সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

আনসারউদ্দিনের গল্প : পাকা দেখা

শ্বশুরমশায় আমাকে বলেছিলেন, একটা ভালমতো মেয়ে দেখতে। দেখতে শুনতে ভাল, লম্বা, ফর্সা, একটু লেখাপড়া জানা। বলা বাহুল্য এরকম মেয়েকে পাত্রপক্ষ যাঞ্চা করবে। এবং এটাই স্বাভাবিক। শ্বশুরমশাইয়ের আমিই বড় জামাই। তিনিই আমার উপর এহেন গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করলেন। অন্য কোন কাজের কথা বললে ঘাড় মাথা এক করে সম্মতি জানাতে আপত্তি ছিল না।
কিন্তু পাত্রী নির্বাচন করার মতো গুরুদায়িত্বের যোগ্যতা আমার অদপেই নেই। থাকলে শ্বশুরমশাইয়ের ঐ মেয়েকে আমি কোনোদিন বিয়ে করতাম না। আমি যে মেয়ে বিয়ে করেছি তার চেয়ে অনেক ভাল ভাল মেয়ে বাজারে সব্জি বিক্রি করে। মানুষের অর্থসম্পদ, গাড়ি-বাড়ি যাই থাক ভাল বউ না থাকলে চাপা অশান্তি থেকেই যায়। এই অশান্তি যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। অথচ বিবাহবাসরে আমাকে প্রথামাফিক শপথ করতে হয়েছে বিবিকে পর্দাপুশিদায় রাখব, তাকে অন্নবস্ত্র যোগান দেব, তার উপর কোন অন্যায় অত্যাচার করব না। আমি সেই শপথ এখনো ভঙ্গ করিনি। আমার স্ত্রীকে এসব মনকষ্টের কথা বুঝতেও দিইনি। অন্য ভায়রারা আমার থেকেও সৌভাগ্যবান, কারণ তারা আমার চেয়েও রূপবতী 

বউ পেয়েছে। এসব দেখেশুনে আমি শ্বশুরবাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। ওদিকে মুখ করলে সত্যি সত্যি এখনো কান্না আসে। এতো আর খাটালের গরু নয়, যে ইচ্ছা মতো পাল্টে নেব। শ্বশুরমশায়ের বাস্তববোধ বুদ্ধির অভাব আছে বলে মনে হয়। তা নইলে ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী নির্বাচনের দায় আমার উপর দেবে কেন? তাঁর বোঝা উচিত যে জামাই তাঁর বড় মেয়েকে প্রথম দর্শনেই পছন্দ করে বিয়ে করলে তার উপর আর যাইহোকক এমন গুরুদায়িত্ব দেওয়া যায় না। সত্যি কথা বলতে কি, এসব দেখাদেখির ব্যাপারে আমার ভীষণ অনীহা আছে। কেবল একবার, মাত্র একবারই গিয়েছিলাম ভাতগাছি। আমাদের বাড়ি থেকে সাইকেলে ঘণ্টা তিনেকের পথ। বাস যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা নেই। বর্ষাকাল তো বটেই, তারপরও পাক্কা দু'মাস হাঁটু অবধি ফ্যাটফেটে আঠালো কাদা। আমার তখন সবে বিয়ে হয়েছে। কাদা শুকোতেই আমার বন্ধু কামাল এসে সঙ্গে যাবার বায়না ধরল। কামাল মাধ্যমিক পাশ। পরীক্ষার রেজাল্টের যা দশা তাতে কোন হায়ারসেকেন্ডারী স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ হয়নি। স্বনিযুক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ হাজার টাকার লোন নিয়ে গাঁয়ে রাসায়নিক সারের দোকান দিয়েছে। আধুনিক চাষবাসে এসব সার ছাড়া আর গতি নেই। ঘোড়াগাড়িতে বস্তা বস্তা সার আসে বাজার থেকে। চিবিয়ে চিবিয়ে উঁচু ক্লাসের পড়া মুখস্থ করার চেয়ে সারের ব্যবসায় নেমে কামাল বরং কাজের কাজটিই করেছে। লোনের টাকা শোধ করে ব্যবসার পুঁজি বাড়িয়ে চার কামরা ইটের বাড়ি তৈরি করা কম হিম্মতের কথা না। যার এক কামরায় বালি সিমেন্টের প্লাস্টার তো বটেই, হলুদ, গোলাপী রং জৌলুস ছড়িয়ে পড়ছে। বিয়ে করে কামালউদ্দিন যে রঙচঙে ঘরে নতুন বউকে এনে তুলবে সেটা পাগলেও আন্দাজ করতে পারে। ওকে বললাম, এত গ্রাম থাকতে ভাতগাছিতে কেন? ও বলল, ভাতগাছিতে ভাল ভাল মেয়ে আছে। ওখানকার পথঘাট তেমন ভাল নয় বলে আমাদের এ দিগরের মানুষ ওসব খবর রাখে না। তুই যদি ওখানে বিয়ে করতিস তাহলে দুজনে কেমন একসঙ্গে যাওয়া হত। 

ভাল মেয়ের খবর শুনে মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। কি যে মতিচ্ছন্ন ধরেছিল আমার! ছ'মাস আগে এমন সুসংবাদ দিয়ে কেউ যদি আমার দু'কান মলে দিত তাতে আমার রাগ অভিমান হত না। আসলে ভাল খবর তো ভালয় ভালয় পাওয়া যায় না। যখন পাওয়া যায় তখন আর কিছুই করার থাকে না। কামালকে বললাম, তুই যা, পছন্দ অপছন্দ যখন তোর ব্যাপার সেখানে আমি গিয়ে কী করব? 

যতই আমার ব্যাপার হোক বিয়ে সাদী কখনো একমতে হয় না জানিস। 

কামালের এই কথাটাই আমার বুকের খাঁচা নড়িয়ে দিল। তেঘরিতে মেয়ে দেখতে গিয়ে এই বিষম ভুলটাই করেছিলাম। জষ্টি মাসের ভ্যাপসা গরমে মেয়ের হাতে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবৎ খেয়ে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম। সেই ভুলের মাশুল আমাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে সন্দেহ নেই। এ আমার অদৃষ্ট। অসহায় মানুষের নিরুপায় সান্ত্বনার ভাষাটাকে সার ভেবেছি। যাহোক কামালের সঙ্গে ভাতগাছিতে রওনা দিলাম। অঘ্যান মাস। মিঠে শীত। পথের কাদা শুকিয়েছে বটে কিন্তু কতবার যে সাইকেল থেকে ওঠানামা করতে হল তা আর বলবার নয়। অসমান রাস্তা। ঝাঁকানিতে সাইকেলের নাটবল্ট ছিঁড়ে ছটকে বেরিয়ে পড়তে চায়। পেটের চৌদ্দনাড়ি সেই ঝাঁকানিতে তালগোল পাকিয়ে যায়। একটা মেয়ে দেখতে এমনই শরীরী কসরত। কামাল বলল, এজন্যই ভাতগাছিতে ভাল মেয়ে এখনো রয়ে গেছে। 

জুলপি থেকে গড়িয়ে আসা ঘাম রুমালে মুছে নিয়ে আবার সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখলাম। আমার সঙ্গগুণে ও যদি একটা ভাল বউ পেয়ে যায় তাতে কোন আহা পস্তানি নেই। সকালে পরিপাটি বেশভুষায় বেরিয়ে দুপুরে ভাতগাছিতে পৌঁছে আমাদের যা দশা তাতে মানুষ কেবল গোরুর দালাল-ই ভাবতে পারে। মাথার চুল উস্‌কো খুস্‌কো, জামা কাপড়ে রাজ্যের ধুলো। সাইকেলের গিয়ারে পাজামার পা আটকে এমন অবস্থা, যেন বাঘে ভাল্লুকে খুব্লে খেয়েছে। আমরা দুই অবলা সেই অবস্থায় মেয়ের বাড়িতে উঠলাম। আমরা ভাবড়িদহ থেকে আসছি শুনে মেয়ের বাবার আলজিভ শুকিয়ে গেল। আমাকে ফিস্‌ ফিস্‌ করে বললে, ছেলে দোজবরে নাকি? 

আমি বললাম, তা হবে কেন? রাতিমতো ম্যাট্রিক পাস। বাড়িতে সারের ব্যবসা আছে। চার কামরা পাকা ঘর আছে, খেত আমার আছে। মেয়ে হল আপনার, চোখ বন্ধ কার বানের পানিতে ভাসিয়ে দিতে বলছিনে। আমরা ভাবড়িদহ থেকে এসে কোন অন্যায় করেছি? 

আমি সাধারণত মানুষকে এমন কাট্‌ কাট্‌ বলতে অভ্যস্ত নই। সেদিন কোন্‌ খোদার ফেরেস্তা আমার জবানে ভর করেছিল জানি নে, মেয়ের বাবা আমার দু'হাত জড়িয়ে ধরে বললে, কিছু মনে করো না বাপু, আমাদের ভাতগাছি হল গুবোধ গাঁ, সচরাচর মেয়ে দেখতে এতদূর তো আসে না কেউ। 

আমরা জেনে শুনে এসেছি অতদূর থেকে। মেয়ের বিয়ে দিতে যদি চান তাহলে হাজার কষ্ট হলেও আমাদের ভাবড়িদহের বউ করে নিয়ে যাব। 

ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা শেষ করে আমি কামালউদ্দিনের পাশে বসলাম। আমাদের কথাবার্তা বোধ হয় ওর কানে গিয়েছে কিছুটা। কেমন ঝিম মেরে বসে আছে ও। ওকে তড়পে বললাম, ভিন গাঁয়ে মেয়ে দেখতে এসে অমন ভ্যাবলার মত বসে থাকলে হবে? একট ইজি হ। 

কামাল বার কতক গলা ঝাড়া দিল। মাথা ঝাঁকাল। এটা হতে পারে ওর ইজি হবার পদ্ধতি। তারপর ঘনঘন জানলায় চোখ রেখে ফালুক ফুলুক বাইরে তাকাতে লাগল। বললাম, এটা কিন্তু বেয়াদপি। কামাল তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে বসল। 

আমাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা বেশ জমে উঠল। পাঁচ রকমের মিষ্টি, দই, চা, বিস্কুট তো আছেই। আমাদের চোখের সামনে মুরগির গলায় পোঁচ চালিয়ে দিলে মেয়ের বাবা। যেহেতু শীতের কোঁচকানো বেলা, সে কারণে ফেরার তাড়া। অতসব খাদ্য খোরাকির সৎকার করার সময় কই? ভাতগাছির লোক এত যে লোক কুটমের মান্যতা দেয় আমার তা জানা ছিল না। খাওয়া দাওয়া শেষে যখন মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হল তখন একদম বোকা বনে গেলাম। হক কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয় এত ভাল মেয়ে আগে কখনো দেখিনি। কামালেরও বোধ করি একই অবস্থা। সে মেয়েটার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। এদিকে যে বেলা যায় সে বোধ বুঝি হারিয়ে ফেলেছে। মামুলি দু-চারটে কথাবার্তার পর যে কাণ্ড কামাল করল তাতে ওকে ভাতগাছি রেখে আমার বাড়ি ফেরাই ভাল ছিল। মেয়ে পছন্দ হয়েছে ভাল কথা, তাই বলে সেই মেয়ের হাতে পরপর পাঁচ গিলাস পানি চেয়ে খেতে হবে! এই শীতকালে! 

শেষমেষ কামালের বিয়েটা ওখানে হয়নি। না হওয়ার জন্য কামাল আমার উপর কুপিত হয়েছিল। মেয়ে নাকি কামাল নয়, পাত্র হিসাবে আমাকেই পছন্দ করেছিল। কিন্তু কী করা যাবে, মেয়েটা তো জানে না আমি বিবাহিত। এ ঘটনার পর থেকে আমি আর কোথাও কারো জন্য মেয়ে দেখতে যাইনি। আমার স্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে যে গৃহযুদ্ধ হয়েছে তা আর পাঁচকান করতে চাইনে। কিন্তু সমস্যা হল, আমার শ্বশুর যে এখন ধরেছে রুস্তমের জন্য মেয়ে দেখার। আমার দুটো শালা। রুস্তম বড়। বড় হলেও বয়েসে আমার থেকে অনেক ছোট। এটা ঠিক যে শালাজি বউ হলে মনের সুখে দু'চারটে খোশ গল্প করা যায়। একটু রং তামাশা হাসি মসকরাও। আমার নসীবে এসব আছে বলে মনে হয় না। শালার বিয়ের পর ঘন ঘন তেঘরি এড়িয়ে যাওয়া ভাল। বাড়ির লোকের বউ পছন্দ না হলে যে অশান্তি সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেবার ক্ষমতা আমার নেই। পরিষ্কার শ্বশুরমশায়কে বললাম, রুস্তমই দেখাশুনো করুক, ওর তো বুদ্ধি বয়স যথেষ্ট হয়েছে। 

তাহলে আর তুমি আছ কী জন্য? শ্বশুরমশায় একটু মনাক্ষুন্ন হলেন। 

আমি ছাড়া আপনার আরও দুটো জামাই আছে, তাদেরকে বলুন। 

দ্যাখো বাবা, তুমি হলে বড় জামাই, তুমার পছন্দই সবার পছন্দ। 

দায় এড়ানোর জন্য বললাম। এদিক ওদিক যা একটু ঘোরাঘুরি করেছি তাতে তেমন মেয়ে তো চোখে পড়ছে না। 

তার মানে ভাল মেয়ে নির্বাচন তুমিই করতে পারবে। 

শ্বশুরমশায়ের কথার ফাঁদাল কেটে কীভাবে বেরিয়ে আসব তা আমার বোধের বাইরে। আমার স্ত্রীও ঘ্যানর ঘ্যানর করতে লাগল, কুন তেপান্ত ভাতগাছিতে বন্ধুর জন্য মেয়ে দেখতে যেতি পার, আর আমার ভায়ের বেলায় দু'চোখ অন্ধ হয়ে যায়। 

আমি বলতে পারতাম মেয়ে দেখতে যাবার কত হ্যাপা তা তো তুমি জানো। বললাম না, কারণ এখন আমার চেহারার তেমন শ্রী সৌষ্ঠব নেই। বয়স বাড়লে যা হয়। কেমন যেন চোয়াড়ে ভাব। মাথার চুল যেভাবে পাকতে শুরু করেছে বোশেখ মাসের বোরোধান ওভাবে পাকে না। বললাম, কারো জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়া এখন সেকেলে ব্যাপার। আজকাল বেশিরভাগ বিয়ে-থা ভাব- ভালোবাসা করেই হয়। 

ওসব যারা করে তারা করে। আমাদের বংশে ওসব নেই। 

নেই, হতে আর কতক্ষণ। 

অ্যাঁ , তুমি আমার ভাই বাবাদের এতটা নীচ ভাবছ। আমাদের কোন বংশ মর্যাদা নেই? 

আমার স্ত্রী যেভাবে খেঁকিয়ে উঠল তাতে আমাকে দমে যেতে হল। আমি জানি ব্যাধের জাল কেটে যদিবা বেরিয়ে আসা যায়, মেয়ে মানুষের কথার প্যাঁচ কাটানো আরও কঠিন। যার জন্য রুস্তমের বিয়ের ব্যাপারে আর কোন উচ্চবাচ্য করিনি। হঠাৎ একদিন শুনলাম যে রুস্তমের বিয়ে হচ্ছে। এ দুনিয়ায় কারো জন্য যে কিছু আটকে থাকে না, এর থেকে অকাট্য প্রমাণ আর কী আছে। খবরটা শুনেই একটু দমে গেলাম। আমি যা পারিনি আমার ছোট ভায়রা সেটা পেরেছে। ছোট ভায়রার বাড়ি হোসেনপুর। বিয়ে হবে তারই আশেপাশে ফাতাইনগর। মেয়ে কেমন বা অবস্থা ব্যবস্থা কেমন এসব ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই। তবু দুশ্চিন্তা অন্যখানে। শালার বিয়ে। আমাদের সমাজে শালাজি বউকে মাথা থেকে পা অব্দি গহনায় সাজাবে ছেলের বোনাই। বড়-নন্দাই এর কাছ থেকে শালাজি বউ বড় গহনা পেতে চায়। আমার মতো আলুর ব্যাপারী এত বড় ঝক্কি কি করে সামাল দেয়। কপালের টায়রা, নাকের নথ কিংবা কানের দুল, কোনটাই দেড়হাজারের নীচে নামবে না। আমার ঝিমানো ভাব দেখে স্ত্রী বললে, এজন্যই তুমি ভাব ভালবাসার বিয়ের কথা বলেছিলেন। 

ভালবাসার বিয়েরকথা আমি ঠিক এই অর্থে বলিনি। নানান কথায় চিন্তায় ভাবনায় মনে হল, আমি দু'দিক থেকেই ভীষণভাবে ঠকে যাচ্ছি। বড়জামাই হিসেবে শ্বশুরমশাইয়ের অপেক্ষাকৃত কম সুন্দর মেয়েকে যেমন বিয়ে করেছি অন্যদিকে বড়জামাই হিসেবে বেশিদামের গহনার ভার আমাকে বইতে হবে। এসব কথা ভাবতে গেলেই দু'হাতে গাল মুখ চড়াতে ইচ্ছে করে। বড় হওয়ার কত জ্বালা তা একমাত্র আল্লামালেক তিনিই জানেন। গতকাল আমার শ্বশুরমশাই লোক পাঠিয়ে খবর করেছেন আগামী শুভ শুক্রবারে পাকা দেখা এবং পাকা কথা হবে ফাতাইনগরের মাটিতে, আমি যেন অবশ্য অবশ্যই যাই। 

এই পাকা দেখা এবং পাকা কথা হওয়ার ব্যাপারটা আমি বুঝি। ঐদিন বরপক্ষের নিকট আত্মীয়রা কনে বাড়িতে গিয়ে বরযাত্রীর সংখ্যা, বিয়ের দিন ধার্য থেকে শুরু করে দেনা-পাওনার ব্যাপার নিয়ে নাড়ি কাটাকাটির কথা তুলবে। আমার শ্বশুরমশাইয়ের মুখ থেকে ভাল পাত্রীর কথা যেভাবে শুনেছি সেভাবে দেনাপাওনার কথা শুনিনি। তাছাড়া উনি নামাজি মানুষ। এসব নোংরামির মধ্যে থাকবেন না বলেই বিশ্বাস। ধর্মীয় জলসায় গিয়ে শুনেছি পণ নেওয়া হারাম। একজন শ্রোতা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আচ্ছা জনাব, মেয়ের বাবা খোশ করে যদি কিছু দিতে চায় ? 

আলেমসাহেব কাট কাট জবাবে বলেছিলেন, মেয়ের বাবা খোশ করে যদি শুয়োর দিতে চায়, নেবেন? 

মুখের বাণী আর হাদিস কোরাণের পাতা দিয়ে কতকাল সমাজ-সংসার শাসন করা যায়। অনেকে বলেন আরে ভাই, দ্বীনের নবী হজরত মহম্মদও মেয়ের বিয়ের সময় যাঁতা দিয়েছিলেন। ইসলামের মধ্যে তিনি নিজেই পণপ্রথা চালু করেছেন। তখনকার যাঁতা এখনকার টিভি, মোটর সাইকেল, কি, ঠিক কী না? 

মাওলানা মৌলভীরা প্রকাশ্যে যতই পণপ্রথার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিক না কেন দিনের পর দিন পণের অঙ্ক বেড়েই চলেছে। একটা ছেলে শুধু তেল কাজলে মানুষ হয় না। হাজার চল্লিশ হ্যাপা আছে। দাবা হাঁপানি সর্দি কাশি জ্বর-জ্বালা এসব সামাল দিতে দিতে বাপ মায়ের চোখের নিদ টুটে গেছে কত রাত্তির সে হিসেব রাখা দরকার। আমার শ্বশুরের প্রতি শ্রদ্ধা এখানেই যে তিনি অন্তত ছেলের বিয়েতে পণ নেবেন না। আমরা কয় ভায়রা তাঁর কাছ থেকে এক ফুটো পয়সা দাবি করিনি। শশুরমশাইয়ের কথা মোতাবেক ফাতাইনগরে আমাকে যেতেই হবে। আমার স্ত্রী একদিন আগে জামা কাপড় কেচে দিয়েছে। নাওয়ার সময় কান চোয়ালের ময়লাগুলো অনেক করে ঘষে ঘষে তুলে দিয়েছে। না হলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলতেই পারে মেয়ে জামাইয়ের খিদমত করে না। আর আমাকে প্রথমে হাজিরা দিতে হবে ওখানেই। অন্যান্য লোককুটুমও জড়ো হবে। তারপর একসঙ্গে ফাতাইনগর। 

পাঁচ গাঁ থেকে লোককুটুক জমায়েত হতে কিছুটা সময় গেল। আমি তো বেরিয়েছি সাত সকালে। পান্তাভাতের থালা নিয়ে বসতে গিয়ে মুখঝাড়া খেতে হল। যাচ্ছ তো নতুন কটুমবাড়ি। সেখানে এত এত ভালমন্দ খাদ্য-খোরাকির সদগতি করবে কে? 

যার ফলে রাজ্যের খিদে নিয়ে ফাতাইনগরের দিকে সাইকেলের প্যাডেল ঠেলা। আমি অন্যদের উদ্দেশ্যে বললাম, তাড়াতাড়ি করে চল সব। ফাতাইনগরের মসজিদে জুম্মাবারের নামাজে সামিল হতে হবে, নইলে খোদাতালার কাছে জব্বর গোনাগার (পাপী) হয়ে যাবে। 

আমার মেজো ভায়রা বলল, তুমি আবার এত নামাজি মানুষ হলে কবে থেকে? মুখে দাড়িও নেই, কপালে নামাজপড়া ঘাঁটাও নেই। 

খিদের চোটে পেটের নাড়ি পুড়ে যাবার ব্যাপারটা চাপা দেবার জন্য ভায়রার কথার কোন জবাব দিলাম না। পিছনে তাকিয়ে দেখি ধোপদুরস্ত পোশাকে সাইকেলের মিছিল। একটানা ক্রিং ক্রিং আওয়াজের ঝড়। সামান্য একটা বিয়ের পাকা কথার ব্যাপারে এত লোক! আমি সাইকেল থেকে নেমে পড়ি। গোনাগুনতির হিসাবে সাতাশ জন। আমার মেজোভায়রা বললে, নামলে কেন? 

বললাম, দু'চারটে লোক গেলেই তো যথেষ্ট হত। মানুষ যেভাবে ফাতাইনগরের দিকে ছুটছে তাতে তো মনে হচ্ছে দেশে গায়ে আগুন লেগেছে। 

একথা যদি বল, তাহলে কোন চারজন মানুষ যাবে তুমিই ঠিক করে দাও ভায়া। মেজোভায়রার কথার মধ্যে পিছনে থেকে উড়ে আসা সাইকেলগুলো ব্রেক কষে দাঁড়াল। 

ছোট ভায়রা বলল, শুভ কাজে পাক বাধানো ভাল নয়। মেয়ের বাবা বুঝবে মেয়ের বড়গোষ্ঠীতে বিয়ে হচ্ছে। আত্মীয় স্বজন ছাড়া বিয়ে হয় ? 

বললাম, এতো বিয়ে নয়, পাকা দেখা, পাকা কথার অনুষ্ঠান। 

আমার মাথা ঘুরতে লাগল। এ গাঁ-সে গাঁ একিয়ে বেঁকিয়ে চলেছে সাইকেলের মিছিল। ফাতাইনগরে পৌঁছোতে বিশ মিনিটের পথ বাকী। যেতে হবে ধান্যপাড়ার মধ্যে দিয়ে। সামনে চটকাতলায় কিছু মানুষের জটলা। গাছের ডালে মাইকের চোঙ। আমাদের দেখে দু'তিনটে যুবক তেড়ে ফুড়ে ছুটে এল। কমরেড, লালসেলাম। এত দেরি হবে খবর পাঠাবেন তো? আমরা মিটিং ভেস্তে দেবারই পরিকল্পনা করছিলাম। যা হোকক কমরেড বাঁচালেন। উঃ শেষমেষ ভূবনদার কাছে মান রক্ষা হল। 

বললাম ভুবনদা কে? 

অ্যাঁ! ভুবনদাকে চেনেন না? উনিই তো এবার বিধানসভায় দাঁড়িয়েছেন। বলতে বলতে মাইকে স্লোগান গর্জে উঠল--কমরেড ভবনদাকে ভোট দিন। ভুবনদা জিতছে, জিতবে। একটু পরেই শান্তস্বরে ঘোষণা হল, যে সমস্ত কমরেড এইমাত্র এসে পৌঁছোলেন তারা চটকাগাছের গায়ে সাইকেল হেলিয়ে আপন আপন জায়গায় বসে যান। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের প্রার্থী কমরেড ভুবনদার মহামূল্যবান বক্তব্য শুনবেন। 

আমি ককিয়ে উঠলাম। বললাম, আমরা মিটিং-এর লোক নই। ফাতাইনগরে বিয়ের ব্যাপারে যাচ্ছি কমরেড। 

সেটা বলবেন তো? নেতা গোছের লোকটা ঝাঁকিয়ে উঠল। 

কখন বলব? বলতে সময় দিয়েছেন? তার আগেই তো আমাদের লোকের বুকে ব্যাজ সেঁটে দিলেন। 

আমার মেজাজ দেখে চুপসে গেল লোকটা। বললে, এসেছেন যখন বক্তব্যটা শুনে যান। যাকেই হোক ভোট তো দেবেন। 

বললাম, আমাদের একদম সময় নেই। তাছাড়া আজ শুক্রবার, জুম্মার নামাজ পড়ব ফাতাইনগরে। 

সাইকেল নিয়ে পথে নামতেই আমাদের বাকি লোকজন সভাস্থল থেকে উঠে দাঁড়াল। তাদের সাইকেল চটকা গাছের গায়ে হেলান। দেখে শুনে মাথার চাঁদি তেতে উঠল। কাকে কী বলব? কেউ মামাশ্বশুর, খুড়শ্বশুর, শালা, ভায়রাভাই। 

যত্তোসব উজবুকের দল। পার্টির লোকেরা কমরেড বলতেই চটকাতলায় বসে গেল। এতবড় একটা দায়িত্বের কাজ মাথা থেকে ফোঁৎ করে উবে গেল! 

ধান্যপাড়া পেরিয়ে যখন ফাতাইনগরে পোঁছোলাম তখন মসজিদে শুক্রবারের আজান শুরু হয়েছে। মুসলমানের পরিচয় দিতে গেলে এই পবিত্র মসজিদে অন্তত আল্লাপাকের উদ্দেশ্যে বার কয়েক মাটিতে মাথা ঘষটাতে হয়। খিদেয় আমার মা শরীরের অবস্থা একবার নামাজে মাথা নোয়ালে তুলবার তাগদ পর্যন্ত নেই। কিন্তু কী করব, ছাব্বিশ জন লোক যখন ইমানদারির পরিচয় দিতে মসজিদে ঢুকল তখন আমি কি ভেভিয়ে বেড়াব? আমাদের তবলীগ জামাতের লোক ভেবে গায়ের ইমামসাহেব তোয়াজ করে সালাম জানালেন। মসজিদের কোথাও সেদিন একটা বেড়াল ঢোকার ফাঁক ছিল না। আমার ছোট ভায়রা বললে, আমরা তেঘরিয়ার ছেলের পক্ষের লোক। আপনাদের গাঁয়ের ইকবাল সেখের মেয়েকে পাকা দেখা দেখতে এসেছি। শুনে ইমামসাহেব বললেন, এতগুলো পুরুষবান্দা একটা আওরত দেখতে এসেছেন? এর থেকে মেয়েটাকে বেইজ্জতি করাও ভাল। 

এত অস্বস্তির মধ্যেও ইমাম সাহেবের কথায় স্বস্তি খুঁজে পেলাম। এই কথাটা আমার ভায়রাদেরকে বোঝাতে পারিনি। মাথা হেঁট করে ইকবাল সাহেবের বাড়ির উঠোনে হাজির হলাম। উঠোনের উপর সার সার কয়েকটা কাঁসার ঘড়া বদনা জগ। আমাদের আসার খবর এ বাড়িতে আগেই পৌঁছে গেছে বুঝতে পারি। ইকবাল সেখের ভাগ্য ভাল বলতে হবে। আমরা ওজু সেরে সদ্য মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসেছি। তা নইলে সাতাশটা লোকের চুয়ান্নটা ধুলোভর্তি পা ধোয়া-পাখলা করতে গেলে গেলে বান ডেকে যেত। ইকবাল সাহেব আমাদের পরম যত্নে বসতে দিলেন। একটা লম্বা চালাঘর। সার সার বিছানা পাতা। তাঁর উপর বিছিয়ে দেয়া ফুলকাটা কাঁথা, বালিশ, পাশবালিশ। যতগুলো লোক কুটুমের আগমন ঘটেছে ঘরে ততগুলো হেলান দেবার বাঁশের খুঁটি নেই। ঘরের চালের যা দশা তাতে মনে হয় বাঘে ভাল্লুকে খাবলে খেয়েছে। এমন একটা হত দরিদ্র পরিবারে শ্বশুরমশায় বড়শালা রুস্তমের বিয়ে দিচ্ছেন। আজকের দিনে এতটা উদার আছে কোন্‌ মানুষ? 

সামান্য বিশ্রামের পরই আমাদের আতিথেয়তার অন্যপর্ব। প্রত্যেকের হাতে হাতে কাচের গেলাস। তাতে শরবৎ। ভ্যাপসা গরমে শরবতের আশ্বাদ নিতে নিতে রকমারী মিষ্টান্ন। আমার চার-পাঁচ জন মামাশ্বশুর, খুড়শ্বশুর, ভায়রার দল গপগপিয়ে খেয়ে যাছে। অন্যঘর থেকে প্লেট বোঝাই হয়ে এগিয়ে আসছে বেদানা, আপেল, আঙুর, কিসমিস, ঠাণ্ডা দইয়ের ভাঁড়, চা, বিস্কুট। ছোট ভায়রা আমার কানে মুখ লাগিয়ে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললে, এসব যোগাড়-যন্তর কি এমনি এমনি হয়েছে, আগাম করে ফরমাইস করতে হয়েছে বুঝলে? 

বললাম, মিষ্টির কথা ছেড়ে দিলাম, এতব ফল কেন? এগুলো তো রোগীর খাবার। 

ভায়রা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সবাব দিল, তুমি দেখি হাবাগোবা। সেই তেঘরি থেকে এই ফাতাইনগরে রোদ গরমে আসলে যে কোন লোক রোগী হয়ে যাবে। শালার বিয়েতে ন খেলে আর কুথায় খাবো? 

ইকবাল সেখ ঢিলমিল পায়ে আমাদের খাওয়া তদারকি করছেন। হাড়জিরজিরে শরীর, বসে যাওয়া গাল, ঘোলাটে চোখ। খেয়ে যাও ব্বারা আল্লা যেমন মাপিয়েছে এই গরীবের সামর্থ্যে। 

আমি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ইকবাল সাহেবকে দেখছিলাম। দেখছিলাম ত্র অন্য দুটো মেয়েকেও। যাদের বয়স আর শরীরের বাড়বাড়ন্ত এমনই অনুষ্ঠানের দাবী রাখে। হঠাৎ চোখ চলে গেল চালাঘরের এক কোণে। সেখানে বাঁশের কাবারির সঙ্গে ঝোলানো রয়েছে দুই গুচ্ছ গোরুর গোঁফালি। গোঁফালি হচ্ছে গোরুর লেজের অবশিষ্ট লোম। আমি জানি গৈ গ্রামের চাষিভুষো মানুষ গোরু বিক্রি করতে বাধ্য হলে লেজের লোম কেটে স্মৃতি হিসেবে তুলে রাখে। নিশ্চয় এই অনুষ্ঠানের খরচ সামাল দিতে ইকবাল সাহেব তাঁর হালের বলদ বিক্রি করে দিয়েছেন। 

প্রাথমিক খাওয়া-দাওয়ার শেষে ইকবাল সাহেবকে একান্তে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি হালের বলদ বেঁচে দিয়েছেন? 

কিছুক্ষণ আমার পানে ঘোলাটে দৃষ্টি ভাসিয়ে বললেন, হ্যাঁ। 

তাহলে চাষ করবেন কী করে? 

চাষের জমি তো আর নেই। 

কন্যাদায় বড় দায় বাবা। মোল্লা মৌলবীরা বড় বড় ফতোয়া দেয়, তবে ভুলে তারাই পণ নেয়। 

আপনি তো আর মেয়ের বিয়েতে পণ দিচ্ছেন না। 

পণ ছাড়া কি সাদী হয় বাপ? 

আমার সারা গায়ে ঝাঁকি দিয়ে উঠল। বললাম, কত টাকা পণ দিচ্ছেন? 

পঞ্চাশ হাজার নগদ। সঙ্গে খাট, আলমারী, রঙীন টিভি, আইফোন, ঘড়ি, মেয়ের নাকে কানে হাতে গলায়। না দিলে এত এত অঙ্গ যে বেয়াব্রু হয়ে যায়, বড় মানে লাগে ছেলের বাপের। 

বললাম, এসব গহনা ছেলের পক্ষের আত্মীয়রা বউকে সাজিয়ে দেবে। 

ইকবাল সাহেব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তখনই আমার ছোট ভায়রা হাঁক দিল, তাউই মশায়ের সঙ্গে বিয়ের পরে অনেক গল্প করা যাবে। এদিকে যে বেলা বয়ে যায়। খেয়ে দেয়ে এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। 

এবার ভাত খাবার পালা। হরেকরকম স্বাদু তরকারির সঙ্গে মাংসের যথেষ্ট আয়োজন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এসব খাদ্য খোরাকি নির্লজ্জের মতো চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বাঁশের বাতায় ঝুলন্ত গোঁফালি আর মাথার উপর ধ্বস্ত খোড়ো চালের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বার বার মনে হচ্ছিল, আমরা একপাল ক্ষুধার্ত শকুন ফাতাইনগরের এই ভাগাড়ে বসে ইকবাল সাহেবের হাড় মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে যাচ্ছি। 



৬টি মন্তব্য:

  1. এমন সরস করুণ গল্প 'গল্প পাঠ' এ আর পড়ি নি। ওপাড় বাংলার গল্প, কিন্তু কি অনায়াসে পড়তে পড়তে চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। মিলিয়ে নিচ্ছিলাম আমার দেখা আশেপাশের চেনা সমাজের বাস্তবতার সাথে। গল্পকার আনসারউদ্দিনের গল্প প্রথমবারের মতন পড়লাম। আরও গল্প পড়ার জন্য মুখিয়ে রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  2. স্যাটায়ার ও হিউমরের অনন্য মিশেল। শেষটা বিষাদাচ্ছন্ন করে।
    খুব ভালো লাগল। ঝরঝরে লেখা। পরবর্তী লেখার প্রত্যাশা রইলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. স্যাটায়ার ও হিউমরের অনন্য মিশেল। শেষটা বিষাদাচ্ছন্ন করে।
    খুব ভালো লাগল। ঝরঝরে লেখা। পরবর্তী লেখার প্রত্যাশা রইলাম।

    উত্তরমুছুন