রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

হারুকি মুরাকামি'র সঙ্গে রোনাল্ড ক্যাল্টসের সংলাপ

ভাষান্তর : এমদাদ রহমান 

['বাতাস যেখানে গান গায়' নামে মুরাকামি প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন '৭৯ সালে, তারপর টানা ৩ দশক ধরে তিনি মানুষের মনোজগতকে আশ্চর্য দক্ষতায় পর্যবেক্ষণ করেছেন।

শুধু জাপানেই নয়, হারুকি মুরাকামি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম। বিশ্বের কয়েক কোটি পাঠক পড়েছেন তার লেখা। ইতোমধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার বইগুলি। সেসব বইয়ে পাঠককে তিনি অদ্ভুত ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চেয়েছেন। ২০০৫-এ বেরিয়েছে তার বহুল আলোচিত উপন্যাস 'কাফকা অন দ্য শোর', এবং ২০১৭ সালে সঙ্গীত নিয়ে সেজি ওযাওয়া'র সঙ্গে আলাপচারিতার বই 'এবসোলিউটলি অন মিউজিক'।

মুরাকামি টোকিও'র ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তার পাঠ্য বিষয় ছিল 'নাটক'। 

জে.ডি স্যালিঞ্জারের 'দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই', এফ. স্কট ফিটজিরাল্ডের 'দ্য গ্রেট গ্যাটসবি' বইদুটি তিনি অনুবাদ করেছেন। ফিটজিরাল্ডের উপন্যাসটিকে লেখক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই মনে করেন। 

লেখালেখির শ্রমসাধ্য দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে তিনি ভিডিও গেমস প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, 'লিখতে বসে কখনও মনে হয় ভিডিও গেম ডিজাইন করছি। আমিই প্রোগ্রামার, আমিই প্লেয়ার। এক বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড়'। দৌড়বিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। ২০০৮-এর জুনে দ্য নিউইয়র্কারে মুরাকামি'র 'দৌড়বিদ উপন্যাসিক' লেখাটি প্রকাশিত হয়, একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনস্মৃতি 'হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং'। 

তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালে, জাপানের কিয়োটো'য়। তিনি উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক। ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স, আফটার দ্য কোয়েক, দ্য স্ট্রেঞ্জ লাইব্রেরি, ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইম্যান, এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ, নরওয়েজিয়ান উড, দি উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল, স্পুটনিক সুইটহার্ট, ওয়ানকিউএইটফোর ইত্যাদি তাঁর অন্যতম সৃষ্টি। 

রোনাল্ড ক্যাল্টস টোকিও ইউনিভার্সিটি'র লেকচারার যিনি টোকিও এবং নিউইয়র্কে নানা ধরণের লেখালেখি ও গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকেন। জাপানি পপসংস্কৃতির ঢেউ কীভাবে আমেরিকান জীবনধারায় আছড়ে পড়েছে তা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি ও বই প্রকাশ করেছেন। তার আলোচিত বই- 'জাপানামেরিকা-- হাও জাপানিজ পপ কালচার হ্যাজ ইনভেডেড দ্য ইউ.এস.'। মুরাকামির সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের, বহু সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। 'দ্য জাপান টাইমস'-এ তার নেওয়া মুরাকামির সাক্ষাৎকার 'রাইটার্স অন দ্য বর্ডারলাইন' সাহিত্য মহলে প্রশংসিত হয়। রোনাল্ড ক্যাল্টসের এই লেখাটি 'থ্রি : এ. এম.' ম্যাগাজিনের ওয়েভসাইটে ছাপা হয়, ২০০৯'র মার্চে।] 

৮০'র দশকের শেষদিকে, পঞ্চম উপন্যাস 'নরওয়েজিয়ান উড' প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়, মুরাকামিও আর দেরি না করে স্ত্রী য়োকোকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন, প্রথমে ইউরোপ, তারপর আমেরিকা; জাপানে আসেন, তবে মাঝেমাঝে, এবং নীরবে, প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে কেউ কিছু জানতেও পারে না। সকলের অগোচরে এক সন্ধ্যায় চলে যান টোকিও'র ইয়োকো সোয়ালোয় বেসবল খেলা দেখতে, সেখানে থেকে বিচবয় ব্রায়ান উইলসনের কনসার্টে; মাসের শেষ সপ্তাহে, টোকিও থেকে সোজা হাওয়াইয়ের বাড়িতে। 

লেখা থেকে এক মুহূর্তও দূরে ছিলেন না তিনি, সবকিছু দেখছিলেন তীক্ষ্ণ জাপানি চোখে; পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন চিঠির মাধ্যমে, সেসব চিঠি থেকে বুঝতে পারছিলেন তার পাঠকদের বেশিরভাগই জাপানের সেইসব তরুণ যারা নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। আমাকে তিনি কৌতুকের সুরে বলেন- 

: 'আমি বুড়ো হচ্ছি, আর পাঠকরা তরুণ হয়ে উঠছেন।' 

নতুন বই প্রকাশ হলেই আন্তর্জালে ওয়েভ সাইট খুলেন তিনি; অনলাইন বুলেটিন বোর্ড, ই-মেল এবং ব্লগের মাধ্যমে পাঠকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন-

: পাঠক আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকরা কে কী বললেন তা তেমন দরকারি কিছু নয়, পাঠকই সব। লেখকের নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠী থাকলে সে লেখক শেষ পর্যন্ত লিখে যাবেন, ফুরিয়ে যাবেন না।' 

'৯৫-এ, গ্রেট হানশিন ভূমিকম্প আর টোকিও সাবওয়ে'র বিষাক্ত গ্যাস আক্রমণ লেখককে স্বদেশে ফিরে আসার জন্য মরিয়া করে তোলে, তাগিদ অনুভব করেন জাপানে ফিরবার।

জাপানকে গভীর নিবিড়তায় লেখায় আনতে পুরোপুরি এক নিবেদিত লেখকে পরিণত হন তিনি, যে দেশ থেকে একসময় বলা যায় পালিয়েই গিয়েছিলেন। দুটি বড় ঘটনার অভিঘাত ও অভিজ্ঞতায় পর পর দুটি বই লিখেন তিনি, তার একটি ননফিকশন 'আন্ডারগ্রাউন্ড, সেই সাবওয়েতে ভয়ানক গ্যাস আক্রমণের যারা ভিকটিম ছিলেন আর যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছিল তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি, বইটিতে সেসব কথা স্থান পেয়েছিল, দ্বিতীয় বইটি 'আফটার দ্য কোয়েক', ছোটোগল্পের সংকলন। গল্পগুলিতে যে-সময়টাকে ধরেছিলেন তা হচ্ছে জাপানের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের তৈরি বিপর্যয়ের মধ্যবর্তি তিরিশ দিন। বই দুটি প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই মুরাকামির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়, তিনি আমার হাত আঁকড়ে ধরে বলছিলেন, বই দুটি লেখার অভিজ্ঞতা তাকে অনেক বদলে দিয়েছে, একই সঙ্গে লেখক ও একজন মানুষ হিসাবে দায়িত্বশীলতার বোধকে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে। 

গত এক দশক মুরাকামির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন শহরে। লেখালেখি নিয়ে ধারাবাহিক কথার অংশ হিসেবে কত সংলাপই না হয়েছে আমাদের! তিনি এমন একজন লেখক যাকে আমি শ্রদ্ধা করি, এমন একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসি। ব্যক্তি হিসেবে তিনি স্নিগ্ধ, কৌতুকপূর্ণ ও চিন্তাশীল। ইংরেজি ভাষার সূক্ষ্ম তারতম্য ও দ্যোতনার প্রতি তিনি আগ্রহী ছিলেন, তার ছিল মিশ্র ও নিত্যপরিবর্তনশীল সংস্কৃতির মধ্যে অর্জন করা সেন্স অব হিউমার। 

এ বছরের গোঁড়ার দিকে মুরাকামি ৬০-এ পা দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ও জাপানে তার সঙ্গে নৈমিত্তিক কথোপকথনে জানতে পেরেছি বয়সের এই মাইলফলকটির কথা সব সময়ই তার মনে ছিল, কথায় কথায় তিনি বলেন- '৬০-এর কোটায় পা রাখতে চলেছি, জানেন? কথাটা তিনি খুব সহজ করে বলেন, তাঁর সহজাত ভঙ্গিতে; হয়ত, আর একদিন এভাবে বলবেন-

: দেখুন, আমি কিন্তু ৬০-এ পা দিয়েছি, তাই...'

টোকিও'র অফিসে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বলে উঠলেন দস্তয়েভস্কি'র কথা-

: দস্তয়েভস্কি হচ্ছেন আমার আরাধ্য লেখক। অধিকাংশ লেখক বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়েন, লিখতে পারেন না, কিন্তু দস্তয়েভস্কি ভেঙেপড়া লেখক ছিলেন না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও বেড়েছেন, আরও উঁচু হয়েছেন, মহান কথাকারে পরিণত হয়েছেন; ৬০-এর কাছাকাছি পৌঁছে তিনি 'ব্রাদার্স কারামাজভ' লিখেছিলেন। উপন্যাসটি অসাধারণ এবং মহৎ।' 

তার বহু পাঠক এখন জানেন মুরাকামি একজন দৌড়বিদ। দূরপাল্লার দৌড় তার অত্যন্ত প্রিয়। তিনি নিয়মিত দৌড়ান। বহুবার ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন, তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ হয়েছে ২৭টি ম্যারাথন শেষ করবার অনন্য রেকর্ড। তার বইয়ের তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন 'হোয়েন আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং' নামের ইংরেজিতে লেখা একটি বই, যাতে উৎকীর্ণ রয়েছে 'আত্মস্মৃতি' শব্দটি, যা বইটির উপশিরোনাম; বইটিতে লিখেছেন-

: 'এটি কোনও প্রবন্ধ সংগ্রহ নয়, লেখালেখি ও দৌড়ের মধ্যবর্তি সংযোগগুলিকে বিস্তারে বলবার জন্য পুরো একটি বই আমাকে লিখতে হলো। বইটি শুধুমাত্র দৌড় সম্পর্কিত নয়, জীবনকে যাপনের উপায় সম্পর্কেও। 'কীভাবে কী করবেন' ঘরানার বই নয় এটা। ঠিক যেভাবে আমি দৌড়ই সেই একইভাবে বেঁচেও থাকি। তাই আমার জীবনযাপন, দৌড় আর লেখালেখির সংযোগ নিয়েই এই বই। বলতে পারি, জীবনকে দেখবার এটাই আমার ভঙ্গি।' 

'লেখালেখি কি বিপজ্জনক কাজ?' কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, আমাদের কথোপকথনে, আলাপের বিস্তার হয় এভাবে- 

: [আপনি যখন লিখছেন] ধীরে ধীরে আপনি অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছেন, চারপাশে জমাটবাধা অন্ধকার একটি জায়গায় নেমে এসেছেন আপনি, তখন আপনার দরকার হবে অদম্য শারীরিক শক্তির, টিকে থাকবার প্রয়োজনে; প্রচণ্ড শক্তির দরকার হবে সেই অতল জমাট অন্ধকার থেকে চেনা জগতে ফিরতে হলে।' 

ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যশাস্ত্র পড়া শেষে সংগীতের দোকানের কাজ ছেড়ে দিলেন, দৌড় শুরুর পর ছেড়ে দিলেন দৈনিক ৩ প্যাকেট সিগারেটের অভ্যাস, তাতে শারীরিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেল; প্রতিদিনকার ঘুমের অভ্যাসেও পরিবর্তন এল। যিনি কিছুদিন আগেও ছিলেন নিশাচর পেঁচার মতো, সেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েন রাত ন'টায়, কখনও দশটা'য়, জেগে ওঠেন ভোরে, ৩ টায়, কখনও ৪টায়, তারপর লিখতে শুরু করেন। 

: 'জীবনযাপনে এই পরিবর্তনের ফলে বেশ ক'জন ঘনিষ্ট বন্ধুকে হারালাম, কেউ ভুল বুঝলো, রাগও করল কেউ কেউ, আর আমি ভাবলাম জীবনশৈলীর এমন পরিবর্তন নেহাত মন্দ তো নয়! এবার নিশ্চয়ই ভাল কিছু ঘটবে। নির্ঘুম রাতগুলি আসলে এক বিভ্রম; কেবলই মনে হয়- শেষরাতের দিকে বিস্ময়কর কিছু ঘটবে, মাঝেমাঝে অদ্ভুত কিছু ঘটেও, কিন্তু বেশিরভাগই ক্ষেত্রেই জাগরণটা বিরক্তিকর।'

বয়স যখন ৬০এর কোটায়, মুরাকামি তখনও অদম্য; ৬০-এর ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েননি বরং আরও প্রখর হয়ে উঠছেন। নিয়মিতই প্রিয় মার্কিন লেখকদের লেখা অনুবাদ করছেন, রেমন্ড চ্যান্ডলারের 'দ্য লং গুডবাই', এফ. স্কট ফিটজিরাল্ডের 'দ্য গ্রেট গ্যাটসবি' এবং জে ডি স্যালিঞ্জারের 'দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই'। বইগুলির নতুন সংস্করণ হবে এবার, জাপানে। 

মুরাকামির ভক্তদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ (তাদেরও ভক্ত হিসেবে ধরে নিচ্ছি সানফ্রান্সিসকোতে যারা বইগুলিতে স্বাক্ষর নেবার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছিলেন, লেখককে সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন যেন তিনি তাদের এক আরাধ্য দেবতা।) খবর হচ্ছে, বার্কলে ইনস্টিটিউটে মুরাকামি যেমনটি বলেছিলেন, পরবর্তীতে, টোকিওতেও- 

: উপন্যাসটি শেষ হয়েছে, 'কাফকা অন দ্য শোর'-এর আকারের দ্বিগুণ।' 

সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে তুমুল করধ্বনির ভেতর তিনি বলতে থাকেন- যারা ট্রেনে যেতে যেতে বই শেষ করতে চান তারা ক্ষমা করবেন। বইটি বেশ বড়। এখন আমার উপন্যাস জটিল, বহুস্তরিক হয়ে উঠছে কারণ পৃথিবীও ক্রমশ জটিল, দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। 

উপন্যাসটি সম্ভবত কয়েকখণ্ডে জাপানের দোকানগুলোয় বিক্রি হবে, এই বসন্তে। 

এবং, সেলুলয়েড ভক্তদের জন্যও দারুণ খবর আছে। এই প্রথম মুরাকামির কোনও উপন্যাস সিনেমার ভাষায় অনূদিত হবে, ভিয়েতনামী পরিচালক আন হাঙ ট্র্যানের পরিচলনায়। ট্র্যানের চলচ্চিত্রসংস্করণে 'নরয়েজিয়ান উড'--যা মুরাকামি'র বহুল-বিক্রিত উপন্যাস--মুক্তি পাচ্ছে আগামী বছর। খবরটি আমাকে চমকে দিয়েছিল, কেননা তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন ডেভিড লিঞ্চ আর উডি অ্যালেন হচ্ছেন সেই পরিচালক একমাত্র যাদেরকে তিনি শ্রদ্ধা করতে চান!

: আমি তার [ট্র্যানের] তিন-চারটি ছবি দেখেছি, সত্যিই ভালোলাগার মত কাজগুলি। ব্যক্তিগতভাবেও লোকটিকে আমি পছন্দ করি। টোকিও এবং প্যারিসের বাড়িতে বেশ কয়েকবার আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি একজন ভিয়েতনামি-ফরাসি, তবুও বলব পূর্বএশীয় অঞ্চলটি ধীরে ধীরে এক বিশেষ সংস্কৃতির জন্ম দিতে চলেছে। আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে সমৃদ্ধ এশিয়ান সংস্কৃতি তৈরি করা। দশবছর আগেও আমাদের বাজার ছিল না, পাঠক ছিল না কিন্তু এখন আছে। এখন সবই আছে। এ অঞ্চলের রাজনীতি গভীর সংকটে পড়ে আছে কিন্তু পারস্পরিক মূল্যবোধকে যুক্ত করে আমরা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি তো তৈরি করতে পারি। 

তাকে জিজ্ঞেস করি, কীভাবে তিনি ইউরোপীয় বা আমেরিকানের কাছ থেকে এশিয়ার সংবেদনশীলতাকে আলাদা করেন, প্রভেদ্গুলিকে স্পষ্ট করেন? 

: কাজটা কঠিন, আপনি তো জানেন, কোনও আমেরিকান বা ইউরোপীয় পরিচালক [কেঞ্জি] মিজোগুচি বা [ইয়াসুহিরো] ওজু'র মত সিনেমা বানাতে পারবেন না কেননা এশিয়ায় ভিন্ন জীবনধারা, সময়ের অনুভবও ভিন্ন যাকে ঘিরে থাকে বিপুল ধৈর্য আর শব্দ-নৈঃশব্দ্যের প্রগাঢ় অনুভব।' একটু থেমে, আবার বলতে শুরু করেন- 

: আমি মনে করি আন্তঃসাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই (বিনিময়) আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়', ছোট্ট টেবিলে আলগোছে হাত দুটি রাখতে রাখতে তিনি কথা বলেন, যে-টেবিলটি আমাদের দু'জনের মাঝখানে দারুণ সংযোগ তৈরি করেছে-

: ব্যাপারটা আমি যথার্থই উপব্ধি করতে পেরেছি, এই দেশগুলিতে থাকার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। আমি যখন আমেরিকায় ছিলাম, ৯০'র শুরুতে, জাপান তখন ধনী দেশ, সকলে সে কথা বলত, কিন্তু তখনও নিজস্ব সংস্কৃতির যে স্পষ্ট চেহারা দরকার, যাকে আমরা সংস্কৃতির 'মুখ' বলি, তা ছিল না, আমি ভাবলাম-

: কাউকে কিছু করতে হবে। জাপানি সংস্কৃতির জন্য আমাকেও কিছু করতে হবে। এটা আমার কর্তব্য। এদিকে ইউরোপ আমেরিকায় আমিও বেশ পরিচিত লাভ করেছি, এসব দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, মতবিনিময় করতে সক্ষম হয়েছি। এটা দারুণ সুযোগ। নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা এখন ভাবতে হবে। কাজ করতে হবে। শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকজনই এটা করতে পারবে, আমি তাদেরই একজন। "

একদিন যে মানুষটি জাপান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিই এখন সারাদুনিয়ায় জাপানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বস্ত সাংস্কৃতিক দূত। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন