মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা সাদিক হোসেন এর সেরা গল্প : তিনমহলা

গল্পটি নিয়ে গল্পকারের সঙ্গে আলাপ--
গল্পপাঠ--
গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন। 

সাদিক হোসেন--
সাধারণত আমি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়ার পর লিখতে বসি। লিখতে বসার সময়টা মোটামুটি রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ হয়।


গল্পপাঠ--

গল্পটি লেখার সময়ে কি কাজ করছিলেন, কি  পড়াশুনা করছিলেন বা কি লিখছিলেন?
সাদিক হোসেন-- 
গল্প লেখার সময় আমি সাধারণত কোন বই পড়িনা। বা পড়লেও গল্প উপন্যাস পড়া এড়িয়ে চলি।

গল্পপাঠ--

গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন। 
সাদিক হোসেন--
এটা বলা খুব মুশকিল। আমি চেনাজানা লোকজনের জীবন থেকেই গল্পের সন্ধান পেয়ে থাকি। এটাও সেইভাবেই হয়েছিল।

গল্পপাঠ--

এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন? 

সাদিক হোসেন--
প্রতিটি গল্পই আসলে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সম্পর্কে লেখকের বোঝাপড়া। আমার এই গল্পটি একটি বিয়ের দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। শেষ হয়েছে পরের দিনের সকালে। এইটুকু ঘটমান সময়ের মধ্যে আমি মূলত তিনটি চরিত্রের টানাপড়েন ধরবার চেষ্টা করেছি। তাঁদের টানাপোড়েনের মাধ্যমে আমি একটি পণ্যবাদী সমাজের বিচিত্র অভিমুখ জানতে সচেষ্ট হয়েছি্যেছিলা

গল্পপাঠ--

গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন? 

সাদিক হোসেন--

এক সপ্তাহের মধ্যে গল্পটি শেষ করেছিলাম। 
আমি খুব ধীরে ধীরে লিখি। লেখার সময় বহুবার কাটাকুটি করি। কিন্তু একবার লেখা হয়ে গেলে আর খুব বেশি পরিবর্তন করি না।

গল্পপাঠ--

লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে? 
সাদিক হোসেন--
কোন গল্পে কি একটি-ই মূল ভাবনা থাকে? আমার তো তা মনে হয় না। 

গল্পপাঠ--

গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন? 
সাদিক হোসেন--
আমার এক কবি বন্ধু। সে প্রায় আমার সব গল্পেরই প্রথম পাঠক। 


গল্পপাঠ--

লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন। 

সাদিক হোসেন--
এরকম মনে হওয়া আমার কোনদিন মনে হয়নি। বিষয়ের সঙ্গে আমার চিন্তাভাবনার একটা সমঝোতা হয় মাত্র। কখন আমি এই সমঝোতায় খুশি হতে পারি, কখন পারিনা।


গল্প
তিনমহলা 
সাদিক হোসেন 
।১। 

অবশেষে বিবাহ সম্পন্ন হইল। কাবিলনামায় সহি হইয়া গিয়াছে। মৌলবির সম্মুখে কন্যা তাহার সম্মতি জানাইয়া দিয়াছে। এইক্ষণে নুরুদ্দিন হয়তবা খানিক দুশ্চিন্তা মুক্ত হইয়াছিলেন। এই তো, অত লোকজনের মধ্যে তাহার বৌমা কেমন বসিয়া রহিয়াছে। নববধূর হস্তে নিশ্চিত খয়েরি রঙের মেহেন্দি উৎকীর্ণ। তাহার ঠোঁট কাঁপিতেছে, সে আজিকে লাজমতী। মরালের ন্যায় তাহার গর্দ্দান ক্ষণে ক্ষণে দুলিয়া উঠিতেছে যেন বা। নুরুদ্দিন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। তাহার হাতে একখানা খোরমার প্যাকেট। নিকা পড়ানোর পর মিস্টিমুখ করাইবার হেতু আনা হইয়াছিল। তিনি প্যাকেট হইতে খোরমাগুলি বিতরণ করিলেন। এই ছন্নছাড়া বস্তিতে কেই বা পূর্বে খোরমার স্বাদ পাইয়াছে? তিনি বুঝি নিজ মনেই বিড়বিড় করিলেন। এই কয়দিনে তাহার ঝক্কি তো কম হইল না! অকর্মণ্য ছেলেটির পায়ে শিকল পরাইতে আজ তাহাকে এইসব নীচ মানুষজনের সহিত সম্পর্ক স্থাপন করিতে হইল। 

আহা! কত সখ করিয়া তাহার কনিষ্ঠ পুত্রটির নাম রাখা হইয়াছিল জালালুদ্দিন শেখ। এখনও চোখ মুদিলে নুরুদ্দিন দেখিতে পান তাহার পুত্রটি এইমাত্র জন্মিল। জন্মিল তো জন্মিল, এই তো তাহার তুলতুলে গাত্র, ভেজা চুল, কাঁদিলে কেমন বেড়াল ছানার মত ডাক ভাসিয়া বেড়ায়। মনে হয়, ঐ তো ঘরের কোণে মার্জারটি আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছে। যেন সে সংসারের চারিপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতে চাহে, মাঝেমধ্যে খাদ্য দ্রব্যাদির সন্ধানে সংসারে ঢোকে - এই সে জানালা দিয়া উঁকি মারিল, আবার এইক্ষণে সে পাঁচিলের ধার দিয়া হেলেদুলে বাহির দেখিতেছে। তাহার বাহির মনুষ্য প্রকৃতি বিরুদ্ধ। ইহা কেবলই চন্দ্র-সূর্য সম্মিলিত, নদী ও গিরিখাত দ্বারা আচ্ছাদিত। সে জালালুদ্দিন, এইখানে যেন বাহিরের মানুষ; ফকির ও মিসকিন। ইস! তাহার পিতা নুরুদ্দিন না থাকিলে সে কি নেহাতই ইতর প্রাণীতে পরিণত হইত না! 

পিতার বাহুতে জুলু বড় হইতেছিল। তাহার মস্তিষ্কে বিকৃতিও ঘটিতেছিল। এক গ্রীষ্মকালে সে ঘর ছাড়িয়া গায়েব হইল! 

হয়তবা সেইদিন কালবৈশাখী আসিয়াছিল। বৈকালিক আলোটুকু হঠাৎ নিভিয়া গিয়া আকাশ আন্ধার হইল। গাছেদের পাতা কালো হইল। ছাদে মেলা কাপড়গুলি গৃহিণীরা তুলিতে যাইলে তাহাদের আঁচল লন্ডভন্ড হইল। জানালার কপাট বন্ধ। বাহির হইতে শোঁ শোঁ আওয়াজ আসিতেছে। পাঁচিলের উপর দিয়া ধূলিকণা ওড়ে। পাখির বাসা ঝপ করিয়া খসিয়া পড়ে গাছের নিচে। গাছের নিচে কে বা কাহারা সেইসময় ফল কুড়াইতে গিয়াছিল। সেইখানেই জুলুর চটি দুটি আবিষ্কৃত হইল। 

কিচকিচে ধূলিকণা। তারিমধ্য বাগানে একখানা ডাল ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। তবু নুরুদ্দিন কাহারো নিষেধ মানিতে রাজি নন। তিনি একমাথা বৃষ্টি নিয়া চটি জোড়ার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। রবারের উপর বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ। সামান্য নিচু ঐখানটায়। আহা, ঝড়জল ঐ নিচু রবারের উপর কাদামাটি লেপ্টাইয়া দিয়াছে। নুরুদ্দিনের চোখ দিয়া অনবরত পানি নাবিতে থাকিল। এই চটি জোড়ার ভিতর তিনি বুঝি কোন এতিমকে দেখিতে পাইয়াছেন। একা ও অনাকাঙ্ক্ষিত। নিজেকে রক্ষা করিবার ক্ষমতা উহার নাই! 

কিংবা সেই মানুষটি কোনদিন সংসারের অংশ হইতে পারিল না। যাবার পূর্বে, যাহা কিছু তাহার নয়, সে এমন সব কিছুকে হেলায় ফেলিয়া গিয়াছে। প্রথম দর্শনে চটি জোড়ার প্রতি যে বিস্ময়বোধ জন্মিয়া ছিল; খানিক পর তাহা উধাও হইয়া গেল। আকাশে বিদ্যুৎ খেলিল। নুরুদ্দিন শেখ বুঝিতে পারিলেন – তাহার কনিষ্ঠ পুত্রটি কী ভীষণ প্রতিশোধ লইয়াছে। সকলের সম্মুখে আজ তিনি নাকচ হইয়াছেন। আজ তাহার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর, ক্রয় ক্ষমতা, অপর্যাপ্ত বস্তুসামগ্রী - সব কিছুই এক লহমায় রবারের চটির মত পড়িয়া রহিয়াছে কাদাজল মাখিয়া। 

তিনি আর কোন কথা বলিলেন না। সংসারের কেহ যেন জুলু সম্পর্কিত কোন বাতচিত না চালাইতে পারে, সেই সম্বন্ধেও নিশ্চিত হইলেন। 

কিন্তু পিতা তো বাস্তবিক মানুষ মাত্র। তাহার কোন অতিলৌকিক ক্ষমতা নাই। তিনি চাইলেও কিছুতেই সর্বত্রগামী হইতে পারেন না। ফলত নুরুদ্দিন শেখ, সবে মাত্র তাহার দাড়িতে রঙ লাগিয়াছিল, থাকিতে থাকিতে খালি জুলুর খোঁজখবর লইয়া বসেন। কোন জ্যোৎস্নালোকিত আকাশের নিচে, সেই চিরন্তন প্রান্তরে, যেন বা সেই শস্যক্ষেত আপন মনে ন্যুব্জ হইয়াছে নরম মাটিতে - সেইখানে তিনি তাহার কনিষ্ঠ পুত্রটিকে দেখিতে পান। অথচ এই অঞ্চলে শস্য উৎপাদন হইতই বা কবে? ফসল এইখানে সর্বদা অর্থের বিনিময়ে সংসারে আসিয়াছে। ফসলের দানায় মানবের প্রত্যক্ষ শ্রম লাগে নাই। নুরুদ্দিন শেখ বারে বারে আয়নায় নিজেকে দেখিলেন। নিজের মধ্যেও কি পুত্রটির মত অমন বিকৃতি কোথাও রহিয়া গিয়াছে? তিনি কোন সিদ্ধান্তে আসিতে পারিলেন না। 

অবশেষে জুলুর দেখা মিলিল। একদিন ভোরবেলা তাকে রান্নাঘরে ভিতর বিস্কুটের কৌটো খুলিতে দেখিয়া সকলে চমকিত হইল। 

– এতদিন কোথায় ছিলে? জুলুর কোন জবাব নাই। তাহার অভিব্যাক্তিতেও কোন পরিবর্তন আসে নাই। 

নুরুদ্দিন শেখ সুযোগ বুঝিয়া একদিন পুত্রটিকে নিজ গৃহে ডাকিয়া লইলেন। 

জুলু প্রবেশ করিয়া গুটিসুটি হইয়া বাপের পায়ের নিকটে বসিয়া আছে। পিতাকে তাহার বড় ভয়। একাসনে বসিবার অধিকার যে তাহার নাই – তা সে যথার্থই বুঝিয়া ছিল। 

– কী চাও কী তুমি? 

জুলু নিরুত্তর। 

নুরুদ্দিন শেখ বলিলেন, তোমার এমন খামখেয়ালিপনা হয় কেন? বল, আমাকে বল। 

জুলু কী বলিতে চাহিতেছিল, নুরুদ্দিন শেখ তাকে থামাইয়া দিলেন, অনেকেই বলছে তোমার নাকি মাথায় গণ্ডগোল আছে। এসব রোগ আমাদের বংশে কারো ছিল না। আমার বিশ্বাস এই রোগ তোমার মধ্যেও নেই। নিজেকে সামলিয়ে নাও। তোমার চটি জোড়া বারান্দায় রাখা আছে। খালি পায়ে আর যেন কোনদিন বাইরে বেরতে না দেখি। 

জুলু পিতাকে কথা দিয়াছিল। সে আর কোনদিন চটি ছাড়া বাহিরে যায়নি। উপরন্তু তাহাকে মাঝে মধ্যে পিতার সহিত দোকানে বসিতে দেখা গিয়াছে। সে ক্যাশবাক্সের উপর ঝুঁকিয়া ক্যাশের হিসাব রাখিয়াছে। সেই হিসাব অধিকাংশ সময় মেলে নাই। হিসাব না মিলাইতে পারিলে জুলু ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া থাকে। তখন তাহাকে বড় করুণ দেখায়। নুরুদ্দিন শেখ পুত্রের এই চেহারা সহ্য করিতে পারিতেন না। তিনি পুত্রটিকে কাজ হইতে কিছু সময়ের জন্য রেহাই দিতেন। 

এইভাবে পিতা ও পুত্রের মধ্যে হয়তবা কোন সমঝোতার সূত্র মিলিয়াছিল। জুলুর জন্য কিতাব শিক্ষার আয়োজন করা হইয়াছিল। প্রতিদিন ফজরের নামাজের শেষে একজন মৌলবি আসিতেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপী জুলুর সঙ্গে তাহার কসরত চলিত। কেহ কাহাকে ছাড়িয়া দিবার পাত্র নহে। মৌলবি ছলেবলে তাহাকে অক্ষর চেনাবেনই। আর জুলু ক্রমাগত অক্ষর হইতে ঠিক বুদ্ধি কষিয়া বাহির হইয়া যাইবে। 

কত পুরনো বাড়ি তাহাদের। এককালে তাহাদের পূর্বপুরুষেরা মস্ত মহাজন ছিল। সেই ব্যবসা এখন পড়তির দিকে। তাহাদের মহাজনি ঘুচিয়া গিয়াছে; পরিবর্তে আরও কতকিছু যে হস্তগত হইয়াছে তাহার ঠিক নাই। 

এত পুরনো বাড়ি, গোলবারান্দা, কড়িকাঠের ভিতর ভোরবেলা চড়ুইরা আলিস্যি ভাঙে। তখনও বাড়ির সকলের ঘুম ভাঙে নাই। সদর দরজায় কেহ বুঝি ঝুপ ঝুপ করিয়া আওয়াজ করিতেছে। জুলু সতর্ক হইয়া ওঠে। তাহার মনে কেমন সন্দেহ জাগে। এই তো কয়দিন আগে সে বাগানে একখানা ঢোঁড়া দেখিয়া ছিল। ঢোঁড়াটি একখানা ব্যাঙ গিলিয়া ফাঁপরে পড়িয়াছিল। উহার পেট ফুলিয়া গিয়া ঢোল হইয়া গিয়াছে। নড়িবার শক্তিমাত্র নাই। পেয়ারা গাছের ছাওয়ায় সেটি নিয়তির মত স্থবির, শান্ত। এমনকি ঢিল মারিলেও উহার বিরক্তি প্রকাশ পাইতেছে না। যেন জগতের ভার ব্যাঙের আকৃতিতে উহার পেটের ভিতর আসিয়া আটকাইয়া গিয়াছে। আর বার হইতে পারিতেছে না। 

তা এই ভোরবেলা সদর দরজায় ঝুপ ঝুপ আওয়াজ হইতেছে; আর ইহার সহিত বাগানের ঢোঁড়ার কী সম্পর্ক? জুলু নিজেও কোন যোগসূত্র পাইল না। তবু সে দরজার যত নিকটে গেল, ঢোঁড়ার চিত্রটিই বারবার তাহার সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল। 

সে ভয় পাইয়াছিল। তারপর কোনক্রমে দরজা খুলিলে দেখিল, ঐখানে এ-পাড়ার নুরুল মাস্টার দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। মাস্টারের পেছনে পুলিশের জিপ। 

জুলু কী করিবে বুঝিতে পারিতেছিল না। সে দৌড়াইয়া পুনরায় বারন্দায় ফিরিয়া আসিয়াছিল। মাস্টর তাহার নাম ধরিয়া ডাকিয়া চলিতেছে। জুলু কিছুতেই নিজের নাম শুনিবে না। সে আঙ্গুল দিয়া কান বন্ধ করিয়া রাখিতে চায়। সে কুঁজো হইয়া বসিয়া পড়ে। মাদুরের উপর রেহেল ছিল। সে রেহেলের উপর মাথা গুজিয়া দেয়। তাহার সম্মুখে কতকগুলি ভিনদেশি অক্ষর। কালো কালো, শুষ্ক। গায়ে হাত বোলাইলে তাহা কাগজের মত খসখস করিয়া ওঠে! 

জুলু। জুলু। জুলু... 

জুলু বোবা হইয়া গেল। সে কানা হইয়া গেল। 

সে দেখিতে পাইল, তাহার পিতা, শিরদাঁড়া যেন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, এমনভাবে চলিতেছে। ঐ তিনি সদর দরজা অতিক্রম করিতেছেন। মাস্টারের সহিত কী যেন তর্ক করিতেছেন। তাহার অন্য সব পুত্ররা তাহাকে ঘিরিয়া রহিয়াছে। কিন্তু তিনি বুঝিয়াছেন, এইক্ষণে আর কিছু করিবার উপায় নাই। মাস্টার বড় চালাকির ফাঁদ পাতিয়াছিল। কবেকার মিড-ডে মিলের চাল ব্লাক করিবার মামলায় আজ তিনি পুলিশের জিপে উঠিতেছেন। 

নুরুদ্দিন শেখ জিপে উঠিতে ছিলেন, আবার পেছন ফিরিয়া কী যেন ভাবিতেছিলেন। কী যে তিনি ভাবিতেছিলেন এখন আর ঠিক মনে করিতে পারিতেছেন না। তবু এই বিবাহবাসরে, এই এত লোকের সম্মুখে হাঁটিতে গিয়া তিনি শিরদাঁড়ায় পুনরায় সেইরকম তছনছ টের পাইলেন। তাহার পা কাঁপিয়া উঠিল। তিনি স্পষ্ট দেখিতে পাইলেন, গোলবারান্দায় রেহেলের উপর মুখ গুঁজিয়া বসিয়া রহিয়াছে জুলু, একবার পিতার দিকে কেমন দৃষ্টি ফেরাইল, তাহার মুখে কোন অভিব্যাক্তি ধরা পড়িল না। 

জুলু কি পাগল, উন্মাদ, ছিটগ্রস্ত? সে এমন নিষ্ঠুর হইতে পারিল কিভাবে? দয়ামায়াহীন এই মানুষটি পৃথিবীতে টিকিয়া আছে। বহালতবিয়তে বাঁচিয়া রহিয়াছে। তবু পৃথিবীবাসীর প্রতি তাহার কোন কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ময় নাই! যেন সে আছে বলিয়াই আছে। তাহার কপালে চন্দনের ফোটা দেওয়া হইয়াছে। সম্মুখে টেবিল ফ্যান চলিতেছে। সে তাকাইয়া রহিয়াছে সকলের দিকে। সে কাহাকেও দেখিতেছে না। তাহার শেরওয়ানি তাহাকে বর রূপে চিহ্নিত করিতে পারিয়াছে, এইটুকুই সত্য মাত্র, বাকি যা কিছু - এই সমাহার, খাদ্য, অপচয়...সবই উহ্য অথবা অতিরেখ! 

খানাপিনার পালা শেষ হইয়া গিয়াছিল। আত্মীয়স্বজনেরা হুল্লোড়ে মাতিয়াছে। এই বস্তিতে আমোদের খামতি নাই। নিষেধ সত্বেহ গানাবাজনা একনাগাড়ে বাজিতেছে। 

নুরুদ্দিন শেখ এইবার তাগাদদিলেন। যাহোক করিয়া তাহাকে সন্ধ্যার পূর্বে বাড়ি পৌঁছাইতে হইবে। মেয়েটি জানিয়া-বুঝিয়া এই অকর্মণ্যের সহিত বিবাহ করিয়াছে বলিয়া তিনি অতিরিক্ত কিছু গহনা দিয়াছিলেন। তাহার শত্রু কম নয়। উপরন্তু এইসকল বস্তিবাসীকে তিনি কোনদিন বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। 

কন্যাবিদায়ের তোরজোড় শুরু হইয়া গিয়াছিল। হঠাৎই নুরুদ্দিন শেখের সম্মুখে একজন অতি বৃদ্ধা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি নাকি কন্যার কোন দূর সম্পর্কের দাদী। বলিলেন, কেগা, চিনতে পারচিনি তো। কে? 

নুরুদ্দিন শেখ কী বলিবেন বুঝিতে পারিতেছিলেন না। 

বৃদ্ধাটি আবার বলিলেন, তুমি কে? কে গা? 

নুরুদ্দিন শেখ উত্তর দিতে চাহিলেন না। 

।২। 

নববধূ যখন শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করিল, তাহার পূর্বেই চারিপাশ লন্ডভন্ড হইয়া গিয়াছিল। বধূটিকে আপ্যায়নের সময় তাই সংসারের গিন্নি উপস্থিত থাকিতে পারিলেন না। কন্যা শুধু এইদিক ঐদিক চাহিয়া দেখিতে থাকিল। কী এক মস্ত মহলে সে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে! তাহার পায়ের নিচে যে মেঝে, মাথার উপর যে ছাদ, চারিপাশে যে দেওয়াল – তা তো শুধুমাত্র ইটপাথরে তৈয়ারি হয় নাই; প্রতিটি গাঁথুনিতে বৈভব ও প্রাচুর্য্য যেন গম্ভীর হইয়া গুরুভাব প্রকাশ করিতেছে। এই মহল আজ তাহার। কন্যা ঝড়ের মধ্য দিয়া আজ মহলে প্রবেশ করিয়াছিল। তাহার শরীরে ঝড়ের চিহ্ন বিদ্যমান। 

গাড়িতে উঠিবার পূর্বেই পশ্চিমাকাশে মেঘ ঘন হইয়া আসিয়া ছিল। কন্যার পাশে জুলু বসিয়া রহিয়াছে। সে হাতদুটিকে সংকোচে সরাইয়া লইল। বধূর সংস্পর্শে আসিলে বুঝি তাহার ধর্ম লুপ্ত হইবে। কন্যা এইসময় নিজ নামে জ্ঞাত হইল, সে রাজিয়া, বস্তিজীবন ছাড়িয়া সড়ক পথে মহলে চলিতেছে, তাহার পাশে যিনি বসিয়া রহিয়াছেন তাহার প্রতি সেও তো উদাসীন; তবু সড়ক পথে কালো মহিষের তান্ডব কাহারও চোখ এড়াইলনা। 

মহিষটি চঞ্চল। বিকৃত মস্তিষ্কের। সেটি শিঙা ফুকিয়া ঝড় তুলিয়াছে। সড়কের দুই ধারে কত বৎসরের পুরনো বৃক্ষ। বয়সের ভারে উহাদের বৃদ্ধ হইবার কথা ছিল। কিন্তু এইক্ষণে তাহারা বুঝি পদমর্যাদা ভুলিয়া গিয়াছে। ছোটদের সহিত নৃত্য জুড়িয়া পথ বন্ধ করিয়াছে। গাড়িটি আর এগোইতে পারিতেছে না। 

রাজিয়ার মনে হইয়াছিল মহলটি অলীক। সেই অলীক মহলে সে কোনদিন আর স্থাপিত হইবে না। তবু কল্পনা এমনি, আকাঙ্ক্ষা এমনি যে আজ তাহার গলায় একজন জড়বস্তু ঝুলিতেছে। সে জানালার কাচ দিয়া বাহিরকে লক্ষ্য করিল। তাহার মনে হইল মহিষটি আসলে একটা প্রচন্ড ধাঁধা। এবং পাশের মানুষটি রূপক ব্যাতীত অন্যকিছু নয়; পারম্পর্য নয়। 

 – জুলু, জুলু... 


জুলু পুনরায় কানে আঙ্গুল দিয়াছিল। নুরুদ্দিন শেখ গাড়ির দরজা খুলিয়া ছেলেকে টানিয়া লইলেন। পেছন পেছন রাজিয়াও নামিল। তাহার সম্মুখে মহলের দ্বার উদ্ঘাটিত হইয়াছে। গহনার ভারে সে ফসলের মত ন্যুব্জ। 

গিন্নি অনুপস্থিত। এতক্ষণ তিনি ঝড়ের তান্ডব সামলাইতে ছিলেন। নুরুদ্দিন শেখ আর দেরি করিলেন না। নিজেই বৌমাকে ঘরের মধ্যে ডাকিয়া লইলেন। বলিলেন, এইখানে বোসো। 

তারপর জুলুর দিকে ফিরিয়া বলিলেন, তুমিও এইখানে থেকো। অন্য কোথাও যেও না। 

জুলু বাধ্য ছেলের মত নববধূর পাশে গিয়া বসিল। রজিয়া লক্ষ্য করিল মহলের ভিতর ঝড়ের কোন চিহ্নমাত্র নাই। যেন কত যুগ ধরিয়া, কত বৎসর ধরিয়া মহলটি এইভাবে চলিতেছে। ইহা যেন মনুষ্য বসবাসের স্থান নহে; ইহা ইমারত! 

ইতোমধ্যে রাজিয়াকে দেখিতে কত লোকজন আসিয়া গিয়াছিল। কেহ জুলুকে লইয়া ইয়ার্কি করিতেছে। কেহবা বধূর চিবুক তুলিয়া দেখিতেছে চোখের তলে কালি পড়িয়াছে নাকি! 

অবশেষে জুলুর মা আসিলেন। তিনি রাজিয়াকে বলিলেন, চল। 

রাজিয়া মায়ের পিছু পিছু অন্য একটি ঘরে প্রবেশ করিল। এইটিই তাহার ঘর। তাহার আর জুলুর শয়নকক্ষ। 

পালঙ্কে একখানা ব্যাগ রহিয়াছে। গিন্নি বলিলেন, ঐদিকটায় গোসলখানা। তুমি শাড়িটা পালটে নাও। ব্যাগে নতুন শাড়ি আছে। 

জুলু ঘরের ভেতর আসে নাই। সে দরজার কাছে দাঁড়াইয়া ছিল। এখন মায়ের সঙ্গে অন্য কোথাও চলিয়া গেল। 

দেওয়াল জোড়া আলমারি। পালঙ্কটিও নতুন। নরম গদির উপর রাজিয়া এমনিই কতক্ষণ বসিয়া থাকিল। চাদরের ওপর গোলাপের পাপড়ি ছড়ান। সে কতকগুলি পাপড়ি লইয়া ঘ্রান নিল। তাহার নাকটি সদ্য ফোটান হইয়াছিল। এখন নাকছাবি পরিয়া নাকের পাটা ফুলিয়া গিয়াছে। সে নাকছাবিটা খুলিয়া রাখিল। কপাল হইতে টিপটি তুলিয়া আয়নায় লাগাইল। এইক্ষণে তাহাকে আর লাজমতী লাগিতেছে না। তাহার গ্রীবা যথেষ্ট উদগ্রীব। সে মরালের ন্যায় ঘরমায় পায়চারি করিতে থাকিল। তারপর গোসলখানা হইতে ফিরিয়া পুনরায় টিপটি আর নাকছাবিটি পরিয়া লইল। 

সংসারের কনিষ্ঠ বধূর প্রথম রাত্রি। নুরুদ্দিন শেখ এমন আয়োজন করিয়াছেন যে দেখিলে মনে হইবে প্রথম রাত্রেই বুঝি তিনি কন্যাটির বস্তিজীবনে ছেদ টানিতে চাহিতেছেন। 

খেতে বসিয়া রাজিয়া অভিভূত হইয়া পড়িল। তাহার থালায় কে যেন একখানা সম্পূর্ন খাসির মাথা রাখিয়া দিয়াছে। 

রাজিয়ার অবস্থা দেখিয়া সকলেই হাসিয়া ফেলিল। 

ঝড়ের পর টিপটিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছিল। এখন সেইটাও থামিয়া গিয়াছে। আকাশে মেঘ বলিয়া কিছু নাই। তারা ফুটিয়াছে। তারাদের মাঝখানে চাঁদটিকেও গোলাকার দেখাইতেছে। 

জুলুর মা সকলকে বুঝাইয়া দিলেন। তারা রাজিয়াকে পুনরায় শয়নকক্ষে পাঠাইয়া দিল। 

ফুলের পাপড়ির উপর রাজিয়া বসিয়া রহিয়াছে। ফুলের গন্ধে কোথা হইতে একটা মাছি আসিয়া বারেবারে তাহার গায়ে মাথায় বসিতেছিল। রাজিয়া ঘোমটার ভিতর দিয়া দরজায় চোখ ফেরাইল। 

জুলু দরজার ওপারে। সে ঘরের মধ্যে ঢুকিবে না। জুলুর পেছনে বুঝি আরও অনেকেই উপস্থিত। তাহাদের ফিসফিস কথাবার্তা রাজিয়া খানিক শুনিল। 

শেষে নুরুদ্দিন শেখ নির্দেশ দিলেন। জুলু ভেতরে প্রবেশ করিতেই বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ হইয়া গেল। 

এখন কী করিবে রাজিয়া? 

জুলু পালঙ্কের উপর চুপচাপ বসিয়া রহিয়াছে। মাছিটি এখন রাজিয়াকে ছাড়িয়া দিয়া জুলুর কানের নিকট ঘুনঘুন করিতেছে। জুলু বারবার ঘাড় নাড়িয়া মাছিটিকে তাড়াইতে সচেষ্ট। তবু মুখ তুলিয়া একবারও বধূটিকে দেখিতেছে না। 

অবশেষে রাজিয়া বলিল, আমার নাম রাজিয়া। 

জুলু কোন উত্তর করিল না। 

ক্রমে রাত গভীর হইল। 

রাজিয়া আলমারি হইতে গহনার খালি বাক্সগুলি বার করিয়া আনিল। কত রকমের গহনা হইয়াছে তাহার! প্রথমে সে রতনচূরটি খুলিয়া বাক্সে রাখিল। চারখানা ছোট ছোট কৌটো। এই কৌটোগুলোয় আংটি রাখিতে হইবে। কোমরে রূপোর কোমরবন্ধ। দুই পায়ে নুপুর। চারগাছা করিয়া মোট আটগাছা সোনার বালা সে কোথায় রাখিবে এখন? আলমারিটির চাবি তো এখনও কেহ তাহাকে দেয় নাই! সে গলার হারটি খুলিয়া বাক্সটির মধ্যে রাখিয়া দিল। টিকলিটি খুলিতে যাইলে দেখিল উহার হুকটি কখন ছিঁড়িয়া গিয়াছে। রাজিয়া জিভ কাটিয়া ফেলিল। ইস! যাতায়াতের মধ্যে যদি তাহার গহনাটি কোথাও পড়িয়া যাইত! 

ইতোমধ্যে জুলু শুয়ে পড়িয়াছিল। সে মুখের উপর মাথার বালিশটি চাপিয়া রাখিয়াছে। 

রাজিয়া আবার গহনার বাক্সগুলি আলমারির ভেতর রাখিয়া দিল। তাহার মনটি বড় খুঁতখুঁত করিতেছে। কেন যে আলমারির চাবিটি এখনও তাহাকে কেহ দেয় নাই! 

সে বাতি নিভাইয়া দিয়া পালঙ্কের ধার ঘেষিয়া শুলো। কখন চোখ জুড়াইয়া আসিয়াছিল। সে স্বপ্নে দেখিল তাহাদের বস্তিটি দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া পড়িয়ে রহিয়াছে। কোথাও কোন মানুষ নাই। আবর্জনার স্তূপের উপর একটা মহিষ নৃত্য করিতেছে। 

রাজিয়ার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। চোখ খুলিলেই দেখিল - পিস্তল। জুলু একখানা খেলনার পিস্তল লইয়া তাহার বুকের উপর বসিয়া রহিয়াছে। 

রাজিয়া সর্বশক্তি দিয়াও কিছুতেই অকমর্ণ্যটিকে ফেলিতে পারিল না। 

পরেরদিন স্নান সারিয়া তবে বাহিরে আসিল রাজিয়া। তাহার কক্ষ হইতে তখনও খেলনার বন্দুকের আওয়াজ আসিতেছিল। 

জুলুর মা আর নববধূটিকে কিছু জিজ্ঞাসা করিল না। 

রাজিয়া সিঁড়ি দিয়া নিচে নামিতেছে। তাহাকে ঘিরিয়া রহিয়াছে মহাজনের মহল। বহুকিছুর বিনিময়ে আজ সে পণ্যের অধিকার পাইয়াছে। এই অধিকার সে কিছুতেই ফিরত দিবে না। 



লেখক পরিচিতি
সাদিক হোসেন
জন্মস্থান, জন্মতারিখ বা শাল – মহেশতলা, দঃ ২৪ পরগণা। ১১ই ডিসেম্বর, ১৯৮১
বর্তমানে কোথায় থাকেন-- মহেশতলা
প্রকাশিত বইয়ের নাম--(গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা ইত্যাদি সঙ্গে প্রকাশকের নাম ও ঠিকানা)।
১। দেবতা ও পশুপাখি ( কবিতা)
২। মোমেন ও মোমেনা (উপন্যাস, সোপান)
৩। সম্মোহন ( ছোট গল্প, কলিকাতা লেটারপ্রেস)
৩। গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময় (ছোট গল্প, সোপান)
৪। রিফিউজি ক্যাম্প (ছোট গল্প, অভিযান)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন