রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

মানুষ আর নিসর্গের উপাখ্যান : শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ঈশ্বরীতলার রূপোকথা

লীনা দিলরুবা

"লেখক কোন অভিজ্ঞতার ভিতরে থেকে লিখতে পারে না। সে বেরিয়ে আসে অভিজ্ঞতা থেকে বা অভিজ্ঞতাই তাকে অভিজ্ঞতার বাইরে ঠেলে দেয়।" কথাটি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের, যিনি ফিকশনে আগ্রহ হারিয়ে, বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলার প্রতি অনেকটা বিতশ্রদ্ধ হয়েই ডকুমেন্টশনকেই চূড়ান্ত উপন্যাস বলে রায় দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, উপন্যাসের খসড়া হবে পুরোপুরি ডকুমেন্টশন, এটি দাঁড়িয়ে গেলে কল্পনাকে এর ভেতর ঠেসে ঢুকাতে হবে, এটিই দ্য ক্রিয়েটিভ প্রসেস অফ এডিটিং।

সারাজীবনই নিজের জীবনের কাহিনীকে নানান চরিত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্টরূপে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সন্দীপনের মতো একেবারে ডকুমেন্টশন নয়, বরং অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে কাহিনীর মঞ্চ রূপায়নেই তাঁর অধিক মনোযোগ ছিল, তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন আরো মস্তবড় আয়োজন। নিজের জীবনের গল্প নয়, বরং গল্প বলার জন্য নিজেকে চরিত্র বানিয়ে তাতে অভিনয় করার একধরনের পশ্চিমা সংস্কৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে তিনি তাঁর জীবনযাপনের প্রণালীই পালটে দিয়েছিলেন। ষাটের দশকের গোড়ায় কলকাতা ছেড়ে একেবারে দূরে, নগরের বাইরে গ্রামীণ পরিবেশে, চম্পাহাটি নামক একটি পাণ্ডব বর্জিত জায়গায় সপরিবারে বসত গড়েছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। যদি প্রশ্ন করি, কী উদ্দেশ্য ছিল এই স্থান পরিবর্তনের? নাগরিক জীবনে বিরক্ত একজন লেখকের সিনিক বিউটি দর্শন? উদ্দেশ্য আরো বৃহৎ, কিছু চরিত্র দাঁড় করাবার স্বপ্ন। গল্প-উপন্যাসের প্লট পাবার আগ্রহ। আশপাশ দেখে সেসব কিছু নিয়ে লেখবার দূর্ণিবার ইচ্ছে। চম্পাহাটি থেকে তাঁর গল্প-উপন্যাসের বহু চরিত্রের জন্ম হয়েছে। চম্পাহাটিতে বসেই লেখা হয়েছিল 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস "কুবেরের বিষয় আশয়", যেটি তাঁকে পাঠকমহলে আলোচিত করেছিল। আলোকিত করেছিল তাঁর লেখক জীবনকে। চম্পাহাটি এসেছে তাঁর আরেকটি সুবিখ্যাত উপন্যাস "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা"তেও। "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা"র ভৌগলিক পরিচয় নির্ণিত করতে হলে প্রথমেই বলতে হয়, যাহাই চম্পাহাটি, তাহাই উপন্যাসের ঈশ্বরীতলা, যদিও চম্পাহাটির অস্তিত্ব ভারতের মানচিত্রে থাকলেও, ঈশ্বরীতলার নেই। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলম জন্ম দিয়েছে ঈশ্বরীতলার। চম্পাহাটির ডকুমেন্টশনের দ্য ক্রিয়েটিভ প্রসেস অফ এডিটিং হল ঈশ্বরীতলা। প্রধান চরিত্র অনাথবন্ধুর ভেতর ঢুকে পড়েছেন লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় স্বয়ং। চম্পাহাটির পর্বও এক সময় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনে ফুরিয়েছিল। আবার তিনি সপরিবারে থিতু হয়েছিলেন কলকাতায়। কিন্তু পরবর্তীতেও তাঁর লেখা থেকে চম্পাহাটির প্রস্থান ঘটেনি। 'চন্দনেশ্বরের মাচানতলায়', 'কন্দর্প' ... যখনই গ্রামজীবনের কথা লেখায় আসতে চেয়েছে, চম্পাহাটি পায়ে-পায়ে এগিয়ে এসেছে। 

ঈশ্বরীতলার সঙ্গে 'রূপোকথা' কেন? শব্দদুটির জোড়তো যুগপৎভাবে বাস্তব আর অবাস্তব জগতের। বাস্তবতা আর কুহকের মধ্যে কোনোটিকে গ্রহণ এবং অন্যটিকে বর্জন করার মাধ্যমে পাঠকরা যে-যার মত করে স্বাধীনতা খুঁজে নেবে- নাম নির্বাচনে লেখকের মনে এই সুপ্ত ইচ্ছেই কী লুকিয়ে ছিল? ঈশ্বরীতলার 'উপকথা' নয় 'রূপোকথা।' প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি একটা রূপকথার রাজ্যে পাঠককে ভ্রমণ করিয়েছেন। যেখানে উপকথাও যে ছিল না তা নয়। বস্তুত পক্ষে, কল্পনা আর জীবনবাস্তবের মিশেলে এক আশ্চর্য পরিভ্রমণ "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা।" তাঁর জীবনীগ্রন্থ নিংড়ে উপন্যাসের কাহিনীর বর্ণনা করলে বেশ কিছু মিলও পাওয়া যায়। তিনি যখন কলকাতা ছেড়ে চম্পাহাটি যান তখনকার সময়, তাঁর পরিবারের ক্রিয়া-কর্তব্য অনেককিছুই মিলে যাবার বিষয় চোখে পড়ে। বইটি নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য সেই মিল খোঁজা নয়, বরং উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর পরিধি অনুধাবন, নানান চরিত্র এবং ঘটনার বিপরীতে লেখকের পর্যবেক্ষণের প্রতি দৃষ্টিপাত, লেখক হিসেবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের নৈপুণ্যর দিকে ফিরে তাকানো, উপন্যাস হিসেবে 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'র বিশেষত্ব উন্মোচন, সর্বোপরি একজন শিল্পী হিসেবে লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন করার স্পর্ধা দেখানোই আমাদের উদ্দেশ্য।
অনাথবন্ধু বসু কলকাতা শহরে চাকরি করেন। আয়-রোজগার নেহায়েত মন্দ নয়। তার স্ত্রীর নাম- শান্তা, তাদের দুটি কন্যা, একজনার নাম টুকু অন্যজন লিলি। তিনি কলকাতা ছেড়ে প্রায় গ্রাম মতন এলাকা ঈশ্বরীতলায় বসত গড়েছেন, এখান থেকেই তিনি কলকাতায় ট্রেনে করে ডে'লি প্যাসেঞ্জারি করেন। সকালে ঈশ্বরীতলা থেকে কলকাতায় যান আবার বিকেলে অফিস সেরে ট্রেনে করেই ঈশ্বরীতলায় ফেরেন। অনাথবন্ধু নির্বিবাদী মানুষ। কারো ধারে-পাছে নেই। গ্রামের লোকজন অধিকাংশই খেটে-খাওয়া মানুষ, মূলত চাষী। এদের মধ্যে সম্প্রীতি তেমন নেই। অনাথবন্ধু উদার মানসিকতার মানুষ। ঠেকায় পড়ে কারো কিছু বিক্রি করতে হলে তারা অনাথবন্ধুর দারস্থ হয়, অনাথ এসবক্ষেত্রে হাতখোলা, যদিও তার স্ত্রী শান্তা এসব খুব একটা পছন্দ করেন না। স্ত্রীর চোখে এটি অনাথের বদ-অভ্যাস, আরও একটি বদ-অভ্যাস রয়েছে, সেটি অনাথের তাড়ি খাওয়া। সময়ে-অসময়ে অনাথ তাড়ি খায় আর স্ত্রী'র বকুনীর শিকার হয়। নির্বিবাদী অনাথ এসবক্ষেত্রে চুপই থাকে। এখানে, এই ঈশ্বরীতলায় অনাথের পরিবারে গৃহকর্মী মদন আর বদনের আশ্রয় মেলে। আশ্রয় মেলে উমা নামের একটি গরুর- যেটিকে অনাথ স্ত্রীর অমতে ক্রয় করে, গরুর বাছুর কানাই, আশ্রয় মেলে কুকুর বাঘার। পারিবারিক সদস্যদের মতো ছাগল শুক্লা, পাতিহাঁস, লংহর্ণ মুরগিদেরও স্থান হয় অনাথের পরিবারে। তাদের প্রত্যেকের নামকরণ হয়। পারিবারিক ফটোশ্যুটেও তার পশু-পাখিরা অংশ নেয়। অনাথের স্ত্রী শান্তা, কন্যারা এবং মদন-বদন যেমন অনাথের প্রশ্রয় পায়, এসব পশুপাখিও এর ব্যতিক্রম নয়। অনাথ এদের সঙ্গে কথা বলে, নিজের মতো করে অনাথ সংলাপ-প্রতি সংলাপে সময় কাটায়। অনাথ প্রকৃতিপ্রেমী। শুধু গাছ-পালা পরিদর্শনেই তার প্রেম সীমাবদ্ধ থাকে না, অনাথের কাছে অন্য অনুভবেও তারা ধরা দেয়। অনাথ বাতাসের চলাচল, হাওয়ার কানাকানি শুনতে পায়। ঈশ্বরীতলার আশ্রয়ে অনাথ যেন ধীরে ধীরে প্রকৃতির সন্তান হয়ে যায়। 

উপন্যাস থেকে লেখকের প্রকৃতির দেখার এবং তার সাথে সম্পর্কিত মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে পশুপাখিদের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করার শক্তির নমুনা হিসেবে পর পর দুটো উদাহরণ দিচ্ছি:

'অনাথ বেলাবেলি বাড়ি ফিরে দেখে-দিনের বেলা এই লাল সুরকির পথ অন্য রকমের। এ সময় ঈশ্বরীতলার ওপর দিয়ে সম্ভবত নিরক্ষরীয় বায়ু বয়ে যায়। ওই বায়ু বোধ হয় কোনো লেখাপড়া শেখেনি। কেননা খালপাড়ের গাছগুলোর ডালপালা পাতাসুদ্ধ এই বাতাসে ওলট পালট খাচ্ছে। গুচ্ছের গাইবাছুর বাদা থেকে ঘরে ফিরছে। বাঘার পাহারায় পাতিহাঁস আটটি খালের জলে বিকেলের শেষ স্নান সারতে ব্যস্ত। কোথাও কোনো নাগরিক জিনিসের ছায়া পর্যন্ত দেখতে পেল না অনাথ। আজ পূর্নিমা হতে পারে। চন্দনশেবর মৌজা পেরিয়ে দূরের ধোঁয়াটে জায়গায় ওপরকার আকাশে এরই ভেতর চাঁদের একটা আউটলাইন ফুটে উঠল। ভালো জ্যোৎস্না পেলে ঈশ্বরীতলার এদিকটা একদম বুনোপরী হয়ে যায়।' 

'পরদিন সকালেও বৃষ্টি গেল না। বাতাসে ঠাণ্ডার ছাট। আকাশ ঘোরাল। পেটব্যথার ভান করে লিলি বিছানায় মটকা মেরে পড়ে আছে। স্কুলের টাইম পেরোলেই সিংহী হবে। টুকু বলাইয়ের পাশে পুকুরঘাটে বসে পাতিহাঁসদের ঝিনুক ভেঙে খাওয়ানো দেখছিল। বলাই এ কাজটা খুব ভালো পারে। এভাবে খাওয়ালে ওরা বয়স না হতেই ডিম দিতে শুরু করে। উমা কানাইকে নিয়ে পাশাপাশি বসে ঘুমোচ্ছিল। অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে ওরা। গোবর সরিয়ে নেওয়ার জায়গাটা তকতক করছে। কারণ ঘাস চেঁছে দেওয়ায় গোবরের প্রলেপ একদম নিকোনো লাগছে।'

বিভুতিভূষণের গল্প-উপন্যাসে প্রকৃতি বর্ণনায় এবং মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক প্রকাশে যে ভাবলোকের আশ্রয় নেয়া হত এখানেও তার নমুনা দেখা যাচ্ছে। 

অনাথকে ঘিরে বিভিন্ন চরিত্র এবং গ্রামের ছোট্ট-ছোট্ট ঘটনা উপন্যাসে আনাগোনা করে। পুরো উপন্যাস জুড়ে শ্যামল সম্পর্কদের একে-অন্যের সঙ্গে জড়িয়েছেন, ছাড়িয়েছেন। খুন করিয়েছেন, আত্মহত্যা করিয়েছেন, রেখেছেন ধোঁয়াশার মধ্যেও। প্রচণ্ড জটিলতায় আক্রান্ত সম্পর্কিত মানুষগুলোর মধ্যে আশার বাতি ঝুলিয়ে রেখেছেন। 

প্রধান চরিত্রদের মধ্যে মদন-বদন অন্যতম, যারা অনাথের বাড়িতে গৃহকর্মের পাশাপাশি মাছ শিকার করে। মদন-বদনের পরিবারের সদস্যরা, যারা অতোটা স্পষ্ট বা মূখ্য চরিত্র নয় কিন্তু এদেরই একজন উপন্যাসের সম্প্রসারিত কাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রূপে দেখা দেয়, তার নাম ওষ্ট। মদন-বদনের ছোটবোন। গ্রামে গরিব পরিবারে পণের জন্য বিবাহ হয় না অনেক মেয়ের। শ্যামল ওষ্টের মাধ্যমে এরকম একটি নিরীহ মেয়েকে চিত্রিত করেন। ওষ্টের স্বামীর নাম বংশী। সুখী অনাথের ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের সঙ্গে যার সৌভাগ্য হাত বদল হয়। গ্রামে বসবাস করে ইলেকশন-পলিটিক্স নিয়ে সদা ব্যস্ত দক্ষিণা চক্রবর্তী। ডাকাত সন্তোষ টাকী। এক অদ্ভুত চরিত্র মহম্মদ বাজিকর। যে অনেকটা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে ঘটতে থাকে অসংখ্য ঘটনা। অনাথ সবই দেখে, অভিজ্ঞ হয়, কিন্তু সে কী এসবের মধ্যে থাকে? অনুভব ছাড়া যখন অভিজ্ঞতার কোনো স্থায়ীত্ব থাকে না, তখন অনাথ তার নিজস্ব অনুভব নিয়েই তাকে ঘিরে ঘটমান কিংবা তার সঙ্গে সম্পর্কিত, সম্পর্কিত-নয়, সমস্ত কিছুর ভাবনায়ই নিমজ্জ্বিত থাকে। 

শহর ছেড়ে গ্রামে বসবাস করতে করতে অনাথ অনুভব করে, তার ভেতরে অনেককিছুরই গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। গ্রাম তাকে যেন ক্রমাগত সরল করেছে। অনাথ বলে:

'আমি কি ছাড়তে শিখেছি? নিজেকে প্রশ্ন করল অনাথ। আগে অনাথ অফিসে প্রোমোশন, স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। মনে কষ্ট পেয়েছে। অনেক কিছুই ঘোর অবিচার বলে মনে হয়েছে। মনটা এক রকমের বিষাদের চাপে কালো হয়ে উঠত। সে তো অনেকদিন অঅগেকার কথা। তারপর সে আস্তে এস্ত আকাশের রঙ চেনে ঈশ্বরীতলায় এসে। ছুটন্ত বৃষ্টিকে দৌড়ে আসতে সে এখানেই দেখে। দেখে দেখে আর ফুরোয় না। ভগবানের নিজের এই ফুটবলার সারা গায়ে গাছপালা, মানুষ দিয়ে তৈরি এত লেসের কাজ। ভাবা যায় না। কত ডিজাইন।' 

এই সারল্যই তাকে বৃহত্তর চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। অনাথ ঝুঁকে পড়ে অনেকটা সাম্যবাদী চেতনার দিকে। সাম্যবাদ, মানে সমাজতন্ত্রেরও বৃহত্তর স্বরূপের দিকে। স্বাধীন নয়, সামাজিকভাবে অসচেতন ঈশ্বরীতলার শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে অনেকটা সামাজিক কল্যাণের চিন্তায় অনাথ নেমে পড়ে কৃষিকাজে। সবার জমিতে যৌথ চাষের সেই স্বপ্ন একদিন সত্যিও হয়ে ওঠে। কৃষকদের কল্যাণের চিন্তার এই সারল্য যদিও নানান কার্যকারণে শেষ পর্যন্ত অনাথের চূড়ান্ত সর্বনাশ ডেকে আনে।

এই চূড়ান্ত ঘটনাই উপন্যাসটিকে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারত। কিন্তু লেখক এর পরেও এগিয়ে যান। অনাথ প্রত্যক্ষ করে তার একটি একটি পশু-পাখি তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পশু-পাখির পথ অনুসরণ করে একসময় দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্গী গৃহকর্মীরাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। কৃষিকাজ করতে গিয়ে ব্যাংকের কাছে তার বাড়িটি বন্ধক ছিল, একটা সময় সেটিও হাত ছাড়া হবার উপক্রম হয়। অনাথ ধারে চলতে শুরু করে। সেই থেকে তার পারিবারিক বৈরাগ্যের শুরু। 

'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'য় অনাথের মাধ্যমে একটি জনসমাজের মধ্যে সাম্যবাদী চিন্তার অনুপ্রবেশ আমরা দেখতে পাই। একই সঙ্গে দেখি, সর্বহারা শ্রেণির পূর্ণাঙ্গ মতাদর্শের চিন্তা এবং একটা নতুন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সম্পূর্ণ, প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও যুক্তিসংগত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর প্রবেশ করার সাহসী পদক্ষেপ লেখক হিসেবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'র মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রায় পৌছে দেয়। 

গ্রামীণ জীবন, অবক্ষয়, ভালোবাসা, ত্যাগ, ঘৃণা, হিংসা, সুখ আর ব্যর্থতার উপাখ্যানই হয়ত 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা', কিন্তু উপন্যাসটি বিশেষ হয়েছে তখনই, যখন লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কাহিনী নির্মাণে আঞ্চলিকতার রূপকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগোত্রীয় হয়ে যান। তখন তিনি প্রকৃতিতে নিমগ্ন, আত্মমগ্ন। লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে ভিন্ন ভঙ্গিতে আবিষ্কার পাঠকের কাছে শিল্পরূপের নান্দনিক প্রাপ্তি। 





লেখক পরিচিতি
লীনা দিলরুবা
প্রবন্ধকার। অনুবাদক। জীবনানন্দ গবেষক।
ঢাকায় থাকেন। 

২টি মন্তব্য: