রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

মুভি দেখা- বাবেল

২০০৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল বাবেল মুভি। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় মুভিটির পরিচালক Alejandro González Iñárritu. 

বাবেল অর্থ কনফিউজড বা সংশয়। 

মুভিটিতে তিনটি দেশে তিনটি ঘটনা ঘটতে দেখা। তিনটির পটভূমি, চরিত্র, আখ্যান ভিন্ন। মনে হয় কোনোভাবেই একটির কোনো সংযোগ নেই। একটি মুভিতে চারটি মুভি দেখছি মনে হয়। দর্শক এই চারটি কাহিনী দেখতে দেখতে সংশয়ে পড়ে যায়।

১. কাহিনীস্থল মরক্কো:

কাহিনী--১
মরুভূমি বেষ্টিত পাহাড়িয়া এলাকায় ছাগলপালনকারী আব্দুল্লাহ ইব্রাহিম নামে একজন পশুশিকারী বুড়োর কাছ থেকে ২৭০ উইনচেস্টার একে ৭০ রাইফেল কেনে। ইব্রাহিম এর দাম হাকিয়েছিল ১০০০ দিরহাম। আব্দুল্লাহ ৫০০ দিরহাম আর একটি ছাগলের বিনিময়ে রাইফেলটি কিনতে সক্ষম হয়। আব্দুলাহর দুই কিশোর সন্তানকে রাইফেলটি দিয়ে ছাগলপালে হামলাকারী শিয়াল তাড়ানোর দ্বায়িত্ব প্রদান করে। 

দুই ছেলের বড়োটি আহমদ একটু সাদাদিধে স্বভাবের। ছোট ছেলে ইউসুফ বেশ পাকা। তার বোন যখন ঘরের মধ্যে জামা কাপড় পালটায় তখন ইউসুফ গোপনে ছিদ্র দিয়ে দেখে উত্তেজনা বোধ করে। 

দুইভাই ছাগল চরাতে গিয়ে রাইফেলটি দিয়ে টার্গেট প্রাক্টিস করে। সেখানেও ইউসুফ আব্দুল্লাহ চেয়েও বেশি দক্ষতা দেখায়। সে সুনিপুনভাবে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। 

একদিন দুভাই একটি ট্যুরিস্ট বাসকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আব্দুল্লাহর গুলি বাসটিকে আঘাত করে না। কিন্তু ইউসুফের গুলিটি বাসের গায়ে লাগে। কিছু দূরে গিয়ে বাসটি থেমে যায়। আব্দুল্লাহ ও ইউসুফ রাইফেলটি পাহাড়ের একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখে।


উপকাহিনী--১
সুশান এবং রিচার্ড দম্পতি সম্প্রতি তাদের তৃতীয় সন্তান হারিয়েছে। তারা দুজনেই বিষাদগ্রস্থ। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি আছে। এগুলো দূর করার জন্য তারা দুজনে মরক্কোতে একটি ট্যুরিস্ট দলের সঙ্গে এসেছে। বাসে চলছে। ট্যুরিস্ট দলটির সবাই মার্কিনী। 

সুশান বাসের জানালায় কাচে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ছিল। এ সময় জানালার কাচ ভেদ করে একটি বুলেট তার কাঁধে এসে লাগে। রিচার্ড বাস থামায়। সেখানে কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল ছিল না। এম্বুলেন্সও পাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।

স্থানীয় গ্রামের একটি বাড়িতে আহত সুসানকে নিয়ে যাওয়া হয়। রিচার্ড মার্কিন এম্বেসিতে ফোন করে সাহায্য চায়।

মুসলমানদের এই মার্কিনী ট্যুরিস্ট ভয় পায়। তারা মনে করে এরা সন্ত্রাসী। এখান দেরি করলে তারা আবার আক্রান্ত হতে পারে। ফলে সুসান ও রিচার্ডকে রেখে তারা বাস নিয়ে চলে যায়। কিন্তু বাসের ট্যুরিস্ট গাইড সুসান ও রিচার্ডের সঙ্গে থাকে। সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে। 

যে ঘরে সুসানকে রাখা হয়েছিল সেখানে একজন অতি বয়স্ক বুড়ি তার যত্ন নিয়েছে। তাকে অভয় দিয়েছে। একজন গোবদ্যি যখন সুসানের ক্ষত সেলাই করেছে, তার ভাঙ্গা কাঁধ বেঁধে দিয়েছে তখন ভয়ে যন্ত্রণায় সুসান চিৎকার করেছে। ভেবেছে মুসলমান বদ্যি তাকে মেরে ফেলতে এসব কিছুই করছে। 

বুড়ি তাকে যন্ত্রণা দূর করতে সাহায্য করে। তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। 

এই সময় রিচার্ড তার ছেলে মেয়েকে ফোন করে। তাদের মায়ের অবস্থা বলে না। ছেলেটি যখন তার স্কুলের মজার কাহিনি শোনাচ্ছিল তখন রিচার্ড ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। 

এম্বাসি একটি এম্বুলেন্স হেলিকপ্টার পাঠিয়ে দেয়। তারা তাতে উঠে হাসপাতালে রওনা করে। 


উপকাহিনী --২
মার্কিন টেলিভিশন প্রচার করে মরক্কোতে মুসলমান সন্ত্রাসিদের হামলার শিকার হয়েছে মার্কিন দম্পতি। মহিলাটি মারা গেছে। মার্কিন কর্তৃপখ মরক্কোর ওপর চাপ দেয় সন্ত্রাসীদের ঘটনার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে। মরক্কোর গোয়েন্দা বাহিনী ওই এলাকায় চলে ব্যাপক তল্লাসী অভিযান চালায়। তারা বুলেটের খোসা পাহাড়ে খুঁজে বের করে। এবং সনাক্ত করে এটা একে ৭০ রাইফেল থেকে ছোড়া হয়েছে। নিকটবর্তী লোক হিসেবে বুড়ো ইব্রাহিম ও তার স্ত্রীকে আটক করে। অমানুষিক নির্যাতন করে। বুড়ো এক সময়ে স্বীকার করে সে রাইফেলটি এক জাপানী শিকারির কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিল। সেটা পরে স্থানীয় পশুপালক আব্দুল্লাহর কাছে বেঁচে দিয়েছে।

আহমদ ও ইউসুফ দুই ভাই গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতা টের পেয়ে তাদের বাবাকে এই হত্যাকাণ্ডের খবরটি জানায়। এবং তারা স্বীকার করে তারা টার্গেট প্রাকটিসের অংশ হিসেবে গুলিটি করেছে। আব্দুল্লাহ আরো জানতে পারে ছোটো ছেলেটি শুধু গুলি করে মানুষই মারেনি। সে তার নিজের বোনের নগ্ন দেহ গোপনে দেখে বিকৃত আনন্দ পায়। তখন সে খুব রাগ করে দু ছেলেকে পেটায়। গুপ্ত স্থান থেজে রাইফেলটি উদ্ধার করে। দু ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদেরকে দেখে গুলি করে। সে গুলি বড় ছেলে আহমদের পায়ে লাগে। তখন রাইফেলটি নিয়ে ছোট ছেলে ইউসুফ পুলিশের উপর পালটা গুলি চালায়। একজন পুলিশ অফিসারকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়। আব্দুল্লাহ ছোট ছেলেকে নিষেধ করেছিল গুলি ছুড়তে। পুলিশের আরো গুলি আহমেদকে বিদ্ধ করে। তখন ইউসুফ হাত তুলে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। অনুরোধ করে তারা যেন অবিলম্বে তার আহত ভাইকে বাঁচাতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। 


কাহিনী--২
কাহিনীস্থল জাপান

চিকো নামে এক স্কুল ছাত্রীর মা সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছে। এরপর সে ডিপ্রেশনের রোগী হয়ে পড়ে। তার বাবা ইয়াসিজিরোকে সে সহ্য করতে পারে না। বোবা স্কুলের মেয়েদের জন্য আয়োজিত ভলিবল টুর্নামেন্টে রেফারি তাকে লালকার্ড দেখায়। চিকো তার ক্লাশের ছেলেদেরকে যৌনাঙ্গ দেখিয়ে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। বন্ধুদের সঙ্গে মাদক গ্রহণ করে। পার্টিতে একটি ছেলেকে সে টার্গেট করে। ছেলেটির সঙ্গে বান্ধবীকে চুমু খেতে দেখে সে পার্টি ত্যাগ করে বাড়িতে চলে আসে। 

সে গোয়েন্দা পুলিশের এক অফিসারকে তাদের বাড়িতে আসতে বলে। অফিসারকে জানায়, তার মা ব্যালকনি ঝুঁকে লাফ দিয়েছিল। সে নিজের চোখে মাকে ঝাঁপ দিতে দেখেছে। তখন তার ইয়াসিজিরো বাবা ঘুমাচ্ছিল। তারপর ইয়াসিজিরো মরক্কোতে শিকার করতে চলে যায়। 

এরপর চিকো গোয়েন্দা অফিসারের সামনে লগ্ন হয়ে আসে। তাকে যৌনাত্মকভাবে আকর্ষণ করে। অফিসারটি তাকে বিরত করে। তখন চিকো কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। একটি চিরকুট লিখে অফিসারকে দেয়। অনুরোধ করে এই বিল্ডিং থেকে বাইরে গিয়ে যে চিরকুটটি খুলে পড়ে। 

বাইরে গোয়েন্দা অফিসারের সঙ্গে চিকোর বাবা ইয়াসিজিরোর সঙ্গে দেখা হয়। তাকে তার মেয়ের ভাষ্য অনুসারে তার স্ত্রীর ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার বিষয়ে প্রশ্ন করে। ইয়াসিজিরো অফিসারকে জানায় তার স্ত্রী ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দিয়ে নয়, টয়লেটে ঢুকে গুলি করে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনা বহুবার গোয়েন্দাদেরজে জানিয়েছে। সে অনুরোধ করে তাকে যেন এ বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন না তোলে। গোয়েন্দা অফিসার ইয়াসিজিরোকে বিশ্বাস করে। কথা দেয় তাকে বিষয়ে আর কখনো কোনো প্রশ্ন করে বিব্রত করবে না। তখন সে ইয়াসিজিরোর কাছে জানতে চায়, মরক্কো যে রাইফেলটি দিয়ে পশু শিকার করেছিল সেটা এখন কোথায়? 

ইয়াসিজিরো বলে, রাইফেলটি মরক্কোতে তার শিকারের গাইড ইব্রাহিমকে উপহার হিসেবে দিয়েছে। 

এরপর ইয়াসিজিরো বাসায় আসে। ব্যালকনিতে মেয়ে চিকোকে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। দুজনে কান্নায় ভেঙে পড়ে। 


কাহিনীস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো
আমেলিয়া এক দশক ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার সসান দিয়াগোতে দুটি শিশুর দেখভাল করে। শিশু দুটির নাম ডেব্বি ও মাইক। তাদের বাবামা মরক্কযতে অবকাশে গেছে। সেখান থেকে আমেলিয়াকে ফোন করে জানিয়েছে, শিশু দুটির মা অসুস্থ। তাদের ফিরতে দেরি হতে পারে। এই অনুপস্থিতকালে আমেলিয়া যেন সার্বক্ষণিকভাবে দেখভাল করে। আমেলিয়া মেক্সিকান

মেক্সিকোতে তার ছেলের বিয়েতে যাওয়ার সুযোগ হারাতে চায় না। সে শিশু দুটিকে নিয়ে মেক্সিকোতে চলে যায়। 

ডেব্বি ও মাইক বিয়ের অনুষ্ঠানে খুব মজা করে। সবাই নেচে গেয়ে উৎসবটিকে মুখর করে তোলে। এমন কি মধ্য বয়স্কা আমেলিয়ার সঙ্গে আরেকহন মধ্য বয়স্ক পুরুষের পরিচয় হয়। দুজনে বিয়ের আসর থেকে সরে এসে একান্ত সময় কাটায়। 

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে আর দেরি করে না। শিশু দুটিকে নিয়ে মেক্সিকো থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশে রওনা করে। তার বোনের ছেলে সান্তিয়াগো গাড়িতে। সে খুব মজার লোক। শিশু দুটির সঙ্গেও তার খুব ভাব হয়ে গেছে। কিন্তু সান্তিয়াগো বিয়েতে খুব মদ খেয়েছে। 

বর্ডার গার্ড সান্তিয়াগোর হাবভাবে তাকে সন্দেহ করে। তার গাড়ি তল্লাশি চালায়। পেছনের সিটে ঘুমন্ত দুটি মার্কিনি শিশুকে দেখে তারা আমেলিয়াকে জিজ্ঞেস করে তাদের বাবা মায়ের অনুমতিপত্র আছে কিনা। আমেলিয়া গার্ডদের জানায়, অনুমতি পত্র নেই। তভে সেই তাদের জন্মের পর থেকেই দেখভাল করে আসছে। সেও তাদের একজন মা। 

বর্ডার গার্ড শিশু দুটির পাশপোর্ট দেখে। তারা বুঝতে পারে আমেলিয়া দীর্ঘদিন আমেরিকায় অবৈধভাবে বসবাস করছে। এই অপরাধে তারা তাকে আমেরিকা থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত জানায়। এবং সান্তিয়াগোকে অতিরিক্ত মদ্যপান করে গাড়ি চালিয়ে বর্ডার পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার জন্য অভিযুক্ত করে। তখন সে দ্রুত গাড়িয়ে চালিয়ে সেখান পালিয়ে যায়। পিছনে ধাওয়া করে পুলিশ। এক পর্যায়ে আমেলিয়া এবং শিশু দুটিকে একটি মরু এলাকায় নামিয়ে রেখে দ্রুত চলে যায়। তখন বেশ রাত। কেউ কোথাও নেই। ভয়ে আতঙ্কে রাত কেটে যায়। বুঝতে পারে তারা ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছে। এর থেকে উদ্ধার না পেলে মারা পড়তে হবে। 

আমেলিয়া শিশু দুটিকে সেখানে থাকলে বলে লোকজনের সন্ধানে বের হয়। 

বহুদূরে এক বর্ডার গার্ডের সঙ্গে দেখা হয়। তারা শিশু দুটির কাছে আসে। এসে দেখে সেখানে তারা নেই। বর্ডার গার্ড আমেলিয়াকে তাদের অফিসে নিয়ে আসে। সেখানে জানতে পারে ডেব্বি ও মাইক নামের শিশু দুটিকে তারা খুঁজে পেয়েছে। তাদের বাবা রিচার্ডকে সব জানানো হয়েছে। রিচার্ড আমেলিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি। তাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু বর্ডার গার্ডরা বে-আইনীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে মেক্সিকোতে পাঠিয়ে দেয়। তাকে গ্রহণ করে তার নববিবাহিত ছেলে। তখনো আমেলিয়ার গায়ে বিয়ে উপলক্ষ্যে পরা লাল রঙের জামাকাপড়। কিন্তু একরাতের মধ্যে তা ময়লা হয়ে গেছে-- ছিঁড়ে গেছে। আর চেহারাও মলিন হয়ে গেছে হাস্যোজ্জ্বল আমেলিয়া। 


দুই. 

মরক্কোর মরুভূমিতে গুলি করে আহত করা, সন্দেহ অবিশ্বাস নিয়ে মরনপথযাত্রী একজন বিদেশী নারীর বাঁচা মরার পরিস্থিতি, একটি বোবা মেয়ের মায়ের আত্মহত্যা ও তার বিকারগ্রস্থতা, এবং দুটি শিশুকে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ভিন্ন দেশে গমন এবং বর্ডার গার্ডের হাতে ধরা পড়া, পলায়ন ও ডিপোর্টেশন-- ইত্যাদি ঘনঘটাপূর্ণ আখ্যান অনেক চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত চারটি উত্তেজনা পূর্ণ ট্রাজিক আখ্যানই পাই। প্রতিটি আখ্যানই শেষ হয় কান্না দিয়ে। 

রিচার্ড আর সুসাম দম্পতি তৃতীয় শিশুটি ঘুমের ঘোরে মারা গিয়েছে। কিভাবে মারা গেছে এটা বলা হয়নি। কে দায়ী সেটাও বলা হয় না। কিন্তু এই মৃত্যু নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সংকটের সৃষ্টি হয়। হতে পারে রিচার্ডের কিছুটা অবহেলা ছিল। সেজন্য সে সুসানের কাছেও ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু সেই অবহেলাটি যে পরিকল্পনা করেই হয়েছিল তা কিন্তু মনে হয় না। সে নিজেও মৃত্যুর জন্য শোকগ্রস্থ। স্ত্রীকে স্বাভাবিক করতে মরক্কোতে বেড়াতে নিয়ে গেছে। সুসানও তাকে সম্পূর্ণ দায়ী মনে করে না। করলে বেড়াতে আসত না। তাকে মরক্কোর মুসলমানদের দেওয়া বরফে ক্ষতিকর কিছু থাকতে পারে বলে তা সরিয়ে ফেলত না। শেষ মুহূর্তে সে বোঝে এই মৃত্যুটা আসলে দূর্ভাগেরই ফল। ফলে রিচার্ডের হাতের উপরই সে ভরসার হাতটি রাখে। 

আব্দুল্লাহ ও ইউসুফ দুই ভাই কিশোর বয়সে কোনো লেখাপড়া করে না। সেভাবে আধুনিক নীতিবোধও তাদের শেখানো হয় না। কিশোর বয়সেই তাদেরকে পশুপালনের দ্বায়িত্ব দিয়েছে তার বাবা। এবং আগ্নেয় অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বোঝার মতো বয়স না হলেও তাদের পিতা দূর পাল্লার রাইফেল কিনে দিয়েছে। তাদেরকে শিয়াল হত্যার জন্য তাগাদা দিয়েছে। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো বড়ো কেউই তাদের কাছে নেই। ফলে এই কিশোর বয়সের চপলতা হেতু যাত্রীসহ গাড়িতে গুলি করে টার্গেড প্রাকটিস করার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধা বোধ করে না। আব্দুল্লাহর টার্গেট মিস হয়। কিন্তু ইউসুফের টার্গেট মিস হয় না। তা একজন বিদেশি মহিলাকে আঘাত করে। 

অথচ রিচার্ড ও সুসানের দুই সন্তানের জন্য একজন দক্ষ ন্যানি তারা দশ বছর ধরে নিয়োগ করে রেখেছে। তারা পড়ালেখা ঠিক করছে কিবা সেই দূর মরক্কো থেকেও বাভা রিচার্ড খোঁজ নিচ্ছে। সান্তিয়াগো যখন একটি মুরগীর গলা ছিড়ে হত্যা করছিল তখন এই শিশু দুটির কাছে তা অসহনীয় লেগেছে। আব্দুল্লাহ- ইউসুফের সঙ্গে ডেব্বি- মাইকের এই সংস্কৃতিগত পার্থক্য রচনা করেছে বিভাজন রেখা। 

আমাদের রাগান্বিত, ক্ষুব্ধ, প্রতিশোধকামী করতে উস্কানি দেয় না। করে তোলে বেদবাবিধুর ও বিষাদাগ্রস্থ। এবং অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করি এই চারটি ঘটনার অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে কোনো ভিলেন নেই। কাউকেই এই ট্রাজেডির জন্য দায়ী করা যায় না। কেউ কাউকে দায়ীও করে না। কেউ কারো প্রতি ঘৃণাসূচক বাক্য বা শব্দ প্রয়োগ করে না। সবাই সবার পরিস্থিত বুঝতে পারে। ক্ষমা করতে শেখে। পরস্পর পরস্পরের ভাষা বুঝতে পারে। 

নাইন এলেভেনে টুইন টাওয়ারে হামলার পর সারা পৃথিবীর মানুষ ভয়, আতংক, সন্দেহ অবিশ্বাস ও ঘৃণার মধ্যে প্রবেশ করেছে। ইসলাম সন্ত্রাস বনাম আমেরিকা দ্বন্দ্বটি প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল কায়দা আইসিস ইত্যাদি নামে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটেছে। তারা নানা দেশে হামলা চালাচ্ছে। আবার এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে দমনের জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রগোষ্ঠী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। মুসলমানদেরকে সন্দেহ আর অবিশ্বাস করার সংস্কৃতি সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে বিভাজন,দূরত্ব ও যোগাযোগহীনতা বাড়ছে। কেউ কাউকেই বুঝতে পারছি না। দূর থেকে পূর্বনির্ধারিত ধারণা নিয়ে চলছি। এই পূর্ব নির্ধারিত ধারবা হলো ভয়, আতংক ও ঘৃণা। কিন্ এটাই একমাত্র সত্যি নয়। কাছে গেলেই এগুলো মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়। মানুষ মানবিক হয়ে ওঠে। 


২টি মন্তব্য: