রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

কুলদা রায়ের গল্প : হারানো চাঁপার খোঁজে

নতুন বাড়িটার চিলেকোঠাটা বেশ বড়। সেটা মেয়ে বেছে নিয়েছে। সঙ্গে রয়েছে একটা স্টোর রুম। পুরনো বাড়িওয়ালা সেটা পরিস্কার করে দিয়েছে। শুধু রেখে গেছে বড়ো একটা সিন্ধুক। রাজকীয় তার সাজ। এটাও ফেলে ফিতে চেয়েছিল। কিন্তু এন্টিক বলে আমার মেয়ে রেখে দিয়েছে।

সেদিন ঠিক দুপুর পড়ে এলে মেয়েটা এটিক থেকে চেঁচিয়ে উঠল। ছুটে গিয়ে দেখলাম ঝুঁকে পড়ে সে একটা অয়েল পেইন্টিং দেখছে। সেটা সিন্ধুকের মধ্যে ছিল। ফ্রেম বেশ পুরনো। ছবিতেও বেশ ময়লা পড়েছে। সেটা পরিস্কার করতেই, একটি সাদা তরুণী মেয়ের ছবি ভেসে উঠল। তার গোলাপী চিবুক। হাল্কা সোনালী চুল। কানে হীরের দুল। 

হাসি হাসি মুখ। যেন এখনি কথা কয়ে উঠবে। 

আমার মেয়েই আবিষ্কার করল, ছবির নিচে ইটালিক অক্ষরে লেখা আছে-- রোজ ট্রেমেইন। এটা শিল্পীর নাম নয়। শিল্পীর স্বাক্ষর আছে নীচে ডান দিকে-- উইলিয়ামস ট্রেমর। এই হেতু ছবির মেয়েটিরই নাম রোজ। 

আগের বাড়িওয়ালী হাবিবা রুথ কালো। এরকম সোনালী চুলের কেউ তার থাকার নয়। তাকে ফোন করে ছবিটার কথা করলাম। সে জানালো, ওই সিন্ধুকটার মালিক সে নয়। তার দাদী বুড়ি যার কাছ থেকে কিনেছিল তাদের কাছ থেকেই ছবিটা পেয়েছিল। তারাও বলতে পারেনি ছবিটা কার।

তবে রুথের পরামর্শ মোতাবেক স্থানীয় কুইনস লাইব্রেরীতে খোঁজ নিলাম। তারা কম্পিউটার আর্কাইভে সার্চ দিয়ে রোজ ট্রেমেরিনের খোঁজ দিল--

রোজ ট্রেমেরিন জন্ম ১৯৪৩ সালে ২ রা আগস্ট। লন্ডনে। তার পরদাদাজানের নাম উইলিয়াম থমাস। তিনি ইয়র্কের আর্যবিশপ হিসেবে জয়েন করেন ১৮৬২ সালে। সে সময়ে জোড়াসাঁকোতে নাতির প্রথম জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেট প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নাম্মী এক ভারতীয়ের পক্ষে টেগোর এন্ড কোংএর ট্রাস্টি বাকিংহাম প্যালেসে একটি পার্টি দিয়েছিল। সেই নাতি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল অর্জন করেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। আর উইলিয়ামসের ছেলের নাতনি রোজ এর দু বছর পরে জন্ম নিয়ে ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ছোট গল্পকার হিসেবে বিখ্যাত হন। 

রোজ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য পাওয়া গেল--

রোজের ব্যক্তিত্ব ছিল দ্যূতিময়। ব্যবহার ছিল গোলাপ ফুলের মতো কোমল। তিনি গোলাপ প্রেমী হিসেবে ইরাণ দেশ থেকে মোগলাই গোলাপগাছ এনে বাগানে রোপন করেছিলেন। এজন্য স্থানীয় বৌদ্ধিক পরিষদে তিনি রোজ কুইন ওরফে গোলাপ সুন্দরী নামে পরিচিত ছিলেন। 

রোজের কবরের ঠিকানাও তারা দিতে পারল। রিচমন্ড হীলের শান্ত মনোরম কবরস্থানে রোজ ঘুমিয়ে আছে। তার নামের নিচে জন্ম মৃত্যু তারিখ। আর তার নিচে লেখা কবি, গল্পকার। আর রয়েছে কয়েকটি গোলাপের ঝাড়। গোলাপ ফুটেছে। চারিদিকে ঘ্রাণ ভেসে যাচ্ছে। এপিটাপে লেখা--
Once met never forgotten. 

 মেয়ে শুধাল, রোজ নামটি কি সুন্দর তাই না বাবা? 

--হ্যাঁ। আমি তার চুলে হাত দিয়ে জবাব দিলাম। 

মেয়েটি কুইনস ম্যাথ এন্ড সায়েন্স হাই স্কুলে যায়। তার ক্লাশে পৃথিবীর নানা দেশের ছেলে মেয়েরা পড়ে। সে হিসেব করে বের করল, তাদের ক্লাশে তিনজনের নাম ফুলের নামে। ডেইজি-- সুইডেনের মেয়ে। নারগিস--ইরানী। সে সুন্দর গান করে। আরেকটি মেয়ের নাম টিউলিপ। বাড়ি হল্যান্ড। তাদের পারিবারিক টিউলিপ ফুলের ফার্ম আছে। ফিলিপাইনের মেয়েটির নাম চেরী। সে ছবি আঁকতে পারে। ক্যালকুলাসের হালকা পাতলা টিচারকে সবাই জিনিয়া বলে ডাকে। 

--জিনিয়া নামে আমাদের পাড়ায় একটি মেয়ে ছিল। আমার মেয়েকে বলি। সে ছিল নতুন মিয়ার ভাস্তি। আমাদের চেয়ে বড়ো। বেলবটম প্যান্ট পরত। ভয়ডর ছিল না। একবার কে একটা ছেলে খারাপ কথা বলেছিল তাকে। সেজন্য জিনিয়া আপা তাকে পিট্টি দিয়েছিলেন। 

শুনে আমার মেয়ে হেসে ফেলে। বলে কুংফু জানত জিনিয়া?

--না। সেকালে কুংফু ব্যাপারটা মফস্বলে আসেনি। এরপরে জিনিয়ার বিয়ে হয়েছিল এক দারোগার সঙ্গে-- চট্টগ্রামে। সেখানে দুটি বাড়ি আছে। গাড়ি আছে। 

--গাড়ি চালাতে জানতেন উনি?

--না মনে হয়। ড্রাইভার আছে। গাড়ি করে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতেন। 

মেয়েকে বলি, তবে রোজ নামটা মেয়েদের হয়না। রোজি হয়। সিনেমায় রোজি সামাদ নামে একজন অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। এজন্য পাশের পাড়ার সালেক চাচা মেয়ের নাম রেখেছিলেন রোজি। আমাদের বয়সী হলেও তাকে সবাই রোজি খালা বলে ডাকা হতো। এটা তার পছন্দ ছিল না। আমাদের সঙ্গে খুব ঝগড়াঝাটিও করেছিল। তার বিয়ে হয়েছিল একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে। এই দু:খে সে বাপের বাড়িই আসত না। খুব অল্প বয়সেই সে বিধবা হয়। তিনটি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে হয়েছিল। সালেক চাচা তাকে বাড়িতে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রোজি আসেনি। শুনেছি--একটি স্কুলের আয়ার কাজ নিয়েছিল। স্কুলের ছোটো ছেলেমেয়েরা তাকে রোজি খালাই ডাকত। এই ডাকে সে খুশিই হতো।

--ডেইজি নামের কেউ ছিল না? শুধায় মেয়ে।

- ছিল। ছিল। আমি একটু চিন্তা করে বলি। ডেইজি আর শিউলি-- দুই বোন। নতুন স্কুলের পাশে দেওয়াল ঘেরা বাড়ি। ডেইজি গান করত। আর শিউলি কবিতা আবৃত্তি করত। শিল্পকলা একাডেমির রবীন্দ্র নজরুল জন্ম জয়ন্তীতে ডেউজি গান গেয়েছিল-- শিউলি ফুল, শিউলি ফুল

কেমনে ভুল।

আর শিউলি পড়েছিল রবি ঠাকুরের ক্যামেলিয়া নামের কবিতা। 

--ক্যামেলিয়া? মেয়ে অবাক হয়। বাহ, খুব সুন্দর তো। গুগল ঘেটে ক্যামেলিয়া ফুলটি দেখে নিল। গোলাপ ফুলের মতো দেখতে। তবে পাপড়ি কয়েক স্তবকে সাজানো। ডালে কাঁটা নেই। বড় বড় পাতা। 

আমার মেয়েটি একটু দু:খ করে বলল, তাদের ক্লাশে ক্যামেলিয়া নামের কেউ নেই।

এমনি সারা স্কুলেও খুঁজে পায়নি ক্যামেলিয়া নামের কোনো মেয়েকে। কৌতুহল ভরে জিজ্ঞেস করল, ক্যামেলিয়া নামে কি কাউকে তুমি চেনো? 

--ক্যামেলিয়া? ক্যামেলিয়া নামে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি শোনাই,--

নাম তার কমলা,
দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।
সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায়।
আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে।
মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়,
আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নীচে।
কোলে তার ছিল বই আর খাতা।
যেখানে আমার নামবার সেখানে নামা হল না।’ 

শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। ‘ক্যামেলিয়া নামের অর্থ নির্দেশক লাইনটি যখন এলো, তখন সে অবাক হয়ে জানতে চাইল সত্যি সত্যি এই ফুলের সহজে মন মেলে না?

আমি হেসে ফেলি। বলি, এটা কবির কল্পনা। তাকে বলি, আমাদের কালে ক্যামেলিয়া মুস্তফা নামে একজন আবৃত্তিকার এই কবিতাটি টেলিভিশনে করেছিলেন। সেই থেকে মনে গেঁথে আছে। 

মেয়েটি বিড়বিড় করে বলল, ক্যামেলিয়া ফুলের গাছ ফ্রন্ট ইয়ার্ডে জানালার পাশে লাগাবে। 

কিন্তু বহু সন্ধান করেও এখানকার কোনো নার্সারিতে তার চারা পাওয়া গেল না। 

ফুলের নামে আমার পরিচিত আর কে কে আছে সেটা বলতে আমার ছোট মেয়ে বায়না ধরল। লক্ষ্য করলাম, আমার পাঁচ বোনের কারো নামই ফুলের নামে নয়। এক পিসি ছিল নাম পদ্ম। রান্নায় তার খুব নাম ছিল। এলাকায় বিয়ে বাড়ি, অন্নপ্রাশন, জামাই ষষ্ঠীতে তার ডাক পড়ত। এক সময়ে লঞ্চঘাটে একটা হোটেলও খুলেছিলেন পিসেমশাই। পদ্ম হোটেল ছিল তার নাম। খুব জনপ্রিয় ছিল হোটেলটি।

--পদ্মপিসি কি বেঁচে আছেন?

-- জানি না। দূর সম্পর্কের পিসি। বিদেশ থেকে খবর নেওয়া হয়না। 

মেয়ে বলল, কোনো সমস্যা নেই। ফেসবুকে সার্চ করো নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে। 

হা হা করে হেসে উঠি। পদ্মপিসি লেখাপড়াই জানতেন কিনা সন্দেহ। ফেসবুকে নাম লেখানোর কোনো প্রশ্ন আসে না। 

মেয়ে অবাক হলো। জানাল--একালে সবারই ফেসবুক আছে। ওর পাকিস্তানী বন্ধু হাসনু হেনার দাদী আম্মারও ফেসবুক একাউন্ট আছে। হেনাই খুলে দিয়েছে। সেখানে দাদী আম্মার ছবিটবি শেয়ার করে। তার মেয়েজামাই নাতিনাতনি সেটা দেখে। দাদী আম্মার হালফিল সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকে।

জিজ্ঞেস করলাম, হাসনার নামটি কে রেখেছে, তুমি জানো?

মেয়ে বলল, দাদী আম্মা। বলেছে হাসনা। 

আমার মেয়েকে বলি, আমাদের প্রতিবেশী লিচুর দুই বোনের একজনের নাম হাসনা। আরেকজনের নাম হেনা। হাসনা খুব শান্ত। একটু বড়ো হয়ে গেলে দিনের বেলায় তাকে আর দেখা যেতো না। ছোটো হেনা বাড়ির সামনে পেয়ারা তলায় খেলত সারাদিন। আর সন্ধ্যাকালে গভীর জ্যোৎস্না উঠলে হেনা হাততালি দিয়ে উঠত, হাসনা। হাসনা। 

তখনি হাসানাদের দোতলার জানালা খুলে যেতো। সেখানে আলো ছায়া। তার মধ্যে একটি হাসি হাসি মুখ। সেই মুখ হাসনার। অপার বিস্ময় নিয়ে বর্ষার সন্ধ্যায় ভেজা জ্যোৎস্নায় হাসনাহেনা ফুল দেখতে চাইছে। এর মধ্যে হেনা উচ্চস্বরে বলত, হাসনা ফুটেছে।
বাসনা ছুটেছে। 
সেটা শুনে ভেতর বাড়ি থেকে ওদের দাদীজান গাঢ় স্বরে ডেকে উঠত, হাসনা, পর্দা ভেঙ্গো না। 
তখনি খোলা জানালাটা বন্ধ হয়ে যেতো। কিন্তু চারিদিকে হাসনাহেনা ফুলের সৌরিভ ভেসে বেড়াত।

এই মায়াময় সৌরভে গর্ত থেকে সাপ বের হয়ে আসে। সেই সাপ বড়ো বিষধর। এই ভয়ে হাসনাহেনাদের বাড়ির কাছে কেউ ঘেষতে সাহস পেতো না। তাদের বাড়ির গেটটাও থাকত তালা মারা।

সাপের কথা শুনে আমার ছোট মেয়েটি একটু ভয় পায়। বলে, হাসনাহেনাদের ভয় করত না?
--না। আমি মেয়েকে বলি। তারা ভয় পেতো না। সাপ তো তাদের চিনত। তাছাড়া আমরা পাড়ার ছেলেরা শুনেছিলাম, এই সাপগুলো আসলে সাপ নয়। কোহেকাফের কালো জ্বিন। হাসনাহেনাদের দিকে যাতে কেউ নজর না দিতে পারে সেজন্য দাদীজানের এক পীরবাবা জাদু দিয়ে দুটো কালো জ্বিনকে সাপ বানিয়ে রেখেছিল। কেউ দুবোনকে ঝামেলা করতে এলেই ঠোক্কর দেবে। ফিনিস।
-- এইসব জ্বিনপরী তোমরা বিশ্বাস করো? 
-- সেকালে করতাম। কিন্তু এখন করি না। তবে--
-- তবে কী বাবা?
-- একবার বর্ষা থেমেছে। চারিদিকে ভেজা পাতা থেকে জল ঝরছে। ফিনিক দিয়ে জ্যোৎস্না উঠেছে। ঠাণ্ডা পেয়ে দাদীজান ঘুমিয়ে পড়েছে। দরোজা খুলে হাসনা একা একা দোতলা থেকে উঠোনে নেমে এসেছে। এসেছে হাসনা হেনা গাছটির কাছে গেছে।

তখনো ফুল ফোটেনি। ফুটবে ফুটবে করছে। বহুদিন পরে একটু নিচু হয়ে কলিগুলোর কাছে মুখটি নিয়েছে। একটা হাওয়া উঠেছে পূব দিক থেকে। গভীর ঘুম এসেছে তার চোখে মুখে। 

পরদিন ভোরবেলায় লিচুদের বাড়ির উঠোনে ঝরে থাকা হাসনাহেনা ফুলের ভেতরে এলিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল হাসনাকে। হাসি হাসি মুখ। চারিদিকে ফুলের সৌরভ।

দাদীজান আছাড়ি বিছাড়ি খেয়ে কালো জ্বিন দুটোকে শাপশাপান্ত করছে। নিচুপাড়ার সাপুড়ে ওঝা হরিশচন্দ্র এসে হাসনার মুখটিকে ভালো করে দেখল। ঠোঁটের নিচে দুটো রক্তের ফোঁটা। ওঝা কিছু না বলে চলে গেল। বাড়ির গেটটা খোলাই রইল। পাড়ার সবাই খবর পেয়ে খোলা গেট দিয়ে দেখতে এলো। তাদের মুখগুলো ছিল কালো। 

এই প্রথম আমরা পাড়ার ছেলেরা বড়োবেলার হাসনাকে নিয়ে গোরস্থানের দিকে রওনা হয়েছিলাম। আমাদের চোখে ছিল বৃষ্টির মতো জল।

শুনে আমার মেয়ের মন খারাপ হয়ে গেল। বলল, ভেরি স্যাড। ভেরি স্যাড।

আমার মেয়ের মন ভালো করার জন্য এবার তাকে বকুলদের কথা বলি। 

বকুলদের বাড়ি ব্যাঙ্কপাড়া। বিকেল হলেই বকুল একটি কালো সাইকেল নিয়ে বের হতো। সঙ্গে ওর মা। মায়ের নাম শিমুল। গার্লস স্কুলের দিদিমনি। খুব রাশভারী। তাকে দেখলে ছেলেপেলেরা কাছে ঘেষত না। গোল পুকুর পাড়ের চারিদিকে বকুল সাইকেল চালাত। ওদের বাড়ির সামনে একটি আরবি ঘোড়াও বাঁধা থাকত। ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতো। আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে মুখ করে হ্রি হ্রি করে ডাক দিত। সেই ডাক শুনে বকুলের বাবা হাক ছাড়তেন, ওয়ার্দা। ওয়ার্দা। 

ঘোড়াটির নাম ওয়ার্দা। নিজের নাম শুনে ঘোড়াটির কেশর ফুলে উঠত। তার রঙ হালকা গোলাপী। ওয়ার্দা আরবি শব্দ। অর্থ গোলাপ। তারপর গোল পুকুরের পাড়ে বকুলের পাশে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ধীর ধীর হাওয়া খেতো ওর বাবা। গলায় বাঁধা থাকত একটি গোলাপি স্কার্ফ । 

বকুল পরে ঢাকায় পড়তে যায়। সেখান থেকে লন্ডনে।

ব্যারিস্টার হয়েছে। জাতি সংঘের মানবাধিকার শাখার পরিচালক। নিউ ইয়র্কে বছর পাঁচেক আগে দেখা হয়েছিল। গুগল সার্চ দিয়ে ব্যারিস্টার বকুলের ছবিসহ প্রোফাইল খুঁজে বের করল আমার মেয়ে।

বকুলদের বাসার পাশেই ছিল চামেলী দিদির বাসা। তার বাবা ছিলেন পুরনো কমিউনিস্ট। জেল খাটতে খাটতে তার জীবন গেছে পুরো পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর। ছাড়া পেলেও জেল গেট থেকেই আবার গ্রেফতার হতেন। ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময় মুক্তি পান। তবে একাত্তর সালে তাকে খান সেনারা গুলি করে হত্যা করে। দেশ স্বাধীনের পরে চামেলি দিদি কলেজে পড়ত। বাবার মতোই মিছিল মিটিং করে বেড়াত। বক্তৃতা দেওয়ার সময় নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিত। এই চামেলী দিদির কাছ থেকেই আমরা গোর্কির মা উপন্যাসটি পড়েছি। পড়েছি তুর্গেনিভ। দস্তয়েভস্কি। তলস্তয়। একবার জেলেও গিয়েছিলেন তিনি। অনেক রাত্রিরে জ্যোৎস্নাকালে জেলখানার পাশে গেলে শোনা যেতো দৃপ্ত ভঙ্গিতে চামেলী দিদির গলা--

‘’যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর
তা আজও আমরা দেখেনি
সব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠেনি
আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো
আজও আমরা পাইনি
মধুরতম যে কথা আমি তোমাকে বলতে চাই_
সে কথা আজও আমি বলিনি।’...

শুনে আমার মেয়ে মুগ্ধ। শুধালো, তোমার চামেলী দিদি এখন কোথায়?

--সেটা তো জানিনা। উত্তরে বললাম। আমি যখন ময়মনসিংহে পড়তে চলে যাই তখনো তিনি জেলেই ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্রমামলা ছিল। নানা জেলখানায় বদলি হতেন। বিয়ে করারও সময় পাননি। বলতেন, বিপ্লবীর আবার বিয়ে কীরে! 

--তবে--

--তবে?

--চামেলিদিদিদের বাড়ি ছিল মধ্যপাড়ায়। বেশ বড়ো তাদের বাড়ি। তার মা আর একটা ছোটো ভাই ছিল। 

স্কুলে পড়ত। নাম ছিল অশোক। অশোক ফুলের নামে নাম। কিন্তু চামেলী দিদি বলত, অশোক ফুল নয়-- ওর নামের অর্থ ন--শোক। যার শোক পেতে নেই। কোনো কিছুতেই শোক পাবে না। বাবাকে হারিয়েছে। জেঠাকে হারিয়েছে। মাকে হারাবে। আমাকেও হারাবে। কিন্তু অশোক থাকবে অবিচল। বুক চিতিয়ে বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাবে। 

আমার মেয়ে শুনে বলে, বাহ। একদম চে গুয়েভারার মতো। 

আমাদের ছোটো সেই শহরে, ফুলের নামের ছিল ছড়াছড়ি। কেতকী, মাধবী, জুই, বেলি, টগর, অপরাজিতা, কামিনী, অতসী, লিলি, মহুয়া, কেয়া। আরেকটি মেয়ের নাম ছিল গুলমোহর বানু। ওরা বিহার প্রদেশ থেকে এসেছিল। লেপ তোষকের দোকান ছিল ওদের। 

-- গুলমোহর মানে কি??

--কৃষ্ণচূড়া ফুল। বানু মানে মেয়ে। কৃষ্ণচূড়া ফুলের মেয়ে। 

মেয়ে বলে, বাহ। কী সুন্দর নাম। 

-- কিন্তু বিহারী বলে ওদের সঙ্গে শহরের লোকজন বিশেষ মিশত না। তবে কেউ ওদের ঘাটাতও না। ওদের বাপদাদারা সব সময় কোমরে ছুরি গুঁজে রাখত। যখন তখন যে কাউকে খুন করে বসতে পারে। কিন্তু গুলমোহর ছিল খুব মিষ্টি মেয়ে। পাড়ার ভাই ব্রাদাররা লুকিয়ে ভালবাসত তারে। আর তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে সে গাইত, হাওয়া মে উড়তা যায়ে

মেরা লাল দোপাট্টা মল মল….

মেয়ে হেসে ফেলে। বলে, গুলমোহর বানু কি লাল ওড়না পরত?

--না, তাকে কখনো লাল রঙের ওড়না পরতে দেখিনি। বাড়ির বাইরে এলে বোরকা পরত। চোখের জায়গায় কালো গ্লাশ পরা থাকত বলে তার মুখ দূরে থাকুক চোখ দুটোও কেউ দেখতে পেতো না। 

এই গুলমোহরের চোখ দুটো আমার দেখার সুযোগ ঘটেছিল একবার। ঠিক একবার নয়-- দুবারই হবে মনে হয়। 

আমাদের কাকীমার নাম ছিল পারুল। তিনি সুন্দর করে পাঁচালি পড়তেন। বাড়ি বাড়ি তার ডাক পড়ত। পারুল কাকিমা কিছু তুকতাক জানত। কারো চোখ উঠলে, বাও বাতাস লাগলে, হাম হলে বা ভয় পেলে কাকীমা ফুফা দিত। তাতেই সবাই ভালো হয়ে যেতো। এমনকী কাকীমা মেয়েদের হিস্ট্রিয়া রোগেরও নিদান দিতে পারত। এটা নিয়ে কিছু লুকোছাপা ছিল। 

সে সময়কার এক ভোর ভোর বাড়ির সামনে একটি রিকশা থামল। রিকশাটির চারিদিকে কাপড় দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কারা আছে দেখা যায় না। সবে আমাদের ঘুম ভেঙেছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছি কেউ নামছে না। কাছে যেতেই রিকশার ভেতর থেকে উর্দু টানে একজন মহিলা বললেন, পারুল দিদি আছে?


--আছে। একটু উঁচু স্বরে বললাম। বাড়ির মধ্যে আইসা পড়েন। 

আমার গলা শুনে পারুল কাকীমা তুলসিতলা থেকে উঠে এলো। তাকে দেখে কাপড়ের ঘের থেকে বয়স্ক বোরকাওয়ালী বেরিয়ে এলেন। কাকীমাকে সালাম জানিয়ে ব্যাকুল গলায় জানালেন, তার মেয়েটিকে মাঝে মাঝে জ্বিনে ধরে। কোর্ট মসজিদের ইমাম সাহেব ফিকির করেছিলেন। কিন্তু ভালো বোধ হচ্ছে না। তাই পারুল দিদির কাছে নিয়ে এসেছে। তিনিই এখন শেষ ভরসা। 

মেয়েটি মায়ের গায়ে এলিয়েছিল। তার কাছে এসে পারুল কাকিমা মেয়েটির মুখের কালো নেকাবটি তুলতে গেল। আর তার মা আঁতকে চেচিয়ে উঠল, নেহি নেহি। বেয়াব্রু না করো।

কিন্তু ততক্ষণে নেকাবটি পারুল কাকি খুলে ফেলেই আবার ঝপ করে বন্ধ করে দিল। আমরা ততক্ষণে তার মুখটি দেখে ফেলেছি। ক্লান্ত মুখ। দুই চোখে কালো চশমা। কালি কালি তাদের চারিপাশ। মরে যেতে দেরি নেই। 

পারুল কাকিমা মেয়েটিকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল। তার মাকেও ঢুকতে দিল না। ঘণ্টাখানেক পরে মেয়েটিকে নিয়ে পারুল কাকিমা বেরিয়ে এলো। তার মায়ের হাতে দিয়ে বলল, আর ভয় নেই। ভুত তাড়িয়ে দিয়েছি। 

দাঁড়ানো রিক্সায় বোরকাওয়ালী মা আর মেয়েটি উঠে পড়ল। যেতে যেতে একবার মেয়েটি পিছন ফিরে মুখের নেকাবটি খুলে আমাদের দিকে তাকালো। চশমাটি নেই। সেই ক্লান্তি নেই। উজ্জ্বল দুটি চোখ। কৃষ্ণচূড়ার রঙ মাখা মুখ। আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিচ করে নি:শব্দে হেসেও উঠল। তার মা কড়া করে ধমকে উঠল, গুলমোহর। আব্রু করো। 

আর মেয়েটির মুখ আবার ঢাকা পড়ল। রিকশাটি চলে গেল। যেতে যেতে এক ফাঁকে তার সেই কালো চশমাটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেল। আর কখনো দেখা হয়নি এ শহরে। পারুল কাকিমাই বলেছিল, গুলমোহরের বিয়ে হয়ে গেছে খুলনায়। ভালো আছে। ঝামেলা নেই।

আমাদের প্রতিবেশী হরেণ মোক্তারের মেয়ের নাম ছিল মালতিবালা। আমাদের সঙ্গেই পড়ত। খুব হাসি খুশি ছিল। ক্ষণে ক্ষণে খিল খিল করে গড়িয়ে পড়ত। নিজেদের বাড়িতে থাকতই না। ছুটে ছুটে আমাদের বাড়িতে আসত। সেই মালতিবালাই গুলমোহরের কালো চশমাটি কুড়িয়ে নিয়েছিল। ওড়নায় ঘষে সাফসুতারো করে রাখত। কিন্তু কখনোই চোখে দেয়নি। কেনো দেয়নি তার কোনো কারণও বলেনি। বললেই হেসে হেসে গেয়ে উঠত--

মধু মালতি ডাকে আয় ফুল ও ফাগুনের এ খেলায়,
যূথী কামিনী কত কথা গোপনে বলে মলয়ায়।।

চাঁপা বনে অলি সনে লুকোচুরি গো লুকোচুরি,
আলো ভরা কালো চোখে গো কি মাধুরী গো কি মাধুরী।
মন চাহে যে ধরা দিতে তবু সে লাজে সরে যায়।।

'চাঁপা' শব্দে এসে একটু হেসে উঠত। সেটা দেখে আমরা অবাক হয়ে শুধাতাম, হাসলি কেনো?

গান থামিয়ে হাসি হাসি মুখেই বলত, চাঁপা হলো চাঁপা। দোলন চাঁপা, কাঠালি চাঁপা, ভূঁই চাঁপা, কনক চাঁপা, স্বর্ণচাঁপা, নাগেশ্বর চাঁপা, গুলঞ্চ চাঁপা, হিমচাঁপা। 

এগুলো ফুলের নাম। এর কোনো কোনোটি আমাদের এলাকায় আছে। আর কোনো কোনো নেই। কিন্তু নাম শুনেছি। এর মধ্যে গুলঞ্চ চাঁপা হলো কাঠ গোলাপ। আর হিমচাঁপা হলো উদয় পদ্ম। চাপা জানে। ওর মামা বোটানির শিক্ষক। থাকেন বরিশালে। এই মামার কাছ থেকেই চাঁপা নামের ফুলের কথা জেনেছে মালতি। 

তবে মালতি বলে, এই গানের চাঁপা ফুলটি হলো ফুলবদিনা গ্রামের মেয়ে। তার দূর সম্পর্কের পিসাতো বোন। হরিদ্রা বর্ণের মুখ তার। সে হেঁটে গেলে মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। এই ঘ্রাণ কাঁঠালিচাঁপা ফুলের। এই চাঁপা এলে গুলমোহরের চশমাটি তাকে দেবে। তার চোখেই মানাবে। সে কখনো শহরে আসেনি। 

শুনে আমাদের শ্বাস ঘন হয়ে আসে। নাকে ঘাম জমে। শুধাই, কবে, কবে আসবে চাঁপা? 

--আসবে। আসবে। কোনো এক গ্রীষ্মে। বর্ষায়। অথবা হেমন্তে। নেচে নেচে গান শোনাবে। 

আমরা সারা শহর তন্ন তন্ন করে কাঠালি চাঁপা ফুলের গাছ খুঁজতে শুরু করি। ছত্তার মোল্লার বাসায় দুটো কাঠালি চাঁপার গাছ ছিল। বন্যায় মরে গেছে। চন্দ্র গোসাইর আশ্রমে অনেক ফুলের গাছ আছে। গোসাই বলেন, এ গাছটি ছিল বটে। কিন্তু বাগের হাটের আমিরুদ্দিন খাঁ মাটি খুড়ে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘোরাঘুরি দেখে মালতিবালা বলে, ফুলবদিনা গ্রাম থেকে আসার সময় চাঁপা কাঠালিচাঁপা নিয়ে আসবে। 

--শুধু ফুল?

-- ফুলও আনবে। আবার চারাও আনবে। নিজের হাতে চারা লাগাবে। এ শহর কাঠালি চাঁপার ঘ্রাণে ভেসে বেড়াবে। 

আমরা চাঁপার জন্য অপেক্ষা করি। চাঁপা ফুলটির জন্য অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করি চাঁপা গাছটির জন্য। অপেক্ষা করি গ্রীষ্মে, বর্ষায় এবং হেমন্তে। অপেক্ষা করি বছর থেকে বছর। আমারা হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুল প্যান্ট ধরি। আমাদের ঠোঁটের উপরে গোঁফ ঘন হয়ে উঠে। গলা ভেঙে যেতে থাকে। মালতি শাড়ি পরে মাঝে মাঝে মালতিবালা হয়ে ওঠে। 

এরই মধ্যে একদিন মালতিদের বাড়ির চারিদিকে তড়িঘড়ি করে উঁচু বেড়া ওঠে। সামনে গেট। গেটে তালা পড়ে। বাড়ির লোকজন সতর্ক হয়ে চলাফেরা করে। মনে হয় কী একটা গুপ্ত ঘটনা ঘটে চলেছে অগোচরে।

মালতিকেও আর বাড়ির বাইরে দেখা যায় না। মাঝে মাঝে তার গলা শোনা যায়। আগের মতো ফুল্ল গলা নয়-- চাপা গলা। চাপা লয়ে ভেতর বাড়িতে কথা বলে। একদিন বেড়ার ফোকর থেকে তাকে ধরি। শুধাই, কী হয়েছে?

বেড়ার ওপাশ থেকে মালতি ফিসফিস করে বলে, সে এসেছে। 

আমরা অবাক হয়ে বলি, কে এসেছে? 

--চাঁপা এসেছে। 

--চাঁপাকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো? 

এর জবাব মালতি দিল না। তার বদলে বেড়ার উপর দিয়ে একটি সাদা মুখের বেড়াল উচিয়ে দেখাল। বেড়ালটি গলায় কুঁচফলের মালা পরানো। এ বিড়ালটি এ পাড়ায় কখনো দেখিনি। আমাদের উদ্দেশ্যে মালতি বলে, ঘ্রাণ পাচ্ছ?

--কিসের ঘ্রাণ?

--কাঠালি চাঁপার ঘ্রাণ। 

আমরা মাথা নাড়ি। কোনো ঘ্রাণ পাই না। মালতি তাড়াহুড়া করে বলে, সময় নেই। বাবা এসে পড়বে। জোরে জোরে শ্বাস টানো। 

আমরা জোরে জোরে শ্বাস টানি। ঘরের ভেতর থেকে মালতির মায়ের গলা শুনতে পাই। সে বিড়ালটি নিয়ে সাৎ করে চলে যায়। আমরা ঘ্রাণ পাইনা। তবে কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মালতি যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে বলে গেছে, পাবে পাবে। কোনো ভুল নেই। চাঁপা এসেছে। কুঁচ ফুলের মালা গলায় দিয়ে চাঁপার বিড়ালটি এসেছে। কাঠালি চাঁপাও এসেছে।

এরপরে সেই আধো অন্ধকারে শান্ত স্নিগ্ধ মৃদু জ্যোৎস্নায় আমরা সত্যি সত্যি যেন কাঠালি চাঁপা ফুলের ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছি।

সেই ঘ্রাণের সঙ্গে ভেসে আসছে কিন্নর কণ্ঠ--

মালা হয়ে প্রানে মম কে জড়ালো কে জড়ালো,
ফুল রেনু মধু বায়ে কে ঝরালো কে ঝরালো।
জানি জানি কে মোর হিয়া রাঙালো রাঙা কামনায়।।

আমরা অপেক্ষা করি, এ বাড়ির দেওয়াল উবে যাবে। বাইরে জ্যোৎস্না উঠবে। তার মধ্যে ঘুঙুর পরে চাঁপা বেরিয়ে আসবে। নেচে নেচে গানটি গাইবে। 

আমাদের সারা শহরের মানুষজন এই বাড়ির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাতে লাগল। কেউ কেউ সন্দেহ করল, এ বাড়িতে গ্রাম থেকে কোনো একটি মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে। সে হয়তো কোনো যুবকের প্রেমে পড়েছিল। হয়তো সে যুবকটির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ষঢ় করেছিল। হয়তো পালিয়েও গিয়েছিল। পরিবারের লোকজন তাকে ধরে এনে রেখেছে এ বাড়িতে। তাকে তার প্রেমিকের সঙ্গে যেতে দিতে চায় না। কেউ কেউ ভাবল, এ মেয়েটিকে হয়তো কেউ জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিতে চায়। জোর করে বিয়ে করতে চায়। বাবা মা এই নাবালিকা মেয়েটিকে রক্ষা করতে শহরে নিয়ে এসেছে। কারো কারো ধারণা, মেয়েটিকে কে বা কারা ধর্ষণ করতে পারে। হয়তো ধর্ষিত হয়েছে। কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে ভাবল, মেয়েটি গর্ভবতী হয়েছে। তবে কারো কারো বিশ্বাস এলাকার নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় আক্রান্ত হতে পারে ভেবে ঘরবাড়ি ছেড়ে মেয়েদের নিয়ে শহরে পালিয়ে এসেছে। এইরকম নানা গুজবে সারা শহর জুড়েই ফিসফাস হতে লাগল। এগুলো আমাদের ভালো লাগল না। আমাদের মনে হলো, ও বাড়িতে যাওয়া দরকার। ওদের খোঁজ খবর নেওয়া দরকার। চাঁপাকে দেখা দরকার। দরকার তার কাছ থেকে কাঠালি চাঁপা ফুলগুলো নেওয়া-- চারাটির দেখভাল করা। শহরের লোকজন বাড়িটিকে দূর থেকে নজর করছিল। তারা আমাদেরকে যেতে বাঁধা দিল। বলল, পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। ঝামেলা হতে পারে। 

কী ঝামেলা সেটা বোঝার মতো বয়স আমাদের হয়নি। আমরা ততদিনে চাঁপা ফুলটির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। মনে হলো এইভাবে দূরে থাকলে চাপা ফুলটিকে হারিয়ে ফেলব। চাঁপাকে চোখের দেখা পাবো না। একদিন খুব ভোর ভোর মালতিকে বেড়ার বাইরে থেকে ডাক দিলাম। কোনো উত্তর এলো না। ওদের গেটের তালাটির কাছে আসতেই দেখা হলো তালাটিতে চাবি দেওয়া হয়নি। ঘরের দরোজা সামান্য ঠেলতেই খুলে গেল। তখনো অন্ধকার হয়ে আছে। আমরা দরোজার দিকে মুখ করে জোরে জোরে হেঁকে উঠলাম-- চাঁপা। চাঁপা!

কোনো সাড়া এলো না। আমাদের ভয় করতে লাগল। একটা বদ হাওয়া ঘুরে এলো। আর ঘরের দরোজাটিও ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল। বাঁড়িটি ফাঁকা। রান্নাঘরে কয়েকটি কাটা সবজি গামলায় পড়ে আছে মাত্র। মালতিও নেই--চাঁপাও নেই। দুটি চুল বাঁধা ফিতে বিছানার উপর গড়াচ্ছে। কেউ কোথাও নেই। হাওয়ায় উবে গেছে। সেটা দেখে আমাদের কান্না পেলো। সেই প্রথম আমরা সবাই সত্যিকারের কান্না করতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম কান্না ছাড়া আমাদের আর কিছুই নেই। সেটা ভেবে আজ আবার এই মধ্য বয়সে কান্না এলো।

দেখে আমার মেয়ে অবাক হয়ে বলল, কাঁদছ কেনো? 

বললাম, কাঁদছি না তো। বলতে বলতে আবার চোখ বেয়ে জল ঝরতে লাগল।

মেয়ে কী বুঝল কে জানে। বলল, দেশ থেকে ঘুরে এসো। নিশ্চয়ই চাঁপার সন্ধান পাবে। 

হয়তো পেতে পারি। নাও পেতে পারি। তবে চাঁপার জন্য যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

-------------------------------------------------------------------------------------------------
বহু বছর পরে দেশে ফিরছি রিপভ্যান উইংক্যালের মতো। চেনা শহরটি আর নেই। গাছপালা, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর আর মানুষও সব পালটে গেছে। 

শহরে ঢোকার মুখে একটি একটি ঘোড়ার ভাস্কর্য বসেছে। কেশরটা হালকা গোলাপী। বাংলায় লেখা-- ওয়ার্দা। জন্ম--। মৃত্যু--১৯৮৫ ইসায়ী সাল। 

তোমার তরে হয়েছিলাম শিশুবেলার পরী।

সেই গরবে ওয়ার্দা তোমায় সারাজীবন স্মরি।।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, ঘোড়াটি কিছুদিন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পশুচিকিৎস তার শেষ ক্ষণ ঘোষণা দিয়ে যান। তখন এলাকার লোকজন ঘোড়াটিকে ভীড় করে দেখতে আসত। আসত দূর দূরান্তেরও লোকজন। মারা গেলে সাতদিন ব্যাপী জেয়াফতের আয়োজন করা হয়েছিল। মাননীয় সংসদ সদস্যও এসেছিলেন সে উপলক্ষে। প্রতিবছর মৃত্যুদিবস ঘটা করে পালন করা হয়। ঘোড়াটি নির্মাণ করেছেন বিশিষ্ট ভাস্কর শামীম শিকদার। তবে বকুলের বাবা ঘোড়াটির মৃত্যুশোক বেশি দিন সইতে পারেননি। ছমাসের মাথায় তিনি অজানা রোগে মারা যান। 

লিচুদের বাড়িতে আরো দুটো বিল্ডিং হয়েছে। সামনে খোলা উঠোনটা নেই। তবে হাসনাহেনা ফুলগাছটি আছে। বেশ লম্বা হয়েছে। লিচু জানালো হেনা মালয়েশিয়া থাকে। তার তিন সন্তান। সন্তানদের একজনের নাম রেখেছে হাসনা। বড়ো বোনটিকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। 

চামেলিদিদিদের বাড়িটা নেই। সেখানে একটি ইংরেজি কেজি স্কুল। চামেলি দিদিই তার অধ্যক্ষ। দিদির চেহারা অনেকটা পালটে গেছে। বেশ ভারি হয়েছেন। সিঁথিতে সিদুঁর নেই। বিয়ে করেছেন কিনা বোঝা যায় না। বললেন, তার ছোটো ভাই অশোক নিখোঁজ হয়ে গেছে। তারপর বাড়িটি শত্রু সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা তদ্বির করে সেটা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এজন্য তিনি তার পার্টি কমরেড আকমল চৌধুরীকে বিয়েও করেছিলেন। একটু মুখ নিচু করলেন চামেলিদিদি। আর্দ্র গলায় বললেন, বিয়ের তিন বছর পরে পুলিশের এনকাউন্টারে তিনি নিহত হন। 

একে সবার খবরই পাওয়া গেল। রোজিখালা এখনো বাপের বাড়ি আসেনা। তার বড়ো মেয়েটি ডাক্তার হয়েছে। ছেলেটি ম্যাজিস্ট্রেট । জিনিয়া আপা খুলনা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন। গেলবার তিনি হেলিকপ্টারে করে এ শহরে এসেছিলেন। ডেইজি আর শিউলি আর গান করে না। এক পীরের মুরীদ হয়েছে। কঠিন পর্দা করে। পরপুরুষের সামনে যায় না। 

সবারই খবর পাওয়া গেল। শুধু চাঁপার পাওয়া গেল না। কেউ মনেই করতে পারল না, চাঁপা নামে এ শহরে কেউ এসেছিল। তবে স্থানীয় থানার পুলিশের দারোগা বললেন, এসেছিল কিনা-- গায়েব হয়েছিল কিনা তার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি একটু হাসি হাসি মুখ করে বললেন, চাঁপা নামে যদি কেউ এসেও থাকে সে সময়ে তবে নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে তার পরিবার ওই পারে চলে গেছে। 

--কোন পারে? 

তিনি একটু গম্ভীর স্বরে বলেন, ওই পারে মানে ওই পারে। 

সেটা বর্ডারে পার হতে পারে। আবার পরপারও হতে পারে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। 

একটু মরিয়া হয়ে শুধাই, পুরনো ফাইলপত্র খুঁজে কি দেখা যেতে পারে? 

এবারে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, এরকম চাঁপাদের সংখ্যা এতো বেশি যে তাদের নামে ফাইল খুললে থানা ভরে যাবে। তারা সবাই ফাইল চাওয়া পড়বে হবে। আর কোনো কাজ করা যাবে না। 

চাঁপার সন্ধান পাওয়া যাবে না। মন খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো মালতিদের বাড়িটা দেখে যাই। সেখানে চাঁপা এসেছিল। 

বাড়িটার কোনো পরিবর্তিন হয়নি। চালের টিনগুলো শুধু পুরনো হয়েছে-- জং ধরেছে। দরোজায় টোকা দিলাম। ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন মধ্যবয়সী মহিলা বের হল। মুখ ভর্তি পান। চেনা চেনা মনে হলো। চিনতে পারছি না। মনে হলো ফিরে যাই। 

সে-ই আমাকে চিনে ফেলল। সে বিহারিদের মেয়ে গুলমোহর বানু। ভিন্ন পাড়ার চৌধুরীদের ছেলের সঙ্গে তার প্রেম হয়েছিল। কিন্তু বিয়েতে তার বাবামা রাজি হবে না জেনে হিস্ট্রিয়া রোগের অভিনয় করেছিল। পারুল কাকিমার পরামর্শে গুলমোহর ছেলেটিকে নিয়ে পালিয়ে যায়। বিয়ে করে। দুবছর এখানে ওখানে থেকেছে। মালতীদের বাড়িটা ফাঁকা পেয়ে গুলমোহর বানু বাড়িটিতে উঠে পড়েছে। এইভাবেই আছে। তাদের আর্থিক অবস্থা খব বেশি ভালো নয়। ভালো হলে বিল্ডিং তুলবে। 

বসার ঘরে বসিয়ে রেখে গুলমোহর বানু চা নাস্তা বানাতে গেল। যেতে যেতে বলে গেল,চাঁপা এসেছে।

চমকে উঠি। চাঁপার খোঁজেই দেশে আসা। বললাম, চাঁপা কোথায় এসেছে? 

--বাইরে। উঠোনে।জানালা খুলে দেখো। 

জানালাটি পর্দা দিয়ে ঘেরা ছিল। খেয়াল করা হয়নি। সেদিকে তাকাতেই কানে ভেসে এলো, ওপাশে শাড়ির খসখস শব্দ। আর একটি বিড়ালের অল্পস্বরে মিউ মিউ ডাক। বিড়ালটিকে মৃদু ধমকে শান্ত থাকতে বলছে। 

জানালার কাছে গেলাম। পর্দা তুললেই আমাদের চাঁপাকে দেখতে পাওয়া যাবে। আমাদের স্বপ্ন পূর্ণ হবে। মন ভালো হয়ে যাবে। 

থর থরে পর্দাটা তুললাম। জানালার ওপাশে কেউ নেই। ফাঁকা। উঠোনের প্রান্তে একটি গাছ দেখা গেল। মৃদু হাওয়ায় নড়ছে তার পাতা। তার নিচে মিউ মিউ করছে একটি বিড়াল। গলায় কুঁচফুলের মালা। হাওয়ায় একটি মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। খুব চেনা। 

গুলমোহর বানু চা নাস্তা দিতে দিতে বলল, চাঁপা ফুলের গন্ধ-- কাঠাঁলি চাঁপা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন