রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

অ্যামি তান'এর সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : এমদাদ রহমান

অ্যামি তানের জন্ম ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। তিনি চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক। বেড়ে উঠেছেন ক্যালিফোর্নিয়া'র ওকল্যান্ডে। তাঁর লেখপত্রে অভিবাসী জীবনে মা-মেয়ের নানামুখী সম্পর্ক এবং চীনা-আমেরিকান অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাদের পরিবার চীন থেকে আমেরিকায় চলে এসেছিল।
প্রথম বই গল্পসংকলন 'ফিশ চিকস্‌', প্রকাশিত হয় ১৯৮৭তে; একটি চীনা পরিবারের গল্পকে উপজীব্য করে ১৯৮৯-এ প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দ্য জয় লাক ক্লাব', প্রকাশের পরপর বইটি বেস্টসেলারে পরিণত হয়, বিশ্বজুড়ে তাঁর পরিচিতিও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৩-এ পরিচালক ওয়েইন ওয়াঙ উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রুপায়িত করেন, চিত্রনাট্য লেখার কাজটি করেন অ্যামি তান নিজে। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসগুলি হলো- দ্য ভ্যালি অ্যামেজমেন্ট (২০১৩) , দ্য হান্ড্রেড সিক্রেট সেন্সেস (১৯৯৫), দ্য কিচেন গড'স ওয়াইভ' (১৯৯১)। তিনি ছোটদের জন্যও বই লিখেছেন। মায়া এঞ্জেলো'র সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন নন-ফিকশন 'মাদার' (১৯৯৬); যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন 'দ্য বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরি'জ' (১৯৯৯)। 'হোয়্যার দ্য পাস্ট বিগিন :  এ মেমোয়ার' নামে তাঁর আত্মকথা প্রকাশিত হয়েছে, ২০১৭ সালে। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন 'কমনওয়েলথ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড', 'আমেরিকান লাইব্রেরি এ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড', 'এশিয়ান/প্যাসিফিক আমেরিকান অ্যাওয়ার্ড ফর লিটারেচার'।
'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর 'বাই দ্য বুকস' বিভাগে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় ২০১৩'র ১৪ নভেম্বর, সাক্ষাৎকারটিতে তাঁর সাহিত্যচর্চা ও লেখকজীবনের নানা দিক উঠে আসে।  


সাক্ষাৎকারী :
এ বছর আপনার পঠিত বইগুলির মধ্যে সবচেয়ে সেরা বই কোনটি?  

অ্যামি তান :
রিচার্ড ফোর্ডের লেখা 'কানাডা'ই এ পর্যন্ত পড়া সেরা বই। আমি তার প্রায় সবগুলি বইই পছন্দ করি, চরিত্র থেকে শুরু করে দাড়ি কমা সেমিকোলনসহ প্রতিটি বাক্যও আমার পছন্দের।  তাঁর কণ্ঠ সব সময়ই আকর্ষণ করে; এত স্পর্শ করে যে মনে হয় এই প্রথম কোনও ন্যারেটর বুঝি পাঠকের আত্মাকে স্পর্শ করছে! তার গল্পে আছে অনুভূতির এমন এক প্রশান্ত নিবিড়তা আর এমন এক তীব্রতা, চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের একাত্ম হয়ে  যাওয়ার সহজ প্রগাঢ় ভঙ্গি। উপন্যাসের এক একটি চরিত্রটি কীভাবে চিন্তা করে, সে সম্পর্কে পাঠক হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা আছে, আপনি সহজে বুঝতে পারবেন তাদের; ন্যারেটর কখনও বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় না, ন্যারেটর হয় পর্যবেক্ষক।  

সাক্ষাৎকারী :
বইগুলি কখন পড়েন?   

অ্যামি তান :
প্রায়শই আমি এমন উদ্ভট কল্পনা করি যে যদি ছোটখাট অপরাধের জন্য জেলখানায় আটকে রাখা হতো, কমপক্ষে তিন থেকে ছয় মাস, তাহলে সেখানে বহু বই পড়তে পারতাম। আমি মনে করি, কারারুদ্ধ থাকা পড়ার জন্য ভাল। কোনও ইমেল আসবে না, ওয়্যারেন্টি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া নেই, তহবিল সংগ্রহকারীদের আমন্ত্রণ নেই, কিচ্ছু নেই। কিন্তু যতক্ষণ প্রয়োজনীয় সেই অপরাধটি না করছি ততোক্ষণ আমি টানা ১২ ঘণ্টার উড়ান বেছে নেব। ভাল একটি বই হাতে নিলে সময় কী দ্রুতই না এগিয়ে চলে! প্লেনের উড়ানে, গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সে দৈর্ঘ্যের একটি বই নিতে হবে, যাতে বিমানেই বইটি পুরোটা পড়া যায়, ২০ পৃষ্ঠা অপঠিত না থাকে, যেমনটি হয়েছিল 'দ্য ইম্‌মর্টাল লাইফ অব হেনরিটা ল্যাক্স' বইটির বেলায়।

সাক্ষাৎকারী :
আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক কারা?

অ্যামি তান :
আমার পছন্দের তালিকায় সেই বইগুলিই থাকে যা সবসময়ই বর্তমান সময়, স্থান এবং মেজাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন একটি বই পড়ে শেষ করি, তখন খুব দ্রুতই চাই একই লেখকের আরও একটি বই পড়তে। তখন আর কোনও লেখকের বই পড়তে ইচ্ছে করে না, কারণ এই লেখক তখন আমার মনোজগতের সঙ্গী হয়ে পড়েছেন, আমার প্রিয় লেখকের তালিকায় চলে এসেছেন। এভাবে একের পর এই লেখকরা প্রিয় লেখকের স্থানটি দখল করেছেন- লুয়েস এরড্রিক, ভ্লাদিমির নবোকভ, জেভিয়ার মারিয়া, রিচার্ড ফোর্ড, হা জিন, অ্যানি প্রলক্স, আর্থার কোনান ডয়েলে, এফ. স্কট ফিটজিরাল্ড, ডি. এইচ. লরেন্স, জ্যামাইকা কিনসেদ, এবং আরও আরও লেখক।


সাক্ষাৎকারী :
আপনার পছন্দের তালিকায় চীনা সাহিত্যের কোনও ক্ল্যাসিক আছে কি?

অ্যামি তান :
জিং পিং মেই-এর 'দ্য প্লাম ইন দ্য গোল্ডেন ভাস'। এই লেখক সম্পর্কে কেউ জানেনা। অনামা। তীব্র যৌন উত্তেজক হওয়ার কারণে বইটিকে আমি মানুষের ভেতরের অন্ধকার বর্ণনার এক ডকুমেন্টেশন বলব। বইটি লিখিত হওয়ার বহু বছর পরও পাঠকরা বইটিকে বেডকভারের নিচে লুকিয়ে রাখেন, কারণ পর্ণোগ্রাফি হিসেবে বইটি নিষিদ্ধ। আমার দৃষ্টিতে, বইটির মোটামুটি একটি আধুনিক ও প্রকৃতিগত শৈলী রয়েছে, লেখক বইটিতে কিছু দেখান কিন্তু বলেন না, আবার প্রচুর যৌনদৃশ্যও দেখানো হয়েছে, যা সত্যিই রগরগে। বহু বছর পর্যন্ত আমি জানতে পারিনি এই বইয়ের এমন একটি সংস্করণ আছে যেখানে দেখা যায় ভেঙেপড়া মানুষরা বিছানায় শুয়ে পড়ছে আর ঘুম থেকে জেগে উঠছে প্রচণ্ড প্রাণশক্তি নিয়ে, তারা একেবারে উদ্দাম আর তরতাজা সব মানুষ।

সাক্ষাৎকারী :
চীনা এবং চিনা-আমেরিকান লেখকদের মধ্যে এই সময়ে ভাল লিখছেন কে?

অ্যামি তান :
আমি শুধুমাত্র অনুবাদেই চীনা উপন্যাস পড়তে পারি, এই সীমাবদ্ধতার কারণে আমি কোনওভাবেই বিচার করতে পারি না কে কে ভাল লিখছেন। আমি প্রথমদিককার কিছু নারীবাদী, যেমন, ওয়াং আনি, ঝাং জি এবং সম্প্রতি মারা চেং নাশানের কিছু কিছু লেখা পড়তে পেরেছি। আপনাকে ভেবে দেখতে হবে তারা উপন্যাস আর ছোটোগল্পগুলি যে সময়ে তারা লিখেছেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তাদের চিন্তাভাবনা ও নীতি কতোটা প্রাগ্রসর ছিল! তারা তাদের সমস্ত রকমের যাতনা, ব্যর্থ প্রেম আর সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে লিখেছেন, হাতে কলম নিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তারা অতীতের দিকে তাকিয়েছেন, বলেছেন সাংহাই নিয়ে তাদের নস্টালজিয়ার কথা। আমি একটি প্রেমের গল্প পড়েছি যেখানে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমালোচনা করা হয়েছে। আমি ইয়ান গিলিঙের গল্পের কথাও বলব। গিলিং দেখিয়েছেন, সৌন্দর্য এবং আদর্শবাদের আড়ালে কতোটা নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকে। মো ইয়্যানের কয়েকটি উপন্যাস পড়েছি, যিনি গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড-কে (৫০ বছর আগে মাও জে দং ঘোষণা করেছিলেন চীনকে আধুনিকায়নের এক পরিকল্পনা 'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড', এর পরিণামে চীনে দেখা দিয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। মারা গিয়েছিল অন্তত তিন কোটি মানুষ) দেশপ্রেমিকের দৃষ্টিতে দেখতে চাননি। ইয়ান সাহিত্যে নোবেল জিতেছিলেন, পরে চীনের কারাবন্দী নোবেল বিজয়ী লিউ জিয়াবাওয়ের পক্ষে কথা না বলার কারণে তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন, তার সাহিত্যের শৈলী আর বিষয়কে অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করা হয়েছিল। আমি লক্ষ্য করেছি, লেখকের সাহিত্যিক যোগ্যতা প্রায়শই তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা তার পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানদণ্ড হয়ে যায়।
চীনা-আমেরিকান লেখকদের মধ্যে, এই দু'জনের নাম সহজেই মনে আসে : ইয়ুন লী, এবং হা জিং। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করে লিখতে পারেন যেখানে চরিত্রের  বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে পরিস্থিতি আর তাদের অতীত একাকার হয়ে যায়। তাদের গল্পগুলি প্রায়ই ট্রাজেডি হয়ে ওঠে, কিন্তু ট্রাজেডির শিকার মানুষরা ঘুরেও দাঁড়াতে পারে। লেখার এই দিকগুলি আমাকেও আক্রান্ত করে, কিছুটা প্রভাবিতও করে।  এমন কিছু লিখতে প্রণোদনা দেয় যা হয়ত আমি আগে উপেক্ষা করে গেছি।



সাক্ষাৎকারী :
আপনার খুব প্রিয় একজন লেখক যার কথা তেমন কেউই জানে না, এমন কেউ থাকলে তার কথা বলুন।  

অ্যামি তান :

কয়েক বছর ধরে, আমি লেবানিজ-আমেরিকান লেখক রাবিহ আলামেদিনের লেখাকে গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করছি। তাঁর গদ্য জমকালো, দৃষ্টিভঙ্গিতে শ্রদ্ধাহীনতা, আর গল্পের আইডিয়াগুলি কখনও চরম হাস্যোদ্রেককর, কখনওবা উদ্ভট কল্পনাপূর্ণ কিন্তু সর্বদাই এমন গুরুতর যেন পৃথিবীতে মৃত্যু ছাড়া আর কোনও আত্মসমর্পন নেই!  আজকের পবিত্র যুদ্ধগুলির পেছনের ভয়ানক জটিল ইতিহাস বোঝার পক্ষে খুব তার গল্পগুলি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ইতালি ও স্পেনে তার বই বেস্ট সেলার হয়, প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে তার পূর্ণ-পৃষ্ঠা প্রোফাইল ছাপা হয়। তিনি ইতোমধ্যে কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার জিতেছেন, সাহিত্য উৎসবে আন্তর্জাতিক লেখকদের প্রশংসাও পেয়েছেন। কিন্তু  আমেরিকায় তিনি খুব কমই পরিচিত। জানি না, সাহিত্যিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বিভাজন কেন এত বড় হয়ে ওঠে!?


সাক্ষাৎকারী :

গল্প পড়ার সময় আপনি বিশেষ কোনও পদ্ধতি অনুসরণ করেন কি?


অ্যামি তান :
আমি পড়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকি, কথাসাহিত্য কি ননফিকশন, সবকিছু; কিন্তু সেই লেখার প্রথম একটি বা দুটি বাক্য এমন হতে হবে যেন দেখেই বুঝতে পারি ঠিক এই লেখাটির জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম! যেন আমি দীর্ঘদিন ঘরে এমন একটি কন্ঠস্বরেরই অপেক্ষা করছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে এমন গদ্য পড়তে চাইছিলাম। সেই লেখাটিই আমি পড়তে চাই, যেখানে লেখক এমন এক চিত্রকল্প, ভাষা, দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে লেখায় নতুন একটি জগত তৈরি হয়ে গেছে।  

সাক্ষাৎকারী :
বুকশেলফে কোন বইগুলি দেখে আমাদেরকে বিস্মিত হতে হবে?
অ্যামি তান :

পশুপাখির আচরণ এবং বোধশক্তির ওপর লিখিত বইগুলি যে কাউকেই বিস্মিত করে দেবে! দাঁড়কাক, কুকুর এমনকি পিঁপড়েদের নিয়েও কতো সব আশ্চর্য বই যে রচিত হয়েছে! এখানে কুকুর-প্রশিক্ষণের বইও দেখতে পাবেন। তাছাড়া, আমি জীববিজ্ঞানের ওপর রচিত বহু প্রাচীন বইও সংগ্রহ করেছি, তাদের একটি কল্পবিজ্ঞান লেখক এইচ. জি. ওয়েলস, তার ছেলে জি. পি. ওয়েলস এবং জীববিজ্ঞানী, প্রজননবীদ জুলিয়ান হাক্সলি'র চার খণ্ডের সেট 'দ্য সাইন্স অব লাইফ।    


সাক্ষাৎকারী :

উপহার হিসেবে পাওয়া এ পর্যন্ত সেরা বই কোনটি?

অ্যামি তান :
'৯৯ সালের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি আমার সম্পাদক ফেইথ সেইলের কাছ থেকে চলে এসেছিলাম, একটু আগে তার লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রগুলি খুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা দুই বোনের মতোই ছিলাম। তার ঠিক দু'ঘণ্টা পর, স্টিফেন কিং আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলে হোটেলে আমাদেরকে দেখা করতে বললেন। মুহূর্তটি ছিল ভীষণ উত্তেজনার, মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে ভাগ্যগুণে বেছে যাওয়া এই লেখক ছয় মাস কারও সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেননি, সেটা ছিল কারও সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ। তিনি আমাকে তার 'অন রাইটিং' বইয়ের একটি এডভান্স কপি দিয়েছিলেন। কয়েক বছর আগে, আমরা পরস্পর কথা বলেছিলাম যে কেউ ইন্টার্ভিউতে ভাষা সম্পর্কে আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করে না। তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির ওপর একটি বই লিখবার কথা ভাবছেন। তাকে বললাম, 'কাজটা করুন'। বইটি তিনি লিখে ফেলেছেন। আমাকে উৎসর্গও করেছেন! বইটি আমার জন্য! তারপর আমরা 'দ্য গ্রিন মাইল' ছবির প্রিমিয়ার দেখতে গিয়েছিলাম। ছবির গল্পটি ছিল মৃত্যুর জন্য অপেক্ষামান একজন মানুষকে নিয়ে যিনি ক্যান্সারে মরতে বসা ব্যক্তিদের নিরাময় করতে পারেন। সেই রাতটিতে আমরা দুজন গভীর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে হতে হঠাৎ এক আশ্চর্য শক্তি অনুভব করেছিলাম!

সাক্ষাৎকারী :

কোন বইটি আপনার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে?  
অ্যামি তান :
সম্ভবত বাইবেলই আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পেরেছে। বাবা মন্ত্রী ছিলেন বলে আমাদেরকে প্রায় দিনই বাইবেলের আয়াতগুলি শুনতে হতো। বাইবেল পাঠের পুনরাবৃত্তিমূলক ছন্দটি, বিশেষ করে বাইবেলের সুরের ধারা, সেই শৈশব থেকেই আমার মস্তিষ্কে খোদাই হয়ে গিয়েছিল। ('এবং' দিয়ে দীর্ঘ বাক্য লেখার প্রবণতাটি হয়ত বাইবেল থেকেই পেয়েছিলাম)। আমার বেশিরভাগ গল্পই বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত যা বেশিরভাগই এসেছে ধর্ম, সমাজ আর মায়ের কাছ থেকে। সেগুলো আবার ঠিক ধর্মীয় না, নিজের জীবন-সম্পর্কিত উপলব্দি। মায়ের কাছ থেকে এমন কিছু পেয়েছি যা আপনি কোনও বইয়ে পাবেন না, আর আমার লেখার সংবেদনশীলতাও গথিক চিত্রকল্পের মতো কখনও ধর্মীয় পাপ বা পবিত্রতা, শুদ্ধতা ইত্যাদি দিয়ে মোড়ানো থাকে। স্যামসনের রক্তাক্ত মাথার চুলে কোনও বন্ধনী থাকে না, আত্মীয়দের চুম্বন করার জন্য উঠে আসে গলিত লাশ!

সাক্ষাৎকারী :
রাষ্ট্রপতিকে কোন বইগুলি পড়ার জন্য বলবেন?

অ্যামি তান :

আমি কখনও কাউকে নির্দিষ্ট কোনও বই পড়তে অনুরোধ করব না। আমরা তো তাই পড়ি যে বইটিকে আমরা ব্যক্তিগত পছন্দে পড়ার জন্য বেছে নিই, এখন কাউকে কিছু বলতে বলার মানে হচ্ছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলে যাওয়া। ব্যাপারটি আমার কাছে পরস্পরবিরোধী। কোনও পাঠ্যতালিকায় যখন আমি আমার কোনও বইয়ের নাম দেখি, সবসময় কেন জানি না, ভয় নাকি আতঙ্ক, থরথরিয়ে কাঁপতে থাকি।

সাক্ষাৎকারী :

আপনি কি প্রচুর বইয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন? ছোটবেলার বইপড়ার সেসব স্মৃতির কথা বলুন।

অ্যামি তান :
সে তো বহু বই। বহু বইয়ের সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠছিলাম। আমাদের ঘরে ছিল 'ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া, 'রিডার্স ডাইজেস্ট কনডেন্সড বুকস', বিলি গ্রাহামের সেই সব আশ্চর্য অনুপ্রেরণামূলক বইগুলি; আর ছিল বাইবেল, আর শেলফের সবচে উপরের তাকে ছিল সেক্সুয়াল প্যাথলজি নিয়ে লিখিত পৃথিবীর প্রথম বই 'সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস'। বইটি আমার অসম্ভব প্রিয় ছিল। একবার ক্রিসমাসে ইতালীয় ভাষায় অনূদিত চীনা রূপকথার বই পেয়েছিলাম। বইটির সব ঋষি, ঈশ্বর, আর সব মহাপাপীর চেহারা ছিল ইতালীয় সিনেমার অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের মতো। ক'দিন আগে বইটিকে খুঁজে বের করেছি, মাটি খুঁড়ে কোনও কিছু বের করার মতো।
বাবা মা কখনও ফিকশন পড়তেন না, ইংরেজিতে তো নয়ই। কিন্তু এক বছরের জন্য, বাবা আমাকে আর আমার ভাইটিকে ঘুমোনোর আগের গল্প পড়ে শুনালেন, '৩৬৫টি গল্প' নামক একটি বই থেকে, বইটির নিয়ম অনুসারে প্রতিদিন একটি করে গল্প পড়তে হবে; গল্পগুলিতে সুখি ও আনন্দিত আমেরিকান বাচ্চাদের প্রতিদিনের ছোটছোট সব কথা থাকত, গল্পগুলোয় তাদেরকে সুখের জিনিসগুলি বেছে নিতে হতো। আমার নিজের পড়ার বইগুলি আসতো লাইব্রেরি থেকে, আমার ৬ বছর বয়সে। প্রতি দু'সপ্তাহের জন্য ৫ থেকে ৬টি বই বেছে নিতাম, এভাবে পড়তে পড়তে লাইব্রেরির বইয়ের তাকের নিচ থেকে উপরের দিকে পৌঁছে যেতে লাগলাম। ছেলেবেলায় পরীদের কাহিনি প্রিয় খুব ছিল। সেই সময় হঠাৎ একদিন 'টু কিল এ মকিং বার্ড' পড়ে পাঠক হিসেবে সংবেদনের প্রবেশ দুয়ারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, মনে হচ্ছিল এই মাত্র আমি যেন জীবনের সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছি। তারপর আরও সাহসী হয়ে উঠলাম, একবার এক কাউন্সেলিং সেশনে জনৈক মন্ত্রীর সামনে হাতে তুলে নিলাম জে. ডি. স্যালিঞ্জারের নিষিদ্ধ বই 'দ্য ক্যাচার অব দ্য রাই', মন্ত্রী আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, এধরণের বই মানুষকে পাপের পথে নিয়ে যায়, মানুষের মনে পাপের অনুভূতি তৈরি করে। এই ঘটনাটি আমাকে বইয়ের শক্তি সম্পর্কে এমন এক ধারণা দেয় যাতে আমি বুঝতে পারি যে বই ছাড়া জীবনে বেঁচে থাকা অর্থহীন। বই অনুভূতিকে তীব্র করে।  

সাক্ষাৎকারী :

ছেলেবেলার প্রিয় কোনও চরিত্র বা নায়কের কথা এখন মনে পড়ে?

অ্যামি তান :
তখন জেন আয়ার খুব প্রিয় ছিলেন। মাঝে মাঝে তার সততা আমাকে তুমুল আনন্দিত করে ফেলত, তার একাকীত্ব মাঝেমাঝে আমার অনুভূতির সঙ্গে একাকার হয়ে যেত; হয়ত তখনই ভেতরে ভেতরে একাকীত্বের বোধ তৈরি হতে শুরু করেছিল। 'দ্য লিটল প্রিন্স'ও ছিল আরেকটি বই যাকে এখনও অনুভব করি, আর ছিল, পিপি লংস্টকিং। আমার শৈশবকে তারা নানা রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল।    

সাক্ষাৎকারী :

কোন লেখকরা আপনাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন?

অ্যামি তান :

আমি যখন গল্পগুলি লিখতে শুরু করলাম, তখন অ্যামি হ্যাম্পেল, মাভিস গ্যাল্যান্ট, এলিস মুনরো, মলি গাইলস, ফ্ল্যানারি ও'কনার, এডোরা ভ্যালি, রিচার্ড ফোর্ড, মেরি রবিসন, চেখভ এবং আরও অনেকের গল্প সংগ্রহগুলি পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর পড়া হয়েছিল লুইস এড্রিকের 'লাভ মেডিসিন' বইটি; লেখায় বহুল স্বর তৈরি করার কৌশলটিকে আমি তার কাছ থেকেই শিখেছিলাম। পরবর্তীতে, আমি আমার 'দ্য জয় লাক ক্লাব' উপন্যাসের স্ট্রাকচারের জন্য তাঁকে অনুসরণ করেছি!  
আজকের দিনে এরকম একটি বই যদি যদি খুঁজে পাই যা আমাকে আশ্চর্য করতে পারে, যদি মনে হয় বইটি আমাকে দিয়ে দারুণ কিছু লিখিয়ে নিতে পারবে তাহলে আমি হয়ত লেখালেখিই ছেড়ে দেব। কোয়েটজি'র 'ডিসগ্রেস' বহু পরে আমাকে সেই অনুভূতিটি দেবে।


সাক্ষাৎকারী :
যদি আপনাকে জীবিত কিংবা মৃত কোনও লেখকের সঙ্গে দেখা করতে হয়, তিনি কে হবেন? তার কাছে কী জানতে চাইবেন?   
অ্যামি তান :
তিনি, এমিলি ডিকিনশন। আমি তার সেবিকা হতে চাইব। জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র নীরবতার ভেতর দিয়ে হাঁটবার সময় আমি তার সঙ্গী হতে চাইব। আমি মাঝেমাঝে কল্পনায় দেখি, ধীর পদক্ষেপে হেঁটে তিনি কোথায় কোথায় যাবেন, হ্যাঁ, তিনি চলে যাবেন পাখিদের খসে পড়া পালকের কাছে, চা-পাতা আর ভাঙা বেড়ার গর্তের কাছে, সেখানে তিনি জীবনকে অনুভব করবেন; জীবন সম্পর্কে তার গভীর পর্যবেক্ষণগুলি আমাকে বলবেন।  

সাক্ষাৎকারী :

সাহিত্যিক কোনও চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে কাকে বেছে নেবেন?

অ্যামি তান :
সাহিত্য কোনও চরিত্র আমার বাস্তব জগতে প্রবেশ করুক, আমি তা চাইব না; তাহলে তারা তাদের বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলবে, তাদের সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ কমে যাবে। আবার, আমিও কখনও তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে পারি, কারণ তারা কোনও ধারণাই করতে পারবে না যে, আমি কে? আমি চেশায়ার বিড়ালের সঙ্গে সেই ঘোরলাগা জগতে যেতে চাই, তাদের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শিখতে। তাদের জগতে অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে হয়। আমি জানি তাদেরকে হুবহু ট্যানেলের ইলাস্ট্রেশনের মতোই দেখতে পাব, এমনকি আমি নিজেও সে ইলাস্ট্রেশনের মতো হয়ে যাব।


সাক্ষাৎকারী :
আপনার পাঠ্য তালিকায় এখন কোন বইটি আছে?  

অ্যামি তান :
এখন আমি একসঙ্গে দুটো বই পড়ছি, তাদের একটি জোসেফ রথের 'ডার্ক, উয়েইটস এন্ড মেজার্স', আমেরিকা সম্পর্কিত আমার ভাবনাগুলির সঙ্গে বইটি বেশ ভালোই তাল মেলাচ্ছে। মানুষের জীবনের বিপজ্জনক পরিণতি, আমেরিকার রাজ্যগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন, রাজনীতিবীদ ও অর্থদাতাদের নৈতিক মৃত্যু সম্পর্কে অসাধারণ পর্যবেক্ষণ হবে বলেই ধারণা করছি বইটিকে।
ভাবছি, দ্বিতীয় বইটি (সোনিয়া সোটোমায়রের 'মাই বিলাভড ওয়ার্ল্ড') আমাকে আশাবাদী করে তুলবে। । সুপ্রিম কোর্টে সোটোমায়রের প্রজ্ঞা আর সমবেদনার যে প্রকাশ আমি দেখেছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। জুন মাসে, বিচারপতি সোটোমায়র তার চেম্বারে আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানালেন, সময়টা ছিল ঠিক তখন, বিচারকরা যখন প্রধান প্রধান মামলাগুলির বিষয়ে সতর্কতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। আমরা সেখানে প্রকাশনা, অনুবাদ, বাচ্চাদের দত্তক নেওয়া, এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নিয়ে আমাদের মায়েদের উদ্বেগের কথা বললাম। আমি এখন পর্যন্ত তার স্মৃতিকথা'র প্রথম দশ পাতা পড়েছি, বুঝতে পারছি বইটিকে তিনি আমাদের কথোপকথনের ধারাবাহিকতার মতো করেই লিখেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন