রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

শ্যামল তর্পণ : বাজার থেকে তুলে আনা জীবন

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য

প্রতিটি নতুন সকালে , পৃথিবীর মতোই , আমাদের শরীরটাও , তার ভিতরে সবে জন্মানো কোষগুলো নিয়ে একেবারে টাটকা লতা হয়ে জেগে ওঠে৷ অন্ধকার আকাশ থেকে টুপ করে বেরিয়ে আসে খোসা ছাড়ানো আলো৷ তখন দেখা যায় , সুন্দর করে সাজানো এই পৃথিবীতে নতুন বাতাসের ঝাপটা গায়ে লাগাতে লাগাতে গাছপালা মাঠঘাট লতাগুল্ম আগেরদিনের মতোই একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিজেদের জায়গায়৷ তাদের মাথার উপর পরিষ্কার একটি রোদ্দুর৷
সেই রোদ্দুরের কয়েকটা ফালি কাত হয়ে জানলা কিংবা ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে পড়ে আমাদের কারও কারও ঘরে৷ এই সময় নিজের ঘরের জানলা দিয়ে দৃষ্টিটা বাইরে ফেলে দিলেই তোমার অতীত তোমার ভবিষ্যত মিলিয়ে একেবারে অনেকটা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়৷ ওই সময় হয়তো কেউ চিনি ছাড়া লাল চা খাচ্ছে৷ কেউ হয়তো গত রাতের জমে যাওয়া দোষ লিভার থেকে আয়ুর্বেদিক উপায়ে মোছার জন্য জল দিয়ে প্রাণপণে চিবোচ্ছে এক কোয়া রসুন৷ কেউ দাঁতের ফাঁকে দু’দিন ধরে আটকে থাকা খাসির ফাইবার খুঁচিয়ে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ সবাইকে একটু একটু করে ছুঁয়ে দিয়েই সেই নিরাপদ রোদ্দুরটি চলে গিয়েছে বাজারের দিকে৷ সেখানে তখন সমস্ত হাবিজাবি কথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যযুগীয় তেজ ও শক্তি নিয়ে তোমার জন্য অমোঘ অপেক্ষা নিয়ে বসে আছে যারা , তাদের নাম --- নতুন আলু, সবে মাঠ ছেঁচে আনা পটল , বিভিন্ন শাক , কয়েকটি সুন্দর ডাঁটিওয়ালা মহত্ বেগুন , উদ্দাম যৌবন ও থিতিয়ে আসা জীবন নিয়ে ঝুড়ির ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ফুলকপি -বাঁধাকপি৷ আরও একটু এগিয়ে গেলে পুঁটি , মৌরলা , ট্যাংরা , পার্শে, কই, খলসে … আজকের দিনটি ভালো৷ থাউকো ধরে হিসাব হচ্ছে তাদের৷

সকালবেলার সমস্ত নিরাপদ রোদ্দুরই এ ভাবেই বাজারের দিকে চলে যায়৷ একটি ভরা শরীরের ঘাড়ে মাংসভর্তি মাথাটা সেট করে এই রোদ্দুর বরাবরই বিভিন্ন বাজারের দিকে হেঁটে গিয়েছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়৷ হাতে কয়েকটা বড়ো চটের ব্যাগ৷ পরনে কখনও লুঙ্গি কখনও পায়জামা৷ সময়টা বছর বিশেক আগে৷ তখন তাঁর বয়স ষাট পেরিয়েছে৷ দু’দিন দাড়ি না কামালে , তা সাদা চিনির দানা হয়ে গালে বসে যায়৷ তবু, শরীরের সুখ আর তৃন্তির গর্তগুলো টুবুটুবু৷

কারণ , আজ একটি নতুন দিন৷ আরেকটি নতুন বাজার৷ একটি নতুন আকাঙ্ক্ষাও বটে৷ যার ফলে , অন্ধকারে ইঁদুরের প্রখর জ্বলজ্বলে চোখ থেকে খুবলে তুলে আনা যায় জলপ্রপাতের গমগম শব্দ৷ যে শব্দ আমাদের কান থেকে সোজা হূদয়ে প্রবেশ করলে টের পাই , দলে দলে দৈবী পাগল মানুষ কেবল লিখতেই না , বাজার করতেও আসেন …‘যিনি খেতে জানেন --- তিনি সঠিক বাজার করতে জানেন৷ তার মানে বলতে চাই , আগে খেতে শিখুন , তারপরে বাজারে যান৷ তাহলে খুব সহজেই সঠিক বাজার করতে পারবেন৷ মহাজনেরা বলে থাকেন , শুধু খেতে জানলেই হবে না , ঘুমোতেও জানা চাই৷ সঠিক ঘুমের পর প্রসন্নচিত্তে রসনার সাধনা জমে ওঠে৷ আমার তো মনে হয় , আমাদের জীবন তিনভাগে ভাগ করা উচিত৷ গোড়াতেই সঠিক ঘুম৷ তারপর ঘুম থেকে উঠে খুব প্রসন্নচিত্তে ভাবতে হবে , আজ কি খাবো ? মনে মনে খাবার জিনিসগুলোর সুন্দর ছবি ভেবে নিয়ে বাজারে যাওয়া দরকার৷ যেতে যেতেও ওই ছবিগুলোর কথাই ভাবতে হবে৷ তখন বাজার আপনা -আপনিই একটা ছকে চলে আসবে …’ যে লেখা থেকে এই অংশটি তুলে দিলাম , তার আর একটি অংশও থাকুক এখানে৷ ‘বাজারের এক কোণে এক বুড়ি নিজে রোদে নেতিয়ে গেছেন৷ তাঁর বেচতে আনা ডুমুর এক কোণে ডাঁই হয়ে পড়ে আছে৷ একভাগা ডুমুরের দাম বুড়ি বললেন , এক টাকা৷ বুঝলাম , কাল থেকে বিশেষ বিক্রি হয়নি৷ বললাম - দু’ভাগা ডুমুর দাও গো৷

বুড়ি খুশিই হল৷ ডুমুরের কদর ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে৷ আর কদর দেখেছি ইংরেজি উপন্যাসে৷ বডে়া বডে়া লেখকদের লেখায় খাবারের বর্ণনা আর ফার্নিচারের বর্ণনা পাওয়া যায়৷ খাবারের বিরাট তালিকায় ডুমুরকে বারবার পেয়েছি৷ সেদ্ধ৷ ভাজা৷ মাংসের সঙ্গে ডুমুর মাখনে ডুবিয়ে ভিক্টোরিয়ান নায়ক -নায়িকারা দিব্যি খেতেন৷ নরেন্দ্রপুরে সত্য মহারাজার সঙ্গে খেতে বসে ওদের প্রাঙ্গণের নিজস্ব গাছের ডুমুরসেদ্ধ খেয়েছি৷ আর খেয়েছি অতি সুস্বাদু ডুমুরের ডালনা৷ গরম মশলা দিয়ে রান্না৷ গোবিন্দভোগ চালের সঙ্গে৷ গরম গরম …’ এই লেখার শিরোনাম --- খেতে জানলে বাজার করা সহজ৷ বইটি পড়তে পড়তে বোঝা যায় , বাজার নিয়ে লিখতে বসে , লেখক কেবল বাজারেই থেমে থাকেন না৷ বাজারের ইতিহাস , সেখানে আসা ক্রেতা , বিক্রেতা , আঁশবটি , মাছের ফেলে দেওয়া কানকো , শাকসবজির ঝুড়ি , সেই সবজিদের গায়ে লেগে থাকা ধুলো --- কোনও কিছুই তাঁর চোখ এড়ায় না৷ এক বিরাট ছাঁকনি নিয়ে কখনও টালিগঞ্জ , কখনও যাদবপুর , কখনও মানিকতলা , কখনও বরানগর --- বিভিন্ন বাজারের সামনে চওড়া ছাতিটি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি৷ তার পর , তার ভিতর কী যেন বুঝতে পেরে গিয়েছেন --- এই ভাবটি আভাসে , সঙ্কেতে সারা রচনায় চারিয়ে দিয়েছেন৷ সবকিছুর মধ্যে থেকেই আসলে ছেঁকে এনে ফেলেছেন জীবন৷ দুটো ইটের মাঝে চাপা পড়ে ছিন্ন , দীর্ণ হয়ে যাওয়া কমলালেবুর খোসাটিও সেই ছাঁকনির আওতায় পড়ে যাওয়া থেকে ছাড় পায়নি৷

‘পৃথিবীর পাঠশালায় ’ শিরোনামের লেখাটিতে তিনি কী অবলীলায় বলে দেন --- ‘নামগোত্রহীন খাবার কোনও জিজ্ঞাসা জাগায় না৷ কিন্ত্ত রিহান্দের রুই, লালগোলার আড় , গঙ্গাধরপুরের গলদা , পুরশুড়ার আলু বললে খেতে বসে মনে হবে আমি যেন ইতিহাস ভেঙে ভূগোল দিয়ে ভাত খাচ্ছি৷ সঙ্গে এক কামড় কাঁচালঙ্কায় এক ঝলক বেলডাঙা৷ মানুষের মতো আলু-পটলেরও ঠিকানা লাগে …’ নিসর্গের চরিত্র ও সভ্যতার ইতিহাস -বোধ এই দুই ব্যাপার ‘বাজার সফর সমগ্র ’ বইটির প্রতিটি রচনার গায়েই এমন ভাবে মিশে আছে , যেমন পায়েসে চিনি৷ পড়তে পড়তে মনে হয় , ঝুড়ি থেকে মাথাটা বার করে হাওয়ায় দুলতে থাকা একটি সজনেডাঁটার আত্মার মধ্যে ধীরে প্রবেশ করে যাওয়ায় যে অতর্কিত আনন্দ , তারই ভালো নাম হল শিল্প৷ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় , বাজার সফর সমগ্র আজকাল প্রকাশন৩৫০ টাকাবাজার৷ বাঙালির দৈনিক জীবনের প্রাণভোমরা৷ তারই বিচিত্র রোজনামচা৷ সংবাদপত্রের জনপ্রিয় কলাম থেকে সম্প্রতি দুই মলাটের মধ্যে৷ পড়লেনবোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যএক বিরাট ছাঁকনি নিয়ে বিভিন্ন বাজারের সামনে চওড়া ছাতিটি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি৷ তার পর , তার ভিতর কী যেন বুঝতে পেরে গিয়েছেন --- এই ভাবটি আভাসে , সঙ্কেতে সারা রচনায় চারিয়ে দিয়েছেন৷

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন