রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

হে স্মারকবন্ধুরা : হেঁটে হেঁটে কাছে আসি, শুনি তব নৈঃশব্দ্যবারতা

কুমার চক্রবর্তী

শুধু জীবিতের নয়, মৃতের অনুষঙ্গ ও অভিমুখিতায় জড়িয়ে আছে এই বৃক্ষবন্ধুরা। আমাদের জীবনকে যেমন রক্ষা করে চলে তেমনই মৃত্যুতেও ভূমিকাশীল হয় তারা তাদের নিজের দেহের জোগান দিয়ে।
মৃতদেরও ছায়া দেয় তারা, আপন শরীরসহযোগে ঘটায় সমাধিস্থ হতে। আমাদের এইসব নৈঃশব্দ্যিক বন্ধুদের কথা আমরা কি ভাবি? আমরা কি চেষ্টা করি তাদের ভাষা বুঝতে, বা বুঝতে তাদের অনুভবকে? অনেক আগে একটি কবিতায় লিখেছিলাম, ‘মৃত্যুর পরও বৃক্ষরা দাঁড়িয়ে থাকে অনেক দিন।’ বস্তুত তা-ই। বৃক্ষের মৃত্যুক্ষণ হয়তো বোঝা যায় না তাৎক্ষণিক। কিন্তু তাদেরও মৃত্যু ঘটে, আদিম দেবতাদের ক্রোধ এবং আঘাতকে প্রতিহত করে তারা আমাদের রক্ষা করে নিজ মৃত্যুর বিনিময়ে। 

আর কিছুকাল আগে লেখা কবিতায় লিখলাম: ‘আজ এই দীর্ঘ গাছের নীচে এসে জীবন আমার খুলে দিয়েছে গুহারহস্যের দ্বার। আমার/ আত্মা এখানে বের হয়ে বন্ধুরই মতো আমার পাশে পাশে হাঁটে আর দেখায়/ সপ্রতিভ গগনচারিতা।/ভালো লাগছে আমার, এখানে, গাছের নীচে হাঁটতে, কেননা এই উল্লম্বতা গূঢ়ার্থব্যঞ্জক,/মুহূর্তেই আমাকে দার্শনিক করে তোলে।’ গাছের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চিন্তা, বোধ, প্রেম, অনুভব নতুন রূপ পায়, পায় নতুন মাত্রা। বিখ্যাতদের অনেকেই নিয়মিত হাঁটতেন: নিয়মিত হাঁটতেন রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, নিটশে, রুশো, শোপেনহাউয়ার আরও অনেকে অনেকে। ডেভিড হেনরি থোরো তো গাছপালার প্রেমে দু-দুটো বছর কাটিয়ে দেন ওয়ালডেন বনে, একা একা; কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, সংকল্পনিষ্ঠ জীবন যাপনের আকাক্সক্ষায় বনবাসে গিয়েছিলেন তিনি; অর্থাৎ অরণ্যেই কেবল এই জীবন যাপন সম্ভব। তাঁরা সবাই নিশ্চয়ই হাঁটার সময় দেখতেন গাছপালা, অনুভব করতেন তাদের মাহাত্ম্য আর তা তাঁদের দিত চিন্তার নতুন খোরাক, অনুভূতির সিন্ধুবৈভব। 

কবে থেকে গাছকে ভালোবাসতে শুরু করি? আমাদের জন্মসময়ে প্রকৃতি ছিল নিগূঢ় এবং নৈকট্যময়। কত তার আশ্লেষ ও উপযোগিতা। প্রকৃতির ব্যাপক উপস্থিতি ও অবেষ্টনে মানুষের জীবন ও যাপন, যেন প্রকৃতিই জন্ম দিয়েছিল আমাদের। চোখ খুললেই কতসব গাছগাছালি, ফুল, পাখি, কীটপগঙ্গ, জল-হাওয়া! আমাদের পৈত্রিক বাড়ির সামনেই ছিল একটা প্রকা- অর্জুন গাছ যার বাকল নেওয়ার জন্য দূর-দূরান্তর থেকে মানুষজন আসত। পরে জেনেছি, এই অর্জুন গাছের ছাল দিয়েই বানানো হতো কবিরাজি ওষুধ অর্জুনারিষ্ট যা ছিল হৃদরোগের এক নিদান। আমাদের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে ছিল একটি অশোক গাছ, তার লাল লাল ফুল সৃষ্টি করত বিস্ময়ের! আর কত গাছ ছিল চারপাশে: আমলকী, গাব, চালতা, নারকেল, তাল ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু শিমুল গাছের বিচি শব্দ করে ফুটে বাতাসে তুলা ওড়ার চিত্র সারাজীবনের জন্য যেন তৈরি করে দিয়েছিল এক বিস্ময়রোধ! শুধু তা-ই নয়, এগুলো হলো জীবনের চিরন্তন চিত্রকল্প যা মানুষ মৃত্যু অব্দি বয়ে বেড়ায়। এসব স্বপ্নে হানা দেয়, আলোড়িত করে, আর ব্যক্তিকে করে জীবনস্মৃতিমাতাল। একদিন যখন সব লেনদেন শেষ হয় তখন এইসব স্মৃতিছবিরা এসে ছায়া দেয় জীবনকে, মনে করিয়ে দেয় তার অপাপবিদ্ধ শৈশব-কৈশোরের মন-মাতালকে। কিন্তু সব গাছকে যে ভালোবাসতাম তা নয়, কিছু গাছকে ভয়ও পেতাম। বাড়ির দূর-সীমানায় অবস্থিত পাঁচশ বছরের পুরোনো বট গাছটিকে ভয় পেতাম, রাতে পারতপক্ষে তাকাতাম না তার দিকে পাছে দেখে ফেলি পরি বা ভূত-প্রেত যারা গাছটির কা-ের ভাঁজে বসে একে অপরের চুলে বিনুনি করত বলে বিশ্বাস করতাম। ভয় পেতাম তেঁতুল গাছ বা গাব গাছ, সন্ধ্যা বা রাতে বা ঠাট দুপুরে যেতাম না এদের নীচে। তো এভাবেই গাছ যেন হয়ে উঠেছিল আমাদের বাঁচার এক অপর সঙ্গী। কিন্তু গাছকে ভালোবাসতে শুরু করি একটি গল্প পড়ে: রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’। প্রথমবারের মতো বুঝতে শিখি, মানুষের নিজ বর্গের বাইরেও মানুষের মহত্তম প্রেম লুক্কায়িত আছে, থাকতে পারে, যা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় একান্তে, স্থানে স্থানে, আর তাহলো একটি গাছ। সেই প্রিয় গাছটি যেন বলাইয়ের কাছে হয়ে ওঠে অস্তিত্বের বা তার অপর সত্তার রূপক। সিমলার অসংখ্য গাছের মধ্যে সেই শিমুল গাছটিই যেন সমগ্র উপস্থিতি নিয়ে হাজির হতে চাইছে তার সত্তায়, তাই সে তার ফোটোগ্রাফ পাওয়ার জন্য কাকার কাছে চিঠি লিখে বসে একদিন। বলাই প্রকৃতিপ্রেমী: ‘তার প্রকৃতিতে কেমন করে গাছপালার মূল সুরগুলোই হয়েছে প্রবল।’ বলাইয়ের ‘সমস্ত মনটাতে ভিজে হাওয়া যেন শ্রাবণ-অরণ্যের গন্ধ নিয়ে ঘনিয়ে ওঠে।’ কেন কেউ কেউ এমন হয় রবীন্দ্রনাথ মানুষের এই বিশেষ প্রকৃতি বিষয়ে বলছেন, সংগীতের এক-একটি সুর অন্য সকল সুরকে ছাড়িয়ে বিশেষ হয়ে ওঠার মতোই বলাইয়ের বৃক্ষপ্রেমী মনটি আর-সব কিছুকে ছাড়িয়ে বিশেষ হয়ে উঠেছে। তারপর অব্যক্ত, পালামৌ, আরণ্যক। এই গ্রন্থগুলোই হয়তো বাঙালিদের বৃক্ষপ্রেমের জন্ম দিয়েছে। সে-অর্থে এ বইগুলো মননের প্রেম-পুস্তক। এই তিনটি বই-ই চিরন্তন ভালো লাগা দিয়ে আমাকে অধিকার করে আছে এখনও। সাধারণত কোনো বই পড়ার পর তার প্রতি মুগ্ধতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে, কিন্তু এই তিনটি বই আমার ভেতর সৃষ্টি করেছে ক্রমবর্ধমান মুগ্ধতা ও ভালোবাসা। মনে পড়ে পালামৌর বিখ্যাত ও গ্রস্ত করার মতো কত পঙ্ক্তি: ‘সেই ফাটার উপর বৃহৎ এক অশ্বত্থগাছ জন্মিয়াছে। তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থগাছ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রসগ্রহণ করিতেছে। কিছুকাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই।’ বাক্যবন্ধের মধ্যে ভাববিরোধ এবং বিরোধাত্মক স্থিতি নির্মাণের এই অপূর্বতা এখনও আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু তো সেই প্রথম পথিকৃৎ যিনি জানান দেন বৃক্ষের প্রাণ বিষয়ে, আর বিভূতিভূষণ দেখান কী করে লেখার প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি। আর এসবই সম্ভব হয়েছিল জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উপাদানেÑÑÑ তাঁরা এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন একা একা, ঘুরে ঘুরে। হেঁটে হেঁটে দেখার আর অনুভব করার অভিজ্ঞতাই পরে অভিজ্ঞানে পরিণত হয়েছিল তাঁদের জীবনে।

২.

ভাষাকে আমরা তো শাব্দিক করে বসে আছি; মনে করি ভাষা মানেই উচ্চারণ বা ধ্বনি প্রক্ষেপণ। বলে থাকি, ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম, কিন্তু শুধু ভাষাই যোগাযোগের মাধ্যম এই বিশ্বাস ভাষাচিন্তাকে দুর্বল করে দিতে বাধ্য। যা কিছু ভাষায় আনা যায় না, তা হয়তো ভাষাবলয়ে অব্যক্ত, কিন্তু তারও নিজস্ব যোগাযোগ প্রক্রিয়া আছে, আছে ব্যক্ত করার নিজস্ব পন্থা। ফুলের যে সৌগন্ধ বা আমরা যখন গায়ে সুগন্ধি ব্যবহার করি, বা আমাদের শরীর থেকে যখন বিশেষ ‘সিগনেচার সেন্ট’ বের হয়, তা-ও স্থাপন করে যোগাযোগ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের ঘামে ফেরোমোন নামক এক রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয় যার কারণে আমরা আমাদের সঙ্গী পছন্দ করি যৌন সম্পর্কের জন্য। সুতরাং বলা যায়, আমাদেরও রয়েছে সুগন্ধের এক গোপন ভাষা যা দিয়ে সৃষ্টিশীলভাবে যোগাযোগ স্থাপন করি আমরা। তো গাছেদের ভাষা নেই কিন্তু তাদের কি যোগাযোগ নেই? অথবা গাছেদের শাব্দিক ভাষা নেই, রয়েছে এক নৈঃশব্দ্যিক ভাষা যা দিয়ে তারা যোগাযোগ করে চলে নিজেদের ও অন্যদের সাথে। বলে নেওয়া ভালো, ভাষা হলো আত্মরক্ষার একধরনের উপায়মাত্র। আর গাছের ক্ষেত্রেও তার ভাষা হলো বেঁচে থাকার উপায় ও গন্তব্য। আমাদের ভাষা হয়তো গাছের ভাষা নয় কিন্তু গাছের ভাষা আমাদের ভাষা হয়ে ওঠে আমাদের বৌধায়নে--- রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘জীব-জগতের আদিভাষা, তার ইশারা গিয়ে পৌঁছয় প্রাণের প্রথমতর স্তরে।’ গাছের প্রাণই তার ভাষা হয়ে ওঠে; তার স রণ, তার কাঁপন, তার ছন্দ আমাদের কাছে ধরা দেয় ভাষাপ্রতিমতা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছেন: যদি নিস্তব্ধ হয়ে প্রাণ দিয়ে শুনি তা হ’েল অন্তরের মধ্যে মুক্তির বাণী এসে লাগে।’

বাহ্যিক দৃষ্টিতে প্রত্যেক গাছকে মনে হয় বিচ্ছিন্ন, একাকী, যেন এক মৌনের তপশ্চর্যায় ব্রত। যে-অরণ্য ধরে আছে এত এত বৃক্ষপত্রালি, তার এক-একটি গাছকে মনে হয় এক-একজন নৈঃশব্দ্যের সাধক, বা প্রত্যেকে যেন রচনা করে বসে আছে এক একক নৈঃশব্দ্য। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই! গাছেদের মধ্যে কি নেই কোনো আন্তর যোগাযোগ! মাটির ওপরে গাছের যে অংশ দেখি তার চেয়েও মাটির গভীরে তার অংশ রয়েছে দেখার বাইরে যা বিশাল। হ্যাঁ, গাছের শিকড় কখনও-বা তার ওপরের অংশের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে থাকে। ফলে একটির অন্ধকার অংশ অনায়াসেই পৌঁছে যায় অন্যটির এলাকায়, মেলামেশা করে আপন ইঙ্গিতে ও অভীপ্সায়, বিনিময় হয় পরস্পরের। পাশাপাশি থাকা গাছের শিকড়েরা রচনা করে আন্তঃসংযোগ, সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। বাঁধের ধারের গাছেদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয় কেননা বাঁধের মাটি সরে যায় অধিক হারে, তাই গাছেদের দরকার হয়ে পড়ে শিকড়সংযোগী হওয়ার। কিন্তু এই সংযোগ সবার ক্ষেত্রে হয় না। মানুষের মধ্যে যেমন কেউ কেউ হয় অসামাজিক তেমনি গাছের মধ্যেও কেউ কেউ অসামাজিক ও বিবিক্ত, আর তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে ঋষির মতোই এক জীবন চালিয়ে যায় বছরের পর বছর। যা-ই হোক, গাছেরা যে-যোগাযোগ করে থাকে নিজেদের মধ্যে, তা তারা করে থাকে বৈদ্যুতিক তাড়না এবং ছত্রাকের মাধ্যমে। ছত্রাক যেন বৃক্ষের ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট কেবল, যার মাধ্যমে একের খবর পৌঁছে যায় অন্যের কাছে। একটি-মাত্র ছত্রাক কয়েক বর্গমাইলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে শতাব্দব্যাপী। এই ছত্রাকভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংকেত প্রেরণের দ্বারা খরা, পোকামাকড়ের আক্রমণ বা অন্য বিপদের কথা একে অন্যের কাছে পৌঁছে দেয় গাছেরা। এই যোগাযোগের সক্ষমতা হারালে গাছেরা দুর্বল হয়ে পড়ে। গাছের প্রকৃত নীরবতা আসলে এই যোগাযোগহীনতার ফলাফল, ছত্রাকভিত্তিক যোগাযোগহীনতার কারণেই গাছ হয়ে পড়ে অসুস্থ। গাছেদের সামাজিকতা গাছেদের বন্ধুত্ব আরও নানাক্ষেত্রে প্রসারিত। বৃক্ষদের এই সামাজিকতা এই বন্ধুত্ব সম্ভব হয় যূথচারী অবস্থানে। একটিমাত্র গাছ তা করে উঠতে পারে না, কারণ একটি বৃক্ষ কোনো জলবায়ুর সৃষ্টি করতে পারে না, তাকে নির্ভর করতে হয় জলহাওয়ার ওপর। কিন্তু অরণ্যে তারা একসাথে সৃষ্টি করে একটি প্রতিবেশ-পদ্ধতির, নিয়ন্ত্রণ করে তাপ ও শৈত্যকে, জমিয়ে রাখে জল আর জন্ম দেয় আর্দ্রতার, আর এই পরিবেশে গাছেরা বেঁচে থাকে দীর্ঘকাল। এভাবেই অরণ্য হয়ে ওঠে এক জাদুময় ভূমি যেখানে অমরত্ব না-হলেও মৃত্যু দীর্ঘায়িত হয়। অরণ্যে বৃক্ষরা ভিন্ন সময়রেখায় ভিন্ন স্থায়িত্বকালের পরিমাপ-এককে বেঁচে থাকে। সুইডেনে স্প্রুস জাতীয় এক সরলবর্গীয় বৃক্ষ রয়েছে যার বয়স ৯৫৫০ বছর, গড়পরতা মানুষের বয়সের চেয়ে যা ১১৫ গুণ বেশি। এই বয়সি হওয়ার সাথে রয়েছে তাদের পক্বতাও। বয়স হলে মানুষ মূল্যহীন হয়ে পড়ে, কিন্তু বৃক্ষরা বয়সের সাথে সাথে হয়ে ওঠে মূল্যবান। কিন্তু যতই সময় যায়, তাদের ওপরের দিকে বৃদ্ধি সংকুচিত হতে থাকে, কেননা তাদের শিকড় ও রসবাহী পদ্ধতি উচ্চতায় জলীয় পদার্থ পৌঁছিয়ে দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা পাশে মোটা হতে থাকে ঠিক মানুষের মতো। কিন্তু কীভাবে মাটি থেকে আকাশে পৌঁছে যায় জল তা এক রহস্য। অনেকে বলবেন, কেন অসমোসিস প্রক্রিয়ায়? কিন্তু তা শুধু ঘটে শিকড় এবং পাতায়, কিন্তু বিশাল কা-ে প্রক্রিয়াটা কীভাবে ঘটে তা রহস্যময়।

কত যে রহস্য আরও রয়েছে গাছেদের জীবনে তা এক বিস্ময়। অনেক অক্ষাংশে হেমন্তে ঝরে পড়ে তাদের পাতা আর বসন্তে পুনরায় উদ্গমিত হয়। এই যে আপাত ঘটনা অবিরত ঘটতে থাকে, তাকে সাধারণ না ভাবলেই রহস্য অনুসন্ধানে সুবিধা হয়। কীভাবে গাছ উপলব্ধি করে এই আত্মপরিবর্তন? করে নিজ সময়-সংবেদন দিয়ে। এই সময়-সংবেদনকে ব্যবহার করেই বৃক্ষরা বুঝতে পারে আলোর হ্রাসবৃদ্ধি। উষ্ণদিনে গাছের পাতারা বিকশিত হয় বেশি, কারণ তখন গাছের কা-ে জমে থাকা জল আবার গলতে শুরু করে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত হলো শীতে যত হিম নামে ততই পত্রালি বিকশিত হতে থাকে। এই সময়-সংবেদন পত্রসম্ভারের চেয়ে অন্য কারণে প্রয়োজন বৃক্ষের। বংশবৃদ্ধির জন্যও দরকার এই সংবেদনের। গাছেরা বোঝে, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া মানে গ্রীষ্মকাল, আর কমে যাওয়া মানে শীতকাল। তাপমাত্রা বেড়ে যেতে থাকা মানে বসন্ত আর কমে যেতে থাকা মানে হেমন্ত। আবার উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে এই হিসাব বিপরীতও হতে পারে। কিন্তু কীভাবে তারা বোঝে তা? তারা তা বোঝে স্মৃতি দিয়ে। হ্যাঁ, গাছেরও রয়েছে স্মৃতি। এই স্মৃতি দিয়েই তারা দিনের দৈর্ঘ্য মাপে আর গুনে চলে উষ্ণতাময় দিন। 

শ্বাস-প্রশ্বাস বৃক্ষদেরও রয়েছে, সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসন হলো এর অনিবার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু কীভাবে বৃক্ষরা শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করে? তারা তা করে পাতায় অবস্থিত কাঁটার মাধ্যমে। আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান অক্সিজেন সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বৃক্ষরা উৎপাদন করে দিনের বেলায়। গ্রীষ্মকালে দিন দীর্ঘ এবং আলো প্রতুল হওয়ায় তা ঘটে ব্যাপকভাবে। বনের ভেতর প্রতি বর্গমাইলে যে-গাছেরা থাকে তারা প্রতিদিন ঊনতিরিশ টন অক্সিজেন উৎপাদন করে, একজন মানুষ প্রতিদিন দুই পাউন্ড অক্সিজেন গ্রহণ করে আর সেই হিসেবে গাছের উৎপাদিত অক্সিজেন কাজে লাগে দশ হাজার মানুষের। এজন্যই বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা মানে অক্সিজেনে ¯œাত হওয়া। এই হাঁটা শুধু চিন্তাকেই উসকে দেয় না, স্বাস্থ্যকেও করে সবল। কিন্তু রাতে বন্ধ থাকে সালোকসংশ্লেষণ তাই ঘটে বিপরীতটা, অর্থাৎ রাতে তারা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করে। গাছের জন্য প্রবৃদ্ধির উপাদান হলো জল। এক পাউন্ড প্রবৃদ্ধির জন্য এক-একটি গাছের দরকার হয় বিশ থেকে তিরিশ গ্যালন জলের। জলের অভাব হলে বৃক্ষরা সমস্যায় পড়ে, জল হলো গাছের প্রাণ। গাছের ভেতর জলের যে খেলা, তা সত্যিই রহস্যময়।

প্রেম রয়েছে তাদের মধ্যে। গাছেদের মধ্যেও রয়েছে নারী-পুরুষ। পরাগায়ন ঘটে এদের মধ্যে মৌমাছি বা বাতাসের গতায়াতে। গাছেদের প্রেম দূরত্বময়, কিন্তু নয় দুরবগাহ। আর তাদের প্রেম অন্ধকারে আরও বেশি হয় প্রকটিত। অরণ্যের অন্ধকারে বৃক্ষরা প্রেমে মেতে ওঠে। বৃক্ষরা সামাজিক, একে অন্যকে সাহায্য করে যায় অবিরত। অরণ্যে তারা সামষ্টিক একাত্মতায় নিবিড় হয়ে থাকে। অরণ্যে বৃক্ষরা যূথবদ্ধ। বৃক্ষ হলো সৌন্দর্যের চিরন্তন বিভূতি-প্রত্যয়। এমনকি মৃত বৃক্ষও সৌন্দর্য দান করে যায়। শাশ্বত সবুজতা আর অন্য সব রঙের উৎপাদক-উপস্থাপক হিসেবে বৃক্ষ আমাদের উষ্ণক প্রতীক। মহাজগতের যে আবর্তন এবং আপতন তা বৃক্ষের মাঝ দিয়ে প্রতিফলিত হয়ে সৌন্দর্য হয়ে ওঠে। সূর্যের কিরণ বা চন্দ্রের আলো বা বৃষ্টি বা বাতাস বৃক্ষের অংশগ্রহণে হয়ে ওঠে অন্যরকম, হয় অপার্থিব। রাতের কালপুরুষ বা সপ্তর্ষিম-ল চুপিসারে কথা বলে বৃক্ষের সাথে। যে-মানুষ বৃক্ষের নীচে এসে দাঁড়ায়, হাঁটে তার চারপাশে, সেও অন্য-এক মানুষ, সে মানুষ দার্শনিক, কবি, চিন্তক বা বৃক্ষে-পাওয়া-মানুষ। বৃক্ষরাই ভূ-সাংকেতিক সৌন্দর্য মানুষকে দান করে। বিভূতিভূষণ যখন তাঁর আরণ্যক-এ বলেন, ‘নিঃশব্দ অরণ্যভূমি, নিস্তব্ধ জনহীন নিশীথরাত্রি। সে জ্যোৎ¯œা-রাত্রির বর্ণনা নাই। কখনো সে-রকম ছায়াবিহীন জ্যোৎ¯œা জীবনে দেখি নাই।’ বা ‘প্রাচীন পাকুড় গাছটার মগডালে বকেরা দল বাঁধিয়া বাস করে, দূর হইতে দেখিলে মনে হয়, গাছের মাথায় থোকা থোকা সাদা ফুল ফুটিয়াছে।...কী সুন্দর ছায়া এই শ্যাম বংশী-বটের, কেমন মন্থর যমুনাজল, অতীতের শত শতাব্দী পায়ে পায়ে পার হইয়া সময়ের উজানে চলিয়া যাওয়া কী আরামের!’--- তখন বোধগম্য হয় এর সত্যতা। শুধু মানুষ নয়, বৃক্ষকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে পাখপাখালি, পোকামাকড়, ছত্রাক, জীবাণু, এমনকি ভূত-পেতিœ-জিন-পরিরাও! পৃথিবীতে এক জীবনদায়ী বাতাবরণ তৈরি করে রাখে বৃক্ষরা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘সৃষ্টির বিরাটত্ব, কসমিক স্কেল-এর বিশালত্ব¡’ উপহার দেয় বৃক্ষ।

কিন্তু এইসব প্রাণন বৃক্ষও মারা যায়। জলের অভাবে বা পোকার আক্রমণে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বা মানুষের নিধনে তাদের মৃত্যু হয়। বৃক্ষদের মৃত্যু হলো প্রাকৃতিক ট্র্যাজেডি। এক-একটি বৃক্ষমৃত্যু যেন আমাদেরও এক পরোক্ষ মৃত্যুর সূচনাকারী। কিন্তু মৃত বৃক্ষ যেন জীবিতের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে। রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর ‘সুগন্ধী বনের গাছেরা’ কবিতায় গাছের কথনে বলেন: তোমাদের দিই কাগজের ম-,/ মোদের জ্বালানি দেয় তোমাদের উত্তাপ;/ তোমাদের ঘরের কাঠও জোগাই আমরা,/ আর দিয়ে যাই বাতাম ও ফল খাবার। এক-একটি বৃক্ষের মৃত্যু যেন একটি খ-কালের বা দীর্ঘকালের বিমোচন। এই পৃথিবীকে শ্রুশ্রূষা দিয়ে একটি বৃক্ষ চলে যায় কালান্তরে, রেখে যায় মৌনের স্মৃতি-সৌন্দর্য, কালের অমোচনীয় অশ্রুবিন্দু।




৩.

কত যে কবিতা আর গান লেখা হয়েছে গাছদের নিয়ে। বৃক্ষরা এক-একটি জীবন্ত কবিতা আর মৌন গান। বস্তুত কবিতা আর গান অবশেষে যে-নৈঃশব্দ্যে পৌঁছতে চায় বৃক্ষ হলো সেই অবস্থার দৃশ্যরূপ। গাছ নিয়ে ফ্রস্ট লিখেছেন বিখ্যাত কিছু কবিতা, তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী, বলেছেন বিখ্যাত এক কবিতায়: কাজল-কালো বনানী যে ভালোলাগে: উড্স আর লাভলি ডার্ক অ্যান্ড ডিপ। হাউজম্যান বলেছেন: ‘দাও আমাকে পত্রবহুল শাখা/ দ-ায়মান বৃক্ষময় ভূমিখ-/ গাছ পড়ে গেলে মনে জাগে ব্যথাবোধ/ ভালো তো বাসি না পাতাহীন ভূমিখ-।’ আইলিন ফিশার বলেছেন: ‘হব আমি এক দীর্ঘ মেপল / হেমন্তে ঝরাব পত্রসকল। /বসন্ত এলে যে দেখা দেবে নব পাতা/ দেখো, তো কীভাবে বাড়ে এই বৃক্ষরা? এখন তো তুমি জান তা!’ আলফ্রেড জয়েস কিলমার অসাধারণ সুন্দর এক কবিতায় বলছেন: গাছের মতো সুন্দর কবিতা তিনি দেখেননি কখনও, কবিতা তো তাঁর মতো বোকারা রচনাই করতে পারে, আর গাছ তো কেবল ঈশ্বরের সৃজন। ফিলিপ লারকিন তাঁর ‘গাছেরা’ কবিতায় বলছেন--- বসন্ত শুধু পুনর্জন্মেরই প্রতীক নয়, মৃত্যুরও স্মরণিকা; তার মানে প্রতিটি আগত বসন্ত মৃত্যুরও বার্তাবাহক। তিনি বলছেন, গাছের বয়স লেখা থাকে ‘ইন রিংস অব গ্রেন’, অর্থাৎ গাছের বল্কলের নীচে অবস্থিত কা-ে যে বলয় বা স্মারকচিহ্ন পড়ে তা আসলে গাছের বয়সের চিহ্ন, কালচিহ্ন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক গানে বলেছেন এক গাছের কথা যে-গাছ অপেক্ষাহীনভাবে নিজ সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত: ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায় ফাগুন মাসে কী উদ্ভাসে, ক্লাান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর পালা!’ তাঁর কত কবিতা আর গানে রয়েছে বৃক্ষরা! শুধু লেখায়ই নয় জীবনেও তিনি বৃক্ষপ্রাণময়। পালন করতেন বৃক্ষউৎসব। বৃক্ষ তথা প্রকৃতির অংশগ্রহণ তাঁর সাহিত্যে প্রগাঢ়ভাবে লেপে রয়েছে। বনবাণী কাব্যে দেখি তিনি বলছেন ‘বৃক্ষবন্দনা’র কথা। বৃক্ষকে তিনি বললেন ‘আদিপ্রাণ’, বললেন ‘মানবের বন্ধ’ু; করলেন প্রশস্তি এই বলে: ‘তুমি তাই দিলে ভরি/ আপনারে পত্রপুষ্পপুটে, অনন্তযৌবনা করি/ সাজাইলে বসুন্ধরা।’ জীবনানন্দে রয়েছে পরাপ্রকৃতির উদ্বোধন। রূপসী বাংলা কাব্যে বাংলার বৃক্ষরা দেখা দিয়েছে রূপক ও লক্ষণা হয়ে। বলছেন তিনি জারুল, হিজল, অশ্বত্থ, আম, জাম, করবী, ফণীমনসা, কদম, কাঁঠালিচাঁপা, হেলে া, ভেরেন্ডা, মাদার, ডুমুর, চালতা, করমচা, সজিনা, বাবলা, আকন্দ... আরও কত কত কী গাছের নাম! বলছেন তিনি: ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে ---সবচেয়ে সুন্দর করুণ:/ সেখানে সবুজ ডাঙা ভ’রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল;/ সেখানে গাছের নাম: কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল;।’ বলেছেন: ‘অশ্বত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী।’ বস্তুত রূপসী বাংলা যেন প্রকৃতির ¯œায়ুপ্রশান্তি ও বোধিদ্যোতক, তা যেন এক বৃক্ষবাটিকা যেখানে গাছেরা রচনা করেছে স্বাপ্নিক অবভাস। তা এমন এক সংবেদনের সৃষ্টি করে যার ফলে চেতনা আক্রান্ত হয় বিহ্বলতা, ও নিঃসঙ্গপ্রিয়তায়। যে গাছপালার বর্ণনা জীবনানন্দ দেন তা যেন আমাদের সত্তার আর্কেদিয়া রচনা করে। বিনয় মজুমদার বলেছেন, সৃষ্টির মূল সূত্রগুলো যেমন জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, তেমনই উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যেও প্রকাশিত।

গাছ-বিশেষ রূপক বা প্রতীক হয়ে দেখা দেয় কখনও কখনও। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘আট বছর আগের এক দিন’ কবিতায় আমরা পাই অশ্বত্থকে এরূপে: ‘চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে/ এক-গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা-একা;/ যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের--- মানুষের সাথে তার হয় না ক’ দেখা/ এই জেনে।/ অশ্বত্থের শাখা করে নি কি প্রতিবাদ?/ ।’ কবিতাটিতে অশ্বত্থ হলো সেই বিধেয় যা উদ্দেশ্য-এ সেঁটে রয়েছে। এভাবেই জীবনানন্দ এক বিশ্লেষণাত্মক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছেন পরোক্ষ রূপক হিসেবে গাছকে ব্যবহার করে। ক্লিন্টন বি সিলি তাঁর দীপ্তিমান জীবনানন্দ-জীবনীতে বলেছেন অশ্বত্থের মহিমা ও কিংবদন্তি নিয়ে। তিনি বলছেন, কোনো সংজ্ঞার্থমতে, অশ্বত্থ হলো সেই গাছ, বিরোধ ছাড়াই যে বেঁচে থাকতে পারে দীর্ঘকাল; ‘অ’ হলো বিরোধিতাহীন, ‘শ্ব’ হলো অনন্তকাল, ‘ত্থ’ হলো দ-ায়মান। সিলি অশ্বত্থের আরেকটি ব্যাখ্যা দেন এই: ‘অ’ হলো ‘নয়’, আর ‘শ্বত্থ’ হলো ‘অস্থায়ীভাবে দ-ায়মান’; অর্থাৎ অশ্বত্থ হলো সংসার বা এই জগতের গাছ। তিনি গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, অশ্বত্থ শব্দের মানে হলো পরিবর্তনশীল প্রপ , ঠিক সংসারের মতো, যা নশ্বরতা থেকে মুক্ত তবে জড়পদার্থ নয়। আমরা জানি, মদ্ভগবদ্গীতার প দশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে সেই জীবনবৃক্ষের কথা, যার শেকড়গুলো ওপরের দিকে আর পাতাগুলো নীচের দিকে, পাতাগুলো হচ্ছে জ্ঞান, যে তা জানে সেই জ্ঞানী; এই জগৎ-বৃক্ষ আসলে সংসার, যা শাশ্বত। জুনিপার গাছের কথা উল্লেখ করেছেন টি এস এলিঅট তাঁর বিখ্যাত অ্যাশ ওয়েনেশডে কবিতায়: খধফু, ঃযৎবব যিরঃব ষবড়ঢ়ধৎফং ংধঃ ঁহফবৎ ধ লঁহরঢ়বৎ-ঃৎবব।




৪.

এ জীবনে কত যে গাছ দেখেছি, দেখছি, অনবরত। সমভূমি, পাহাড়, মরুভূমি---সব জায়গায় গাছ দেখলে আনন্দ পাই। আমাদের ভূগোলে মুগ্ধ হয়ে দেখি বট-পাকুড়-অশ্বত্থ, হিজল, অশোক, ছাতিম, আমলকী ইত্যাদি, আর বিদেশে গেলে খুঁজে বেড়াই ওক, ফার, বিচ, বার্চ, পাইন, সাইপ্রেস কত কী! কাশ্মীরে দেখেছি চেনার গাছ; আরণ্যক-এ বিভূতিভূষণ বলেছেন, নুরজাহান পারস্য থেকে এই গাছ এনে কাশ্মীরে লাগিয়েছিলেন যা এখন ছেয়ে রয়েছে সেখানে। জর্ডানে দেখেছি সাহাবি বৃক্ষ, মরুভূমিতে একা সে কী করে যে বেঁচে রয়েছে! মরুভূমির গাছকে মনে হয় দগ্ধপ্রাণ, যেন এক প্রতীক, জীবনের, যে সংগ্রাম করে চলে একা একা। উচ্চভূমি, নি¤œভূমি, সমভূমি, মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া গাছ উপহার দিয়েছে উদ্ভিন্ন সৌন্দর্য যা জীবন্যাস করেছে আমাকে প্রতিনিয়ত, নানাভাবে। ভূগোল ও তার প্রকৃতি অনুয়ায়ী এক এক জায়গার গাছও হয় এক এক রকম। কেন দেখি বৃক্ষ? কারণ বৃক্ষ হলো আত্মবন্ধু, বৃক্ষ হলো জগদ্বন্ধু। উপস্থিতি ও অবদান দিয়ে তারা সেবা করে আমাদের। মলম যেমন শরীরের ক্ষত সারায় তেমনই বৃক্ষরা মলমের কাজ করে আত্মার হতাহতে। রাজা সলোমনের নাকি এক অদ্ভুত আংটি ছিল যা আঙুলে পরলে তিনি সমস্ত প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারতেন, আমার যদি এমন-কিছু থাকত যা দিয়ে আমি বুঝতে পারতাম বৃক্ষের ভাষা! 

বৃক্ষের মাঝ দিয়ে ভ্রমণ নান্দনিক এক প্রাপ্তি। তা আমাদের করে তুলে দার্শনিকতাগ্রস্ত। জীবন সম্পর্কে, জগতের বহুত্বময় প্রাচুর্য ও প্রাপ্তির বিষয়ে আমরা হয়ে ওঠি বিভাবম-িত এবং অনুরাগিত। কিন্তু এই পরাদর্শন শুধু সম্ভব মানসিকযোগে হাঁটার মাধ্যমে। এক-একটি দীর্ঘ ও মন্থর হাঁটাই কেবল আমাদের এই প্রাপ্তিযোগে নিয়ে যেতে পারে। হেঁটে হেঁটেই প্রকৃতির এই অসম্ভব অভিজ্ঞান, আভাস আর উপসর্গকে আত্মস্থ করা যায়। দৌড়ে নয়, নয় কোনো যানে চড়ে; বরং শুধু দেহযানকে স্থির ও অবিচলিত রেখেই এই চৈতন্যকে পাওয়া সম্ভব। কেননা এর জন্য দরকার গতির মন্থরতা এবং স্থিতির স্বতশ্চলতা। দাঁড়াতে হয় তাদের কাছে গিয়ে, বুঝতে হয় তাদের অব্যক্ততা। আর এই মন্থরগামিতা তো হাঁটা ব-ই অন্য কিছুতে আসে না। দূর থেকে তাদের আবছায়া আর অবভাসকে কল্পনা করা যায়, হৃদয়ঙ্গম করা যায় না তাদের উপস্থিতি ও ভাষাকে। বৃক্ষের কাছে এলে বিনিময় হয় পরস্পরের, আত্ম ও পর একাকার হয়। আমাদের জীবন ও মৃত্যু যেন একসাথে হাঁটে তখন। 

বৃক্ষস্মরণ তো পেরিয়ে আসা সময়ের স্মৃতিপথ। সময় তো স্মৃতির বুনন, তাতে ধরা থাকে সেই অভিজ্ঞতা যখন শরীর হেঁটেছিল, হেঁটে হেঁটে তন্ময় হয়ে পড়েছিল। বৃক্ষস্মরণ তাই আত্মস্মরণও। জীবন, প্রকৃত জীবন, অঞ্জনময় জীবন বাঁকে বাঁকে গড়ে রাখে নানা ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ, মানুষটি যাতে তার কাছে গিয়ে আর্তি অনুভব করতে পারে, কালের কান্নার ধ্বনি শুনে। কাল নানাভাবে থাকে পৃথিবীতে, সরাসরি কালকে দেখা যায় না কিন্তু পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় তাকে আঁচ করা যায়। গাছ হলো সেই কালের স্বপ্নাদ্য রূপ। কালকে এতটা বিস্তৃতিতে কেউ আর ধারণ করতে পারে না। একটি দীর্ঘজীবী গাছ দেখা মানে কালের এক প্রতিভাসকে চাক্ষুষ করা। বৃক্ষ হলো প্রকৃতির কালচিহ্ন, বৃক্ষ হলো মহাকালের দেবদূত যারা নিঃশব্দে লালন করে চলে আমাদের, ধারণ করে রাখে মহাজগৎকে। ওভিদের মেটামরফোসিস-এ দেখি পার্থিব মানব-মানবী ফিলেমোন ও বাউসিজ দেবতার আশীর্বাদে মৃত্যুর পর বৃক্ষে পরিণত হয়, অর্থাৎ তারা পরিণত হয় মহাকালে। বুদ্ধ ধ্যান করেছিলেন যে-অশ্বত্থের তলে তা আজ বোধিবৃক্ষ। আসলে সব বৃক্ষই বোধি বা জ্ঞানবৃক্ষ। বুদ্ধ তো সারাজীবনই হেঁটেছেন, হেঁটে হেঁটে গেছেন গাছের কাছে, নদীর কাছে, মানুষের কাছে। পরিব্রাজকের বাহন হলো পা, আর তার শক্তি হলো হাঁটা। বৃক্ষ হলো প্রকৃতির গুপ্ত ও গূঢ় প্রতীক যারা একই সাথে ধরে রাখে সৃষ্টির রহস্য, এবং সৌন্দর্য। শুধু নিজেরাই সুন্দর নয় তারা, অন্য সুন্দরকে বিকশিত করতে তারা রাখে সহায়ক সংবেদনশীল ভূমিকা: চাঁদ, জোছনা, জল, সূর্যালোক, চরাচর, সুবাতাস, তুষার প্রভৃতি---এসব সৌন্দর্য-আকরগুলো স্মিত হয়ে ওঠে গাছের প্রশ্রয়ে। একেকটি বৃক্ষ যেন আমাদের যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। শক্তিশেলে মূচ্ছিত আমাদের এই জীবনে বৃক্ষরা সেই বিশল্যকরণী যা আমাদের সুস্থ্য করে রাখে। আমরা হেঁটে হেঁটে তাদের কাছে যাই, তাদের স্পর্শ পাই।

হাঁটা হলো জীবনযজ্ঞ আর বৃক্ষ হলো জীবনবেদ, আমাদের নৈঃশব্দ্যের চিরন্তন স্মারক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন