সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

সাঁঝবেলার নাইপল

গৌতম চক্রবর্তী

মাঝে মাঝে টেবিল চাপড়ে ওঠার সেই ঝাঁজ তাঁর মধ্যে আর নেই। নোবেলজয়ী লেখক স্যার বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল এখন অনেকটাই স্তিমিত।

কোনও পলিটিকাল কারেক্টনেসের তোয়াক্কা না-করা ওই ঝাঁজটাই ছিল তাঁর ব্র্যান্ড। কখনও সটান বলে দিয়েছেন, ইংরেজি ছাড়া অন্য ভারতীয় ভাষায় আজকাল কোনও লেখালেখি হচ্ছে না। কখনও লেখিকাদের সম্বন্ধে: ‘‘মেয়েরা আবেগপ্রবণ, তাদের লেখালেখিতেও সেই সঙ্কীর্ণ চিন্তাধারা।
ফলে জেন অস্টেন থেকে কেউই সাহিত্যিক হিসাবে প্রথম শ্রেণির নন।’’ কখনও পূর্বপুরুষের দেশ ভারত নিয়ে ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’: এখানে লোকে সর্বত্র মলত্যাগ করে। রেললাইনের ধারে, মাঠের ধারে, রাস্তার ধারে, নদীর ধারে, সমুদ্রতীরে কোত্থাও হাগতে বাকি রাখে না’। আর এক জায়গায়: ‘অমুক লোকটা খারাপ। শুধু বাঙালি আর ক্রিমিনালদের সঙ্গে মেশে।’

আফ্রিকা থেকে ইসলাম সব কিছু নিয়েই ছিল তাঁর তির্যক ও ভুলভাল মন্তব্য। আফ্রিকা নিয়ে: ‘‘ঠিক-ভুলের কোনও ব্যাপার নয়। ঠিক ব্যাপারটাই এখানে নেই।’’ ইরান, ইরাক থেকে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ঘুরে সেখানকার মুসলিম জনজীবন নিয়ে দুই পর্বের রুদ্ধশ্বাস বই। এবং সেখানে পর্যবেক্ষণ: ‘‘ইসলাম আসলে ঔপনিবেশিকতার চেয়েও খারাপ। ইসলাম ধর্ম মেনে নেওয়া মানে সেই জাতিগোষ্ঠী নিজের অতীত অস্বীকার করছে। ইতিহাসকে অস্বীকার করছে। এ যেন বলা, আমার পূর্বপুরুষের কোনও সংস্কৃতি ছিল না।’’ বহু লেখকই নাইপলের এ সব কথাবার্তার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন, উইকিপিডিয়াতে ‘এ কালেকশন অব ওয়ার্স্ট থিংস ভি এস নায়পল হ্যাজ এভার সেড’-এর মতো সাইট তৈরি হয়েছে, তবু দুর্মুখ লোকটাকে বাগ মানানো যায়নি।

কিন্তু ভি এস নাইপল মানে শুধু বিতর্কিত উক্তিসম্ভার নয়। ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ। এ বারের জয়পুর সাহিত্য উৎসবেই পল থুরো এক দিন মঞ্চে তাঁকে তুলনা করছিলেন চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে, “একটা দ্বীপে এক পরিবারকে নিয়ে উপন্যাস। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ, খাওয়াদাওয়া, বাড়িঘর, কথা বলা, আবহাওয়া কিছুই আমাদের জানতে বাকি থাকল না। চার্লস ডিকেন্সের পর এ রকম উপন্যাস আর লেখা হয়নি,’’ তখনই ‌ ‌ ‌‌ পাটাতন বেয়ে নিয়ে আসা হল হুইলচেয়ার। পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত ৮২ বছরের নাইপল আজ হুইলচেয়ারে বন্দি!

ঔজ্জ্বল্য এতটুকু কমেনি। লালরঙা হাইনেক টি শার্টের ওপর কোট। পল থুরো যে উপন্যাসটার জন্য ডিকেন্সের সঙ্গে তাঁর তুলনা করছিলেন, সেই ‘এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’ প্রকাশের এ বার ৫৪ বছর।

স্মৃতি গোলমাল করে, অনেক কিছু ভুলে যান। হুইলচেয়ারের পিছনে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী: লেডি নাদিরা নাইপল। ‘‘থ্যাঙ্ক ইউ অল ভেরি মাচ। যাঁরা আমার নামে এত ভাল কথা বলছেন, সেই লেখকদের সবাইকে ধন্যবাদ,’’ বলতে বলতে মুখটা কান্নায় ভেঙেচুরে যাচ্ছে, চেয়ারে এলিয়ে পড়ছে পার্কিনসন-আক্রান্ত শরীরটা। নাদিরা এগিয়ে এসে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিলেন, “আপনাদের বক্তব্যে উনি অভিভূত। পল, হানিফ, ফারুখ, অমিত সবাই আমাদের বন্ধু। এ বার বোধ হয় গুডবাই বলার সময়।’’ পল মানে পল থুরো। তাঁর পাশে হানিফ কুরেশি, ফারুখ ধোন্ডি ও অমিত চৌধুরী। সবাই এতক্ষণ আলোচনা করছিলেন, কী ভাবে ‘মিস্টার বিশ্বাস’ তাঁদের লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এখন সবাই বাকরুদ্ধ। ঢালু পাটাতন বেয়ে হুইলচেয়ার নামিয়ে আনা হল। পিছনে নাদিরা, রুমালে চোখ মুছছেন তিনিও।

এ বারের জয়পুর সাহিত্য উৎসবের সেরা ছবি এখানেই। প্রবীণ লেখকের সামনে তাঁরই ৫০ বছর আগের লেখা নিয়ে আলোচনা করছেন পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকরা, এমন সচরাচর ঘটে না। কোন লেখা? এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস। আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি উপন্যাসের সূচনাবিন্দু। পটভূমি ত্রিনিদাদ হতে পারে, কিন্তু মোহন বিশ্বাস থেকে শ্যামা, তুলসী পরিবার সবাই ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান। ছোট্ট মোহনের ছয়টা আঙুল, তার জন্মের পর কোষ্ঠী তৈরি, গণৎকারের তাকে অপয়া বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা— সবই ভীষণ ভাবে ভারতীয়।

সেরা ছবি, কেন না প্রায় কুড়ি বছর পর পল থুরো এবং নাইপল এক মঞ্চে। দুই লেখকই একদা তুমুল বন্ধু ছিলেন। নাইপল বয়সে বড় এবং খ্যাতিতে এগিয়ে। ফলে, তিনি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। কখনও লন্ডনের সাহিত্যজগতে থুরোকে আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন, কখনও উগান্ডায় দু’জনে মিলে একসঙ্গে পানশালায় হইচই করছেন। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের পর সব ওলোটপালোট! সেটা ১৯৯৬ সাল। থুরো আচমকা আবিষ্কার করলেন, তাঁর উপহার-দেওয়া সব বই নাইপল নিলামে চড়িয়েছেন। থুরো চিঠি লিখে কারণ জানতে চাইলেন, তীব্র ভাষায় উত্তর এল নাইপলের দ্বিতীয় স্ত্রী নাদিরার থেকে, “তোমার মতো পিছনে ছুরি-মারা বিশ্বাসঘাতক খুঁজে পাওয়া ভার। জায়গায় জায়গায় ওঁকে একগুঁয়ে, উদ্ধত, বদমেজাজি বলে বেড়িয়েছ।’’

‘দ্য গ্রেট রেলওয়ে বাজার’-এর মতো বেস্টসেলার-লেখকই বা ছাড়বেন কেন? দু’ বছরের মধ্যে পল থুরো লিখে ফেললেন ‘স্যার ভিদিয়াজ শ্যােডা’। বিখ্যাত লেখক নাইপল আসলে কিপ্টে, রেস্তোরাঁয় খেয়ে কখনও বিল মেটান না, অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেন, স্ত্রীকে মারতেও বাকি রাখেন না ইত্যাদি কত কেচ্ছাই যে ছিল সেই বইতে। তার পরই মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এক লেখক তাঁর পৃষ্ঠপোষক সিনিয়র লেখকের নামে কেচ্ছা গেয়ে আস্ত বই লিখছেন, এমন উদাহরণ আর নেই। এবং কেচ্ছা কার নামে? সেই নাইপল, যিনি সব সময় অন্যকে আক্রমণ করেই আনন্দ পেয়েছেন।

সাহিত্যের দুনিয়ায় অনেক বিখ্যাত বন্ধুবিচ্ছেদ হয়েছে। মেক্সিকোর এক সিনেমা হলের সামনে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও মারিও ভার্গাস লোসা, দুই বন্ধুর হাতাহাতি হয়েছিল। ভার্গাস লোসা বন্ধুকে ‘ফিদেল কাস্ত্রোর বেশ্যা’ বলে গালিগালাজও দিয়েছিলেন।

গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুর কয়েক বছর আগে অবশ্য নিঃশব্দে কলহ মিটে গিয়েছিল। কিন্তু দুই বন্ধু এ ভাবে কখনও একত্র মঞ্চে আসেননি। জয়পুর সাহিত্য উৎসবের উদ্যোক্তা সঞ্জয় রায় বলছিলেন, এক বছর আগে যখন তাঁরা নাইপলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, নাইপল নিজেই বলেছিলেন, ‘থুরোকেও বলো।’

সে দিন উৎসবে উপস্থিত অনেকে বলছিলেন, থুরোর কথা শুনেই নাইপল কেঁদে ফেলেছিলেন। বন্ধুর হুইলচেয়ারও এক সময় ঠেললেন থুরো। ডিনারে এক জনকে নাইপল বলেছিলেন, ‘‘বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। লাইফ হ্যাজ কাম ফুল সার্কল।’’

বৃত্ত পূর্ণ? অশক্ত শরীরে আর কখনও পূর্বপুরুষের দেশে আসবেন না তিনি? কয়েক মাস আগেই জানিয়েছেন, ভারত নিয়ে আর লিখবেন না। শরীর খারাপের কারণটাই দেখিয়েছেন, “৮০ পেরিয়ে কাকে লিখতে দেখেছেন?”

বয়স বেড়েছে ঢের পৃথিবীর নরনারীদের! ২৬ বছর বয়সে লন্ডনের এক চিলতে ভাড়ার ফ্ল্যাটে ‘মিস্টার বিশ্বাস’ লিখতে শুরু করেছিলেন নাইপল, তাঁর জীবনের চার নম্বর উপন্যাস। সময় লেগেছিল তিন বছর। লেখাটা তখন মাঝে মাঝেই পড়ে শোনাতেন স্ত্রী প্যাট্রিসিয়াকে।

ব্রিটিশ কন্যা প্যাট্রিসিয়া হেলের সঙ্গে ভিদিয়া নাইপলের কলেজ-প্রেম। দু’জনেই অক্সফোর্ডের ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক করতে গিয়ে প্রথম দেখা। প্যাট্রিসিয়া দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, তার বাবা জর্জ হেল ব্যাঙ্কের কেরানি। বিদ্যাধরও ত্রিনিদাদের গরিব বাড়ির ছেলে, স্কলারশিপ নিয়ে অক্সফোর্ডে। মিসেস কিং নামে এক ভদ্রমহিলার বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকে। মার্গারেট রবার্টস নামে কেমিস্ট্রির এক সিনিয়র ছাত্রী ওই ঘর ছেড়ে দেওয়ার পর বিদ্যাধর সেখানে ঢুকেছে। এই মার্গারেট-ই পরে ডেনিস থ্যাচারকে বিয়ে করে মার্গারেট থ্যাচার নামে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হবেন, কিন্তু কলেজে এ সব আর কে জানত!

সেমেস্টারের ছুটির পর বিদেশ-বিভুঁইয়ে একটি ঘটনাই ঘটিয়েছিল বিদ্যাধর। ‘তোমাকে ভীষণ মিস করছি। সেন্ট হিউজেস কলেজে তোমার ঘরে তুমি নেই। ওই ঘর তার যাবতীয় আকর্ষণ এবং উত্তাপ হারিয়ে এখন খাঁ খাঁ করছে,’ প্রথম চিঠিতে প্যাটকে লিখেছিল সে। ব্রিটেনের স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা তার ভাল লাগে না, হাঁপানির টান বাড়ে। বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটিও তথৈবচ। অষ্টাদশ শতকের ভাষা আর ঐতিহ্যেই মজে রয়েছে। এখনও কোর্টইয়ার্ড বা বারান্দাকে বলে ‘কোয়াড’, শিক্ষককে ‘ডন’। ‘এখানে বেশির ভাগ ছেলেই স্টুপিড। এখানে এলে বোঝা যায়, হায় ব্রিটিশ আভিজাত্য, তোমার দিন গিয়াছে,’ বাড়িতে লিখেছিল বিদ্যাধর।

এটাই বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল। তিনি শুধু ভারত, আফ্রিকা নিয়ে বাজে কথা বলেন না, ছাত্রাবস্থা থেকেই মুখের আগল রাখেন না। বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়কেও মুহূর্তে নস্যাৎ করে দিতে পারেন। এই ঠোঁটকাটা স্বভাবেই কি নেই তাঁর যাবতীয় আকর্ষণ?

প্রথম প্রেমে ছিল ব্যর্থতার স্বীকারোক্তিও। এই সময়েই প্রেমিকাকে বিদ্যাধরের চিঠি: ‘ফিরে দেখলাম, ডাকবাক্সে মোটা খাম। প্রকাশক উপন্যাসটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রবল জিন খেলাম। জিন, আরও জিন। প্যাট, অক্সফোর্ডে আসার আগে আমি চা-ও খেতাম না। এখানে এসে দেখলাম, কিছু স্মার্ট ছেলে, যারা মাতাল হতে জানে, তারাই নাকি সত্যিকারের অক্সফোর্ড।’

এই কলেজ প্রেমে ছিল ব্যর্থতাবোধ, ছিল শরীরী অ্যাডভেঞ্চার। সেপ্টেম্বরের এক দুপুরে ওষুধের দোকান থেকে প্রথম কন্ট্রাস্পসেপটিভ জেল কেনে বিদ্যাধর। প্যাট সে দিন তার ঘরে। কৌমার্য হারানোর উথালপাথাল অভিজ্ঞতার পর দিনই হস্টেল থেকে প্যাটকে চিঠি: ‘অন্য মেয়েরা আমাকে কোনও দিনই টানে না। আমি জানি, ওরা আমার প্যাটের চার আনাও নয়।’

১৯৫৩ সাল। পরীক্ষা শেষ। ব্রিটেনের সিংহাসনে বসলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ, এভারেস্টে উঠলেন তেনজিং নোরগে। ‘‘টিভিতে মিসেস তেনজিংকে দেখে আমার ভাল লেগেছে। বাই দ্য ওয়ে, কাল চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখলেম, একটা পাকা চুল। ফরাসি ডিকশনারির মধ্যে রেখে দিয়েছি। আজই ওটা খামে ভরে পাঠিয়ে দেব। নিজের চোখে দেখে নিও, তোমার পাগলামির চোটে আমি কত দ্রুত কবরের দিকে এগিয়ে চলেছি,’ লিখেছিল প্যাট।

২০১৫ সালের সন্ধ্যায় পাঁচতারা হোটেলের আলোকবৃত্তে জীবনের কোন বৃত্তের কথা ভাবছিলেন নাইপল? তাঁর বৃত্ত তো কখনও একটা কেন্দ্র ঘিরে এগোয়নি। কলেজপ্রেম, বিয়ে, বহু ব্যর্থতা পেরিয়ে চতুর্থ উপন্যাসে স্বীকৃতিলাভ.... তার পরও রূপকথার গল্প হয়নি। পূর্বপুরুষের দেশকে নিয়ে নন ফিকশন লিখবেন বলে ’৬২ সালে সস্ত্রীক এসেছিলেন এ দেশে। লেখা হয়েছিল ‘ইন্ডিয়া: অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস।’ ভারতীয় দুর্নীতি, যত্রতত্র মলত্যাগের অভ্যাস নিয়ে লেখা সে বই নিয়ে এখনও লোকের যা রাগ! জয়পুরেই এক পাঠক নাইপলকে প্রশ্ন করলেন, ‘বইটা লিখেছিলেন কেন? ভারত এক উজ্জ্বল দেশ, অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা নয়।’ পাঁচ বছর আগে এ প্রশ্নের অন্য উত্তর পাওয়া যেত। এ বার হুইলচেয়ারে বসা শরীর উত্তর দিল, “ওটা একটা অন্ধকার জায়গার বর্ণনা। যে অন্ধকার আমি আজীবন বুকে নিয়ে বেড়িয়েছি।’’ নাদিরার পাশে বসে থাকা এই নাইপল আর বদরাগী নন, স্তিমিত এক শান্ত জীবন।

অন্ধকার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো? জীবনের বৃত্ত কি ভাঙতে শুরু করেছিল সেখান থেকেই? প্রথম ভারতসফরে মুম্বই, দিল্লি হয়ে কাশ্মীরে এসেছেন নাইপল। এক রাতে প্যাটকে মারছিলেন, তাঁর কান্নায় হোটেলের পাশের ঘরের বোর্ডাররা ছুটে যান। জীবনীকার প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ পরে নাইপলকে এ নিয়ে প্রশ্নও করেছিলেন। লেখকের উত্তর ছিল, ‘না। খাট থেকে পড়ে ওর নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল। আমি জীবনেও প্যাটকে মারিনি। নেভার।’

দাম্পত্যের ঝগড়া, মারপিট নয়। স্যার বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপলের জীবনের ট্র্যাজিক অন্ধকার ছিল অন্যত্র। সেক্সুয়াল কমপ্যাটিবিলিটি! ভারত থেকে ফেরার কয়েক বছর পরে আর্জেন্টিনার মার্গারেট গুডিং-এর সঙ্গে প্রেম। মার্গারেট বিবাহিতা, দুই সন্তানের জননী। তাঁকে নিয়েই ভারত, ইরান, আর্জেন্তিনার নানা জায়গায় উড়ান দিয়েছেন লেখক। কিন্তু উড়ান থেকে ফিরে ‘আ বেন্ড ইন দ্য রিভার’ বা ‘অ্যামং দ্য বিলিভার্স’ তিনি লিখবেন লন্ডনের বাড়িতে বসে। প্রায়ই স্ত্রীকে শোনাতেন, মার্গারেট ছাড়া তাঁর জীবন অসহ্য। কিন্তু স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতেও চাননি। পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘‘লেখালেখির জন্য তোমাকে চাই। সাহিত্যিক ছাড়া আমি কিছু নই। তুমি আমার সেই সাহিত্যের জন্য। মার্গারেট জীবনের জন্য, যৌনতার জন্য।’’

নারীবাদী থেকে আতুপুতু রোমান্টিক বাঙালি সকলে চটে যেতে পারেন। কিন্তু জীবনের ট্র্যাজেডি? পুরুষ যখন স্ত্রীকে জানায়, তুমি লেখালেখির জন্য আর মার্গারেট যৌনতার জন্য, তোমাদের কাউকেই আমি ছাড়তে পারব না, সেই অসহায় যন্ত্রণা কি নিছক নীতিবাদের দোহাই দিয়ে এড়ানো যায়? ‘এ বেন্ড ইন দ্য রিভার’ উপন্যাসের প্রথম লাইন The world is what it is; men who are nothing, who allow themselves to become nothing, have no place in it কি পুরুষের রক্তাক্ত অভিমান থেকেই উঠে আসে না?

পুরুষের অভিমান, লেখকের দায়। নাইপলকে চিনতে গেলে এই দুটো বুঝতে হবে, কোনও পলিটিক্যাল কারেক্টনেস বা মূল্যবোধের রাজনীতি নয়। ‘ইন্ডিয়া: মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ’ লেখার সময় মার্গারেটকে নিয়ে ভারতে এসেছেন নাইপল। রাজস্থানে দু’জনে বাসে উঠেছেন। বাসভর্তি ছাগল, ভেড়া আর মানুষ। সিটে জায়গা না পেয়ে মেঝেতেই গাদাগাদি করে বসে তাঁরা। মার্গারেট এত বিরক্তি জানিয়েছিলেন যে, পরদিনই তাকে পত্রপাঠ বিমানে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গিনীকে তিনি যৌনকর্মের পুঁটুলি ছাড়া কিছুই মনে করেননি।

মার্গারেটও নন, নাইপলঘরনি এখন পাকিস্তানের মেয়ে নাদিরা। নব্বই দশকের মাঝামাঝি লাহৌরে মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়ির ককটেল পার্টিতে নাইপলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘তালিবান’ বইয়ের লেখক আহমেদ রশিদ। অন্য সকলের প্লেটে তন্দুরি কাবাব, নাইপলের প্লেটে নিরামিষ স্যালাড। সাহসী নাদিরা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনিই ভি এস নাইপল?’-‘হ্যাঁ।’ তার পরই জিজ্ঞাসা, ‘মে আই কিস ইউ?’ নাইপলের চিবুকে চুম্বনচিহ্ন এঁকে নাদিরা জানালেন, ‘এ ট্রিবিউট টু ইউ।’ অহেতুক নাইপলকে নিয়ে চেঁচিয়ে লাভ নেই। কোন পুরুষ না চায় এ রকম সাহসী, চকিত চুমু!

নাদিরার সঙ্গে এই ঘটনার সময় লন্ডনের বাড়িতে তাঁর স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত। দেশে ফিরে লেখকের ডায়রি: শেষ দিন অবধি আমাকে তাড়া করবে প্যাটের বিবর্ণ হাসি, ‘কেমন আছ? কাজ কেমন এগোচ্ছে?’ ওকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলাম। প্যাট আচমকা আমাকে চুমু খেল। গত কুড়িটা বছর ও আমাকে এতটুকু ছুঁয়ে দেখেনি। নাদিরার কথা বললাম। কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। কে জানে, সেই মুহূর্তে আমার কথা ও কতটা বুঝতে পারছিল।’ পরের দিনই কোমায় চলে গিয়েছিলেন প্যাট।

৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬। হিমেল হাওয়া, লন্ডনের রাস্তায় জমাট বরফ। একটু আগে প্যাট্রিসিয়াকে কবরে শুইয়ে রেখে বাড়ি ফিরলেন নাইপল। সারা বাড়ি খাঁ খাঁ, শূন্য বিছানা। টেবিলে ওষুধের স্তূপ। কাজের মাসি ফুডস্টোরে খাবার কিনতে গিয়েছে। আপেল, জলপাই আর চিজ। দোকান থেকে আসা রিসিটের উল্টো পিঠে লিখলেন, ‘সবুজ অলিভ। জীবনের প্রতীক। নাদিরার জন্য। আগামী কালই হিথরোয় নামছে ও।’

প্রথম স্ত্রীকে সমাহিত করার দিনেই দ্বিতীয় স্ত্রী নাদিরাকে এ ভাবেই জীবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নাইপল। স্বার্থপর, ধর্ষকাম এক স্বামী? কিন্তু যে লোক স্ত্রীর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরেই সবুজ অলিভ আর জীবনের স্বপ্ন দেখে, তাকে ওই সব বিশেষণে বাঁধা যায়? এ বারেও জয়পুরে এক সন্ধ্যায় ফারুখ ধোন্ডি নাইপলকে বলছিলেন, “মনে হচ্ছে, আপনার লন্ডনের বাড়িতে বসে সূর্যাস্ত দেখছি।’’ ঝটিতি জবাব, “সূর্যাস্তর প্রসঙ্গ তুলো না। লোকে ভাববে, আমার জীবনেই এখন সূর্যাস্ত। আনহ্যাপি মেটাফর।’’

সাঁঝবেলার নিয়মকানুন কবেই বা পাত্তা দিয়েছেন তিনি? প্যাট্রিসিয়ার ডাইরি, তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিপত্র সবই ৬ লক্ষ ২০ হাজার ডলারে ওকলাহোমার তুলসা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বলা ছিল, তাঁর মৃত্যুর আগে কেউ ওই কাগজপত্র পড়তে পারবেন না। কিন্তু তাঁর জীবনী লিখতে এসে ব্রিটিশ লেখক প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ জানালেন, ওই কাগজগুলি পড়তে ও প্রকাশের অনুমতি না দিলে তিনি জীবনী লিখতে পারবেন না। নাইপল সে দিনই প্যাট্রিককে প্রয়োজনীয় অনুমতি দেন, “লেখকদের জীবন অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। হয়তো লেখকের জীবনী তাঁর লেখার চেয়েও আরও ভালভাবে সংস্কৃতির ইতিহাসকে তুলে ধরে।’’ তিনি, নোবেলজয়ী স্যার বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল তো জানতেন, ওই কাগজগুলিতে কোন বিস্ফোরক ডিনামাইট আছে। কিন্তু ছাপোষা, রক্ষণশীল, মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির কথা ভেবে নিজেকে এক বারও লুকোতে চাননি। আশ্রয় চাননি মৃত্যু-পরবর্তী অমরত্বের অন্ধকারে। 

এ বারেও যেন সেই ছবি! অনেক কথা ভুলে যাচ্ছেন, খেই হারিয়ে ফেলছেন, তবু বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল এখনও আপন সাহিত্যস্মৃতিতে বুঁদ। বরাবরই তিনি চেয়েছেন বিতর্ক, এক বার বলেওছিলেন, ‘‘যে লেখা পড়ে আপনার মনে লেখকের প্রতি শত্রুতা জন্মাবে না, সে আসলে মৃত।’’ একটা সময় ভারত নিয়ে তাঁর বিতর্কিত লেখাগুলির প্রেক্ষিতে ছুটে আসছে তিতকুটে প্রশ্ন, নাদিরা মাইক তুলে নিলেন, ‘‘ওঁর মা একটাই হিন্দি কথা জানতেন। বেটা। বইটা লেখার পর বলেছিলেন, বেটা, ভারতকে বরং ভারতীয়দের হাতেই ছেড়ে দাও।’’ নাইপল হাসলেন। কৃতজ্ঞতার হাসি।

দেশপ্রেমিকরা বুঝলেন না, ভারত আসলে নাইপলের কাছে তাঁর জীবনের প্রিয় নারীদের মতোই। কাছের নারীদের খাক করে দিয়েছেন, আবার প্রতিটি মুহূর্তে নারীর কাছেই নতজানু হয়েছেন। এখানেই তাঁর জীবনবৃত্ত! অনুষ্ঠানের রাতেই টুইট করলেন উইলিয়াম ডালরিম্পল: নাইপলের অনুষ্ঠানে ছিল ৬ হাজার মানুষ। অমিতাভ বচ্চন, ওপরা উইনফ্রের সময়েও এত ভিড় দেখিনি।

যাবতীয় সিনেমা, রিয়ালিটি শো-কে তুড়ি মেরে হুইলচেয়ারে বসা লোকটা ফের সাহিত্যকে জিতিয়ে গেল!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন