সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

আফসার আমেদের অকাল প্রয়াণ : অমর মিত্র

অমর মিত্র

‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য কথা সাহিত্যিক আফসার আমেদ গত ডিসেম্বরে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। সাত মাসের ভিতরে প্রয়াণ। কোনো সুখ স্বস্তি ওর জীবনে ছিল না।
বাংলা অকাদেমিতে ২৫ বছর চাকরি করেছে কিন্তু পাকা হয়নি চাকরি। উদ্দিষ্ট পোস্টে অনভিজ্ঞ মানুষকে নেওয়া হয়েছে ওকে নেওয়া হয়নি। অবসরের কোনো সুবিধা পায়নি। অনিরাপদ জীবন ছিল ওর সঙ্গে। আমি কত কথা শুনেছি ওর মুখে। খুব মৃদুভাষী ছিল। মনে পড়লে এখন চোখে জল এসে যায়।

আফসার আমেদ, সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত হাওড়া জেলার বাগনানবাসী এক যুবক বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবাহের গান সংগ্রহ করে সুখ্যাত পরিচয় পত্রিকায় নিয়ে এসেছিলেন সম্পাদক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ১৯৭৮ সালে। সেই প্রবন্ধ পড়ে সম্পাদক অবাক। বিশ্বাসই হয় না, এই যুবক এমন গভীর ভাবে অনুধাবন করেছে বিয়ের গানের ভিতরের আনন্দ এবং অশ্রু। সেই লেখা থেকেই তরুণ লেখক আফসার আমেদ চোখে পড়েন লেখক অমলেন্দু চক্রবর্তী এবং দেবেশ রায়ের। নানা সাহিত্যপত্রে আফসারের আত্মপ্রকাশে এই দুই অগ্রজের স্নেহ জড়িয়ে আছে। আফসারের গল্প লেখা শুরু তখন। প্রথম প্রকাশিত গল্প জলস্রোতে জনস্রোতে। তারপর থেকে পরিচয়, কালান্তর, বারোমাস, প্রতিক্ষণ, সারস্বত ইত্যাদি সাহিত্য পত্রে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। তাঁর লেখায় এল প্রায় অচেনা বাঙালি মুসলমানের অত্মকথাই যেন। কী অপূর্ব তাঁর দেখা। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর বাঙালি মুসলমান পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যে প্রায় ব্রাত্য হয়েই ছিল। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের পর আফসার আমেদ এবং আবুল বাশার লিখলেন সেই কথা। আফসার আমেদ বিশিষ্ট হলেন তাঁর অন্তর্দৃষ্টির জন্য। সিরাজদা আফসারের লেখা পছন্দ করতেন। তাঁর কিসসা সিরিজ পড়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। কালান্তর শারদীয়তে আফসার তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখেন ১৯৮০ সালে, ঘরগেরস্তি। সাহিত্যের ভালো পাঠক ঘুরে তাকিয়েছিলেন এই নবীন লেখকের দিকে। এরপর প্রতিক্ষণ সাহিত্য পত্রে আফসার আমেদ যে উপন্যাস লেখেন গত শতকের আটের দশকের মাঝামাঝি, আত্মপরিচয় নামের সেই উপন্যাসেই বিস্মিত করেন অনুসন্ধিৎসু পাঠককে। বাঙালি মুসলমান নারীর জীবন ছিল সেই অসামান্য আখ্যানে। ছিল বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় উন্মোচনের এক নিদর্শন। এক ভয়ানক হত্যাকান্ডে শুরু সেই উপন্যাস। অন্ধকার রাত্রি। ধনী গৃহস্তের পুত্রবধূ হত হয়েছে। তার গোর কাটতে বসে আছে গ্রামের সবচেয়ে গরিব মানুষটি। আমি এখনো ভুলতে পারিনি সেই অংশগুলি। তখন থেকে আফসার আমার পাঠ্য তালিকায়। এরপর আফসার ক্রমশ খ্যাতিমান হয়ে উঠতে থাকেন। আলাপ হলো লাজুক একটি যুবকের সঙ্গে। সেই আলাপও বছর ৩৫। উদার মানবিকতা তাঁর দর্শন। আর সমস্ত রকম ধর্মীয় কুসংস্কারের বিপক্ষে। আফসার আমাকে তাঁর কথা বলতেন। আরম্ভের দিনে তিনি বাইনান গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে একটি পত্রিকা করতেন, জাগর। স্বল্পায়ু সেই পত্রিকা গুন-মানে ছিল প্রথম শ্রেণীর। বাইনানের এক বন্দর শ্রমিক পরিবারে আফসারের জন্ম। তিনি তাঁর শিকড় চেনেন। জন্মভূমি ছেড়ে আসেননি। সামান্য ছিল তাঁর জীবিকা। লেখার জন্য ত্যাগ করেছেন। সাধনা করেছেন। তাঁর লেখার পটভূমি বাগনান এবং তার আশপাশ। হ্যাঁ, আফসার আমেদ বাঙালি মুসলমান জীবনের বিশ্বস্ত চিত্রকর। হ্যাঁ, চিত্রময় তাঁর লেখা। ধানজ্যোৎস্না উপন্যাস পড়লে তা ধরা যায়। মনে হয় এক কবির লেখা উপন্যাস পড়ছি। যা কিছু সুন্দর, তার সঙ্গে কবিতার তুলনা করতে ভালবাসি আমরা। ধানজ্যোৎস্না উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে ছবি করেছিলেন মৃণাল সেন। ছবির নাম, আমার ভুবন। এরপর ‘খন্ড বিখন্ড,’ নামের উপন্যাস লেখেন কলকাতার বই বাঁধাই করেন যাঁরা তাঁদের জীবন নিয়ে। ‘অন্তঃপুর’ নামের উপন্যাসটি ছিল মুসলমান নারীর অন্তঃপুরের কথা। গত শতকের শেষদিকে আফসার আমেদের উপন্যাসে একটি বড় বাঁক আসে ‘বিবির মিথ্যা তালাক তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিসসা’ রচনার পর। মুসলমান বাঙালির জীবনে অনেক রকম রূপকথা, কিসসা, গুজব, কল্প-কাহিনি যা ছড়িয়ে ছিল পথের ধূলায় আফসার আমেদ যেন তা কুড়িয়ে আনতে থাকেন। লেখকের এই অদ্ভুত যাত্রা ছিল বাংলা উপন্যাসের এক নতুন পথে। হ্যাঁ নিভৃতচারী লেখক সকলের অজান্তেই সেই কাজটি করে যেতে থাকেন। তিনি আরম্ভ করেন কিসসা সিরিজ রচনা। বিবির মিথ্যা তালাক...রচনার পর আফসার লেখেন, কালো বোরখার বিবি কুসুমের গন্ধ ও চল্লিশজন লোক। সেই উপন্যাসে লিখলেন তিনি মুসলমান জীবনের আর এক নতুন কাহিনি--কিসসা। তারপর আশ্চর্য বশীকরণ কিসসা, মেটিয়াবুরুজে কিসসা, একটি ঘোড়সওয়ার কিসসা, হিরে ও ভিখারিনি সুন্দরী রমণী কিসসা ।এই উপন্যাসগুলিতে বাঙালি মুসলমান রমণীর সামাজিক অবস্থানের কথা আছে, আছে ধর্মীয় নিগড়ের কথা। তিন তালাক যে কত নিষ্টুর এক জীবন-চর্চা তা আফসারের লেখার ভিতরে নানা ভাবে প্রতিভাত। একটি সামাজিক অন্যায় রক্তের ভিতরে প্রবেশ করেছে, তাকে নানা ভাবে নানা কোণ থেকে দেখেছেন আফসার আমেদ। এই দেখা মানবিক। ধর্ম যেভাবে মানুষের জীবনে জড়িয়ে থাকে, তা লিখেছেন আফসার। সেখানে তাঁর দেখা সম্পূর্ণ আলাদা। মৌলিক। তিনি একটি গল্প লিখেছিলেন, ‘আত্মপক্ষ’। তার কথা বলি, কিছুটা তা ব্যক্তিগতও নিশ্চয়। আফসারের বাড়ি বাগনান শহর থেকে ভিতরে, বাইনান গ্রামে। কলকাতার কাছে কোনো আশ্রয় ছিল না। আর আমি তো ভাড়াবাড়ির বাসিন্দা। আমরা কলকাতার কাছে সল্টলেক সংযুক্ত এলাকা, মহিষবাথান গ্রামে জমি কিনি একসঙ্গে। সামনে পিছনে, একই প্লট। আমি আগে বাড়ি করলাম। এবার আফসার আর আফসারের স্ত্রী নাসিমা গিয়ে উঠল আমার বাড়িতে। ওখানে থেকে নিজের বাড়ি করবে। কিন্তু সেখানে মসজিদের আজান শোনা যায় না। আত্মীয় স্বজন নেই কেউ। আর সেই ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গাও ঘটে গিয়েছিল। নাসিমা বলল, বাগনানে ফিরে যাবে চেনা জায়গায়। আফসার চলে গেল। আমরা এক সঙ্গে থাকতে পারলাম না। আমিও বাড়ি প্রায় তৈরির মূল্যে বিক্রি করে দিলাম আফসার জমি বিক্রি করেদিতে। এরপর আফসার বারোমাস পত্রিকায় একটি গল্প লেখে আত্মপক্ষ। আমি পরের শারদীয়তে লিখি আফসারের গল্পের বিপরীতে একটি গল্প, হ্যাঁ বারোমাস পত্রিকাতেই। আমার গল্প কিছু হয়নি। আফসারের গল্প অসম্ভব ভালো হয়েছিল। আমার নিজের গল্পটি হারিয়ে গেছে। খুঁজে তো পাই না। আত্মপক্ষ গল্পে এক হিন্দু বন্ধুর রেখে যাওয়া বাড়িতে মুসলমান পরিবারটি থাকতে এসেছে। হিন্দু বন্ধুর পরিবার রেখে গেছে দেবীর পট, ধুপ-ধুনো। মুসলমান বন্ধুর ধর্মপরায়ণ স্ত্রী সেই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ফজরের আজান না শুনে যেমন শূন্যতা অনুভব করে, তেমনই কষ্ট পায় লক্ষ্মী দেবীর পটের সমুখে ধুপ জ্বালানো হচ্ছে না, পুজো হচ্ছে না, তাই। কী অসামান্য আফসারের এই দেখা। এই গল্পই আফসার আমেদের জাত চিনিয়ে দেয়। 

তার জাত চিনিয়ে দেয় কিসসা সিরিজের উপন্যাসগুলি। শানু আলীর নিজের জমি, অন্তঃপুর, খন্ড বিখন্ড, সেই নিখোঁজ মানুষটি, আত্মপরিচয়, এইসব উপন্যাস। 

যে উপন্যাসটির জন্য আফসার আমেদ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন গত বছর তাও এক প্রথার বাইরে গিয়ে দেখা এই সমাজ জীবন। ‘ সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসে গঞ্জের এক মেধাবী মানুষ নিরুদ্দেশে গিয়েছিল বহুদিন আগে। আচমকা সে ফিরে আসে সেই গঞ্জে, যেখানে নানা ভাবে বিড়ম্বিত জীবন নিয়ে বাস করে ্সাধারণ মানুষ। লোকটি ফিরে এসে যা করে তা যেন এক রূপকথা। আফসারের লেখার যা আমার পছন্দ তা হলো তিনি বাস্তব থেকে বেরিয়ে পরাবাস্তবতায় চলে যান অনায়াসে। ফ্যান্টাসির ভিতরে প্রবেশ করেন সহজেই। যে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন, তা এক ঘোরলাগা আখ্যান নির্মাণ করে। এই উপন্যাসটিও তাই। নিরুদ্দিষ্ট মানুষটি ফিরে এসে নানা ভাবে বিড়ম্বিত ও সমস্যা-জর্জরিত মানুষের কাছে যায় এবং সমস্যার নিরসন ঘটায়। তারপর আবার নিরুদ্দেশে যায়। এ এক আধুনিক রূপকথা। এই উপন্যাসের বাস্তব এবং ফ্যান্টাসির ভিতরে যে চলাফেরা তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আফসারের প্রয়াণ আমাদের ভাষা আমাদের সাহিত্যকে নি:স্ব করল। অনেক লেখা নিয়ে চলে গেল আমার অনুজ আমার বন্ধু।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন