সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

ভি এস নইপাল : অভিবাসী জীবনের শক্তিশালী অতি বিতর্কিত কথাকার

সৌভিক ঘোষাল

৮৫ বছর বয়েসে চলে গেলেন ভি এস নইপাল। ভারতীয় বংশদ্ভূত নোবেল বিজয়ী এই লেখকের জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ত্রিনিদাদে, ১৯৩২ সালের ১৭ অগস্ট। পরে পড়াশোনার জন্য আসেন লন্ডনে এবং পাকাপাকিভাবে সেতাই হয়ে ওঠে তাঁর আবাসভূমি। এর মাঝে অবশ্য তিনি ঘুরেছেন থেকেছেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ভারত সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে। শুধু পর্যটকের মতো করে ঘোরেন নি, থেকেছেন মাসের পর মাস। ভারতে তিনি টানা প্রায় এক বছর ছিলেন। আফ্রিকাতেও কাটিয়েছেন দীর্ঘদিন। আর এগুলো তাঁর লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে গিয়েছে।

নইপাল এর প্রথম উল্লেখযোগ্য লেখা এ হাউস অব মিস্টার বিশ্বাস (১৯৬১) তাঁকে বিশেষ খ্যাতি দিয়েছিল। এই উপন্যাসের মিস্টার বিশ্বাস চরিত্রটি যে তিনি অনেকটা তাঁর নিজের বাবার আদলে গড়ে তুলেছেন এবং সেই জীবনীর অংশ এই আখ্যানে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে,তা নইপাল নিজেই জানিয়েছিলেন। নইপালের এই লেখা দেখায় অভিবাসী মানুষের নানা ধরনের সঙ্কটকে। সেই সঙ্কট যেমন অর্থনৈতিক তেমনি সাংস্কৃতিক। সবচেয়ে বড় কথা তা আত্মপরিচয়েরও এক বড় সংকট। এই উপন্যাসে আমরা দেখি মিস্টার বিশ্বাসের বাবার মৃত্যুর পর কীভাবে প্রতিবেশীদের লোভাতুর দৃষ্টি এই অভিবাসী পরিবারের জমি বাড়ির ওপর এসে পড়ে, তাদের নানাভাবে জর্জরিত করে তোলে এবং শেষমেষ বাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য করে। এরপর বাকী আখ্যানের একটা বড় অংশ জুড়ে মিস্টার বিশ্বাসকে আমরা নিজের একটি জমি ও বাড়ির জন্য নিবিষ্ট হয়ে থাকতে দেখি। কিন্তু সে বাড়ি আর বানানো হয় না, একবার অনেকটা তৈরি বাড়ি ভেঙে যায় পারিবারিক দুর্যোগে। শেষমেষ শেষ জীবনে জামাইয়ের থেকে টাকা ধার করে বিশ্বাস একটা বাড়ির মালিক হন ঠিকই, কিন্তু সেটা একটা কেনা বাড়ি। নিজের বাড়ি আর তার বানানো হয় না।

চাকরীর দিক থেকেও বিশ্বাস কখনো থিতু হতে পারেন নি। বাড়ি বা জীবিকার পাশাপাশি তাকে আর একটা সংকট বয়ে বেড়াতে হয়েছে। তার ছেলেবেলায় দু ধরনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন। প্রথমে ইউরোপীয় শিক্ষা সংস্কৃতি, সেই শিক্ষা শেষে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণের কাছে ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি। সনাতন ভারতীয় হিন্দু আদর্শের অনেক প্রাচীনতাকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। এই জন্যই মা, স্ত্রী বা যে শ্বশুরবাড়িতে তিনি থাকতেন – সেখানকার সাথে তিনি মানিয়ে নিতে পারেন নি। আবার ঔপনিবেশি ইউরোপীয় সংস্কৃতিও তার আপনার হয়ে ওঠে নি।
অভিবাসী মানুষের এই সংকটকে নইপাল বারেবারে ফিরিয়ে আনেন। এ বেন্ড অব দ্য রিভার (১৯৭৯) উপন্যাসেও এটা আমরা দেখতে পাই। এই কাহিনীটির পটভূমি আফ্রিকার একটি সদ্য স্বাধীন দেশে স্থাপণ করেছেন নইপাল, কিন্তু মধ্য আফ্রিকার দেশ এই সাধারণ পরিচয়ের বাইরে তাকে নির্দিষ্ট করেন নি। এই আখ্যানের নায়কও একজন অভিবাসী ভারতীয় সেলিম। সে আফ্রিকার শহরে এসে নিজের ব্যবসা শুরু করে। সেলিম ছিল ইংরাজী জানা মানুষ। এইজন্য দোকান চালানোর ফাঁকে তার ওপর ভার পড়ে এক স্থানীয় ছেলেকে ইংরাজী শেখানোর। সদ্য স্বাধীন দেশটি দ্রুতই এক রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মুখোমুখি হয় এবং সেলিম কিছুদিনের জন্য লন্ডনে চলে যান। ফিরে এসে দেখেন তার দোকানটি বাজেয়াপ্ত হয়েছে সরকারের দ্বারা এবং সেখানেই তিনি ম্যানেজার হিসেবে বহাল হন। অতিরিক্ত অর্থের আশায় নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে তার জেল হয়। স্থানীয় কর্তাব্যক্তির সাহায্যে শেষমেষ সেলিম দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। উপন্যাসের শুরুতে যেরকম এক অনিশ্চিত জীবন থেকে থিতু হবার লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, সেই অনিশ্চিত জীবনেই তিনি আবার ফিরে যেতে বাধ্য হন।

১৯৭১ সালে লেখা নইপালের ‘ইন এ ফ্রি স্টেট’ বুকার পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল। এটি তিনটি কাহিনীর সমষ্টি। একটি মূল কাহিনীর পাশেই আছে দুটি ছোট কাহিনী। প্রথম গল্পটি বোম্বে থেকে আমেরিকায় এসে পড়া এক চাকরের গল্প। কীভাবে সে নানা অর্থসঙ্কট এবং বে আইনী বসবাসের আতঙ্কে ক্রমশ ডুবে যায় তার আখ্যান। দ্বিতীয় আখ্যানটিতে রয়েছে গ্রামীণ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে কানাডা ও ইংলণ্ডে অভিবাসী হওয়া এক পরিবারের নানা অভিজ্ঞতার কথা। তৃতীয় তথা মূল কাহিনীটি একটি অনামা আফ্রিকান দেশের পটভূমিতে রচিত, যেটি সদ্য স্বাধীন হয়েছে। সেখানকার রাজাকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার একটা পর্বের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ববি ও লিন্ডার নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যান নইপাল। বলা বাহুল্য সে আখ্যানও সুস্থিত কোনও জীবনের নয়, নইপালের আখ্যানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য মেনে নানাভাবে জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল।

নইপালের লেখক সত্তার শক্তি নিয়ে নিঃসন্দেহ হয়েও তাঁর বিভিন্ন ধারণা সম্পর্কে প্রচুর সমালোচনা হয়। ২০০১ সালে এক সাক্ষাৎকারে নাইপল বলেছিলেন, ‘এক প্যারা পড়েই তিনি বলে দিতে পারেন, লেখক পুরুষ না নারী’ “মেয়েরা আবেগপ্রবণ,তাদের লেখালেখিতেও সেই সঙ্কীর্ণ চিন্তাধারা।ফলে জেন অস্টেন থেকে কেউই সাহিত্যিক হিসাবে প্রথম শ্রেণির নন”। তাঁর ওই মন্তব্যে স্বাভাবিক কারণেই তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে চিনুয়া আচিবে বা এডওয়ার্ড সইদ থেকে শুরু করে অনেকেই প্রচণ্ড সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। মনে করা হয়েছে ভারত,আফ্রিকা বা ত্রিনিদাদে তিনি কখনও ভালো কিছু দেখেননি। তার চাঁছাছোলা ভাষার কর্কশ বর্ণনায় তৃতীয় বিশ্ব চিত্রিত হয়েছে বিভৎস ভূখণ্ড হিসেবে। পূর্বপুরুষের দেশ ভারত নিয়ে ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ (১৯৬৪) এ তিনি লিখেছিলেন এখানে লোকে সর্বত্র মলত্যাগ করে। রেললাইনের ধারে,মাঠের ধারে,রাস্তার ধারে,নদীর ধারে,সমুদ্রতীরে -কোত্থাও বাকি রাখে না’। আর এক জায়গায় লিখেছেন, “অমুক লোকটা খারাপ। শুধু বাঙালি আর ক্রিমিনালদের সঙ্গে মেশে”। আফ্রিকা সম্পর্কে বলেছেন, “ঠিক-ভুলের কোনও ব্যাপার নয়। ঠিক ব্যাপারটাই এখানে নেই”।

ইসলাম নিয়ে তাঁর মন্তব্যের জন্যে অনেকেই তাঁকে ইসলামোফোবিক বলে সমালোচনা করেছেন। 
ইরান,ইরাক থেকে পাকিস্তান,ইন্দোনেশিয়া,মালয়েশিয়া ঘুরে সেখানকার মুসলিম জনজীবন নিয়ে দুটি বই লেখেন তিনি। ‘অ্যামং বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি’ (১৯৮১) এবং ‘বিয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকার্শনস অ্যামং দ্য কনভার্টেড পিপলস’ (১৯৮৮)। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “ইসলাম আসলে ঔপনিবেশিকতার চেয়েও খারাপ। ইসলাম ধর্ম মেনে নেওয়া মানে সেই জাতিগোষ্ঠী নিজের অতীত অস্বীকার করছে। ইতিহাসকে অস্বীকার করছে। এ যেন বলা,আমার পূর্বপুরুষের কোনও সংস্কৃতি ছিল না”।

যে ত্রিনিদাদে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তার মধ্যেও তেমন ইতিবাচক কিছু খুঁজে পান নি নইপাল। ১৯৫০ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ত্রিনিদাদ ছেড়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়তে যান অক্সফোর্ডে। এরপর সেখানেই থেকে গিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বময়। কিন্তু কোথাও নিজেকে খুঁজে নিতে পারেননি। নিজেই নিজেকে বর্ণনা করেছেন একজন শেকড়হীন মানুষ হিসেবে। বলেছেন,তিনি তার লেখাগুলোর সমষ্টিমাত্র।বিভিন্ন প্রশ্নে ন্যায্য সমালোচনার পরেও সাহিত্যিক হিসেবে এই নোবেল জয়ীর মূল কৃতিত্ব অভিবাসী মানুষের শিকড়হীনতা ও অস্তিত্বের সঙ্কটকে, পরিচিতির সঙ্কটকে নানাভাবে অবিস্মরণীয় দক্ষতায় লেখায় তুলে আনতে পারা। 
১৯৩২ এর অগস্টে তাঁর জন্ম। জন্মদিন ১৭ অগস্টের ছদিন আগে ২০১৮ সালের ১১ অগস্ট চলে গেলেন বিতর্কিত শক্তিশালী ভারতীয় বংশদ্ভূত কথাকার বিদ্যাধর সূরজপ্রসাদ নইপাল।

‘অন বিয়িং এ রাইটার’ শিরোনামে লেখা এক প্রবন্ধে (১৯৮৩) নইপাল তাঁর নিজের লেখালেখি প্রসঙ্গে অনেক সূত্র তুলে দিয়েছেন। পরিশেষে সেটা স্মরণ করা যাক। 
“একখানে বসে একটা বই লিখে ফেলার ব্যাপারটা আমার কাছে হঠাৎ খুব মেকি মনে হতো। আজ এত বছর পরেও সেই অনুভূতিটা আমাকে কখনও আচ্ছন্ন করে রাখে, আমি যখন একটা লেখা শুরু করি— তার মানেই হলো আমি কিছু সাজানো আর বানানো কাজের ব্যাপারে ভাবছি। মাথায় সব সময় কোনো নির্দিষ্ট কাহিনি বা ঘটনা থাকে না। আবার বলতে গেলে মাথায় অনেক কিছুই হয়ত থাকে; তেমন কিছু না ভেবেই আমি সম্পূর্ণ কল্পনা থেকে কোনো কাহিনির শুরুটা লিখে ফেলি; লিখতে থাকি যতক্ষণ কোনো গন্তব্য না পাই— সেই সাজানো ঘটনার ভেতর দিয়ে এগোতে থাকি— একসময় সেটা আমাকে ঘায়েল করে ফেলে, আর তারপর আমার সারা জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতায় আমি অজানার উদ্দেশে রওনা দেই। আর এখনও এটাই সবচেয়ে রহস্যময়— সাজানো, বানানো, কৃত্রিম কতগুলো বিষয়কে আশ্রয় করে একজনকে তার আত্মার, হৃদয়ের আর স্মৃতি ভাণ্ডারের গভীরতম অনুভূতি খুঁজে বের করতে হবে এবং তাকে স্পর্শও করতে হবে।
সাহিত্যের সবরকম ক্ষেত্রই আসলে কৃত্রিম, আর সেগুলো ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে, বদলায় সংস্কৃতির নতুন ধারা আর আমেজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে। ধরা যাক, সাহিত্য বোদ্ধা একজন মানুষ একটি মঞ্চনাটক লিখবে বলে ভাবল; তাকে তখন কিছু কল্পনা সাজাতে হবে যেটা বলতে গেলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না— কাহিনিটা বিভিন্ন দৃশ্যে আর ছোট ছোট পালায় ভাগ করে নিতে হবে; হয়তো সাদা কাগজে একের পর এক লাইন লিখে যেতে হবে না, কিন্তু অভিনেতার কাছে স্পষ্ট করে তুলতে পালার একেকটা অংশ বর্ণনা করতে হবে ঠিকই। মঞ্চনাটক লিখেছেন, এমন একজনের কাছে জেনেছি, নাটকের দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজাতে গিয়ে তিনি নিজেকে সেই নাটকের সামনের সারিতে বসা একজন দর্শক হিসেবে কল্পনা করেন।

আগেকার দিনে যখন রেডিও বা রেকর্ড ছিল না, ছাপানো কাগজ যে যুগে রাজত্ব করত, তখন কেউ চাইলে একটা কাহিনিকে এমনভাবে সাজাতে পারত যেন সেটি অনেকগুলো ভাগে ভাগ হয়ে যায় আর মাসের পর মাস ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, এভাবে ভল্যিউমের পর ভল্যিউম হয়ে যেত। তারও আগে, লেখা হয়েছিল গীতিকবিতা অথবা গীতিনাট্য, কখনও ছন্দ মেলানো, কখনও আবার ছন্দবিহীন; এমনকি গীতিমহাকাব্যও।

এর সবকিছুই এখন আমাদের চোখে কৃত্রিম, কিন্তু আজকের আধুনিক উপন্যাসকে যেমন পাঠকের কাছে বাস্তব বলে মনে হয়, সে সময়ে গীতিনাট্যকেও দর্শকের কাছে তেমনই বাস্তব মনে হতো। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসমাত্রই কৃত্রিম, কৃত্রিম তার কাহিনির সরলতা কিংবা জটিলতায়, বানানো দৃশ্যকল্পে, সাধারণ জীবনযাপনের ছন্দে কোনো সংকট এবং তার থেকে উত্থানের ধারাবাহিক বর্ণনায়। আমি আসলে খুব সরাসরি বলতে চাচ্ছি যে, এই কৃত্রিমতার অনুভূতি লেখালেখির শুরু থেকেই আমার ভেতরে কাজ করত, যখন আমি লিখতে শুরু করতাম, ভাবতাম আমার জীবনের অভিজ্ঞতার কোন অংশকে সেই লেখার আওতায় কী করে ফেলা যায়— বলতে গেলে, নিজের স্মৃতির ভেতরে পাগলের মতো হাতড়ে বেড়াতাম, পইপই করে খুঁজতাম কী করে সাহিত্যের ওই ক্ষেত্রটিতে সাজানো ঘটনার আবহে আমার অর্জিত কোনো অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দিতে পারি।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রূপে বিন্যাস বা নির্মাণের প্রয়োজন: অভিজ্ঞতাকে সেখানে মিশিয়ে দিতে হবে সাবলীলভাবে, যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কিছু কিছু নির্মাণের ক্ষেত্রে, যেমন— কাপড়চোপড়ের ফ্যাশনের ক্ষেত্রে এই কৃত্রিমতার ব্যাপারটা মাঝে মধ্যে চরমে পৌঁছায়। আর তখন সেখানে নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিফলনে তাকে আরও তীক্ষ্ণ করার পরিবর্তে অনেক বেশি কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়, গাঁজাখুরি কল্পনার ভারে বিষয়টি তখন হয়ে দাঁড়ায় একটা বোঝার মতো। ট্রলোপ (ইংরেজ ঔপন্যাসিক অ্যান্থনি ট্রলোপ —অনুবাদক) যেমন কাল্পনিক একটা পরিস্থিতির অবতারণা করতেন— তিনি ছিলেন রীতিমতো একজন সমাজ গবেষক, সমাজ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল প্রখর, বলা যেতে পারে সেই জ্ঞানের গভীরতা ছিল ডিকেন্সের (ইংরেজ লেখক চার্লস ডিকেন্স —অনুবাদক) চেয়েও বেশি, যেন এক মোহিনী শক্তি। অথচ ট্রলোপ, যিনি কিনা অকল্পনীয় পরিস্থিতি তৈরি করতেন, তাকে নিয়ে আমার এক ধরনের সমস্যা আছে, তার লেখার প্রারম্ভিক কয়েকটি পাতায় যে সামাজিক চিন্তা এবং দার্শনিক মতামতের পরিচয় পাওয়া যায়, তার সাথে মিলিয়ে পরে উদ্ভূত সেই জটিল পরিস্থিতির জট ধীরে ধীরে খোলা সহজ নয়। ঠাকরের (ভারতীয় বংশদ্ভূত ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিক উইলিয়াম ঠাকরে —অনুবাদক) লেখার বিষয়েও আমার একই কথা বলার আছে— পড়তে পড়তে এগোতে থাকলে মনে হয় বাচনভঙ্গিটি টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা আর প্লটের জটিলতা যেন তার ঘাড়ে আলগা বোঝার মতো চেপে বসেছে।
বর্ণনামূলক সাহিত্য থেকে আনন্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিগত প্রায় একশ' বছরে আমাদের রুচির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গত শতাব্দীর সমস্ত সাহিত্য, সিনেমা আর টেলিভিশনে প্রচারিত সব অনুষ্ঠান আমাদের রুচির পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। আজ এ কথা অনায়াসে বলতে পারি যে, উনিশ শতকের ইংরেজি ভাষার যেসব ঔপন্যাসিকেরা আমাকে উপন্যাস পড়ার প্রকৃত আনন্দ দেয়— যখন তাদের লেখার জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে মানুষের জীবন দেখা যায়, মানুষের সেই প্রতিকৃতি আমাকে উৎসাহিত করে— তবে দুঃখের বিষয় হলো, তাদের নিজেদের সময়ে সেই লেখকদের আদৌ ঔপন্যাসিক হিসেবে ভাবা হয়নি।”


পরিচিতি
সৌভিক ঘোষাল - 
ভাষা সাহিত্যের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। নিবাস কোলকাতায়। মার্কসবাদী মতাদর্শে আস্থাশীল। লেখালেখি মূলত সাহিত্য সংস্কৃতি ইতিহাস রাজনীতি নিয়ে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ওয়েব ম্যাগাজিনে লেখালেখির সাথে যুক্ত গত দু দশক ধরে, সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য পড়ার সময় থেকেই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন