রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

অনিতা দেশাই'এর সাক্ষাৎকার

অনুবাদ: এমদাদ রহমান

অনিতা দেশাই ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখকদের একজন। তার জন্ম জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৪ জুন, ভারতের উত্তরাখণ্ডের মসুরিতে। তিনি একধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও শিশুসাহিত্যিক। জার্মান মা ও বাঙালি বাবার সন্তান অনিতা দেশাই পড়াশোনা করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বর্তমানে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপনায় নিয়োজিত।

পশ্চিমে, মায়ের কাছে বড় হয়ে উঠলেও পিতৃভূমি ভারতের কথা কখনও ভুলে যাননি তিনি, সব সময়ই গভীর টান অনুভব করেছেন। জার্মান, বাংলা, উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি শিখে বড় উঠলেও ইংরেজিকেই তিনি সাহিত্যভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অনিতা দেশাইয়ের বইগুলোর মধ্যে 'দি আর্টিস্ট অফ ডিসএপিরেন্স (২০১১), ডায়মন্ড ডাস্ট অ্যান্ড আদার স্টোরিজ (২০০০), ফাস্টিং, ফেস্টিং (১৯৯৯), বাউমগার্টেনের'স বোম্বে (১৯৮৮), ইন কাস্টডি (১৯৮৪), দ্য ভিলেজ বাই দ্য সী, (১৯৮২), ক্লিয়ার লাইট অফ ডে (১৯৮০), ফায়ার অন দ্য মাউন্টেন (১৯৭৭), দ্য পিকক গার্ডেন (১৯৭৪), ভয়েসেস ইন দ্য সিটি (১৯৬৫), ক্রাই, দ্য পিকক (১৯৬৩) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি এ পর্যন্ত তিনবার বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে এসেছেন। '৭৪-এ 'ফায়ার অন দ্য মাউন্টেন' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। 'দ্য ভিলেজ বাই দ্য সী' গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন 'গার্ডিয়ান চিলড্রেন'স ফিকশন অ্যাওয়ার্ড'। খ্যাতনামা এই ডায়াসপোরা লেখককে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণে সম্মানিত করা হয়, ২০১৪ সালে। তিনি যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ সাহিত্য সংস্থা 'রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার' এবং আমেরিকার 'একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স'-এর সম্মানিত সদস্য। অনিতা দেশাইয়ের মেয়ে কিরণ দেশাইও লেখালেখি করেন। কিরণ তাঁর 'দ্য ইনহেরিটেন্স অব লস' উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৬-এ। রোজালিন সাইকস গৃহীত এই সাক্ষাৎকারটি ফাইন্যানসিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত হয়েছিল, অল্পকথা'র আলাপ হিসেবে, ২০১২ সালের ২৪ অক্টোবর। 


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার প্রকৃত পাঠক কে?

অনিতা দেশাই :
তিনি এমন একজন পাঠক যিনি জানেন আমার লেখাগুলির উৎসভূমি কোথায়, সেই পাঠক ভারত সম্পর্কেও জানেন; ভারতীয় জীবনধারাই আমার লেখার মূল উপকরণ।


সাক্ষাৎকারী : 
সর্বশেষ কোন লেখাটি পড়ে আনন্দে উচ্চস্বরে হেসে উঠেছিলেন? 

অনিতা দেশাই :
চার্লস পোর্টিস [ট্রু গ্রিট, উপন্যাস, পরে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে] নামের এক আমেরিকান লেখককে খুঁজে পেয়েছি যার আছে পাঠককে আশ্চর্য করে দেওয়ার যাদুময় ক্ষমতা। বইটিতে তিনি এমন কিছু মানুষের কাহিনি লিখেছেন, যারা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছে, তারা আসলে দক্ষিণ-পশ্চিম মেক্সিকোতে যাচ্ছে একটি খুন করতে। লোকগুলি বন্য হলেও অদ্ভুত আর মজার। চার্লস পোর্টিস মানুষের মনোজগতের অস্বাভাবিক, খামখেয়ালি ও পাগলাটে অবস্থা নিয়ে উপন্যাসে এমন এক তরতাজা আর খাঁটি গদ্য লিখেছেন, সমকালের কারও লেখায় এমন গদ্যের দেখা মিলে না। 

সাক্ষাৎকারী :
খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলি রেখেছেন? 

অনিতা দেশাই :
জন ব্যানভিলের 'দ্য নিউটন লেটার' এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট্ট বই 'মাই বিওন্ড ডেই'জ (আমার ছেলেবেলা')। 


সাক্ষাৎকারী : 
কোন বইগুলি আপনার জীবনকে বদলে দিয়েছে?

অনিতা দেশাই :
এমিলি ব্রন্টি'র 'উইদারিং হাইটস'। এই বইটি পড়বার আগে আমি এরকম শক্তিশালী বই আর একটিও পড়িনি। বইটির ভাষা আমার বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল!


সাক্ষাৎকারী : 
কখন বুঝতে পেরেছিলেন যে লেখক হতে চলেছেন?

অনিতা দেশাই :
ঠিক যখন লিখতে ও পড়তে শিখেছিলাম! যখন কোনওকিছু পাঠ করাকে জগতের সবচেয়ে আনন্দময় কাজ বলে মনে হতো। পড়া শেষ করে কাগজে যখন একসঙ্গে কতোগুলি শব্দ লিখতাম, ঠিক তখন বুঝতে পারতাম আমি আসলে লেখক হতে চলেছি! এই বুঝতে পারাটা কতকিছুর সঙ্গে যে মিশে থাকে! 
ন'বছর বয়সে ছোটদের পত্রিকায় আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।


সাক্ষাৎকারী : 
কোনও কিছুতে ভয় পান?

অনিতা দেশাই :
রাতের নিয়ন্ত্রণহীন আতঙ্ক আর ভয়ের অনুভূতি আমার অসহ্য হয়ে ওঠে। ব্যাপারটিকে অদ্ভুত মনে হতে থাকে যেন কোনও রহস্যের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে আছি! যেখানে দিনের আলোয় কেউ একজন ঘরের সমস্ত কাজ নিজে নিজে করছে, কোথাও কোনও সমস্যা হচ্ছে না কিন্তু যেই একটু রাত হলো, বিছানায় লম্বা হলাম, চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে এল, একাকীত্বে ভরে গেল ঘরবাড়ি সব, ঠিক তখনই ভয় আর আতঙ্ক আপনাকে বিধ্বস্ত করে ফেলবে; আপনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন... 

সাক্ষাৎকারী : 
কখন খুব সুখি থাকেন?

অনিতা দেশাই :
ভারত আর মেক্সিকোর সুউচ্চ পর্বতমালা আমাকে আন্দোলিত করে। পর্বতচূড়ায় এমন বিস্ময়কর মুক্তি, এমন উতল হাওয়া ও আলো'র নির্মলতা, যা আর কোথাও নেই! 


সাক্ষাৎকারী : 
কোন চিত্রকর্মটিকে নিজের কাছে রাখতে চান? 

অনিতা দেশাই :
পিয়েরো দেল্লা ফ্রাঞ্চেসকা'র আঁকা 'এ ওয়ান্ডারফুল প্রেগনেন্ট ম্যাডোনা'। আমি এ পর্যন্ত যতগুলি চিত্রকর্ম দেখেছি, তার মধ্যে, আমার ধারণা, এটাই সবচেয়ে সুন্দর। 


সাক্ষাৎকারী : 
আবার যদি সেই সময়ে ফেরা যেত, যদি আবারও প্রথম থেকে শুরু করা যেত, তাহলে কি অন্যভাবে শুরু করতেন? 

অনিতা দেশাই :
এত বছর পর এখন দেখতে পাচ্ছি আমার সমস্ত কাজই নিস্ফলা! অর্থহীন। আসলে, আমার কাছে একমাত্র লেখালেখিই ছিল সবকিছুকে অর্থবহ করবার একটা পথ। যে-কাজগুলি আরও আগে করা দরকার ছিল সেই কাজগুলি আমি বড় দেরিতে করেছি। জীবনের দীর্ঘ একটা সময় আমার নিস্ফলা, ঊষর কেটে গেছে! তবুও মাঝেমাঝে মনে হয়, লেখালেখি আমাকে সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পেরেছে। 


সাক্ষাৎকারী : 
কোন লেখাটি আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল? 

অনিতা দেশাই :
'৭৭-এ লেখা ছোট্ট একটি বই, 'ফায়ার অন দ্য মাউন্টেন'। বইটি লেখার পর বুঝতে পেরেছিলাম কৈশোরক লেখা পেছনে ফেলে এবার কিছুটা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠেছি আর নিজস্ব স্বর খুঁজে পেয়েছি। 


সাক্ষাৎকারী : 
লেখালেখি ছাড়তে হলে কী নিয়ে বাচবেন? 

অনিতা দেশাই :
কেবলমাত্র লেখালেখি ছাড়া আমি আর কিছু করতে চাই না। 


সাক্ষাৎকারী : 
লেখক হওয়ার মানে কী?

অনিতা দেশাই :
লেখালেখি ছাড়া তো আমি জীবনকে কল্পনাও করতে পারি না, কেননা তার হাত থেকে আমার নিস্তার নেই, আমাকে লিখতে হবেই, এটা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাওয়ার মতো, পোশাক পরার মতো, শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই, অনেকটা। লেখালেখিটা এমন কিছু যা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষের জীবন জুড়ে যে নিত্য কোলাহল, তার অন্তর্নিহিত রূপটিকে খুঁজে বেড়াবার নিত্য তাড়নাই তো লেখালেখি। তাছাড়া লেখালেখি কাউকে অনুভূতি প্রকাশের এমন এক ভাষা দেয় যে ভাষাটিকে আমরা হয়ত কথা বলার সময় খুঁজে পাই না কিংবা কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসলেও তা লিখতে পারি না। লেখা'র অনুভবটি আমাদের ভেতরে সেই পরম ভাষাটির জন্ম দিতে পারে, যা দিয়ে কেবল উন্মোচনই সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন