হলেও ছোট্র একটা মিস্কল পাঠিয়ে দেয়! 

একটা নির্ঘুম রাত কেটে গেল। পরদিন সকালে রাতের অনিঃশেষ অস্থিরতা, সেইসাথে পূর্বের সকল অবসন্নতা ও হতাশায় জেরবার হয়ে অন্যান্য দিনের মতোই সুলেমান আলির সামনে নিজেকে খুঁজে পাই। আমার চেহারায় দৃশ্যমান ক্লান্তি ও ভেতরের অস্থিরতাটুকু তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। ফ্লাস্ক থেকে কাপে গরম পানি ঢালতে ঢালতে তিনি বিষণ্ণ মুখে হাসলেন। চেহারার মধ্যে এমন একটা কৃত্রিম নীরবতা আরোপ করলেন যেখানে আমার প্রতি তাঁর বিদ্রূপাত্মক প্রবণতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম, যা আমাকে আরেকটা ক্লান্তিকর দিন শুরু করার পূর্বে পুরোপুরি হতোদ্যম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যদিও ব্যাপারটা ছিল তাঁর ব্যাক্তিত্বের মৌলিকত্বের সঙ্গে কিছুটা সাঙ্ঘর্ষিক, কঠোর ও অভূতপূর্ব। কীভাবে জীবনের বাজে সময়গুলোকে মোকাবিলা করতে হয়, সে সম্পর্কে তিনি প্রায়ই দারুণ সব কৌতুকপূর্ণ কথা বলতেন। তখন একজন মামুলি ব্যবসায়ির খোলস থেকে বেরিয়ে আসতো অন্যরকম একজন সুলেমান আলি। যিনি সময়টাকে ধরতে পারতেন তাঁর উপলব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক পরিপার্শ্ব থেকে। কখনো আভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতেন। একজন সত্যিকার নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন মানুষের মতো তিনি মন্তব্য করতেন। যুদ্ধের স্মৃতিগুলো ঝালাই করে নেয়ার জন্য যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতেন। যুদ্ধের শুরুতে ভারতীয় মিত্র বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে কেন কালক্ষেপণ করেছিল সে জন্য ভারতীয়দের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। ঢাকার দায়িত্ব থেকে টিক্কা খানকে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে যুদ্ধের গতিবিধি সম্পর্কে নিক্সন ও ইয়াহিয়া খানের হতাশাই যে একমাত্র কারণ সেটা জোর দিয়ে বলতেন। এমনকি ফাল্লুজা শহরে আমেরিকান সৈন্যদের দ্বারা ইরাকি নারিদের ধর্ষণের প্রতিশোধের অংশ হিসেবে তিনি ইরাকিদের দ্বারা আমেরিকান নারীদেরকেও ধর্ষণের অনুমোদন করতেন। কখনো কখনো আমি হয়তো কিছু ক্ষেত্রে তাঁর পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের জন্য দ্বিমত পোষন করতাম। বলতাম, “একটা অপরাধ দিয়ে আরেকটা অপরাধকে জাস্টিফাই করা মানবতার সার্বজনীন ধারনার পরিপন্থী”। তখন তিনি তাঁর দীর্ঘ গ্রীবাটিকে আরো উঁচু করে আমার দিকে ঝুকিয়ে দিয়ে বলতেন, “যুদ্ধের ময়দানে যখন শত্রুপক্ষ আপনার নারীকে ধর্ষণ করবে, তখন সুযোগ থাকা স্বত্বেও, শত্রুপক্ষের নারীর ওপর ঘৃণা-পূর্বক জোর না খাটিয়ে ভালবাসা দেখানোটা কাপুরুষতা! আপনার নারীকে অপমানের বদলা আপনাকে নিতেই হয়!” তখন আমি চুপ মেরে যেতাম। আমি তাঁর বক্তব্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে একটা যৌক্তিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতাম যাতে করে একজন পরস্পর বিরোধী ও দ্বিধা বিভক্ত ধারনায় আস্থাশীল মানুষ সম্পর্কে যথাযথ সারাংশে পৌছা যায়। আমি এটাও লক্ষ করতাম, এই কথাগুলো বলার পরই সুলেমান আলি কেমন বিমর্ষ হয়ে যেতেন। চোখ বন্ধ করে যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতির অংশ বিশেষ স্মরন করতে চেষ্টা করতেন। একধরনের তাৎক্ষণিক বিষণ্ণতা ও হতাশা-বোধ তাঁকে গ্রাস করতো, যা থেকে তিনি মুক্তি পেতে চাইতেন। 

সেদিন তখনো সকালের কাজ শুরু হয়নি। আমি তাঁর সামনে চুপচাপ বসে ছিলাম, আর তিনি তখন সামনের দিকে ঝুঁকে টেবিলের ওপর দুই হাতের কনুইয়ে ভর রেখে চোখ বন্ধ করে বিরক্তি ভরে মাথার চুলগুলো টানছিলেন। আর কিছুক্ষণ পরেই সকালের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়ে যাবে। হঠাৎ একজন লোক দরজা ঠেলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে মাথা নুইয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করlলেন। মাথা নুইয়ে ঢোকার কারণে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, লোকটার মাথাটা যেন দক্ষিণ দিকে ষাট ডিগ্রি অবস্থানে কাৎ হয়েছিল। বাম হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে আমাদেরই কোম্পানির তুলসি পাতার চায়ের দুটো প্যাকেট দেখতে পাচ্ছিলাম। ব্যাগ শুদ্ধ ডান হাতটা বুকের কাছে রেখে বাম হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখার প্রানান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন তিনি। বোঝাই যাচ্ছিল লোকটার ডান হাতে কোন শক্তি নেই। বয়সের তুলনায় শরীরে বার্ধক্যের আক্রমন একটু বেশিই মনে হচ্ছিল। প্রথম দিকে কথা বলতে গিয়ে কাশির গমকে কিছুটা খেই হারিয়ে ফেললেও দ্রুত নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে বললেন, “সুলেমান কিতা তুলসি পাতার ডিলার আনছো নি বা? 

“জ্বী অয় ভাইছাব, তুলসি পাতার চায়ের ডিলার। তিন চার মাস অইব”। সুলেমান আলি মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন। 

লোকটা তাঁর হাতের ব্যাগে চা পাতার প্যাকেট দুটো দেখিয়ে বললেন, “এগুলো আমি ফেরত দিতে আইছিবা সুলেমান। আমার ফুরিটা কালকে স্টেশন রোড থেকে কিনছিল্। তোমার কোনো কোম্পানিম্যানের কাছ থেকে’। 

মুহূর্তে গতকালের তরতাজা স্মৃতি, স্টেশন রোডের সেই রেস্তোরাঁ, গভীর গিরিখাদে আটকে পড়া মেঘখন্ড দুটো- আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল; সেইসাথে প্যাকেটের নিচে মোবাইল নাম্বার লিখে দেওয়ার কারণে একটা অতি প্রাসঙ্গিক মফস্বলীয় আতঙ্ক। 

আমি বললাম, কেন? কি হয়েছে? 

তিনি সুলেমান আলির দিকে তাকিয়ে খুবই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “তুলসি গাছ বিধর্মী কালচার’র অংশ। তুমি কি তা ভুলে গেছো নি বা সুলেমান?’ 

লোকটির কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। সুলেমান আলি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। যা আমার কল্পনাতেও ছিলনা লোকটা তাই বলছেন। আমি দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে প্রতিবাদ করলাম। “মাফ করবেন। গাছ মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য গাছ সৃষ্টি করেন। গাছ কারো কালচারের ব্যক্তিগত অংশ নয়, জনাব”। 

লোকটা এবার কাঁপতে লাগল, “আমাকে কালচার শেখাবেন না দয়া করে”। কাশির গমক আবারো বৃদ্ধি পেল। কাশতে কাশতে বললেন, “আমরার ঈমান নষ্ট করতে ছাইরায় নি তুমরা?” 

সুলেমান আলি যেভাবে ছিলেন সেভাবেই চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তার দৃষ্টি যেন সুদূরের কোন লক্ষের দিকে নিবদ্ধ, পুরো বিষয়টির প্রতি কোন মনোযোগ নেই, ধুসর চোখ দুটো পাথরের টুকরোর মতো স্থির হয়ে আছে। আমি লোকটির শব্দচয়ন দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। মানুষ নিজের মহত্বকে অজ্ঞানতা বশত অতি-সরলীকরণের মাধ্যমে, একটা তুচ্ছ বিভাজন রেখার মধ্যে সচেতন ভাবে ঠেলে দিয়ে, কত অনায়াসে সুখি হতে চায়! লোকটার সুখি হতে চাওয়ার এই পদ্ধতিটি আমার কাছে নোংরা ও ন্যাক্কারজনক মনে হলো। তাই বলেই ফেললাম, “আপনি ধার্মিক হয়ে অধার্মিকের মতো কথা বলছেন”। 

লোকটা চা পাতার ব্যাগটি বাম হাত দিয়ে সজোরে আমার ওপর ছুঁড়ে মারলেন। কোনো জবাব দিলেন না। আর কোন শব্দও ব্যয় করলেন না। ক্রোধে, উত্তেজনায় দ্রুত ঘুরে বের হতে গিয়ে ডান পায়ে ভর হারিয়ে মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়লেন, এমনভাবে, যেন একটা গাছের গুড়ি, মাত্রই করাত চালানো শেষ হয়েছে আর লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। আমি সাহায্য করতে ছুটে এলে তিনি ইশারায় আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, একজন চলৎশক্তিহীন পাক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ তাঁর বিশ্বাসের আধ্যাত্মিক শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে একা উঠে দাঁড়ানোর জন্য লড়াই করছে। প্যাকেট দুটো হাতে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লোকটার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। যেভাবে ঢুকেছিলেন ঠিক সেভাবেই তিনি খুড়িয়ে খুড়িয়ে, ধীরে ধীরে, মাথাটা নুইয়ে বেরিয়ে গেলেন। 

লোকটি চলে যাওয়ার পর আমরা দীর্ঘ সময় নিরবে মুখোমুখি বসে ছিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা এতটাই হতবাক হয়ে পড়েছিলাম যে, এ বিষয়ে কোনো কথাই আর বলতে চাইলাম না। আমি সুলেমান আলির কাছ থেকে একটি সঙ্গত প্রতিক্রিয়া দাবি করেছিলাম হয়তো মনে মনে; এখন ঠিক মনে নেই। হঠাৎ সুলেমান আলি নিরবতা ভাঙলেন। যেন দূর সমুদ্রে রাতের অন্ধকারে প্রবল ঝড়ের মুখে ডুবে যাওয়া কোনো জাহাজের ঘুমন্ত নাবিকের গোঙানি। যে কিনা এখনো ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। চারিদিকে থকথকে নিকষ কালো মৃত্যুহীম অন্ধকার তাকে ঘিরে ধরেছে। এর মধ্যে খুবই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে তিনি জানতে চাইলেন আমি তার কানের ফুটোটির ব্যাপারে এখনো আগের মতো কৌতূহলী কিনা? আমি ঈষৎ মাথা নাড়তেই তিনি বললেন, এটা শুধু একটা গুলির চিহ্নই নয়, এটা একটা অবর্ণনীয় বেদনাদায়ক ঘটনার স্মৃতি। যার দুঃসহ যন্ত্রনা তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে এতোটা বছর। আমার মনে হলো, তাঁর চোখের মনি দুটো আচমকা একরাশ ধুসর মেঘমালার আড়ালে হারিয়ে গেছে। এবং তিনি আরও জানালেন, আমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে তিনি সেই দুর্বিষহ যন্ত্রনা থেকে শেষবারের মতো মুক্তি পাওয়ার একটা উপায় খুঁজে বের করতে চেয়েছেন। তারপর তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আত্মহত্যা ছাড়া অতীত ভুলে যাওয়ার আর কোনো উপায় আমার জানা আছে কিনা? আমি বুঝতে পারলাম, তাঁর ব্যক্তিত্বের সবগুলো কৃত্রিম শৃঙ্খল আজ একে একে খুলে গিয়েছে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা সংঘটনের মধ্য দিয়ে; কিছু বিরল ক্ষেত্রে, যেমনটি হয়, স্মৃতি হারিয়ে ফেলা মানুষের মস্তিষ্কে দীর্ঘদিন পরে কোনো আঘাতজনিত কারণে স্মৃতি ফিরে পাওয়ার মতো, হয়তোবা। কিন্তু আমি নিজের ব্যাপারে যদি সৎ থাকতে চাই, তাহলে আমাকে এটা স্বীকার করতেই হয় যে, সুলেমান আলির কানের ফুটোটির ব্যাপারে এতোটুকু উৎসাহ আমার ভেতরে তখন আর অবশিষ্ট ছিলোনা। 

এই ঘটনার পরই চাকরি চালিয়ে যাওয়ার মতো সব ধরণের মানসিক শক্তি আমি হারিয়ে ফেলি। ব্যবসায়ীক দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো এটা আমার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটা জ্বালাময়ী ও দারুণ প্রণোদনামূলক অভিজ্ঞতা হতে পারত। যেহেতু এখনো গ্রামে আমার মায়ের নামে ছোট্র একটা মানি অর্ডার আমাকে পাঠাতে হয়, যা থেকে আমার মা তাঁর সৌর বিদ্যুৎ বিলের মাসিক বকেয়া পরিশোধ করেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিজেকে আমি বোঝাতে ব্যর্থ হই যে চাকরিটা আমার জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। 

পরদিন সকালে তখনো ঘুমিয়ে। আমার সহকারি ছোকরাটি এসে জানালো যে, রাতে বাড়ি ফেরার পথে রেল লাইনে কাটা পড়ে সুলেমান আলি মারা গেছেন। 

সেদিনই রাতের ট্রেনে আমি বাড়িমুখো হলাম। অন্ধকারে জানালার পাশে বসে পেছনে তাকিয়ে দেখছিলাম, কুলাউড়া শহরটি যত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে, ঠিক তত দ্রুতই আমার স্মৃতির নিকটবর্তী হচ্ছে দুইজোড়া চোখ। একজোড়া গভীর গিরিখাদে আটকে পড়া মেঘখন্ড। আদৌ যার উদ্ধারের কিংবা মুক্তির কোনো উপায় বা সম্ভাবনা আছে কিনা আমার জানা নেই। আর অন্যজোড়া সুলেমান আলির ফ্যাকাশে, আর্দ্র ও করুণ চোখ। একমাত্র আমিই জানি, জীবন ইতোমধ্যে যাকে মুক্তি দিয়ে প্রকৃতির বিধান মতে সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। 



মে, ২০১৭ ইংরেজি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন