রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

মেহেদী উল্লাহ'র গল্প - খেলার লাঠি, লাঠির খেলা


খেলার লাঠি, লাঠির খেলা

আমরা শুনেছি, তখনো এই দিককার বাড়িতে বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো এসে

পৌঁছায়নি। আর তাই সেই সময়টার কথাই ধরা যাক-চাঁদ থাকলেও কুপির আলো থাকত। আর তাই এখনো চাঁদ থাকলেও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো থাকে। অমাবশ্যার আন্ধারে তারা লাঠি নিয়ে নামে না। শুধু চাঁদ যেদিন থাকে, সেদিন নামে। বৈদ্যুতিক আলোর ভেতর যদি খেলবি তো, জোছনা আর অমাবশ্যা কি! ফকফকা আলোয় দে হাঁক উঠানে উঠানে, ‘হে, বা, বা, হে বা, বাহ বাহ বাহ...’;

কিন্তু তারা খেলবে। পূর্বপুরুষরা কুপি জ্বালিয়ে উঠানে লাঠি চালাইছে বলে, তাদেরও এখন বৈদ্যুতিক বাতিটা এমনি এমনি জ্বালিয়ে রেখে লাঠি চালানোর অভ্যাস হয়েছে।

এই যে জোছনার কথা বললাম, মাঝেমধ্যে তাদের এ রকম কত জোছনা অনর্থক হয়ে যায়। খেলার বায়না না থাকলে তারা নামে না উঠানে। দুই ঘর এক উঠানের বাড়িটা। একটা ঘর বড়, সামনেরটা ছোট। আরেকটা চারপাশ খোলা একচালা, ঠিক ঘর বলা চলে না, ওটা রসুই। বাড়িটার চারধারে কয়েক প্রজাতির গাছ থাকলেও আন্ধারে ঠাওর করা যায় না। তখন হাবিজাবি গাছ এঁকে নিতে হয় মনে মনে। দুই ঘরের ঠিক মাঝখানটায় উঠান। খেলার বায়না থাকলেই কেবল তারা এই উঠানটায় জড়ো হয়। খেলা তোলে। নাটক যেমন মে নেওয়ার আগে তোলা হয়, ঠিক তেমনি এরাও উঠানময় খেলা তোলে। এ খেলার নাম লাঠিখেলা। জগতে দুই পক্ষ লাঠি নিয়ে লাঠালাঠি করে রোজ রোজ মারা যায়। হানাহানি।

আর এরা মিছামিছি লাঠি ঘুরায়, লাঠিতে লাঠিতে বাড়ি মারে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাঠিতে লাঠিতে আঘাত হানে, তবুও বিষয়টা দাঁড়ায় মিছামিছি, বেশি কিছু নয়। তো আসলে তারা লাঠি খেলার অভিনয় করে। কত বাইড়ায়, কেউ আহত হয় না! এ বিদ্যার বড় দৌড় মাঝেমধ্যে আঙুলে আঘাত। তাও বিদ্যার বাইরে গিয়ে মারলে। দুলিপিডার লাঠিখেলা যারা দেখায়, তাদের কোনো নাম নেই। কেমন? শব্দসূত্র অনুযায়ী এদের নাম হওয়ার কথা ছিল লাঠিয়াল। অথবা খোলোয়াড়। যেহেতু তারা লাঠি খেলে। কিন্তু এখানে এদের কোনো নাম নেই। তাই তাদের লাঠিখেলার দল বলেই উল্লেখ করা গেল আপাতত।

এদের আলাদা নাম নেই কেন? এরা নিজেরাও জানে না। জাদু যে দেখায় জাদুকর, বাজি দেখায় বাজিকর, সাপের খেলা দেখায় সাপুড়ে; কিন্তু এদের কোনো নাম নেই। তাদের পূর্বপুরুষ, যারা লাঠিখেলা দেখাত, আর তাদের লতিকা বেয়ে বেয়ে আজকের এদের কাছে পৌঁছেছে, তাদের কি নামে ডাকা হতো তাও এরা জানে না। এরা সিজনাল লাঠিখেলার দল। দু-একটা উৎসব-টুৎসবে বড়জোর খেলে। বাদবাকি সময়ে এরা রিকশা চালায়, বদলা দেয়, দোকানদারি করে অথবা বেহুদা সময় কাটায়। বলে রাখা ভালো, এরা সবাই পুরুষ, সাতআটজনের একটা দল। খেলার বড় নিয়ম, জোড়া জোড়া ধরে খেলা। মাঝেমধ্যে একজন উধাও হয়ে গেলে তাদের জোড়া মেলাতে কষ্ট হয়। প্রতিবারই দল থেকে একজন কোনো না কোনো কারণে ছুটে যায়। ছুটে যাওয়ার বড় একটা কারণ, ‘ভাল্লাগে না’। বায়না পাওয়ার পর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়সী যে জন, তারা যাকে মুরব্বি বলে ডাকে, মুরব্বি পুরো দলটাকে এই উঠানটায় সন্ধ্যার পর এক সঙ্গে করে। এর আগে সবাইকে জানিয়ে দেয়, অমুক দিন জোছনা রাত্রিতে খেলা তোলা হবে। সবাই বলতে, ছয়জন বা আটজন। যেহেতু এরা জোছনারাত ছাড়া

খেলা তুলতে পারে না, তাই বায়নাদাররা সেই অনুপাতে এক-দেড় মাস আগেই বায়না করে যায়, যাতে এরা খেলা দেখানোর আগে সুন্দর সুন্দর কয়েকটা জোছনারাত অন্তত পায়, তাতে তারা খেলা তোলার ব্যাপক সুযোগ পায়।

এদের পূর্বপুরুষদের আমলে খেলা তোলাটা অত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। বলতে গেলে খেলা তোলাই থাকত। এত বেশি খেলা দেখানোর বায়না থাকত একবার তুললে তা দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যেত সাত-আট প্রহর। এখন আর সেই দিন নাই, নাই বলেই এরা আর এক ঢিলে সাত-আট পাখি মারতে পারে না। একবার খেলা তুলে দেখানোর পর দ্বিতীয় বায়নার দিন আসতে আসতে এদের লাঠি তো বটেই, হাতেও জং ধরে যায়। ফলে এদের কালেভদ্রে বায়না পেলে তার আগে খেলাটা তুলতে হয়। কারণ এরা ভুলে যায়। তাল ঠিক রেখে লাঠি চালাতে হলে অবশ্যই খেলাটা তুলে নিতে হবে। আর তাল ভুল হলে দর্শক মজা পায় না। আউলাজাউলা হয়ে যায় খেলা। এমনি বিনা রক্তপাতের খেলা, তার ওপর যদি বাড়ি মারতে হয় ভুল, তবে খেলাটা পুরো ফিকে হয়ে যাবে। মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে কেন। এই খেলায় উত্তেজনা নেই, জোশ নেই। তাই পাবলিক ঐতিহ্য ধুইয়ে পানি খায় না।

লাঠি খেলায় টাকা নেই, আগের মতো মান-সম্মানও নেই, দর্শক নেই, নেই রং-তামাশা, কদর। তবু এরা খেলে কেন? এদের জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘বাপ-দাদার স্মৃতি, হেললাইগা ধইরা রাখছি।’

এ রকম একটা হাবভাব নিয়ে আজকেও তারা একসঙ্গে হয়েছে উঠানটায়। সামনে কবে যেন একটা বায়না আছে। বায়নার আগে আগে খেলাটা তুলতে হবে। সবাই জড়ো হয়েছে মুরব্বির বাড়ির উঠোনে। আর বড় ঘরটার তিনটা বড় বড় জানালা ভরপুর মহিলাদের চোখে। এরা দেখছে, কী হচ্ছে না উঠোনে! হাঁক-ডাক, পুরুষের লাঠি নিয়ে নাচানাচি ইত্যাদি। সেখানে তখন তিনজোড়া পুরুষ। দুইটা জোড়া নিজেদের কিছুক্ষণ ঝালিয়ে নিয়ে এখন বসে আছে ঢেলার ধার ঘেঁষে, সেখানে গ্রামের আরো অনেকে ভিড় জমিয়ে বসে আছে। তারাও খেলা তোলা দেখছে। সন্ধ্যার পর বলে অধিকাংশের কাম-কাজ নেই।

বয়স্ক থেকে ছোকরা পর্যন্ত আছে। আর মহিলারা কেউ এলে ঘরে ঢুকে জানালা দিয়ে চোখ রাখে। উঠোনে এক জোড়া। হাতে দুটি লাঠি। দুজনের মধ্যে একজনের লাঠি ঘোরানো দেখেই বোঝা যাড়েবছ সে বেশ চৌকস। আরেকজনের হাবভাব দেখে বোঝা গেল সে নতুন। এই একজনক নিয়েই ওদের সমস্যাটা বারো মাস। প্রায়ই একজন দল থেকে হারিয়ে যায়। গতবারের বায়নার সময়ও একজন নাকি গ্রাম থেকেই পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পালানোর আগে, কথায় কথায় কয়েক জায়গায় বলে গেছে, ‘ধুরু, আর খেলুম না। ভাললাগে না। এইডা কুনো খেলা।’ পরে নাকি খেলা দেখানোর দিন আত্মগোপনকারী নিজেই এসে ধরা দিল, তবে দর্শকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে। এর আগেই এরা একজনকে তৈরি করে শূন্য আসন পূরণ করে নিয়েছে।

এবারও কি তা-ই? একজনকে কি পাওয়া যাড়েবছ না। তাই নতুন একজনকে এনে শিক্ষা করানো হচ্ছে না। নবাগত ভীষণ বিরক্ত। তাকে বারবার কৌশলগুলো শিখিয়ে দেওয়ার পরও সে পারছে না। রণেভঙ্গ দিয়ে সে খালি দাঁত খুলে হাসে। বাকিরা ঝাড়ি দেয়। যে এতক্ষণ শেখাচ্ছিল, সে নিজেই এবার হাল ছেড়ে দিল। বলল, ধুর ভোদাই, তুই পারতি না। এমনে খেলেনি। সে হাল ছেড়ে ঢেলার ধারে বসে পড়ার পর উঠল আরেকজন। তাকে একটু বয়স্ক মনে হলো। পঞ্চাশের ওপর নিশ্চিত, ষাটের কাছাকাছি হবে বয়স। সে উঠার পর একজনকে বলতে শোনা গেল, এইবার না শিখে কই যাবি। মুরব্বি উঠছে।

ইনিই তাহলে মুরব্বি। নাম নাসের মুন্সী। একটু কুঁজো হয়েছেন বটে; কিন্তু এখনো বেশ তরতাজা। লাঠি হাতে নিয়ে হাঁকডাক করে উঠলেন। সেই ডাক, যা তিনি শিখেছেন তাঁর পূর্বপুরুষদের কারো কাছ থেকে। ডাকে বেশ আদিমতা আছে। লাঠিখেলার সঙ্গে এই ডাকের প্রাকৃতিক একটা সম্বন্ধ টের পাওয়া গেল।

গলা থেকে নয়, একেবারে পেটের ভেতর থেকে ডাকটা উঠে আসছে বারবার। নবাগত তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। প্রথমেই তাঁর কোমরে ঠাট্টার একটা লাথি মারলেন। তারপর বললেন, ‘হারামজাদা, এমনে, এই দ্যাখ। তারপর কৌশলটা দেখিয়ে বললেন, কর দেখি, পারবি না?

নবাগত বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল। তারপর প্রথম কায়দাটা রপ্ত করল। আরেকটা কৌশলে যাওয়ার আগে মুরব্বি বললেন, এমনে আচমকা কাউরে শেখান যায়? এইডা তো মেলা শিখবার বিষয়।

দ্বিতীয় দফায় নবাগত আর পারছেই না। পায়ের নির্দিষ্ট ছন্দ আছে এ খেলায়; কিন্তু সে পায়ের ছন্দ আর সঙ্গে হাতের তাল ভঙ্গ করছে। আর মাঝেমধ্যে পায়ের ছন্দ মেলাতে গিয়ে আর হাতের তাল ঠিক রাখতে গিয়ে তালু থেকেই যায় লাঠিটা ছুটে। মুরব্বি আবার গালিগালাজ করলেন তাকে। কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। পারছে না মোটেও পুরোটা। অর্ধেকটা পারছে, বাকি অর্ধেকটা পারছে না।

মুরব্বি অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও তাকে দ্বিতীয় ধাপ শেখাতে না পেরে হাঁপিয়ে উঠলেন। তিনি হাল না ছেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এবার উঠলেন আরেকজন। তাঁর নাম কিসমত মাতুব্বর। মুন্সীর চেয়ে ছয়-সাত বছরের ছোট হবেন। এবার তিনি দেখিয়ে দিলেন, কিভাবে পা ফেলতে হবে, হাত চালাতে হবে। সব কিছুতেই আছে একটা ছন্দ। আর সেই ছন্দের কেন্দ্রে আছে লাঠিটা।

লাঠি হাতে নিয়ে কিভাবে ছন্দ-তাল মেলাতে হবে, তা তিনি বার কয়েক দেখিয়ে দিলেন। বললেন, ‘খালি লাফাস কা রে রতন! আগে আমারটা দ্যাখ, হেরপর কর, তাইলে অইবো।’ এবারও আগেরবারের মতো রতন খালি হাসে, দাঁত বের করে হাসে। ভাবখানা এমন, যেন সে ধরেই নিয়েছে, কামডা এত সহজ না।

বাপ-দাদার রপ্ত করা জিনিস আছিল। আর পইলা দিন এসেই সে কি সব শিখে ফেলবে? এমনটাই তো মানায়। সে হয়তো ভাবছে, দেইখাই যদি শিখা যাইবো গা, তো বাপ-দাদারা জীবনভর উঠানে কোন বাল ফেলছে। বলতে বলতে কোমরে সামান্য নিচে পাছার ছালে আরেকটা লাথি বসিয়ে দিলেন মাতবর। বললেন, ‘ছাগলের বাড়বচার মতন খালি তিড়িং-বিড়িং করতাছস ক্যা, তোরে না কইলাম, আগে দেখ, হেরপর তো পারবি। খেয়াল দিয়া দেখ। পাও মাইপা মাইপা ফেলাবি, আর হাতও লাড়াবি দেইখা দেইখা।’

বাচাধন পারছে না, তাকে লাঠিখেলা শেখাতে এনে এই পর্যন্ত দুই ওস্তাদের ওস্তাদি ফলানো শেষ, অথচ সে কিনা এখনো লাঠিখানাই কায়দামতো ধরতে পারছে না, দেখে কি আর মায়ের সয়? জানালা থেকেই যিনি এই মাত্র বললেন, ‘তুই যেমনে দেহায় দেয়, হেমনে করলেই না পারবি, ভালা কইরা আগে শিহা ল।’ এই মহিলা রতনের মা।

মুন্সী পানের খিলি মুখে দিতে দিতে বললেন, ‘আরে বাবা, এর আগেও তো আমরা শিহাইছি, শিহাইছি না, মানুষ কি নতুন ছুটছে দল থিকা? একবার দেহাইলেই তো পাইরা যায় গা...’ পান চিবুতে গিয়ে কথার আর অংশ বোঝা যায়নি। ঠিকই বলেছে মুন্সী, এর আগেও দল থেকে লোক চলে গিয়েছিল। তখন একজনকে ধরে এনে দুইতিন রাত সবক দিলেই তো তার খেলাটা তোলা হয়ে যেত।

মাতবর ক্ষান্ত দিলেন। গাঁইগুঁই করতে করতে বেরিয়ে গেলেন উঠান থেকে। বলে গেলেন, ‘আইজকালকার পোলাপাইন, মানজার বল আগেই শেষ। বিয়াশাদি তো রইছে। যুদ্ধ করলাম এতক্ষণ, বালডাও শিহাইতে পারলাম না। পোলাপাইন...

মনোযোগই নাই, কি শিখবো...’ রাগে গজ গজ করতে করতে উঠান ছাড়লেন তিনি। এবার আর বাকিরা ঢেলার পাশে বসে থাকার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। নতুন ছোকরারে শেখানো বাদ দিতে বলে সবাই একমত হলো, তারচেয়ে নিজেদের যার যার খেলাটাই ভালো করে তোলা যাক এইবার।

মুন্সী আর মাতবর মিলে একটা জোড়া। আজই প্রথম জোড়া মিলিয়েছে তারা। মুন্সীর জোড়াটা কদিন আগেও মাতবরের লগে ছিল না। মুন্সীর জোড়া ছিল মুন্সীর লগেই। নতুন ছোকরা পোলাপাইন চলে গেলে মানান যায়, ওরা আর বাপ-দাদার মর্ম কী বুঝব, বুঝের মানুষ এমন সময় চইলা গেলে কী করার আছে তাদের, সামনেই ঠিক বায়না। যাওয়ার আর টাইম পাইল না বুইড়া আজিজ মুন্সী। এক জোড়ায় দুই মুন্সী। গ্রামের সবাই তাই বুইড়ারে আজিজ মুন্সী না বলে শুধু এই খেলার কারণে আজিজ মোল্লা বলে ডাকা শুরু করে। বেশ জনপ্রিয়তা পায় নামটা। একজন মুন্সী, আরেকজন মোল্লা। এইবার জমব খেলা। এই দুজনের দিকেই সবার থাকত চোখ। বাইরে থেকে দর্শকের হৈচৈ। এই মোল্লা, মোল্লা, দাও দাও, লাগাও বাড়ি। হে বা, বা, বাহ, বাহ, হে... ডাক আর মুন্সী জইমা গেছে, ভিজা গেছে গা... খেলা চলাকালীন ইত্যাদি মন্তব্য। দূর গ্রামে খেলতে গেলেও দুইটা নাম কিভাবে কিভাবে যেন লোকেরা জেনে যেত। আর নিজেদের গ্রামের আশপাশে হলে তো খাইছে...। এই দুইজনের কারণে অন্য জোড়াগুলোর দিকে কারো খেয়াল করার সুযোগই ছিল না। মেইন চমক এরা দুইজন।

কিন্তু এক মোল্লার কারণেই দলটা ভাঙল এবার। নতুন করে সাজাতে হচ্ছে না সব। জোড়া ভেঙে গেছে। আবার নতুন জোড়া ধরাতে হবে। যা-ই হোক, তিরোধানের মুসাবিদা-১৭ তিরোধানের মুসাবিদা-১৮ মুন্সী আর মাতবর এক জোড়ায় খাড়াইলেও বিষয়টা কম না, এইভাবেও এরা ভেবে ফেলেছে অলরেডি। যে গেছে, তাকে তো আর আনতে পারবে না। শালার মোল্লা! যাওয়ার আর টাইম নেই। গ্রামের ছেলে-বুড়া সবাই বেশ গোস্বা করেছে বিষয়টা নিয়ে। মহিলারা তো হতবাক। এই সময় কেউ যায়...। এ রকম আর ঘটেনি, তাদের লাঠিখেলার ইতিহাসেও সম্ভবত বিষয়টা নেই, যে খেলার আগে বুঝের মানুষ কেউ চইলা যাইতে পারে। নবাগত রতন আর তার সঙ্গে যে জোড়া বাঁধবে, তার নাম সিক্কু। বাপ-মা শখ করে নাম রাখছে সেকান্তর। হয়ে গেল সিক্কু। তো, সেই সিক্কুও দলে আসছে বেশি দিন হয়নি। এর আগে মাত্র একটা বায়নায় খেলার অভিজ্ঞতা তার হাঁটুতে জমা আছে। বায়নার আগে তাকে শেখাতে শেখাতে জান শেষ মোল্লার। ভাগ্যিস সে সময় মোল্লা আর মুন্সীর জুটিটা ছিল বলে তাদের দিকেই দর্শকের সজাগ আকর্ষণ থাকায় সিক্কুর দিকে তেমন কেউ মনোযোগ দেওয়ার সময়ই পায়নি। আর সেই সময় সিক্কুর পার্টনার ছিল মানোয়ার। তার নাম হয়ে গেছে মনা। তো, সেই মনা কিন্তু আবার ভালোই খেলে। মনার কপাল খারাপ। আগে খেলত সিদ্দিকের লগে। কিন্তু সিদ্দিক খেলার আগেই ভাগছে, পালায়ে গেল, আর নাকি খেলবে না। এর চেয়ে নাকি তার কাছে ভালো পুকুর পাড়ে বসে মাঝখানে ঢিলানো। যা- ই বলুক, লাঠিখেলাটা সিদ্দিককে দিয়ে হইত। সে পারত ভালোই। তাই সে চলে যাওয়ার পর মনা যোগ দিয়েছিল সিক্কুর সঙ্গে। আজ আবার মনোয়ারের প্রমোশন হয়েছে দেখছি। সে খেলবে করিমের লগে। আরো একটা জোড়া আছে বেশ পুরনো। এরা একসঙ্গে প্রায় পনের-বিশ বছর বয়স থেকে খেলছে। কপাল ভালো, জোড়াটা ভাঙেনি। তবে দুজনের মধ্যে আমজাদের হাঁটুতে সামান্য সমস্যা আছে বলে অন্যজন রব্বানীর মাঝেমধ্যে কপালে খিঁচ ধরে যায়। সে বেশ বিরক্ত হলেও আস্তে আস্তে ব্যাপারটা মানিয়ে নিয়েছে। খেলতে খেলতে দুজনের অভ্যাস হয়ে গেছে। মূলত ব্যাপারটা হয়েছে আমজাদের জন্যই রব্বানী নিজেকে একটু স্লো বানিয়ে নিয়ে প্রস্তুত করেছে। আর ব্যক্তিগত জীবনে এরা আবার ভায়রা।

খেলতে খেলতেই সম্বন্ধটা হয়ে গেছে কেমনে কেমনে জানি। টেরই পায়নি দুইজনে। অনেক দিন ধরে কত বায়নার সঙ্গী-সাথি এই দুইজন। এর মধ্যে চাঁদ উঠে এসেছে মাঝ উঠোনে। হঠাৎ বিদ্যুৎটাও চলে গেল। জানালা দিয়ে এক মহিলা কুপি এগিয়ে দিল কেন কে বলতে পারে। ভরা চাঁদের আলো। তার পরও কুপি কেন? আসলে এটা এদের অভ্যাস। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে রপ্ত করা অভ্যাস। চাঁদের আলোতেও এদের একটা দিগদর্শন লাগে হয়তো। নইলে হাঁকডাক জমে না। বৈদ্যুতিক বাতি আর কুপির বাতি কি এক হলো? এরাই ভালো বলতে পারবে।

এরি মধ্যে উঠোনে জোড়ায় জোড়ায় খেলা তোলা শুরু হয়ে গেছে। রতন আর সিক্কু আশপাশ ঘেঁষে দেখে দেখে শেখার চেষ্টা করছে। বাকিরা বাহ বাহ বাহ বলে লাঠি ঘুরিয়ে যাড়েবছ আর কসরত দেখাড়েবছ। কেন যেন সাবধান করে দিল রতনকে। বলল, এই হর, লাডির থেইকা মাথা হরা, বাড়ি লাগব কইলাম। আবার আরেকজন সিক্কুকে। হর। আর চরম উত্তেজনা। লাঠিতে লাঠি পড়ছে।

আর আওয়াজ হচ্ছে না ঠক ঠক। আর এদের মুখ থেকে প্রাচীন পূর্বপুরুষদের শেখানো বোল। একটাই আওয়াজ, নানা ভঙিতে বের হচ্ছে না। উঠোনে কেবলই ধস্তাধস্তি। হাঁক-ডাক। কুপিটা আলো ছড়িয়ে যাড়েবছ, চাঁদ আছে, জোছনা আছে; তবুও বেশরমের মতো।

মুন্সী আর মাতবর অসাধারণ ভঙিতে লাঠি চালিয়ে যাড়েবছন। হাত নাড়ছেন, পা ফেলছেন। কী ছন্দময় তাল! এককালে এই গ্রামে লাঠিখেলার দলটা আরো বড় ছিল। প্রায়ই যখন বায়না আসত, আর এরা জোছনা রাতে জেগে জেগে খেলা তুলত, তখন গ্রামের মহিলারা পুরুষদের জন্য দুলিপিঠা বানাত। খেলা তোলা দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন আসত, সেটাও একটা উপলক্ষ ছিল। মহিলাদের কি আর সময় আছে হাতে। পানির ভাপে চুলায় বানাতে থাকত দুলি পিঠা। শীত নেই, গরম নেই-সব কালে তারা দুলি পিঠা দিয়ে চাঁদনি রাতের শেষের দিকে ক্লান্ত পুরুষ আর মেহমানদের আপ্যায়ন করত। সেই থেকে এই গ্রামের নাম দুলিপিঠা। আর এখন দুলিপিডা ডাকে সবাই। এখন আর দুলি পিঠা কেউ বানায় না। তবুও নামটা রয়ে গেছে। ঠিক তেমন, আগের মতো আর লাঠিখেলার আমেজ নেই, তবু একটা নেশা এদের মাথায় পূর্বপুরুষরা ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে বলে এরাও যেমন খেলে, তেমনি খেলায় আর আগের মতো উত্তেজনা নেই, বায়না নেই; তবুও এরা যেমন খেলে। অন্যরা চালিয়ে যায়। মাতবর আর মুন্সী হঠাৎ খেলা থামিয়ে দেন। আগে থামান মুন্সী। খেলতে খেলতে হঠাৎ কি যেন কথা মনে পড়ে গেল। পেটে আর আটকে রাখতে পারেননি। শুনে মাতবরও খেলা থামিয়ে দিতে বাধ্য হন। কী কথা?

কথাটা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুন্সী কেমন যেন থুবড়ে পড়ে যান, বসে যান ঢেলার পাশে, সঙ্গে মাতবরও। অন্যরা এদিকে বড় একটা খেয়াল না দিয়ে খেলা চালিয়েই যাড়েবছ। বরং জায়গা ফাঁকা পেয়ে সিক্কুর সঙ্গে রতন হুদাই লাঠি চালাড়েবছ। সিক্কু দেখিয়ে দিড়েবছ। রতন রপ্ত করার চেষ্টা করছে। কী কথা মনে পড়ল মুন্সীর। বসেই পানের বাটা কাছে টেনে নেন তিনি। পান বানান নিজের জন্য, আর হয়তো বানিয়ে দেবেন মাতবরকে এক খিলি। মুন্সী মাতবরকে বলে, ‘মাগির কা- হুন্চ আজকে। কী র্কচে জান?’ মুন্সীর এগিয়ে দেওয়া পানটা ধরতে ধরতে মাতবর বলে, ‘কী করছে আবার!’

দুজনেই খেলতে খেলতে হাঁপিয়ে গেছে বেশ। তবুও এর চেয়ে কথাটার গুরুত্ব তিরোধানের মুসাবিদা-১৯ তিরোধানের মুসাবিদা-২০

বেশি হওয়ায় নিঃশ্বাসের উপরে উপরে ভেসে উঠছে তা।

আরে, আইজগা মাগি কয় কী! বাপের লাঠি দিব না। লাঠি দিবি না, তাইলে খেলব কী দিয়া! ঘরে রাইখা রাইখা কি পূজা দিবি!

পরে আনলা কী বাই?

আরে মাগি লাঠি বুকে জড়াইয়া ধইরা কান্দে। খালি কান্দে। কয়, লাঠি নিতে পারবা না তুমরা। আমার বাপের লাডি।

মোল্লার মাইয়া কোনডা এইডা?

মাইয়া তো ওগগা। বড়ডা।

লাঠি কেড়ে আনার মিশনে সিক্কুও ছিল। এ বিষয়ে আলাপ হচ্ছে না দেখে সে খেলার চেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়ে উঠোন থেকে ঢেলার দিকে সরে এসে মুন্সী আর মাতবরের সঙ্গে যোগ দিল যেন। বলল, ‘জিদি বেশি কাকা। হেতি তো দেবোই না লাডি। পরে টান মাইরা কাইড়া লইয়া আইছি। আর কী করুম।

কইলাম, আরে তোমার বাপের লাঠি আমরা কি খামু নাকি। খেলা শেষ করে আবার দিয়ে যাব। কয়, না, আমার বাপের লাডি, দিমু না, খালি কান্দে আর কয়, আমার বাপের লাডি, দিমু না। পরে আমরা কাইড়া লইয়া আইচি।’ মাতবর সায় দিয়ে বললেন, ‘না, ঠিকই করচো, এহন লাডি পাইবা কই? এই লাডি মোল্লায় পাইল কই? এইডা তো আচিল আমগো বড় দাদার লাডি। হেরে দিয়া গেছে তো মরার শুম।’

কথা এমনভাবেই চলছে, ঠিক কুপির আলোর মতো ঢিমেতালে। বিদ্যুৎ এখনো আসেনি। রাত বেড়ে যাড়েবছ, আকাশে তেমন মেঘ না থাকায় চাঁদের আলোয় ফকফকা উঠান। তবুও কুপিটা জ্বলছে। অন্যরা খেলা তুলছে অবিরাম। হঠাৎ ঘটল ঘটনাটা। কেউ একজন ছুটে এসে ঝাঁপ দিল উঠানে। মধ্যবয়সী মহিলা। কুপির আলো আর চাঁদের আলো মিলেও তার মুখের ছায়াটা ঠিক স্পষ্ট করে তুলতে পারছে না। শাড়ি পরা, মাথার কাপড় টানা ছিল কোনো এক সময়, এখন নেই, এক প্যাঁচে পরা শাড়িটা খুলে খুলে পড়ছে। হাউমাউ করে কান্না করায় কথা জড়িয়ে যাড়েবছ তার। কী যেন বলতে চাইছে। সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ। খেলা বন্ধ। উঠানটা একাই এখন দখল করে নিয়েছে আগন্তুক মহিলা।


মাতবর আর মুন্সী বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। মহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী অইচে লা জমিলা? কান্দিস না, থাম, কী অইচে ক।’

মধ্যবয়সী মহিলা, এর নাম জমিলাই হয়তো। সে থামে না। মধ্যরাতে হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে একটানা। কেউ তাকে থামাতে পারছে না। এরি মধ্যে জানালা ছেড়ে ঘর থেকে মহিলারা ছুটে এসেছে। তবু তাকে শান্ত করা যাড়েবছ

না। জমিলা বলতে চাইছে, ‘আমার বাপের লাডি নিয়া আইচে গো। লাডি দে, আমার বাপ আর খেলব না, আর খেলব না...।’

মাতবর আর মুন্সী উপস্থিত টাসকি খান। অন্যরাও হয়তো খায়। তাদের বোঝার বাকি থাকে না, দুপুরে কী কারণে জমিলা বাপের লাঠি হাতছাড়া করতে চায়নি। জমিলার বাপের নামই আজিজ মোল্লা। যিনি চলে গেছেন। তবে ছোকরা সিদ্দিকের মতো পালায়া যায়নি। যাকে হারিয়ে বায়নার ঠিক আগ মুহূর্তে এরা বেকায়দায় পড়ে তাড়াহুড়ো করে রতনকে দিয়ে খেলাটা চালিয়ে নিতে চাচ্ছে।

মোল্লা বার্ধক্যজনিত কারণে কয়েক দিন আগে হঠাৎ মারা গেছেন। তার পর থেকেই মরা বাপের জায়গাটা রতন নিয়ে নেবে-এই আশঙ্কায় জমিলা লাঠিটা হাতছাড়া করতেই রাজি নয়। এদিকে এদের বায়নার দিন ঘনায়। সবার ধারণা, মোল্লার মাইয়্যা হিংসুক, কৃপণ আর বদখেয়ালী, তাই লাঠিটা দিড়েবছ না।

অথচ এখন কী শুনাইল জমিলা! সবাই যখন তাকে শান্ত করতে উঠোনে ছুটে এলো, তখন সে শুনিয়ে দিল, ‘লাডি দিয়া কী করমু? আমার বাপ তো আর খেলব না। তার বদলে রতইন্যা খেলব না! ও কাকা, কথা কন না ক্যা...।’

মুন্সী কী কথা কইবেন? হয়তো ভাবছেন, ‘লাডির কামই তো খেলা।

খালি খেলা আর খেলা। বিনা রক্তপাতে খেলা। এই যেমন, এহন খেলতাছে, মোল্লা আর তাঁর মাইয়্যারে লইয়া।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন